বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/৪

 এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১


  আগের পর্ব - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/৩ "


  তৃতীয় স্কন্ধ - পর্ব ৪

জগতের কাল ও যুগ তত্ত্ব

শ্রীমৈত্রেয় বললেন, “ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ ও ব্যোম - সৃষ্টির শুরুতে এই পাঁচবস্তুর উৎপন্ন হয়, এদেরকে কার্য্য বলে। এই কার্যের যে ক্ষুদ্রতম অংশ, যাকে আর ভাগ করা যায় না, তাকে পরমাণু বলেপরমাণুকে চোখে দেখতে পাওয়া যায় না, কিন্তু এর অস্তিত্ব অনুমানে বুঝতে পারা যায়। পরমাণু যখন একক অবস্থায় থাকে, তখন তার কোন কার্য্য অবস্থা নিরূপণ করা যায় না। অনেক পরমাণু্র সমষ্টিতে বস্তু গড়ে ওঠে, তখন সকল বস্তুকেই আলাদা মনে হয়। কিন্তু সকল বস্তুরই পরমাণু ধর্ম একঅতএব পরমাণু সমস্ত ভূতের সূক্ষ্মরূপ এবং বস্তু স্থূলরূপ। প্রলয়ের আগে,  সকল বস্তু নিজ নিজ বৈশিষ্টের মধ্যে থাকে। কিন্তু প্রলয়কালে বস্তুর সকল বৈশিষ্ট্য বিনাশ হয় এবং সমস্ত ব্রহ্মাণ্ড একই পরমাণু রূপে সমাহিত হয়। এই ধারণাকে বলা হয় পরমমহৎ পরিমাণ

[এই পর্যন্ত পড়ে মনে হয় সরল বাংলায় ফিজিক্সের অ্যাটমিক তত্ত্ব পড়ছি। এবং "পরমমহৎ পরিমাণ" তত্ত্বটিতে কালা-গহ্বর তত্ত্বের গন্ধও কিছুটা যেন পাওয়া যায়। মনে হয় আমাদের ঋষিরা যদি আরও গভীরে গিয়ে আরও চিন্তাভাবনা করতেন, তাহলে আমরা হয়তো পদার্থবিদ্যার জনক হতে পারতাম। কিন্তু তা হবার নয় - এই পর্যায়ে প্রবেশ ঘটে গেল ঈশ্বরের - এবং সমস্ত বিষয়টা ভক্তিরসে বেপথু হয়ে ধর্মতত্ত্বের পথে মোড় নিল।]                  

একই ভাবে কালেরও সূক্ষ্ম ও স্থূলরূপ দুইই অনুমান করা হয়। কাল শ্রীনারায়ণের শক্তি, তিনি স্বরূপতঃ অব্যক্ত ও উৎপত্তি উভয় বিষয়েই দক্ষ। শ্রীভগবান পরমাণু থেকে ব্যক্ত বস্তু, সর্বত্রই ব্যাপ্ত থাকেন। দুটি পরমাণুর সমষ্টিকে অণু বলে, এবং তিনটি অণুর সমষ্টিকে ত্রসরেণু বলে। অন্ধকার ঘরে জানালা দিয়ে সূর্যের আলোক রশ্মি প্রবেশ করলে, সেই আলোকপথে যে ক্ষুদ্র কণাসমূহ চোখে পড়ে, সেই কণাগুলিই ত্রসরেণু। যে কাল তিনটি ত্রসরেণুকে ভোগ করে, তাকে ত্রুটি বলে। একশ ত্রুটিতে এক বেধ, তিন বেধে এক লব হয়। তিন লবে এক নিমেষ, তিন নিমেষে এক ক্ষণ। পাঁচ ক্ষণে এক কাষ্ঠা, পনের কাষ্ঠায় এক লঘু, পনের লঘুতে এক দণ্ড। দুই দণ্ডে এক মুহূর্ত এবং ছয় বা সাত মুহূর্তে এক যাম অর্থাৎ প্রহর। চার প্রহরে এক দিবা, চার প্রহরে এক রাত। এই হল মানুষের এক পূর্ণ দিবসের কাল বিভাগ। পনের দিনে এক পক্ষ, শুক্ল ও কৃষ্ণ, পক্ষের দুই প্রকার। দুই পক্ষে মানুষের এক মাস হয়, কিন্তু পিতৃলোকে দুইপক্ষ মানে এক দিন। শুক্ল পক্ষে দিন আর কৃষ্ণ পক্ষে রাত। মানুষের দুই মাসে এক ঋতু ও ছয় মাসে এক অয়ন। অয়ন দুরকমের – উত্তরায়ণ ও দক্ষিণায়ণ। দেবলোকে দেবতাদের উত্তরায়ণে এক দিন এবং দক্ষিণায়ণে এক রাত হয়। বারো মাসে মানুষের এক বছর আর এইভাবেই মানুষের আয়ু একশ বছর নির্দিষ্ট হয়ে আছে”

[আবারও একটু ঘেঁটে গেল। কাল অর্থাৎ সময়ের এমন সূক্ষ্ম পরিমাপের কল্পনা পড়লে বিস্মিত হতে হয়। কিন্তু আলোকপথে চোখে পড়া ত্রসরেণু বলতে যা বোঝানো হয়েছে সেই কণা থেকে সময়ের হিসেব কী করে হয়? সময়কে চোখে দেখা যায় নাকি? তাহলে সূর্যের আলোক রশ্মি যখন নেই, অর্থাৎ রাত্রে ত্রসরেণু তো দেখতে পাওয়া যাবে না, সময়ই বা হিসেব কী করে করব?]         

মহাত্মা বিদুরের প্রশ্নে শ্রীমৈত্রেয় আরো বললেন, “সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর ও কলি এই হচ্ছে চার যুগ। কোন যুগের প্রথম ভাগকে বলে সন্ধ্যা ও শেষভাগকে বলে সন্ধ্যাংশ। দেবতাদের বারো হাজার বছরে সন্ধ্যা এবং এই চারটি যুগ নিয়ে দেবতাদের সন্ধ্যাংশ বলা হয়। সত্যযুগ চার হাজার বছর এবং সন্ধ্যা ও সন্ধ্যাংশ প্রত্যেকে চারশ বছর। এইভাবে ত্রেতা, দ্বাপর ও কলি যথাক্রমে তিন হাজার, দু হাজার ও একহাজার বছর। এই তিন যুগের সন্ধ্যা ও সন্ধ্যাংশ প্রত্যেকে যথাক্রমে তিনশ, দুশ ও একশ বছর। সন্ধ্যা ও সন্ধ্যাংশের মাঝের সময়টিকে যুগ বলে। যে যুগে যে ধর্ম নির্দিষ্ট করা আছে, মানুষের সেই ধর্মই পালন করা উচিৎ। সত্যযুগে চতুষ্পাদ ধর্ম, অর্থাৎ ধর্মই সম্পূর্ণভাবে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে। তারপরে ত্রেতা, দ্বাপর ও কলিতে এক এক পাদ অধর্ম বাড়তে থাকে এবং এক এক পাদ ধর্ম কমতে থাকে। অতএব এই তিন যুগে অধর্মের সঙ্গে যুদ্ধ করেই সম্পূর্ণ ধর্ম আচরণ করার চেষ্টা করা উচিৎ”

[এই যুগের হিসেব ধরলে, কলিযুগের এক হাজার বছর কবেই পার হয়ে গেছে! মহাভারতে বলা হয়েছে, শ্রীকৃষ্ণের মর্ত্যলীলা সংবরণের দিন থেকে দ্বাপরের শেষ ও কলির শুরু। সেই সময়টা যদি মোটামুটি ৮৫০ বি.সি.ই ধরি, তাহলে আজ পর্যন্ত ৮৫০ + ২০২৬ = ২৮৭৬ বছর পার হয়ে গেল, কিন্তু সত্য যুগ ফিরে আসার কোন লক্ষণ তো টের পাওয়া যাচ্ছে না, বরং ধার্মিকগণ এখনও বলে চলেছেন "ঘোর কলি চলছে"।]    

শ্রী মৈত্রেয় বললেন, “হে বিদুর, ভূর্লোক, ভূবর্লোক ও স্বর্লোক, এই তিন লোকের বাইরে আছে মহর্লোক, জনলোক, তপোলোক ও সত্যলোক। এই চার লোকে এক হাজার চার যুগে এক দিন হয়। এই দিন ব্রহ্মার এক দিন, একই সময়ে ব্রহ্মার রাত্রি হয়। ব্রহ্মা রাত্রে নিদ্রামগ্ন থাকেন, ব্রহ্মার রাত্রি অবসানে সৃষ্টির প্রক্রিয়া শুরু হয়। এবং যে কাল পর্যন্ত ব্রহ্মার দিন গণ্য করা হয়, সেই কালে চোদ্দজন মনু রাজত্ব করেন। প্রত্যেক মনুর রাজ্যকালকে মন্বন্তর বলে। এই ত্রিলোক সৃষ্টি ব্রহ্মার দৈনন্দিন সৃষ্টি। এই সৃষ্টির মধ্যে তির্যগযোনি পশুপাখি, মানুষ, পিতৃগণ ও দেবগণের নিজ নিজ কর্মফল অনুসারে জন্ম হয়ে থাকে। প্রত্যেক মন্বন্তরে ভগবান সত্ত্বময় পরমপুরুষ রূপে অবতীর্ণ হয়ে এই বিশ্বের রক্ষা করে থাকেন। তারপর দিনের অবসানে সমস্ত তমোগুণ নিজের আত্মায় সন্নিবেশ করে, ত্রিলোকের উপসংহার করেন। তিন লোকের সকল জীবসমূহকে নিজের দেহে লীন করে তিনি তাঁর মায়া লীলা পরিত্যাগ করেন। সেই সময় সূর্য, চন্দ্র এবং সমস্ত লোক শ্রীভগবানের মধ্যে প্রবেশ করে। এই কল্প শেষের কালে সমুদ্রের জল বেড়ে যায়, প্রচণ্ড বাতাসে সমুদ্রের ঢেউ সমস্ত স্থলভাগকে গ্রাস করে এবং ত্রিভুবনকে প্লাবিত করে। শ্রীনারায়ণ সেই প্লাবনের জলে অনন্তশয়ানে অবস্থান করেন, তাঁর দুই চোখ যোগনিদ্রায় নিমীলিত হয়

এই ব্রহ্মার যে আয়ু, সেই আয়ু এখন শেষের দিকে। তাঁর জীবিত কালের অর্ধাংশকে পরার্ধ বলে, প্রথম পরার্ধ শেষ হয়েছে, আজ শেষ পরার্ধের প্রথম দিন। প্রথম পরার্ধের আদিতে মহান ব্রাহ্মকল্প হয়েছিল এবং সেই কল্পে ব্রহ্মা আবির্ভূত হয়েছিলেন। তাঁকে শব্দব্রহ্ম বলা হয়। যেহেতু এই কল্পে শ্রীনারায়ণের নাভি সরোবর থেকে উৎপন্ন কমল থেকে এই ত্রিভুবনের সৃষ্টি হয়েছিল, সেই কারণে এই কল্পকে পাদ্মকল্প বলে। আবার এই পাদ্মকল্পকেই বরাহকল্পও বলা হয়, যেহেতু এই কল্পে শ্রীহরি বরাহ অবতার হয়ে পৃথিবীর উদ্ধার করেছিলেন।

এই দুই পরার্ধকালকে কোন কোন শাস্ত্রে ভগবানের নিমেষ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। ভগবান কাল প্রভৃতি নিখিল জগতের একমাত্র কারণ, এই কারণে তিনি কালের অতীত, সুতরাং তাঁর শুরু কিংবা অন্ত কিছুই নেই। পরমাণু থেকে দুই পরার্ধ পর্যন্ত কাল, দেহরূপ গৃহে আসক্ত প্রাণিদের উপর যে প্রভাব বিস্তার করতে পারে, পরিপূর্ণ ভগবান অর্থাৎ ভূমার উপর সেই কালের বিন্দুমাত্র প্রভাব নেই। এই ব্রহ্মাণ্ডকোষ এগারো ইন্দ্রিয় ও পঞ্চমহাভূত - এই ষোলটি বিকারপদার্থ এবং প্রকৃতি, মহত্তত্ত্ব, অহংকারতত্ত্ব ও পঞ্চতন্মাত্র - এই আট প্রকৃতি দিয়ে নির্মিত। এই কোষ ভিতরের দিকে পঞ্চাশকোটি যোজন বিস্তৃত এবং বাইরের দিকে ক্ষিতি, অপ, তেজঃ, মরুৎ, ব্যোম, অহংকার ও মহত্তত্ত্ব এই সাত আবরণে ঢাকা। এই ব্রহ্মাণ্ডকোষের যত পরিমাণ, প্রথম আবরণ ক্ষিতির পরিমাণ তার দশগুণ। এইভাবে পরবর্তী প্রত্যেক আবরণ তার আগের প্রতিটি আবরণের থেকে দশগুণ বড়ো হয়ে থাকে। এই বিশাল ব্রহ্মাণ্ড এবং এছাড়াও এরকম কোটি কোটি ব্রহ্মাণ্ড যাঁর মধ্যে আশ্রয় নিয়ে আছে, তাঁকে পরমাণুর মতো মনে হয়। তিনিই সকল কারণের কারণ অক্ষর ব্রহ্ম। তিনিই পরমপুরুষ সাক্ষাৎ মহাবিষ্ণু”। 

 ব্রহ্মার সৃষ্টিকথা                

শ্রীমৈত্রেয় বললেন, “হে বিদুর, কালরূপী শ্রীনারায়ণের প্রভাব আপনার কাছে বর্ণনা করলাম, এখন ব্রহ্মার সৃষ্টিকথা বর্ণনা করি, শুনুন। ব্রহ্মা প্রথমতঃ অবিদ্যার পাঁচটি বৃত্তি সৃষ্টি করলেন। প্রথম সৃষ্টি করলেন তমোগুণ, অর্থাৎ স্বরূপের অপ্রকাশ। তারপর মোহ, অর্থাৎ অহংবুদ্ধি। মহামোহ অর্থাৎ ভোগ বাসনা। তামিস্রা অর্থাৎ ভোগ বাসনায় বাধা ঘটলেই ক্রোধ। অন্ধতামিস্রা অর্থাৎ ভোগবাসনার বিনাশে আমারই সর্বনাশ, এমন বুদ্ধি। কিন্তু এই সৃষ্টিতে তিনি সন্তুষ্ট হলেন না। তিনি আবার শ্রীনারয়ণের তপস্যা করে নিজেকে পবিত্র করে অন্যান্য সৃষ্টি করলেন। প্রথমে তিনি নিজেরই রূপে সনক, সনন্দ, সনাতন ও সনৎকুমার এই চারজন নিষ্ক্রিয় ব্রহ্মস্বরূপ মুনিকে সৃষ্টি করে বললেন, হে পুত্রগণ, তোমরা প্রজা সৃষ্টি করোকিন্তু যেহেতু তাঁরা মোক্ষনিষ্ঠ, শ্রীবিষ্ণু পরায়ণ, তাঁরা প্রজা সৃষ্টিতে প্রবৃত্ত হলেন নাতাঁর নির্দেশ অমান্য করায় তিনি চার কুমারের প্রতি প্রচণ্ড ক্রোধী হয়ে উঠলেন, কিন্তু তিনি ক্রোধ সংবরণ করার চেষ্টা করলেন। সেই ক্রোধ তাঁর দুই ভুরুর মধ্যে থেকে নীললোহিতকুমার রূপে জন্ম নিল। সদ্যজাত শিশু কাঁদতে কাঁদতে বললেন, হে জগৎ গুরু, আমার নাম ও স্থান আপনি নির্দেশ করে দিন। পদ্মযোনি ব্রহ্মা সস্নেহে সেই কুমারকে বললেন, যেহেতু তুমি উদ্বিগ্ন বালকের মতো রোদন করেছ, তাই তোমার নাম হবে রুদ্র। আর হৃদয়, ইন্দ্রিয়, প্রাণ, আকাশ, বায়ু, অগ্নি, জল, মহা, সূর্য, চন্দ্র ও তপস্যা এই স্থানগুলি আমি তোমার জন্যেই নির্দিষ্ট করে রেখেছি। মন্যু, মনু, মহিনস, মহান, শিব, ঋতধ্বজ, উগ্ররেতঃ, ভব, কাল, বামদেব, ও ধৃতব্রত এই একাদশ নামে তুমি বিখ্যাত হবে। এবং ধী, ধৃতি, উশনা, উমা, নিষুৎ, সর্পিঃ, ইলা, অম্বিকা, ইরাবতী, স্বধা ও দীক্ষা এই একাদশ শক্তি হবেন তোমার পত্নী। তুমি এই পত্নীদের স্বীকার করে বহু প্রজার সৃষ্টি করো।

 প্রজাপতি ব্রহ্মার নির্দেশে নীললোহিতকুমার নিজের শক্তি, আকৃতি ও তীব্রস্বভাব অনুযায়ী প্রজাসমূহ সৃষ্টি করতে লাগলেন। সেই প্রজাদের রুদ্ররূপে এবং ব্যবহারে জগতের চারদিক অতিষ্ঠ হয়ে উঠল। তখন ব্রহ্মা আবার পুত্রকে ডেকে বললেন, হে রুদ্র, এমন প্রজা সৃষ্টির আর প্রয়োজন নেই তোমার সৃষ্টি করা প্রজাদের চোখের দৃষ্টিতে দশদিক এমনকি আমারও দগ্ধ হয়ে যাবার অবস্থা হয়ে উঠেছে। অতএব, হে পুত্র তুমি তপস্যা করো, তপস্যা সর্বভূতের মঙ্গলকারী, তপস্যা করে তুমি আগের কল্পের মতো বিশ্ব সৃষ্টি করো। রুদ্র পদ্মযোনি ব্রহ্মার নির্দেশে তপস্যার জন্যে অরণ্যে প্রবেশ করলেন।

[জন্মানোর পরেই নীললোহিতকুমার এমন কাঁদতে লাগলেন, ব্রহ্মা তাঁর নাম রাখলেন রুদ্র। সেই রুদ্র একাদশ নাম নিয়ে, একাদশ পত্নীর সঙ্গে প্রজা সৃষ্টি করছিলেন। কিন্তু ব্রহ্মার রুদ্রের ওই সৃষ্টিসমূহ মনঃপূত হল না, তিনি বললেন, "ঢের করেছ, বাপু, এবার ক্ষ্যামা দাও। তুমি তপস্যা করো। শৈব মতে রুদ্র হচ্ছেন শিব। ভাগবত পুরাণে রুদ্রর সঙ্গে রীতিমতো ছেলেখেলা করলেন ব্রহ্মা, শৈব পুরাণ নিয়ে যদি কোন দিন আলোচনার সুযোগ পাই দেখা যাবে চিত্রটি সম্পূর্ণ উল্টো]।          

রুদ্র ধ্যানে নিমগ্ন হলে, ব্রহ্মার আরো দশটি পুত্র সৃষ্টি হল। তাঁদের নাম মরীচি, অত্রি, অঙ্গিরা, পুলস্ত্য, পুলহ, ক্রতু, ভৃগু, বশিষ্ঠ, দক্ষ ও নারদ। নারদের জন্ম হল ব্রহ্মার কোল থেকে, দক্ষ হলেন তাঁর বুড়ো আঙুল থেকে, বশিষ্ঠ তাঁর প্রাণ থেকে, ভৃগু ত্বক থেকে, ক্রতু হাত থেকে, পুলহ নাভি থেকে, পুলস্ত্য দুই কান থেকে, অঙ্গিরা মুখ থেকে, অত্রি তাঁর চোখ থেকে ও মরীচির সৃষ্টি হল তাঁর মন থেকে। লোকবিস্তারের কারণেই এঁদের জন্ম। ব্রহ্মার দক্ষিণ স্তন থেকে ধর্মের সৃষ্টি হল, এই ধর্মেই স্বয়ং শ্রীনারায়ণ বিরাজ করেন। তাঁর পিঠ থেকে সৃষ্টি হল অধর্মের, লোক সকলের মৃত্যুভয়ের কারণ এই অধর্ম। এরপর তাঁর হৃদয় থেকে কাম, দুই ভুরু থেকে ক্রোধ, অধর থেকে লোভ, মুখ থেকে সরস্বতী, লিঙ্গ থেকে সমস্ত সিন্ধু ও পায়ু থেকে পাপ সৃষ্টিকারী রাক্ষসের সৃষ্টি হল। ব্রহ্মার ছায়া থেকে সৃষ্টি হলেন দেবহূতির পতি ঋষি কর্দমএই ভাবেই ব্রহ্মার সমস্ত দেহ ও মন থেকে এই জগতের সৃষ্টি হল।

চলবে...

মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩২

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "



[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩১ 


৩৮

“হুঁ, বুঝলাম। তার মানে তুমি রাজধানীর পথে রতিকান্তকে ভল্ল ছোঁড়ার যে কাণ্ডটা করেছিলে - সবটাই সাজানো নাটক”?

“ঠিকই – পুরোটাই নাটক। আমাকে এখানে পাঠানো এবং এখানে এসে আমার কাজের সুবিধার জন্যেই এরকম একটা ঘটনার পরিকল্পনা করেছিল প্রশাসন থেকে। তবে রতিকান্তের প্রতি আমাদের অর্থাৎ রাজধানীর সমস্ত রক্ষীদের ঘৃণা এবং বিদ্বেষের বিষয়টার মধ্যে এতটুকু নাটক নেই। রতিকান্তকে প্রাণে না মেরে – চরম একটা শিক্ষা দেওয়ার পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে। যে শিক্ষা সে সারাজীবন বয়ে বেড়াবে আর জ্বলে মরবে। এ কথা প্রশাসন যদিও জানে না। তবে আমার মনে হয় তারা বোঝে এবং বুঝেও না বোঝার ভান করে থাকে”।

“সেটাই কি মারুলাদাদা সেদিন বলছিল?”

“হ্যাঁ, ওরকমই। এবং মারুলাই ওই কাজটার দায়িত্ব নিয়েছে। আমরা সাহায্য করব”, হাসতে হাসতে ভল্লা বলল।

দুজনের কেউই কোন কথা বলল না অনেকক্ষণ। শেষ রাতের নিস্তব্ধ জনপ্রাণীহীন রাজপথে দুজোড়া রণপা দ্রুত এগিয়ে চলল। পাথুরে রাস্তায় আওয়াজ উঠছিল খুট-খাট খুট-খাট।

কিছুক্ষণ পর রামালি বলল, “নোনাপুর ফিরেই আমাদের রণপাগুলো বালিয়াকে দিয়ে দিতে হবে। পাথুরে রাস্তায় এভাবে বারবার চলতে গেলে, লোহার খুড়ো ছাড়া চলবে না”।

“হুঁ। ভল্লর ফলাগুলো হয়ে গেলেই – রণপাগুলো দিয়ে দিস”। বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর ভল্লা বলল, “সব কথাই তো শুনলি এবং বুঝলি। তোর কী মনে হচ্ছে, রামালি?”

একটু সময় নিয়ে রামালি বলল, “দেখ ভল্লাদাদা, নিজের প্রাণটুকু ছাড়া আমার জীবনে হারানোর কিচ্ছু ছিল না। তোমার সঙ্গে এই ক মাসে যা শিখেছি, নিজের ওপর যে বিশ্বাস আমি অর্জন করেছি, সেটা আমি আর কোনভাবেই হারাতে চাই না। তোমাকে আমি যতটা শ্রদ্ধা করি, কিন্তু কিছু কিছু ব্যাপারে তোমার ওপর ঠিক ততটাই ক্ষুব্ধ”।

ভল্লা অন্ধকারের মধ্যে রামালির গম্ভীর মুখের দিকে তাকাল, বলল, “যেমন?”

একটু ইতস্ততঃ করে রামালি বলল, “এই যেমন ধরো, গ্রামপ্রধান এবং কবিরাজমশাই দুজনকেই তুমি যে সত্যি সত্যিই শ্রদ্ধা করো, সে বিষয়ে আমার কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু এই দুজনেরই মৃত্যুর জন্যে তুমিই যে দায়ী – সে বিষয়েও আমি নিশ্চিত। এরকম করছ কেন?”

“কিন্তু কবিরাজমশাই তো মারা যাননি। বন্দী হয়ে আছেন”।

“ভোলাচ্ছো ভল্লাদাদা? ওঁনার আয়ু আর কয়েকদিন মাত্র – হয়তো কাল কিংবা পরশু অথবা তার পরের দিন…”।

ভল্লা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “দেখ রামালি, আমরা যতই দক্ষ এবং উচ্চপদস্থ রাজকর্মীই হই না কেন – আমরা আসলে তো ভৃত্য। অর্থাৎ কর্তার ইচ্ছেয় কর্ম। অতএব প্রশাসনের নির্দেশে কোন কোন নীতিবিরুদ্ধ কাজ – কখনো কখনো বিবেক-বিরুদ্ধ কাজও - করতেই হয়। এমনকি যখন আমি নিজেই কোন প্রশাসনিক প্রধানের দায়িত্বে থাকি – তখনও প্রশাসনের স্বার্থেই, মন থেকে সায় না থাকলেও, অনেক কঠোর এবং অনৈতিক কাজ করতে হয়। তোদের নোনাপুর গ্রামের কথাই ধর। প্রশাসন এখানে কাজটা গুছিয়ে করার জন্যে আমাকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছে। শষ্পক আমার থেকে অনেকটা উচ্চপদে থাকলেও, রাজধানীর নির্দেশে, আমার অধিকাংশ সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে – আমাকে সম্পূর্ণ সাহায্য তাকে করতেই হবে”।

একটু চুপ করে থেকে ভল্লা আবার বলল, “এখানেও কিন্তু অলিখিত কিছু নিয়ম আছে – যেমন আমি স্বাধীনতা পেয়ে, এমন কিছু করতে পারি না, যাতে প্রশাসনের কোন ক্ষতি হয়। অথবা প্রশাসন সরাসরি কোন বিপদে পড়ে। শষ্পকের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য, কিন্তু শষ্পকের ক্ষেত্রে বিষয়টা আরও জটিল। ধর আমি এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিলাম, তাতে মারাত্মক কোন গোলমাল হয়ে গেল। রাজধানী আমাকে শাস্তি তো দেবেই, শষ্পককেও ছেড়ে দেবে না। বলবে, উচ্চপদে থেকেও ভল্লার এই সিদ্ধান্ত তুমি মেনে নিলে কী করে?

এবারে কবিরাজমশাই এবং প্রধানমশাইয়ের কথায় আসি। ওঁনারা বড়ো বেশি বুঝে ফেলেছিলেন। বিশেষ করে, কবিরাজমশাই যা বুঝেছিলেন, সেটা এতটাই সত্যি এবং যুক্তিনির্ভর যে, সেটাকে কোন মিথ্যা দিয়েই ঢেকে দেওয়া সম্ভব নয়”।

“হুঁ। সেকথার কিছুকিছু আমরাও শুনেছি”।

“রাজধানীর সিদ্ধান্ত অস্ত্রভাণ্ডার থেকে কৌশলে পুরোন অস্ত্র বিক্রি করতে হবে। তার জন্যে এই রকম ভয়ানক পরিকল্পনা করে সেটাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার দায়িত্ব, কোন একজন সেনাধ্যক্ষ বা মহাধিকারিকের পক্ষে নেওয়া সম্ভব? না – সম্ভব নয়। এমন সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা করতে পারেন, রাজ্যের সর্বোচ্চ কর্তারা – অর্থাৎ রাজা স্বয়ং এবং মহামন্ত্রী। আমার ধারণা মন্ত্রীসভার অন্যান্য মন্ত্রীরাও এ বিষয়ে এখনও কিছুই জানেন না।

এইবার এত কাঠ-খড় পুড়িয়ে, এত নাটক করে, সবে যখন আমাদের কাজটা সাফল্যের দিকে এগোচ্ছে, সে সময় কবিরাজমশাই এবং প্রধানমশাই আমাদের গোপন কৌশলটাই যদি সবার সামনে ফাঁস করে দেন, কী হবে? আমরা ব্যর্থ হবো – কিন্তু সেটা তুচ্ছ ব্যাপার। গুরুতর হচ্ছে - সব কথা জানাজানি হয়ে গেলে মন্ত্রীসভায় ঝড় বয়ে যাবে। রাজা ও মহামন্ত্রীকে বাধ্য হয়ে – তাঁদের বিশ্বাসভাজন সেনাধ্যক্ষ এবং মহাধিকারিকদের ঘাড়ে সমস্ত দোষ চাপিয়ে এবং যারা যারা এই কাজের সঙ্গে যুক্ত – সকলকে শাস্তি দিয়ে – পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে। তাতে রাজ্যের সমস্ত প্রশাসনিক কর্মী ও  সেনাবাহিনীতে তুমুল বিক্ষোভ সৃষ্টি হবে। এক কথায় রাজ্যের প্রশাসন ও সুরক্ষা ভয়ংকর সংকটের সম্মুখীন হবে – তাতে রাজার সিংহাসনও টলে যেতে পারে…।  

অতএব যতই অপ্রিয় বা অনৈতিক কাজ হোক না কেন, আমরা যে ভয়ে হানো এবং শল্কুকে বিদায় দিলাম – তার থেকেও অনেক বড়ো বিপদ এড়াতে, প্রধানমশাইয়ের মতো কবিরাজমশাইকেও এই ধরাধাম থেকে বিদায় নিতে হবে”।

ভল্লা চুপ করে যেতে রামালি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “ভোরের আলো ফুটছে যে ভল্লাদাদা, বীজপুরের চটি আর কতদূর?”

রামালির স্বাভাবিক স্বরে, ভল্লা নিশ্চিন্ত হয়ে বলল, “আরও প্রহর দেড়েক তো বটেই। তবে আমিও কী আর ঠিক করে জানি? এ পথে একবারই গিয়েছি – তাও আধমরা অবস্থায়।  কোথাও বসে একটু জিরিয়ে নিই, চল। এতটা পথ হেঁটে তোর খিদে পায়নি? আমার তো পেয়েছে…”।

 

দিনের প্রথম প্রহরের মাঝামাঝি সময়ে, পিছনের দরজা দিয়ে, জনাইয়ের চটিতে ঢুকে পড়ল ভল্লারা। জনাইয়ের ঘরে গিয়ে দেখল, জনাই নেই। রণপাগুলো ঘরের বাইরে খাড়া করে রেখে, ঘরের ভেতরে ঢুকে ভল্লা বলল, “এখানেই আমাদের থলেগুলো রাখি, তারপর চ মুখ-হাত-পা ধুয়ে একেবারে স্নানটা সেরে নিই”।

“এখানে কে থাকে, ভল্লাদাদা”?

“বীজপুরের এই চটির অধ্যক্ষ – জনাই। যদিও এখন সে জন ঘরে নাই”। ভল্লার কথায় রামালি হাসল।

স্নান করে ভল্লারা জনাইয়ের ঘরে এসে দেখল, ঘরের ভেতরে জনাই দাঁড়িয়ে আছে কোমরে হাত দিয়ে। ভল্লাকে দেখে চেঁচিয়ে উঠল জনাই, “শালা, ভল্লা! তুই হঠাৎ কোত্থেকে? ঘরে ঢুকে সেই থেকে আমি ভাবছি – বাইরে রণপা দুজোড়া, আমার ঘরে ঝোলাঝুলি – কে রেখে গেল, আর গেলই বা কোথায়?”

ভল্লা হাসতে হাসতে ঘরের মেঝেয় বসল আরাম করে, বলল, “রামালি, বস। জনাই, এ হচ্ছে আমার সেনাপ্রধান, নাম রামালি। আর তোকে তো বলেছিলাম, জনাই হচ্ছে এই চটির সর্বেসর্বা”।

জনাই রামালির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল, তারপর হাসল একটু, বলল, “এখন কী খাবি বল? এত সকাল সকাল এখানে পৌঁছে গেলি, রাত্রে কখন বেরিয়েছিলি?”

ভল্লা বলল, “এখন কিচ্ছু খাবো না, সঙ্গে খাবার নিয়ে বেরিয়েছিলাম, পথে খেয়েছি। তবে দুপুরে কী খাওয়াবি বল? মাছের ঝোল – ভাত খাওয়াতে পারবি?”

জনাই বলল, “মাছ? এই সময়ে হাটে মাছ একটু কম আসে। তাও দেখছি – দাঁড়া হাটে লোক পাঠিয়ে আমি এখনই আসছি”। জনাই উঠতে যাচ্ছিল, ভল্লা তার হাত ধরে বসাল, বলল, “আরে অত তাড়াহুড়ো করার কিছু নেই... মাছ না পেলেও কিছু যাবে আসবে না। তার আগে যে জন্যে আসা সেটা আগে বলে নিই”। জনাই কিছু বলল না, ভল্লার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

“বীজপুরে কেউ একজন ইঁটের গাঁথনির ঘর বানায় – চিনিস? তাকে লাগবে – দুটো করে দু জায়গায় মোট চারটে ঘর বানাতে হবে, টালির চাল। খুব তাড়াতাড়ি দরকার”।

“চিনি বৈকি! নাম সুমের। আমার এই চটিতে সে অনেক কাজ করেছে। ডেকে পাঠাচ্ছি, কথা বলে নে”।

“কথা বলবি, তুই আর রামালি – আমি সামনে থাকব না”।

“আচ্ছা। আর কিছু?”

“কালো কাপড়ের থান– জনা চল্লিশেক ছেলের ধুতি বানাতে হবে। পাওয়া যাবে?" 

পরের পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩৩ "



সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৫/৯

 ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "

ধর্মাধর্ম শেষ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৫/১ "

 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  


[এর আগের পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৫/৮ "]

পঞ্চম পর্ব /পর্বাংশ - ৯


৫.৩.১ ব্রাহ্মণ্য ধর্ম থেকে হিন্দু ধর্মে রূপান্তর (শেষাংশ)

৬. অতএব অস্তিত্ব রক্ষা এবং হারিয়ে যাওয়া প্রতিপত্তি ফিরিয়ে আনার তাগিদে ব্রাহ্মণ্য ধর্মকে বেতসবৃত্তি অবলম্বন করতে হল। যাঁরা ক্ষমতার শীর্ষে অথবা যাঁরা প্রশাসনের উচ্চস্তরে অধিষ্ঠিত তাঁদের ঘনিষ্ঠ হতে ব্রাহ্মণ্য নিয়মকে শিথিল করতেই হল। রাজা যেই হোন, বৈশ্য, শূদ্র অথবা বিদেশী যবন বা ম্লেচ্ছ – ভিন্ন পরিচয়ে তাঁরাও ব্রাহ্মণ্য ধর্মে অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেলেন। আগে যাঁদের “পতিত-ক্ষত্রিয়” বা “সংকর-ক্ষত্রিয়” বলে অবহেলায় ব্রাহ্মণ্য সমাজ দূরে রেখেছিল, এখন তাঁরাই “ব্রহ্মক্ষত্রিয়”, “নাগক্ষত্রিয়”, “উগ্রক্ষত্রিয়” ইত্যাদি বিচিত্র নামে ব্রাহ্মণ্য সমাজে সসম্মানে প্রতিষ্ঠা পেতে শুরু করলেন। উপরন্তু পৌরাণিক কিছু বিখ্যাত রাজবংশ, যেমন সূর্য, চন্দ্র ইতাদির সঙ্গে যুক্ত করে, ব্রাহ্মণ পণ্ডিতরা এই সব রাজাদের ঘনিষ্ঠ বৃত্তেও ঢুকে পড়তে সমর্থ হলেন। তাঁরা রাজাদের প্ররোচিত করলেন, রাজসূয়, বাজপেয় বা অশ্বমেধ যজ্ঞের আয়োজনে। এই আয়োজনে একদিকে পূর্ণ হল রাজাদের আত্মশ্লাঘা এবং অন্যদিকে পুনর্প্রতিষ্ঠা পেল ব্রাহ্মণ পুরোহিতদের প্রতিপত্তি ও বিপুল বিত্ত।

শুধুমাত্র রাজ-বৃত্তেও নয়, ব্রাহ্মণরা আরো নমনীয় হল অনার্য ধর্মবিশ্বাসের প্রতি। ততদিনে তারা চিনে ফেলেছে ভারতবর্ষের প্রতিটি প্রত্যন্ত অঞ্চল, বুঝে ফেলেছে দেশের আঞ্চলিক জনগনের মনোভাব। উপলব্ধি করতে পেরেছে, অনার্য মানুষের পরিশ্রমে উৎপন্ন শস্য এবং অজস্র সামগ্রী ছাড়া সমাজের অস্তিত্বই থাকবে না। অতএব অনার্য জনগণের বিদ্বেষ এবং বিতৃষ্ণা দূর করার লক্ষ্যে তাঁরা অনার্যদের প্রতিটি দেব-আত্মা, প্রতিটি ধর্মবিশ্বাস আত্মসাৎ করে নতুন উৎসাহে লেগে পড়লেন, সর্ব ভারতীয় ধর্মভাবনা রচনায়, যার নাম পুরাণ। তার জন্যে তাঁরা ধীরে ধীরে বৈদিক অনেক দেবতাকেই গুরুত্বহীন করে তুলতে এতটুকু দ্বিধা করলেন না। আবার কিছু কিছু বৈদিক দেবতাকে নব-রূপে মহিমান্বিত করে তুললেন, বেশ কিছু গৌণ বৈদিক দেবতাকে বসালেন প্রথম সারিতে। নতুন এই দেবতাদের নব নব মহিমাতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল আমাদের ধর্মধারণা  – যাকে আমরা হিন্দু ধর্ম বলে থাকি। 

সেই হিন্দু ধর্ম নিয়েই এবার আলোচনা করা যাক।          

 

৫.৩.২ হিন্দু দেব-দেবী

আর্যদের ভারতে প্রবেশ মোটামুটি ১৫০০ বি.সি.ই-তে, প্রাচীনতম ঋগ্বেদের সংকলনের সময় কাল ১০০০ বি.সি.ই-র কিছু আগে বা পরে এবং পরবর্তী ৫০০ বছরের মধ্যে সংকলিত হয়েছে ব্রাহ্মণ, উপনিষদ এবং আরণ্যক বিভাগ সহ আরও তিনটি বেদ। ঋগ্বেদের সময় দেবতাদের সংখ্যা ছিল মাত্র আট বা নয়, খুব জোর দশ জন। পরবর্তী বেদগুলিতে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি। কিন্তু আরও তিনশ বছর পর অর্থাৎ মোটামুটি খ্রী.পূ. দ্বিতীয় শতাব্দী থেকে এই দেবতাদের সংখ্যায় বিস্ফোরণ ঘটতে লাগল।

দেবদেবীরা শুধু যে সংখ্যাতেই বৃদ্ধি পেলেন, তা নয়, তাঁদের গুণগত পার্থক্য অর্থাৎ মহাবিশ্বের যাবতীয় বিষয়ে তাঁদের প্রভাব, প্রতিপত্তি, কর্তব্য, দায়িত্ব এবং অধিকার বেড়ে গেল বহুগুণ। এই পর্যায়ে যে তিনজন দেবতাদের মধ্যে প্রধানতম হয়ে উঠলেন, তাঁদের একত্রে ত্রিদেব বলা হয় – ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর। এই  তিন দেবতার নামই আমরা বৈদিক সাহিত্যে জেনেছি। বেদের ব্রহ্ম ছিলেন, সকল দেবতাদের দেবতা – যাঁর আরেক নাম হিরণ্যগর্ভ। আমরা জেনেছিলাম, তিনিই একমাত্র সত্য, তিনিই বিভক্ত হয়ে অন্যান্য দেব-দেবী হয়েছেন। এই ব্রহ্মের অধিষ্ঠান ছিল ব্রহ্মলোকে – দ্যুলোকের উচ্চতম স্তরে। [এই স্তরের ঊর্ধে কী আছে জিজ্ঞাসা করায় বাচক্‌নু-কন্যা গার্গীকে মুণ্ডপাতের হুমকি দিয়েছিলেন মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্য, সে কথা আশা করি ভুলে যাননি (অধ্যায় ৪.৪.৯)]। বিষ্ণু ছিলেন বৈদিক সূর্য-দেবতা - দ্বাদশ আদিত্যের মধ্যে সর্ব কনিষ্ঠ। বৈদিক সূর্য বা দ্বাদশ আদিত্য যেহেতু দ্যুলোকের দেবতা, অতএব বিষ্ণুর অধিষ্ঠান হল, দ্যুলোকের সর্বোচ্চ স্তরে, অর্থাৎ বৈকুণ্ঠলোকে। আর মহেশ্বর হলেন বৈদিক অগ্নির রুদ্ররূপ। তিনি পৃথ্বীলোকের দেবতা, অতএব তাঁর অধিষ্ঠান হল এই পৃথিবীর উচ্চতম স্তরে, হিমালয় পর্বতশ্রেণীর মধ্যে কৈলাস পর্বতে।

 

৫.৩.২.১ ব্রহ্মা

হিন্দুদের মধ্যে ব্রহ্মা খুব একটা জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারেননি। তাঁর অন্যতম কারণ হয়তো, তাঁর নামের সঙ্গে পরমাত্মা ব্রহ্মের নাম-সাযুজ্য। পুরুষোত্তম ব্রহ্ম তথা হিরণ্যগর্ভ, বেদ ও উপনিষদের অব্যক্ত নিরাকার ঈশ্বর। তাঁকে বর্ণনা করা যায় না, ধারণা করা যায় না, তিনি অবাঙ্মনসোগোচর, তাঁকে শুধুমাত্র উপলব্ধি করা যায়। উপনিষদ এবং বেদান্তের ব্রহ্ম ধারণা এবং হিন্দু ধর্মের ব্রহ্মা ধারণা কিন্তু মোটেই এক বিষয় নয়। কারণ হিন্দুদের ব্রহ্মা সাকার। তাঁর চতুর্মুখ, মাথায় জটা। তিনি তাঁর চারটি অঙ্গ থেকে চতুর্বণের সৃষ্টি করেছেন। তাঁর মন থেকে জন্ম নিয়েছেন সপ্তর্ষি সহ অনেক ঋষি ও নারদ, মনু – যাঁরা পৃথিবীর যাবতীয় প্রাণী ও উদ্ভিদের স্রষ্টা। কিন্তু এই অপার ঐশ্বর্য থাকলেও ভগবান ব্রহ্মা অত্যন্ত সরল দেবতা ছিলেন। দৈত্য, দানব, রাক্ষস ও মানুষদের অনেকেই তপস্যা করে ব্রহ্মাকে বেশ সহজেই সন্তুষ্ট করেছে এবং বহুবার এমন সব বর আদায় করে নিয়েছে, যার ফলে দেবতা এবং মানুষদের বারবার বিপদে পড়তে হয়েছে। পরিস্থিতি সামলাতে হয়েছে হয় বিষ্ণু নয় শিবকে। তাঁর এই সারল্য এবং সহজেই সন্তুষ্ট হয়ে ওঠার কারণেই হয়তো তাঁর প্রভাব খর্ব হয়েছে, কমেছে জনপ্রিয়তা।

মহাভারত ও পুরাণগুলিতে বিষ্ণু বা শিবের মাহাত্ম্য প্রসঙ্গে ব্রহ্মার উল্লেখ এসেছে বারবার, তার থেকেই তাঁর অনেক কাহিনী ও উপাখ্যান জানা যায়। এই প্রসঙ্গে হিন্দু পুরাণগুলি নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করে নেওয়া যাক। হিন্দুদের পুরাণ সংখ্যা ঠিক কতগুলি সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ আছে, তবে আঠারোটি প্রধান পুরাণ গ্রন্থকে প্রায় সকলেই মেনে নিয়েছেন, সেগুলিকে মহাপুরাণ বলা হয়। এই মহাপুরাণগুলির সংক্ষিপ্ত পরিচয় এখানে দেওয়া হলঃ- 

মহাপুরাণ সারণি

মহাপুরাণের নাম             সংক্ষিপ্ত বিষয় পরিচয়                         প্রধান দেবতা

অগ্নি      নানা বিষয়ের আলোচনা, গাছ-পালা, উদ্ভিদ, বাস্তুশাস্ত্র ইত্যাদি।  অগ্নি

ভাগবত বিষ্ণুর অবতার বিবরণ, মহিমা গাথা ও ধর্মতত্ত্ব।              বিষ্ণু

ব্রহ্ম      নানান প্রাচীন কাহিনী, ধর্মতত্ত্ব, ব্রহ্মের কথা সামান্যই।          ব্রহ্মা

ব্রহ্মাণ্ড নানান কাহিনী, ধর্মতত্ত্ব, রাজনীতি, শাসন প্রণালী ইত্যাদি।     শিব

৫   ব্রহ্মবৈবর্ত প্রধানতঃ বিষ্ণুর নানান মহিমা গাথা ও ধর্মতত্ত্ব।               বিষ্ণু

গরুড় প্রধানতঃ বিষ্ণুর নানান মহিমা গাথা ও ধর্মতত্ত্ব।               বিষ্ণু

কূর্ম      বিষ্ণু ও শিবের উপাখ্যান, তীর্থ ব্যাখ্যা এবং ধর্মতত্ত্ব।          বিষ্ণু 

লিঙ্গ      লিঙ্গ অর্থাৎ শিবের মাহাত্ম্য, শৈব ধর্মতত্ত্ব।                    শিব

মার্কণ্ডেয় মহাভারত ও নানান পুরাণ নিয়ে আলোচনা ও ধর্ম তত্ত্ব।      বিষ্ণু ও শিব

১০ মৎস্য বিষ্ণুর দশ অবতারের উপাখ্যান।                             বিষ্ণু

১১ নারদ প্রধানতঃ বিষ্ণু মাহাত্ম্য।                                       বিষ্ণু

১২ পদ্ম      বিষ্ণু এবং শিবের নানানমাহাত্ম্য, তীর্থ কথা, বিবিধ তত্ত্ব।    বিষ্ণু ও শিব

১৩ শিব      শিবের মাহাত্ম্য।                                            শিব

১৪ স্কন্দ      কার্তিক ও শিবের মাহাত্ম্য।                                  শিব

১৫ বামন প্রধানতঃ বিষ্ণুর মাহাত্ম্য।                                       বিষ্ণু 

১৬ বরাহ প্রধানতঃ বিষ্ণুর মাহাত্ম্য।                                  বিষ্ণু 

১৭ বায়ু      প্রধানতঃ শিব মাহাত্ম্য ।                                       শিব

১৮ বিষ্ণু      প্রধানতঃ বিষ্ণু মাহাত্ম্য।                                       বিষ্ণু

             

উপরের সারণি থেকে বহুল প্রচলিত অষ্টাদশ মহাপুরাণগুলির বিষয়ভিত্তিক বিচার করলে, দেখা যায়, আঠারোটির মধ্যে বিষ্ণু-মহিমা বিবৃত মহাপুরাণের সংখ্যা নটি এবং শিব-মহিমার পাঁচটি। তাছাড়া একটি করে মহাপুরাণ ব্রহ্মা এবং অগ্নির। বাকি দুটি বিষ্ণু, শিব ও অন্যান্য নানান ঘটনা নিয়ে রচিত। অতএব মোট মহাপুরাণের শতকরা ৫০ ভাগ ভগবান বিষ্ণুর ভাগে, শতকরা ২৭.৭৮ ভাগ ভগবান শিবের ভাগে। ভগবান ব্রহ্মার ভাগে মাত্র শতকরা ৫.৫৫ ভাগ। এর থেকেই বোঝা যায়, ভগবান বিষ্ণুর ভক্ত বিদগ্ধ পণ্ডিতরা ভাগবত ধর্মের প্রচারে কতটা নিষ্ঠাবান ছিলেন। আর উল্টোদিকে ভগবান ব্রহ্মার ভক্ত ভাগ্য খুবই সঙ্গীন।

ভারতবর্ষের মন্দিরের হিসাব থেকেও এই চিত্র পরিষ্কার হয়ে ওঠে। ভগবান বিষ্ণু ও মহাদেবের বিখ্যাত মন্দিরগুলি ছেড়ে দিলেও, প্রতিটি হিন্দুপাড়ায় ছোট-ছোট মন্দির আছে অজস্র, সেক্ষেত্রে ব্রহ্মার মন্দিরের সংখ্যা গোটা ভারতবর্ষে সাকুল্যে মাত্র ছটি, একটি আজমীড়ে পুষ্কর সরোবরের তীরে; রাজস্থানের বারমের; খোখান, (কুলু, হিমাচল); কুম্ভকোনম (তাঞ্জাভুর, তামিলনাড়ু); পানাজি (গোয়া) এবং তিরুপাত্তুরে (তামিলনাড়ু)। 


পরের পর্ব - " ধর্মাধর্ম - ৫/১০ "

শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬

শুধু _তুই .কম - পর্ব ১৬

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

এই উপন্যাসের শুরু - " @শুধু _তুই .কম - পর্ব ১



এর আগের পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১৫ 


১৬ 

নির্দিষ্ট দিনে মা রওনা হয়ে যাওয়ার পরেই, বাড়িটা বড়ো শূণ্য মনে হল সুনেত্রর। প্রতিটা ঘরের প্রত্যেকটি কোনায় কোনায় সে অনুভব করল মায়ের হাতের স্পর্শ – মায়ের মমতা। কথায় বলে, দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা কেউ বোঝে না। আজ যেন খুব স্পষ্টভাবেই সে কথাটির মর্ম উপলব্ধি করল সুনেত্র। তার মনে যে এখন শূণ্যতার বোধ তাই নয়, বারবারই তার মনে হল, দাদার কাছে মায়ের এই যাওয়াটা সুখকর হবে না। বরং এই স্মৃতি বড়ো বেদনাদায়ক হয়েই থাকবে মায়ের বাকি জীবনের অবশিষ্ট বছরগুলিতে।

মায়েরা তাঁদের সকল সন্তানের প্রতি কখনোই পক্ষপাতহীনা হয়ে উঠতে পারেন না। প্রথম সন্তান যে কোন নারীর জীবনে এনে দেয় জীবনের পূর্ণতা। প্রথম মাতৃত্বের পরম অনুভূতি। পরবর্তী সন্তান না আসা পর্যন্ত, প্রথম সন্তানই হয় মাতৃহৃদয়ের একচ্ছত্র অধিরাজ। মায়ের সবটুকু মাতৃত্ব – আদর, প্রশ্রয়, মমতা– প্রথম সন্তানই এককভাবে আদায় করে নেয়। পরবর্তী সন্তান এলে, প্রথম সন্তানের প্রতি মায়ের মমতা অনেকটাই খণ্ডিত হয়ে যায় ঠিকই – কিন্তু সেই খণ্ডিত মমতার পুরোটাই বদলে যায় প্রথম সন্তানের প্রতি মায়ের নির্ভরতায় ও আশা-ভরসায়।

মায়ের মনের এই পরিবর্তনটুকু, বড়ো হতে হতে প্রথম সন্তান কিভাবে গ্রহণ করবে, তার ওপরেই নির্ভর করে ভবিষ্যতে দাদা-ভাই, দাদা-বোন, কিংবা দিদি-ভাই এবং দিদি-বোনের মধ্যে সম্পর্ক কেমন হবে। ছোটভাই বা বোনকে বিছানায় ঘুম পাড়িয়ে মা যদি প্রথম সন্তানকে বলেন, “ভাইকে (বা বোনকে) একটু দেখ তো, তোর বাবার চান হয়ে গেল মনে হয়, ভাতটা বেড়ে দিয়ে আসি”। অথবা “ভাইয়ের (বা বোনের) সামনে ওই ঝুমঝুমিটা বাজা তো, বাবু, কিছুতেই খেতে চাইছে না, একটু ভুলে থাকবে”। প্রথম সন্তানদের কেউ কেউ মায়ের দেওয়া এই দায়িত্ব পেয়ে খুশি হয়, ভাবে আমি বড় হয়ে গেছি, মা আমাকে ভরসা করছে। আবার কেউ কেউ মনে করে, মা সারাক্ষণ ভাইকে (বোনকে) নিয়েই ব্যস্ত। ভাইয়ের জন্যে আমি নিজে মায়ের সঙ্গে খেলতে পারছি না, উলটে তার জন্যে আমাকে খিদমদগারি করতে হচ্ছে। প্রথম সন্তানের মনে আসতে থাকে প্রবল ঈর্ষা বোধ।

প্রথম সন্তান আরও বড়ো হওয়ার পর, তার হাতে টাকা আর ছোট্ট ফর্দ ধরিয়ে দিয়ে মা বলতেই পারেন, “যা তো বাবা, সাধনের দোকান থেকে এই জিনিষগুলো চট করে নিয়ে আয় তো”। সে ছেলে উত্তর দিতে পারে,

“আমি এখন ঘুড়ি ওড়াচ্ছি, ভাইকে (বোনের একটা বয়স পর্যন্ত দাদারা তাকে একটু প্রিভিলেজ দিতে তেমন কার্পণ্য নাও করতে পারে) পাঠাও না”।

“ধুর, ও পারে নাকি তাই? ছেলেমানুষ – টাকার হিসেব বুঝবে? ছোট পেয়ে সাধন ওকে কী দিতে কী দিয়ে দেবে...”।

“তবে? সে এখন ছোট নাকি, মা তার ওপর সব কিছুতেই ভরসা করছেন”, এই চিন্তায় কিছু দাদা আত্মশ্লাঘা অনুভব করবে, আর ছোট ভাইকে করবে করুণা, ভাববে “ভাইটা চিরকাল বাচ্চাই রয়ে গেল”।  আবার কিছু দাদা ভাববে, “ছেলেমানুষ না হাতি, মা ওকেই বেশি ভালোবাসে, কাছে কাছে রাখতে চায় – আর আমাকে খেলতে না দিয়ে, নানান কাজে সারাদিন খাটিয়ে মারে”। অর্থাৎ তার মনে গেঁথে যেতে থাকবে ভাইয়ের প্রতি তীব্র ঈর্ষা।

সুনেত্র বড় হতে হতে তার প্রতি দাদার এই ঈর্ষাটি টের পেয়েছে বারবার। তার কথায়-বার্তায়, আচরণে। একটা ঘটনার কথা মনে পড়লে,  দাদার প্রতি সুনেত্রর মনটা আজও বড্ডো সংকীর্ণ হয়ে ওঠে।

সুনেত্র তখন স্কুলের উঁচু ক্লাসে পড়ে, ইলেভেনে বা টুয়েলভে। কলকাতা বইমেলা তখন বসত পার্কস্ট্রিটের মোড়ের কাছে ময়দানে। সে আর তার খুব প্রিয় বন্ধু ও ক্লাসমেট অনিমেষ ঠিক করল, সামনের শনিবার স্কুলে হাফ ছুটির পর একসঙ্গে বইমেলায় যাবে। সেই দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখার জন্যে অনিমেষ প্রস্তাব দিয়েছিল, সেদিন তুই আমাকে একটা বই উপহার দিবি, আমিও তোকে একটা বই দেব। প্রস্তাবটি শুনেই অনিমেষ প্রমাদ গুনল, সে জানত মায়ের কাছে সংসার চালানোর টাকা ছাড়া উদ্বৃত্ত তেমন কিছুই থাকে না। কারণ সেই সময় বাবা কলকাতা ছেড়ে দিনাজপুরে ট্রান্সফার হয়ে গিয়েছিলেন, এবং সেখান থেকে খুব অনিয়মিতভাবে মানি অর্ডার আসত। তবে তার ভরসা ছিল, স্কুল থেকে নগদ পাওয়া, তার মাধ্যমিকের সরকারি স্কলারশিপের বাৎসরিক টাকাটা মায়ের কাছে অনেকটাই জমা আছে। মাকে বললে, তার থেকে কুড়িটা টাকা কি আর দেবেন না?

সুনেত্র জানত, মায়ের অনেকদিনের সাধ ছিল টুকটুকে লাল, চওড়া পাড়ওয়ালা, সাদা আর মুগা সুতোয় বোনা বেশ ভালো একখানি শাড়ি নেওয়ার। সরকারি স্কলারশিপের ওই টাকাটা হাতে আসার একদিন পরেই মাকে সঙ্গে নিয়ে বিখ্যাত এক শাড়ির দোকান থেকে কিনে দিয়েছিল মায়ের পছন্দের শাড়িটা। সেসময় টাঙ্গাইল বা ধনেখালি তাঁতের শাড়ি পাওয়া যেত ৫০/৬০ টাকায়, মায়ের এই শাড়িটার কত দাম ছিল – এখন আর মনে নেই - সাড়ে তিন/ চারশ হবে বড়ো জোর। শাড়িটা কিনে খুব খুশি হয়েছিলেন মা, কয়েকদিন পরেই মা ওই শাড়িটা পরে সেজমাসিমার বাড়ি গিয়েছিলেন। সেখানে গর্ব করে বলেছিলেন, শাড়িটা সুনু আমায় কিনে দিয়েছে – ওর স্কলারশিপের টাকায়। মায়ের এই গর্ব করাটা দাদার যে সহ্য হয়নি মোটেই, সেটা ওই বইমেলায় যাওয়ার দিন সকালে টের পাওয়া গেল।

বইমেলা যাওয়ার দিন সকালে, স্কুলে বেরোনোর আগে মাকে টাকার কথা বলতে, মা বললেন, “দেখছিস তো সংসারের এই হাল। তোর বাবার পাঠানো টাকা কবে আসে, ঠিক নেই। এসময় ওরকম শখ-আহ্লাদ না করলেই নয়?”

সুনু মায়ের কাছে খুব স্বাভাবিক বায়নার স্বরেই বলেছিল, “তোমার ওখান থেকে কুড়িটা টাকা দাও না, মা”।

পাশে দাদা বসেছিল, বলল, “তোমার ওখান থেকে মানে? তোর ওই স্কলারশিপের টাকা থেকে? ওই টাকা কটা মায়ের হাতে ফেলে দিয়েছিস বলে, তোকে যখন খুশি টাকা ওড়াতে দিতে হবে? তুমিও পারো বটে মা, ওর কথায় নেচে তুমি শাড়ি কিনতে চলে গেলে? আমি কি স্কলারশিপ পাইনি, তোমার হাতে তুলে দিইনি? আমি কি তোমাকে কখনো এমন কথা বলার সাহস পেয়েছি? ওই শাড়িটা দিয়ে মনে হচ্ছে ও তোমাকে উদ্ধার করে দিয়েছে?” দাদার কন্ঠস্বর ধীরে ধীরে চড়তে লাগল, ঠিক যাত্রার রাবণ বা হিরণ্যকশিপুর মতোই। “ওই টাকা আর ওই শাড়ি তুমি ছুঁড়ে ফেলে দাও মা। ওই শাড়ি পরেও তোমার কাজ নেই...আর কাজ নেই ওর ওই টাকাতেও”।

সুনু খুব আশ্চর্য হয়েছিল, মা কী করে তাকে ভুল বুঝলেন? মা সঙ্গে সঙ্গেই স্টিলের আলমারি খুলে শাড়িটা আর  টাকার খামটা ছুঁড়ে ফেলে দিলেন মেঝেয়। খামের মুখটা মেঝেয় পড়ে খুলে গিয়েছিল, বেরিয়ে পড়েছিল গোটা কয়েক পাঁচ-দশ টাকার নোট। সুনেত্র সেই খাম থেকে কুড়িটা টাকা নিয়ে, খামের মুখ বন্ধ করে টেবিলে তুলে রাখল, আর পাটভাঙা শাড়িটা মেঝে থেকে সযত্নে তুলে রাখল মায়ের বিছানায়। তারপর একবার মায়ের মুখের দিকে আরেকবার দাদার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখল – পায়ে জুতো পরে আর কাঁধে বইখাতার ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে এল ঘর থেকে, “আসছি, মা”, বলে।

সদর দরজা পেরোতে পেরোতে সে শুনতে পেল, “দেখলে, দেখলে মা, কী রকম আস্পর্ধা হয়েছে? টাকার গরম হয়েছে? এত কাণ্ডের পরেও ও তোমার সামনে দিয়েই টাকা নিয়ে বেরিয়ে গেল?”

 

চারটে ক্লাস হয়ে স্কুল ছুটি হয়ে গেল, ছুটির পর অনিমেষের সঙ্গে বাসে উঠল সুনেত্র। যাওয়ার পথে অনিমেষ কথা বলছিল অনর্গল। বইমেলা নিয়ে। নানান সাহিত্যিকের লেখা নিয়ে। রিসেন্টলি কোন কোন বই ওকে মুগ্ধ করেছে। সুনেত্র এমনিতেই কথা কম বলে, সেদিন যেন তাকে বোবায় পেয়েছিল। অনিমেষের সঙ্গে কোন মতে সায় দিয়ে কথাবার্তা চালাচ্ছিল, আর তার বারবার মনে পড়ছিল মায়ের আজকের মুখটা। সেজমাসীমার বাড়ি গিয়ে লালপেড়ে মুগা-শাড়ি পরা মায়ের – মা দুর্গার মতোই - গর্বিতা মুখটাও। সে কি সত্যিই মাকে অপমান করল?

বাস থেকে নেমে মেলাগামী জনস্রোতে মিশে অনিমেষের সঙ্গে মেলার গেটের দিকে যেতে যেতে সুনেত্রর নিশ্চিত মনে হল, না সে কোন অন্যায় করেনি। তার নাটুকে দাদাটি তার মনের মধ্যে জমিয়ে রাখা ঈর্ষার বিষটা মায়ের মনে নাটকীয়ভাবে ঢেলে দিতে পেরেছে। সুনেত্র নিশ্চিত, মায়ের মনের এই আকস্মিক অভিঘাত অচিরেই দূর হবে এবং মা চিনতে ভুল করবেন না, তাঁর গর্ভজাত দুই সন্তানের মনোভাব।

না, মা ভুল করেননি। সন্ধের মুখে সুনেত্র বাড়ি ফিরল। সন্ধে দেওয়ার জন্যে মা প্রস্তুত হচ্ছিলেন। দরজা খুলে দিয়ে প্রসন্ন মুখেই বললেন, “আয়, মেলা ঘোরা হল?”। কিন্তু তাঁর মুখটা, চোখের কোলদুটো একটু যেন ফোলা-ফোলা। এতক্ষণ সুনেত্রর মনের মধ্যে কোন অভিমান ছিল না, ছিল দাদার প্রতি তীব্র বিরক্তি। কিন্তু এখন মায়ের ওই কথায় তার মনে এল অভিমানের জোয়ার। মাথা নীচু করে জুতো খুলতে লাগল দীর্ঘসময় নিয়ে। তারপর পিঠের ব্যাগ নামাল পড়ার টেবিলের ওপর। তারপর ব্যাগ থেকে অনিমেষের দেওয়া বইটা বের করে রাখল সামনে। শীর্ষেন্দুর আশ্চর্য ভ্রমণ, মূল্য ছটাকা (প্রথম সংস্করণ- ফেব্রুয়ারি ১৯৭৬)।

সন্ধে দেওয়া সারা হলে, মা কাছে এলেন সুনেত্রর, মাথায় হাত রেখে বললেন, “কিরে, মায়ের ওপর অভিমান করেছিস?”

উদ্গত কান্নার আবেগ সামলাতে সামলাতে সুনেত্র বলেছিল, “অনিমেষ পরশুদিন বলেছিল, আজকে বইমেলা গিয়ে দুজনে দুজনকে, প্রিয় সাহিত্যিকের লেখা একটা বই উপহার দেব। এই দেখ, অনিমেষ আমাকে আজ এই বইটা উপহার দিল। আমি ওকে দিয়েছি শীর্ষেন্দুর ঘুণপোকা, দাম সাতটাকা। আমি যদি ওকে বইটা না দিতে পারতাম, যদি বলতাম, আমার পয়সা নেই রে - খুব ভালো দেখাত, মা? আমার তো লাগত না, ও মনে মনে ভাবত – সুনেত্রদের দেখে তো বোঝা যায় না, ওরা এতটা গরিব। ভাবত, আসলে আমার মনটাই ছোট – বন্ধুকে একটা বই কিনে দিতে হবে বলে, সুনেত্র গরিবি কান্না কাঁদছে...”। সুনেত্র পকেট থেকে ন’টা টাকা বের করে মায়ের হাতে দিয়ে বলল, “বইয়ের দাম সাত, যাতায়াতের বাসভাড়া, আর মেলাতে চা-সিঙাড়া খেয়েছিলাম, সব মিলিয়ে এগারোটাকা খরচ হয়েছে, মা”।

সুনেত্রর মাথাটা বুকের মধ্যে নিয়ে মা কেঁদে ফেললেন, সুনেত্রও। সুনেত্রর মাথার ওপর গাল চেপে, মা বললেন, “সুমুটা ভয়ানক হিংসুটে – আজ আরও একবার তার প্রমাণ পেলাম। তুই বেরিয়ে যাওয়ার সময়, আমার দিকে যে তাকিয়েছিলি, তখনই আমার ভুলটা বুঝতে পেরেছিলাম, সুনু...। তুই তো কিছু নিয়ে বায়না করিস না কোনদিন...।  যত ভেবেছি, ততই কেঁদেছি সারাদিন। তুই কাঁদিস না, অভিমান করে থাকিস না...”।

“জামা-কাপড়ের ছাঁট, জুতোর ডিজাইন, চুলের ফ্যাশান নিয়ে বাবাকে কতবার কত চেঁচামেচি করেছে, অপমান করেছে দাদা, সে তুমি জানো না মা? সে এখন আমার আস্পর্ধা দেখছে? আমি কোনদিন কোন বিষয়ে একদিনও তোমাকে বা বাবাকে কিছু বলেছি মা? আমি বুঝি বাবা কত কষ্ট করছেন আমাদের জন্যে...আজ তুমি আমার দেওয়া শাড়িটা, দাদার কথায় – মেঝেয় ছুঁড়ে ফেলে দিলে, মা?”

“ও শাড়ি আমার বুকেই আছে, রাখব সারা জীবন। আর কাঁদিস না, সুনু, বলছি তো ভুল হয়েছে... এবার কিন্তু আমার হাতে মার খাবি...জামাকাপড় ছেড়ে মুখ-হাত ধুয়ে আয়, তোর জন্যে পরোটা আর হালুয়া বানিয়েছি – এখনও গরম আছে...”।

“হালুয়া?” চোখ-টোখ মুছে সুনেত্র হেসে ফেলল। তারপর চেয়ার থেকে উঠতে উঠতে বলল, “আমাকে দেওয়ার সময় বইতে আজকের তারিখটা লিখে সই করে দিয়েছে অনিমেষ – ১০ই মার্চ ১৯৭৯। এই বইটাও আমার কাছে সারাজীবন থাকবে, থাকবে এই দিনের সব স্মৃতিও...সেটা তুমি আমার মন থেকে কিছুতেই মুছতে পারবে না, মা”।

মুখ হাত ধুয়ে, ঘরে পড়ার পাজামা পরে, টেবিলে বসে, সুনেত্র বলল, “খিদে পেয়েছে মা, খাবার কই?” বলতে না বলতেই মা কাঁসার রেকাবিতে পরোটা আর বাটিতে করে হালুয়া এনে দিলেন। ভাজা পরোটার রঙে আর ঘিয়ের গন্ধমাখা হালুয়ার গন্ধে সুনেত্রর খিদেটা চনমনে হয়ে উঠল আরও। পরোটার টুকরো ছিঁড়ে তার মধ্যে একটু হালুয়া তুলে, মুখে তোলার সময়েই সে থমকে গেল, বলল, “মা, দুপুরে তুমি ভাত খেয়েছ?”

“বোঝো, খাবো না কেন? খেয়েছি...তুই শুরু কর আরও আনছি...”।

সুনেত্র রেকাবিতে পরোটার টুকরোটা নামিয়ে রেখে, দৌড়ে গেল রান্নাঘরে। রান্নাঘরের মেঝেয় রাখা ভাতের হাঁড়ির ঢাকনা তুলে দেখল, তরকারির বাটিগুলোর ঢাকনা তুলেও দেখল। দুপুরে মা কিছুই খাননি। সারা দুপুর কেঁদেছেন, খাবেন কখন?

“ও আবার কি, সুনু? বলা নেই কওয়া নেই ভাতের সকড়ি ঘাঁটতে এলি...?”

সুনেত্র মায়ের হাত ধরে মাকে টেনে আনল টেবিলের সামনে। রেকাবি থেকে পরোটার টুকরো তুলে মায়ের মুখের কাছে তুলে বলল, “তুমি না খেলে, আমি খাবো না, মা”।

“আমার আছে, আমি খাবো, খিদে পেয়েছে বলছিলি, তুই খা না”।

“তোমার বড়ো ছেলের মতো আমি চিৎকার করতে পারি না। কিন্তু আমার জিদ কেমন সে তুমি আমার থেকেও ভালো জানো, মা”। মায়ের চোখে চোখ রেখে, খুব গম্ভীর গলায় বলেছিল সুনেত্র। “বড়ো করে হাঁ করো দেখি”।

“আমি কি রাক্ষুসী নাকি, বড়ো করে হাঁ করব?” হাসি হাসি মুখে, হাঁ করেছিলেন মা। সুনেত্র খাইয়ে দিয়েছিল মাকে। তারপর বলেছিল, “এখানে বসো, একগ্রাস নয় – আমার সঙ্গে তোমাকেও খেতে হবে...”।

“কী যে জেদ করিস না...গা জ্বালা করে...” মা বললেন, কিন্তু বাধ্য মেয়ের মতো বসেও পড়লেন সামনের চেয়ারে। দুজনে মিলেই খাওয়া শুরু করলেন। খেতে খেতে মায়ের মনে হল, একই গর্ভে জাত তাঁর দুই সন্তানের আচরণে এত পার্থক্য হয় কী করে? আজ সুনু বেরিয়ে যাওয়ার ঘন্টাখানেক পরে, সুমু চান করে বেরিয়েই মাকে ধমকে বলেছিল, “ভাত দাও মা, আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে...ছোট ছেলের জন্যে কান্নাটা পরে কেঁদো, সারা দুপুর পড়ে আছে...”। মায়ের দু চোখ জলে ভরে উঠেছিল আবার, কী করে তিনি সুমুর কথায়, এত বড়ো আঘাতটা দিতে পারলেন, সুনুকে?

“আবার কাঁদছো কেন, মা? ঈর্ষা ব্যাপারটাতে কোন যুক্তি থাকে না। দাদার থেকে সব ব্যাপারেই আমি যে নীরেস, সবাই জানে...লেখাপড়ায়, বুদ্ধি-শুদ্ধিতে, কথাবার্তায়... তবুও...। কেঁদো না, মা। খাও। বলছিলে আরও পরোটা আছে, নিয়ে এস না, মা”।    

পরের পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১৭ "


নতুন পোস্টগুলি

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩৩

    এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "  অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "...