শুক্রবার, ৫ জুন, ২০২৬

ভারতের নির্বাচনে সুকুমার সেন

  


এর আগের প্রবন্ধ " চোদ্দ শাক " 

[প্রত্যেকটি লেখা সরাসরি আপনার মেলে পেতে চাইলে, ডান দিকের কলমে "ফলো করুন" 👉 

 বক্সটি ক্লিক করে নিজের নাম ও মেল আইডি রেজিস্টার করে নিন]


 

এই ২০২৬ সালে, পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণা হয়ে গেছে। এই নির্বাচন নিয়ে অন্যান্যবারের মতোই রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক উত্তেজনা ছিল চরম সীমায়। ছিল নির্বাচনী প্রচারের নামে রাজনৈতিক দলগুলির কদর্য কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি এবং তীব্র আকথা-কুকথার নিবিড় চাষ। জনগণ নির্ভয়ে ভোট দেবে নাকি সভয়ে ঘরে বসেই শুনবে, তার হয়ে কারা যেন ভোট দিয়ে দিয়েছে। মুগ্ধ বা বিভ্রান্ত কিংবা ক্ষুব্ধ সাধারণ নাগরিক কার পক্ষে দাঁড়ালেন – সেকথা আমরা জেনে গেছি ৪ঠা মে, ২০২৬ তারিখ। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ঘটে গেছে নিঃশব্দ বিপ্লব – জনগণের রায়ে উল্টে গেছে বিগত পনের বছর ধরে মৌরসী-পাট্টা বিছানো সরকার। নব নির্বাচিত সরকার হাতে তুলে নিয়েছে নতুন শাসন ও প্রশাসন ব্যবস্থা।     

বিগত ৪৯ (৩৪ + ১৫) বছরে পশ্চিমবঙ্গ-নির্বাচন মানেই ছিল – ভোটের আগে এবং ভোটের পরে বিরোধী সমর্থকদের হত্যা, ধর্ষণ, ব্যাপক মারধোর, ঘরে ঘরে আগুন জ্বালানো এবং সমর্থক পুরুষদের ঘর ছাড়া করার সংস্কৃতি। রবীন্দ্রনাথ, রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ, বঙ্কিম, সত্যজিৎ, নেতাজী সুভাষ, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন প্রমুখ ব্যক্তিত্বের স্মৃতিচারণ-বিলাসী বাঙালীর সংস্কৃতি-গর্বের সঙ্গে জুড়ে গিয়েছিল, বাংলার প্রাক নির্বাচনী ও নির্বাচনোত্তর বীভৎস মারণ ও ধ্বংস লীলার সংস্কৃতিও। সুদীর্ঘ কর্মজীবনের অধিকাংশ সময়টাই আমাকে পশ্চিমবঙ্গের বাইরে  - নানান রাজ্যে কাটাতে হয়েছে। সুদূর কেরালা থেকে হিমাচল, কিংবা গুজরাট থেকে কাছাড় (আসাম) – প্রতিটি নির্বাচনের সময়েই সর্বত্র শুনতে হয়েছে – আমরা এত হিংস্র কেন? নিজের পড়শি-প্রতিবেশীদের প্রতি বাঙালীরা কেন এত নির্মম-নৃশংস হয়ে ওঠে “নির্বাচন” নামক মৌসুমী-বায়ুর প্রভাবে?     

লজ্জায় মাথা নত করে চুপ করে থাকা ছাড়া কোন উত্তর দিতে পারিনি কোনবার। কিন্তু দীর্ঘ ৪৯ বছর পর এই ২০২৬-এর নির্বাচনে আমাদের সেই রাহু-কেতু ও শনির দশা কাটিয়ে তোলা গেছে – কেন্দ্রীয় বাহিনীর চুলচেরা পর্যবেক্ষণে। যৎসামান্য কিছু ঘটনা ছাড়া, এবারের নির্বাচন ঘটে গেছে শান্তিতে। যদিও বাঙালীর অগৌরবের চরিত্রটি আবার ফুটে ওঠে কিনা – সেকথা বোঝা যাবে পরবর্তী নির্বাচনগুলিতে। সে পৌরসভা, পঞ্চায়েত, লোকসভা, বিধানসভা, যাই হোক না কেন।     

 এই প্রসঙ্গে বাংলার আরও এক কৃতী সন্তান - যিনি স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধান নির্বাচন কমিশনার (Chief Election Commissioner) হয়ে শুধু সূচনা করেননি, গণতান্ত্রিক ভারতের নির্বাচন প্রক্রিয়াকে দাঁড় করিয়েছিলেন অত্যন্ত দৃঢ় এক ভিত্তিতে। তাঁর সেই গৌরবজনক কৃতিত্বের কথাই এখন বলব।

 ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগষ্ট মধ্যরাত্রে ভারতবাসীর হাত ও পায়ের শেকল ভেঙে আমাদের দেশ স্বাধীন হল। স্বাধীনতা লাভের মুহূর্তে দেশের তৎকালীন অবিসংবাদিত নেতা জওয়াহরলাল নেহরু আপামর জনতার উদ্দেশে ঘোষণা করেছিলেন, Long years ago we made a tryst with destiny, and now the time comes when we shall redeem our pledge, not wholly or in full measure, but very substantially.

At the stroke of the midnight hour, when the world sleeps, India will awake to life and freedom. A moment comes, which comes but rarely in history, when we step out from the old to the new, when an age ends, and when the soul of a nation, long suppressed, finds utterance....”।

   তাঁর এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে জন্ম হল, ভারত নামক সার্বভৌম, ধর্মনিরপেক্ষ, গণপ্রজাতন্ত্রী একটি শিশু-দেশের। পণ্ডিত নেহেরুর তত্ত্বাবধানে অন্তর্বর্তী মন্ত্রীসভা গড়ে, শুরু হল শিশু রাষ্ট্রের পথ চলা। সেই মন্ত্রীসভার প্রধান হলেন পণ্ডিত নেহরু।

সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক একটি দেশ শাসনের জন্যে প্রথমেই দরকার পাকাপোক্ত একটি সংবিধান। আর দরকার সাধারণ জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে, কেন্দ্রীয় স্তরে সংসদ এবং রাজ্য স্তরে বিধানসভার পরিকাঠামো গড়ে তোলা। কিন্তু সংবিধান নির্দিষ্ট না হলে তো নির্বাচন করা যায় না, অতএব প্রথমেই শুরু হল সংবিধান রচনার  প্রক্রিয়া।  

২৯শে আগস্ট ১৯৪৭ তারিখে ভারতীয় সংবিধানের খসড়া রচনার জন্যে সাতজন সভ্য নিয়ে একটি কমিটি গড়া হয়েছিল। সে কমিটির চেয়ারম্যান হলে বাবা ভিমরাও আম্বেদকার। সংবিধানের প্রথম খসড়াটি, অন্তর্বর্তী মন্ত্রীসভার কাছে জমা পড়েছিল ৪ঠা নভেম্বর ১৯৪৮। অন্তর্বর্তী মন্ত্রীসভা, নানান আলোচনা এবং তর্কবিতর্কের পর ২৬শে নভেম্বর ১৯৪৯ সালে - সংবিধানটি সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহণ করল। এরপর ১৯৫০ সালের ২৬শে জানুয়ারি, স্বাধীন ভারতের প্রথম নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হলেন বাবু রাজেন্দ্র প্রসাদ, এবং সেই দিনটি থেকেই শুরু হল গণতন্ত্রী, ধর্মনিরপেক্ষ স্বাধীন ভারতের সাংবিধানিক পথ চলা।  সেই দিনটি আজও আমরা মহাড়ম্বরে স্মরণ করি প্রজাতন্ত্র দিবস হিসেবে।

এরপর অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী সংবিধান মেনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আলোচনা এবং অনুমতি নিয়ে শুরু করলেন সাধারণ নির্বাচনের প্রক্রিয়া। পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন অন্তর্বর্তী মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধান চন্দ্র রায়ের পরামর্শে, অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী নেহরুজি শ্রী সুকুমার সেনকে ডেপুটেশনে দিল্লি নিয়ে গেলেন এবং শ্রী সেনের হাতে তুলে দিলেন প্রথম সুষ্ঠু নির্বাচন করানোর দায়িত্ব – অর্থাৎ তিনিই হলেন ভারতের প্রথম প্রধান নির্বাচন কমিশনার। ঐতিহাসিক সেই দিনটি ছিল ১৯৫০ সালের ২১শে মার্চ – অর্থাৎ আজ থেকে ঠিক ছিয়াত্তর বছর আগে।    

 কিন্তু কে এই সুকুমার সেন? তাঁর বিপুল কর্মকাণ্ডের আলোচনায় যাওয়ার আগে, শ্রীসেনের পরিচয়টা জেনে নেওয়া প্রয়োজন।

এক বাঙালী বৈদ্য-ব্রাহ্মণ পরিবারে, সুকুমার সেনের জন্ম। তাঁর জন্ম তারিখ দোসরা জনুয়ারি ১৮৯৯। তিনি তাঁর পিতা, সরকারী আধিকারিক, শ্রী অক্ষয় কুমার সেনের জ্যেষ্ঠ পুত্র ছিলেন। তাঁর লেখাপড়া কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে, এবং তারপর তিনি উচ্চ শিক্ষার জন্যে যান ইউনিভার্সিটি অব লণ্ডনে। সেখানে অঙ্কে বিশেষ কৃতিত্বের জন্যে তিনি স্বর্ণপদক লাভ করেন। এরপর ১৯২১ সালে তিনি ইণ্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসে (ICS) যোগ দেন এবং বিভিন্ন জেলায় আইসিএস আধিকারিক এবং বিচারক পদে দীর্ঘদিন কর্মরত ছিলেন। ১৯৪৭ সালে ভারত যখন স্বাধীন হয়, সে সময় তিনি ছিলেন বেঙ্গল প্রভিন্সের প্রধান সচিব। ব্রিটিশ জমানায় এই পদটিই ছিল যে কোন ভারতীয় আইসিএস আধিকারিকের পক্ষে সর্বোচ্চ পদ। স্বাধীনতার পরেও তিনি এই পদেই কর্মরত ছিলেন।

শ্রী সেনের অনুজ শ্রী অশোক কুমার সেন (১৯১৩-১৯৯৬) ছিলেন বিখ্যাত ব্যারিষ্টার এবং ১৯৫৭ থেকে ১৯৭৭ ও ১৯৮০ থেকে ১৯৮৯ পর্যন্ত – সুদীর্ঘ দিন সংসদ সদস্য ছিলেন। তিনি কেন্দ্রীয় আইন মন্ত্রী পদেও আসীন ছিলেন দীর্ঘদিন। তাঁর আরেক ভাই শ্রী অমিয় কুমার সেন, ছিলেন প্রথিতযশা ডাক্তার এবং রবীন্দ্রনাথের অন্তিম-যাত্রা পথে তিনিই তাঁর সঙ্গী ছিলেন।

 

 

প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব গ্রহণের পর, শ্রী সেন মাত্র ৫৮৩ দিন – মোটামুটি দেড় বছরের মাথায় - ভারতের প্রথম নির্বাচনের প্রথম পর্যায় শুরু করতে পেরেছিলেন ১৯৫১-র ২৫শে অক্টোবর। এবং এই নির্বাচনের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি নির্বিঘ্নে শেষ করতে পেরেছিলেন ১১৯ দিনের মাথায়  ১৯৫২-র ২১শে ফেব্রুয়ারি।

আজকের প্রযুক্তি-সম্পৃক্ত জীবনপ্রবাহের প্রবল স্রোতে দাঁড়িয়ে মনে হতে পারে, একটা সাধারণ নির্বাচন শুরু করতে কেন লাগল দীর্ঘ ৫৮৩ দিন?  এবং সেটাও শেষ হল আরো চারমাস পর!  কেন এতটা সময় লাগল সে কথাই এবার আলোচনা করা যাক।

  ১৯৫১ সালের জন গণনা অনুযায়ী ভারতের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৩৬.১০ কোটি, তার মধ্যে ১৭.৩২ কোটি মানুষের বয়স ছিল একুশ বছর বা তার বেশী। সে সময় একুশ বছর বয়সকেই ভোটাধিকার প্রয়োগের ন্যূনতম বয়স নির্ধারিত করা হয়েছিল। এই ১৭.৩২ কোটি ভারতবাসীর মধ্যে প্রায় ৮৫% ছিলেন নিরক্ষর। এই মানুষগুলিকে ভোটাধিকার কি? স্বাধীন দেশের নাগরিক হয়ে ভোট দেওয়া কেন গুরুত্বপূর্ণ? এবং ভোট দিলে তাদের জীবনে কোন মোক্ষলাভ ঘটবে? এই সব তত্ত্বকথা বুঝিয়ে প্রতিটি ভোটারকে বুথ-মুখী করে তোলাই ছিল নিঃসন্দেহে শ্রীসেনের কঠিনতম চ্যালেঞ্জ।   

টিভি, স্মার্টফোন, ইন্টারনেট ও সোশাল মিডিয়াহীন সেই যুগে এই চ্যালেঞ্জটির সমাধান করা হয়েছিল, রেডিওয় অনবরত প্রচারের মাধ্যমে এবং সিনেমা শোয়ের আগে ডকুমেন্টরি দেখিয়ে। সারা দেশে তখন প্রায় ৩০০০ সিনেমা হল ছিল, সেখানে “ইণ্ডিয়ান নিউজ রিল” নামের নানান আঞ্চলিক ভাষার ডকুমেন্টরিতে ভোটারদের দায়িত্ব এবং কর্তব্য বারংবার বোঝানো হত। মূল সিনেমা শুরুর আগে এই ডকুমেন্টরিগুলি দেখানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। এছাড়া ভোটার লিস্ট বানানোর সময় সরকারি প্রতিনিধিরা গ্রামে-গ্রামে, শহরের পাড়ায়-পাড়ায় ব্যক্তিগতভাবেও এই প্রচার যথাসম্ভব চালিয়ে গিয়েছিলেন।

তখনকার সামাজিক সংস্কার ও রীতিনীতি এমনই ছিল, বিশেষ করে মহিলাদের ক্ষেত্রে, ভোটার লিস্ট বানানোও হয়ে উঠেছিল মস্তো বড়ো এক চ্যালেঞ্জ। উদাহরণ দিলে স্পষ্ট হবে বিষয়টা। সর্বধর্ম নির্বিশেষে গ্রামের মহিলারা নিজেদের পরিচয় দিতেন, “শ্যামলের মা”, কিংবা, “সামসুদ্দিনের বউ” হিসেবে। মহিলাদের এই রকম নাম সম্বলিত খসড়া ভোটার লিস্ট যখন সুকুমার সেনের কাছে জমা পড়েছিল, তিনি এই লিস্ট বাতিল করেছিলেন এবং তাঁর প্রতিনিধিদের আবার গ্রামে গ্রামে পাঠিয়েছিলেন মহিলাদের নির্দিষ্ট নামগুলি নতুন করে রেকর্ড করার জন্যে। এর পরেও প্রায় পঁচিশ লক্ষ মহিলা তাঁদের নিজস্ব নাম নথিভুক্ত করেননি – অর্থাৎ যুগ-প্রাচীন সংস্কারের বাইরে তাঁরা বেরিয়ে আসতে পারেননি। কিন্তু শ্রী সেন এবার আর কোন রকম আপোস না করে, এই পঁচিশ লক্ষ মহিলার নাম ভোটার লিস্ট থেকে বাদ দিয়ে দিয়েছিলেন এবং ১৯৫১-৫২ সালের নির্বাচনে তাঁরা কেউ ভোটের অধিকার পাননি।  

আজকের সোশাল মিডিয়ার যুগে এরকম ঘটনা ঘটলে – শ্রীসেনকে সারা দেশ জুড়ে অজস্র “মিম” এবং “ট্রোল”-এর সামনে পড়তে হত এবং তাঁকে স্বৈরাচারী, মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী হিসেবেও চিহ্নিত করে ফেলত আজকের সমাজ-সচেতন নেটিজেন জনগণ।

কিন্তু শ্রী সেনের এই কড়া পদক্ষেপের কারণে, মহিলারা দ্রুত সচেতন হয়ে ওঠেন এবং পরবর্তী নির্বাচনের অর্ত্থাৎ ১৯৫৭ সালের ভোটার লিস্টে তাঁরা নিজ-নিজ নামই নথিভুক্ত করেন এবং ভোট দিতেও তাঁদের কোন অসুবিধে হয়নি। প্রসঙ্গতঃ ১৯৫৭ সালের সাধারণ নির্বাচনের সময়েও শ্রী সেনই মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক ছিলেন।  অতএব, নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শ্রী সেন যে অজস্র ভারতীয় নিরক্ষর মহিলাকে নিঃশব্দে যথেষ্ট আত্মসচেতন করে তুলতে পেরেছিলেন, একথা আজ নিঃসন্দেহে বলা যায়।

যেহেতু প্রায় ৮৫% ভোটার সেই সময় নিরক্ষর ছিলেন, নির্বাচনে লড়তে নামা রাজনৈতিক দলগুলির নাম অথবা দলের প্রার্থীদের নাম তাঁদের পক্ষে পড়া সম্ভব ছিল না। তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না ব্যালট পেপারে প্রার্থীর নাম বা দলের নাম লিখে, ব্যালট বক্সে সেই কাগজ জমা দেওয়ারও। শ্রী সেন এই সমস্যার সমাধান করেছিলেন প্রতিটি দলের জন্য আলাদা প্রতীক (Symbol)-এর ব্যবস্থা করে। সে সময় সারা দেশে মোট যে চোদ্দটি দল নির্বাচনে লড়েছিল, তারা প্রত্যেকে নিজ নিজ দলের জন্যে আলাদা আলাদা প্রতীক বেছে নিয়ে জমা দিয়েছিল নির্বাচনী কমিশনের কাছে। যেমন জোড়া-বলদ, কাস্তে-ধানের শিষ, উদিত-সূর্য, গাছ, ইত্যাদি। নীচের চার্ট থেকে সেদিনের চোদ্দটি দলের নাম ও প্রতীকগুলি দেখে নিতে পারেন। জানা যাবে তখনকার চোদ্দটি জাতীয় দলের নামও।

১৯৫১-৫২ সালে স্বাধীন ভারতের বিভিন্ন দলের প্রতীক 
 

এই প্রথম নির্বাচনেই শ্রী সেন প্রত্যেকটি বুথে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের প্রতীক চিহ্নিত আলাদা আলাদা ব্যালট বক্স রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন। এতে নিরক্ষর হলেও, কোন মানুষেরই তাঁর সমর্থিত দলের নির্দিষ্ট বক্সে, তাঁর সমর্থনের কাগজটি ফেলতে কোন অসুবিধে হয়নি।

আজকের দিনের নির্বাচনে “ছাপ্পা ভোট” শব্দটি আমাদের কাছে বহুল প্রচলিত গা সওয়া ব্যাপার। কিন্তু প্রথম নির্বাচনের আগেই শ্রী সেনের মাথায় এই আশঙ্কা এসেছিল যে, একই চতুর ভোটার নিজের দলের বক্সে অনেকগুলি ভোট দিয়ে ফেলতে পারে। এই সমস্যার সমাধানে তিনি ভারতীয় বিজ্ঞানীদের সাহায্য নিয়ে ভোটারদের আঙুলে ইণ্ডেলিব্‌ল্‌ ইংক (indelible ink) লাগানোর ব্যবস্থা করেন। আজও সেই কালিই ব্যবহার হয় এবং আমরা সকলেই জানি, এই কালি একবার লাগিয়ে দিলে, অন্ততঃ দিন সাতেকের আগে আঙুল থেকে এই কালি মোছা যায় না।

প্রথমবারের সেই নির্বাচনী লড়াই হয়েছিল ৪৫০০ আসনের জন্যে, তার মধ্যে সংসদের আসন ছিল ৪৮৯ এবং বাকিগুলি ছিল রাজ্য বিধানসভার আসন। প্রায় ৫৬০০০ নির্বাচনী অফিসার নিযুক্ত ছিলেন, সারা ভারতের ২,২৪,০০০ বুথ পরিদর্শনের জন্য। ১৬,৫০০ করণিককে ছমাসের জন্যে নিযুক্ত করা হয়েছিল সারা ভারতের ভোটার লিস্ট বানানো, নির্বাচনী বিধি-বিধান রচনা, আরও বিবিধ নথিপত্র বানানোর জন্যে। ৮২০০ টন ইস্পাত থেকে, প্রায় পঁয়ত্রিশ লক্ষ ব্যালট বক্স বানানো হয়েছিল। প্রায় ৩,৮৯,৮১৬ ফাইল ইণ্ডেলিব্‌ল্‌ ইংক ব্যবহার হয়েছিল ১৯৫১-৫২-র সেই নির্বাচনে। বক্সগুলি বুথে বুথে বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যে ২,৮০,০০০ শ্রমিক এবং বক্সের সুরক্ষার জন্যে ২,২৪,০০০ পুলিশ কর্মী নিযুক্ত হয়েছিল।

মনে রাখতে হবে সেসময়, এক্সপ্রেসওয়ে, হাইওয়ে এবং প্রধানমন্ত্রী গ্রামীণ সড়ক যোজনার মতো প্রকল্প বহুদূরের স্বপ্ন – ভারতের প্রত্যন্ত প্রান্তের বুথগুলিতে ব্যালটবক্স সহ নির্বাচনী কর্মীদের পৌঁছানোর একমাত্র উপায় ছিল গরুরগাড়ি কিংবা ঘোড়ার গাড়ি।

১৯৫১-৫২ নির্বাচনের পর ১৯৫৭ সালের সাধারণ নির্বাচনেও শ্রীসেনই মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক ছিলেন। প্রথমবারের তুলনায় দ্বিতীয় নির্বাচনের প্রক্রিয়ার ব্যয় কমেছিল প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা। এর কারণ হল প্রথমবারে বানানো সমস্ত ব্যালট বক্সই, দূরদর্শী শ্রী সেন সযত্নে সুরক্ষিত রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন।

 ভারতের প্রথম নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সাফল্য সে সময় গোটা বিশ্বে সাড়া ফেলে দিয়েছিল। বিশ্বের তৎকালীন গণতান্ত্রিক দেশগুলি, যেমন আমেরিকা কিংবা ইওরোপের কোন দেশের সাহায্য ছাড়াই, সদ্য স্বাধীন হওয়া একটা দেশ যে এত নির্বিঘ্নে এমন সার্বিক নির্বাচনের আয়োজন করতে পারবে, একথা তথাকথিত সুসভ্য শ্বেতবর্ণ মানুষদের পক্ষে হজম করা নিঃসন্দেহে কঠিন ছিল বৈকি!  অনুমান করে নেওয়া যায় সদ্য ভারত ছেড়ে যাওয়া ইংরেজ শাসকরাই ঈর্ষান্বিত হয়েছিল সব থেকে বেশি। কারণ যে দেশের অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্কই ছিল নিরক্ষর। যে দেশে মাত্র বছর চারেক আগেই ১৯৪৬-৪৭ সালে ধর্ম নিয়ে এবং দেশভাগ নিয়ে দেশের পূর্ব ও পশ্চিম সীমান্তে ঘটে গেছে অজস্র গণহত্যার বীভৎস ঘটনাসমূহ। স্বাধীনতা লাভের পরেই যে দেশকে ১৯৪৭-৪৮ সালে, সদ্যজাত প্রতিবেশী দেশের উদ্ধত আক্রমণকে শক্ত হাতে দমন করতে হয়েছে। যে দেশের ৭০% - ৮০% মানুষ জীবনযাপন করতেন  দারিদ্রসীমার নীচে। এই সকল প্রতিকূলতাকে নিপুণ হাতে সামলে, নবজাত একটি দেশের এমন সার্বিক সাফল্যের মূল্যায়ন - আজকের অত্যাধুনিক যুগে দাঁড়িয়ে তার আন্দাজ করাও অসম্ভব।

১৯৫২ সালের স্বাধীন ভারতের প্রথম নির্বাচনের পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক শ্রী রামচন্দ্র গুহ লিখেছেন, 


Nehru's haste [in wanting India's first general election] was understandable, but it was viewed with some alarm by the man who had to make the election possible, a man who is an unsung hero of Indian democracy. It is a pity we know so little about Sukumar Sen. He left no memoirs and, it appears, no papers either. ...

It was perhaps the mathematician in Sen, which made him ask the prime minister to wait. No officer of State, certainly no Indian official, has ever had such a stupendous task placed in front of him. Consider, first of all, the size of the electorate: 176 million Indians aged 21 or more, of whom about 85 per cent could not read or write. Each voter had to be identified, named and registered. This registration of voters was merely the first step. For how did one design party symbols, ballot papers and ballot boxes for a mostly unlettered electorate? Then, polling stations had to be built and properly spaced out, and honest and efficient polling officers recruited. Voting has to be as transparent as possible, to allow for the fair play of the multiplicity of parties that would contest. Moreover, with the general election would take place elections to the State Assemblies. Working with Sukumar Sen in this regard were the election commissioners of the different provinces, also I.C.S. men.

 নবীন ভারতের প্রথম নিরপেক্ষ এবং সাবলীল নির্বাচনী প্রক্রিয়ার দিকে তাকিয়ে ছিল, বিশ্বের বহু উন্নতিশীল  গণতন্ত্রকামী দেশ। তাদের মধ্যে একটি দেশ হল সুদান। সে দেশের ১৯৫৩ সালের প্রথম সাধারণ নির্বাচন প্রক্রিয়াটি পরিচালনা করার জন্যে, ১৯৫১-৫২-র সাধারণ নির্বাচনের পরেই সুদান থেকে শ্রী সেনের কাছে আমন্ত্রণ আসে। ১৯৫৭ সালে সুদানের প্রথম যে নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়, তার অধিকাংশ নির্বাচনী প্রক্রিয়া এবং আইনগুলি ভারতীয় নিয়মের অনুসারী ছিল।

১৯৫২ সালের পাঁচ বছর পর ১৯৫৭ সালের সাধারণ নির্বাচনের সময়েও তিনিই ভারতীয় নির্বাচন কমিশনের প্রধান ছিলেন এবং ১৯৫৮ পর্যন্ত তিনি ওই পদেই নিযুক্ত ছিলেন। ১৯৫৪ সালে ভারত সরকার তাঁকে “পদ্মভূষণ” সম্মানে ভূষিত করেন। নির্বাচন কমিশনের পদ ছাড়ার পর  ১৯৬০ সালে বর্ধমানের রাজবাড়ি, গোলাপবাগে নব প্রতিষ্ঠিত বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য হয়েছিলেন সুকুমার সেন।

জিটি রোড থেকে গোলাপবাগ পর্যন্ত প্রধান রাস্তাটি তাঁর নামেই চিহ্নিত করা হয়। আবার তাঁর অবদানের কথা মনে রেখে সুদূর সুদানের রাজধানী খার্তুম শহরেও তাঁর নামাঙ্কিত একটি প্রধান রাস্তা আছে। কিন্তু যৎসামান্য এই স্মৃতিরক্ষার প্র্য়াসটুকু ছাড়া এমন একটি কৃতী বাঙালীকে আমরা আজ ভুলেই গেছি। এই কলকাতা শহরে কোন আয়োজন নেই তাঁর স্মৃতি রক্ষার।

১৯৬৩ সালের ১৩ই মে তাঁর পরলোক যাত্রার সঙ্গে সঙ্গেই শেষ হয়েছিল বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতবর্ষের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সূচনা পর্বটি।

গুগ্ল সার্চ করে উইকিপিডিয়া এবং কয়েকটি সর্বভারতীয় পত্রিকার ওয়েবসাইট থেকে যেটুকু তথ্য তাঁর সম্বন্ধে জানা যায় – সেটুকুই এই প্রবন্ধে তুলে ধরতে পারলাম। এই লেখাটি পড়ে আশা করি কোন উৎসাহী গবেষক, তাঁর সম্বন্ধে আরও বেশী তথ্য সংগ্রহ করে আমাদের সামনে তুলে ধরবেন। এবং সেটাই হবে তাঁর প্রতি আমাদের এতদিনের অবহেলার প্রায়শ্চিত্ত।      

 --০০--

 চিত্রঋণঃ উইকিপিডিয়া।

 


বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ২ /৩

 এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১




দ্বিতীয় স্কন্ধ - তৃতীয় পর্ব

শ্রী ব্রহ্মার পরমেশ্বরের মহিমা বর্ণন

 শ্রীসূত বললেন, “উত্তরানন্দন রাজা পরীক্ষিৎ, শ্রীশুকদেবের কথা শুনে “শ্রীকৃষ্ণই একমাত্র পথ” নিশ্চয় করলেন। এবং অবিচলিতভাবে প্রাণ ও মন সমর্পণ করে, নিজের দেহ, জায়া, পুত্র, কন্যা, গৃহ, অশ্ব, গজ, গাভি, ধনরত্ন, বন্ধু ও নিরুপদ্রব রাজ্যের সঞ্চিত বাসনা পরিত্যাগ করলেন। হে দ্বিজগণ, মৃত্যু আসন্ন জেনে, সকল বিষয় ও কর্ম ত্যাগ করে, রাজা পরীক্ষিৎ ভগবান বাসুদেবকে অত্যন্ত আপনার জন বলে অনুভব করলেন এবং সেই ভাবনায় জিজ্ঞাসা করলেন, “হে ব্রহ্মন, আপনি সর্বজ্ঞ ও নির্মলচেতা। আপনার শ্রীমুখে শ্রীহরিকথা শুনে আমার মন থেকে অজ্ঞানের অন্ধকার দূর হয়ে গেল। এখন আপনাকে আরেকটি জানার বিষয় জিজ্ঞাসা করি, কৃপা করে উত্তর দিন। চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি এই যে বিশ্ব, এই বিশ্ব লোকপালগণের তর্কের অতীত। পরম পুরুষ ভগবান যে আত্মমায়ায় এই বিশ্বর সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয় করে থাকেন। যে যে শক্তিতে সর্বশক্তিমান প্রভু নিজেকে মহত্তত্ত্ব ও অহংকারতত্ত্বরূপে পরিণত করেন। ব্রহ্মা ও মরীচি প্রভৃতি প্রজাপতিদের সঙ্গে খেলার ছলে নিজেকে দেব, মনুষ্য, তির্যক ইত্যাদি রূপে সৃষ্টি করেন, সেই তত্ত্বটি শুনতে ইচ্ছা হয়। অদ্ভূত লীলাবিহারী ভগবানের এই সৃষ্টিলীলা শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতেরাও জানেন না, এই বিষয়ে আমি নিশ্চিত। এই বিষয়ে আমার মহা সংশয় আছে, আপনি বিচারে বেদজ্ঞ এবং অনুভবে পরব্রহ্মের তত্ত্বজ্ঞ, অতএব আপনি কৃপা করে আমার এই সন্দেহ দূর করুন”

[আমরা আশৈশব ত্রিদেব অর্থাৎ ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বরকেই আমাদের ঈশ্বর বলে জেনে এসেছি। এও জেনেছি ব্রহ্মা হলেন জগৎস্রষ্টা, বিষ্ণু জগন্নিবাস এবং মহেশ্বর জগৎ বিনাশক। কিন্তু বিভিন্ন পুরাণে, বিশেষ করে ভাগবত ও শৈব পুরাণগুলিতে যথাক্রমে বিষ্ণু ও শিবকেই পরমেশ্বর বা পরমপুরুষ রূপে তুলে ধরা হয়েছে। এই ভাগবত পুরাণ যেহেতু বিষ্ণুর মহিমা বর্ণন - সেখানে ব্রহ্মা নিজেই বিষ্ণু বা শ্রীহরিকে পরমেশ্বর প্রমাণে ব্রতী হয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, শ্রীহরিই ব্রহ্মারও সৃষ্টিকর্তা, এবং শ্রীহরিই ব্রহ্মাকে ঈশ্বরত্ব প্রদান করেছিলেন। বেশ মজার ব্যাপার না?]       

শ্রীশুকদেব মহারাজের এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে হৃষীকেশের স্মরণে স্তুতি করার পর বললেন, “শ্রীবাসুদেবের অবতার শাস্ত্রকর্তা আমার পিতা শ্রীব্যাসদেবের চরণ বন্দনা করি, কারণ আমার মতো ভক্তগণ তাঁর মুখপদ্মের জ্ঞানময় মধু পান করে পরম তৃপ্তি পেয়েছি। হে রাজন, শ্রীহরি স্বয়ং ব্রহ্মাকে এই বিষয়ে উপদেশ দিয়েছিলেন এবং দেবর্ষি নারদও এই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করলে, বেদগর্ভ ব্রহ্মা তাঁকে এই বিষয়ের যথাযথ সিদ্ধান্ত কীর্তন করেছিলেন”

শ্রীনারদ ব্রহ্মাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “হে দেবদেব, আপনাকে নমস্কার। আপনি ভূত সকলের স্রষ্টা, এই কারণে আপনি অনাদি। যে সাধনে আত্মতত্ত্বের সম্যক উপলব্ধি হয়, আমাকে সেই উপদেশ দিন। হে প্রভু, যিনি এই বিশ্বকে প্রকাশ করেছেন, যাঁকে আশ্রয় করে এই বিশ্ব অবস্থান করছে, যাঁর থেকে এই বিশ্বের আবির্ভাব, এই বিশ্ব যাঁর মধ্যে লয় পাবে; এই বিশ্ব যাঁর অধীন এবং এই বিশ্বের যিনি প্রকৃত স্বরূপ, এই সমস্ত তত্ত্ব বর্ণনা করুন। আপনি এই বিশ্বের কারণ, অতএব এই বিশ্বের ভূত, ভবিষ্যত ও বর্তমান সবই আপনি জানেন। হাতের মুঠিতে থাকা আমলকির মতো, এই বিশ্ব আপনার কাছে অত্যন্ত পরিচিত

হে পিতা, বিশ্বের তত্ত্ব বলার আগে আপনি নিজের তত্ত্ব প্রথমে বর্ণনা করুন। আপনার জ্ঞানদাতা কে? আপনি কার আশ্রয়ে, কার অধীনে অবস্থান করছেন এবং আপনার স্বরূপই বা কী? আমার মনে হয় আপনিই জগতের স্বতন্ত্র পরমেশ্বর। একা আপনিই মায়ার প্রভাবে ভূতপদার্থ দিয়ে ভূতবিষয়সমূহ সৃষ্টি করে, নিজের মধ্যেই পালন করছেন। মাকড়সা যেমন অনায়াসে নিজের দেহ থেকে তন্তুজাল বিস্তার করে, তেমনি আপনিও নিজের মায়াশক্তির প্রভাবে, নিজের দেহ থেকেই এই ব্রহ্মাণ্ডকে অবলীলাক্রমে প্রকাশ করে চলেছেন। কিন্তু একটি বিষয়ে আমার মনে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। আপনি এত শক্তিসম্পন্ন হয়েও কার উদ্দেশে ঘোর তপস্যা করছিলেন? হে সর্বজ্ঞ ও সর্বেশ্বর, এই সমস্ত প্রশ্নের যথার্থ সিদ্ধান্ত যাতে আমার সম্যক উপলব্ধি হয়, আপনি আমাকে সেই ভাবে উপদেশ করুন”

পিতামহ ব্রহ্মা বললেন, “হে বৎস, সন্দেহ করে যে প্রশ্ন তুমি করলে, সে প্রশ্ন সমীচীন। শ্রীভগবানের মাহাত্ম্য বর্ণনা করার জন্যে তুমি আমাকে প্রবৃত্ত করছো, এই কারণে পুত্র হয়েও আমাকে তুমি দয়াই করলে। তুমি যে আমার ঈশ্বরত্বের প্রশংসা করলে, এই কথা সম্পূর্ণ অসত্য নয়। কারণ, আমার মধ্যে ঈশ্বরত্ব আছে, কিন্তু যে পরমেশ্বরের থেকে আমার এই ঈশ্বরত্ব, তাঁর সম্পর্কে তুমি কিছুই জানো না। তাঁর বিষয়ে তোমাকে বলছি, মন দিয়ে শোন।

সকল জীবের মধ্যে একজন প্রকাশক বিষয় আছেন, তাঁকে চৈতন্য বলে; জ্ঞান তাঁর শক্তি। শ্রীভগবান তাঁর চৈতন্যস্বরূপে প্রথমতঃ যাবতীয় বস্তু প্রকাশ করার পর, চন্দ্র, সূর্য, অগ্নি, গ্রহ, নক্ষত্র ও তারকাসমূহের প্রকাশ হয়। একই ভাবে তিনি নিখিল বিশ্বকে প্রকাশ করলে, আমি সৃষ্টি দিয়ে তাকে ব্যক্ত করি। অতএব আমি স্বতন্ত্র প্রকাশক নই। যাঁর দুর্জয় মায়ায় মুগ্ধ হয়ে তোমরা আমাকে জগৎকর্তা বলে কীর্তন কর, আমি কিন্তু সেই ভগবান বাসুদেবের ধ্যান ও বন্দনা করি। হে পুত্র, ক্ষিতি, জল প্রভৃতি মহাভূত সকল বিশ্বের উপাদান। কর্ম জীবের বারবার জন্মের কারণ। কালশক্তি সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ এই তিনগুণের তারতম্যের কারক, এই স্বভাবগুণের পার্থক্যের কারণে জীবের সুখ ও দুঃখের ভোগ হয়ে থাকে। বেদসমূহ শ্রীনারায়ণ থেকেই আবির্ভূত হয়েছে। দেবতাগণ শ্রীনারায়ণের অঙ্গ থেকে সৃষ্টি হয়েছেন। স্বর্গলোক ইত্যাদি তাঁর আনন্দের অংশ এবং যজ্ঞসকল তাঁকে লাভ করার সাধনা ছাড়া আর কিছুই নয়। প্রাণায়াম, যোগ, তপস্যা, একাগ্রচিত্তে প্রকাশিত জ্ঞান এবং জ্ঞানের ফলস্বরূপ মোক্ষ, সব কিছুই শ্রীনারায়ণের অধীন।

তিনি প্রথমতঃ আমাকে সৃষ্টি করেছিলেন। তারপর তাঁর সৃষ্ট বস্তুই, আমি তাঁর আজ্ঞায় প্রকাশ করে থাকি। এই সৃষ্টিও আমি স্বেচ্ছায় বা নিজের প্রভাবে সম্পন্ন করতে সমর্থ নই। তিনি সাক্ষী, নিয়ন্তা ও অন্তর্যামী হয়ে কূটস্থ থাকেন, অর্থাৎ বড়ো ছোট সকল প্রাণীর বুদ্ধিতে বিরাজ করেন বলেই, সৃষ্টির ক্রিয়া সম্ভব হয়। বিশ্বের সৃষ্টি, স্থিতি ও লয় করার জন্য, ভগবান মায়ার সাহায্যে সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ এই তিনগুণ গ্রহণ করে থাকেন। কিন্তু এই তিনগুণে তিনি নিজে কখনোই প্রভাবিত হন না, এই কারণে তাঁকে নির্গুণ বলা হয়। এই তিনগুণ থেকেই পৃথিবী ইত্যাদি ভূত, চক্ষু ইত্যাদি ইন্দ্রিয় এবং সূর্য ইত্যাদি ইন্দ্রিয়ের দেবতাসকল সৃষ্ট হয়েছেন। সুতরাং এই তিনটি গুণ মায়ামুগ্ধ জীবকে বন্ধন করে রাখে। তখন জীব, আমিই দেহ, আমিই ইন্দ্রিয়, আমিই দেবতা, কখনো বা আমিই আত্মা, এইরূপ কল্পনা করে এবং নিজেকে কর্তা চিন্তা করে, ভুল করে। এই তিনগুণ জীবকে মোহে আচ্ছন্ন করে রাখে বলে, জীব শ্রীভগবানকে উপলব্ধি করতে পারে না।

প্রলয়ের কালে নিখিল বিশ্ব শ্রীভগবানে লীন থাকে। তারপর যখন তাঁর বহু হবার ইচ্ছা হয়, তখন সৃষ্টির ক্রিয়া আরম্ভ করেন। তাঁর এই ইচ্ছার কেউ নিয়ামক নেই, অর্থাৎ কখন তাঁর ইচ্ছা হবে, এমন নির্দেশ কেউ দিতে পারে না। যখন তাঁর ইচ্ছার উদ্রেক হয়, কালশক্তির প্রয়োগে, তিনি সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ এই তিন গুণের সাম্য অবস্থায় থাকা প্রকৃতিকে সংক্ষুব্ধ অর্থাৎ চঞ্চল করে তোলেন। তার ফলে প্রকৃতিতে এই তিন গুণের সাম্য অবস্থা ভেঙে, কমবেশীর তারতম্য ঘটে যায়। প্রকৃতির মধ্যে এই বৈষম্য ঘটে গেলে, মায়ার অধীশ্বর শ্রীহরি প্রকৃতির স্বভাবশক্তিকে জাগিয়ে তোলেন। তার ফলে প্রকৃতি মহত্তত্ত্ব, অহংকারতত্ত্ব প্রভৃতি জগতের যাবতীয় উপাদানে পরিণত হয়। প্রলয়ের পূর্বকল্পে যে সকল জীব তাঁর মধ্যে লীন হয়েছিল, তারা নিজেদের ভিন্ন ভিন্ন অদৃষ্ট নিয়েই লীন হয়েছিল। এই অদৃষ্টিকেই জীবের কর্মফল বলে। প্রকৃতি বিশ্বের উপাদানে পরিণত হওয়ার সময়, জীব নিজের নিজের অদৃষ্ট অনুসারেই, ভোগের উপযোগী হয়ে সৃষ্ট হয়। হে বৎস, এই সৃষ্টির মধ্যে রহস্য এই যে, সমস্ত শক্তিই ঈশ্বরের ইচ্ছায় উৎপন্ন হয় এবং  ঈশ্বর নিজেই বহুরূপে প্রকাশ হয়েছেন, এই বিষয় মায়ামাত্র।

আগে যে মহত্তত্ত্বের কথা বললাম, এতে সত্ত্বগুণ ও রজোগুণ বেশি পরিমাণে এবং তমোগুণ কম পরিমাণে থাকে। মহত্তত্ত্ব বিকৃত হয়ে আরেকটি তত্ত্ব উৎপন্ন হয়, তার নাম অহঙ্কারতত্ত্ব, এতে তমোগুণের পরিমাণ বেশি। এই তত্ত্বেই সকল ভূত, ইন্দ্রিয় ও দেবতা সৃষ্টির বীজ নিহিত থাকে। এই তত্ত্ব আবার বিকৃত হয়ে তিন গুণের প্রভাবে তিন রকম হয়ে ওঠে। সাত্ত্বিক অহঙ্কার থেকে দেবতা, রাজস অহঙ্কার থেকে ইন্দ্রিয় এবং তামস অহঙ্কার থেকে সকল ভূতের সৃষ্টি হয়।

প্রথমতঃ এই তামস অহঙ্কার থেকে সূক্ষ্ম শব্দ অনুভূত হয়, তারপর এই শব্দ থেকে সৃষ্টি হয় আকাশ। এই শব্দ আকাশের অসাধারণ ধর্ম। এই শব্দ থেকেই দ্রষ্টা ও দৃশ্য এই উভয় বস্তুর বোধ নিষ্পন্ন হয়। যদি চোখের আড়ালে কেউ “গজ” এই শব্দ বার বার উচ্চারণ করে, তাহলে ওই শব্দে গজদ্রষ্টা পুরুষ ও দৃশ্য গজ – উভয় পদার্থেরই বোধ তৈরি হয়। তারপর আকাশ স্পর্শরূপে বায়ু সৃষ্টি করে। স্পর্শ বায়ুর অসাধারণ ধর্ম। এই বায়ুতে জীব প্রাণধারণ করে এবং এই বায়ু থেকেই ইন্দ্রিয়, মন ও শরীরের দক্ষতা আসে। এইভাবে কাল ও স্বভাবের বশে বায়ু বিকৃত হয়ে রূপ সৃষ্টি করে। এই রূপই তেজের উৎপত্তির কারণ। তেজে নিজের অসাধারণ ধর্ম রূপ এবং শব্দ ও স্পর্শ এই দুই কারণ অনুভব করা যায়। এরপর তেজ থেকে রস জলরূপে পরিণত হয়। রস জলের অসাধারণ গুণ এবং জলে আগেকার কারণ সমূহ বর্তমান থাকায় শব্দ, রূপ ও স্পর্শ অনুভব করা যায়। জল থেকে গন্ধগুণ উৎপন্ন হয়ে পৃথ্বীতত্ত্ব সৃষ্টি করে। গন্ধ পৃথ্বীতত্ত্বের অসাধারণ গুণ, কিন্তু কারণের গুণ সংক্রামিত হয়ে, পৃথ্বীতত্ত্বে শব্দ, স্পর্শ, তেজ ও রস অনুভব হয়ে থাকে।

এইভাবে সাত্ত্বিক অহঙ্কার থেকে মন ও দশ দেবতা প্রকাশ হন। তার মধ্যে দিক কর্ণের, বায়ু ত্বকের, সূর্য চক্ষুর, প্রচেতা রসনার, অশ্বিনীকুমারদ্বয় ঘ্রাণের ইন্দ্রিয় নাসিকার, অগ্নি বাক্য ইন্দ্রিয়ের, ইন্দ্র হাতের, উপেন্দ্র পায়ের, মিত্র গুহ্যের ও প্রজাপতি উপস্থের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা। এইভাবে রাজস অহঙ্কার থেকে জ্ঞানশক্তি বুদ্ধি ও ক্রিয়াশক্তি প্রাণ প্রকাশিত হয়ে চোখ, কান, নাক, জিহ্বা ও ত্বক এই পঞ্চ জ্ঞানের ইন্দ্রিয় এবং বাক, হাত, পা, পায়ু ও উপস্থ এই পাঁচ কর্ম ইন্দ্রিয় উৎপন্ন করে। এইভাবে ভূত, ইন্দ্রিয়, মন ও প্রাণ সৃষ্টি হলেও, তারা পৃথক পৃথক অবস্থান করার জন্যে, দেহ তৈরি করতে পারে না। শেষে শ্রীভগবানের শক্তিতে তারা মিলিত হয় এবং উপাদানের মধ্যে একে অপরের অধীন থেকে এই ব্যষ্টি অর্থাৎ আলাদা আলাদা জীবদেহ এবং সমষ্টি অর্থাৎ ব্রহ্মাণ্ডদেহ নির্মাণ করে”। 

[উপস্থ কথাটির অর্থ জননেন্দ্রিয় - স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে।]


বুধবার, ৩ জুন, ২০২৬

খাই খাই - পর্ব ১

 ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) "

ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল্প) "

ছোটদের শিকার কাহিনী - " কিরণাগড়ের বাঘ "

ছোটদের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস - " লিলিপুট "

আগের প্রবন্ধ গল্প - " অস্ত্রের ঝংকার "

ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " লিখিব পড়িব - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " মুদ্রা ও টাকাকড়ি - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ -গল্প - " আগুনের পরশমণি - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " ঘড়ি করে টিক টিক - পর্ব ১ "




  পর্ব-১

 

আদিম মানুষের এই বড়সড়ো দলটাতে ছেলেমেয়ে, বুড়োবুড়ি, যুবকযুবতী মিলে প্রায় পঁচাত্তর জন। ভোরে ঘুম থেকে উঠেই ওদের একটাই চিন্তা – সেটা হল খাদ্য যোগাড়ের চিন্তা। দলের এতগুলো মানুষের জন্যে প্রচুর খাদ্য চাই। ওরা প্রধানতঃ শিকার করে, যে কোন ধরনের পশু – তবে মাংসাশী পশুর থেকে তৃণভোজী পশু শিকারেই ওদের বেশি আগ্রহ। মাংসাশী পশু ছোট ছোট দলে ঘোরাফেরা করে, তাদের শিকার করাতে খুব ঝুঁকি, তারা মানুষকে ভয় পায় কম, আর প্রায়শঃ ঘুরে দাঁড়িয়ে আক্রমণ করে শিকারী মানুষকেই, ঘায়েল করে দেয় - কখনো কখনো শিকারীই শিকার হয়ে যায়! সেদিক থেকে তৃণভোজী পশুরা বড়ো বড়ো দলে থাকে, তারা মানুষের দলকে ভয় পেয়ে দৌড়ে পালাতে থাকে, তাদের মধ্যে থেকে বৃদ্ধ, দুর্বল কিংবা শিশু পশুদের শিকার করা অনেক কম বিপজ্জনক। তাছাড়া তৃণভোজী পশু খাদ্য হিসেবে স্বাদে গন্ধেও অনেক সুস্বাদু। পশু ছাড়া মানুষগুলো অন্য খাদ্য হল, গাছের ফল, মাটি থেকে খুঁড়ে তোলা নানান কন্দ, কিন্তু সে আর কত? জন সংখ্যার দিক থেকে তার পরিমাণ অপ্রতুল।

গাছের কাণ্ড, ডালপালা আর বড়ো বড়ো পাতার ছাউনি দেওয়া ঘরে মানুষগুলো থাকে। অনেকগুলো ঘর-পাশাপাশি, ঘেঁষাঘেঁষি করে বানানো একটা গ্রামে। সেই গ্রামের চারদিকে সারি সারি শক্ত মোটা গাছের কাণ্ড মাটিতে পুঁতে বেড়া দেওয়া, জানোয়ারের দল কিংবা দলছুট জানোয়ার যাতে হুট করে আক্রমণ করতে না পারে!

এই মানুষগুলো শুনেছে, তাদের আগের মানুষেরা এমন ঘর বানাতে পারতো না। তাদের অধিকাংশ থাকতো ঘনজঙ্গলের মধ্যে বড়বড়ো গাছের ওপর, আবার কেউ কেউ থাকত গুহার মধ্যে। আরো আশ্চর্য তারাও এদের মতোই শিকার করত, আর পশুর কাঁচা মাংস খেত। ইস্‌, তারা কি জংলী মানুষ ছিল রে বাবা, আগুনে না পুড়িয়ে কাঁচা রক্তমাখা কাঁচা মাংস কী করে খেত কে জানে? ভাবলেই ঘেন্না করে! ওই মানুষগুলির তুলনায়, এরা নিজেদের খুবই সভ্য ও আধুনিক মনে করে, কারণ তারা শিকার করা পশু, আগুনে পুড়িয়ে এবং মাটি থেকে তুলে আনা কন্দ সেদ্ধ করে খায়।

ওরা যখন শিকারে যায়, শিশুরা আর বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা ঘরে থাকে, তাদের দেখভালের জন্যে থাকে দু –তিনজন যুবক-যুবতীবাকি সবাই – নারী ও পুরুষ একসঙ্গে শিকারে যায়। শিকার পাওয়ার ব্যাপারটা কিন্তু খুবই অনিয়মিত। কোন কোনদিন প্রচুর পশু হাতের কাছেই শিকার হওয়ার জন্যেই যেন ঘুরে বেড়ায়। আবার কোন কোন দিন একজঙ্গল থেকে অন্য জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে পশুর দেখাই মেলে না, যাও বা এক আধটা পাওয়া যায়, তারা মানুষের সাড়া পেলেই দৌড়ে পালিয়ে যায় গভীর জঙ্গলে। এমনই একদিন, ব্যর্থ শিকারের দিনে, হঠাৎ বদলে গেল, মানব সভ্যতার দিশা।

সেদিনও সকাল থেকে জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে পুরো দলটা ক্লান্ত, অবসন্ন, তৃষার্ত – কিন্তু একটাও শিকার জুটল না। দুপুর গড়িয়ে দিন চলেছে বিকেলের দিকে। ঘুরতে ঘুরতে একসময় তারা চলে এল জঙ্গলের এক ধারে, ঘন গাছ আর ঝোপঝাড়ের আড়াল থেকে তারা দেখতে পেল, বিস্তীর্ণ জলা জমিময় হলদেটে সবুজ বিস্তীর্ণ ঘাসের ক্ষেত্র। তার ওপাশে বয়ে চলেছে একটা তিরতিরে নদী। তারা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল অনেকক্ষণ, ওই ঘাসের ক্ষেত্রের দিকে।

তারা ওই নদী আর তার বেলাভূমির ওই বিস্তীর্ণ তৃণভূমির দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হল, তা কিন্তু নয়। তারা মুগ্ধ হল এই দেখে যে, ওই তৃণভূমির চারপাশে অজস্র তৃণভোজী পশু মহানন্দে মহাভোজে ব্যস্ত। অন্য কোনদিকে তাদের যেন দৃষ্টি দেওয়ার সময় নেই, চোখ বন্ধ করে, তারা মহা আরামে খেয়ে চলেছে ওই হলদেটে সবুজ ঘাস। এই পশুরা ছাড়াও নানান রকমের নানান রঙের পাখি ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ছে বসছে, ওই তৃণভূমির ওপর, আর খুঁটে খুঁটে খেয়ে চলেছে কিছু। পাথরের আর কাঠের অস্ত্রগুলো শক্তহাতে চেপে ধরে, শিকারী মানুষগুলো, নীচু হয়ে সন্তর্পণে এগোতে লাগল, তৃণভূমির দিকে। পশুগুলো খাওয়ায় এতই মগ্ন ছিল, প্রথম লক্ষ্যই করল না কেউ এবং যখন করল, তখন বড্ডো দেরি হয়ে গেছে। বেশ কয়েকটা পশু ঘায়েল হল মানুষের অস্ত্রে, বাকিরা পালিয়ে গেল জঙ্গলের গভীরে! কিন্তু পাখিরা সবাই অনেকটা উঁচুতে চক্রাকারে ঘুরতে লাগল, মানুষগুলো তৃণক্ষেত্র ছেড়ে বেরিয়ে এলেই, তারা আবার নেমে আসবে এই ঘাসের জমিতে।

সারাদিনের ব্যর্থতার পর সহজ শিকারের সাফল্যে, মানুষগুলো প্রায় সবাই যখন খুব ব্যস্ত আহত পশুদের বধ করে, বয়ে গ্রামে নিয়ে যাওয়ার যোগাড়ে, সেই সময় এক যুবক আর যুবতী – জলাভূমির সেই ঘাসের গুচ্ছগুলি দেখতে লাগল খুঁটিয়ে। কোমর ভর উঁচু এই ঘাস, তার সরু সরু পাতাগুলির রঙ হলদেটে সবুজ, আর প্রত্যেক ঘাসের শীর্ষে দুলছে পুষ্ট একগুচ্ছ হলুদ রঙের বীজের ছড়া। এই ঘাস খেতেই পশুদের এত আগ্রহ, আর পাখিদের আগ্রহ এই বীজের দানা খুঁটে খাওয়াতে? যুবতী কঠিন নখে খুঁটে ছাড়িয়ে ফেলল, কয়েকটি বীজের খোসা, বেরিয়ে এল ভেতরের সাদা রঙের দানা। একমুঠি ছাড়িয়ে কিছুটা নিজের মুখে নিল, বাকিটা দিল সঙ্গীর হাতে। দুজনেই সেই শক্ত দানা চিবোতে লাগল দাঁতে। দানা পিষ্ট হয়ে, লালায় মিশে জিভে এনে দিল নতুন এক স্বাদ, নতুন এক গন্ধ। দুজনেই মহানন্দে গিলে ফেলল, এই নতুন খাদ্য। পশুর কাছে এই ঘাস এবং পাখির কাছে এই দানা যখন প্রিয় খাদ্য, তখন বিষাক্ত কিছু হওয়ার সম্ভাবনা বেশ কম। যুবক ও যুবতী ঘাড় তুলে দেখল, দলের বাকি সবাইকে, সকলেই তখনো ব্যস্ত পশুগুলোকে বহন করার যোগাড়ে। তারা দুজনে আর বিলম্ব করলো না, তাদের ধারালো পাথরের অস্ত্র দিয়ে, অতিদ্রুত সপাসপ কাটতে লাগল ঘাসের শীষগুলি, জমা করতে লাগল এবং ছোট ছোট আঁটি বাঁধতে লাগল, একটা একটা ঘাস ছিঁড়ে তার বাঁধনে।

সেদিন শেষ বিকেলে সেই মানুষের দলটি যখন গ্রামে ফিরল, তারা বহন করে আনল, মোট চোদ্দটি পশু, আর অন্ততঃ ছয় বোঝা ঘাসের দানা!

গ্রামে ফিরে একদল মানুষ যখন আগুন জ্বেলে পশুগুলোকে ঝলসানোর যোগাড় করতে লাগল, দলের নেত্রী ইরা দেখলেন, বয়ে আনা শীষগুলি থেকে দানা ঝাড়ছে সেই যুবতী। তিনি সেই যুবতীর পাশে বসে বললেন,

“তুই কী করছিস রে, রিরি? বাজে সময় নষ্ট না করে, পশু ঝলসানোয় যা না! কী করবি কি ওই দানাগুলো নিয়ে, খাবি না কি?” যুবতী রিরি মুখ তুলে হাসল, বলল,

“আমি খাবো, তোমরাও খাবে”।  ইরা ঘৃণায় মুখ বেঁকিয়ে বললেন,

“ছিঃ, শেষ অব্দি ঘাসপাতা খাবি, ঘাসের বীজ খাবি? তুই গরু না মোষ, রে?”

“খেয়ে দেখো না, আমরা কাঁচা দানা চিবিয়ে খেয়েছি, বেশ খেতে। একটু সেদ্ধ করে দেখবো কেমন লাগে।”

“খেতে হয় তুই খা। আমি খাবো না। তোর আর মিকার যতো উদ্ভট কাণ্ড। তোরা শিকারে গেলেই দেখেছি ভয়ে সবার আড়ালে থাকিস। ভীতু দুব্বল, অকর্মা। আরো দেখেছি, তোরা কেমন হাঁ-করা আলসে, ফ্যালফ্যাল করে চুপচাপ তাকিয়ে তাকিয়ে কী যে দেখিস, আর কী সব ভাবিস, কে জানে। শিকারে গিয়েও তোদের এই গাছাড়া ভাব আমার একদম সহ্য হয় না”। মিকা বলল,

“রোজ রোজ এই একই মাংস খেতে ভালো লাগে না, মাসি। এটা একটু খেয়ে দেখই না, খারাপ লাগবে না”।

ইরা বিরক্ত হয়ে উঠে গেলেন। রিরি আর মিকা দুজনে বসে বসে দানার খোসা ছাড়াতে লাগল। বড্ডো দেরি হচ্ছিল খোসা ছাড়াতে, কী মনে হতে, মিকা একটা পাথরের পাটার ওপর কিছু বীজ রেখে, আরেকটা পাথরে পাটা দিয়ে চেপে চেপে ঘষল কয়েকবার। সরিয়ে দেখল, খোসা খুলে গেছে, তবে কিছু দানা ভেঙে গেছে, কিছু গুঁড়ো হয়েছে, কিছু গোটাও আছে! বেশ মজা পেয়ে গেল দুজনে। রিরি বীজ ছাড়াতে লাগল, আর মিকা দানা বের করতে লাগল খোসা ছাড়িয়ে। ঘন্টা খানেকের মধ্যে বেশ অনেক দানাই তৈরি হল। তখন বড়ো মাটির পাত্রে জল দিয়ে তার মধ্যে দানা দিয়ে, বসিয়ে দিল জ্বলন্ত পাথরের উনুনে। কিছুক্ষণ পরেই জল ফুটতে শুরু হল। রিরি আর মিকা গভীর আগ্রহে ঝুঁকে দেখতে লাগল। দেখল, দানাগুলি আকারে বাড়ছে, বাড়ছে জলের ঘনত্ব, আর যত ফুটছে, তত অদ্ভূত গন্ধ ছড়াচ্ছে! সে গন্ধ দগ্ধ মাংসের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।

আশেপাশের সবাই, এতক্ষণ তেমন গুরুত্ব দেয়নি, কিন্তু অদ্ভূত এই ব্যাপারে তাদেরও কৌতূহল বাড়তে লাগল। মাত্র কয়েকমুঠো দানা পাত্রের নিচেয় পড়েছিল, মনে হচ্ছিল সামান্য, কিন্তু এখন বাড়তে বাড়তে সেই দানাগুলিই পাত্রটিকে প্রায় ভরে তুলেছে! আর স্বচ্ছ জল এখন দানার রসে মিশে ঘন তরল। রিরি গাছের একটা ডাল দিয়ে কয়েকটা দানা তুলে টিপে দেখল, বেশ নরম, আঙুলের চাপে থেঁৎলে গেল। বিকেলে কাঁচা দানাগুলি যেমন শক্ত ছিল, দাঁতে চিবুতে হচ্ছিল কটকট করে, এখন আর তেমন নয়। রিরি অনেক গুলি পাতা দিয়ে ধরে, উনুন থেকে মাটির বড় পাত্রটি নামিয়ে রাখল, তাকে সাহায্য করল, একমাত্র মিকা। নামানোর পর মুখ তুলে তাকিয়ে দেখল, তাদের ঘিরে দলের সকলে দাঁড়িয়ে আছে, সবার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, ইরা।

বড়ো একটি পাতায়, কিছুটা তুলে, মিকা ইরার দিকে বাড়িয়ে দিল মিকা, বলল,

“খেয়ে দেখই না, মাসিআমরা বিকেলে কাঁচা দানাই চিবিয়েছিলাম, বেশ লেগেছিল খেতে!” ইরা সন্দিগ্ধ হাতে তুলে নিলেন পাতাটি, প্রথমে গন্ধ শুঁকলেন, তারপর সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে, সামান্য একটু মুখে তুললেন, মুখের মধ্যে নাড়াচাড়া করে, খেয়েও ফেললেন। বললেন,

“একটু পানসে মতো, কিন্তু খাওয়া চলবে! তা হ্যাঁরে খেয়ে কোন অনর্থ হবে না তো? শরীর-টরীর খারাপ হলে?”

“কিচ্‌ছু হবে না, মাসি। আমি আর রিরি তো খেলাম, অনেকক্ষণ আগেই, কিছু হয়েছে কি? আর পাখিরা খাচ্ছে, পশুরাও খাচ্ছে, তারা বেশ মজা করেই খাচ্ছিল গো, মাসি”। ইরা পাতা শেষ করে বললেন,

“খেতে মন্দ নয় রে, আমাকে আরেকটু দে তো দেখি। তারপর সবাইকে ভাগ করে দিয়ে, তোরাও খাস। এর সঙ্গে ঝলসানো মাংসও দিস দু’টুকরো করে! আজকের খাওয়াটা একটু অন্যরকমই হোক। দেখা যাক এ কেমন খাদ্য”।

 

 

বিশেষজ্ঞরা বলেন, আজ থেকে অন্ততঃ দশ থেকে চোদ্দ হাজার বছর আগে ওরাইজা রিউফিপোগন (Oryza rufipogon) নামে বুনো এক ঘাস মানুষরা আবিষ্কার করেছিল। পরবর্তী কালে সেই ঘাসেরই তারা চাষ করতে শেখে। দীর্ঘ চাষের প্রক্রিয়ায় একটু আলাদা প্রজাতির যে ঘাস থেকে তাদের প্রধান খাদ্য উৎপন্ন করতে শুরু করে, পণ্ডিতেরা সেই প্রজাতির ঘাসের নাম দিয়েছেন, ওরাইজা সাটিভা (Oryza sativa)। এই ঘাস আসলে ধানের চারা এবং এই ধান থেকেই যে চাল উৎপন্ন হয়, সেই চালই নানান রন্ধন প্রক্রিয়ায় আজ সারা বিশ্বের অন্যতম প্রধান খাদ্য (staple food)।

শস্যসহ ধানগাছ 

প্রধানতঃ উত্তর-পূর্ব ভারতে উৎপন্ন এই চালের প্রধান উপপ্রজাতির নাম ইণ্ডিকা (indica)। আর চিনের ইয়াংসে এবং হুয়াই নদীর উপত্যকায় যে চালের চাষ শুরু হয়েছিল, সেই উপপ্রজাতির নাম জাপোনিকা (japonika)। ইণ্ডিকা চাল ভারতবর্ষ এবং ভারতীয় উপমহাদেশে ব্যাপক উৎপন্ন হত, বর্তমানে শুধু মাত্র ভারতবর্ষেই প্রায় দশহাজার উপপ্রজাতির ধান ও চাল উৎপন্ন হয়ে থাকে।

এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছো রিরি আর মিকা নামের ওই মেয়ে ও ছেলেটি, যে দানা আবিষ্কার করেছিল, সেটিই চাল, আর শস্যটি ধান। আর প্রথম দিন রান্না করে যে খাবারটা সবাই মিলে খেয়েছিল, সেটি আমরা বাঙালি, ওড়িয়া কিংবা অহোমি ঘরে আজও খাই, যার নাম “ফ্যানাভাত”! অর্থাৎ, এখন একটু ঘি বা মাখন মিশিয়ে, আলুসেদ্ধ এবং কাঁচালংকার অনুষঙ্গে যে খাবারটি আমরা অত্যন্ত তৃপ্তি করে খাই, সেটি প্রায় দশহাজার বছরের প্রাচীন রেসিপি, অনুষঙ্গগুলি সামান্য আলাদা!

ধান বা চালের মতো, প্রথম গমও অন্য এক প্রজাতির বন্য ঘাস থেকেই আবিষ্কৃত হয়েছিল এবং পরবর্তীকালে ব্যাপক চাষের ফলে, প্রাচীন ভারতে নানান প্রজাতির গম উৎপন্ন হত। 

শস্যসহ গমগাছ 

    মহেঞ্জোদরো ও হরপ্পার নগর সভ্যতার অনেক আগে, ওই অঞ্চলের বোলান নদীর মেহেরগড় অঞ্চলের উৎখননে যে গমের নমুনা পাওয়া গেছে, সেগুলি যিশুর জন্মের অন্ততঃ পাঁচ হাজার বছর আগেকার! এই প্রমাণ থেকে ধারণা করা যায়, মেহেরগড়ের উন্নত কৃষি পদ্ধতির অনেক আগে থেকেই গমের বহুল চাষ শুরু হয়ে গিয়েছিল এবং সেটা ধান চাষের সময়ের থেকে খুব একটা পিছিয়ে নেই।  এর সঙ্গে আর একটু কল্পনা যদি করে নিই যে, বিশেষ প্রজাতির ঘাস থেকে ধান ও গমের মতো সুস্বাদু এবং পুষ্টিকর খাবারের সন্ধান পেয়ে সেকালের মানুষ, থেমে থাকল না। তারা বুনো ঘাস ও ঝোপঝাড় থেকে আরও খুঁটিনাটি সন্ধান করে, অচিরেই একের পর খাদ্য শস্য  আবিষ্কার করে ফেলতে লাগল, যেমন, জোয়ার, বাজরা, তিল, সরষে, ভুট্টা, ছোলা, মটর, মুগ, মুশুর ইত্যাদি এবং নানান মশলা, যেমন লংকা, ধনে, জিরে ইত্যাদি। কী মনে হয়, আমার কল্পনাটা খুব অযৌক্তিক মনে হচ্ছে? একেবারেই না। কারণ ধান কিংবা গমের চাষ শুরু হবার কয়েক হাজার বছরের মধ্যেই আমাদের মহাকাব্য রামায়ণ ও মহাভারতে এমন সব খাবারের উল্লেখ পাওয়া যাচ্ছে, তাতে রান্নার প্রক্রিয়া তেলমশলা সহ, রীতিমতো “রন্ধন শিল্প” হয়ে উঠেছিল। 

শেষ পর্ব - " খাই খাই - শেষ পর্ব "



মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২৪

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "



[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২৩ 


৩০

 মারুলা চলে গেল বনের পথে দক্ষিণ দিকে, ভল্লা আর রামালি রওনা হল নোনাপুর গ্রামের দিকে। যেতে যেতে ভল্লা জিজ্ঞাসা করল, “কী বুঝছিস, রামালি? ভয় করছে না তো?”

“ভয় যে করছে না, তা নয় ভল্লাদাদা। করছে, তবে সেটা প্রাণের ভয় নয়। এতবড়ো একটা ষড়যন্ত্র, যার পেছনে রয়েছে আমাদের রাষ্ট্র, আমাদের প্রশাসন। ভয় হচ্ছে তার সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারব কিনা। তোমাদের কথায় অনেক কিছুই বুঝলাম। কিন্তু সে বোঝায় বেশ কিছু ফাঁক থেকে যাচ্ছে। আর এটাও বুঝছি না, এই পুরো প্রক্রিয়াতে আমার অবস্থানটা কোথায়? এই দুটো ব্যাপার বুঝতে চাই। তবে এখন নয়, নিরিবিলিতে কোন এক সময় আলোচনা করব...”।

ভল্লা বলল, “সেই ভালো। এবার তোকে সব কিছু খুলে বলার সময় এসেছে। ও হ্যাঁ, দুপুরে খাওয়ার আগে তুই ছোট মুখে কিছু বড়ো কথা বলতে চেয়েছিলি, কী কথা বলতো?”

রামালি হাসল, বলল, “আমার মুখ এখনও ছোটই আছে ভল্লাদাদা, কিন্তু কথাগুলো আরও বড়ো হয়ে উঠেছে, তোমার আর মারুলাদাদার আলোচনা শুনতে শুনতে। সে কথাও এখন তোলা থাক। কিন্তু একটা কথা বলো তো, ভল্লাদাদা, তুমি কি সত্যিই প্রধানমশাইয়ের জন্যে দুশ্চিন্তায় রয়েছ?”

ভল্লা একটু চমকে উঠল, তাকাল রামালির মুখের দিকে। তারার আলোয় রামালির মুখটা অস্পষ্ট, কিন্তু চোখদুটো চিকচিক করছে, তাকিয়ে আছে ভল্লার দিকে। ভল্লা একটু চিন্তা করে বলল, “প্রধানমশাইয়ের জন্যে যে খুব চিন্তায় আছি, সে কথা হয়তো সত্যি নয়। কিন্তু কমলিমায়ের জন্যে ভীষণ চিন্তা হচ্ছে। মায়েরা যেমন হন আর কি, নরম মনের মানুষ, সহজ-সরল। বহু বছর আগে পুত্রদের হারিয়েছেন, এখন যদি চোখের সামনে স্বামীর এমন অসম্মানের মৃত্যু হয়। কমলিমায়ের পক্ষে এই ধাক্কা সহ্য করা শক্ত হবে”।

রামালি কিছু বলল না। ভল্লা আবার বলল, “কমলিমায়ের মুখটা মনে পড়লেই…এই যে এতদূরে এসে এইসব রাজকার্য করছি… মাঝে মাঝে মনে হয়, যা কিছু করছি, ঠিক করছি কি… কোনটা যে কর্তব্য, আর কোনটা করণীয় নয়…সেটাই আজকাল কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে রে, রামালি…”! পাশাপাশি চলতে চলতে কেউ কোন কথা বলল না অনেকক্ষণ। কিছুক্ষণ পর রামালি বলল, “আমরা বনের সীমান্তে চলে এসেছি ভল্লাদাদা, এখানেই রণপাগুলো রেখে, চলো গ্রামে ঢুকি”।

 কমলিমায়ের বাড়ির পিছনের বেড়া ডিঙিয়ে ভল্লা আর রামালি ঢুকল। এবারে আর কোন সংকেত না দিয়ে, ভল্লা নিঃশব্দে সামনের উঠোনে গিয়ে, দাওয়ার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দেখল কমলিমায়ের ঘরের দরজার পাল্লা ভেজানো, ফাঁক দিয়ে আলো দেখা যাচ্ছে। ভল্লা তিনধাপ সিঁড়ি বেয়ে দাওয়ায় উঠে দরজার সামনে গিয়ে খুব নীচু স্বরে ডাকল, “মা, মা রে, এখনও ঘুমোসনি?” কোন সাড়া পেল না। ভল্লা সন্তর্পণে দরজার পাল্লায় চাপ দিল, একটু ফাঁক হতে দেখল, জুজাক শুয়ে আছেন খাটিয়ার বিছানায়। তাঁর মাথার দিকে মেঝেয় বসে আছেন কমলিমা। হাঁটুতে কনুইয়ের ভর দিয়ে রাখা হাতের ওপর মাথাটি রেখে চোখ বুজে বসে আছেন। দীপের ম্লান আলোতে তাঁর মুখটা কিছুক্ষণ দেখল ভল্লা। অসহায় ক্লান্ত মুখে জমে আছে জীবনের যাবতীয় বিষণ্ণতা। ভল্লা নিঃসাড়ে কাছে গিয়ে বসল, কমলিমায়ের হাঁটুতে হাত রাখল। কমলিমা চোখ মেলে তাকালেন। দু চোখে কোন কৌতূহল নেই, বিস্ময় নেই, আনন্দ নেই...। জিজ্ঞাসা করলেন, “কতক্ষণ এসেছিস, চোখটা একটু লেগে গিয়েছিল রে। কেমন আছিস ভল্লা?”

“কী চেহারা করেছিস রে মা? এ ভাবে নিজেকে কষ্ট দিলে প্রধানমশাইকে সারিয়ে তুলতে পারবি? তার আগেই তুইই তো মারা পড়বি রে মা? খাওয়দাওয়া বন্ধ করেছিস, ঘুমোচ্ছিস না”।

“কে বললে, খাচ্ছি না, ঘুমোচ্ছি না? সবই করছি। জীবন কারও জন্যে থেমে থাকে নাকি? এই তো গতকাল সকালে বটতলির সনাতন কবিরাজ এল। প্রধানকে দেখে গেল। ওষুধ-পথ্যি বুঝিয়ে দিল। আধমরা একটা মানুষকে ওষুধ কী ভাবে খাওয়াবো বল তো? সেদিন থেকে প্রধানের কোন সাড় নেই – শুধু প্রাণটুকুই কোনমতে ধুকধুক করছে! দিনে দশবার করে নাকের নীচে হাত রাখি - শ্বাস পড়ছে তো? বুকের ওপর কান পাতি – ধুকধুক করছে তো! আচ্ছা, সনাতন কবিরাজকে কে পাঠাল বল তো। তুই? তুই ছাড়া আর কে পাঠাবে? কবিরাজদাদা কবে আসবে জানিস? তাকে কেন ধরে নিয়ে গেল রে, আস্থানের আঁটকুড়ির ব্যাটারা? কী অপরাধ করেছে সে? ডাকাতি? হত্যা? কবিরাজদাদা থাকলে, প্রধান এতদিনে ঠিক উঠে বসত...”।

ভল্লা কমলিমায়ের দুহাঁটুতে হাত রেখে মুখের দিকে তাকিয়ে কথা শুনছিল। কান্নায় ভেঙে না পড়েও, এমন কথার হাহাকার সে কোথাও কোনদিন শোনেনি।

“দরজায় কে দাঁড়িয়ে রে? তোর সঙ্গে এসেছে বুঝি? দরজায় দাঁড়িয়ে কেন? ভেতরে আসতে বল”। রামালি নিঃশব্দে দরজা দিয়ে মুখ বাড়াল, ঘরের ভেতরে ঢুকল। “ও মা রামালি? ঘরে এসে বস। শুনলাম তোর কাকিমা তোকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। তুই এখন ভল্লার সঙ্গেই থাকিস। প্রধান তোর কাকার সঙ্গে দেখা করতে যাবে বলেছিল। সে আর হল কই? তার আগেই এসব। তা বেশ করেছিস। ভাসুরপো, ভাইপো এ সম্পর্কগুলো আজকাল বহুদূরের সম্পর্ক বাবা... কোন ভরসা নেই, কোন বিশ্বাস নেই। কে জানে কবে তোর খাবারে বিষ দিয়ে তোকে হয়তো মেরেই ফেলত...তার থেকে এ বরং ভালই হল...নিজের জীবনটা নিজের মতো গড়ে নে। আমাদের দিন তো শেষ হয়ে এল, দেখছিস। গ্রামপ্রধানকেই ধরে চোরের মার মার রাজার রক্ষীরা। শুনলাম কবিরাজদাদাকে এমন করে ধরে নিয়ে গেছে, যেন সে ডাকসাইটে অপরাধী। সাধারণ মানুষের মান-সম্মান-মর্যাদার আর কানাকড়ির মূল্যও নেই রাজশক্তির কাছে”

ভল্লা কমলিমায়ের একটা হাত নিজের হাতে তুলে নিয়ে বলল, “তুই এত ভেঙে পড়ছিস কেন, মা? দেখিস সব ঠিক হয়ে যাবে। প্রধানমশাই আবার উঠে দাঁড়াবেন। কবিরাজমশাইও ফিরে আসবেন…এত ভাবিস না…”।

কমলিমা ভল্লার হাতের মুঠিতে থাকা নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুই নাকি আমাদের ছেলেদের নিয়ে দল গড়েছিস? শুনতে পাই, তাদের লড়াই করতে শেখাচ্ছিস?” চোখ তুলে তিনি ভল্লার মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “সত্যি না কি রে?” এই মানসিক অবস্থার মধ্যেও কমলিমা আচমকা এমন একটা প্রশ্ন করে বসবেন, ভল্লা আদৌ অনুমান করতে পারেনি। এই পরিস্থিতিতে সত্যি না মিথ্যে কোনটা বলা সমীচীন হবে চট করে ভেবে পেল না। ভল্লার পিছনেই বসে থাকা রামালি বলল, “আমরা হাত-পা গুটিয়ে, ঘাড় হেঁট করে, বসে থাকবো, জেঠিমা? গ্রামের এতবড়ো অপমানটা আমরা বসে বসে দেখে যাব? শোধ নেব না?”

কমলিমা অবিশ্বাসী চোখে রামালির মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে, অস্ফুট স্বরে বললেন, “শোধ নিবি…?” একটু থেমে আবার বললেন, “রাজশক্তির বিরুদ্ধে… কী বলছিস রে?”

“হ্যাঁ জেঠিমা, আমাদের মরতে হবে জানি… কিন্তু আমাদের মারার আগে ওরাও টের পাবে, মৃত্যুর গন্ধ কাকে বলে …। সেটাই বা কম কি, জেঠিমা?”

কমলিমা কোন উত্তর দিলেন না, একইভাবে তাকিয়ে রইলেন রামালির দুই চোখের দিকে। আহত-অচেতন প্রধানমশাইকে গ্রামের মানুষরা সেদিন যখন ধরাধরি করে বাড়িতে নিয়ে এল। তাদের মুখে সব কথা শুনে তিনি স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন। সেদিন থেকে শোক, দুঃখ, বেদনার কোন অনুভূতিই আর অবশিষ্ট ছিল না তাঁর মনে। আজ হঠাৎই তাঁর সেই নির্বাক দুই চোখ ভাসিয়ে নেমে এল অশ্রুধারা।


সোমবার, ১ জুন, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৫/১

  ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "

 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  


[এর আগের পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৪/শেষ পর্বাংশ "]

পঞ্চম পর্ব /পর্বাংশ  - ১


আমাদের ধর্ম বিশ্বাসের পরিণতি

 প্রাককথা

আগের পর্বগুলিতে ৭০,০০০ বি.সি.ই থেকে মোটামুটি ১৩০০ সি.ই. পর্যন্ত হোমোস্যাপিয়েন্স নামক ভারতীয় মানব প্রজাতির ধর্মীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক ক্রমবিকাশের “আনুমানিক তত্ত্ব” এবং প্রামাণিক তথ্য সংগ্রহ সম্পূর্ণ হল। এবার এই সমস্ত তথ্যগুলির একত্রে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। একজন ভারতীয় হোমোস্যাপিয়েন্স হিসেবে, ১৩০০ সি.ই.-তে আমরা ঠিক কোথায় এসে পৌঁচেছিলাম – সে বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণা থাকলে আমাদের আধুনিক আচরণের যৌক্তিকতা খুঁজে পেতে হয়তো সুবিধে হবে।

 এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে, ১৩০০ সি.ই.-র ধারণা থেকে ২০২৬ সি.ই.-র আধুনিকতার আঁচ কীভাবে পাওয়া সম্ভব? তার উত্তরে বলা যায়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক ধারণার দিক থেকে ১৩০০ সি.ই. এবং ২০২৬ সি.ই.-র মধ্যে আকাশ-পাতাল বদল ঘটেছে। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হল, আমাদের ধর্মীয় আচরণ ও ধারণায় যেটুকু বদল ঘটেছে, তার তাৎপর্য এবং গুরুত্ব যৎকিঞ্চিৎ। সে কথা এই পর্ব শেষে আশা করি বোঝা যাবে।

বৈদিক ধর্ম থেকে বিচ্যুত ব্রাহ্মণ্যধর্ম মোটামুটি কবে হয়েছিল, সে বিষয়ে আমরা আলোচনা করেছি, দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্বে, এবং কবে থেকে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম হিন্দু ধর্মে মোড় নিতে শুরু করল তার ইঙ্গিতও আমরা পেয়েছি, আগের পর্বগুলিতে। এবার কী ভাবে এবং কেনই বা ব্রাহ্মণ্য ধর্ম হিন্দুধর্মতে রূপান্তরিত হল, সে আলোচনাই কিছুটা বিস্তারে করা যাক।

ব্রাহ্মণ্য ও হিন্দু শাস্ত্রের গ্রন্থসম্ভার অজস্র, তার প্রত্যেকটির আলোচনা এখানে সম্ভব নয়, এবং আমার মনে হয় তার প্রয়োজনও নেই। তবে সাধারণ ভাবে আমরা আমাদের ধর্মাচরণ ও ধর্ম বিশ্বাসের সমর্থনে ও প্রসঙ্গে যে যে শাস্ত্র, পুরাণ ও কাব্যগ্রন্থগুলির সচরাচর উল্লেখ করে থাকি, সেগুলির মধ্যেই আমার এই আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখব।

৫.১ ষড়দর্শন

প্রথমেই শুরু করা যাক হিন্দু ধর্মের দর্শন তত্ত্ব নিয়ে। হিন্দু ধর্মের মূল যে যে দর্শন তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে – সেই ছটি দর্শনের কথাই আমরা এই গ্রন্থে আলোচনা করব। অন্যান্য বহু দর্শন যেগুলি এই ছটি দর্শনেরই আরও সূক্ষ্মতর বা উচ্চতর মতামত কিংবা আরো অজস্র দর্শন যেগুলি বহুদিনই অপ্রচলিত, সেগুলির কোথাও কোথাও উল্লেখ আসতে পারে।            

যে ছটি দর্শন ব্রাহ্মণ্য ও হিন্দু ধর্মতত্ত্বের মূল, সেগুলিকে একত্রে ষড়দর্শন বলা হয়। এই ছটি দর্শন হল, সাংখ্য, পাতঞ্জল, বৈশেষিক, ন্যায়, মীমাংসা ও বেদান্ত। 

৫.১.১ সাংখ্য দর্শন

সাংখ্য দর্শনের স্রষ্টা কপিল মুনি। খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীর কোন সময়ে এই দর্শনের সৃষ্টি। যদিও এর কিছু কিছু তত্ত্বকথা ওই সময়ের আগে থেকেই চিন্তাশীল ঋষি, মুনিদের ভাবনাতে এবং আলোচনায় আসতে শুরু করেছিল। কপিলদেব সেই সকল বিক্ষিপ্ত আলোচনাগুলিকে সুসংহত সম্পূর্ণ করে একটি তত্ত্ব রচনা করলেন, তার নাম দিলেন সাংখ্য। পরবর্তী কালে যত দর্শন-তত্ত্বই রচনা হয়ে থাক না কেন, এই তত্ত্বের কাছে তারা প্রত্যেকেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ঋণী। এই তত্ত্ব প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল এবং সে সময় ব্রাহ্মণ বা ক্ষত্রিয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেদের সঙ্গে সাংখ্য পাঠও আবশ্যিক ছিল। এই কারণেই শ্রীমদ্ভাগবত গীতার বিভূতিযোগ অধ্যায়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কপিলমুনিকে নিজের অংশ-অবতার বলে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন (এই গ্রন্থের ২.৬.৪ অধ্যায় দেখুন)। শোনা যায় গৌতমবুদ্ধ ছাত্রাবস্থায় চার-বেদ ও সাংখ্যতে অসামান্য ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন।

ভারতবর্ষে কপিলমুনির স্মৃতি বিজড়িত পুণ্যভূমির অভাব নেই। সেগুলির মধ্যে সব থেকে বিখ্যাত গঙ্গাসাগরের কপিলমুনির মন্দির। গয়াতে ব্রহ্মযোনি পাহাড়ের গায়ে যে কপিলধারা আছে, তার পাশেও দুটি প্রাকৃতিক গুহাকে কপিলমুনির সাধন ক্ষেত্র বলা হয়। আবার নর্মদার কপিলধারা প্রপাতের পাশেই আছে কপিলেশ্বর শিবের মন্দির ও কপিলমুনির তপস্যা ক্ষেত্র[1]। অথচ কপিলাবস্তু, জনশ্রুতি অনুযায়ী যেখানে কপিলমুনির আশ্রম ছিল ও সাংখ্য তত্ত্বের চর্চা হত – হয়তো সেখানেই তাঁর কোন শিষ্যের থেকে গৌতমবুদ্ধ সাংখ্য পাঠ করেছিলেন - এই কপিলাবস্তুকে ঘিরে কপিলমুনির কোন পৌরাণিক কাহিনী পাওয়া যায় না। প্রবল বৌদ্ধ বিদ্বেষের কারণেই কী হিন্দু শাস্ত্রের এই ইচ্ছাকৃত বিস্মৃতি? কে জানে?                   

সাংখ্য দর্শনের মূল তত্ত্বটি হল, পঁচিশ সংখ্যক বিষয় বা পদার্থ – যার থেকে এই জগতের সৃষ্টি, স্থিতি ও লয়। এই পঁচিশটি পদার্থ এবং বিষয়গুলি হল এরকমঃ-

পঞ্চ মহাভূত – মৃত্তিকা, জল, বায়ু, অগ্নি এবং আকাশ। জগতের সকল জীবদেহ এই পঞ্চভূত থেকেই গড়ে উঠেছে।

পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয়– চোখ, কান, নাক, জিভ এবং ত্বক। এই পঞ্চেন্দ্রিয় দিয়ে আমাদের চারপাশের যে জ্ঞানের প্রত্যক্ষ অনুভব হয়, তাকে তন্মাত্র বলে। সেই কারণে তন্মাত্রও পাঁচটি।

পঞ্চ তন্মাত্র – রূপ, শব্দ, গন্ধ, রস এবং স্পর্শ।

পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয় – হাত, পা, বাক, পায়ু এবং উপস্থ (স্ত্রী এবং পুরুষের জননাঙ্গ)। এই পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয় দিয়েই আমরা সমস্ত কাজ করি, হাঁটা-চলা করি, খাই-দাই, কথা বলি, মলমূত্র পরিত্যাগ করি এবং সন্তান উৎপাদনের জন্য স্ত্রী-পুরুষে সঙ্গম করি। 

এই কুড়িটি বিষয়কে নিয়ন্ত্রণ করে, আরও পাঁচটি বিষয় – প্রকৃতি, পুরুষ, মহৎ-তত্ত্ব, অহংকার এবং মন।

প্রকৃতি জড় পদার্থ এবং কিন্তু সকল কার্যের কারণ। জড় পদার্থ আবার কাজ করবে কী করে? এই সন্দেহের উত্তরে সাংখ্য বলছে, প্রকৃতি তিনটি গুণের সাহায্যে কাজ করতে পারে। সেই তিনটি গুণ হল সত্ত্ব, রজঃ, তমো। তাতেও ঠিক স্পষ্ট হল না। উদাহরণ দিলে কিছুটা সহজ হবে। কাঠ জড় পদার্থ। কিন্তু তার মধ্যে আছে দাহিকা শক্তি। কোন ভাবে কাঠে অগ্নি সংযোগ করতে পারলে, সেই কাঠই আলো দেয়, উত্তাপ দেয়। সেই আগুনে রান্না করা যায়, শীতের রাত্রে হাত সেঁকে নেওয়া যায়, জংলী পশুদের ভয় দেখানো যায়, কখনো কখনো প্রতিবেশীর ঘরে আগুনও ধরানো যায়। একই ভাবে প্রকৃতি জড় হলেও, চেতনার প্রভাবে সত্ত্ব, রজ বা তমোগুণের অধিকারী হয়ে উঠতে পারে।

পুরুষ হল চেতনস্বরূপ, কিন্তু নির্বিকার এবং অকর্তা, অর্থাৎ কোন কার্যই করেন না। কোন কার্যের পরিণামও ভোগ করেন না। পুরুষ এবং প্রকৃতির সংযোগ হলেই, মহৎ-তত্ত্ব, অহংকার এবং মনের কার্যপ্রণালী শুরু হয়ে যায়, অর্থাৎ সত্ত্ব, রজঃ ও তমো গুণের ক্রিয়াকলাপ আরম্ভ হয়ে যায়। সত্ত্বগুণে কাঠে আগুন জ্বলে ওঠে, রজঃগুণে আলো এবং উত্তাপের আনন্দ উপভোগ করে অথবা তমোগুণে প্রতিবেশীর ঘরে আগুন লাগায়। কিন্তু এই আগুন জ্বলে ওঠা, আলো ও উত্তাপের আরাম কিংবা প্রতিবেশীর ঘরের আগুন থেকে, প্রকৃতি ও পুরুষের কিছু আসে যায় না। এই তিন অবস্থা হলেই বা কী, না হলেই বা কী? তারা যেমন ছিল, তেমনই থাকবে, অবিচল, উদাসীন, নির্বিকার। এই তিন অবস্থার পরিণাম বা ফল ভোগ করবে মানুষ, যার মধ্যে মহৎ-তত্ত্ব, অহংকার এবং মন আছে।  

মহৎ-তত্ত্ব বুদ্ধি স্বরূপ, যা দিয়ে আমরা বিচার করি, ভালো-মন্দ, শুভাশুভ, পাপ-পুণ্য, দুঃখ-সুখ। অহংকারের অর্থ আমিত্ব– যার থেকে আমার সন্তান, আমার স্বামী, আমার বংশ, আমিই ধনী, আমি পণ্ডিত এমন ধারণা আসে। মন হল মানুষের চেতনা – এই মনই মহত্তত্ত্ব এবং অহংকারকে নিয়ন্ত্রণ করে। 

সাংখ্য দর্শনের সব থেকে আশ্চর্য বিষয় হল এখানে কোথাও ঈশ্বর বা দেবতার অস্তিত্ব নেই। পুরোটাই বস্তুবাদী ভাবনা। প্রত্যক্ষ জড় আর জীবের, বিশেষতঃ মানুষের জীবন তত্ত্ব। এই তত্ত্বে জন্ম-মৃত্যু এবং একজন মানুষের জীবনে পাপ-পুণ্য, শুভ-অশুভ কাজ এবং তার কারণের সন্ধান করা হয়েছে। বৈদিক ধর্মের প্রাথমিক স্তরে এই তত্ত্ব দারুণ কার্যকরী এক তত্ত্ব হয়ে উঠেছিল।

কিন্তু বৈদিক সমাজ থেকে পরবর্তী কালে ব্রাহ্মণ্য সমাজ প্রতিষ্ঠার সময় এই তত্ত্বে দেখা গেল বিশাল বিপত্তি। এখানে ঈশ্বর তো নেইই, এমনকি কোন দেবতাও নেই! তাহলে এত মন্ত্র-টন্ত্র বলে, এত উপচার দিয়ে দেবতাদের উদ্দেশে যে এত বড়ো বড়ো যজ্ঞের আয়োজন, তার যৌক্তিকতা কোথায়? ব্রাহ্মণেরা সময় নষ্ট করলেন না, তাঁরা তাড়াতাড়ি আরেকটি দর্শন তত্ত্ব রচনা করতে বাধ্য হলেন, পাতঞ্জল দর্শন। প্রত্যক্ষ জড় ও জীবের সঙ্গে জুড়ে দিলেন, পরোক্ষ এক বিষয় – যে বিষয় ছাড়া ব্রাহ্মণ্য তত্ত্ব দাঁড়ায় না। 

৫.১.২ পাতঞ্জল দর্শন

ঋষি পতঞ্জলি এই দর্শন রচনা করেছিলেন, তাই এই দর্শনের নাম পাতঞ্জল। তিনি সাংখ্য দর্শনের পুরোটাই মেনে নিলেন, অর্থাৎ পঁচিশটি বিষয়ের তত্ত্ব, তার সঙ্গে শুধু যোগ করে দিলেন ঈশ্বরতত্ত্ব। অর্থাৎ পাতঞ্জল দর্শন ছাব্বিশ বিষয়-তত্ত্বের দর্শন। সাংখ্যর পুরুষকে ঋষি পতঞ্জলি দুটি পুরুষে বিভক্ত করলেন, একজন পরমপুরুষ অন্যজন পুরুষ। অর্থাৎ পরমপুরুষ এক এবং অদ্বিতীয়, আবার তিনিই অসংখ্য রূপে বিভাজিত হয়ে পুরুষ হয়েছেন, এবং মানুষ তো বটেই, সমস্ত জীবের মধ্যেই তিনি পুরুষরূপে অবস্থান করছেন। পরবর্তী সময়ে এই পুরুষকে আত্মাও বলা হয়েছে, এবং ঈশ্বর হয়েছেন পরমাত্মা। আরো পরবর্তী হিন্দু ধর্মমতে পরমাত্মা হয়েছেন পরমব্রহ্ম, বৈষ্ণবদের কাছে তিনি ভগবান বিষ্ণু এবং শৈবদের কাছে তিনিই দেবাদিদেব শিব। কিন্তু সেকথা আসবে পরে।



[1] তপোভূমি নর্মদা – প্রথম খণ্ড – পৃঃ ৩৯-৪০

পরের পর্ব - " ধর্মাধর্ম - ৫/২ "

নতুন পোস্টগুলি

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ২ /৭

  এই সূত্রে - "    ঈশোপনিষদ "  এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ " এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ...