এই সূত্রে - " ঈশোপনিষদ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "
এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১ "
দুই বিষ্ণু-পারিষদের শাপগ্রস্ত হওয়া
মৈত্রেয় বললেন, “প্রজাপতি কশ্যপের
তেজ, দিতির গর্ভে একশ বছর ধরে বাড়তে থাকল। ঐ তেজ এতই তীব্র যে অন্যান্য দেবতাদের
তেজ ম্লান হতে লাগল। সেই তেজে সূর্য্য, চন্দ্রের জ্যোতিও ম্লান মনে হতে লাগল।
চারদিক তমাসাচ্ছন্ন হয়ে আসতে লাগল দেখে, দেবতারা এবং লোকপালগণ ব্রহ্মার কাছে
উপস্থিত হয়ে বললেন, “হে জগত বিধাতা, আপনাকে আমরা প্রণাম করি। আপনিই সকলের নিয়ন্তা,
আপনাকে প্রণাম করি। হে দেব, দিতির গর্ভে কশ্যপের বেড়ে ওঠা তেজে চারদিক অন্ধকার হয়ে
উঠছে, দিন ও রাতের পার্থক্যও ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হচ্ছে। আমরা সকলে বিপন্ন, হে দেব,
দিনের বিহিত কর্মের অনুষ্ঠান অসম্ভব হয়ে উঠছে। আপনি আমাদের প্রতি কৃপাদৃষ্টি দিয়ে
আমাদের উদ্ধার করুন”।
[পুরাণকারদের অল্পে সন্তুষ্ট হতে দেখা যায় না। তপস্বীদেরকে তাঁরা শত-শত বৎসর, এমনকি সহস্রাধিক বছরও তপস্যা করান। এখন দৈত্য-জননীকেও তাঁরা একশ বছর ধরে গর্ভধারণ করালেন! এবং তাঁর গর্ভস্থ সন্তানের তেজে সূর্য পর্যন্ত আবছা হয়ে গেলেন, চাঁদের কথা তো আর না বলাই ভালো - তিনি চির-অমাবস্যায় ডুবে গেলেন। এই সব দেখে স্বর্গের অসহায় দেবতারা অন্ধকারে ব্রহ্মার কাছে উপস্থিত হলেন]
তাঁদের অনুরোধ শুনে ভগবান
ব্রহ্মার, দিতির সেই কুকর্মের কথা মনে পড়ে গেল, তিনি স্মিত হেসে বললেন, “আমি
তোমাদেরও আগে আমার সংকল্প দিয়ে সনক,
সনন্দ, সনাতন ও সনৎকুমার নামে চার পুত্রকে সৃষ্টি করেছিলাম। নিখিল বস্তুতে অনাসক্ত হয়ে, নানা
লোকে ঘুরতে ঘুরতে তাঁরা একদিন ভগবান বিষ্ণুর বৈকুণ্ঠলোকে গিয়ে পৌঁছলেন। এই বৈকুণ্ঠলোকে আদিপুরুষ ভগবান
বিশুদ্ধসত্ত্ব রূপে বাস করেন ও ভক্তদের পরম আনন্দ বিধান করেন। নিষ্কাম ধর্মে ও
একান্ত ভক্তিতে শ্রীহরির আরাধনা করে,
যাঁরা তাঁর পরমপদে আশ্রয় পেয়েছেন, তাঁদের সকলেই এই বৈকুণ্ঠধামে বাস করেন। এই ধামে
একটি কানন আছে, তার নাম নৈঃশ্রেয়স। কৈবল্য অর্থাৎ মোক্ষই যেন সেই কাননে মূর্তিরূপে
বিরাজ করছে, এমন মনে হয়। সেই কাননের গাছগুলি কল্পতরু, সারাবছর সে গাছে ছয় ঋতুর ফুল
ফোটে। সেই ফুলের গন্ধ কাননের সর্বত্র বহন করে নিয়ে যায় সুরভিত সমীরণ। সেখানে
ভ্রমরের গুঞ্জনে শ্রীহরির নাম শোনা যায়। সেখানে পাখিরা কূজন করে না, ভজন করে।
ভগবানের পার্ষদেরা সর্বদাই শ্রীহরির ভজনায় নিরত। সেখানে ক্ষীণকটি গুরু নিতম্ব
ললনাগণ শত পরিহাসেও, বৈকুণ্ঠবাসীদের হরিবিলাসী মনকে বিচলিত করতে পারে না।
বৈকুণ্ঠধামেই শ্রীহরির গৃহে অচঞ্চল হয়ে বাস করেন লক্ষ্মীদেবী। তাঁর হাতে লীলাকমল,
তাঁর রাতুলচরণে সোনার নূপুর।
যাই হোক
সনকেরা অষ্ট যোগের প্রভাবে বিষ্ণুপদ লাভ করে, সেই বৈকুণ্ঠধামে উপস্থিত হলেন। তাঁরা
শ্রীহরির দর্শন লাভের জন্যে ব্যাকুল হয়েছিলেন। তাঁরা নন্দন কানন নিন্দিত নৈঃশ্রেয়স
কানন পার হয়ে, ছয়টি প্রাচীরের দ্বার পার হয়ে গেলেন, কিন্তু তাঁদের চোখে ঐ কাননের
কোন সৌন্দর্যই ধরা পড়ল না। কারণ তাঁদের চিত্ত তখন শ্রীহরির পাদপদ্ম দর্শনের জন্যে
উদ্গ্রীব। যে ছয়টি দ্বার তাঁরা এতক্ষণ পার
হয়ে এলেন, সেই সব দ্বারেও দ্বাররক্ষী ছিল, কিন্তু তাঁদের কেউ বাধা দেয় নি। কারণ
সকলেই জানে শ্রীবিষ্ণুর বিশেষ কৃপা ছাড়া বৈকুণ্ঠধামে পৌঁছনো সম্ভব নয়। তাছাড়া এই চারজন তত্ত্বজ্ঞ ঋষি
বৃদ্ধ হলেও বালকের ন্যায় দিগম্বর, সমদর্শী ও পবিত্র, তাঁদের বাধা দেওয়ার কথা কেউ
চিন্তাই করেনি।
কিন্তু
সপ্তম দ্বারে এসে তাঁরা বাধা পেলেন। সেই দ্বারের দুই দ্বারপাল তাঁদের নিবারণ করে,
অবহেলা ভরে বলল, “এইভাবে যখন তখন ভগবানের অন্তঃপুরে ঢুকবেন না”। সনকেরা চারজনেই শ্রীহরির দর্শনের
জন্যে উন্মুখ হয়েছিলেন, তাঁরা এই হঠাৎ বাধায় ক্ষুব্ধ হয়ে বললেন, “দেখ হে, যাঁরা
বহুজন্ম ভগবানের সেবা করেছেন, তাঁরাই ভগবানের করুণায় এই বৈকুণ্ঠে আসতে পারে। আমরা
তাঁর একান্ত ভক্ত বলেই এতদূরে আসতে সমর্থ হয়েছি, তাহলে কিসের ভয়ে, কিংবা কোন
বৈরিতার আশঙ্কায়, তোমরা আমাদের ঢুকতে দিচ্ছ না? বৈকুণ্ঠলোকে যাঁরা বাস করেন, তাঁরা
সকলেই শ্রীহরির শরণাগত, অতএব সকলকে সমান দৃষ্টিতে দেখেন, তাঁদের অন্তরে কোন
ভেদবুদ্ধি থাকে না। তোমরা সেই পরমপুরুষ শ্রীবিষ্ণুর কিঙ্কর হয়েও কিভাবে এমন অদ্ভূত
আচরণ করতে পারলে? আমাদের বিশ্বাস, এই বৈকুণ্ঠলোকে বাস করার কোন যোগ্যতাই তোমাদের
নেই। তোমাদের যেমন মন্দবুদ্ধি, তোমাদের মনে এখনো যেমন ভেদভাব বর্তমান, তোমাদের
অচিরেই বৈকুণ্ঠলোক ছেড়ে যেতে হবে। তোমাদের স্থান হবে সেই সব লোকে, যে লোকে জীব
কাম, ক্রোধ, লোভ, ঈর্ষা ও শত্রুভাব নিয়ে কালাতিপাত করে”।
ব্রহ্মজ্ঞ ঋষি সনকদের এই কথায় সেই দুই দ্বাররক্ষী ভীষণ ভয় পেয়ে গেল। তারা বুঝতে পারল কি ভয়ংকর ভুল তারা করে ফেলেছে। ভগবান শ্রীবিষ্ণু স্বয়ং এই রকম তেজস্বী ব্রাহ্মণদের অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও সম্মান করেন। তাদের দুজনকে, এই ঋষিরা যে অভিশাপ দিয়েছেন তার খণ্ডন স্বয়ং ভগবানও করবেন না। তারা দুইজনে ঋষিদের চরণ বুকে নিয়ে অনুতপ্ত স্বরে বলল, “হে মহর্ষিগণ, আমরা অপরাধী, অতএব আপনাদের দেওয়া শাস্তিবিধান ছাড়া আমাদের মুক্তি নেই। আপনাদের কাছে এই অনুরোধ, আমাদের যে মূঢ়যোনিতেই জন্ম হোক না কেন, সকল জন্মেই যেন আমাদের ভগবানের প্রতি অচলা ভক্তি থাকে, আমরা কোনভাবেই যেন তাঁকে ভুলে না যাই”।
এদিকে তাঁরই দ্বারপ্রান্তে চার মহর্ষির অপমান হয়েছে এই ঘটনা শুনে স্বয়ং শ্রীভগবান পায়ে হেঁটে উপস্থিত হলেন। সনকেরা মুগ্ধ নেত্রে প্রত্যক্ষ দেখলেন তিনি আসছেন। তাঁর দুইপাশে হংসশুভ্র ব্যজন দুলছে। তাঁর মাথার ওপর শুভ্রছত্র, তার পরিধিতে বাঁধা সাদা মুক্তোর মালা চলার ছন্দে দুলছে। তাঁর নিতম্বে পীতাম্বর মেখলা, তাঁর কণ্ঠে দুলছে বনমালা। তাঁর মণিবন্ধে মণিময় বলয়। তাঁর এক হাত গরুড়ের কাঁধে ন্যস্ত, অন্য হাতে লীলাকমল। তাঁর দুই কানে মকর আকারের কুণ্ডল। তাঁর মাথায় মণি মাণিক্য খচিত মুকুট। তাঁর বক্ষস্থলে মনোহারি হারগুচ্ছ। তাঁর কণ্ঠলগ্ন হারে গাঁথা অনন্য কৌস্তুভ মণি তাঁর বুকের উপর দুলছে। সনক কুমারেরা ভগবানের সেই মূর্তি দেখে আনন্দে বিহ্বল হয়ে গেলেন, তাঁরা ভগবানকে নত মস্তকে প্রণাম করলেন। ভগবানের রূপ একবার দেখেও তাঁদের তৃপ্তি হল না, তাঁরা মুগ্ধনেত্রে ভগবানের রূপ সুধা পান করতে করতে ভাবলেন, শ্রী ভগবানের করুণাঘন প্রেম দৃষ্টি, তাঁর মধুর অমৃতময় হাসি, তাঁর লাবণ্যময় শরীর, তাঁর কমনীয় সুন্দর মুখমণ্ডলের জন্যে কোন অলংকারের প্রয়োজনই ছিল না। তাঁর অঙ্গের স্পর্শে ও ঐশ্বর্যে অলংকারই বরং অলংকৃত হয়েছে।
ভক্তি ব্যাকুল স্বরে, কুমারগণ বললেন, “হে অনন্ত, যদিও তুমি সকল অন্তরেই ব্যাপ্ত, কিন্তু দুরাত্মাদের কাছে কখনো প্রকাশিত হও না। অথচ আমাদের মতো ভক্তদের অন্তর থেকে তুমি কোনদিন অদৃশ্য হও না। পিতা ব্রহ্মার উপদেশে তুমি আমাদের হৃদয়ে অধিষ্ঠান করেছিলে, আজ তোমার দর্শন পেলাম। তোমার দর্শন পেয়ে আমরা পরমাত্মতত্ত্বের সাক্ষাৎ পেয়েছি, তোমার এই বিশুদ্ধসত্ত্ব শ্রীমূর্তি আমাদের হৃদয়ে সারাজীবন অক্ষয় থাকবে। কিন্তু, হে ভগবান, একটু আগে পর্যন্ত আমাদের কোন অপরাধ ছিল না, কিছুক্ষণের জন্যে ধৈর্য হারিয়ে আমরা একটি অন্যায় কর্ম করে ফেলেছি। তোমার দুই ভক্তকে আমরা অভিশাপ দিয়ে ফেলেছি যে, অবিলম্বে তারা বৈকুণ্ঠলোক থেকে বিচ্যুত হবে। এই অপরাধে যদি আমাদের নীচযোনিতেও জন্ম হয়, তাতেও আমাদের দুঃখ থাকবে না। ভ্রমর যেমন কাঁটার আঘাতে বারবার কষ্ট পেলেও ফুলের বন পরিত্যাগ করে না, সেই রকম যে কোন পরিস্থিতিতে আমাদের মন সর্বদাই তোমার শ্রীচরণেই নিবদ্ধ থাকবে। আজ তোমার এই অপরূপ দেখে আমরা পরমানন্দ সাগরে ডুবে রইলাম, হে ভগবান, তুমি আমাদের প্রণাম নাও”।
দুই বিষ্ণু-পারিষদের শাপমোচনের বিধান
তাঁদের
বাক্যে প্রীত হয়ে বৈকুণ্ঠবিহারী শ্রীহরি বললেন, “জয় ও বিজয় আমার এই দুই পারিষদ
আপনাদের অপমান করেছে, এই অপমান আমারই অপমান। আপনারা দেবতার মতো শ্রদ্ধেয় ও পূজ্য।
আমি ব্রাহ্মণকে সর্বদাই পরমদেবতা বলে বিশ্বাস করি। অতএব ওদের এই অপরাধের জন্যে আমি
আপনাদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। শরীরে কুষ্ঠ ব্যাধি যেমন ধীরে ধীরে ত্বকের বিনাশ করে,
সেইরকম ভৃত্যের অপরাধে প্রভুও বিনষ্ট হয়। গো, ব্রাহ্মণ ও অসহায় জীব আমার দেহ। হে
মুনিগণ, ব্রাহ্মণদের সেবা করেই আমি এই উৎকৃষ্ট চরিত্র লাভ করেছি। পরমপাবন ভগবান
হয়েও, আমার মুকুটে আমি ব্রাহ্মণের পবিত্র চরণরেণু ধারণ করে থাকি। আমার এই ভৃত্য
দুইজন আমার মনের কথা না বুঝে আপনাদের অপমান করে অপরাধ করে ফেলেছে। তার জন্যে
আপনারা যে শাস্তিবিধান করেছেন, সে শাস্তি আমি অনুমোদন করি। তবে বৈকুণ্ঠলোক থেকে
তাদের নির্বাসন কাল তাড়াতাড়ি সমাপ্ত করে, তারা যাতে আমার সঙ্গে আবার মিলিত হতে
পারে, আপনারা অনুগ্রহ করে সেই বিধানের অনুমতি দিন”।
শ্রীব্রহ্মা
বললেন, “শ্রীহরির এই মধুর কথায় কুমারেরা প্রথমে বুঝতে পারলেন না, ভগবান তাঁদের
কাজের প্রশংসা করলেন, না নিন্দা করলেন। তাঁরা ঐ দুই পারিষদের যে শাস্তিবিধান
করেছেন, তাতে ভগবান সায় দিলেন, নাকি সেই শাস্তি হ্রাস করলেন। তাঁরা উপলব্ধি করলেন
ভগবানের কাছে সকল ভক্তই সমান। ভগবানের দ্বার রক্ষার দায়িত্বে থাকা জয় ও বিজয়ের
সামান্য অপরাধে, তাদের অভিশাপ দিয়ে, তাঁরা অনেক বেশী অপরাধ করে ফেলেছেন। কিন্তু
শ্রীভগবান এসব সত্ত্বেও তাঁদের অনুগ্রহ চাইছেন, এই কথায় তাঁরা আপ্লুত হয়ে বললেন,
“হে
ভগবান, তুমি ত্রিগুণের অতীত ও তুমিই বিশ্বের পালন কর্তা। তুমিই ব্রহ্মণ্যদেব,
ব্রাহ্মণ ও দেবের রক্ষক। তোমার
থেকেই সনাতন ধর্মের সৃষ্টি হয়েছে। যে ব্রাহ্মণগণ দেবতাদের পূজ্য, তুমিই সেই
ব্রাহ্মণদের আত্মা ও আরাধ্য দেবতা। অতএব তুমি সর্বেশ্বর হয়েও আমাদের “অনুগ্রহ করে
অনুমতি দিন” এই বাক্য প্রয়োগ করায়, তার সঠিক মর্ম আমরা প্রথমে উপলব্ধি করতে
পারিনি। তুমি ধর্মরক্ষার জন্যে এবং লোক শিক্ষার জন্যেই ব্রাহ্মণের কাছে অবনত হলে,
এতে তোমার গৌরব এতটুকুও ক্ষীণ হয় নি। হে ত্রিযুগ, সকল যুগেই তুমি পরমপুরুষ। ধর্ম
তোমার পরমরূপ; তপস্যা, শুচিতা ও দয়া তোমার স্বরূপ। তুমি ব্রাহ্মণ, দেবতাদের সঙ্গে
এই নিখিল বিশ্ব চরাচরের পালন করছো। হে দেব, তুমিই আদর্শ পুরুষ, সর্বশ্রেষ্ঠ পুরুষ।
তোমার আচরণ অনুসরণ করেই আমরা ধর্ম অনুসরণ করি। তোমার এই দুই নিরপরাধ পার্ষদকে
অভিশাপ দিয়ে আমরাই অপরাধ করেছি, অতএব তোমার যে কোন আদেশ ও উপদেশে আমরা সম্মত আছি।
তোমার যা উচিৎ মনে হয়, তুমি তাই করো”।
শ্রী
ভগবান বললেন, “হে বিপ্রবর, আপনারা আমার এই দুই পার্ষদকে যে অভিশাপ দিয়েছেন, জেনে
রাখুন তা আমার প্ররোচনাতেই করেছেন। জয় ও বিজয় এখনই আসুরীযোনি লাভ করবে; জন্ম থেকেই
আমার প্রতি ওদের ক্রোধের আবেশ, আমাকে ওদের কাছে আকর্ষণ করবে এবং ওরা তাড়াতাড়ি আবার
আমার কাছে ফিরে আসতে পারবে”। ভগবানের
এই কথার পর সনক কুমারেরা তাঁর কাছে বিদায়ের অনুমতি নিলেন। ভগবানকে প্রদক্ষিণ ও
তাঁকে প্রণিপাত করার পর, তাঁরা আনন্দ চিত্তে
বৈকুণ্ঠলোকের শোভা দেখতে দেখতে ফিরে এলেন।
এরপর
ভগবান জয় ও বিজয়কে বললেন, “তোমরা যাও, ভয় পেয়ো না, তোমাদের মঙ্গলই হবে। আমি
ব্রহ্মশাপ নিবারণ করতেই পারতাম, কিন্তু করলাম না। সনক কুমারদের ক্রোধ, তোমাদের মতো
পার্ষদের সঙ্গে ব্রাহ্মণের প্রতিকূল আচরণ, এই সবকিছু আমার ইচ্ছেতেই ঘটেছে, এমনই উপলব্ধি করো। আমার
নিজের ভক্তদের মধ্যে উপেক্ষা, বৈকুণ্ঠবাসীদের পুনর্জন্ম এমন ঘটনা সম্ভব নয়, কিন্তু
তাও যে এমন ঘটল তার কারণ বলছি শোন। আমার যেমন সৃষ্টি করতে আনন্দ হয়, তেমনি যুদ্ধ
বিগ্রহ করতেও ইচ্ছে হয়। অন্যান্য সকলে আমার থেকে অনেকটাই হীনবল, কিন্তু তোমরা
দুজনেই আমার তুল্য বলের অধিকারী। অতএব, তোমাদের দিয়ে ব্রাহ্মণের বাধা সৃষ্টি
করিয়ে, তোমাদেরকে ব্রহ্মশাপে আমার প্রতিপক্ষ করে তুললাম। আমার প্রতি বৈরীভাবে অল্প
দিনের মধ্যেই তোমরা ব্রহ্মশাপ উত্তীর্ণ করে আমার কাছেই আবার ফিরে আসবে”।
শ্রীব্রহ্মা
বললেন, “হে দেবগণ, এই কথা বলে ভগবান তাঁর নিজের ভবনে ফিরে গেলেন আর দেবশ্রেষ্ঠ জয়
ও বিজয়, ব্রহ্মশাপে গর্বহীন হয়ে বিষ্ণুলোক থেকে পতিত হতে হতে শ্রীহীন হয়ে গেলেন।
সেই দুই পার্ষদ কশ্যপের তেজকে নিজের দেহরূপে স্বীকার করে, এখন দিতির গর্ভে বেড়ে
উঠছে। সেই দুই অসুরের তেজেই তোমাদের তেজ দিনে দিনে ম্লান হতে থাকবে; এ সবই স্বয়ং
ভগবানের ইচ্ছা, এ বিষয়ের প্রতিকার একমাত্র তাঁর পক্ষেই করা সম্ভব এবং তিনিই আমাদের
মঙ্গলের জন্যে সঠিক সময়ে এর প্রতিকার করবেন, এবিষয়ে আমাদের কোন কার্য বিচারে কোন
ফলোদয় সম্ভব হবে না”।
[এমনটা যে হবে সেকথা ব্রহ্মা বহু যুগ আগে থেকেই জানতেন। দিতির গর্ভস্থ সন্তানরা কারা - সে কথাও তিনি জানতেন। তিনি এও জানতেন এই দুই দৈত্যকে জন্মগ্রহণের পরেও কয়েকশ' বছর সময় দিতে হবে, যাতে বড়ো হয়ে তারা দেবতাদের অত্যন্ত অতিষ্ঠ করে তোলে। তারপরেই না ভগবান বিষ্ণু এসে ওই অজেয় দৈত্যদের হত্যা করে ভূভার হরণ করবেন!]
চলবে...
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন