রবিবার, ২ আগস্ট, ২০২৬

লিলির বিয়ে

 বড়োদের বড়োগল্প - " এক দুগুণে শূণ্য "

বড়োদের ছোট উপন্যাস - " অচিনপুরের বালাই "

বড়োদের ছোট উপন্যাস - " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

বড়োদের নাটক - " চ্যালেঞ্জ - নাটক

    


এর আগের রম্যকথা - " ভাগ্যের পাথর - পর্ব ২ " 

এর আগের বড়োদের গল্প - " মহীরূহ "


 

ছোটকা ছাদে এসেছেন একটা সিগারেট খাবেন বলে। নীচেয় আজ গুরুজনদের সমাবেশ। বৌদি কিংবা বড়দি, ছোড়দিরা ম্যানেজেব্‌ল্‌। কিন্তু দাদা, বড়জাঁইবু ছোটজাঁইবু শুদ্ধ সাত্ত্বিক মানুষ। জীবনে কোনদিন পান-সুপুরিও দাঁতে কাটেননি। সিগারেট-বিড়ি তো তাঁদের কাছে চরম অধঃপতনের সূত্রপাত। তাঁরা যদি ভাইকে কিংবা ছোট শালাকে নাক-মুখ থেকে ফুঁ মেরে ধোঁয়া ছাড়তে দেখেন বা গন্ধ পান – ব্যস্‌। তাঁরা গহন-গম্ভীর হিমালয় হয়ে যাবেন। হিমালয়ের ঝর্ণাগুলোও থমকে থমকে অশ্রু হয়ে নামবে নিঃশব্দে।

কিন্তু ছাদে এসেও শান্তি নেই মনে হচ্ছে। ঠোঁটে সিগারেট নিয়ে ছোটকা সবে দেশলাই জ্বালাতে যাবেন, তাঁর কানে এল ভাইঝি লিলির চাপা কণ্ঠস্বর। লিলি বড়দার একমাত্র কন্যা, ভাল নাম আনন্দিতা। দেশলাই জ্বালালেন না, পাছে লিলির আলাপে বিঘ্ন ঘটে। সন্তর্পণে এগিয়ে গিয়ে দেখলেন, চিলেকোঠা ঘরের বাইরে এককোনায় দাঁড়িয়ে লিলি ফোনে কথা বলছে। পিছন ফিরে থাকায় ছোটকাকে দেখতে পেল না, ছোটকাও দেখা দিলেন না। আড়ালে দাঁড়িয়ে উৎকর্ণ হলেন। ফোনে অন্যপ্রান্তের কথা শুনতে পেলেন না, একা লিলির কথাতেই তিনি মন দিলেন।  

“আজ আমাদের বাড়িতে সবাই আসবে তোকে বলিনি? আজ সকালে তোর ফোন ধরতে পারব না, বলিনি?” “তাহলে? সকাল থেকে তুই চারবার ফোন করেছিস। কেন? কিসের জন্যে?” “দ্যাখ, তোর ওই আদিখ্যেতার কথা অনেক শুনেছি। একই কথা আবার বলার জন্যে কেন ফোন করছিস, বারবার?” “কাল সারারাত তোর ঘুম হয়নি তো আমি কী করব? আমি গিয়ে আম্রুতাঞ্জন মাখিয়ে তোর মাথা টিপে...”। “শোন, ঝাঁপান। সবার আগে একটা চাকরি চাই। মাস-পয়লায় নিয়মিত কিছু টাকার আমদানি চাই। চাল-ডাল-নুন-তেল-গ্যাস চাই”। “আমি চাকরি করছি, তাতে তোর কী? তুই কি আমার ঘাড়ে বসে খাবি নাকি?” “দ্যাখ, মায়েরা ঘর সামলাতেন আর বাবারা রোজগার করতেন সে সব জমানা চলে গেছে”। “হ্যাঁ মায়েরা গৃহিণী – হোম-মেকার হতেন, তো?” “তুই গৃহস্বামী হয়ে ঘর সামলাবি, আর আমি চাকরি করে... বাঃ অ্যাদ্দিনে তোর চরিত্রটা বোঝা গেল। তুই ঢ্যাঁড়স একটা, তুই... তুই বুনো ওল একটা। খেতেও অখাদ্য, তার ওপর গলা চুলকোয়। যাগ্‌গে অনেকক্ষণ হল, ছাদে এসেছি। আমি নীচেয় যাচ্ছি। মা, পিসিমারা সন্দেহ করবেন”।

লিলি ফোনটা কেটে দিয়ে পিছন ফিরতেই ছোটকাকে দেখতে পেল। ধরা পড়ে যাওয়া ফ্যাকাসে মুখে জিগ্‌গেস করল, “ছোটকা, তুমি? কতক্ষণ এসেছ ছাদে”?

ছোটকা খুব শান্তভাবে সিগারেটটা ধরিয়ে, লিলির মুখের দিকে তাকিয়ে জিগ্‌গেস করলেন, “ঝাঁপানের জন্মদিন চৈত্র সংক্রান্তির দিন। তাই না? এই সব ছেলেপুলেরা হয় শিরে-সংক্রান্তি নিয়ে আসে, নয়তো ক্রান্তিকারী হয়ে ওঠে।”

লিলি প্রায় চিৎকার করে বলে উঠল, “ছোটকা তুমি তার মানে সব শুনেছ...এম্মা, আমি নীচেয় যাচ্ছি...মা ডাকছেন”।

ছোটকা গম্ভীর গলায় বললেন, “এখান থেকে এক পা নড়ে দ্যাখ, আগে আমি তোর ঠ্যাং ভাঙবো। বৌদির সঙ্গে বোঝাপড়াটা তার পরে সেরে নেব। কিন্তু ছেলেটি কে?”

“ছেলে কোথায়? ও তো আমার বান্ধবী”।

“বলিস কী? তার মানে সমকামী প্রেম? তোর বান্ধবী তোকে বিয়ে করে, তোর গৃহস্বামী হতে চায়? বয়ফ্রেণ্ড হলে ব্যাপারটা ম্যানেজ করতে আমার অসুবিধে হত না, কিন্তু গার্লফ্রেণ্ড হলে আমাকে অনেক বেশি কাঠ-খড় পোড়াতে হবে, সমাজ এখনও অতটা, বিশেষ করে তোর বাবা-মা, পিসিমারা এখনও অতটা প্রগ্রেসিভ হয়ে উঠতে পারেননি, রে...। যাগ্‌গে গুপ্তকথা যা আছে, এই বেলা বলে ফেল”।

লিলি ছোটকার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। এই মানুষটাকে সে বাবার মতোই শ্রদ্ধা করে, ভালোবাসে কিন্তু ভয় করে না। আশৈশব এই কাকুর কাছে কত যে প্রশ্রয় আর আদর পেয়েছে। এককথায় কাকুই তার হিরো। তার মনে হল, তার পরিবারে কাকুর যে অবস্থান, তাতে এই এক কাকুই তাকে উদ্ধার করতে পারেন এই সঙ্কট থেকে। কাকু এ বাড়িতে সকলের ছোট হলেও, গুরুজনেরা কাকুকে সমীহ করেন, কিছু বললে না করতে পারবেন না কেউই। মেঝেতে পায়ের বুড়ো আঙুল ঘষতে ঘষতে, মুখ নামিয়ে লিলি বলল, “ঝাঁপান আর আমি একই কলেজে পড়ছি। আমার থেকে এক ক্লাসের সিনিয়র”।

“মানে সিনিয়র দিদি?”

“যাঃ, ছেলে... দিদি হবে কেন?”

“অ, তাই বুঝি? একটু আগেই যেন বললি তোর বান্ধবী? আমি কি ভুল শুনলাম”?  সিগারেটটা মেঝেয় ফেলে চটির তলা দিয়ে নিভিয়ে, লিলির মুখের দিকে ছোটকা এমন তাকালেন, লিলির মনে হল তার সামনে উত্তমকুমার দাঁড়িয়ে আছেন। সেই ঠোঁটের কোনে হাল্কা হাসি। সেই চাউনি। ছোটকা জিগ্‌গেস করলেন, “তা, ওই ইয়ে, মানে বুনো ওল বা ঢ্যাঁড়স বা ঝাঁপান, কী করে?”

এবার লিলি নিশ্চিন্তে ছোটকার কাছে আত্মসমর্পণ করে বলল, “ওটাই তো সমস্যা - এমএসসি করে বসে আছে, কোন চাকরি পাচ্ছে না।”

“বলিস কী? ইতিহাসে এমএ করে তুই চাকরি পেয়ে গেলি, আর এদিকে সায়েন্সের এমন দুরবস্থা? কী সাবজেক্ট?”

“কেমিস্ট্রি”।

“কেমিস্ট্রি? আচ্ছা? ভেরিগুড। তা লিলিসোনা তুমি ঝাঁপানের জীবনে কি সত্যিই ঝাঁপ মারতে চাও? নাকি বুনো ওলের মতো তাকে ত্যাগ করতে চাও”। লিলির চোখ ছলছল করে উঠল, কাকুর মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি তো চাই। তিন বচ্ছর হয়ে গেল ও চাকরি পাচ্ছে না, এদিকে বাবা-মা আমার বিয়ের জন্যে তাড়া দিচ্ছেন। ওর কোথাও একটা চাকরি হলে...”।

“হুঁ” বলে ছোটকা হাত বাড়িয়ে লিলির ডান কানটি মলতে মলতে বললেন, “সবই তো বুঝলাম, মা। কথাগুলো এতদিন বলা হয়নি কেন? আমাকে না পারিস, কাকিমাকে বলতে কী হয়েছিল? তাহলে আজকের এই ঝামেলাগুলো পাকতেই দিতাম না। যাগ্‌গে, তোর ওই ঢ্যাঁড়শটিকে বলে দে, একটা সিভি আর সমস্ত সার্টিফিকেটের কপি নিয়ে, আজই বিকেল চারটে-সাড়ে চারটে নাগাদ আমার সঙ্গে যেন দেখা করতে আসে। তুই ফোন করেই নীচেয় আয়, আমি যাচ্ছি”।

ফিক করে হেসে ফেলে লিলি ডান কানে হাত বোলাতে বোলাতে বলল, “কাকু, ওর ভালো নাম ঋচীক, ঝাঁপানটা ডাক নাম। কিন্তু চোত সংক্রান্তিতে ওর জন্ম কী করে জানলে?” ছোটকা কোন উত্তর না দিয়ে উত্তমকুমারসুলভ এক টুকরো হাসি নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নীচেয় নেমে গেলেন।     

 

লিলিদের বাড়িতে আজ এই আত্মীয় সমাগম লিলির কারণেই। বড়দা-বৌদি অর্থাৎ লিলির বাবা-মা আর দেরি না করে, লিলির বিয়ে দিতে চাইছেন। সেই সূত্রেই দু’সপ্তাহ আগে রবিবারের কাগজে “পাত্র চাই” কলামে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছিল। সেই বিজ্ঞাপনের উত্তরে গতকাল অব্দি বাহাত্তরটি উত্তর এসেছে। আজ সকাল থেকে পারিবারিক সমাবেশে তার থেকে মাত্র ছটি বিজ্ঞাপন নির্বাচিত হয়েছে। এবার সেই ছটি চিঠির উত্তর দেওয়া থেকে পরবর্তী সকল কর্মবিধির দায়িত্ব ন্যস্ত হয়েছে সুতো অর্থাৎ সুতীর্থর ওপর। এই সুতীর্থই লিলির প্রিয় ছোটকা। কেমিস্ট্রির নামকরা অধ্যাপক, রাসায়নিক শিল্পজগতের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ রসায়ন।

 

মধ্যাহ্ন ভোজের সময় দুই ভাই এবং দুই ভগ্নীপতি একত্রে খেতে বসেছিলেন। মেয়েরা বসবেন পরে। আহারের শেষ পর্বে বড়ো জাঁইবাবু বললেন, “সামনের বোশেখেই দিনস্থির করে ফেলুন, দাদা। সেই সুতোর বিয়ের পর অনেকদিন এ বাড়িতে কোন শুভকাজ হয়নি”।

অমায়িক বড়দা বললেন, “তোমরা সবাই সঙ্গে থাকলে আমার আর ভাবনা কি?”

সুতো চাটনির বাটি চাঁটতে চাঁটতে বলল, “জাঁইবু, বাহাত্তরটি থেকে ছটি ছেলেকে আমরা শর্ট-লিস্ট করলাম ঠিকই, কিন্তু মন থেকে যেন সায় পাচ্ছি না। চেনা নেই, জানা নেই, আজকাল কতরকমের অঘটন হচ্ছে, ভয় লাগে খুব”।

“সে কথা তো একশবার, লিলির এমন কিছু বয়সও হয়নি। চাকরি করছে। সবদিক বিবেচনার জন্যে আরেকটু সময় আমরা নিতেই পারি”। ছোটজাঁইবু সুতোকে সমর্থনই করলেন।

সুতো বললেন, “আমাদের পরিচিত-পরিজনদের মধ্যে ভালো ছেলে কী পাওয়া যাবে না, দাদা?”

লিলির পিতৃদেব বললেন, “দেখ, না। দেখতে তো ক্ষতি নেই কোন।” সুতো বললেন, “তাহলে এই ছটি ছেলেকে আমি সাত-দশ দিনের জন্যে হোল্ডে রাখছি, দেখা যাক এর মধ্যে কিছু ঘটে কিনা”। সকলেই সম্মত হলেন, এবং আহার পর্ব সমাধা করে, লিলির পিতৃদেব বললেন, “বেলা হল অনেক, মেয়েরা এবার বসে যাও”।

 

চারটে পনেরোতে লিলির ফোনটা বেজে উঠতেই, লিলি কাকিমাকে বলল, “এসে গেছে, কাকিমা”। লিলি কাকু-কাকিমার ঘরেই ছিল। কাকু গম্ভীর হয়ে বললেন, “যা গিয়ে নিয়ে আয়। কিন্তু একটা কথা আমি যখন আলাপ করব, কেউ কোন কথা বলতে পারবে না, লিলিও না। ফিচ-ফিচ নাকে কান্না একদম বরদাস্ত করব না”। লিলি দৌড়ে নীচে গিয়ে, সন্তর্পণে কাকুর ঘরে নিয়ে এল ঝাঁপানকে।

একটু নার্ভাস, তবে মোটামুটি সপ্রতিভ ছেলেটিকে কাকুর ভালই লাগল। ঝাঁপান কাকু ও কাকিমাকে প্রণাম করে দাঁড়িয়ে রইল চুপটি করে। লিলি গিয়ে বসল কাকিমার পাশে। কাকু গম্ভীর গলায় বললেন, “তোমার সিভি আর সার্টিফিকেটগুলো এনেছ?” ঝাঁপান হাত বাড়িয়ে এগিয়ে দিল কাগজগুলো। কাকু মন দিয়ে দেখলেন তারপর বললেন, “তোমাকে ঠিকানা দিয়ে একজনের কাছে পাঠাবো। আগামীকাল সাড়ে এগারোটা নাগাদ। আশা করি চাকরিটা তোমার হয়ে যাবে”।

মাখোমাখো গলায় ঝাঁপান বলল, “থ্যাংকিউ স্যার, আপনার এই ঋণ শোধ করা যাবে না...অনেক অনেক থ্যাংকিউ”।

উদাস চোখে ঝাঁপানের দিকে তাকিয়ে বললেন, “উঁহুঁ, ঋণ শোধ করা যাবে না, এমন নয় – এটুকু ঋণ শোধের অনেক উপায় আছে”।

ঝাঁপান কিছু বলল না। অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল ছোটকার দিকে।

ছোটকা গম্ভীর গলায় বললেন, “ছোট্ট একটা শর্ত। চাকরিটি পেয়ে আমার এই ভাইঝিটির সঙ্গে তোমার সব সম্পর্ক ত্যাগ করতে হবে - ব্যস্‌ তাহলেই তোমার ঋণ শোধ”। কাকুর কথায় কাকিমা এবং লিলি চমকে গেল। কিন্তু কিছু বলা যাবে না, কাকু আগেই বলে দিয়েছিলেন।

কাকু আবার বললেন, “লিলির বিয়ের কথাবার্তা মোটামুটি পাকা হয়ে গেছে। হয়তো সামনের বোশেখেই...খুব ভালো ছেলে, দুর্দান্ত কেরিয়ার। সে পাত্রটিকে আমরা কোনভাবেই হাতছাড়া করতে চাই না”।

কাকু লক্ষ্য করলেন, ঝাঁপানের মুখ বিষণ্ণ হয়ে উঠল। কিছুক্ষণ পরে উত্তর দিল, “তাহলে স্যার, আপনার দেওয়া চাকরিটি আমি চাই না”।

কাকু রেগে গিয়ে সোজা হয়ে বসলেন, কর্কশ কাকের কণ্ঠে বললেন, “তুমি জান, তুমি কী বলছো? একটি মেয়ের জন্যে নিজের জীবনটাকে শেষ করে দিতে চাও”? কাকু এখন আর উত্তমকুমার নন, যেন কমল মিত্র।

ঝাঁপান ম্লান মুখে গভীর আবেগের সঙ্গে বলল, “লিলিকে না পেলে শুধু আমার জীবন নয়, আমার বাবা-মার জীবনগুলিও ধূলি হয়ে যাবে, স্যার”। স্তম্ভিত হয়ে কাকু ঝাঁপানের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন, ঝাঁপান আবার বলল, “আগামীকাল সকাল দশটায় আর দুপুর আড়াইটেতে দুটো ইন্টারভিউ আছে, একটা না একটা লেগে যাবেই, স্যার। তারপরে আমি আবার আসব। আমার বাবা-মাও আসবেন স্যার”।

কাকু কমল মিত্রর মতোই বললেন, “এর আগে কটা ইন্টারভিউ দিয়েছ?  সেগুলোর মতো এ দুটোও যদি না হয়?” ঝাঁপান উত্তর দিল, “তা হোক স্যার। কিন্তু লিলির বিনিময়ে কোন চাকরিই আমি নিতে পারব না”। ঝাঁপান কাগজপত্র গুছিয়ে নিয়ে হাত তুলে নমস্কার করে বলল, “আসছি, স্যার”।

কাকু কিছু বললেন না, ঝাঁপান পিছন ফিরে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। কাকু কাকিমা আর লিলির অবাক স্তম্ভিত মুখের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন। তারপর বললেন, “ওহে বুনো ওল ঝাঁপানচন্দ্র, চললে কোথায়?”

ঝাঁপান অবাক হয়ে কাকুর মুখের দিকে ফিরে তাকাল। কাকুর মুখে আশ্চর্য হাসি, বললেন, “রাগ করে চললে কোথায়? বসো, বসো, সেই থেকে তো দাঁড়িয়েই রইলে”। ঝাঁপান অত্যন্ত সংকোচের সঙ্গে বিস্মিত মুখে চেয়ারে বসল, তার নিতম্বের অতি সামান্য অংশই চেয়ারে ঠেকে রইল, অধিকাংশই ঝুলে রইল বাইরে। কাকু বললেন, “আচ্ছা, তোমার ওই ঝাঁপান নামটা কে রেখেছিলেন বলো তো?”

ঝাঁপান আরো বিব্রত হয়ে বলল, “আমার ঠাকুমা, স্যার। চৈত্র সংক্রান্তির দিন জন্মেছিলাম। আমাদের ওদিকে ঝাঁপান বলে, এদিকে বলে গাজন”।

কাকু আবার চোখ ছোট করে মুখ কুঁচকে বললেন, ““আনন্দিতা ওয়েড্‌স্‌ ঝাঁপান”, তোমাদের বিয়েতে এরকম একটা ব্যানার ঝোলালে, লোকের মধ্যে কী রকম প্রতিক্রিয়া হবে, বুঝতে পারছো? যাদের নিমন্ত্রণ নেই, সেই সব উটকো লোকেই বাড়ি ভরে উঠবে”।

ঝাঁপান এবং লিলি দুজনেই অভিভূত। লিলি মুখ লুকোলো কাকিমার পিঠে। কাকিমা লিলিকে টেনে নিলেন বুকে। ঝাঁপান কিছুক্ষণ সময় নিল নিজেকে সামলাতে, তারপর বলল, “আমার ভালো নাম স্যার ঋচীক”।

কাকু স্মিত মুখে বললেন, “আই নো, ঝাঁপান। তোমার সিভি, সার্টিফিকেট দেখেছি। সকালে লিলিও বলেছিল। বাট আই লাইক ঝাঁপান। একটা ইন্ডিজেনাস উৎসবের স্মৃতি। একটা অরিজিনাল নাম”। কাকু ঝাঁপানের থেকে সিভিটা আরেকবার নিয়ে, তার ওপরে অফিসের নাম ঠিকানা লিখে, সই করে দিলেন। তারপর বললেন, “এই অফিসে গিয়ে এটা দেখাবে। তারপর কী হয় লিলিকে জানাবে, আমি জেনে যাব”।   

--00--

 

                              


শনিবার, ১ আগস্ট, ২০২৬

শুধু _তুই .কম - পর্ব ১৭

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

এই উপন্যাসের শুরু - " @শুধু _তুই .কম - পর্ব ১



এর আগের পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১৬ 



১৭

 মায়ের মুম্বাই-বাস তখন কুড়ি দিনে পরেছে। অন্য দিনের মতো সেদিনও ডিউটিতে গিয়েছিল সুনেত্র। সকাল নটায় হসপিটালে পৌঁছে বেলা একটা দেড়টা পর্যন্ত হাঁফ ফেলার সময় পায় না সে। ওয়ার্ডের ভিজিট সেরে আউটডোরের পেশেন্ট দেখা। যেদিন ওটি থাকে সেদিন আরও দেরি হয়।  

দেড়টা নাগাদ নিজের চেম্বারে এসে বসতেই নিবারণ এক কাপ কফি আর দুটো ক্রিমক্র্যাকার বিস্কুট দিয়ে গেল টেবিলে। কফি খেতে খেতে লক্ষ্য করল তার সামনেই গুচ্ছের খাম রাখা আছে। অধিকাংশই আজে-বাজে মার্কেটিংয়ের চিঠি। কিছু থাকে দিল্লি বা মুম্বাইয়ের কর্পোরেট অফিসের চিঠি। খামগুলো দেখতে দেখতে তার হাতে এল, তার নিজের হাতে ঠিকানা লেখা, হলুদ একটা খাম। মায়ের চিঠি। সুনেত্রর শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে এল শীতল স্রোত।

দ্রুত হাতে খামটা ছিঁড়ে পড়ে ফেলল চিঠিটা, মায়ের হাতে লেখা দু লাইন...

“সুনু,

এখানে থাকতে আমার আর একদণ্ডও ভালো লাগছে না। তুই এসে আমাকে নিয়ে যা।

ইতি আশীর্বাদিকা মা”।

মা কোন তারিখ লেখেননি। খামটা নিয়ে পোস্ট অফিসের ছাপমারা গোল স্ট্যাম্পটা পড়তে চেষ্টা করল, খুবই অস্পষ্ট - মনে হচ্ছে পাঁচদিন আগে বান্দ্রার পোস্টঅফিস থেকে রওনা হয়েছে। খোলা চিঠিটা পেপার ওয়েটে চাপা দিয়ে কফিটা শেষ করল, সুনেত্র। কিছুক্ষণ চিন্তা করল, তারপর ইন্টার কমে ফোন করল এইচ-আর ডিপার্টমেন্টে।

“গুড আফটারনুন, স্যার। মিতালি স্পিকিং”।

“মিতালি, আমার একটু ইমার্জেন্সি হয়ে গেছে – কাল থেকে চার-পাঁচদিনের জন্যে আমি ছুটি নেব”।

“কী হয়েছে, স্যার? এনি মিসহ্যাপ?” মিতালির কন্ঠে প্রফেসনাল উদ্বেগ।

“মিসহ্যাপ ঠিক নয়...কাল ভোরের ফ্লাইটে মুম্বাই যেতে হবে। আই নিড লট অফ হেল্প ফ্রম ইউ”।

“কী করতে হবে, স্যার”।

“আজ রাত্রে কলকাতার গেস্ট হাউসে আমার জন্যে একটা রুম বুক করতে হবে। কলকাতা-মুম্বাইয়ের একটা ভোরের ফ্লাইট বুক করতে হবে কালকের জন্যে। ওই সঙ্গে লাগবে ভোরে গেস্টহাউস থেকে দমদম যাওয়ার জন্যে একটা গাড়ি – ফ্লাইটের শিডিউল অনুযায়ী”।   

“হয়ে যাবে, স্যার। আর কিছু?”

“মুম্বাই এয়ারপোর্টে আমাকে রিসিভ করার জন্যে একটা গাড়ির বুকিং – গাড়িটা আমার সঙ্গেই সারাদিন থাকবে”।

“হুঁ, হুঁ”।

“আমাদের মুম্বাই গেস্ট-হাউসে আমার জন্যে একটা রুম বুক করতে হবে – আমার মাও আমার সঙ্গে থাকতে পারেন”।

“ওকে”।

“আপাতত এইটুকুই, মিতালি। মুম্বাইতে মায়ের সঙ্গে দেখা হলে পরের শিডিউল ঠিক করব”।

“আজ সন্ধেয় কলকাতা যাবার গাড়ি লাগবে না, স্যার?”

“ও ইয়েস। ভুলেই গেছিলাম। গাড়ি একটা তো লাগবেই, মিতালি। থ্যাংকিউ ভেরিমাচ”।

“মোস্ট ওয়েলকাম, স্যার। মাসিমার শরীর কি খুব খারাপ স্যার?”

“বুঝতে পারছি না, মিতালি। এইমাত্র মায়ের একটা চিঠি পেলাম, খুব ডিস্টার্বিং। ছেলেমেয়েদের কাছে নিজের শরীর খারাপের কথা, মায়েরা সহজে ডিসক্লোজ করতে চান না... ”।

“আপনি চিন্তা করবেন না, স্যার, উনি তাড়াতাড়িই সেরে উঠবেন। বুকিংগুলো সেরে আমি আপনাকে ফিড-ব্যাক দিতে থাকব, স্যার, ডোন্ট ওরি”।

ফোন রেখে কিছুক্ষণ চিন্তা করল, সুনেত্র। মায়ের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর, অবস্থা বুঝে, মুম্বাই ব্র্যাঞ্চে মায়ের হেলথ চেক-আপটাও করিয়ে নেবে...। তারপর সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে – মাকে নিয়ে কবে ফেরা সম্ভব। প্রয়োজন হলে ওখানকার গেস্ট হাউসে কয়েকটাদিন থেকেও যেতে পারে দুজনে।  

 মিতালির নিপুণ ব্যবস্থাপনায় সুনেত্র বান্দ্রায় দাদার ফ্ল্যাটে পৌঁছে গেল সকাল নটা-কুড়ি নাগাদ। বেল বাজাতে দরজা খুলল বৌদি – এবং তাকে দেখেই বলে উঠল, “বাব্বা, আজকে কোনদিকে সূর্য উঠল, এতদিন ডেকে ডেকেও যার দেখা পাওয়া যায়নি...আজ সে একবারে স্বয়ং উপস্থিত?”।

“দাদা কোথায়? অফিসে বেরিয়ে গিয়েছে, নাকি?”

“না গো স্নান করছে”।

“টুটুল আর ডলি?” সুনেত্রর ভাইপো, ভাইঝির নাম।

“ওরা এই তো একটু আগে স্কুলে বেরিয়ে গেল। ওদের একেবারে ঘড়ি ধরা, ইন্টার ন্যাশানাল স্কুল তো...”।

ভেতরের ঘর থেকে খুব দুর্বল পায়ে বেরিয়ে এলেন, মা, “বৌমা, সুনুর গলা পেলাম মনে হল?”

“বুড়ির কান দেখেছ? ভেতরের ঘর থেকেও তোমার গলা ঠিক শুনতে পেয়েছে?”।

সুনেত্র মনে মনে বিরক্ত হল। ছেলেরা প্রৌঢ় হয়ে উঠলে, বাবা-মায়ের বুড়ো-বুড়ি না হয়ে অন্য উপায় থাকে কি? সেটাকে চোখে আঙুল ঢুকিয়ে দেখানোর দরকার কি? সোফা থেকে উঠে এগিয়ে গিয়ে মাকে প্রণাম করল সুনেত্র, বলল, “এতটা দুর্বল হয়ে গেলে কী করে, মা? শরীর খারাপ হয়েছিল নাকি?” মায়ের হাত ধরে সুনেত্র সোফার দিকে এগোতে এগোতে অনুভব করল, মাত্র এই কুড়ি দিনে, মা সত্যি সত্যি একটু বেশিই বুড়িয়ে গেছেন। সুনেত্র লক্ষ্য করল, মায়ের হাত ধরে নিয়ে আসায় বৌদির মুখের সাজানো হাসিটা আর নেই, বরং তার দু চোখে একটা বার্তা সে পরিষ্কার পড়তে পারল, “আদিখ্যেতা”।  

সোফায় মাকে বসিয়ে সুনেত্র বলল, “তুমি চটপট ব্যাগ-ট্যাগ গুছিয়ে নাও, মা আজ এখনই তোমায় নিয়ে যাবো”।

“তার মানে?” বৌদি বলে উঠল।

“এতদিন মুম্বাইতে থেকে বাংলাটা কি একেবারেই ভুলে গেছ?” সামান্য শ্লেষ মিশিয়ে উত্তর দিল সুনেত্র।

স্নান সেরে ফিট-ফাট সায়েব হয়ে দাদা বেরিয়ে এল হলে। সুনেত্রকে দেখেই বলে উঠল, “কীরে তুই, একেবারে হঠাৎ?”

“হ্যাঁ দাদা। মাকে দেখতে এসেছিলাম, লক্ষণ দেখে খুব ভালো বুঝছি না মায়ের শরীরটা। আমাদের হসপিট্যালে একবার থরো চেক আপ করিয়ে, মাকে আজ নিয়ে যাবো”।

“নিয়ে যাবি মানে? এতদিন পরে এত খরচ করে মাকে নিয়ে এলাম। বলা নেই কওয়া নেই, এসেই বলছিস তুই মাকে নিয়ে যাবি?”

থমথমে মুখে বৌদি উঠে গেল, বোধহয় কিচেনে, দাদার ব্রেকফাস্ট রেডি করতে।

সুনেত্র দাদার চোখে চোখ রেখে, খুব শান্তভাবে কাটা কাটা কথায় উত্তর দিল, “আমি মাকে নিয়ে যাব, দাদা। তুই অনেক খরচ করে মাকে নিয়ে এসেছিলি, কিন্তু মা অসুস্থ হয়ে পড়লে তোর আরও বেশি খরচ হয়ে যাবে দাদা। সেটা বোঝার চেষ্টা কর”।

“কী করে বুঝলি, তুই – মা অসুস্থ?”

“আমি নাড়ি-টেপা ডাক্তার দাদা, তোমার মতো ব্রিলিয়ান্ট ইঞ্জিনিয়ার নই। তোমার বিষয়ে আমি কোনদিন নাক গলাইনি, আমার বিষয়েও তুমি নাক গলিও না”।

সুমিত্র একটু অবাক হল, মুখচোরা ভীতু ভীতু ভাইটা আজ তার মুখে মুখে কাটা কাটা এমন জবাব দিচ্ছে!

“মা কি বলেছে তোর সঙ্গে আজই যাবে? নাতি নাতনীদের সঙ্গে দেখা না করে”? সুমিত্র বলল।

এতক্ষণ মা চুপ করে বসে, দুই ভাইয়ের কথোপকথন শুনছিলেন, এখন বললেন, “চলেই যাই, বুঝলি সুমু। তোদের এত আদর-যত্ন সত্ত্বেও, কদিন ধরেই শরীরে তেমন বল পাচ্ছি না। আমরা কোনদিনই বসে খাওয়ার মানুষ নই, বাবা। সারাদিনে কোন কাজ করতে না পারলে শরীর-মন হাঁফিয়ে ওঠে”।

একটু থেমে আবার বললেন, “তোর মনে আছে, সুমু তুই তখন সবে কলেজে ঢুকেছিস, আর সুনুটা তখন সেভেনে উঠেছে। কী একটা নার্ভের অসুখে আমি প্রায় আড়াই মাস শয্যাশায়ী ছিলাম। তার আগে এমন কোনদিন হয়নি – আমাদের তখন একজন কাজের লোক রাখারও সাধ্য ছিল না। একা হাতে রান্না-বান্না, কাচাকাচি, ঘর-দোর ঝাঁট দেওয়া – সব কাজই সারতাম। ওই সময়ে, ওইটুকু বয়সে সুনু যে কী ভীষণ দায়িত্ব নিয়েছিল – আমাকে জিজ্ঞেস করে করে উনোন ধরাত, কুটনো কাটত, বাঁটনা বাঁটত, রান্না-বান্না করত... কিছুদিনের মধ্যে সব শিখে নিয়ে – একাই করত, করতে পারত সবকিছু...। এই নিয়ে তুই ওকে “মেয়েলি” বলতিস, মনে আছে? আর তুই? একদিন তোর জামা-কাপড় কাচতে দেরি হয়ে গেলে কী কাণ্ডটাই না করতিস – চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় করে, পাড়ার লোক জড়ো করতিস”।

ক্রূর চোখে সুমিত্র মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “এতদিন পরে এসব কথা কেন, মা?”

মা ম্লান হাসি মুখে বললেন, “তোদের এখানে সারাদিন আমার কোন কাজ নেই, তোদের উপদেশ শোনা ছাড়া। তোদের ইংরিজিতে সেই একটা কথাটা আছে না... আইড্‌ল্‌ ব্রেন ইজ ডেভিলস্‌ ওয়ার্কশপ – সারাদিন বসে বসে কত কথাই মনে পড়ে – আমার জগৎটা তো ছিল তোদের দুজন আর তোদের বাবাকে ঘিরেই ... আমার স্মৃতি বলতে ওই কথাগুলোই”।

দাদা গুম হয়ে গেল, বিরক্ত মুখে চেঁচিয়ে উঠিল, “পনের মিনিট হয়ে গেল বসে আছি, এখনও তোমাদের ব্রেকফাস্ট রেডি হল না? এতগুলো লোক আমার ঘাড়ে চেপে কী করছোটা কি?”

মা সুনেত্রকে বলল, “আমি রেডি হয়ে এখনই আসছি, সুনু – তুই একটু বস”।  

সুনেত্র আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করল, মা বেশ দ্রুত স্বাভাবিক পায়েই ভেতরের ঘরের দিকে গেলেন। এই কয়েক মিনিটের মধ্যেই এতটা পরিবর্তন। ডাক্তারি শাস্ত্র বলে, মানুষের মন তার শরীরকে প্রবলভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। আজ তার আরেকটা অকাট্য প্রমাণ পেল সুনেত্র। তাকে চিঠি লেখার পর থেকেই মা প্রচণ্ড দুশ্চিন্তায় ছিলেন, তিনি জানতেন সুনু চিঠি পেয়েই দৌড়ে আসবে, আর আজ সকালে সুনুর গলা পেতেই তাঁর মনে হয়েছে – না জানি আজ আমাকে নিয়ে দুই ভাইয়ের মধ্যে কোন শুম্ভ-নিশুম্ভের যুদ্ধ বেধে যায়। প্রবল উদ্বেগ, আর মানসিক দ্বন্দ্বের কারণেই, মায়ের অমন জবুথবু অবস্থা হয়েছিল। সুনেত্র অনেকটা নিশ্চিন্ত হল – মায়ের শরীর, বলতে নেই, মনে হচ্ছে ভালই আছে, ভাল ছিল না তাঁর মনটা। এ বাড়ি থেকে বেরোলেই সেটাও সামলে নিতে মায়ের অসুবিধে হবে না।

একজন মহিলাকে, মুম্বাইতে ওঁদের বাই বলে, বোধ হয়, সঙ্গে নিয়ে বৌদি ডাইনিং টেবিলে এল, বলল, “একটুতেই অমন বাড়ি মাথায় তোল কেন, চেঁচিয়ে? চলে এস...সুনু, তুমিও দাদার সঙ্গে ব্রেকফাস্ট সেরে নাও, সেই কোন ভোরে কলকাতা থেকে রওনা হয়েছ...”

দুজনেই উঠে গিয়ে টেবিলের দুদিকে বসল, দূরত্ব অনেকটাই।

সুনেত্র বলল, “বৌদি, আমি শুধু চা খাবো এক কাপ, টোস্ট খেতে ঠিক ইচ্ছে হচ্ছে না, ফ্লাইটে একটা স্যাণ্ডউইচ খেয়েছিলাম...ভালো নয় তেমন, পেটটা কেমন যেন ভার-ভার...”।

“শুধু চা খাবে? সঙ্গে অন্ততঃ একটা অমলেট খাও, কিচ্ছু হবে না, ডাক্তার মানুষ, দরকার হলে, একটা অ্যান্টাসিড খেয়ে নিও”।

সুনেত্র হেসে বলল, “তথাস্তু, কিন্তু আমার অমলেটের জন্যে দাদার আবার লেট না হয়ে যায়”। কড়া চোখে একবার তাকাল সুমিত্র, ভাইয়ের দিকে। হতভাগা আজ একটার পর একটা বাউন্সার ছেড়ে যাচ্ছে...। অবশ্য মায়ের চলে যাওয়াতে সে অনেকটা স্বস্তিও বোধ করছিল। মায়ের বয়েস হয়েছে, শরীর দুর্বল হয়েছে, এখানে হঠাৎ কিছু একটা ঘটে গেলে জলের মতো বয়ে যাবে টাকা। তার ওপর ডাক্তার, হসপিট্যাল, দৌড়োদৌড়ি – তার চেয়ে সুনু নিয়ে যাচ্ছে...একদিক থেকে ভালই। তবে মা আর সুনু মিলে আজ যেভাবে তার সঙ্গে কথা বলছে, তাতে অমিয়া (সুমুর ওয়াইফ) বহুদিন কথা শোনাবে। বলবে, আমাদের ওপর তোমার যত চোটপাট, ভাই আর মা মিলে দিল তো মুখে ঝামা ঘষে...?

সুনেত্রদের ব্রেকফাস্ট শেষ হওয়ার আগেই মা বেরিয়ে এলেন। হাতে ব্যাগ নিয়ে। সুনেত্রর চেয়ারের পিঠে হাত রেখে বললেন, “চলি রে, সুমু। চলি গো বৌমা, এ কদিন যা কষ্ট দিলাম তোমাদের...”

অমিয়া বলল, “স্কুল থেকে ফিরে টুটুল আর ডলি কিন্তু খুব আপসেট হয়ে পড়বে, মা। হঠাৎ করে এমন চলে যাচ্ছেন”।

মা হেসে বললেন, “এত বছর পেরিয়ে গেল - কবে কোথায় কিসের সেটিং হয়েছিল, বৌমা? ওদের কাছে ওটুকু আপসেট জলের আলপনা – নিমেষে মিলিয়ে যাবে”।

সুমিত্র তো বটেই, সুনেত্রও অবাক হল মায়ের এই নিখুঁত ও স্পষ্ট উত্তরে। সুনেত্র বুঝল, এ কদিন মায়ের ওপর অনেক মানসিক অত্যাচার করেছে, দাদা-বৌদি। মায়ের মনে জমে উঠেছিল অসহ্য রাগ আর ক্ষোভ। আজ সুনেত্র আসায়, সেই ক্ষোভেরই বিস্ফোরণ ঘটছে বারবার।

চা খাওয়া শেষ করেই সুনেত্র উঠে দাঁড়াল, বলল, “তাহলে চলি, দাদা? চলি গো বৌদি”।

“কী আর বলব?” বলে বৌদি এগিয়ে এসে মাকে প্রণাম করল। দাদা তখনো চায়ের কাপে নিশ্চিন্তে চুমুক দিয়ে চলেছে, উঠে দাঁড়ালোও না একবার। সুনেত্র মায়ের ব্যাগটা হাতে নিয়ে দরজার দিকে এগোলো।

“আমার আরেকটা গাড়ি আছে, তোদের কি ছেড়ে দিয়ে আসবে?” দাদা হঠাৎ বলে উঠলো।

“না, দাদা, নীচেয় আমার অফিসের গাড়ি ওয়েট করছে, জীতেশজি আজ সারাদিনই আমার সঙ্গে থাকবে। আসছি রে”।

 ওখান থেকে বেরিয়ে সুনেত্র সোজা গেল ওদের গেস্ট হাউসে। মাকে বলল, “চান-টান সেরে ফ্রেশ হয়ে নাও মা, ব্রেকফাস্ট করে আমরা বেরোব...”।

দরজাটা চেপে দিয়ে সুনেত্র ঘরের বাইরে এল গেস্ট হাউসের করিডরে। অনেকক্ষণ সিগারেট খাওয়া হয়নি, রিসেপশনের চেয়ারে বসে আরামে একটা সিগারেট ধরাল। তারপর চিন্তা করতে লাগল, একটু আগের স্থান-কাল-পাত্রদের কথা। বাইশ তলা অ্যাপার্টমেন্টের চোদ্দ তলার ফ্ল্যাটে দাদার অবস্থানটি। লিভিং এরিয়া আর ডাইনিং হল দেখেই ফ্ল্যাটের সাইজ কিছুটা টের পাওয়া যায়। ধরে নেওয়া যায়, কম করে তিনটে বেডরুম উইথ অ্যাটাচ্‌ড্‌ বাথ। অন্ততঃ একটা ব্যালকনিও থাকবেই! সব মিলিয়ে তেইশ শ/চব্বিশ শ স্কোয়ার ফুটের ফ্ল্যাট। মুম্বাইয়ের বান্দ্রা অঞ্চলে এই ফ্ল্যাটের কত দাম হতে পারে – তার ধারণা নেই – তবে ছ-সাত কোটির নীচে হবে বলে মনে হয় না। তার ওপর দুখানা গাড়ি – একটা হতে পারে অফিসের, অন্যটা পার্সোনাল। কত টাকা মাইনে পায়, দাদা? আর এই টাকার কতটুকু সাদা আর কতটাই বা কালো...?

 মা রেডি হয়ে যেতেই, সুনেত্রও ফ্রেশ হয়ে নিল তাড়াতাড়ি। পুরি-ডাল আর সবজি দিয়ে নিরামিষ ব্রেকফাস্ট সেরে দুজনে বেরোল হসপিট্যালে। ডাঃ রঞ্জন মোহতাকে আগেই বলা ছিল, মাকে নিয়ে সোজা ঢুকে পড়ল তাঁর চেম্বারে। এই ডাঃ মোহতা আর সে সমবয়সী, এক সঙ্গে কাজ করেছে দিল্লিতে। সে সময়ে মায়ের সঙ্গেও তার ভালই পরিচয় ছিল। খুব মন দিয়ে দীর্ঘ সময় নিয়ে চেক আপ করল মাকে। তারপর বলল, “অ্যাজ সাচ আন্টিকা মেজর কোই হেল্‌থ্‌ প্রবলেম নেহি হ্যায় সুনেত্র, শি ইজ ফাইন। বাট আই থিংক শি ইজ এ বিট ডিপ্রেস্‌ড্‌ মেন্টালি। নাথিং টু ওরি। ইয়েস ইয়েস, আন্টি কো লেকে আজই আরাম সে কলকাত্তা রিটার্ন কর সকতা হ্যায়”।

সুনেত্র বলল, “ওকে, থ্যাংকিউ রঞ্জন। লেকিন মুম্বই-কলকাতাকা ইভনিং ফ্লাইট আকসার বহোত লেট করতি হ্যায়। আই উইল নট গোয়িং টু টেক এনি রিস্ক – ইট উইল বি মাচ বেটার টু ফ্লাই টুমরো আর্লি মর্নিং”।

“ইয়েস, ইট উইল বি, সুনেত্র”।   

ডাঃ মোহতার চেম্বার থেকেই সুনেত্র এইচ-আর ডিপার্টমেন্টে ফোন করে, বলে দিল আগামীকাল আর্লিং মর্নিংয়ের কলকাতা ফ্লাইটের দুটো টিকিট – আর তাদের কলকাতা গেস্ট হাউসে একটা রুম বুক করতে।

 অবশেষে পরের দিন বেলা দেড়টা নাগাদ মাকে নিয়ে ঘরে ফিরল সুনেত্র। মিতালিকে বলে রেখেছিল, তাকে নিতে পরেশ যখন রওনা হবে, একবার তার কোয়ার্টার হয়ে শম্পাদিদিকে যেন বলে দেয় – মাকে নিয়ে সুনেত্র আজ দুপুরে ফিরছে। মিতালি তার কর্তব্যে কোন ত্রুটি রাখেনি।

মাকে দেখে শম্পাদিদি মুখ ফুটে কিছু বলতে পারেনি, কিন্তু তার উজ্জ্বল খুশিমাখা মুখের নীরব কথাটুকু বুঝতে এতটুকুও ভুল হয়নি, তার মা এবং সুনেত্রর। মাও নিজের ক্ষুদ্র এই রাজ্যে ফিরে এসে যে স্বস্তি ও শান্তি ফিরে পেলেন, দাদার বৃহৎ সাম্রাজ্য তাঁর কাছে হয়ে উঠল অতীব তুচ্ছ।

পরের পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১৮ "


বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/৪

 এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১


  আগের পর্ব - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/৩ "


  তৃতীয় স্কন্ধ - পর্ব ৪

জগতের কাল ও যুগ তত্ত্ব

শ্রীমৈত্রেয় বললেন, “ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ ও ব্যোম - সৃষ্টির শুরুতে এই পাঁচবস্তুর উৎপন্ন হয়, এদেরকে কার্য্য বলে। এই কার্যের যে ক্ষুদ্রতম অংশ, যাকে আর ভাগ করা যায় না, তাকে পরমাণু বলেপরমাণুকে চোখে দেখতে পাওয়া যায় না, কিন্তু এর অস্তিত্ব অনুমানে বুঝতে পারা যায়। পরমাণু যখন একক অবস্থায় থাকে, তখন তার কোন কার্য্য অবস্থা নিরূপণ করা যায় না। অনেক পরমাণু্র সমষ্টিতে বস্তু গড়ে ওঠে, তখন সকল বস্তুকেই আলাদা মনে হয়। কিন্তু সকল বস্তুরই পরমাণু ধর্ম একঅতএব পরমাণু সমস্ত ভূতের সূক্ষ্মরূপ এবং বস্তু স্থূলরূপ। প্রলয়ের আগে,  সকল বস্তু নিজ নিজ বৈশিষ্টের মধ্যে থাকে। কিন্তু প্রলয়কালে বস্তুর সকল বৈশিষ্ট্য বিনাশ হয় এবং সমস্ত ব্রহ্মাণ্ড একই পরমাণু রূপে সমাহিত হয়। এই ধারণাকে বলা হয় পরমমহৎ পরিমাণ

[এই পর্যন্ত পড়ে মনে হয় সরল বাংলায় ফিজিক্সের অ্যাটমিক তত্ত্ব পড়ছি। এবং "পরমমহৎ পরিমাণ" তত্ত্বটিতে কালা-গহ্বর তত্ত্বের গন্ধও কিছুটা যেন পাওয়া যায়। মনে হয় আমাদের ঋষিরা যদি আরও গভীরে গিয়ে আরও চিন্তাভাবনা করতেন, তাহলে আমরা হয়তো পদার্থবিদ্যার জনক হতে পারতাম। কিন্তু তা হবার নয় - এই পর্যায়ে প্রবেশ ঘটে গেল ঈশ্বরের - এবং সমস্ত বিষয়টা ভক্তিরসে বেপথু হয়ে ধর্মতত্ত্বের পথে মোড় নিল।]                  

একই ভাবে কালেরও সূক্ষ্ম ও স্থূলরূপ দুইই অনুমান করা হয়। কাল শ্রীনারায়ণের শক্তি, তিনি স্বরূপতঃ অব্যক্ত ও উৎপত্তি উভয় বিষয়েই দক্ষ। শ্রীভগবান পরমাণু থেকে ব্যক্ত বস্তু, সর্বত্রই ব্যাপ্ত থাকেন। দুটি পরমাণুর সমষ্টিকে অণু বলে, এবং তিনটি অণুর সমষ্টিকে ত্রসরেণু বলে। অন্ধকার ঘরে জানালা দিয়ে সূর্যের আলোক রশ্মি প্রবেশ করলে, সেই আলোকপথে যে ক্ষুদ্র কণাসমূহ চোখে পড়ে, সেই কণাগুলিই ত্রসরেণু। যে কাল তিনটি ত্রসরেণুকে ভোগ করে, তাকে ত্রুটি বলে। একশ ত্রুটিতে এক বেধ, তিন বেধে এক লব হয়। তিন লবে এক নিমেষ, তিন নিমেষে এক ক্ষণ। পাঁচ ক্ষণে এক কাষ্ঠা, পনের কাষ্ঠায় এক লঘু, পনের লঘুতে এক দণ্ড। দুই দণ্ডে এক মুহূর্ত এবং ছয় বা সাত মুহূর্তে এক যাম অর্থাৎ প্রহর। চার প্রহরে এক দিবা, চার প্রহরে এক রাত। এই হল মানুষের এক পূর্ণ দিবসের কাল বিভাগ। পনের দিনে এক পক্ষ, শুক্ল ও কৃষ্ণ, পক্ষের দুই প্রকার। দুই পক্ষে মানুষের এক মাস হয়, কিন্তু পিতৃলোকে দুইপক্ষ মানে এক দিন। শুক্ল পক্ষে দিন আর কৃষ্ণ পক্ষে রাত। মানুষের দুই মাসে এক ঋতু ও ছয় মাসে এক অয়ন। অয়ন দুরকমের – উত্তরায়ণ ও দক্ষিণায়ণ। দেবলোকে দেবতাদের উত্তরায়ণে এক দিন এবং দক্ষিণায়ণে এক রাত হয়। বারো মাসে মানুষের এক বছর আর এইভাবেই মানুষের আয়ু একশ বছর নির্দিষ্ট হয়ে আছে”

[আবারও একটু ঘেঁটে গেল। কাল অর্থাৎ সময়ের এমন সূক্ষ্ম পরিমাপের কল্পনা পড়লে বিস্মিত হতে হয়। কিন্তু আলোকপথে চোখে পড়া ত্রসরেণু বলতে যা বোঝানো হয়েছে সেই কণা থেকে সময়ের হিসেব কী করে হয়? সময়কে চোখে দেখা যায় নাকি? তাহলে সূর্যের আলোক রশ্মি যখন নেই, অর্থাৎ রাত্রে ত্রসরেণু তো দেখতে পাওয়া যাবে না, সময়ই বা হিসেব কী করে করব?]         

মহাত্মা বিদুরের প্রশ্নে শ্রীমৈত্রেয় আরো বললেন, “সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর ও কলি এই হচ্ছে চার যুগ। কোন যুগের প্রথম ভাগকে বলে সন্ধ্যা ও শেষভাগকে বলে সন্ধ্যাংশ। দেবতাদের বারো হাজার বছরে সন্ধ্যা এবং এই চারটি যুগ নিয়ে দেবতাদের সন্ধ্যাংশ বলা হয়। সত্যযুগ চার হাজার বছর এবং সন্ধ্যা ও সন্ধ্যাংশ প্রত্যেকে চারশ বছর। এইভাবে ত্রেতা, দ্বাপর ও কলি যথাক্রমে তিন হাজার, দু হাজার ও একহাজার বছর। এই তিন যুগের সন্ধ্যা ও সন্ধ্যাংশ প্রত্যেকে যথাক্রমে তিনশ, দুশ ও একশ বছর। সন্ধ্যা ও সন্ধ্যাংশের মাঝের সময়টিকে যুগ বলে। যে যুগে যে ধর্ম নির্দিষ্ট করা আছে, মানুষের সেই ধর্মই পালন করা উচিৎ। সত্যযুগে চতুষ্পাদ ধর্ম, অর্থাৎ ধর্মই সম্পূর্ণভাবে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে। তারপরে ত্রেতা, দ্বাপর ও কলিতে এক এক পাদ অধর্ম বাড়তে থাকে এবং এক এক পাদ ধর্ম কমতে থাকে। অতএব এই তিন যুগে অধর্মের সঙ্গে যুদ্ধ করেই সম্পূর্ণ ধর্ম আচরণ করার চেষ্টা করা উচিৎ”

[এই যুগের হিসেব ধরলে, কলিযুগের এক হাজার বছর কবেই পার হয়ে গেছে! মহাভারতে বলা হয়েছে, শ্রীকৃষ্ণের মর্ত্যলীলা সংবরণের দিন থেকে দ্বাপরের শেষ ও কলির শুরু। সেই সময়টা যদি মোটামুটি ৮৫০ বি.সি.ই ধরি, তাহলে আজ পর্যন্ত ৮৫০ + ২০২৬ = ২৮৭৬ বছর পার হয়ে গেল, কিন্তু সত্য যুগ ফিরে আসার কোন লক্ষণ তো টের পাওয়া যাচ্ছে না, বরং ধার্মিকগণ এখনও বলে চলেছেন "ঘোর কলি চলছে"।]    

শ্রী মৈত্রেয় বললেন, “হে বিদুর, ভূর্লোক, ভূবর্লোক ও স্বর্লোক, এই তিন লোকের বাইরে আছে মহর্লোক, জনলোক, তপোলোক ও সত্যলোক। এই চার লোকে এক হাজার চার যুগে এক দিন হয়। এই দিন ব্রহ্মার এক দিন, একই সময়ে ব্রহ্মার রাত্রি হয়। ব্রহ্মা রাত্রে নিদ্রামগ্ন থাকেন, ব্রহ্মার রাত্রি অবসানে সৃষ্টির প্রক্রিয়া শুরু হয়। এবং যে কাল পর্যন্ত ব্রহ্মার দিন গণ্য করা হয়, সেই কালে চোদ্দজন মনু রাজত্ব করেন। প্রত্যেক মনুর রাজ্যকালকে মন্বন্তর বলে। এই ত্রিলোক সৃষ্টি ব্রহ্মার দৈনন্দিন সৃষ্টি। এই সৃষ্টির মধ্যে তির্যগযোনি পশুপাখি, মানুষ, পিতৃগণ ও দেবগণের নিজ নিজ কর্মফল অনুসারে জন্ম হয়ে থাকে। প্রত্যেক মন্বন্তরে ভগবান সত্ত্বময় পরমপুরুষ রূপে অবতীর্ণ হয়ে এই বিশ্বের রক্ষা করে থাকেন। তারপর দিনের অবসানে সমস্ত তমোগুণ নিজের আত্মায় সন্নিবেশ করে, ত্রিলোকের উপসংহার করেন। তিন লোকের সকল জীবসমূহকে নিজের দেহে লীন করে তিনি তাঁর মায়া লীলা পরিত্যাগ করেন। সেই সময় সূর্য, চন্দ্র এবং সমস্ত লোক শ্রীভগবানের মধ্যে প্রবেশ করে। এই কল্প শেষের কালে সমুদ্রের জল বেড়ে যায়, প্রচণ্ড বাতাসে সমুদ্রের ঢেউ সমস্ত স্থলভাগকে গ্রাস করে এবং ত্রিভুবনকে প্লাবিত করে। শ্রীনারায়ণ সেই প্লাবনের জলে অনন্তশয়ানে অবস্থান করেন, তাঁর দুই চোখ যোগনিদ্রায় নিমীলিত হয়

এই ব্রহ্মার যে আয়ু, সেই আয়ু এখন শেষের দিকে। তাঁর জীবিত কালের অর্ধাংশকে পরার্ধ বলে, প্রথম পরার্ধ শেষ হয়েছে, আজ শেষ পরার্ধের প্রথম দিন। প্রথম পরার্ধের আদিতে মহান ব্রাহ্মকল্প হয়েছিল এবং সেই কল্পে ব্রহ্মা আবির্ভূত হয়েছিলেন। তাঁকে শব্দব্রহ্ম বলা হয়। যেহেতু এই কল্পে শ্রীনারায়ণের নাভি সরোবর থেকে উৎপন্ন কমল থেকে এই ত্রিভুবনের সৃষ্টি হয়েছিল, সেই কারণে এই কল্পকে পাদ্মকল্প বলে। আবার এই পাদ্মকল্পকেই বরাহকল্পও বলা হয়, যেহেতু এই কল্পে শ্রীহরি বরাহ অবতার হয়ে পৃথিবীর উদ্ধার করেছিলেন।

এই দুই পরার্ধকালকে কোন কোন শাস্ত্রে ভগবানের নিমেষ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। ভগবান কাল প্রভৃতি নিখিল জগতের একমাত্র কারণ, এই কারণে তিনি কালের অতীত, সুতরাং তাঁর শুরু কিংবা অন্ত কিছুই নেই। পরমাণু থেকে দুই পরার্ধ পর্যন্ত কাল, দেহরূপ গৃহে আসক্ত প্রাণিদের উপর যে প্রভাব বিস্তার করতে পারে, পরিপূর্ণ ভগবান অর্থাৎ ভূমার উপর সেই কালের বিন্দুমাত্র প্রভাব নেই। এই ব্রহ্মাণ্ডকোষ এগারো ইন্দ্রিয় ও পঞ্চমহাভূত - এই ষোলটি বিকারপদার্থ এবং প্রকৃতি, মহত্তত্ত্ব, অহংকারতত্ত্ব ও পঞ্চতন্মাত্র - এই আট প্রকৃতি দিয়ে নির্মিত। এই কোষ ভিতরের দিকে পঞ্চাশকোটি যোজন বিস্তৃত এবং বাইরের দিকে ক্ষিতি, অপ, তেজঃ, মরুৎ, ব্যোম, অহংকার ও মহত্তত্ত্ব এই সাত আবরণে ঢাকা। এই ব্রহ্মাণ্ডকোষের যত পরিমাণ, প্রথম আবরণ ক্ষিতির পরিমাণ তার দশগুণ। এইভাবে পরবর্তী প্রত্যেক আবরণ তার আগের প্রতিটি আবরণের থেকে দশগুণ বড়ো হয়ে থাকে। এই বিশাল ব্রহ্মাণ্ড এবং এছাড়াও এরকম কোটি কোটি ব্রহ্মাণ্ড যাঁর মধ্যে আশ্রয় নিয়ে আছে, তাঁকে পরমাণুর মতো মনে হয়। তিনিই সকল কারণের কারণ অক্ষর ব্রহ্ম। তিনিই পরমপুরুষ সাক্ষাৎ মহাবিষ্ণু”। 

 ব্রহ্মার সৃষ্টিকথা                

শ্রীমৈত্রেয় বললেন, “হে বিদুর, কালরূপী শ্রীনারায়ণের প্রভাব আপনার কাছে বর্ণনা করলাম, এখন ব্রহ্মার সৃষ্টিকথা বর্ণনা করি, শুনুন। ব্রহ্মা প্রথমতঃ অবিদ্যার পাঁচটি বৃত্তি সৃষ্টি করলেন। প্রথম সৃষ্টি করলেন তমোগুণ, অর্থাৎ স্বরূপের অপ্রকাশ। তারপর মোহ, অর্থাৎ অহংবুদ্ধি। মহামোহ অর্থাৎ ভোগ বাসনা। তামিস্রা অর্থাৎ ভোগ বাসনায় বাধা ঘটলেই ক্রোধ। অন্ধতামিস্রা অর্থাৎ ভোগবাসনার বিনাশে আমারই সর্বনাশ, এমন বুদ্ধি। কিন্তু এই সৃষ্টিতে তিনি সন্তুষ্ট হলেন না। তিনি আবার শ্রীনারয়ণের তপস্যা করে নিজেকে পবিত্র করে অন্যান্য সৃষ্টি করলেন। প্রথমে তিনি নিজেরই রূপে সনক, সনন্দ, সনাতন ও সনৎকুমার এই চারজন নিষ্ক্রিয় ব্রহ্মস্বরূপ মুনিকে সৃষ্টি করে বললেন, হে পুত্রগণ, তোমরা প্রজা সৃষ্টি করোকিন্তু যেহেতু তাঁরা মোক্ষনিষ্ঠ, শ্রীবিষ্ণু পরায়ণ, তাঁরা প্রজা সৃষ্টিতে প্রবৃত্ত হলেন নাতাঁর নির্দেশ অমান্য করায় তিনি চার কুমারের প্রতি প্রচণ্ড ক্রোধী হয়ে উঠলেন, কিন্তু তিনি ক্রোধ সংবরণ করার চেষ্টা করলেন। সেই ক্রোধ তাঁর দুই ভুরুর মধ্যে থেকে নীললোহিতকুমার রূপে জন্ম নিল। সদ্যজাত শিশু কাঁদতে কাঁদতে বললেন, হে জগৎ গুরু, আমার নাম ও স্থান আপনি নির্দেশ করে দিন। পদ্মযোনি ব্রহ্মা সস্নেহে সেই কুমারকে বললেন, যেহেতু তুমি উদ্বিগ্ন বালকের মতো রোদন করেছ, তাই তোমার নাম হবে রুদ্র। আর হৃদয়, ইন্দ্রিয়, প্রাণ, আকাশ, বায়ু, অগ্নি, জল, মহা, সূর্য, চন্দ্র ও তপস্যা এই স্থানগুলি আমি তোমার জন্যেই নির্দিষ্ট করে রেখেছি। মন্যু, মনু, মহিনস, মহান, শিব, ঋতধ্বজ, উগ্ররেতঃ, ভব, কাল, বামদেব, ও ধৃতব্রত এই একাদশ নামে তুমি বিখ্যাত হবে। এবং ধী, ধৃতি, উশনা, উমা, নিষুৎ, সর্পিঃ, ইলা, অম্বিকা, ইরাবতী, স্বধা ও দীক্ষা এই একাদশ শক্তি হবেন তোমার পত্নী। তুমি এই পত্নীদের স্বীকার করে বহু প্রজার সৃষ্টি করো।

 প্রজাপতি ব্রহ্মার নির্দেশে নীললোহিতকুমার নিজের শক্তি, আকৃতি ও তীব্রস্বভাব অনুযায়ী প্রজাসমূহ সৃষ্টি করতে লাগলেন। সেই প্রজাদের রুদ্ররূপে এবং ব্যবহারে জগতের চারদিক অতিষ্ঠ হয়ে উঠল। তখন ব্রহ্মা আবার পুত্রকে ডেকে বললেন, হে রুদ্র, এমন প্রজা সৃষ্টির আর প্রয়োজন নেই তোমার সৃষ্টি করা প্রজাদের চোখের দৃষ্টিতে দশদিক এমনকি আমারও দগ্ধ হয়ে যাবার অবস্থা হয়ে উঠেছে। অতএব, হে পুত্র তুমি তপস্যা করো, তপস্যা সর্বভূতের মঙ্গলকারী, তপস্যা করে তুমি আগের কল্পের মতো বিশ্ব সৃষ্টি করো। রুদ্র পদ্মযোনি ব্রহ্মার নির্দেশে তপস্যার জন্যে অরণ্যে প্রবেশ করলেন।

[জন্মানোর পরেই নীললোহিতকুমার এমন কাঁদতে লাগলেন, ব্রহ্মা তাঁর নাম রাখলেন রুদ্র। সেই রুদ্র একাদশ নাম নিয়ে, একাদশ পত্নীর সঙ্গে প্রজা সৃষ্টি করছিলেন। কিন্তু ব্রহ্মার রুদ্রের ওই সৃষ্টিসমূহ মনঃপূত হল না, তিনি বললেন, "ঢের করেছ, বাপু, এবার ক্ষ্যামা দাও। তুমি তপস্যা করো। শৈব মতে রুদ্র হচ্ছেন শিব। ভাগবত পুরাণে রুদ্রর সঙ্গে রীতিমতো ছেলেখেলা করলেন ব্রহ্মা, শৈব পুরাণ নিয়ে যদি কোন দিন আলোচনার সুযোগ পাই দেখা যাবে চিত্রটি সম্পূর্ণ উল্টো]।          

রুদ্র ধ্যানে নিমগ্ন হলে, ব্রহ্মার আরো দশটি পুত্র সৃষ্টি হল। তাঁদের নাম মরীচি, অত্রি, অঙ্গিরা, পুলস্ত্য, পুলহ, ক্রতু, ভৃগু, বশিষ্ঠ, দক্ষ ও নারদ। নারদের জন্ম হল ব্রহ্মার কোল থেকে, দক্ষ হলেন তাঁর বুড়ো আঙুল থেকে, বশিষ্ঠ তাঁর প্রাণ থেকে, ভৃগু ত্বক থেকে, ক্রতু হাত থেকে, পুলহ নাভি থেকে, পুলস্ত্য দুই কান থেকে, অঙ্গিরা মুখ থেকে, অত্রি তাঁর চোখ থেকে ও মরীচির সৃষ্টি হল তাঁর মন থেকে। লোকবিস্তারের কারণেই এঁদের জন্ম। ব্রহ্মার দক্ষিণ স্তন থেকে ধর্মের সৃষ্টি হল, এই ধর্মেই স্বয়ং শ্রীনারায়ণ বিরাজ করেন। তাঁর পিঠ থেকে সৃষ্টি হল অধর্মের, লোক সকলের মৃত্যুভয়ের কারণ এই অধর্ম। এরপর তাঁর হৃদয় থেকে কাম, দুই ভুরু থেকে ক্রোধ, অধর থেকে লোভ, মুখ থেকে সরস্বতী, লিঙ্গ থেকে সমস্ত সিন্ধু ও পায়ু থেকে পাপ সৃষ্টিকারী রাক্ষসের সৃষ্টি হল। ব্রহ্মার ছায়া থেকে সৃষ্টি হলেন দেবহূতির পতি ঋষি কর্দমএই ভাবেই ব্রহ্মার সমস্ত দেহ ও মন থেকে এই জগতের সৃষ্টি হল।

পরের পর্ব - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/৫ "

মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩২

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "



[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩১ 


৩৮

“হুঁ, বুঝলাম। তার মানে তুমি রাজধানীর পথে রতিকান্তকে ভল্ল ছোঁড়ার যে কাণ্ডটা করেছিলে - সবটাই সাজানো নাটক”?

“ঠিকই – পুরোটাই নাটক। আমাকে এখানে পাঠানো এবং এখানে এসে আমার কাজের সুবিধার জন্যেই এরকম একটা ঘটনার পরিকল্পনা করেছিল প্রশাসন থেকে। তবে রতিকান্তের প্রতি আমাদের অর্থাৎ রাজধানীর সমস্ত রক্ষীদের ঘৃণা এবং বিদ্বেষের বিষয়টার মধ্যে এতটুকু নাটক নেই। রতিকান্তকে প্রাণে না মেরে – চরম একটা শিক্ষা দেওয়ার পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে। যে শিক্ষা সে সারাজীবন বয়ে বেড়াবে আর জ্বলে মরবে। এ কথা প্রশাসন যদিও জানে না। তবে আমার মনে হয় তারা বোঝে এবং বুঝেও না বোঝার ভান করে থাকে”।

“সেটাই কি মারুলাদাদা সেদিন বলছিল?”

“হ্যাঁ, ওরকমই। এবং মারুলাই ওই কাজটার দায়িত্ব নিয়েছে। আমরা সাহায্য করব”, হাসতে হাসতে ভল্লা বলল।

দুজনের কেউই কোন কথা বলল না অনেকক্ষণ। শেষ রাতের নিস্তব্ধ জনপ্রাণীহীন রাজপথে দুজোড়া রণপা দ্রুত এগিয়ে চলল। পাথুরে রাস্তায় আওয়াজ উঠছিল খুট-খাট খুট-খাট।

কিছুক্ষণ পর রামালি বলল, “নোনাপুর ফিরেই আমাদের রণপাগুলো বালিয়াকে দিয়ে দিতে হবে। পাথুরে রাস্তায় এভাবে বারবার চলতে গেলে, লোহার খুড়ো ছাড়া চলবে না”।

“হুঁ। ভল্লর ফলাগুলো হয়ে গেলেই – রণপাগুলো দিয়ে দিস”। বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর ভল্লা বলল, “সব কথাই তো শুনলি এবং বুঝলি। তোর কী মনে হচ্ছে, রামালি?”

একটু সময় নিয়ে রামালি বলল, “দেখ ভল্লাদাদা, নিজের প্রাণটুকু ছাড়া আমার জীবনে হারানোর কিচ্ছু ছিল না। তোমার সঙ্গে এই ক মাসে যা শিখেছি, নিজের ওপর যে বিশ্বাস আমি অর্জন করেছি, সেটা আমি আর কোনভাবেই হারাতে চাই না। তোমাকে আমি যতটা শ্রদ্ধা করি, কিন্তু কিছু কিছু ব্যাপারে তোমার ওপর ঠিক ততটাই ক্ষুব্ধ”।

ভল্লা অন্ধকারের মধ্যে রামালির গম্ভীর মুখের দিকে তাকাল, বলল, “যেমন?”

একটু ইতস্ততঃ করে রামালি বলল, “এই যেমন ধরো, গ্রামপ্রধান এবং কবিরাজমশাই দুজনকেই তুমি যে সত্যি সত্যিই শ্রদ্ধা করো, সে বিষয়ে আমার কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু এই দুজনেরই মৃত্যুর জন্যে তুমিই যে দায়ী – সে বিষয়েও আমি নিশ্চিত। এরকম করছ কেন?”

“কিন্তু কবিরাজমশাই তো মারা যাননি। বন্দী হয়ে আছেন”।

“ভোলাচ্ছো ভল্লাদাদা? ওঁনার আয়ু আর কয়েকদিন মাত্র – হয়তো কাল কিংবা পরশু অথবা তার পরের দিন…”।

ভল্লা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “দেখ রামালি, আমরা যতই দক্ষ এবং উচ্চপদস্থ রাজকর্মীই হই না কেন – আমরা আসলে তো ভৃত্য। অর্থাৎ কর্তার ইচ্ছেয় কর্ম। অতএব প্রশাসনের নির্দেশে কোন কোন নীতিবিরুদ্ধ কাজ – কখনো কখনো বিবেক-বিরুদ্ধ কাজও - করতেই হয়। এমনকি যখন আমি নিজেই কোন প্রশাসনিক প্রধানের দায়িত্বে থাকি – তখনও প্রশাসনের স্বার্থেই, মন থেকে সায় না থাকলেও, অনেক কঠোর এবং অনৈতিক কাজ করতে হয়। তোদের নোনাপুর গ্রামের কথাই ধর। প্রশাসন এখানে কাজটা গুছিয়ে করার জন্যে আমাকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছে। শষ্পক আমার থেকে অনেকটা উচ্চপদে থাকলেও, রাজধানীর নির্দেশে, আমার অধিকাংশ সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে – আমাকে সম্পূর্ণ সাহায্য তাকে করতেই হবে”।

একটু চুপ করে থেকে ভল্লা আবার বলল, “এখানেও কিন্তু অলিখিত কিছু নিয়ম আছে – যেমন আমি স্বাধীনতা পেয়ে, এমন কিছু করতে পারি না, যাতে প্রশাসনের কোন ক্ষতি হয়। অথবা প্রশাসন সরাসরি কোন বিপদে পড়ে। শষ্পকের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য, কিন্তু শষ্পকের ক্ষেত্রে বিষয়টা আরও জটিল। ধর আমি এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিলাম, তাতে মারাত্মক কোন গোলমাল হয়ে গেল। রাজধানী আমাকে শাস্তি তো দেবেই, শষ্পককেও ছেড়ে দেবে না। বলবে, উচ্চপদে থেকেও ভল্লার এই সিদ্ধান্ত তুমি মেনে নিলে কী করে?

এবারে কবিরাজমশাই এবং প্রধানমশাইয়ের কথায় আসি। ওঁনারা বড়ো বেশি বুঝে ফেলেছিলেন। বিশেষ করে, কবিরাজমশাই যা বুঝেছিলেন, সেটা এতটাই সত্যি এবং যুক্তিনির্ভর যে, সেটাকে কোন মিথ্যা দিয়েই ঢেকে দেওয়া সম্ভব নয়”।

“হুঁ। সেকথার কিছুকিছু আমরাও শুনেছি”।

“রাজধানীর সিদ্ধান্ত অস্ত্রভাণ্ডার থেকে কৌশলে পুরোন অস্ত্র বিক্রি করতে হবে। তার জন্যে এই রকম ভয়ানক পরিকল্পনা করে সেটাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার দায়িত্ব, কোন একজন সেনাধ্যক্ষ বা মহাধিকারিকের পক্ষে নেওয়া সম্ভব? না – সম্ভব নয়। এমন সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা করতে পারেন, রাজ্যের সর্বোচ্চ কর্তারা – অর্থাৎ রাজা স্বয়ং এবং মহামন্ত্রী। আমার ধারণা মন্ত্রীসভার অন্যান্য মন্ত্রীরাও এ বিষয়ে এখনও কিছুই জানেন না।

এইবার এত কাঠ-খড় পুড়িয়ে, এত নাটক করে, সবে যখন আমাদের কাজটা সাফল্যের দিকে এগোচ্ছে, সে সময় কবিরাজমশাই এবং প্রধানমশাই আমাদের গোপন কৌশলটাই যদি সবার সামনে ফাঁস করে দেন, কী হবে? আমরা ব্যর্থ হবো – কিন্তু সেটা তুচ্ছ ব্যাপার। গুরুতর হচ্ছে - সব কথা জানাজানি হয়ে গেলে মন্ত্রীসভায় ঝড় বয়ে যাবে। রাজা ও মহামন্ত্রীকে বাধ্য হয়ে – তাঁদের বিশ্বাসভাজন সেনাধ্যক্ষ এবং মহাধিকারিকদের ঘাড়ে সমস্ত দোষ চাপিয়ে এবং যারা যারা এই কাজের সঙ্গে যুক্ত – সকলকে শাস্তি দিয়ে – পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে। তাতে রাজ্যের সমস্ত প্রশাসনিক কর্মী ও  সেনাবাহিনীতে তুমুল বিক্ষোভ সৃষ্টি হবে। এক কথায় রাজ্যের প্রশাসন ও সুরক্ষা ভয়ংকর সংকটের সম্মুখীন হবে – তাতে রাজার সিংহাসনও টলে যেতে পারে…।  

অতএব যতই অপ্রিয় বা অনৈতিক কাজ হোক না কেন, আমরা যে ভয়ে হানো এবং শল্কুকে বিদায় দিলাম – তার থেকেও অনেক বড়ো বিপদ এড়াতে, প্রধানমশাইয়ের মতো কবিরাজমশাইকেও এই ধরাধাম থেকে বিদায় নিতে হবে”।

ভল্লা চুপ করে যেতে রামালি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “ভোরের আলো ফুটছে যে ভল্লাদাদা, বীজপুরের চটি আর কতদূর?”

রামালির স্বাভাবিক স্বরে, ভল্লা নিশ্চিন্ত হয়ে বলল, “আরও প্রহর দেড়েক তো বটেই। তবে আমিও কী আর ঠিক করে জানি? এ পথে একবারই গিয়েছি – তাও আধমরা অবস্থায়।  কোথাও বসে একটু জিরিয়ে নিই, চল। এতটা পথ হেঁটে তোর খিদে পায়নি? আমার তো পেয়েছে…”।

 

দিনের প্রথম প্রহরের মাঝামাঝি সময়ে, পিছনের দরজা দিয়ে, জনাইয়ের চটিতে ঢুকে পড়ল ভল্লারা। জনাইয়ের ঘরে গিয়ে দেখল, জনাই নেই। রণপাগুলো ঘরের বাইরে খাড়া করে রেখে, ঘরের ভেতরে ঢুকে ভল্লা বলল, “এখানেই আমাদের থলেগুলো রাখি, তারপর চ মুখ-হাত-পা ধুয়ে একেবারে স্নানটা সেরে নিই”।

“এখানে কে থাকে, ভল্লাদাদা”?

“বীজপুরের এই চটির অধ্যক্ষ – জনাই। যদিও এখন সে জন ঘরে নাই”। ভল্লার কথায় রামালি হাসল।

স্নান করে ভল্লারা জনাইয়ের ঘরে এসে দেখল, ঘরের ভেতরে জনাই দাঁড়িয়ে আছে কোমরে হাত দিয়ে। ভল্লাকে দেখে চেঁচিয়ে উঠল জনাই, “শালা, ভল্লা! তুই হঠাৎ কোত্থেকে? ঘরে ঢুকে সেই থেকে আমি ভাবছি – বাইরে রণপা দুজোড়া, আমার ঘরে ঝোলাঝুলি – কে রেখে গেল, আর গেলই বা কোথায়?”

ভল্লা হাসতে হাসতে ঘরের মেঝেয় বসল আরাম করে, বলল, “রামালি, বস। জনাই, এ হচ্ছে আমার সেনাপ্রধান, নাম রামালি। আর তোকে তো বলেছিলাম, জনাই হচ্ছে এই চটির সর্বেসর্বা”।

জনাই রামালির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল, তারপর হাসল একটু, বলল, “এখন কী খাবি বল? এত সকাল সকাল এখানে পৌঁছে গেলি, রাত্রে কখন বেরিয়েছিলি?”

ভল্লা বলল, “এখন কিচ্ছু খাবো না, সঙ্গে খাবার নিয়ে বেরিয়েছিলাম, পথে খেয়েছি। তবে দুপুরে কী খাওয়াবি বল? মাছের ঝোল – ভাত খাওয়াতে পারবি?”

জনাই বলল, “মাছ? এই সময়ে হাটে মাছ একটু কম আসে। তাও দেখছি – দাঁড়া হাটে লোক পাঠিয়ে আমি এখনই আসছি”। জনাই উঠতে যাচ্ছিল, ভল্লা তার হাত ধরে বসাল, বলল, “আরে অত তাড়াহুড়ো করার কিছু নেই... মাছ না পেলেও কিছু যাবে আসবে না। তার আগে যে জন্যে আসা সেটা আগে বলে নিই”। জনাই কিছু বলল না, ভল্লার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

“বীজপুরে কেউ একজন ইঁটের গাঁথনির ঘর বানায় – চিনিস? তাকে লাগবে – দুটো করে দু জায়গায় মোট চারটে ঘর বানাতে হবে, টালির চাল। খুব তাড়াতাড়ি দরকার”।

“চিনি বৈকি! নাম সুমের। আমার এই চটিতে সে অনেক কাজ করেছে। ডেকে পাঠাচ্ছি, কথা বলে নে”।

“কথা বলবি, তুই আর রামালি – আমি সামনে থাকব না”।

“আচ্ছা। আর কিছু?”

“কালো কাপড়ের থান– জনা চল্লিশেক ছেলের ধুতি বানাতে হবে। পাওয়া যাবে?" 

পরের পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩৩ "



নতুন পোস্টগুলি

শুধু _তুই .কম - পর্ব ১৮

 এ র আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "  অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য " ...