এই সূত্রে - " ঈশোপনিষদ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "
এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১ "
জগতের কাল ও যুগ তত্ত্ব
শ্রীমৈত্রেয় বললেন, “ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ ও ব্যোম - সৃষ্টির শুরুতে এই পাঁচবস্তুর উৎপন্ন হয়, এদেরকে কার্য্য বলে। এই কার্যের যে ক্ষুদ্রতম অংশ, যাকে আর ভাগ করা যায় না, তাকে পরমাণু বলে। পরমাণুকে চোখে দেখতে পাওয়া যায় না, কিন্তু এর অস্তিত্ব অনুমানে বুঝতে পারা যায়। পরমাণু যখন একক অবস্থায় থাকে, তখন তার কোন কার্য্য অবস্থা নিরূপণ করা যায় না। অনেক পরমাণু্র সমষ্টিতে বস্তু গড়ে ওঠে, তখন সকল বস্তুকেই আলাদা মনে হয়। কিন্তু সকল বস্তুরই পরমাণু ধর্ম এক। অতএব পরমাণু সমস্ত ভূতের সূক্ষ্মরূপ এবং বস্তু স্থূলরূপ। প্রলয়ের আগে, সকল বস্তু নিজ নিজ বৈশিষ্টের মধ্যে থাকে। কিন্তু প্রলয়কালে বস্তুর সকল বৈশিষ্ট্য বিনাশ হয় এবং সমস্ত ব্রহ্মাণ্ড একই পরমাণু রূপে সমাহিত হয়। এই ধারণাকে বলা হয় পরমমহৎ পরিমাণ।
[এই পর্যন্ত পড়ে মনে হয় সরল বাংলায় ফিজিক্সের অ্যাটমিক তত্ত্ব পড়ছি। এবং "পরমমহৎ পরিমাণ" তত্ত্বটিতে কালা-গহ্বর তত্ত্বের গন্ধও কিছুটা যেন পাওয়া যায়। মনে হয় আমাদের ঋষিরা যদি আরও গভীরে গিয়ে আরও চিন্তাভাবনা করতেন, তাহলে আমরা হয়তো পদার্থবিদ্যার জনক হতে পারতাম। কিন্তু তা হবার নয় - এই পর্যায়ে প্রবেশ ঘটে গেল ঈশ্বরের - এবং সমস্ত বিষয়টা ভক্তিরসে বেপথু হয়ে ধর্মতত্ত্বের পথে মোড় নিল।]
একই ভাবে কালেরও সূক্ষ্ম ও
স্থূলরূপ দুইই অনুমান করা হয়। কাল শ্রীনারায়ণের শক্তি, তিনি স্বরূপতঃ অব্যক্ত ও
উৎপত্তি উভয় বিষয়েই দক্ষ। শ্রীভগবান পরমাণু থেকে ব্যক্ত বস্তু, সর্বত্রই ব্যাপ্ত
থাকেন। দুটি পরমাণুর সমষ্টিকে অণু বলে, এবং তিনটি অণুর সমষ্টিকে ত্রসরেণু বলে।
অন্ধকার ঘরে জানালা দিয়ে সূর্যের আলোক রশ্মি প্রবেশ করলে, সেই আলোকপথে যে ক্ষুদ্র
কণাসমূহ চোখে পড়ে, সেই কণাগুলিই ত্রসরেণু। যে কাল তিনটি ত্রসরেণুকে ভোগ করে, তাকে
ত্রুটি বলে। একশ ত্রুটিতে এক বেধ, তিন বেধে এক লব হয়। তিন লবে এক নিমেষ, তিন
নিমেষে এক ক্ষণ। পাঁচ ক্ষণে এক কাষ্ঠা, পনের কাষ্ঠায় এক লঘু, পনের লঘুতে এক দণ্ড।
দুই দণ্ডে এক মুহূর্ত এবং ছয় বা সাত মুহূর্তে এক যাম অর্থাৎ প্রহর। চার প্রহরে এক
দিবা, চার প্রহরে এক রাত। এই হল মানুষের এক পূর্ণ দিবসের কাল বিভাগ। পনের দিনে এক
পক্ষ, শুক্ল ও কৃষ্ণ, পক্ষের দুই প্রকার। দুই পক্ষে মানুষের এক মাস হয়, কিন্তু
পিতৃলোকে দুইপক্ষ মানে এক দিন। শুক্ল পক্ষে দিন আর কৃষ্ণ পক্ষে রাত। মানুষের দুই
মাসে এক ঋতু ও ছয় মাসে এক অয়ন। অয়ন দুরকমের – উত্তরায়ণ ও দক্ষিণায়ণ। দেবলোকে
দেবতাদের উত্তরায়ণে এক দিন এবং দক্ষিণায়ণে এক রাত হয়। বারো মাসে মানুষের এক বছর আর
এইভাবেই মানুষের আয়ু একশ বছর নির্দিষ্ট হয়ে আছে”।
[আবারও একটু ঘেঁটে গেল। কাল অর্থাৎ সময়ের এমন সূক্ষ্ম পরিমাপের কল্পনা পড়লে বিস্মিত হতে হয়। কিন্তু আলোকপথে চোখে পড়া ত্রসরেণু বলতে যা বোঝানো হয়েছে সেই কণা থেকে সময়ের হিসেব কী করে হয়? সময়কে চোখে দেখা যায় নাকি? তাহলে সূর্যের আলোক রশ্মি যখন নেই, অর্থাৎ রাত্রে ত্রসরেণু তো দেখতে পাওয়া যাবে না, সময়ই বা হিসেব কী করে করব?]
মহাত্মা বিদুরের প্রশ্নে শ্রীমৈত্রেয় আরো বললেন, “সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর ও কলি এই হচ্ছে চার যুগ। কোন যুগের প্রথম ভাগকে বলে সন্ধ্যা ও শেষভাগকে বলে সন্ধ্যাংশ। দেবতাদের বারো হাজার বছরে সন্ধ্যা এবং এই চারটি যুগ নিয়ে দেবতাদের সন্ধ্যাংশ বলা হয়। সত্যযুগ চার হাজার বছর এবং সন্ধ্যা ও সন্ধ্যাংশ প্রত্যেকে চারশ বছর। এইভাবে ত্রেতা, দ্বাপর ও কলি যথাক্রমে তিন হাজার, দু হাজার ও একহাজার বছর। এই তিন যুগের সন্ধ্যা ও সন্ধ্যাংশ প্রত্যেকে যথাক্রমে তিনশ, দুশ ও একশ বছর। সন্ধ্যা ও সন্ধ্যাংশের মাঝের সময়টিকে যুগ বলে। যে যুগে যে ধর্ম নির্দিষ্ট করা আছে, মানুষের সেই ধর্মই পালন করা উচিৎ। সত্যযুগে চতুষ্পাদ ধর্ম, অর্থাৎ ধর্মই সম্পূর্ণভাবে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে। তারপরে ত্রেতা, দ্বাপর ও কলিতে এক এক পাদ অধর্ম বাড়তে থাকে এবং এক এক পাদ ধর্ম কমতে থাকে। অতএব এই তিন যুগে অধর্মের সঙ্গে যুদ্ধ করেই সম্পূর্ণ ধর্ম আচরণ করার চেষ্টা করা উচিৎ”।
[এই যুগের হিসেব ধরলে, কলিযুগের এক হাজার বছর কবেই পার হয়ে গেছে! মহাভারতে বলা হয়েছে, শ্রীকৃষ্ণের মর্ত্যলীলা সংবরণের দিন থেকে দ্বাপরের শেষ ও কলির শুরু। সেই সময়টা যদি মোটামুটি ৮৫০ বি.সি.ই ধরি, তাহলে আজ পর্যন্ত ৮৫০ + ২০২৬ = ২৮৭৬ বছর পার হয়ে গেল, কিন্তু সত্য যুগ ফিরে আসার কোন লক্ষণ তো টের পাওয়া যাচ্ছে না, বরং ধার্মিকগণ এখনও বলে চলেছেন "ঘোর কলি চলছে"।]
শ্রী মৈত্রেয় বললেন, “হে বিদুর, ভূর্লোক, ভূবর্লোক ও স্বর্লোক, এই তিন লোকের বাইরে আছে মহর্লোক, জনলোক, তপোলোক ও সত্যলোক। এই চার লোকে এক হাজার চার যুগে এক দিন হয়। এই দিন ব্রহ্মার এক দিন, একই সময়ে ব্রহ্মার রাত্রি হয়। ব্রহ্মা রাত্রে নিদ্রামগ্ন থাকেন, ব্রহ্মার রাত্রি অবসানে সৃষ্টির প্রক্রিয়া শুরু হয়। এবং যে কাল পর্যন্ত ব্রহ্মার দিন গণ্য করা হয়, সেই কালে চোদ্দজন মনু রাজত্ব করেন। প্রত্যেক মনুর রাজ্যকালকে মন্বন্তর বলে। এই ত্রিলোক সৃষ্টি ব্রহ্মার দৈনন্দিন সৃষ্টি। এই সৃষ্টির মধ্যে তির্যগযোনি পশুপাখি, মানুষ, পিতৃগণ ও দেবগণের নিজ নিজ কর্মফল অনুসারে জন্ম হয়ে থাকে। প্রত্যেক মন্বন্তরে ভগবান সত্ত্বময় পরমপুরুষ রূপে অবতীর্ণ হয়ে এই বিশ্বের রক্ষা করে থাকেন। তারপর দিনের অবসানে সমস্ত তমোগুণ নিজের আত্মায় সন্নিবেশ করে, ত্রিলোকের উপসংহার করেন। তিন লোকের সকল জীবসমূহকে নিজের দেহে লীন করে তিনি তাঁর মায়া লীলা পরিত্যাগ করেন। সেই সময় সূর্য, চন্দ্র এবং সমস্ত লোক শ্রীভগবানের মধ্যে প্রবেশ করে। এই কল্প শেষের কালে সমুদ্রের জল বেড়ে যায়, প্রচণ্ড বাতাসে সমুদ্রের ঢেউ সমস্ত স্থলভাগকে গ্রাস করে এবং ত্রিভুবনকে প্লাবিত করে। শ্রীনারায়ণ সেই প্লাবনের জলে অনন্তশয়ানে অবস্থান করেন, তাঁর দুই চোখ যোগনিদ্রায় নিমীলিত হয়।
এই ব্রহ্মার যে আয়ু, সেই আয়ু এখন
শেষের দিকে। তাঁর জীবিত কালের অর্ধাংশকে পরার্ধ বলে, প্রথম পরার্ধ শেষ হয়েছে, আজ
শেষ পরার্ধের প্রথম দিন। প্রথম পরার্ধের আদিতে মহান ব্রাহ্মকল্প হয়েছিল এবং সেই
কল্পে ব্রহ্মা আবির্ভূত হয়েছিলেন। তাঁকে শব্দব্রহ্ম বলা হয়। যেহেতু এই কল্পে
শ্রীনারায়ণের নাভি সরোবর থেকে উৎপন্ন কমল থেকে এই ত্রিভুবনের সৃষ্টি হয়েছিল, সেই
কারণে এই কল্পকে পাদ্মকল্প বলে। আবার এই পাদ্মকল্পকেই বরাহকল্পও বলা হয়, যেহেতু এই
কল্পে শ্রীহরি বরাহ অবতার হয়ে পৃথিবীর উদ্ধার করেছিলেন।
এই দুই পরার্ধকালকে কোন কোন শাস্ত্রে ভগবানের নিমেষ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। ভগবান কাল প্রভৃতি নিখিল জগতের একমাত্র কারণ, এই কারণে তিনি কালের অতীত, সুতরাং তাঁর শুরু কিংবা অন্ত কিছুই নেই। পরমাণু থেকে দুই পরার্ধ পর্যন্ত কাল, দেহরূপ গৃহে আসক্ত প্রাণিদের উপর যে প্রভাব বিস্তার করতে পারে, পরিপূর্ণ ভগবান অর্থাৎ ভূমার উপর সেই কালের বিন্দুমাত্র প্রভাব নেই। এই ব্রহ্মাণ্ডকোষ এগারো ইন্দ্রিয় ও পঞ্চমহাভূত - এই ষোলটি বিকারপদার্থ এবং প্রকৃতি, মহত্তত্ত্ব, অহংকারতত্ত্ব ও পঞ্চতন্মাত্র - এই আট প্রকৃতি দিয়ে নির্মিত। এই কোষ ভিতরের দিকে পঞ্চাশকোটি যোজন বিস্তৃত এবং বাইরের দিকে ক্ষিতি, অপ, তেজঃ, মরুৎ, ব্যোম, অহংকার ও মহত্তত্ত্ব এই সাত আবরণে ঢাকা। এই ব্রহ্মাণ্ডকোষের যত পরিমাণ, প্রথম আবরণ ক্ষিতির পরিমাণ তার দশগুণ। এইভাবে পরবর্তী প্রত্যেক আবরণ তার আগের প্রতিটি আবরণের থেকে দশগুণ বড়ো হয়ে থাকে। এই বিশাল ব্রহ্মাণ্ড এবং এছাড়াও এরকম কোটি কোটি ব্রহ্মাণ্ড যাঁর মধ্যে আশ্রয় নিয়ে আছে, তাঁকে পরমাণুর মতো মনে হয়। তিনিই সকল কারণের কারণ অক্ষর ব্রহ্ম। তিনিই পরমপুরুষ সাক্ষাৎ মহাবিষ্ণু”।
শ্রীমৈত্রেয় বললেন, “হে বিদুর,
কালরূপী শ্রীনারায়ণের প্রভাব আপনার কাছে বর্ণনা করলাম, এখন ব্রহ্মার সৃষ্টিকথা
বর্ণনা করি, শুনুন। ব্রহ্মা প্রথমতঃ অবিদ্যার পাঁচটি বৃত্তি সৃষ্টি করলেন। প্রথম
সৃষ্টি করলেন তমোগুণ, অর্থাৎ স্বরূপের অপ্রকাশ। তারপর মোহ, অর্থাৎ অহংবুদ্ধি।
মহামোহ অর্থাৎ ভোগ বাসনা। তামিস্রা অর্থাৎ ভোগ বাসনায় বাধা ঘটলেই ক্রোধ।
অন্ধতামিস্রা অর্থাৎ ভোগবাসনার বিনাশে আমারই সর্বনাশ, এমন বুদ্ধি। কিন্তু এই
সৃষ্টিতে তিনি সন্তুষ্ট হলেন না। তিনি আবার শ্রীনারয়ণের তপস্যা করে নিজেকে পবিত্র
করে অন্যান্য সৃষ্টি করলেন। প্রথমে তিনি নিজেরই রূপে সনক, সনন্দ, সনাতন ও সনৎকুমার
এই চারজন নিষ্ক্রিয় ব্রহ্মস্বরূপ মুনিকে সৃষ্টি করে বললেন, হে পুত্রগণ, তোমরা
প্রজা সৃষ্টি করো। কিন্তু যেহেতু তাঁরা মোক্ষনিষ্ঠ,
শ্রীবিষ্ণু পরায়ণ, তাঁরা প্রজা সৃষ্টিতে প্রবৃত্ত হলেন না। তাঁর নির্দেশ অমান্য করায় তিনি
চার কুমারের প্রতি প্রচণ্ড ক্রোধী হয়ে উঠলেন, কিন্তু তিনি ক্রোধ সংবরণ করার চেষ্টা
করলেন। সেই ক্রোধ তাঁর দুই ভুরুর মধ্যে থেকে নীললোহিতকুমার রূপে জন্ম নিল। সদ্যজাত
শিশু কাঁদতে কাঁদতে বললেন, হে জগৎ গুরু, আমার নাম ও স্থান আপনি নির্দেশ করে দিন।
পদ্মযোনি ব্রহ্মা সস্নেহে সেই কুমারকে বললেন, যেহেতু তুমি উদ্বিগ্ন বালকের মতো
রোদন করেছ, তাই তোমার নাম হবে রুদ্র। আর হৃদয়, ইন্দ্রিয়, প্রাণ, আকাশ, বায়ু,
অগ্নি, জল, মহা, সূর্য, চন্দ্র ও তপস্যা এই স্থানগুলি আমি তোমার জন্যেই নির্দিষ্ট
করে রেখেছি। মন্যু, মনু, মহিনস, মহান, শিব, ঋতধ্বজ, উগ্ররেতঃ, ভব, কাল, বামদেব, ও
ধৃতব্রত এই একাদশ নামে তুমি বিখ্যাত হবে। এবং ধী, ধৃতি, উশনা, উমা, নিষুৎ, সর্পিঃ,
ইলা, অম্বিকা, ইরাবতী, স্বধা ও দীক্ষা এই একাদশ শক্তি হবেন তোমার পত্নী। তুমি এই
পত্নীদের স্বীকার করে বহু প্রজার সৃষ্টি করো।
প্রজাপতি ব্রহ্মার নির্দেশে নীললোহিতকুমার নিজের শক্তি, আকৃতি ও তীব্রস্বভাব অনুযায়ী প্রজাসমূহ সৃষ্টি করতে লাগলেন। সেই প্রজাদের রুদ্ররূপে এবং ব্যবহারে জগতের চারদিক অতিষ্ঠ হয়ে উঠল। তখন ব্রহ্মা আবার পুত্রকে ডেকে বললেন, হে রুদ্র, এমন প্রজা সৃষ্টির আর প্রয়োজন নেই। তোমার সৃষ্টি করা প্রজাদের চোখের দৃষ্টিতে দশদিক এমনকি আমারও দগ্ধ হয়ে যাবার অবস্থা হয়ে উঠেছে। অতএব, হে পুত্র তুমি তপস্যা করো, তপস্যা সর্বভূতের মঙ্গলকারী, তপস্যা করে তুমি আগের কল্পের মতো বিশ্ব সৃষ্টি করো। রুদ্র পদ্মযোনি ব্রহ্মার নির্দেশে তপস্যার জন্যে অরণ্যে প্রবেশ করলেন।
[জন্মানোর পরেই নীললোহিতকুমার এমন কাঁদতে লাগলেন, ব্রহ্মা তাঁর নাম রাখলেন রুদ্র। সেই রুদ্র একাদশ নাম নিয়ে, একাদশ পত্নীর সঙ্গে প্রজা সৃষ্টি করছিলেন। কিন্তু ব্রহ্মার রুদ্রের ওই সৃষ্টিসমূহ মনঃপূত হল না, তিনি বললেন, "ঢের করেছ, বাপু, এবার ক্ষ্যামা দাও। তুমি তপস্যা করো। শৈব মতে রুদ্র হচ্ছেন শিব। ভাগবত পুরাণে রুদ্রর সঙ্গে রীতিমতো ছেলেখেলা করলেন ব্রহ্মা, শৈব পুরাণ নিয়ে যদি কোন দিন আলোচনার সুযোগ পাই দেখা যাবে চিত্রটি সম্পূর্ণ উল্টো]।
রুদ্র ধ্যানে নিমগ্ন হলে, ব্রহ্মার আরো দশটি পুত্র সৃষ্টি হল। তাঁদের নাম মরীচি, অত্রি, অঙ্গিরা, পুলস্ত্য, পুলহ, ক্রতু, ভৃগু, বশিষ্ঠ, দক্ষ ও নারদ। নারদের জন্ম হল ব্রহ্মার কোল থেকে, দক্ষ হলেন তাঁর বুড়ো আঙুল থেকে, বশিষ্ঠ তাঁর প্রাণ থেকে, ভৃগু ত্বক থেকে, ক্রতু হাত থেকে, পুলহ নাভি থেকে, পুলস্ত্য দুই কান থেকে, অঙ্গিরা মুখ থেকে, অত্রি তাঁর চোখ থেকে ও মরীচির সৃষ্টি হল তাঁর মন থেকে। লোকবিস্তারের কারণেই এঁদের জন্ম। ব্রহ্মার দক্ষিণ স্তন থেকে ধর্মের সৃষ্টি হল, এই ধর্মেই স্বয়ং শ্রীনারায়ণ বিরাজ করেন। তাঁর পিঠ থেকে সৃষ্টি হল অধর্মের, লোক সকলের মৃত্যুভয়ের কারণ এই অধর্ম। এরপর তাঁর হৃদয় থেকে কাম, দুই ভুরু থেকে ক্রোধ, অধর থেকে লোভ, মুখ থেকে সরস্বতী, লিঙ্গ থেকে সমস্ত সিন্ধু ও পায়ু থেকে পাপ সৃষ্টিকারী রাক্ষসের সৃষ্টি হল। ব্রহ্মার ছায়া থেকে সৃষ্টি হলেন দেবহূতির পতি ঋষি কর্দম। এই ভাবেই ব্রহ্মার সমস্ত দেহ ও মন থেকে এই জগতের সৃষ্টি হল।
চলবে...
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন