শনিবার, ১ আগস্ট, ২০২৬

শুধু _তুই .কম - পর্ব ১৭

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

এই উপন্যাসের শুরু - " @শুধু _তুই .কম - পর্ব ১



এর আগের পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১৬ 



১৭

 মায়ের মুম্বাই-বাস তখন কুড়ি দিনে পরেছে। অন্য দিনের মতো সেদিনও ডিউটিতে গিয়েছিল সুনেত্র। সকাল নটায় হসপিটালে পৌঁছে বেলা একটা দেড়টা পর্যন্ত হাঁফ ফেলার সময় পায় না সে। ওয়ার্ডের ভিজিট সেরে আউটডোরের পেশেন্ট দেখা। যেদিন ওটি থাকে সেদিন আরও দেরি হয়।  

দেড়টা নাগাদ নিজের চেম্বারে এসে বসতেই নিবারণ এক কাপ কফি আর দুটো ক্রিমক্র্যাকার বিস্কুট দিয়ে গেল টেবিলে। কফি খেতে খেতে লক্ষ্য করল তার সামনেই গুচ্ছের খাম রাখা আছে। অধিকাংশই আজে-বাজে মার্কেটিংয়ের চিঠি। কিছু থাকে দিল্লি বা মুম্বাইয়ের কর্পোরেট অফিসের চিঠি। খামগুলো দেখতে দেখতে তার হাতে এল, তার নিজের হাতে ঠিকানা লেখা, হলুদ একটা খাম। মায়ের চিঠি। সুনেত্রর শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে এল শীতল স্রোত।

দ্রুত হাতে খামটা ছিঁড়ে পড়ে ফেলল চিঠিটা, মায়ের হাতে লেখা দু লাইন...

“সুনু,

এখানে থাকতে আমার আর একদণ্ডও ভালো লাগছে না। তুই এসে আমাকে নিয়ে যা।

ইতি আশীর্বাদিকা মা”।

মা কোন তারিখ লেখেননি। খামটা নিয়ে পোস্ট অফিসের ছাপমারা গোল স্ট্যাম্পটা পড়তে চেষ্টা করল, খুবই অস্পষ্ট - মনে হচ্ছে পাঁচদিন আগে বান্দ্রার পোস্টঅফিস থেকে রওনা হয়েছে। খোলা চিঠিটা পেপার ওয়েটে চাপা দিয়ে কফিটা শেষ করল, সুনেত্র। কিছুক্ষণ চিন্তা করল, তারপর ইন্টার কমে ফোন করল এইচ-আর ডিপার্টমেন্টে।

“গুড আফটারনুন, স্যার। মিতালি স্পিকিং”।

“মিতালি, আমার একটু ইমার্জেন্সি হয়ে গেছে – কাল থেকে চার-পাঁচদিনের জন্যে আমি ছুটি নেব”।

“কী হয়েছে, স্যার? এনি মিসহ্যাপ?” মিতালির কন্ঠে প্রফেসনাল উদ্বেগ।

“মিসহ্যাপ ঠিক নয়...কাল ভোরের ফ্লাইটে মুম্বাই যেতে হবে। আই নিড লট অফ হেল্প ফ্রম ইউ”।

“কী করতে হবে, স্যার”।

“আজ রাত্রে কলকাতার গেস্ট হাউসে আমার জন্যে একটা রুম বুক করতে হবে। কলকাতা-মুম্বাইয়ের একটা ভোরের ফ্লাইট বুক করতে হবে কালকের জন্যে। ওই সঙ্গে লাগবে ভোরে গেস্টহাউস থেকে দমদম যাওয়ার জন্যে একটা গাড়ি – ফ্লাইটের শিডিউল অনুযায়ী”।   

“হয়ে যাবে, স্যার। আর কিছু?”

“মুম্বাই এয়ারপোর্টে আমাকে রিসিভ করার জন্যে একটা গাড়ির বুকিং – গাড়িটা আমার সঙ্গেই সারাদিন থাকবে”।

“হুঁ, হুঁ”।

“আমাদের মুম্বাই গেস্ট-হাউসে আমার জন্যে একটা রুম বুক করতে হবে – আমার মাও আমার সঙ্গে থাকতে পারেন”।

“ওকে”।

“আপাতত এইটুকুই, মিতালি। মুম্বাইতে মায়ের সঙ্গে দেখা হলে পরের শিডিউল ঠিক করব”।

“আজ সন্ধেয় কলকাতা যাবার গাড়ি লাগবে না, স্যার?”

“ও ইয়েস। ভুলেই গেছিলাম। গাড়ি একটা তো লাগবেই, মিতালি। থ্যাংকিউ ভেরিমাচ”।

“মোস্ট ওয়েলকাম, স্যার। মাসিমার শরীর কি খুব খারাপ স্যার?”

“বুঝতে পারছি না, মিতালি। এইমাত্র মায়ের একটা চিঠি পেলাম, খুব ডিস্টার্বিং। ছেলেমেয়েদের কাছে নিজের শরীর খারাপের কথা, মায়েরা সহজে ডিসক্লোজ করতে চান না... ”।

“আপনি চিন্তা করবেন না, স্যার, উনি তাড়াতাড়িই সেরে উঠবেন। বুকিংগুলো সেরে আমি আপনাকে ফিড-ব্যাক দিতে থাকব, স্যার, ডোন্ট ওরি”।

ফোন রেখে কিছুক্ষণ চিন্তা করল, সুনেত্র। মায়ের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর, অবস্থা বুঝে, মুম্বাই ব্র্যাঞ্চে মায়ের হেলথ চেক-আপটাও করিয়ে নেবে...। তারপর সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে – মাকে নিয়ে কবে ফেরা সম্ভব। প্রয়োজন হলে ওখানকার গেস্ট হাউসে কয়েকটাদিন থেকেও যেতে পারে দুজনে।  

 মিতালির নিপুণ ব্যবস্থাপনায় সুনেত্র বান্দ্রায় দাদার ফ্ল্যাটে পৌঁছে গেল সকাল নটা-কুড়ি নাগাদ। বেল বাজাতে দরজা খুলল বৌদি – এবং তাকে দেখেই বলে উঠল, “বাব্বা, আজকে কোনদিকে সূর্য উঠল, এতদিন ডেকে ডেকেও যার দেখা পাওয়া যায়নি...আজ সে একবারে স্বয়ং উপস্থিত?”।

“দাদা কোথায়? অফিসে বেরিয়ে গিয়েছে, নাকি?”

“না গো স্নান করছে”।

“টুটুল আর ডলি?” সুনেত্রর ভাইপো, ভাইঝির নাম।

“ওরা এই তো একটু আগে স্কুলে বেরিয়ে গেল। ওদের একেবারে ঘড়ি ধরা, ইন্টার ন্যাশানাল স্কুল তো...”।

ভেতরের ঘর থেকে খুব দুর্বল পায়ে বেরিয়ে এলেন, মা, “বৌমা, সুনুর গলা পেলাম মনে হল?”

“বুড়ির কান দেখেছ? ভেতরের ঘর থেকেও তোমার গলা ঠিক শুনতে পেয়েছে?”।

সুনেত্র মনে মনে বিরক্ত হল। ছেলেরা প্রৌঢ় হয়ে উঠলে, বাবা-মায়ের বুড়ো-বুড়ি না হয়ে অন্য উপায় থাকে কি? সেটাকে চোখে আঙুল ঢুকিয়ে দেখানোর দরকার কি? সোফা থেকে উঠে এগিয়ে গিয়ে মাকে প্রণাম করল সুনেত্র, বলল, “এতটা দুর্বল হয়ে গেলে কী করে, মা? শরীর খারাপ হয়েছিল নাকি?” মায়ের হাত ধরে সুনেত্র সোফার দিকে এগোতে এগোতে অনুভব করল, মাত্র এই কুড়ি দিনে, মা সত্যি সত্যি একটু বেশিই বুড়িয়ে গেছেন। সুনেত্র লক্ষ্য করল, মায়ের হাত ধরে নিয়ে আসায় বৌদির মুখের সাজানো হাসিটা আর নেই, বরং তার দু চোখে একটা বার্তা সে পরিষ্কার পড়তে পারল, “আদিখ্যেতা”।  

সোফায় মাকে বসিয়ে সুনেত্র বলল, “তুমি চটপট ব্যাগ-ট্যাগ গুছিয়ে নাও, মা আজ এখনই তোমায় নিয়ে যাবো”।

“তার মানে?” বৌদি বলে উঠল।

“এতদিন মুম্বাইতে থেকে বাংলাটা কি একেবারেই ভুলে গেছ?” সামান্য শ্লেষ মিশিয়ে উত্তর দিল সুনেত্র।

স্নান সেরে ফিট-ফাট সায়েব হয়ে দাদা বেরিয়ে এল হলে। সুনেত্রকে দেখেই বলে উঠল, “কীরে তুই, একেবারে হঠাৎ?”

“হ্যাঁ দাদা। মাকে দেখতে এসেছিলাম, লক্ষণ দেখে খুব ভালো বুঝছি না মায়ের শরীরটা। আমাদের হসপিট্যালে একবার থরো চেক আপ করিয়ে, মাকে আজ নিয়ে যাবো”।

“নিয়ে যাবি মানে? এতদিন পরে এত খরচ করে মাকে নিয়ে এলাম। বলা নেই কওয়া নেই, এসেই বলছিস তুই মাকে নিয়ে যাবি?”

থমথমে মুখে বৌদি উঠে গেল, বোধহয় কিচেনে, দাদার ব্রেকফাস্ট রেডি করতে।

সুনেত্র দাদার চোখে চোখ রেখে, খুব শান্তভাবে কাটা কাটা কথায় উত্তর দিল, “আমি মাকে নিয়ে যাব, দাদা। তুই অনেক খরচ করে মাকে নিয়ে এসেছিলি, কিন্তু মা অসুস্থ হয়ে পড়লে তোর আরও বেশি খরচ হয়ে যাবে দাদা। সেটা বোঝার চেষ্টা কর”।

“কী করে বুঝলি, তুই – মা অসুস্থ?”

“আমি নাড়ি-টেপা ডাক্তার দাদা, তোমার মতো ব্রিলিয়ান্ট ইঞ্জিনিয়ার নই। তোমার বিষয়ে আমি কোনদিন নাক গলাইনি, আমার বিষয়েও তুমি নাক গলিও না”।

সুমিত্র একটু অবাক হল, মুখচোরা ভীতু ভীতু ভাইটা আজ তার মুখে মুখে কাটা কাটা এমন জবাব দিচ্ছে!

“মা কি বলেছে তোর সঙ্গে আজই যাবে? নাতি নাতনীদের সঙ্গে দেখা না করে”? সুমিত্র বলল।

এতক্ষণ মা চুপ করে বসে, দুই ভাইয়ের কথোপকথন শুনছিলেন, এখন বললেন, “চলেই যাই, বুঝলি সুমু। তোদের এত আদর-যত্ন সত্ত্বেও, কদিন ধরেই শরীরে তেমন বল পাচ্ছি না। আমরা কোনদিনই বসে খাওয়ার মানুষ নই, বাবা। সারাদিনে কোন কাজ করতে না পারলে শরীর-মন হাঁফিয়ে ওঠে”।

একটু থেমে আবার বললেন, “তোর মনে আছে, সুমু তুই তখন সবে কলেজে ঢুকেছিস, আর সুনুটা তখন সেভেনে উঠেছে। কী একটা নার্ভের অসুখে আমি প্রায় আড়াই মাস শয্যাশায়ী ছিলাম। তার আগে এমন কোনদিন হয়নি – আমাদের তখন একজন কাজের লোক রাখারও সাধ্য ছিল না। একা হাতে রান্না-বান্না, কাচাকাচি, ঘর-দোর ঝাঁট দেওয়া – সব কাজই সারতাম। ওই সময়ে, ওইটুকু বয়সে সুনু যে কী ভীষণ দায়িত্ব নিয়েছিল – আমাকে জিজ্ঞেস করে করে উনোন ধরাত, কুটনো কাটত, বাঁটনা বাঁটত, রান্না-বান্না করত... কিছুদিনের মধ্যে সব শিখে নিয়ে – একাই করত, করতে পারত সবকিছু...। এই নিয়ে তুই ওকে “মেয়েলি” বলতিস, মনে আছে? আর তুই? একদিন তোর জামা-কাপড় কাচতে দেরি হয়ে গেলে কী কাণ্ডটাই না করতিস – চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় করে, পাড়ার লোক জড়ো করতিস”।

ক্রূর চোখে সুমিত্র মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “এতদিন পরে এসব কথা কেন, মা?”

মা ম্লান হাসি মুখে বললেন, “তোদের এখানে সারাদিন আমার কোন কাজ নেই, তোদের উপদেশ শোনা ছাড়া। তোদের ইংরিজিতে সেই একটা কথাটা আছে না... আইড্‌ল্‌ ব্রেন ইজ ডেভিলস্‌ ওয়ার্কশপ – সারাদিন বসে বসে কত কথাই মনে পড়ে – আমার জগৎটা তো ছিল তোদের দুজন আর তোদের বাবাকে ঘিরেই ... আমার স্মৃতি বলতে ওই কথাগুলোই”।

দাদা গুম হয়ে গেল, বিরক্ত মুখে চেঁচিয়ে উঠিল, “পনের মিনিট হয়ে গেল বসে আছি, এখনও তোমাদের ব্রেকফাস্ট রেডি হল না? এতগুলো লোক আমার ঘাড়ে চেপে কী করছোটা কি?”

মা সুনেত্রকে বলল, “আমি রেডি হয়ে এখনই আসছি, সুনু – তুই একটু বস”।  

সুনেত্র আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করল, মা বেশ দ্রুত স্বাভাবিক পায়েই ভেতরের ঘরের দিকে গেলেন। এই কয়েক মিনিটের মধ্যেই এতটা পরিবর্তন। ডাক্তারি শাস্ত্র বলে, মানুষের মন তার শরীরকে প্রবলভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। আজ তার আরেকটা অকাট্য প্রমাণ পেল সুনেত্র। তাকে চিঠি লেখার পর থেকেই মা প্রচণ্ড দুশ্চিন্তায় ছিলেন, তিনি জানতেন সুনু চিঠি পেয়েই দৌড়ে আসবে, আর আজ সকালে সুনুর গলা পেতেই তাঁর মনে হয়েছে – না জানি আজ আমাকে নিয়ে দুই ভাইয়ের মধ্যে কোন শুম্ভ-নিশুম্ভের যুদ্ধ বেধে যায়। প্রবল উদ্বেগ, আর মানসিক দ্বন্দ্বের কারণেই, মায়ের অমন জবুথবু অবস্থা হয়েছিল। সুনেত্র অনেকটা নিশ্চিন্ত হল – মায়ের শরীর, বলতে নেই, মনে হচ্ছে ভালই আছে, ভাল ছিল না তাঁর মনটা। এ বাড়ি থেকে বেরোলেই সেটাও সামলে নিতে মায়ের অসুবিধে হবে না।

একজন মহিলাকে, মুম্বাইতে ওঁদের বাই বলে, বোধ হয়, সঙ্গে নিয়ে বৌদি ডাইনিং টেবিলে এল, বলল, “একটুতেই অমন বাড়ি মাথায় তোল কেন, চেঁচিয়ে? চলে এস...সুনু, তুমিও দাদার সঙ্গে ব্রেকফাস্ট সেরে নাও, সেই কোন ভোরে কলকাতা থেকে রওনা হয়েছ...”

দুজনেই উঠে গিয়ে টেবিলের দুদিকে বসল, দূরত্ব অনেকটাই।

সুনেত্র বলল, “বৌদি, আমি শুধু চা খাবো এক কাপ, টোস্ট খেতে ঠিক ইচ্ছে হচ্ছে না, ফ্লাইটে একটা স্যাণ্ডউইচ খেয়েছিলাম...ভালো নয় তেমন, পেটটা কেমন যেন ভার-ভার...”।

“শুধু চা খাবে? সঙ্গে অন্ততঃ একটা অমলেট খাও, কিচ্ছু হবে না, ডাক্তার মানুষ, দরকার হলে, একটা অ্যান্টাসিড খেয়ে নিও”।

সুনেত্র হেসে বলল, “তথাস্তু, কিন্তু আমার অমলেটের জন্যে দাদার আবার লেট না হয়ে যায়”। কড়া চোখে একবার তাকাল সুমিত্র, ভাইয়ের দিকে। হতভাগা আজ একটার পর একটা বাউন্সার ছেড়ে যাচ্ছে...। অবশ্য মায়ের চলে যাওয়াতে সে অনেকটা স্বস্তিও বোধ করছিল। মায়ের বয়েস হয়েছে, শরীর দুর্বল হয়েছে, এখানে হঠাৎ কিছু একটা ঘটে গেলে জলের মতো বয়ে যাবে টাকা। তার ওপর ডাক্তার, হসপিট্যাল, দৌড়োদৌড়ি – তার চেয়ে সুনু নিয়ে যাচ্ছে...একদিক থেকে ভালই। তবে মা আর সুনু মিলে আজ যেভাবে তার সঙ্গে কথা বলছে, তাতে অমিয়া (সুমুর ওয়াইফ) বহুদিন কথা শোনাবে। বলবে, আমাদের ওপর তোমার যত চোটপাট, ভাই আর মা মিলে দিল তো মুখে ঝামা ঘষে...?

সুনেত্রদের ব্রেকফাস্ট শেষ হওয়ার আগেই মা বেরিয়ে এলেন। হাতে ব্যাগ নিয়ে। সুনেত্রর চেয়ারের পিঠে হাত রেখে বললেন, “চলি রে, সুমু। চলি গো বৌমা, এ কদিন যা কষ্ট দিলাম তোমাদের...”

অমিয়া বলল, “স্কুল থেকে ফিরে টুটুল আর ডলি কিন্তু খুব আপসেট হয়ে পড়বে, মা। হঠাৎ করে এমন চলে যাচ্ছেন”।

মা হেসে বললেন, “এত বছর পেরিয়ে গেল - কবে কোথায় কিসের সেটিং হয়েছিল, বৌমা? ওদের কাছে ওটুকু আপসেট জলের আলপনা – নিমেষে মিলিয়ে যাবে”।

সুমিত্র তো বটেই, সুনেত্রও অবাক হল মায়ের এই নিখুঁত ও স্পষ্ট উত্তরে। সুনেত্র বুঝল, এ কদিন মায়ের ওপর অনেক মানসিক অত্যাচার করেছে, দাদা-বৌদি। মায়ের মনে জমে উঠেছিল অসহ্য রাগ আর ক্ষোভ। আজ সুনেত্র আসায়, সেই ক্ষোভেরই বিস্ফোরণ ঘটছে বারবার।

চা খাওয়া শেষ করেই সুনেত্র উঠে দাঁড়াল, বলল, “তাহলে চলি, দাদা? চলি গো বৌদি”।

“কী আর বলব?” বলে বৌদি এগিয়ে এসে মাকে প্রণাম করল। দাদা তখনো চায়ের কাপে নিশ্চিন্তে চুমুক দিয়ে চলেছে, উঠে দাঁড়ালোও না একবার। সুনেত্র মায়ের ব্যাগটা হাতে নিয়ে দরজার দিকে এগোলো।

“আমার আরেকটা গাড়ি আছে, তোদের কি ছেড়ে দিয়ে আসবে?” দাদা হঠাৎ বলে উঠলো।

“না, দাদা, নীচেয় আমার অফিসের গাড়ি ওয়েট করছে, জীতেশজি আজ সারাদিনই আমার সঙ্গে থাকবে। আসছি রে”।

 ওখান থেকে বেরিয়ে সুনেত্র সোজা গেল ওদের গেস্ট হাউসে। মাকে বলল, “চান-টান সেরে ফ্রেশ হয়ে নাও মা, ব্রেকফাস্ট করে আমরা বেরোব...”।

দরজাটা চেপে দিয়ে সুনেত্র ঘরের বাইরে এল গেস্ট হাউসের করিডরে। অনেকক্ষণ সিগারেট খাওয়া হয়নি, রিসেপশনের চেয়ারে বসে আরামে একটা সিগারেট ধরাল। তারপর চিন্তা করতে লাগল, একটু আগের স্থান-কাল-পাত্রদের কথা। বাইশ তলা অ্যাপার্টমেন্টের চোদ্দ তলার ফ্ল্যাটে দাদার অবস্থানটি। লিভিং এরিয়া আর ডাইনিং হল দেখেই ফ্ল্যাটের সাইজ কিছুটা টের পাওয়া যায়। ধরে নেওয়া যায়, কম করে তিনটে বেডরুম উইথ অ্যাটাচ্‌ড্‌ বাথ। অন্ততঃ একটা ব্যালকনিও থাকবেই! সব মিলিয়ে তেইশ শ/চব্বিশ শ স্কোয়ার ফুটের ফ্ল্যাট। মুম্বাইয়ের বান্দ্রা অঞ্চলে এই ফ্ল্যাটের কত দাম হতে পারে – তার ধারণা নেই – তবে ছ-সাত কোটির নীচে হবে বলে মনে হয় না। তার ওপর দুখানা গাড়ি – একটা হতে পারে অফিসের, অন্যটা পার্সোনাল। কত টাকা মাইনে পায়, দাদা? আর এই টাকার কতটুকু সাদা আর কতটাই বা কালো...?

 মা রেডি হয়ে যেতেই, সুনেত্রও ফ্রেশ হয়ে নিল তাড়াতাড়ি। পুরি-ডাল আর সবজি দিয়ে নিরামিষ ব্রেকফাস্ট সেরে দুজনে বেরোল হসপিট্যালে। ডাঃ রঞ্জন মোহতাকে আগেই বলা ছিল, মাকে নিয়ে সোজা ঢুকে পড়ল তাঁর চেম্বারে। এই ডাঃ মোহতা আর সে সমবয়সী, এক সঙ্গে কাজ করেছে দিল্লিতে। সে সময়ে মায়ের সঙ্গেও তার ভালই পরিচয় ছিল। খুব মন দিয়ে দীর্ঘ সময় নিয়ে চেক আপ করল মাকে। তারপর বলল, “অ্যাজ সাচ আন্টিকা মেজর কোই হেল্‌থ্‌ প্রবলেম নেহি হ্যায় সুনেত্র, শি ইজ ফাইন। বাট আই থিংক শি ইজ এ বিট ডিপ্রেস্‌ড্‌ মেন্টালি। নাথিং টু ওরি। ইয়েস ইয়েস, আন্টি কো লেকে আজই আরাম সে কলকাত্তা রিটার্ন কর সকতা হ্যায়”।

সুনেত্র বলল, “ওকে, থ্যাংকিউ রঞ্জন। লেকিন মুম্বই-কলকাতাকা ইভনিং ফ্লাইট আকসার বহোত লেট করতি হ্যায়। আই উইল নট গোয়িং টু টেক এনি রিস্ক – ইট উইল বি মাচ বেটার টু ফ্লাই টুমরো আর্লি মর্নিং”।

“ইয়েস, ইট উইল বি, সুনেত্র”।   

ডাঃ মোহতার চেম্বার থেকেই সুনেত্র এইচ-আর ডিপার্টমেন্টে ফোন করে, বলে দিল আগামীকাল আর্লিং মর্নিংয়ের কলকাতা ফ্লাইটের দুটো টিকিট – আর তাদের কলকাতা গেস্ট হাউসে একটা রুম বুক করতে।

 অবশেষে পরের দিন বেলা দেড়টা নাগাদ মাকে নিয়ে ঘরে ফিরল সুনেত্র। মিতালিকে বলে রেখেছিল, তাকে নিতে পরেশ যখন রওনা হবে, একবার তার কোয়ার্টার হয়ে শম্পাদিদিকে যেন বলে দেয় – মাকে নিয়ে সুনেত্র আজ দুপুরে ফিরছে। মিতালি তার কর্তব্যে কোন ত্রুটি রাখেনি।

মাকে দেখে শম্পাদিদি মুখ ফুটে কিছু বলতে পারেনি, কিন্তু তার উজ্জ্বল খুশিমাখা মুখের নীরব কথাটুকু বুঝতে এতটুকুও ভুল হয়নি, তার মা এবং সুনেত্রর। মাও নিজের ক্ষুদ্র এই রাজ্যে ফিরে এসে যে স্বস্তি ও শান্তি ফিরে পেলেন, দাদার বৃহৎ সাম্রাজ্য তাঁর কাছে হয়ে উঠল অতীব তুচ্ছ।

চলবে...


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নতুন পোস্টগুলি

শুধু _তুই .কম - পর্ব ১৭

  এ র আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "  অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য " ...