ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "
ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১ "
ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "
ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "
ধর্মাধর্ম শেষ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৫/১ "
"ধর্মাধর্ম" গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -
গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২
(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)
অথবা
+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।
[এর আগের পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৫/১১ "]
৫.৩.৩ মহাভারতের অশুদ্ধি
মহর্ষি বেদব্যাস বেদের সংকলন এবং মহাভারত রচনা তখন সমাপ্ত করেছেন। তিনি
তখন বৃদ্ধ। সমগ্র দেশের পণ্ডিতমহলে তাঁর অশেষ যশ ও সম্মান। কিন্তু তাঁর মনে শান্তি
নেই। মহর্ষি বেদব্যাস অদ্ভূত এক মানসিক উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
তার কারণ তাঁর যুবক পুত্র শুকদেব, যিনি সর্বজন শ্রদ্ধেয় এক সিদ্ধযোগী ব্রহ্মর্ষি। সে কখনো
কখনো শিশুর মতো নগ্ন অবস্থায় বিচরণ করে, তার থাকা-খাওয়ার কোন স্থিরতা নেই। মহর্ষি এই পুত্রের জন্যে
বড়ো বিব্রত বোধ করেন। একদিন আশ্রম থেকে নগ্ন হয়ে শুকদেব বেরিয়ে পড়লেন, তাঁকে আটকাতে তিনিও
দৌড়লেন পুত্রের পিছনে। পথের ধারে এক সরোবরে কয়েকজন অপ্সরা স্নান করছিল, যুবক শুকদেব নগ্ন
অবস্থাতেই ওই সরোবরের পাশ দিয়ে যখন হেঁটে গেলেন, অপ্সরাগণ এতটুকু বিচলিত হল না।
কিন্তু বৃদ্ধ বেদব্যাস পুত্রকে অনুসরণ করে সরোবরের কাছাকাছি যেতেই অপ্সরা কন্যারা
লজ্জায় সচকিতে তাদের অঙ্গ আবৃত করল। মহর্ষি বেদব্যাস বিস্মিত হলেন, তিনি অপ্সরাদের এর কারণ
জিজ্ঞাসা করাতে তারা সলজ্জ নতমুখে বলল, “দয়া করে অপরাধ নেবেন না, মহর্ষি বেদব্যাস, আপনার পুত্র শুকদেব শিশুর
মতো, তাঁর নির্মল দৃষ্টিতে
স্ত্রী-পুরুষে প্রভেদ নেই, কিন্তু আপনার...”।
মহর্ষি বেদব্যাস আরও বিষণ্ণ হলেন। তিনি চার বেদের সংকলন করেছেন, অজস্র শিষ্যকে বেদের পাঠ
দিয়েছেন। শূদ্র এবং নারীদের বেদপাঠ নিষিদ্ধ বলে, তিনি পঞ্চম বেদস্বরূপ মহাভারত
রচনা করে,
সকলের কাছে
বেদের জ্ঞান প্রকাশ করেছেন। তিনি উপলব্ধি করলেন, পূর্ণ জ্ঞান অর্জন করা সত্ত্বেও, তিনি পূর্ণ ব্রহ্মলাভ
করতে পারেননি। সামান্য অপ্সরাগণও তাঁর মতো জ্ঞানবৃদ্ধের দৃষ্টিতে সমদর্শন দেখতে না
পেয়ে, লজ্জিতা হয়, তাঁকে সাধারণ মানুষ বলেই
মনে করে! সেদিন সরস্বতী নদীর তীরে বসে, নির্জন গোধূলিতে তিনি চিন্তা করতে বসলেন, তবে কী আমার জ্ঞান
অসম্পূর্ণ এবং অপরিণত?
সেখানে উপস্থিত হলেন ত্রিকালজ্ঞ দেবর্ষি নারদ। তিনি মহর্ষিকে তাঁর
বিষণ্ণতার কারণ জিজ্ঞাসা করলেন। মহর্ষি তাঁর মানসিক অবস্থার কথা সবিস্তারে যখন
বললেন, দেবর্ষি মনোযোগে শুনলেন।
তারপর দেবর্ষি বললেন, “হে
মুনিবর, মহাভারতে আপনি নানাবিধ
অলঙ্কার ও উপমায় ধর্ম সাধনার কথা বলেছেন, ধর্ম ও অধর্মের বিচার করেছেন, তার কর্মফলের নির্দেশ দিয়েছেন। এক
কথায় মহাভারতের কাহিনীসমূহ বায়স-চিত্ত-বাসনাগ্রস্ত মানুষের উপযুক্ত হয়েছে। তারা
কাকের মতোই ওই গ্রন্থের অলংকার, উপমা এবং সুরচিত কাহিনীগুলি ঠুকরে উপভোগ করে, অন্যত্র উড়ে যাবে।
ব্রহ্মনিষ্ঠ সত্ত্বপ্রধান ভক্ত-হংসেরা কখনো মহাভারতে বিহার করবেন না। কারণ
মহাভারতে ভগবানের যশোগান নেই, মহিমাগাথা নেই। অশুদ্ধপদে, ভ্রান্ত উপমায় বাসুদেবের মহিমা
কীর্তন করে লেখা নিরলঙ্কার গ্রন্থও মহান গ্রন্থ, কিন্তু ভক্তিহীন জ্ঞানের আকর
গ্রন্থ মূল্যহীন। কারণ ওই গ্রন্থপাঠে ভগবানকে অনুভব করা যায় না। আপনি দৃঢ়ব্রত, সত্যনিষ্ঠ, পুণ্যকীর্তি, বহুদর্শী ও বেদশাস্ত্রে
পারদর্শী। আপনি অখিল বিশ্বের বন্ধনমুক্তির জন্যে শ্রীহরির লীলা কীর্তন করুন। যা
পাঠ করলে,
বিদ্বান
ব্যক্তিদের জানার আর কোন বিষয় অবশিষ্ট থাকে না, আপনি সেই ভগবানের মহিমা কীর্তন
করুন।
উপরের ঘটনাটি শ্রীমদ্ভাগবত-সংহিতার (পুরাণ) প্রাক-কথনের সংক্ষিপ্তসার।
এরপরেই মহর্ষি বেদব্যাস এই গ্রন্থ রচনা শুরু করেছিলেন। কিন্তু স্পষ্টতঃই এই কাহিনী
কল্পিত এবং আরোপিত। কারণ আমরা আগেই দেখেছি, মহর্ষি বেদব্যাসের সময়কাল, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের
সমসাময়িক,
মোটামুটি
৯০০ বি.সি.ই-তে। বিশেষজ্ঞরা বলেন পুরাণগুলির সম্ভাব্য রচনা কাল খ্রী.পূ. দ্বিতীয়
শতাব্দী থেকে শুরু হয়ে গুপ্তযুগ পর্যন্ত। এবং আমার মনে হয় শ্রীমদ্ভাগবত সম্ভবতঃ
গুপ্তযুগের সমকালীন রচনা, কারণ সে সময় ব্রাহ্মণ্য ধর্ম, সম্পূর্ণ হিন্দুধর্ম হয়ে উঠেছে।
আমার এই অনুমানের আরও কারণ, অন্যান্য পুরাণ গ্রন্থগুলির তুলনায় শ্রীমদ্ভাগবত অনেক
পরিণত রচনা এবং বক্তব্যের দিক দিয়েও অত্যন্ত স্বচ্ছ। মহাভারত রচনার প্রায় পনেরশ’
বছর পরে মহর্ষি বেদব্যাসের বিষণ্ণ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা কোথায়?
অতএব এমন সিদ্ধান্ত করাই যায়, মহাভারত রচয়িতা মহর্ষি
বেদব্যাসের যশ ও জনপ্রিয়তাকে ব্যবহার করে, পুরাণকাররা, তাঁর নামের আড়ালে প্রায়
সকল পুরাণ রচনা করেছেন। পৌরাণিক ভক্তিতে ভারতভূমিকে প্লাবিত করার আগে, উপরে বর্ণিত কাহিনীর একটি
প্রেক্ষাপট রচনা তাঁদের প্রয়োজন ছিল। কাল্পনিক এই ঘটনা থেকে সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া
যায়, তাঁরা মহর্ষি বেদব্যাসের
রচিত মহাভারতকেও ছেড়ে দেননি। কাক-ভক্ষ্য মহাভারতকে, হংস-বিহারী মহাভারতে রূপান্তরের
জন্যে মহাভারতে তাঁরা বহু অধ্যায়েরই অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছেন।
৫.৪.১ শ্রীমদ্ভাগবতের কৃষ্ণ
শ্রীমদ্ভাগবত পূর্ণতঃ বিষ্ণুর মহিমা বর্ণন। তার মধ্যে অবশ্যই সিংহভাগ
দখল করেছেন শ্রীকৃষ্ণ। এই পুরাণে শ্রীকৃষ্ণের মর্ত্যলীলার যাবতীয় ঘটনার কথা জানা
যায়। শ্রীকৃষ্ণের জন্ম বিবরণের কথা ভারতীয় হিন্দুদের অতি পরিচিত, সে বর্ণনায় যাচ্ছি না।
একটিমাত্র বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। কৃষ্ণের জন্মের পরেই মাতা যশোদার কন্যার
সঙ্গে মাতা দেবকীর পুত্রের বদলাবদলি ঘটিয়ে ছিলেন পিতা বসুদেব। মাতা দেবকীর অষ্টম
গর্ভের সন্তান ভেবে, রাজা
কংস এই কন্যাটিকে যখন হত্যা করতে গেলেন, দেখা গেল, এই কন্যা কোন সাধারণ শিশু নয়, তিনি দেবী যোগমায়া। তিনি অষ্টভুজা
দেবী, তাঁর হাতে ধনু, শূল, বাণ, চর্ম, খড়গ, অসি, চক্র ও গদা। তিনি
দিব্যমালা,
বসন ও
রত্ন-অলংকারে ভূষিতা। পুজোর অর্ঘ নিয়ে তাঁর সঙ্গীরা - সিদ্ধ, চারণ, গন্ধর্ব, কিন্নর, অপ্সরা ও উরগগণ - তাঁর
স্তুতি করছিল। বলা বাহুল্য, এই দেবী অনার্য দেবী, কৃষ্ণের জন্মের নিরাপত্তার জন্যেই
তিনি মাতা যশোদার গর্ভে আবির্ভূতা হয়েছিলেন।
এরপর কৃষ্ণের শৈশব, বাল্য ও কৈশোরের নানান আশ্চর্য লীলার কথা আমরা সকলেই জানি, তবুও আরেকবার সংক্ষেপে
আলোচনা করে নেওয়া যাক।
রাজা কংস দেবকীর কন্যা সন্তানের দেবী রূপ দেখেও নিশ্চিন্ত হতে পারলেন
না, কারণ অন্তর্হিত হওয়ার আগে
দেবী ঘোষণা করেছিলেন, “রে
দুষ্ট কংস,
আমাকে মেরে
তুই কী করবি?
তোর শত্রু
তোর মৃত্যুরূপে কোথাও না কোথাও জন্ম নিয়েছেন। অতএব, এরপর তুই আর অন্য নিরাপরাধ
শিশুদের অকারণ বধ করিস না”। কংসের মন্ত্রণাদাতারা সকলেই ছিলেন, রাক্ষস বা দৈত্য-দানব।
তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ করে, তিনি স্থির করলেন, মথুরা, ব্রজ (বৃন্দাবন) এবং আশেপাশের
গ্রামের শিশুদের, যাদের
বয়স দশদিনের আশেপাশে, তাদের
হত্যা করবেন। ভোজরাজ কংসের এই “কৃষ্ণ-হত্যা” সিদ্ধান্তের সঙ্গে রোম প্রশাসক হেরডের
“যিশু-হত্যা” ঘোষণার আশ্চর্য মিল। দুই কাহিনীর কোনটি মূল এবং কোনটি অন্যকে
প্রভাবিত করেছিল, আজ
তার হদিশ খুঁজে পাওয়া অসম্ভব।
শ্রীকৃষ্ণ শৈশব থেকেই অলৌকিক শক্তির অধিকারী, আর হবে নাই বা কেন, মানুষের রূপে তিনিই যে
পরমপুরুষ পুরুষোত্তম ঈশ্বর বিষ্ণু। তাঁর নিত্য সঙ্গী ছিলেন তাঁর বৈমাত্রেয় দাদা, বলরাম, গোপরাজা নন্দর পত্নী
রোহিণীর পুত্র। তিনিও বিষ্ণুর অংশ-অবতার। দুই ভাইকে একত্রে রাম-কৃষ্ণও বলা হত।
শৈশব থেকে বাল্য বয়েসের মধ্যেই তিনি অনেকগুলি কীর্তি করে ফেললেন। কৃষ্ণকে বধ করতে
রাজা কংস তাঁর যে অনুচরদের পাঠাচ্ছিলেন, যেমন পূতনা রাক্ষসী, দৈত্য তৃণাবর্ত বা চক্রবাত, বৎসাসুর, বকাসুর, ধেনুকাসুর, অঘাসুর বা অজগর অসুর, অরিষ্টাসুর, কেশী দৈত্য, প্রলম্ব– সকলেই কৃষ্ণের
হাতে নিহত হলেন। তরুণ বয়সে তিনি দমন করলেন কালিয় নাগকে।
এই কাহিনীগুলিতে অলৌকিক রোমাঞ্চ অনুভব করা ছাড়া আর কোন তাৎপর্য
নেই। অবশ্য চিন্তা করলে একটি তাৎপর্য মনে
আসে, শ্রীকৃষ্ণের মামা রাজা
কংস নিশ্চয়ই অনার্য? তা
নাহলে তাঁর মন্ত্রণাদাতা পারিষদ থেকে শিশু কৃষ্ণকে বধ করতে আসা অনুচরী/অনুচররা
রাক্ষসী,
দৈত্য, অসুর কেন? সদ্যজাত শ্রীকৃষ্ণকে
রক্ষা করতে শিশুকন্যা রূপে জন্ম নিলেন অনার্য দেবী যোগমায়া, আবার তাঁকে হত্যা করতে
রাজা কংস “সুপারি” দিলেন অনার্য খুনীদের! অতএব শ্রীকৃষ্ণর সঙ্গে মাতুল কংস ও
মাতুলের শ্বশুর জরাসন্ধের সঙ্গে যে দীর্ঘ বিবাদ সেটি আসলে ছিল অনার্য যদু, বৃষ্ণি, শূরসেন, ভোজ, অন্ধক ও চেদি গোষ্ঠীর
অন্তর্দ্বন্দ্ব। সে কথা আগেও বলেছি, এই গ্রন্থের ২.৬.২ অধ্যায়ে।
এবার শ্রীকৃষ্ণের বাল্যলীলার দুটি ঘটনা, আমার কাছে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ মনে
হয়েছে, সে দুটির উল্লেখ এখানে
করছি।
৫.৪.১.১ ব্রাহ্মণযজ্ঞে অন্ন প্রার্থনা
একবার যমুনা তীরে গোচারণের সময় রাম-কৃষ্ণ সহ সকল গোপবালক ক্ষুধার্ত হয়ে
পড়েছিলেন। শ্রীকৃষ্ণ গোপবালকদের বললেন, “একটু দূরেই দেখ, ব্রাহ্মণরা দেবযজ্ঞ করছেন। সেখানে গিয়ে তোরা দাদা আর আমার
নাম করে বল,
আমরা সবাই
ক্ষুধার্ত আমাদের অন্নদান করুন”। গোপবালকরা যজ্ঞস্থলে গিয়ে ব্রাহ্মণদের সেকথা
বলাতে, ব্রাহ্মণেরা “হ্যাঁ” বা
“না” কোন উত্তর দিলেন না। গোপবালকরা ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসে শ্রীকৃষ্ণকে সব কথা বলাতে, কৃষ্ণ হাসলেন, বললেন, “এবার তোরা ব্রাহ্মণীদের
কাছে যা,
সেখানে গিয়ে
একই কথা বলবি”। গোপবালকরা এবার ব্রাহ্মণীদের কাছে গিয়ে রাম ও কৃষ্ণের নামে অন্ন
প্রার্থনা করল।
ব্রাহ্মণীরা কৃষ্ণের অনেক কথা আগেই শুনেছিলেন। তিনি কাছেই যমুনাতীরে
রয়েছেন শুনে,
তাঁরা
উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন। প্রচুর অন্ন এবং সুস্বাদু খাদ্যের সম্ভার নিয়ে তাঁরা প্রায়
দৌড়ে এলেন। কৃষ্ণের শ্যামলবরণ[1] কান্তি, পীতবসন, গলায় বনমালা, মাথায় শিখীপুচ্ছ দেখে
তাঁরা বিহ্বলা হয়ে কৃষ্ণকে আলিঙ্গনও করে ফেললেন। রাম-কৃষ্ণ ও গোপবালকদের অন্ন ও
খাদ্য নিবেদন করে, তাঁরা
কিছুক্ষণ কৃষ্ণের সঙ্গে আলাপ করলেন। কিন্তু ফেরার সময় তাঁরা বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে
উঠেছিলেন,
কারণ আসার
সময় তাঁরা স্বামীদের অনুমতি না নিয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটে এসেছিলেন। উপরন্তু
আবেগের বশে তাঁরা গোপবালক কৃষ্ণকে আলিঙ্গন করে ফেলেছিলেন। তাঁরা আশংকা করছিলেন, তাঁদের স্বামীরা হয়তো
তাঁদের গ্রহণ করবেন না। কিন্তু কৃষ্ণ তাঁদের আশ্বাস দিলেন, সেরকম কিছু ঘটবে না, বললেন, “আপনারা আমাতেই সমর্পিত
চিত্ত, নিবেদিত প্রাণ, অতএব কেউ আপনাদের কোন দোষ
দেখবে না”। ব্রাহ্মণীরা যজ্ঞস্থলে ফিরে যেতে, সত্যিই কেউ কিছু বললেন না।
ব্রাহ্মণরা নিজ নিজ পত্নীদের সঙ্গে যথারীতি যজ্ঞে আহুতি দিয়ে, যজ্ঞ সম্পন্ন করলেন।
ব্রাহ্মণ্য ধর্মের যজ্ঞ-অনুষ্ঠানে আহুতি দেওয়ার সময়, পত্নীদের পতির পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া আর কোন ভূমিকা থাকত না। সেই বুঝেই কী কৃষ্ণ এমন একটা ঘটনা ঘটিয়েছিলেন। তিনি কী অনুমান করেছিলেন, ব্রাহ্মণরা যজ্ঞের ব্যস্ততায় গোপবালকদের কথায় গুরুত্ব না দিলেও, অলস বসে থাকা দ্বিজপত্নীরা তাঁর নাম শুনলেই, তাঁকে দেখার জন্যে উদ্গ্রীব হয়ে উঠবেন? আশৈশব তাঁর অতিনায়কোচিত অলৌকিক কীর্তির সৌরভ যে মহিলা মহলে তাঁকে প্রবাদে পরিণত করেছে, সেটাও কী তিনি বুঝতে পেরেছিলেন? এও কী বুঝেছিলেন, নায়কের প্রতি মহিলাদের উদ্বেল আবেগকে তাঁদের স্বামীরা তেমন দোষাবহ মনে করেন না? ধন্য বটে তাঁর নারী ও নর-চরিত্র বিশ্লেষণ।
চলবে...
[1] ভালোবেসে
আমরা যতই “শ্যামলবরণ” বা “রঙটা একটু চাপা” বলি না কেন, এই গাত্রবর্ণ অনার্য লক্ষণ। আদতে
তিনি কৃষ্ণবর্ণই ছিলেন, তাই তাঁর নামও কৃষ্ণ। তাঁর কৃষ্ণবরণ বলিষ্ঠ কান্তিতে
উজ্জ্বল পীতবসন,
গলায়
বনফুলের মালা,
অঙ্গে
হাল্কা স্বর্ণালঙ্কার এবং কেশে শিখীপক্ষ – অসাধারণ এক স্টাইল স্টেটমেন্ট। আর্য বা
অনার্য – সে যে সভাতেই তিনি উপস্থিত হোন না কেন –তাঁর উপস্থিতি সর্বদাই প্রত্যয়ী
পৌরুষরূপে অনন্য এক ঔজ্জ্বল্য সঞ্চার করে। এর সঙ্গে ছিল শৈশব থেকে আবাল্য, তাঁর নানান কীর্তির
মহিমা। বাস্তবিক, এমন
একজন ব্যক্তিত্ব সামনে এসে দাঁড়ালে, হয় মুগ্ধ হতে হয় অথবা ঈর্ষায় দগ্ধ হতে হয়, কিন্তু কোনমতেই অবহেলা
করা যায় না। মহিলাদের আর দোষ কি?
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন