মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩৪

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "



[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩৩ 


৩৮

জনাই বেরিয়ে যেতে রামালি ভল্লাকে জিজ্ঞাসা করল, “ভল্লাদাদা, প্রতি প্রহর শেষ হলেই কি এখানে ঘন্টা বাজানোর নিয়ম? সকালে শুনলাম একবার, এখন দুবার। সারা দিনরাতে এরকম মোট আটবার ঘন্টা বাজানো হয় - প্রতিদিন?”

ভল্লা বলল, “হ্যাঁ। চটির অতিথি এবং কাজের লোকদের সুবিধের জন্যেই ঘন্টা বাজাতে হয়। কাকে কখন খেতে দিতে হবে। কার কখন কী কাজ - সেসব মনে করিয়ে দেওয়ার জন্যে…”।

“বাবা। কী করে বোঝে ঠিক কখন কখন প্রহর শুরু হচ্ছে আর শেষ হচ্ছে? সূর্য দেখে?”

“সূর্য দেখে মোটামুটি বোঝা যায় ঠিকই – কিন্তু মেঘলা দিনে কিংবা রাত্রে কি সূর্য দেখা যায়?”

“না। তাহলে?”

“ঘড়ি আছে – জলঘড়ি”।

“জলঘড়ি? সে এবার কী?”

“ঘড়ির দুটো মানে হয় – ঘটিকা বা ঘন্টা – মানে প্রতি প্রহরের তিনভাগের এক ভাগ। আবার যে যন্ত্র দিয়ে এই ঘটিকা মাপা যায় – তাকেও ঘড়ি বলে। বিকেলে জনাইকে বলব, জলঘড়ি কেমন হয় তোকে দেখিয়ে দেবে। ব্যাপারটা বেশ মজার। বড়োসড়ো একটা গামলায় জল ভরে রাখা থাকে। সেই জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয় ছোট্ট একটা ঘটি। সেই ঘটিটা সাধারণ নয় – তার তলায় খুব ছোট্ট একটা ছিদ্র করা থাকে। সেই ছিদ্র দিয়ে গামলার জল ধীরে ধীরে ঘটিতে চুঁয়ে চুঁয়ে ঢোকে। এভাবে জল ঢুকতে ঢুকতে ওই ফুটো-ঘটিটা ভরে গেলেই, টুপ করে গামলার জলে ডুবে যায়। ওই ঘটিটা ভরতে যত সময় লাগে সেটাই হল এক ঘটিকা বা ঘন্টা। এরকম তিনবার হলে – এক প্রহর হয়। এই ব্যবস্থার জন্যে নির্দিষ্ট লোক আছে – যাদের কাজ হল – ঘড়িটা সঠিক চালানো - এবং ঘটিকা গুণে প্রহর শেষের ঘন্টা বাজানো। বড়ো বড়ো শহরে – প্রতি ঘটিকাতেই ঘন্টা বাজানো হয়, আবার প্রহর শেষেও ঘন্টা বাজানো হয়”।             

   রামালি অবাক হয়ে ভল্লার কথা শুনছিল। কথা শেষ করে ভল্লা আবার বলল, “নে এবার বাঁধানো মেঝেয় গা এলিয়ে একটু আরাম করে নে, এমন সুযোগ আবার কবে পাবি কে জানে। কেমন দেখলি বীজপুর?”

রামালি মেঝেয় শুয়ে শুয়েই বলল, “কী বলি বলো তো ভল্লাদাদা? শহর তো কোনদিন দেখিনি, অন্যের মুখে শুনেছি। এখানে এসে ভাবলাম, এটাই বুঝি শহর। শাম্‌লাকে বলতে হেসে গড়িয়ে পড়ল, বলল, ধুস্‌ - এটা নাকি শহর! শহর হল অনন্তপুর – বছর চারেক আগে একবার গিয়েছিলাম। শহর বটে একখানা। জিজ্ঞাসা করলাম, সেটা আবার কোনদিকে? বলল, এখান থেকে তিনদিনের হাঁটা পথ – রাজপথ ধরে পুবমুখো গেলেই হল”।

ভল্লা হাসল, বলল, “এই তো সবে শুরু রে, রামালি। অনেকদূর যাবি, অনন্তপুর তো তুচ্ছ, রাজধানী কদম্বপুরে তুই দাবড়ে ঘুরে বেড়াবি”। রামালি স্বপ্ন দেখা চোখে বলল, “সে আর কবে হবে, ভল্লাদাদা। আমার কপালে এই অব্দি যে এসেছি সেই ঢের”।

ভল্লা এবার একটু বিরক্ত হল, “আজ থেকে ছমাস আগে বীজপুর আসবি ভেবেছিলি? কপাল-টপাল কোন কাজের কথা নয়, রামালি। ওসব অকর্মাদের ধূর্তামি – আধাখ্যাঁচড়া কাজ করে মনোমত ফল না পেলে, বলে কপালে নেই তো করবো কী? তুই তো তেমন নস, তুই কেন কপালের দোষ দিবি?”

রামালি ঠোঁটে বিটলেমির হাসি নিয়ে বলল, “তুমি যদি নোনাপুরে না এসে, অন্য কোন দূরের  গ্রামে যেতে – তাহলে আমার কপাল খুলত কি?”

মুখে বিরক্তির আওয়াজ তুলে কিছু বলতে যাচ্ছিল ভল্লা, রামালির মুখের দিকে তাকিয়ে থমকে গেল, তারপর হেসে বলল, “চ্যাংড়ামো করছিস না? কিন্তু সেটাও কপাল নয় – সুযোগ। তুই একটা সুযোগ পেয়েছিস – তার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করে চলেছিস। অনেকে সুযোগ পেয়েও যোগ্য হতে পারে না – তারা হিংসুটে শল্কু হয়। নে অনেক বকবক হয়েছে, জনাই আসা পর্যন্ত একটু ঘুমিয়ে নিই চল...। রাত্রে আবার দৌড়তে হবে।” 

৩৯ 

মহড়ার মাঠ থেকে সন্ধের পর ভল্লা আর রামালি বাসায় ফেরার সঙ্গে সঙ্গেই, বালিয়া এল। পিঠের বোঝা থেকে বের করল অনেকগুলো ভল্ল, বলল, “ভল্লাদাদা, পনের জোড়া মানে তিরিশখানা ভল্ল হয়ে গেছে। একবার দেখে নাও তো, ঠিকঠাক হয়েছে কিনা?” বালিয়া পাঁচটা ভল্ল এগিয়ে দিল ভল্লার দিকে।

“বাবা, একদিনের মধ্যে তিরিশখানা?” বালিয়ার হাত থেকে নিয়ে ভল্লগুলো পরখ করতে করতে, ভল্লা বলল।

“আমার ছোটভাইকেও লাগিয়ে দিয়েছি ভল্লাদাদা। ও লোহার পাত বানায়। আমি ফলার তির-মুখগুলো বানাই আর বাবা, ঘষে মেজে ফলাগুলোকে ধারালো বানায়। বাস, তারপর ভাই আর আমি দুজনে মিলে বাঁশের আগায় ওগুলো বসিয়ে দিই”।

ভল্লা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে বলল, “ভালই তো হয়েছে রে। এর আগে রণপার খুড়ো আর ফলাগুলোও ঠিকঠাক হয়েছিল। তুই এক কাজ কর, আজ জোড়া ছয় সাতেক রণপাও নিয়ে যা, কাল বাকি ভল্লগুলো আর যতগুলো সম্ভব রণপা বানিয়ে নিয়ে আসবি। কি রে রামালি, রণপা দিলে অসুবিধে হবে?”

রামালি বলল, “তা একটু হবে, কিন্তু রণপাগুলো তাড়াতাড়ি ঠিকঠাক করে না নিলে নষ্ট হয়ে যাবে। তুই ছজোড়া রণপা এখন নিয়ে যা, পারলে কালই নিয়ে আসিস”।            

বালিয়া চলে যেতে রামালি রান্নার যোগাড়ে বসল। ভল্লা একটু চাপা স্বরে রামালিকে জিজ্ঞাসা করল, “অমাবস্যার আর কয়েকটা দিনই বাকি। আমাদের ছেলেরা পারবে? তোর কী মনে হয়, রামালি?”

রামালি রান্না করতে করতে বলল, “আমাদের মধ্যে বারো-তের জন তো ভালই তৈরি হয়েছে…এ কদিনে বাকিরাও হয়ে যাবে। আমার মনে হয় একটা ঝুঁকি আমরা নিতেই পারি”।

ভল্লা বলল, “নিজের সম্পর্কে তোর কী ধারণা, পারবি রক্ষীদের কোমর ভাঙতে?”

রামালির চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, ঘাড় ঘুরিয়ে ভল্লার দিকে তাকিয়ে বলল, “পারতেই হবে - আর আমার হাতেই উপানুর মরণও হবে – এ আমি তোমায় বলে রাখলাম ভল্লাদাদা”।

ভল্লা দেখল রামালির মুখের ওপর আগুনের আভা খেলা করছে এবং তার দু চোখে জ্বলছে আগুন…। ভল্লা কিছু বলল না। তাকিয়ে রইল রামালির দিকে।

মারুলা নিঃশব্দে ঢুকল ভল্লার উঠোনে, ভল্লার পাশে বসে বলল, “কখন ফিরলি তোরা, বীজপুর থেকে?”

ভল্লা বলল, “শেষ রাতে”।

“রামালি, বীজপুর কেমন দেখলি? কিছু আনিসনি ওখান থেকে?”

“এনেছি বৈকি। ভালো চাল-ডাল, আনাজ-পত্র… চাল-ডালের খিচুড়ি আর ভাজি বানাচ্ছি…” রামালি হেসে উত্তর দিল।

“যাক বাবা, রোজ তোর ওই জোয়ারের রুটি আর ভুট্টার ঝোল খেতে খেতে জিভটা চামচিকের পাখনা হয়ে  উঠছিল - আজ স্বাদ বদলাবে। একটা সুখবর দিই ভল্লা, রাজধানীর গোশকটগুলো আজ রাত্রে বীজপুরে ঢোকার কথা। তার মানে আর তিন-চারদিনের মধ্যে আমাদের অস্ত্রভাণ্ডারে পৌঁছে যাবে”।

“অস্ত্র ভাণ্ডারের কী অবস্থা?”

“চারপাশের দেওয়াল হয়ে গেছে। সামনের দিকে আর উত্তরের দিকে লোহার গেট লেগে গেছে। তুই যে চারটে ঘর দেখে এসেছিলি, তার মধ্যে বড়ো ঘরদুটোর কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ভাণ্ডারের দেওয়ালে তাক ঝোলানোও হয়ে গেছে। তুই বলেছিলি দেওয়ালে বড়ো বড়ো লোহার কীল বসিয়ে কাঠের মোটা পাটা বসিয়ে দিতে। কুলিকপ্রধান কীলগুলোকে দেওয়ালে গেঁথেছে, তার ওপর, দেওয়ালের একটু ওপর থেকে লোহার শিকলের টানা লাগিয়ে দিয়েছে। বলেছে তাকগুলো এমন পোক্ত হবে, যত ভারই দিন – ভেঙে পড়বে না। তুই দেখলে তোর তাক লেগে যাবে, রে শালা”।

“বাঃ, রাজধানীর অস্ত্রভাণ্ডারের দেওয়ালেও একই রকম ব্যবস্থা দেখেছি। তার মানে কুলিকপ্রধান যথেষ্ট অভিজ্ঞ। কিন্তু বাকি ঘরদুটো কবে শেষ হবে”?

“ঘর হয়ে গেছে, ছাদের কাঠামোও হয়ে গেছে। টালি দিয়ে ছাইতে আর কদিন – খুব জোর তিন-চারদিন”?

“হুঁ, তার মানে, রাজধানীর অস্ত্র-শস্ত্র এসে গেলে, ওখানেই রাখা যাবে। কিন্তু শষ্পক কী করছে? বলেছিল সমস্ত ব্যয়-ট্যয় ধরে, অঙ্ক কষে অস্ত্র-শস্ত্রের কী মূল্য হতে পারে, জানাবে? জানালো না তো?”

“এখনও হয়নি। বলছে, গোশকট থেকে নামিয়ে, অস্ত্রভাণ্ডার পর্যন্ত সমস্ত অস্ত্র ঘরের ভিতর সাজিয়ে তুলতেও অনেক শ্রমিক লাগবে – সে সব ব্যয় ধরে, তারপর তোকে পাঠাবে”।

“ঠিক আছে, বুঝলাম”। একটু চিন্তা করে ভল্লা মারুলাকে জিজ্ঞাসা করল, “আস্থান থেকে অস্ত্রভান্ডারের দূরত্ব কতটা হবে বল তো?”

“আস্থান থেকে উত্তর-পশ্চিমে, তা ধর ক্রোশ দুয়ের বেশিই হবে”।

“অমাবস্যার রাতে আস্থান থেকে কাজ সেরে, আমাদের ছেলেরা যদি এদিকে না এসে অস্ত্রভাণ্ডারের দিকে যায় – ওখানে কয়েকটাদিন গা ঢাকা দিয়ে থাকা সম্ভব?”

মারুলা কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলল, “বুদ্ধিটা মন্দ নয় ভল্লা, রণপা চড়ে তোরা একবার জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে পড়তে পারলে – রক্ষীদের চোখে ফাঁকি দিয়ে ওদিকে চলে যাওয়া সহজ হবে…”।

“দাঁড়া, তার আগে আমাদের পুরো পরিকল্পনাটা তোকে বলি, তাহলে তোর বুঝতে সুবিধা হবে। রামালি তোর রান্না কদ্দূর?”

    “এই হয়ে এসেছে, তুমি শুরু কর আমি আসছি”। রামালি সাড়া দিল।

চলবে...

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নতুন পোস্টগুলি

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩৪

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "  অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য " ...