মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩৩

   এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "



[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩২ 


৩৯ 

জনাই চমকে উঠে বলল, “ওরে বাবা। দশহাত মাপের ধুতিই যদি ধরি। চল্লিশখানা মানে – চারশ হাত কাপড়? তাও কালো? অসম্ভব বীজপুরের বিপণিতে একসঙ্গে এত কালো কাপড় পাওয়া যাবে না। আমি বলি কি চল্লিশখান সাদা ধুতি কিনে নে না – তারপর সেগুলো কালো রঙে ছুবিয়ে নিবি ... চলবে না?”

দিনের প্রথম প্রহরের সমাপ্তি ঘোষণা করে, প্রহরী চটির পেটা ঘন্টায় আওয়াজ তুলল ঢং।    

কিন্তু রঙ উঠে গেলে?”

“ধুর ব্যাটা। রঙ উঠবে কেন? আমি তো তাই করি। চটিতে নানান ধরনের লোকজন আসে। অনেকে বিছানাতে বসেই নেশা করে – খায় দায় – আর বিছানার চাদরে ছোপ ধরিয়ে চলে যায়। সে ছোপ না উঠলে সুবিধেমতো রঙে ছুবিয়ে নিই। সে রঙ তো ওঠে না – তবে হ্যাঁ,  কালো রঙ কোনদিন ব্যবহার করিনি”।

একটু চিন্তা করে ভল্লা রামালির দিকে তাকিয়ে বলল, “ঠিক আছে। তাহলে তাই কর – চল্লিশটা সাদা ধুতি – আর পর্যাপ্ত কালো রঙের ব্যবস্থা কর। কত ব্যয় হবে?”

“আমি আনিয়ে নিচ্ছি – যা ব্যয় হবে দিয়ে দিবি”।

“আচ্ছা, এবার বল – বারো হাত লম্বা, দশ হাত চওড়া ইঁটের ঘর বানাতে কত ব্যয় হতে পারে? তোর কোন ধারণা আছে? সব কিছু নিয়ে – ভিত থেকে ছাদ অব্দি”।

“দ্যাখ, এই চটিতে ভৃত্যদের থাকার ঘরগুলো মোটামুটি ওই মাপেই বানাই, তার ব্যয় হয় ঘর প্রতি তিনটে রূপো। কিন্তু তোদের নোনাপুরের ব্যয় অনেকটাই বেশি পড়বে – এখান থেকে ইঁট-চুন-সুরকি-বালি নিয়ে যাবে, কাজের লোকরাও অতটা দূরে গিয়ে থাকবে – তাদের থাকা, খাওয়া-দাওয়া...। আমি ডেকে পাঠাচ্ছি – দেখি না কত বলে। আর কিছু?”

“না আর কিছু না। আজ সন্ধের একটু পরেই আমরা কিন্তু বেরিয়ে পড়ব – কাল সকাল সকাল নোনাপুরে ঢুকতে হবে”।

ঠিক আছে – আমি হাটে লোক পাঠাচ্ছি, আর সুমেরকেও বার্তা পাঠাচ্ছি। একটু বস”।  

জনাই উঠে দাঁড়াতে, রামালিও উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “ভল্লাদাদা, আমি হাট থেকে একটু ঘুরে আসব? জনাইদাদার লোকটির সঙ্গে?”

ভল্লা রামালির মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে কিছু চিন্তা করল, তারপর বলল, “ঠিক আছে - যা ঘুরে আয়”।

চটির কিছু কাজকর্ম সেরে জনাইয়ের ঘরে ফিরতে একটু দেরিই হল। ঘরে এসে দেখল, ভল্লা মাটিতে শুয়ে আছে। অবশ্য জনাইয়ের পায়ের শব্দে ভল্লা উঠে বসল, বলল, “বসে থাকতে থাকতে চোখটা একটু লেগে এসেছিল...”।

জনাই মাটিতে ভল্লার মুখোমুখি বসে বলল, “তোর খবর মাঝেমাঝেই পাই। তুই তো আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিস চারদিকের গ্রামগুলোতে। তবে একথাও বলব, আস্থানের রক্ষীরাও এর জন্যে দায়ী। তারা মোটেই ঠিক কাজ করছে না - গ্রামপ্রধানকে পিটিয়ে মেরে ফেলল? তার ওপর কবিরাজমশাইকে মেরেধরে বন্দী করে রেখে দিল আস্থানে? ফসল ভালো হয়নি বলে, রাজকর কিছুটা কম করার অনুরোধ করেছিল। সেটা তাদের অপরাধ হয়ে গেল? ছি ছি তার জন্যে এরকম নৃশংস হত্যা? বড্ডো বাড়াবাড়ি করছেন আস্থানের আধিকারিক।

আমাদের এই অঞ্চলের লোকরাও ক্ষেপে উঠছে, জানিস? এরকম চললে, নোনাপুর কিংবা সুকরা নয় আরও অনেক গ্রামেই এরকম আগুন ছড়িয়ে পড়বে। বীজপুরে তোর নাম এখন বীজমন্ত্র হয়ে উঠেছে, রে শালা”।

ভল্লা খুব মন দিয়ে শুনছিল জনাইয়ের কথা। রাজধানীর নিবিড় ষড়যন্ত্রের কথা জনাই জানে না। ভল্লার এ অঞ্চলে আসার উদ্দেশ্য সম্পর্কেও তার ধারণা ভাসা-ভাসা। কিন্তু জনাই যেহেতু এই চটির অধ্যক্ষ, বহুলোক - ধনাঢ়্য তীর্থযাত্রী, সম্পন্ন বণিক এবং এই জনপদের সকল মানুষের সঙ্গেও তার নিত্য ওঠাবসা। বলা বাহুল্য সকলের সঙ্গেই তাকে সদ্ভাব রাখতে হয়। জনাইয়ের দৃষ্টিভঙ্গী তার পরিচিত সকল মানুষের ধারণার প্রতিচ্ছবি। অতএব ভল্লার কাছে জনাইয়ের মন্তব্য অমূল্য।

“শুনেছি গ্রামের লোকরা একবার আস্থানে হানা দিয়েছিল। আবার দেবে না তো? এখানকার সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে ছোকরার দল, কিন্তু চাইছে – নোনাপুরের ছেলেরা উচিৎ শিক্ষা দিক – আস্থানের রক্ষীদের। আর ওই যে উপানু – ও হতভাগা রক্ষীদলের সর্দার হল কী করে। ব্যাটা মাথামোটা, হোঁৎকা! শুনেছি আস্থানের অধিকারী শষ্পক সজ্জন-ভদ্র মানুষ – তিনি কী পারবেন এই পরিস্থিতি সামলাতে?”

ভল্লা আলস্যে আড়মোড়া ভেঙে, বড়ো করে হাঁই তুলে বলল, “আমাকে বলছিস কেন? শষ্পককে গিয়ে জিজ্ঞাসা কর। আমি নির্বাসনে থাকা অপরাধী – আমি কী করব?”

জনাই তীক্ষ্ণ চোখে ভল্লাকে দেখল, বলল, “শালা, এমন ভাব করছিস ভাজা মাছ যেন উলটে খেতে জানিস না? চল্লিশটা কালো ধুতি নিয়ে কী করবি – তুই আর তোর ওই সেনাধ্যক্ষ রামালি? কী ভাবিস – আমি কিছুই বুঝি না?”

ভল্লা হেসে ফেলল, বলল, “না রে - তুই কী ভাবছিস জানি না। গ্রামের কিছু ছোকরা ঠিক করেছে – এখন থেকে তারা সাদা ধুতি পরবে না। সাদা ধুতি ময়লা হয় বেশি – দাগছোপ ধরে তাড়াতাড়ি – তার চে কালো ধুতি পরা ভালো। ওরা সবাই দরিদ্র – জানিস তো? প্রতিদিন ক্ষার-সোডা দিয়ে  কাপড় কাচাও ওদের কাছে বিলাসিতা”।

জনাই মুখের সামনে মাছি তাড়ানোর মতো হাত নেড়ে বলল, “তোকে আমি আজ থেকে চিনি ভল্লা? সেই ছোকরা বয়েসের ডামল থেকে চিনি। তুই কোনো গোপন কাজে, গোপন নামে এখানে এসেছিস, সে আমি জানি। কিন্তু কাজটা কী – সেকথা তুই বলবি না, সেও জানি। আর আমিও জানতে চাই না। কিন্তু তাও বলব, এদিকের সাধারণ লোক চাইছে – তোরা কিছু একটা কর, রক্ষীদের গুমোর ভেঙে দে”।

“পাগল হয়েছিস? আমি ওসবের মধ্যে জড়াবো কেন? আর আস্থানের রক্ষীরা জব্দ হলে, রাজধানী থেকে সেনাবাহিনী পাঠাবে। সে ধাক্কা গ্রামের সাধারণ এই ছোকরার দল সামলাতে পারবে”? জনাই ভল্লার মুখের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ভল্লা হেসে জনাইয়ের কাঁধে হাত রেখে বলল, “আমার কাজের কোন কথাই তোকে বলতে পারব না, বন্ধু। কিন্তু ধৈর্য ধরে দেখতে থাক – আগে আরও কী কী হয়। এটুকু বলতে পারি – নোনাপুরের ছেলেরা তোকে এবং বীজপুরবাসীদের হতাশ করবে না। যাগ্‌গে ওসব ছাড় – আমার মাছের ঝোল কী হল?”

“শালা তোর কপালটা ভালো – প্রায় দুসেরের একটা রহু পেয়েছি – একদম জ্যান্ত – এতক্ষণে মনে হয় রান্না শুরু হয়ে গেছে”। হাসতে হাসতে জনাই বলল।

“ওফ্‌, সেই পিপুলতলা ছাড়ার পর এই প্রথম মাছের ঝোল আর ভাত খাবো। ভুট্টার রুটি আর সেদ্ধ ভুট্টা খেতে খেতে জিভে চড়া পরে গেছে, রে জনাই”।

ওদের কথার মধ্যে রামালি ঘরে ঢুকল। ভল্লা জিজ্ঞাসা করল, “বীজপুরের হাট দেখলি?”

“হ্যাঁ, ভল্লাদাদা - কী না পাওয়া যায় হাটে, বাস্‌ রে – অর্ধেকের বেশি পসরা এই প্রথম চোখে দেখলাম”! রামালি মেঝেয় বসতে বসতে একটু উচ্ছ্বসিত হয়েই বলল।

ভল্লা হাসল, বলল, “ধুতি পেয়েছিস?”

রামালি বলল, “হ্যাঁ হ্যাঁ, ধুতি – কালো রঙ সবই পাওয়া গেছে। শাম্‌লা – যার সঙ্গে আমি হাটে গেলাম – বলল এখানেই কালো রঙ করে দেবে...”।

জনাই বলল, “হ্যাঁ আমাদের বাঁধা রজক আছে – বড়বড়ো মাটির গামলায় রঙ গুলে একসঙ্গে সব ছুপিয়ে দেবে। আমার এখানে শুকোতে দেওয়ার অনেক জায়গা – রোদ্দুরে মেলে দিলে দণ্ড দুয়ের মধ্যে শুকিয়েও যাবে। তোরা ওসব করেছিস কখনো? গণ্ডগোল হয়ে গেলে শালা পুকুরের জলই কালো হয়ে কেলেংকারি কাণ্ড হবে – একবার ডুব দিলে কেলেকাত্তিক হয়ে উঠে আসবি... তুই মাছ খাস তো রামালি?”

রামালি বলল, “কয়েকবার খেয়েছি – তবে আমাদের দিকে তেমন কেউ খায় না”।

জনাই হেসে বলল, “ব্যস্‌ ব্যস্‌, ওতেই চলবে। তুই ভাই নিরিমিষ খেলেও আমার কোন অসুবিধে নেই – চটিতে সব ব্যবস্থাই রাখতে হয়…”।  

চটির ঘন্টা দুবার বাজল ঢং ঢং করে। জনাই ব্যস্ত হয়ে উঠে পড়ে বলল, “ওঃ দুই প্রহর শেষ হয়ে গেল…ভল্লা, আমি একটু ঘুরে আসি রে - জনা চারেক মাননীয় অতিথি আছে – মাঝে মাঝে গিয়ে আমার মুখটা না দেখালে – তাদের রাগ হয়ে যাবে। বড়োলোকের পীরিত – শালা ক্ষণে রঙ্গ, ক্ষণে ভঙ্গ... ”। জনাই ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় বলল, “খাওয়ার সময় চলে আসব, একসঙ্গে খাবো”।

চলবে...


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নতুন পোস্টগুলি

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩৩

    এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "  অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "...