রবিবার, ১৫ জুন, ২০২৫

বাংলার রেল

এর আগের প্রবন্ধ - " অনমনীয় সাদাত মান্টো "  


১. রেলযাত্রার সূচনা

১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধ জয়ের পর ধীরে ধীরে গোটা দেশটাই গ্রাস করে নিয়ে, আমাদের শাসন করতে লাগল ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি নামে ইংল্যাণ্ডের একটি বাণিজ্যিক সংস্থা। সেই শাসনব্যবস্থার কাঠামোটি কেমন ছিল, সেটা সংক্ষেপে এখানে বলে নিলে, পরের আলোচনাগুলি বুঝতে অসুবিধে হবে না।

সবার ওপরে ছিল - ব্রিটিশ পার্লামেন্ট থেকে নিযুক্ত একজন ক্যাবিনেট মন্ত্রী।

সেই ক্যাবিনেট মন্ত্রীর অধীনে ছিল একটি বিশেষ বোর্ড। তাদের দায়িত্ব ছিল ভারতীয় বিষয়ের নীতি নির্ধারণ।

এই বোর্ডের অধীনে ছিল কোম্পানির কোর্ট অফ ডিরেক্টরস। এই ডিরেক্টররা সকলেই লণ্ডনে থাকত।

এই কোর্ট অফ ডিরেক্টারসদের অধীনে থাকত একজন গর্ভনর জেনারেল। যার কাজ ছিল কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামে (পরে রাজভবনে) বসে ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে সামলে কোম্পানির স্বার্থ বজায় রাখা। অর্থাৎ সে সময় আমাদের সামনে, আমাদের দেশের দণ্ড-মুণ্ডের কর্তা ছিল ওই গভর্নর জেনারেল।         

 

  পলাশীর যুদ্ধের সাতাশি বছর পর ভারতীয় রেলপথ নির্মাণের প্রথম প্রস্তাব এসেছিল ১৮৪৪ সালে। সেই প্রস্তাবটি এনেছিলেন রোলাণ্ড ম্যাকডোনাল্ড স্টিফেনসন নামে এক ব্রিটিশ ভদ্রলোকের কোম্পানি। এই স্টিফেনসন সায়েব ছিলেন প্রথম সফল বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কর্তা জর্জ স্টিফেনসনের ভাইপো। এই স্টিফেনসন সায়েবই পরবর্তী সময়ে ইস্টার্ন রেলওয়ে কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টর হয়েছিলেন।

এই প্রস্তাবের সমর্থনে ভারতের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড হার্ডিঞ্জ (১৮৪৪-১৮৪৮) বলেছিলেন “শুধুমাত্র সৈন্য এবং রণসম্ভার পরিবহনের জন্যেই কলকাতা থেকে দিল্লি রেলপথ নির্মাণ অত্যন্ত জরুরি”। তাঁর এই প্রস্তাবের উত্তরে কোর্ট অফ ডিরেক্টারসরা, লণ্ডনে বসে উত্তর দিয়েছিল, প্রথমেই কলকাতা-দিল্লির মতো দীর্ঘ রেলপথ নির্মাণ না করে সীমিত দৈর্ঘ্যের ছোটছোট প্রকল্প দিয়ে শুরু করা যেতে পারে। তার সমর্থনে বলেছিল,    

ভারতের বিচিত্র আবহাওয়া এবং অদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য কলকাতা-দিল্লির মতো দীর্ঘ রেলপথ নির্মাণ বেশ ভজকট ব্যাপার হয়ে উঠবে, কারণ -   

১. ঘন ঘন বৃষ্টি ও বন্যা।

২. নিয়মিত ঝড়ো হাওয়া এবং কড়া রৌদ্রের প্রভাব।

৩. নানা ধরনের পোকা (যেমন উইপোকা, ঘূণ) এবং অপকারী প্রাণীর (যেমন ইঁদুর) থেকে কাঠ ও মাটির ভয়ানক ক্ষতির সম্ভাবনা।

৪. কাঠ বা ইঁটের গাঁথনির নিচে ক্ষতিকারক গাছগাছড়া দ্রুত গজিয়ে ওঠা।

৫. দেশের অসংরক্ষিত এবং সুরক্ষাহীন অঞ্চল দিয়ে রেলপথ নির্মাণ করতে হবে।

৬. দক্ষ এবং বিশ্বস্ত ইঞ্জিনিয়ার যোগাড় করতে এবং তাদের ব্যয় বহন করাও কঠিন হবে।

তৎকালীন বিশ্বে সবথেকে উন্নত এবং সুসভ্য লণ্ডনবাসী কোর্ট অফ ডিরেক্টারসরা এদেশের প্রখর রৌদ্র, ইঁদুর ও পোকামাকড়ের উপদ্রব এবং আগাছা গজিয়ে ওঠাকে ভয় পেয়েছিলেন!

তবে কোম্পানির কোর্ট অফ ডিরেক্টারসরা প্রস্তাবিত এই রেলপথের আর্থিক উপযোগিতা বিষয়ে বেশ সুচিন্তিত ও দূরদর্শী মতামত দিয়েছিলেন সন্দেহ নেই – “এখনও পর্যন্ত এদেশের (গ্রেট ব্রিটেন) অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জানি, যাত্রী বহন থেকেই আমাদের অধিকাংশ আয় হয়, পণ্য পরিবহনের আয় যৎসামান্য। ভারতের পরিস্থিতি ইংল্যাণ্ডের ঠিক বিপরীত। এখানকার শহরের জনবহুল ধনী মানুষদের তুলনায় ভারতীয়রা গরিব। এবং ভারতীয় জনগণ বাসকরে বিশাল এক দেশের বিচ্ছিন্ন নানান অঞ্চলে। কিন্তু অন্যদিকে ভারত মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদের অফুরন্ত ভাণ্ডার। সস্তা কিন্ত দ্রুত পরিবহনের অভাবে সেই সম্পদ বিশ্ব-বাজার থেকে প্রচুর মুনাফা অর্জন করতে পারছে না। অতএব, এ কথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, ভারতীয় রেলপথ বাণিজ্যিক পণ্যপরিবহন করে বিপুল অর্থ উপার্জন করতে পারবে, কিন্তু যাত্রী পরিবহনে সে আয় হবে নগণ্য”।

ভারতের স্বাধীনতা লাভের সাতাত্তর বছর পরেও এই পরিস্থিতির এতটুকু পরিবর্তন হয়নি।

 

যাই হোক ১৮৪৪ সালে হাওড়া থেকে দিল্লি রেলপথ বানানোর প্রথম প্রস্তাব উঠলেও, ভারতে প্রথম ট্রেন চালু হয়েছিল, ১৮৫৩ সালে বোম্বাই (মুম্বাই) থেকে থানা। ১৮৫৩ সালে হাওড়া থেকে পাণ্ডুয়া রেললাইন পাতা হয়ে গেলেও, ওই পথে ট্রেন চালু হয়েছিল ১৮৫৪ সালে। এই বিলম্বের প্রধান তিনটি কারণ ,   

১) এই লাইনে চলার উপযুক্ত কিছু কামরা নমুনা হিসেবে বিলেত থেকে বানিয়ে পাঠানো হয়েছিল “গুডউইল” নামের একটি জাহাজে। তীরে এসে তরী ডোবার মতো, গঙ্গাসাগরের কাছে এসে সে জাহাজ গেল ডুবে। এই দুর্ঘটনার পরে ইস্টার্ন রেলের ইঞ্জিনিয়ার মিঃ হজসন, নিজের নকশামতো কলকাতাতেই রেলের কামরা নির্মাণ করিয়েছিলেন। এই নির্মাণে অনেকটাই সময় লেগেছিল।

২) কলকাতার জন্যে বিলেত থেকে যে ইঞ্জিন পাঠানো হয়েছিল, সেই জাহাজ ভুল করে চলে গিয়েছিল অস্ট্রেলিয়া। সেখান থেকে অন্য আরেকটি জাহাজে চাপিয়ে সেই ইঞ্জিন ফিরিয়ে আনা হয়েছিল কলকাতায়। অতএব ইঞ্জিন আনতেও অকারণেই অনেকটা বিলম্ব হয়েছিল।

এই ইঞ্জিনটি হাওড়ার রেলযাত্রার শুরু থেকে নিয়মিত ব্যবহার করা হয়েছিল। এবং দীর্ঘদিন এটি হাওড়া রানিগঞ্জের ১২১ মাইল দূরত্ব নিয়মিত  যাওয়া-আসা করত।  ১৮৯৫ সালে এই ইঞ্জিনটির নাম দেওয়া হয়েছিল “ফেয়ারি কুইন”।  ১৯০৯ সালে এই ইঞ্জিনটিকে অবসর দেওয়া হয়। সেই ইঞ্জিনটি দিল্লির রেলওয়ে মিউজিয়ামে আজও সযত্নে রাখা আছে। কখনো কখনো টুরিস্টদের জন্যে এই ইঞ্জিনটিকে আজও চালু করা হয়। অর্থাৎ ফেয়ারি কুইন আজও স্টিম ছাড়ে, ধোঁয়া ছাড়ে এবং সিটি বাজায় এবং টুরিস্ট ট্রেন হিসেবে মাঝে মাঝে যাতায়াত করে দিল্লি থেকে আলওয়ার পর্যন্ত।  দুটি কামরার ছোট্ট ট্রেন - যাত্রী সংখ্যা ৫০ জন। ফেয়ারি কুইন বিশ্বের প্রাচীনতম একমাত্র সচল রেল ইঞ্জিন ও গাড়ি - তার নাম উঠেছে গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ডে।  


 তখনকার ও এখনকার ফেয়ারি কুইন ইঞ্জিন 


৩) তৃতীয় কারণটি হল দুই সাম্রাজ্যের সীমানা-সংক্রান্ত বিবাদ। ১৯৫২ সাল পর্যন্ত চন্দননগর ছিল ফরাসী সাম্রাজ্যের অন্তর্গত। হাওড়া থেকে পাণ্ডুয়া গামী রেলপথ গিয়েছে চন্দননগরের পাশ দিয়ে। সেই সময় সে জায়গাটি ব্রিটিশ না ফরাসী সাম্রাজ্যের অধীন – সেই বিতর্ক সাব্যস্ত হতেও দীর্ঘদিন গড়িয়েছিল।

শেষমেষ অনেক বাধা বিপত্তি কাটিয়ে, ১৮৫৪ সালের ১৫ই আগষ্ট মঙ্গলবার, কলকাতা থেকে হুগলি পর্যন্ত বাণিজ্যিকভাবে রেলের প্রথম যাত্রা শুরু হল। এই উপলক্ষে ইস্ট ইণ্ডিয়া রেলওয়ে কোম্পানি থেকে যে বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছিল, সেটির অনুবাদ এখানে দিলাম,

 

ইস্ট ইণ্ডিয়ান রেলওয়ে

এমাসের ১৫ তারিখ মঙ্গলবার থেকে ট্রেন হাওড়া ও হুগলি ছাড়বে নিম্নলিখিত সময়ে –

হাওড়া থেকে সকাল ১০-৩০ মিঃ, বিকাল ৫-৩০ মিঃ

হুগলি থেকে       ৮-১০ মিঃ,        ৩-৩৮ মিঃ

ট্রেন থামবে বালী, শ্রীরামপুর ও চন্দননগর স্টেশনে। ১ সেপ্টেম্বর থেকে ট্রেন হাওড়া ও পাণ্ডুয়ার মধ্যে চলবে আর সব স্টেশনেই দাঁড়াবে।

যাঁরা কম ভাড়ায় মাসিক টিকিট চান, তাঁদের অনুরোধ করা হচ্ছে, তাঁরা যেন যে কোনো স্টেশনে ফর্মের জন্যে দরখাস্ত করেন ও ফর্মগুলি ভর্তি করে যত শীঘ্র ম্যানেজিং ডিরেক্টার ও এজেন্টের কাছে পাঠিয়ে দেন। মাসিক টিকিটের ভাড়া পরে ঠিক করা হবে। পরবর্তী ১ জানুয়ারির আগে মাসিক টিকিট দেওয়া হবে না।

আর ম্যাকডোনাল্ড স্টিফেনসন

১২ই আগস্ট, ১৮৫৪                                                  ২৯ থিয়েটার রোড, কলকাতা

 

ওই সময় হুগলি পর্যন্ত প্রথম শ্রেণীর ভাড়া ছিল ৩ টাকা, দ্বিতীয় শ্রেণীর ১ টাকা ২ আনা ও তৃতীয় শ্রেণীর ৭ আনা। তখনকার হিসেবে স্টেশনগুলির দূরত্ব এবং সফর-কাল কিরকম ছিল, সেটাও একবার দেখে নেওয়া যাক-

হাওড়া থেকে বালী – ৫.৫ মাইল – ১১ মিনিট, বালী থেকে শ্রীরামপুর ৬.৫ মাইল – ১৪ মিনিট, শ্রীরামপুর থেকে চন্দননগর – ৮.৫ মাইল – ২০ মিনিট। চন্দননগর থেকে চুঁচুড়া – ৩ মাইল – ৮ মিনিট। সেই সময় চুঁচুড়া আর হুগলিকে একই স্টেশন বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। অতএব হাওড়া থেকে চুঁচুড়া পর্যন্ত ২৩.৫ মাইল পথে ট্রেনের চলতি সময় লাগত ৫৩ মিনিট। অর্থাৎ গাড়ির গতি ছিল গড়ে ২৬.৬০ মাইল প্রতি ঘন্টায়। এর সঙ্গে যোগ করতে হবে গাড়ি স্টেশনে দাঁড়ানোর সময় – মোট ৩৮ মিনিট। তাহলে হাওড়া থেকে চুঁচুড়া পৌঁছতে মোট সময় লেগেছিল ৯১ মিনিট – দেড় ঘন্টাঅর্থাৎ চুঁচুড়া থেকে সকাল ৮-১০ এ ছেড়ে ফেয়ারি কুইন হাওড়া পৌঁছত সকাল ৯-৪০ নাগাদ। সেটি সকাল ১০-৩০টায় হাওড়া ছেড়ে চুঁচুড়া পৌঁছত দুপুর বারোটায়। সেটি আবার চুঁচুড়া ছাড়ত বিকেল ৩-৩৮এ এবং হাওড়া পৌঁছত বিকেল ৫-১০ নাগাদ। তারপর হাওড়া থেকে বিকেল ৫-৩০টায় ছেড়ে সারারাত চুঁচুড়াতেই থেকে যেত।   

এভাবেই আমাদের স্বাধীনতা দিবসের ঠিক ৯৩ বছর আগে, একই দিনে বাংলায় রেলগাড়ির যাত্রা শুরু হয়েছিল।

 

 

২. রেলপথের জাল বিছানো            

১৮৫৪ সালের ১৫ই আগস্ট রেলযাত্রার উদ্বোধনের মাত্র তিন বছরের মধ্যে – ১০ই মে ১৮৫৭ - শুরু হয়েছিল ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামের লড়াই। উত্তর এবং মধ্যভারতের আচমকা এই সর্বাত্মক লড়াইয়ে বৃটিশ কোম্পানি যেমন হতভম্ব হয়ে পড়েছিল, তেমনই তাদের ক্ষয়ক্ষতিও হয়েছিল বিস্তর। অবশ্য দেড় বছরের মধ্যে, পয়লা নভেম্বর ১৮৫৮ সালে সর্বশক্তি দিয়ে এই লড়াইকে তারা দমন করতে সক্ষম হয়েছিল।

এই লড়াইয়ের শেষে ভারত থেকে কোম্পানি-রাজ মুছে গেল, শুরু হল ব্রিটিশ রাজ। ব্রিটিশ পার্লামেন্ট থেকে নতুন আইন পাস হল – গভর্নমেন্ট অফ ইণ্ডিয়া অ্যাক্ট ১৮৫৮। সেই আইনে তারা সরাসরি ভারতের শাসনভার তুলে নিল নিজেদের হাতে। ইংল্যাণ্ডের তখনকার রানি ভিক্টোরিয়া বিবৃতি দিলেন, “তাঁর ভারতীয় প্রজারাও, একজন বৃটিশ নাগরিকের সমান মর্যাদার অধিকারী”। অবশ্য এই বিবৃতির সঙ্গে বৃটিশ সংবিধানের কোনই সাযুজ্য ছিল না এবং ১৯৪৭ পর্যন্ত বৃটিশ-রাজত্বে রানির বিবৃতিটিকে মিথ্যা প্রলাপ হিসাবেই গণ্য করা উচিৎ

১৮৫৭ সালের স্বাধীনতা সংগ্রাম লণ্ডনের বৃটিশ শাসকদের মোক্ষম একটা শিক্ষা দিয়েছিল। তারা বুঝতে পেরেছিল, নিবিড় যোগাযোগ ব্যবস্থায় বাঁধতে না পারলে, ব্যাপ্ত এই দেশকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখা দুরূহ হয়ে উঠবে। অতএব তারা পূর্ণ উদ্যমে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা নির্মাণে লেগে পড়ল। এই রেলপথ প্রসারে বড়ো বাধা হয়ে উঠেছিল, ভারতের এবং বাংলার বড়ো বড়ো নদীগুলি। অতএব রেল যোগাযোগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভারতবর্ষে নদী-সেতু বানানোর ধুম পড়ে গেল। বাংলার রেলপথের সঙ্গে যেহেতু পূর্বভারতের প্রত্যক্ষ সংযোগ অতএব কয়েকটি প্রধান সেতুর কথা এখানে উল্লেখ করছি-

১) বিহারের আরার কাছে শোন নদীর সেতু – ১৮৬৩ সালে চালু হয়েছিল।

২) এলাহাবাদের কাছে যমুনার সেতু – ১৮৬৫ সালে।

৩) দিল্লিতে যমুনার সেতু – ১৮৬৬ সালে।

৪) গঙ্গার ওপর জুবিলি সেতু – ১৮৭৭ সালে – এটি ব্যাণ্ডেল ও নৈহাটি স্টেশনকে যুক্ত করেছে। এই সেতুর নাম জুবিলি, কারণ রানি ভিক্টোরিয়ার রাজত্বের সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে এই ব্রিজটিকে চালু করা হয়েছিল।

৫) অবশ্য বালী ব্রিজ বা উইলিংডন সেতু তৈরি হয়েছিল অনেক পরে – ১৯৩১ সালে।

 রেলপথ নির্মাণের এই ব্যাপক কর্মকাণ্ডের প্রসঙ্গে রেললাইনের মাপ নিয়ে দু চার কথা বলা প্রয়োজন। ব্রিটিশদের নিয়ম অনুযায়ী রেলট্র্যাকে সমান্তরাল দুটি রেললাইন বিছানো হতো তিনটি মাপে – এই তিনটি মাপকে গেজ (Gauge) বলা হয় – ব্রড গেজ, মিটার গেজ এবং ন্যারো গেজ।

ব্রডগেজ – এই মাপে দুটি রেললাইনের মধ্যে দূরত্ব হয় ১.৬৭৬ মি। ব্রডগেজের লাইনগুলিতে দ্রুতগতিতে ট্রেন চালানো অনেক সুবিধেজনক এবং নিরাপদ হয়। তাছাড়া কামরার আকার অনেকটাই বড়ো হওয়ার কারণে অনেকবেশি যাত্রী ও পণ্য বহন করতে পারে।

মিটারগেজ – এই মাপে দুটি রেললাইনের মধ্যে দূরত্ব হয় ১.০০ মি। লাইন ছোট হওয়াতে, খুব স্বাভাবিক কারণেই রেলপথ নির্মাণের এবং আনুষঙ্গিক অন্যান্য খরচও অনেকটাই কম হয়। সেই কারণে এই লাইনগুলি কম গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় – কিংবা পাহাড়ি জায়গায়, যেখানে ঢালু পথে চলাচল করতে হয়, সেখানেই ব্যবহার করা হত। এই লাইনে ট্রেনের গতি ব্রডগেজের তুলনায় অনেকটাই কম রাখতে হ

ন্যারোগেজ – এই মাপে দুটি রেললাইনের মধ্যে দূরত্ব হয় মাত্র ০.৭৬২ মি। এই ট্রেনগুলি সাধারণতঃ প্রত্যন্ত ও প্রান্তিক অঞ্চলে খোলা হত। অবশ্য দার্জিলিং ও সিমলার চড়াই-উতরাইয়ের যাত্রা পথে এই লাইন ব্যবহার করা হয়েছিল।

সে সময় ব্রিটিশ নীতিনির্ধারকরা প্রধান রেলপথগুলি ব্রডগেজ, শাখা লাইনগুলি মিটারগেজ এবং প্রশাখা লাইনগুলি ন্যারোগেজ লাইন বানানোর পরিকল্পনা করেছিলেন এবং সেভাবেই রেললাইন পাতা চালু করেছিলেন।

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশদের বিদায়ের সময় ভারতে মোট রেলপথ ছিল ৫৪,৫৬৮ কিমি। তার মধ্যে ব্রডগেজ ছিল প্রায় ৪৬.১৪% এবং মিটারগেজ ছিল প্রায় ৪৪.২৮% - প্রায় সমান-সমান। আর ন্যারোগেজ ছিল ৯.৫৮%।    

স্বাধীনতার পর ভারতীয় রেল এই গেজ প্রথার আমূল পরিবর্তন শুরু করে। ২০২৩ সাল পর্যন্ত মোট ৬৮,৯০৭ কিমি রেলপথের প্রায় ৯৫.৬৭% লাইন ব্রডগেজে রূপান্তরিত করা হয়ে গিয়েছে। মিটার গেজ এবং ন্যারোগেজ লাইন অবশিষ্ট আছে যথাক্রমে মাত্র ২.৪৩% ও ১.৯০%।

ব্রিটিশ ভারতে রেলপথ বিছানোর মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল পণ্য ও প্রয়োজনে সৈন্য পরিবহন আর গৌণ উদ্দেশ্য ছিল যাত্রী পরিবহন। এই যাত্রী পরিবহনের আবার দুটি ভাগ ছিল – প্যাসেঞ্জার ট্রেন এবং মেল বা এক্সপ্রেস ট্রেন। প্যাসেঞ্জার ট্রেনগুলি স্বাভাবিক ভাবেই প্রতি স্টেশনে দাঁড়াত, গতি ছিল অনেকটাই শ্লথ, গয়ংগচ্ছ ভাব। মেল বা এক্সপ্রেস ট্রেনগুলির কিন্তু তা নয় – তারা গুরুত্বপূর্ণ কিছু স্টেশনে দাঁড়াত, এবং গতি ছিল সেই সময়কার তুলনায় যথেষ্ট বেশি। কিন্তু এই ট্রেনগুলিও আসলে ব্রিটিশ সরকারের মেল (Mail) অর্থাৎ ডাক-বহনকারী গাড়ি ছিল। তার সঙ্গে প্যাসেঞ্জার ট্রেনের থেকে তুলনায় বেশী ভাড়াযাত্রী নেওয়া হত ট্রেন চালানোর খরচ তোলার জন্যে। রাজধানী শহর কলকাতা (পরবর্তীকালে দিল্লি) থেকে বার্তা নিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বিভিন্ন শহরে চিঠিপত্র-নির্দেশ-রিপোর্ট-অভাব-অভিযোগের সংবাদ আদানপ্রদান, এবং দেশের নানান প্রান্ত থেকে সংগ্রহ করা অর্থ-মণি-রত্ন, সোনার অলঙ্কার রাজধানীর রাজকোষে বহন করাই ছিল এই মেলট্রেনগুলির মুখ্য উদ্দেশ্য।                 

হাওড়া-হুগলি রেললাইনে যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৫/০৮/১৮৫৪ – সে কথা আগেই বলেছি। এরপর ১৮৬৬ সালে প্রথম হাওড়া-দিল্লি মেলট্রেন চালু হয়েছিল – তার নাম ছিল ১ আপ/২ ডাউন মেল ট্রেন। পরে এই ট্রেনটিকেই কালকা মেল নাম দিয়ে হাওড়া থেকে কালকা পর্যন্ত চালানো হত।

হাওড়া থেকে প্রথম রেলযাত্রার ১৭বছর পর আজ ২০২সালে পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতবর্ষের রেলপথের বিস্তার গোটা বিশ্বে এখন চতুর্থ স্থানে। অক্টোবর ২০২৩ সালের হিসেব অনুযায়ী ভারতীয় রেলপথের মোট দৈর্ঘ ৬৮,৯০৭ কিমি.। তারমধ্যে ৬০,৮১৩ কিমি বৈদ্যুতিকরণ সম্পন্ন হয়ে গেছে। অর্থাৎ “কু-ঝিক-ঝিক” করে চলা স্টিফেনসনের স্টিম-ইঞ্জিন উঠে গিয়ে,  আমাদের অধিকাংশ ট্রেন এখন চলে বিদ্যুতে এবং কিছু চলে ডিজেল ইঞ্জিনে। তার সঙ্গে বেড়েছে ট্রেনের গতি, সুখস্বাচ্ছন্দ্য, এবং ট্রেনের সংখ্যা বেড়েছে বহুগুণ।

  ওপরের ম্যাপ থেকে পশ্চিমবঙ্গের আধুনিক রেললাইনের পরিস্থিতি সম্যক বোঝা যাবে।      

৩. দক্ষিণবঙ্গ ও উত্তরবঙ্গের যোগাযোগ

রেলযাত্রা নিয়ে অন্য প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে দক্ষিণবঙ্গ এবং উত্তরবঙ্গের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থার চিরন্তন সমস্যার কথা বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে। দীর্ঘ সেই সমস্যা এবং তার সাবলীল সমাধানের কথাই এখন বলব।

শিয়ালদহ স্টেশন থেকে জলপাইগুড়ি/শিলিগুড়ি পর্যন্ত সরাসরি রেলযোগাযোগ শুরু হয়েছিল পদ্মার উপর ১৯১৫ সালে হার্ডিঞ্জ সেতু নির্মাণের পর। সেতুটির অবস্থান আধুনিক বাংলাদেশের কুষ্টিয়ার ভেরামারা থেকে পাবনার ঈশ্বরদি অঞ্চলে। শেয়ালদা থেকে রাণাঘাট হয়ে কুষ্টিয়ার ট্রেন চালু হয়েছিল ১৯০২ সালে।

তার আগে শিয়ালদা থেকে লালাগোলা (১৯০৭ সালে এই ব্রডগেজ লাইন চালু হয়েছিল) যেতে হত। তারপর গঙ্গার পশ্চিমপাড়ের লালগোলাঘাট থেকে স্টিমারে পদ্মাপার হয়ে নামতে হত পূর্বপারের গোদাগারিঘাটে (এখন বাংলাদেশে)। তারপর ওপাড়ের মিটার গেজ লাইনের ট্রেন ধরে মালদা জংশন হয়ে জলপাইগুড়ি এবং শিলিগুড়ি যেতে হত। অতএব সপরিবারে মালপত্র-লটবহর নিয়ে পায়ে হেঁটে নদীর চর ভেঙে স্টিমারে চাপা এবং ওপাড়ে গিয়ে একই ভাবে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ানো ট্রেন অব্দি পৌঁছানো – ভয়ংকর কষ্টসাধ্য ছিল। বিশেষতঃ অসুস্থ এবং বয়স্কদের পক্ষে ছিল মারাত্মক। এর সঙ্গে ঋতু অনুযায়ী গ্রীষ্ম, বর্ষা ও শীতের কষ্ট থাকত উপরি পাওনা।    

হার্ডিঞ্জ সেতু নির্মাণের পর এই অসহনীয় যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন এই পথের অজস্র যাত্রী। কিন্তু এই সৌভাগ্য বেশি দিন সইল না। ১৯৪৭ সালে ভারতভাগের পর হার্ডিঞ্জ সেতু রয়ে গেল পূর্বপাকিস্তানে। অতএব উত্তরবঙ্গ যাত্রা আবার দুরূহ হয়ে উঠল গঙ্গা-পার হওয়ার একইরকম যন্ত্রণায়।

মালদার আগে গঙ্গা পার হওয়ার দুটি পথ ছিল। একটি বিহারের সকরিগালঘাট থেকে স্টিমারে মনিহারিঘাট গিয়ে, সেখান থেকে কাটিহারের ট্রেন ধরা। এবং দ্বিতীয়টি হল – ধূলিয়ানে গঙ্গা পার হয়ে ওপাড়ের খেজুরিয়াঘাট থেকে মালদা যাওয়া। দ্বিতীয় পথটি সংক্ষিপ্ত, কিন্তু গঙ্গার ক্রমাগত ভাঙনে কিছুদিনের মধ্যেই ধুলিয়ানঘাট ব্যবহারযোগ্য রইল না। অতএব সেই পথ পরিত্যাগ করে অনেকটাই ঘুরপথ – সকরিগলিঘাট-মনিহারিঘাট হয়ে উঠল উত্তরবঙ্গ যাওয়ার একমাত্র পথ।

১৯৫৯ সালে বিহারে গঙ্গার দক্ষিণে মোকামা জংশন এবং গঙ্গার উত্তরে বারৌনি জংশনকে জুড়ে রাজেন্দ্রসেতু নির্মাণ হওয়াতে স্টিমার বা লঞ্চে গঙ্গা পার হওয়ার ঝামেলা মিটল। কিন্তু কলকাতা থেকে শিলিগুড়ি যাওয়ার দূরত্ব এবং সময় বেড়ে গেল অনেকটাই।

অতএব বিকল্প রাস্তা খোঁজা শুরু হল। ধূলিয়ানঘাটের অদূরে ফরাক্কা নামের একটি গ্রাম পাওয়া গেল, যেখান থেকে সহজে গঙ্গা পার হয়ে খেজুরিয়াঘাট যাওয়া সম্ভব। অতএব ভারতীয় রেল ফরাক্কা অব্দি নতুন রেললাইন পাতার কাজ শুরু করল, এবং খেজুরিয়াঘাট থেকে জলপাইগুড়ি পর্যন্ত মিটার গেজ লাইন বদলে ব্রডগেজ লাইন পেতে ফেলল ১৯৬০ সাল নাগাদ। কিন্তু এবার আর ছোট স্টিমার নয় গঙ্গা পার করার জন্যে এল বিশাল বিশাল বজরা ও স্টিমার। এগুলিকে বলা হত ওয়াগন ফেরি (Wagon ferry) এক একটি বজরায় ৯ জোড়া লাইন পাতা থাকত এবং প্রতি লাইনে দুটি করে কামরা সেট করা যেত। অর্থাৎ প্রতি বজরা একবারে ১৮টি কামরা নিয়ে নদী পার করতে পারত। এরকম ১০টি বজরা ছিল, অতএব প্রতিবারে ১৮০টি কামরা পারাপার করা সম্ভব ছিল। একদিনে সব থেকে বেশি ৪৫০টি কামরা পারাপার করার রেকর্ডও পাওয়া গেছে। এভাবেই চলছিল প্রায় ১১ বছর।

এরমধ্যেই ফরাক্কা ব্যারেজ নির্মাণের পরিকল্পনা শুরু হয় এবং তার কাজ শুরু হয়েছিল ১৯৬২ সালে। সেই সময়েই ঠিক হয় ফরাক্কা ব্যারেজের ওপরে রেলপথ এবং তার পাশাপাশি তৈরি হবে গাড়ি চলাচলের সড়ক পরিবহণ। ১৯৭১ সালের ১১ই নভেম্বর উভয় পথই চালু হয়ে গেল। দূর হল দক্ষিণ ও উত্তরবঙ্গের যোগাযোগ ব্যবস্থার বহুদিনের সমস্যা।        

 

৪. ট্রেন ও আমাদের আবেগ

(ক) তুফান এক্সপ্রেস বা মেল – এই ট্রেনটি হাওড়া-শ্রীগঙ্গানগর রুটে চালু হয়েছিল পয়লা জুন, ১৯৩০। এই ট্রেনটি সেই সময়ে ভারতের দীর্ঘতম রেলপথ ছিল – ১২২৯ মাইল (১৯৭৮ কিমি)। এখনকার হিসেবে, মোট আটটি রাজ্যকে এই ট্রেনটি যুক্ত করেছিল - পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড, বিহার, উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান, দিল্লি, পাঞ্জাব, হরিয়ানা। এই ট্রেনটির গতি এবং “তুফান” নামে ভারতবাসী এতই উদ্বেল হয়েছিল, যে বম্বের সিনেমা জগতে ১৯৩৪ সালে “তুফান মেল”-নামের একটি সিনেমা রিলিজ করেছিল। এর পর ১৯৪২ সালে আরেকটি সিনেমা “রিটার্ন অফ তুফান মেল” রিলিজ করেছিল। এই সিনেমা সম্বন্ধে আজ আর তেমন কিছু জানা যায় না। কিন্তু বাংলায় “শেষ উত্তর” ও তার হিন্দি ভার্সান “জওয়াব” সিনেমায় আমাদের বাংলার কাননদেবীর কণ্ঠের “তুফান মেল” গানদুটি – আমাদের ছোটবেলাতেও আমাদের গুরুজনদের বহুবার গুনগুন করতে শুনেছি। আজও ইউটিউবে গানদুটি শুনলে তুফানমেল সম্পর্কে জনগণের সমসাময়িক মুগ্ধতার আঁচ পাওয়া যায়।

বাংলা গানের প্রথম পর্বটি এরকম - “তুফান মেল, তুফান মেল যায়। তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে, ময়নামতীর হাট এড়িয়ে, কাশের বনে ঢেউ খেলিয়ে বংশীবটের ছায়, যায় যায় যায় তুফান মেল...”।  

https://www.youtube.com/watch?v=VQD6Md1BbOM

হিন্দিতে গানের প্রথম স্তবকটি এরকম - “তুফান মেল, দুনিয়া ইয়ে দুনিয়া তুফান মেল। ইসকে পাহিয়ে জোর সে চলতে, অওর আপনা রাস্তা তয় করতে, সয়ানেসে কাম নিকালে, বচ্চে সমঝে খেল। তুফান মেল…”।

https://www.youtube.com/watch?v=kNZS86YYP0g

স্বাধীনতার পরে তুফান মেলের তুলনায় বহুগুণ গতিসম্পন্ন এবং দীর্ঘতর রেলপথে বহু ট্রেন দৌড়ে চলেছে প্রত্যেকদিন – কিন্তু জনমানসে তুফান মেলের মতো এমন বিস্ময়ের আবেগ কেউ জাগাতে পারেনি।

স্বাধীনতার পর এই ট্রেনটির নাম হয়েছিল উদ্যান আভা তুফান এক্সপ্রেস ১৯শে মে ২০২০ সালে এই ট্রেনটি ভারতীয় রেল থেকে তুলে নেওয়া হয়। তুফানের গতি আজ স্তব্ধ।

 

(খ) বাল্যকাল ও রেলগাড়ি

আমাদের ছোটবেলায় মাঝেমধ্যে বর্ধমান জেলার পালসিটে মাসির বাড়ি বেড়াতে যেতাম। পালসিট স্টেশন থেকে কিছুটা দূরে মাসির বাড়ির চিলেকোঠার জানালা দিয়ে মাঠের ধার দিয়ে রেলগাড়ি যাওয়া দেখতে পেতাম। দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ ধানের ক্ষেত। সকালের উজ্জ্বল রোদ্দুরে ঝলমলে নীল আকাশ। তার মাঝখান দিয়ে ছুটে চলেছে ট্রেন। সে দৃশ্য আজও মনে পড়লে মনটা বড়ো উদাস হয়ে যায়। তবে আমাদের সময় অধিকাংশই ছিল ধোঁয়াহীন ইএমইউ লোকালট্রেন। কিছুকিছু ছিল সামান্য ধোঁয়া ওঠা ডিজেল চালিত দূরপাল্লার ট্রেন।

একটু বড়ো হয়ে জলপাইগুড়িতে প্রায় চারবছর হস্টেলে থাকতে হয়েছিল। আমাদের হস্টেলের পাশেই ছিল নিবিড়-সবুজ বিস্তীর্ণ চা-বাগান। বাগানের ও পাশ দিয়ে চলে গেছে রেললাইন। রাত জেগে সেমেস্টারের পড়া করার সময় মাঝরাতে আমাদের কানে আসত ওই লাইন দিয়ে দৌড়ে চলা তিনসুকিয়া মেলের আওয়াজ। সে আওয়াজে মনটা বড়ো ঘরমুখো হয়ে উঠত। দৌড়ে গিয়ে বারান্দা থেকে দেখতাম সে ট্রেনের আলোকোজ্জ্বল জানালাগুলির দ্রুত সরে সরে যাওয়া। সে দৃশ্য, সে আওয়াজ দূরে চলে গেলে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘরে এসে আবার বই খুলে বসতাম, কিন্তু মন বসত না, মন তখনও দৌড়ে চলত ওই ট্রেনটির সঙ্গে।        

এ প্রসঙ্গে “পথের পাঁচালি” সিনেমায় কাশবনের ভিতর দিয়ে দৌড়তে দৌড়তে দিদি দুর্গা এবং ভাই অপুর রেলগাড়ি দেখার দৃশ্য অবিস্মরণীয় হয়ে গিয়েছে। বাঙালীর মনে ওই দৃশ্য চিরস্থায়ী আসনে বিরাজ করবে চিরকাল।

 

(গ) রেলগাড়ি-রেলগাড়ি খেলা

আমরা কলকাতার যে সরকারি স্কুলটিতে পড়তাম, সে স্কুলের নিজস্ব কোন মাঠ ছিল না। খেলাধুলো করতে আমাদের যেতে হতো কলেজ স্ট্রিট (এখন বিধান সরণি) পার হয়ে উল্টোদিকে অন্য একটি সরকারি স্কুলে। সে স্কুলে দৌড়ে বেড়ানোর মতো বেশ প্রশস্ত একটি মাঠ ছিল।

সকাল সাড়ে আটটা – নটা নাগাদ আমাদের ক্লাসের তিরিশ জন সারিবদ্ধ বাচ্চাকে নিয়ে দিদিমণিরা রাস্তা পার করতেন। পিঁপড়ের মতো পিছুপিছু সার দিয়ে যেতে যেতে আমাদের মাথায় আসত “রেলগাড়ি-রেলগাড়ি” খেলা। সকলেই সামনের বন্ধুর দুকাঁধে হাত রেখে টুকুরটুকুর দৌড়তাম আর মুখে আওয়াজ করতাম ঝিক-ঝিক – মাঝে মাঝে ডেকে উঠতাম “কু-উ-উ-উ”।  উত্তর আর দক্ষিণ - দু’দিকে দাঁড়িয়ে যেত ট্রাম, বাস, মটর গাড়ি, রিকশ, সাইকেল। ট্রাম-বাসের ড্রাইভার-যাত্রীরা জানালা দিয়ে গলা বাড়িয়ে আমাদের দেখতেন। তাঁদের কোনদিন বিরক্তি বা উষ্মা প্রকাশ করতে দেখিনি – বোধহয়, মজাই পেতেন, হয়তো তাঁদেরও ছোটবেলার কথা মনে পড়ে যেত।

বড়ো হয়ে টিভিতে এই খেলাটি একটি গানের ভিডিওতে দেখেছিলাম। নিজের গলায় “রেলগাড়ি, ছুকছুক-ছুকছুক” গান গেয়ে, বাচ্চাদের একটি “রেলগাড়ি” খেলা পরিচালনা করেছিলেন স্বয়ং দাদামণি অশোককুমার। ১৯৬৮ সালের আশীর্বাদ সিনেমার গান – ইউটিউবে দেখে নিতে পারেন। গানটির রচয়িতা শ্রী হারীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় (ফেলুদার “সিধুজ্যাঠা” এবং শ্রীমতী পদ্মজা নাইডুর ভাই) - ছোটবেলাটা ফিরিয়ে এনেছিলেন এক লহমায়। 

https://www.youtube.com/watch?v=qn_v5PyhQJE

দাদামণি এই গানটির তাৎপর্যপূর্ণ একটি বড়োদের ভার্সান শুনিয়েছিলেন মুম্বাইয়ের এক অনুষ্ঠানে – সেটিও হারীনবাবুর লেখা। সে গানটিও ইউটিউবে শুনে নিতে পারেন।


(ঘ) রেলযাত্রা ও রেলযাত্রী

ব্রিটিশ-রেল যুগে, মোটামুটি ১৮৭১ সাল নাগাদ, দূর-পাল্লার ট্রেনে চারটি শ্রেণী থাকত। প্রথম শ্রেণী ছিল প্রধানত উচ্চপদস্থ শ্বেতবর্ণ মানুষদের জন্য। দু’একজন উচ্চ পদস্থ কৃষ্ণবর্ণ মানুষকেও অবশ্য অনুমতি দেওয়া হত, যেমন পেয়েছিলেন স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়। তাঁর এই প্রথম শ্রেণীতে রেলযাত্রা নিয়ে একটি মজার গল্প শোনা যায়।

একবার মধুপুর থেকে কলকাতা ফেরার সময়, স্যার আশুতোষ রেলের প্রথম শ্রেণীতে উঠেছিলেন। তাঁর কামরায় ছিল জনৈক ইংরেজ সায়েব একই কামরায় নেটিভ মানুষটিকে তার মোটেই সহ্য হচ্ছিল না। স্যার আশুতোষ অবশ্য সায়েবকে গ্রাহ্য না করে, নিজের নির্দিষ্ট বার্থে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন। কিছুক্ষণ পর ঘুম ভাঙতে তিনি কামরার মধ্যে তাঁর জুতো জোড়া খুঁজে পেলেন না। তিনি বুঝতে পারলেন, এ ওই সায়েবের কীর্তি। তাঁর ঘুমের মধ্যে ব্যাটা তাঁর জুতোজোড়া বাইরে ফেলে দিয়েছে। সে সময় সায়েবও তার নিজের বার্থে ঘুমোচ্ছিল, কামরার হুকে ঝুলছিল সায়েবের কোট। স্যার আশুতোষ হুক থেকে কোটটি তুলে নিয়ে, চলন্ত গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে ফেলে দিলেন

কিছুক্ষণ পর সায়েব ঘুম ভেঙে উঠে নিজের কোট দেখতে না পেয়ে খুব রেগে গেল, জিজ্ঞাসা করল, “আমার কোট কোথায়?” স্যার আশুতোষ খুব শান্তভাবে জিজ্ঞাসা করলেন, “তাই তো, আমার জুতোজোড়াও যে খুঁজে পাচ্ছি না”। সায়েব উদ্ধতভাবে উত্তর দিল, “তোমার জুতোজোড়া গেছে বাইরে হাওয়া খেতে”। স্যার আশুতোষ আরও শান্ত ও নিশ্চিন্ত সুরে বললেন, “তাহলে তো ঠিকই আছে, সায়েব। তোমার কোট গিয়েছে, আমার জুতোজোড়া খুঁজতে”! একজন নেটিভের থেকে এমন শান্ত উত্তর শুনে, কোটের শোক ভুলে, সায়েব নাকি স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল।

 দ্বিতীয় শ্রেণী ছিল মধ্যবিত্ত শ্বেতবর্ণ এবং উচ্চবিত্ত কৃষ্ণবর্ণ মানুষদের জন্যে। তবে এই শ্রেণীতেও সায়েব- নেটিভের দ্বন্দ্বের কথা বাংলা সাহিত্যে বিরল নয়।

তৃতীয় শ্রেণী ছিল মধ্যবিত্ত নেটিভদের জন্যে। কামরায় কাঠের বেঞ্চ সেট করা থাকত। প্রথম দিকে কামরাতে কোন টয়লেট থাকত না। দীর্ঘ অনুরোধ, আন্দোলন, কর্তৃপক্ষের কাছে লেখালেখির পর ১৮৯১ সাল থেকে কামরায় শৌচাগারের ব্যবস্থা শুরু হয়েছিল।

তীর্থযাত্রা, পশ্চিমের বিশুদ্ধ জল ও বায়ুতে স্বাস্থ্যোদ্ধার কিংবা চাকরিসূত্রে প্রবাসযাত্রার জন্যে মধ্যবিত্তদের কাছে এই তৃতীয় শ্রেণীর রেলযাত্রা যথেষ্ট আদরণীয় ছিল। তবে তার সাজসরঞ্জাম ও যোগাড়যন্ত্রর কথা শুনলে, এ যুগের রেলযাত্রীরা আঁতকে উঠতে পারে

কর্তা-গিন্নি ও তাঁদের নানানবয়সী চার-পাঁচটি সন্তান। কর্তার একজন ভাই অথবা শ্যালক ও একজন বিধবা ভগিনী অথবা কুমারী শ্যালিকা। একজন ভৃত্য ও একটি কাজের মেয়ে। এই নিয়ে তখনকার দিনে একটি মাঝারি পরিবার হত। অতএব অন্ততঃ তিন-চারটে লোহার ট্রাঙ্ক (তখনকার দিনে পোর্টমান্টো বা Portmanteau বলত) ভরা জামাকাপড়। শতরঞ্চিতে জড়ানো তিন চারটি বেডিং – বিছানার চাদর, বালিশ, বাড়তি কিছু শতরঞ্চিসহ। বড়ো বড়ো বেতের ধামায় শিল-নোড়া, হামানদিস্তা, নানান মশলা, বড়ি, আচারের বয়াম ইত্যাদি। কিছু ভালো চাল, আমসত্ত্ব, ঘিয়ের শিশি। গিন্নিমার হাতের কাছে থাকত ছোট ঝুড়িতে পানের সরঞ্জাম, যাত্রাপথে খাবার জন্যে লুচি, পরোটা, তরকারি, মুড়ি, চিঁড়ে, গুড়। কুঁজোয় খাবার জল। সে জল ফুরিয়ে গেলে স্টেশনে স্টেশনে নেমে কুঁজো ভরে জল আনা ছিল অবশ্য কর্তব্য। এছাড়াও থাকত কাজের লোকেদের নিজস্ব পুঁটলি, তার মধ্যে জামাকাপড় ছাড়াও থাকত চিরুনি, মাথার তেল, দোক্তা, গুড়াখু ইত্যাদি। ও বলতে ভুলেছি, কর্তার হুঁকো-কলকে, তামাক-টিকের দায়িত্ব থাকত ভৃত্যের হাতে। ঠিক ঠিক সময়ে কর্তার হাতে সাজা-হুঁকো তুলে দিতে না পারলে কুরুক্ষেত্র বেধে যাওয়ার উপক্রম হত।

এ প্রসঙ্গে বলে রাখি, সে সময় তীর্থযাত্রা এবং বায়ুপরিবর্তন উপলক্ষে অন্তুতঃ মাসতিনেক প্রবাসে থাকতে হত। আর চাকরিসূত্রে অন্ততঃ ছ’মাস। কারণ, দেশে অর্থাৎ নিজের গ্রামে ঘুরে যাওয়ার জন্যে, “মুখপোড়া” সায়েব-কর্তা কবে ছুটি মঞ্জুর করবে, তার ঠিক কি? অতএব বিদেশ-বিভূঁইয়ে কোথায় কী পাওয়া যাবে, কি যাবে না, সেই দূরদর্শীতা থেকেই রেলযাত্রার এই বিপুল আয়োজন করতে হত।   

পরবর্তী কালে শতরঞ্চি বাঁধা বেডিংয়ের পরিবর্তে এল মোটা ক্যম্বিস কাপড়ের তৈরি – বেল্টবাঁধা হোল্ড-অল (Hold-All) এবং সুটকেশ। আমার ছোটবেলায় আমার পিতৃদেবকে কর্মসূত্রে দিন সাত-দশের জন্যে প্রায়ই বাইরে যেতে হত। ছোটবেলায় বাবার হোল্ড-অল গোছানো শিখেছিলাম মন দিয়ে। সে শিক্ষা এবং পৈতৃক হোল্ড-অলটি আমার জীবনে একবারই কাজে লেগেছিল, জলপাইগুড়ির হস্টেলে প্রথমবার যাওয়ার সময়।

চতুর্থ শ্রেণী ছিল নিম্নবিত্ত এবং মজদুর মানুষদের জন্যে। এই কামরাগুলিতে শোয়া-বসার কোন ব্যবস্থা থাকত না। লোহার মেঝেতেই গাদাগাদি করে শুয়ে বা বসে যাত্রা করতে হতে। এক্ষেত্রেও দীর্ঘ আন্দোলনের পর, বেঞ্চের ব্যবস্থা করা হয় ১৮৮৫ সাল থেকে।

আধুনিক দূর পাল্লার ট্রেনে মোট পাঁচটি শ্রেণিতে যাত্রা করা যায়, 1AC, 2AC, 3AC, Second class Sleeper, General (unreserved)। কিছু কিছু ট্রেন Chair car হয়তাতে AC বা NonAC কামরায় চেয়ারে বসে যাত্রা করতে হয়। অবশ্য এই ট্রেনগুলির দূরত্ব সীমা আট-দশ ঘন্টার মধ্যেই সীমিত রাখা হয়।

 

(ঙ) ছড়া ও চাকার ছন্দে রেলগাড়ি

ছোটবেলায় এই ছড়াটি আমরা সকলেই পড়েছি, শুনেছি, আধোআধো উচ্চারণে আবৃত্তি করে, ঘনিষ্ঠ পরিজনের আদর ও হাততালি কুড়িয়েছি,  

“আইকম বাইকম তাড়াতাড়ি

যদুর মাস্টার শ্বশুরবাড়ি।

রেলকাম ঝমাঝম            

পা পিছলে আলুর দম”।

কিছুটা “ননসেন্স” প্রকৃতির হলেও, ছড়ার বক্তব্য মনে হয়, যদুর মাস্টার শ্বশুরবাড়ি যাবেন বলে তাড়াতাড়ি রেলগাড়ি ধরতে চললেন। সঙ্গে ছিলাম আমি (I) এবং ভাই। ঝমঝম শব্দে রেলগাড়ি এল, কিন্তু মাস্টারমশাই তাড়াহুড়োতে পা পিছলে পড়লেন, পায়ের গোছ ফুলে আলু হয়ে উঠল। তখনকার দিনে, প্ল্যাটফর্ম থেকে লোহার সিঁড়ি বেয়ে কামরায় উঠতে হত। পা পিছলে যাওয়া তেমন আশ্চর্যের নয়।

আরও শুনেছি দ্রুতগামী ট্রেনের চাকার শব্দছন্দে নানান বক্তব্য। যেমন আমার ঠাকুমা বলতেন, তিনি নাকি চাকার আওয়াজে, “দিদি কোথা, দাদা কোথা” শুনতে পেতেন। এক সহযাত্রী বৈষ্ণব ভক্তের মুখে শুনেছিলাম, ঈশ্বর সন্ধানের ব্যাকুলতা, “কালা কোথা রাধা কোথা”! শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের কোন এক উপন্যাসে পড়েছিলাম, এই চাকার চলার ছন্দে নায়ক শুনেছিল “দিন কাল ভাল নয়” ।         

 

৫. স্টিম ইঞ্জিনের বিস্ময়

আধুনিক টেকনোলজিতে ইঞ্জিন যতই শক্তিশালী এবং সুষমসুন্দর হোক এবং স্টিম-ইঞ্জিন যতই ব্রাত্য হয়ে যাক, স্টিম ইঞ্জিনের প্রাথমিক বিস্ময় মন থেকে বোধহয় কখনও মুছে যাবে না। আমার স্টিমইঞ্জিন-টানা ট্রেনে চড়ার বাল্যের একটিমাত্র স্মৃতিই সম্বল। খুব সংক্ষেপে সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখেছিলাম আমার “বিনিসুতোর মালা” গ্রন্থে। সে কথা আরেকবার বলি –

মহাষষ্ঠীর সকালে হাওড়া থেকে বাজারসাউ প্যাসেঞ্জার ছাড়ল। এই ট্রেন আমাদের কালনা পৌঁছে দেবে ঘন্টা চারেকের মধ্যে। বাবার কাছে জানলাম এই ট্রেন ব্যান্ডেল পর্যন্ত দু একটা স্টেশানে দাঁড়াবে। ব্যান্ডেলে ইঞ্জিন বদল হবে। এখন টানছে ডিজেলের ইঞ্জিন, ব্যান্ডেলের পর টানবে কয়লার স্টিম ইঞ্জিন।

এর আগেও বেশ কয়েকবার ট্রেনে চড়ার অভিজ্ঞতা ছিল, কিন্তু সেটা ছিল ইলেক্ট্রিক ট্রেনের। ডিজেলের গাড়ি ধ্বক ধ্বক শব্দ করে, দুদ্দাড় দৌড়ে পার হয়ে যেতে লাগল একটার পর একটা ষ্টেশন। বাপরে তার কি শক্তি। এর তুলনায় ইলেক্ট্রিক ট্রেন অনেক শান্ত আর নিরীহ। কিন্তু ব্যাণ্ডেলে স্টিমইঞ্জিন লাগিয়ে ট্রেন যখন যাত্রা শুরু করল, সে এক অদ্ভূত অভিজ্ঞতা।

ইঞ্জিন বদলের জন্যে অনেকটা সময় লাগত, তাই বাবা আমাদের নিয়ে প্ল্যাটফর্মে নামলেন, স্টিম ইঞ্জিন কেমন হয় দেখানোর জন্যে। ট্রেনের সামনে থেকে চার পাঁচজন রেলকর্মী খুলে দিলেন ডিজেল ইঞ্জিনের বাঁধন, সে ইঞ্জিন মুক্তির আনন্দে ভোঁ শব্দ করে বেরিয়ে গেল। তারপর বেশ কিছুক্ষণ পর কু-উ-উ-উ-উ বাঁশি বাজিয়ে পিছন করে আসতে লাগল স্টিম ইঞ্জিন। মাথার ওপরে তার কালো ধোঁয়া, আর নীচের দিকে ভস ভস করে সাদা ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে। আস্তে আস্তে এসে, সে ধড়াম করে ধাক্কা লাগাল ট্রেনের গায়ে, তারপর দাঁড়িয়ে পড়ল। রেলকর্মীরা ট্রেনের সঙ্গে বেঁধে ফেললেন এই ইঞ্জিনকে। যতক্ষণ সে দাঁড়িয়ে ছিল, তীব্র শব্দে সে ফোঁস ফোঁস করতে লাগল, রাগী মোষের মতো। লোহার বাঁধন শক্ত হতেই, স্টিম ইঞ্জিন বাঁজিয়ে দিল বাঁশি, কু-উ-উ-উ-উ। মাথার ওপরে কালো ধোঁয়ার রাশি ছাড়তে লাগল ভক ভক করে, আর লম্বা লম্বা শ্বাস নেওয়ার মতো ভস ভস করে স্টিম ছাড়তে লাগল ইঞ্জিন। বাবার হাত ধরে আমরা দৌড়ে উঠে পড়লাম ট্রেনে। আমরা উঠতেই ট্রেন গড়াতে লাগল মা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছিলেন, এখন নিশ্চিন্ত হয়ে বললেন- ‘এত দেরি করলে কেন? যদি ট্রেন ছেড়ে দিত’?...

...অতি উৎসাহে জানালার বাইরে মুখ বাড়াচ্ছিলাম, বাবা মানা করলেন। বললেন, ইঞ্জিনের ধোঁয়ায় কয়লার গুঁড়ো থাকে প্রায়ই, চোখে ঢুকে গেলে ভীষণ কষ্টকর জানালা দিয়ে শরতের প্রকৃতি দেখতে দেখতে মনে হল। ইলেকট্রিক ট্রেন বড্ড কাজের, রসকষহীন কাঠখোট্টা। সকালের যে ডিজেল ট্রেনে এলাম সেটার গায়ে বড্ড জোর, ভয় করে, মনে হয় সামনে কিছু পড়লে ঢুঁ মেরে ঠেলে ফেলে দেবে খ্যাপা হাতির মতো। কিন্তু এই স্টিমের ট্রেন খুব মজার। তেমন তাড়াহুড়ো নেই। একটা স্টেশনে দাঁড়ালে যেন নড়তেই চায় না। ভাবখানা আমার মতো, বেড়াতেই তো যাচ্ছি ভাই, এত তাড়া কিসের? দুপাশে সবকিছু দেখে শুনে, লোকজনকে ব্যতিব্যস্ত না করে দিব্বি শান্ত, শিষ্ট। স্টেশনে লোকজন উঠছে, নামছে। পান বানিয়ে আনছে দোকান থেকে। কেউ কল টিপে জল খেয়ে আসছে। এই ট্রেনও খুব জল খায়। একটু বড়ো স্টেশনে লাইনের ধারে লম্বা গলা জিরাফের মতো পাইপ ঘুরিয়ে ট্রেনের পেটে ভরে দিচ্ছে জল। বাপরে সে কি জল খাওয়া। জল-টল খাওয়া হলে মিষ্টি করে ডাক দিল- কু-উ-উ-উ। যেন বলতে চায়, এবারে উঠে পড় হে, আর কি, গন্তব্যে পৌঁছতে হবে না?”...

এই অভিজ্ঞতার সঙ্গে বড়ো হয়ে “শোলে” সিনেমার স্টিমইঞ্জিনের দৃশ্যের যেমন অনেক মিল ছিল, তেমনি অমিলও ছিল বিস্তর। সেখানে বেলচা দিয়ে ফারনেসে কয়লা ঢালছিলেন “বীরু” অর্থাৎ ঝকঝকে সুস্বাস্থ্যবান নায়ক ধর্মেন্দ্র। কিন্তু বাস্তবে আমি দেখেছিলাম, ফারনেস ও বয়লারের তীব্র গরমে বেলচাওয়ালা শ্রমিকের সারা গা-মুখ ঘামে ও কয়লার ধুলোকালিতে জবজব করছে। ফারনেস ও বয়লারের তীব্র উত্তাপে তাঁর মুখমণ্ডল বিবর্ণ। পরনে অত্যন্ত মলিন বেঢপ জামা-প্যান্ট, মাথায় কালোরঙের একটা টুপি। ইঞ্জিন ড্রাইভার যিনি ছিলেন, যিনি সিনেমার বীরুর মতোই দড়ির লিভার টেনে বাঁশি বাজিয়ে ট্রেনের যাত্রা শুরু করলেন, তাঁর দশাও গরমে, ঘামে, ধুলোময়লাতে একই রকম।

যদিও শোলে সিনেমার সেই স্টিম-ইঞ্জিন-দৃশ্য ছিল স্বপ্নের মতো সাজানো, কিন্তু বাস্তবে ওই ইঞ্জিন-যন্ত্রের সঙ্গে সেই কালে ছিল মানুষের সহ্যশক্তি ও পরিশ্রমের অটুট সমন্বয়। তুলনায় ডিজেল বা ইলেক্ট্রিক ইঞ্জিন চালানো অনেক সহজ হয়েছে – কিন্তু ট্রেনের দ্রুত গতির সঙ্গে বেড়েছে দুশ্চিন্তা আর মানসিক উদ্বেগ।


 --০০--     

 

   তথ্য ঋণঃ

১.  A History of Indian Railways – Mr. G S Khosla, Ministry Of Railway (Rail Board), Government of India. Published in 1988.  

২. কলিকাতা দর্পণ (প্রথম পর্ব) – শ্রীযুক্ত রাধারমণ মিত্র  

পরের প্রবন্ধ - " বাংলার কিছু স্টেশন – কিছু অনুভব

 

বৃহস্পতিবার, ১২ জুন, ২০২৫

কমপ্লেক্স

 এর আগের বড়োদের গল্প - " হরিহর আত্মা "




সাইকেলে বাজার থেকে ফিরে নিশীথবাবু রান্নাঘরের দুয়োরের পাশে থলেটা নামিয়ে হাঁক দিলেন, “কোথায় গেলে সব - হ্যারে তনু, এক কাপ চা খাওয়াবি মা?” উঠোনের ধারের কলঘর থেকে মণিকা সাড়া দিলেন, “থলে থেকে মাছগুলো বের করে, ঝুড়ি চাপা দিয়ে রাখ, তনু। ইল্লুতে বেড়ালগুলো ছুঁকছুঁক করে বেড়াচ্ছে… হে কৃষ্ণ করুণাসিন্ধু, দীনবন্ধু জগৎপতে, গোপেশ গোপীকাকান্ত ...”। মণিকাদেবী স্নান সেরে গামছা দিয়ে চুলের খোঁপা বেঁধে বের হলেন। তারপর উঠোনের দড়িতে ডিং মেরে ভেজা কাপড় মেলতে মেলতে বললেন, “পুরোনো তেঁতুল আনতে বলেছিলাম, ভুলে যাওনি তো?” নিশীথবাবু বারান্দাতেই বসেছিলেন, বললেন, “কিচ্ছু ভুলিনি, পুরোন তেঁতুল দিয়ে মৌরলা মাছের অম্বল…”।

তনু বাবার হাতে চিনি ছাড়া লিকার চায়ের কাপ ধরিয়ে বলল, “কোথায়? আমি তো মৌরলামাছ, পুরোন তেঁতুল কিছুই দেখলাম না, বাবা? চিংড়ি আর ভেটকি মাছ দেখলাম”। চায়ের কাপ হাতে নিশীথবাবু অবাক হয়ে মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কী বলছিস?” “দেখবে?” দৌড়ে রান্নাঘরে গিয়ে দুটো থালা নিয়ে বারান্দায় এল তনু, “এই দ্যাখো”। নিশীথবাবুর হাত কেঁপে উঠল। অবোধ অসহায় চোখে মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

বারান্দা পেরিয়ে শোবার ঘরের কোনায় রাখা ঠাকুরের সিংহাসনের দিকে যেতে যেতে মণিকা আড়চোখে মেয়ের হাতের থালাদুটো দেখে মন্তব্য করলেন, “বিয়ের পর থেকে পয়লা মাসেও কোনদিন তোমাকে চিংড়ি-ভেটকি একসঙ্গে আনতে দেখিনি। আজ মাসের ছাব্বিশ তারিখ… লক্ষ্মীস্তং সর্বদেবানাং যথাসম্ভব নিত্যশঃ। স্থিরাভব তথা দেবী মম জন্মনি জন্মনি...”। আসনে বসে দুই চোখ বন্ধ করে মণিকা অতি দ্রুত মন্ত্রোচ্চারণ করলেন। তারপর ঘাড়ে আঁচল জড়িয়ে গড় হয়ে প্রণাম করলেন সিংহাসনের ঠাকুরসমূহকে। তারপর দ্রুতপায়ে গেলেন রান্নাঘরের দিকে।

রান্নাঘরের মেঝেয় বসেছিলেন নিশীথবাবু, সামনে কন্যা তনুজা আর দুজনের মাঝখানে মেঝেয় ঢালা আনাজের বিস্ময়। কেজি দুয়েক কড়াইশুঁটি, টোমাটো, দুটো নারকেল, ‘হাতিরমাথা’ দুটো ফুলকপি...। নিশীথবাবু অবাক হয়ে মেয়েকে বলছিলেন, “হ্যারে, আমি তো পুঁই-কুমড়ো, বাঁধাকপি, আড়াইশ কড়াইশুঁটি, একটা ছোটসাইজের ফুলকপি কিনেছিলাম। আর ছিল মৌরলামাছের প্যাকেটটা...সে সব এমন বদলে গেল কী করে বল তো, মা? এমনও নয় যে বাজারের থলি বদলাবদলি হয়ে গেছে...এই ব্যাগটা আমাদেরই তো...”।

তনুজা ফিক করে হাসল, বলল, “দশকর্মার দোকানে এমন নকশার থলে অনেক ঝোলানো থাকে বাবা, বদলে যে গিয়েছে, তাতে তো সন্দেহ নেই। কিন্তু কার সঙ্গে হতে পারে, সেটা মনে করার চেষ্টা করো”

নিশীথবাবু বললেন, “এই বাজারের বদলে, আমার থলেটা যে বাড়ি নিয়ে গেল, সে যে আমার চোদ্দ পুরুষ উদ্ধার করে দেবে – সে তো বেশ বুঝতে পারছি”।

এতক্ষণ দরজায় দাঁড়িয়ে মণিকা বাপ-বেটির কাণ্ড দেখে বললেন, “গবেষণা করে করবে কী, শুনি? এক কাজ তো করতে পার – পাড়ায় যত বাড়ি আছে, যত ফ্ল্যাটবাড়ি আছে – তাদের দুয়োরে দুয়োরে গিয়ে শুধিয়ে দেখতে পার...মৌরলার বদলে চিংড়ি-ভেটকি নেবে গো...”।

পত্নীর কথায় নিশীথবাবু খুবই ক্ষুণ্ণ হয়ে বললেন, “কী যে বলো না, তার ঠিক নেই”।

মণিকা বললেন, “সে কথাই তো বলছি...ভেবে আর লাভ কি? তনু, আনাজগুলো যেমন ছিল থলেতে ভরে রাখ, মাছের থালাদুটো ফ্রিজে তুলে দে। তুমি বাইরে গিয়ে বসো, আমি জলখাবার নিয়ে আসছি। তনু, হাত চালা মা, অনেক বেলা হল...”।

 


সাততলায় উঠে ফ্ল্যাটের দরজায় বেল দিলেন সোমেশ্বরবাবু। কাজের দিদি সুলতা দরজা খুলতেই ঘরে ঢুকে বাজারের থলিটা তার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, “দিদি আজ দারুণ চিংড়ি পেয়েছি, বেশ গুছিয়ে মালাইকারি করো তো। তাছাড়া ভেটকি আছে – ফুলকপি দিয়ে জমিয়ে ঝোল...ওঃ আজ দুপুরের খাওয়াটা জমে যাবে”।

সুলতাদিদি হেসে ফেলে রান্নাঘরের দিকে যেতে যেতে জিজ্ঞাসা করলেন, “চা খাবে তো”?

“জলখাবার হয়নি?”

“হয়ে গেছে। লুচিকটা ভাজতেই যা দেরি...”।

“তাহলে আর চা নয়, জলখাবারই দাও”। সোমেশ্বরবাবু বসার ঘরের সোফায় বসে নিশ্চিন্তে খবরের কাগজটা খুললেন।

সোমেশ্বরবাবুর স্ত্রী সুলগ্না ছেলেকে নিয়ে ক্রিকেট-কোচিং করাতে নিয়ে গিয়েছেন। কোচিং সেরে ফিরতে ফিরতে ওদের একটা-দেড়টা হয়েই যাবে। অন্য রোববারগুলো ছেলেকে নিয়ে সোমেশ্বরবাবুকেই দৌড়তে হয়। আজ সুলগ্না গিয়েছেন। ওঁর কোন এক বান্ধবীর বাড়ি বিবেকানন্দ পার্কের আশেপাশেই। সে বান্ধবী কেনটাকিতে থাকেন – দিন কয়েকের জন্যে কলকাতায় এসেছেন। ছেলেকে কোচিংয়ে দিয়ে সুলগ্না তার বাড়িতে যাবেন, সুখ-দুঃখের গল্প করতে। রবিবারের এমন নিশ্চিন্ত-নিরিবিলি সকালটাকে বৃথা যেতে দেওয়ার মানে হয় না, অতএব সোমেশ্বরবাবুর ইচ্ছে, জলখাবার সেরেই ভদকা নিয়ে বসবেন।

খবরের কাগজের প্রথম চারটে পাতার বিজ্ঞাপনে চোখ বোলাতে বোলাতেই সুলতাদিদি প্লেটে চারটে লুচি আর আলুর তরকারি নিয়ে হাজির হলেন। গরমগরম ফুলকো লুচির চেহারা দেখেই সোমেশ্বরবাবুর খিদেটা চাগিয়ে উঠল, বললেন, “ওফ দিদি, তোমার জবাব নেই...। বৌদিকে বলতে যেও না, যেন। জিগ্‌গেস করলে বলবে, ওটের খিচুড়ি খেয়েছি”।

সুলতাদিদি মুখে আঁচল চাপা দিয়ে হেসে বললেন, “আরো দুটো দেব, দাদা, তারপর আর নয়, ব্যস। চা খাবে না কফি?”

“আর কিচ্ছু না। সে অন্য ব্যবস্থা আছে”।

“বুজেছি। তাহলে দু পিস মাছ ভেজে দিই?” সুলতাদিদি হাসলেন।

বড়ো তৃপ্তি করে ছটা লুচি শেষ করে সোমেশ্বরবাবু বেসিনে মুখহাত ধুয়ে নিজের ঘরে গেলেন। সেলার থেকে ভদকার বোতল, গেলাস বের করে, ডাইনিং হলে গেলেন, জলের বোতল নিতে।

সুলতাদিদি বাজারের থলি হাতে নিয়ে সামনে এসে বললেন, “এসব কী এনেছ, দাদাবাবু? কোথায় তোমার চিংড়ি আর ভেটকি? এই পুঁই আর কুমড়ো দেখলে বৌদিমণি কিন্তু খুব রেগে যাবেন। সঙ্গে আবার মৌরলা মাছ!”

“তার মানে? কী বলছো?” সোমেশ্বরবাবু থলিটা হাতে নিয়ে ভেতরে উঁকি মেরে দেখতে দেখতে বললেন, “কী সর্বনাশ। তার মানে থলি বদল হয়ে গেছে”।

বসার ঘরের সোফায় ধপ করে বসে, হতভম্ব সোমেশ্বরবাবু চিন্তা করতে লাগলেন, কী করে এমন হল? তিনি মাত্র একবারই থলিটা নামিয়েছিলেন। তিনটে পান আর সিগারেট কিনতে গিয়ে, সেই পানের দোকানের পাশে। মনে পড়ল সেখানে একজন মাঝবয়সী ভদ্রলোক দোকানীর সঙ্গে কথা বলছিল। দোকানী নিতাই সোমেশ্বরবাবুর চেনা।  ওর থেকে তিনি নিয়মিত সিগারেটের বড়ো প্যাকেট নেন, তার সঙ্গে আজ নিয়েছেন তিনটে পান। দোকানী পান সাজা শুরু করতে সেই ভদ্রলোক বলেছিল, “আমি এখন তাহলে চলিরে নিতাই, দুপ্যাকেট বিড়ি আর দেশলাইটা খাতায় লিখে রাখিস”।

সোমেশ্বরবাবু মনে মনে অশ্রাব্য কিছু গালাগাল দিয়ে চিন্তা করলেন, ওই লোকটাই নির্ঘাৎ ব্যাগটা হাতিয়েছে। শালা চোর-চোট্টায় দেশ ছেয়ে গেল? একটু আনমন হয়েছ কি, ব্যাটারা চোখের কাজলটা পর্যন্ত ঝেড়ে দিচ্ছে! গুম হয়ে বসে সোমেশ্বরবাবু আরও কিছুক্ষণ ভাবলেন, নিতাইয়ের দোকানে ওই বিড়িখোর লোকটার খাতা আছে। তার মানে নিতাই ওকে ভালোভাবেই চেনে। নিতাইকে গিয়ে চেপে ধরলেই ওই পুঁই-কুমড়োখোর ছোটলোকের হদিস পাওয়া যাবে। সোমেশ্বরবাবু সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “দিদি থলেতে যা যা ছিল, কিছু বের করোনি তো?”

সুলতা বললেন, “তা করিনি, কিন্তু যে নিয়েছে তাকে তুমি এখন খুঁজবে কোথায়?” সোমেশ্বরবাবু লুচির আনন্দ এবং ভদকার স্বপ্ন ফেলে দরজা খুলে লিফ্‌টের দিকে ধেয়ে যেতে যেতে বললেন, “হতভাগাকে আমি খুঁজে বের করবই, দেখো না”।

 

নিতাইয়ের কাছে সত্যিই হদিস পাওয়া গেল। সোমেশ্বরবাবুর রাগ এবং উত্তেজনা দেখে নিতাই বলল, “উনি তো নিশীথস্যার। উনি আপনার ব্যাগ চুরি করেছেন? না দাদা, হতে পারে ভুল করে তুলে নিয়ে গেছেন, কিন্তু চুরি? অসম্ভব। উনি এ পাড়ার বহুদিনের বাসিন্দা, ওঁনাকে আমরা ছোটবেলা থেকে চিনি। এ বাজারের সবাই চেনে। আপনি ওই জিতেনদার রিকশয় যান - জিতেনদা, ও জিতেনদা, এঁনাকে নিশীথস্যারের বাড়ি নিয়ে যাও তো। যান জিতেনদাই আপনাকে স্যারের বাড়ি নিয়ে যাবে”।

জিতেনের সাইকেল রিকশায় চড়ে সোমেশ্বরবাবু দুপায়ের ফাঁকে পুঁই আর মৌরলার থলি নিয়ে গুম হয়ে বসে রইলেন। নানান অলিগলির প্যাঁচ বেয়ে সাইকেল রিকশ চালাতে চালাতে জিতেন জিজ্ঞাসা করল, “নিশীথস্যার কী করেছেন, দাদা?” সোমেশ্বরবাবু নিতাইকে যে উত্তেজনা নিয়ে তাঁর থলি চুরির কথা বলেছিলেন, এখন আর সেটা বলতে পারলেন না। একটু ইতস্ততঃ করে বললেন, “ইয়ে মানে, মনে হচ্ছে, একটা ভুল বোঝাবুঝি হয়ে, ওঁনার সঙ্গে আমার বাজারের থলিটা বদলাবদলি হয়ে গেছে...”।

জিতেন হাসল, বলল, “তাই? বোঝো কাণ্ড। ও নিয়ে ভাববেন না, থলি আপনি পেয়ে যাবেন”।  

সোমেশ্বরবাবুর গনগনে রাগটা ধীরে ধীরে থিতিয়ে আসছিল। মৌরলা-পুঁই-কুমড়ো খাওয়া লোকটাকে এ পাড়ায় সবাই চেনে! আশ্চর্য! তার ওপর পানওয়ালা থেকে রিকশওয়ালা সবারই এত বিশ্বাস! তাঁর সোয়া দুকোটির ফ্ল্যাট, বত্রিশ লাখি গাড়ি। ছেলে বিখ্যাত স্কুলে পড়ে, ক্রিকেটের কোচিং নেয়। তাঁকে তাঁর কমপ্লেক্সেও তেমন কেউ চেনে না। কমপ্লেক্স তো অনেক বড়ো ব্যাপার, তাঁর নিজের অ্যাপার্টমেন্টের ছতলা কিংবা আটতলার বাসিন্দাদের, তিনিই কি চেনেন? লিফটে ওঠানামার সময় অনেকের সঙ্গে দেখা হয়, হাই, হেলো, গুড মর্নিং, গুড ইভনিং – ব্যস ওইটুকুই!

নোনাধরা দেওয়ালে সবুজ রঙের দরজার সামনে রিকশ থামিয়ে, জিতেন বলল, “এই যে নিশীথস্যারের বাড়ি”। তারপর ভেজানো দরজা ঠেলে উঠোনে দাঁড়িয়ে ডাকতে শুরু করল, “তনু, এই তনু, স্যার কোথায় রে? এই দাদা স্যারকে খুঁজছে”।

রিকশ থেকে নেমে সোমেশ্বরবাবু বাড়ির ভেতরে ঢুকলেন। সিমেন্ট বাঁধানো ছোট্ট উঠোন। একধারে তুলসীমঞ্চ। উঠোন ঘিরে ছোট ছোট ফুলগাছ, গাঁদা, টগর, জবা...। সামনে লোহার গ্রিল দেওয়া লম্বা বারান্দাওয়ালা একতলা বাড়ি – বিবর্ণ, নোনাধরা…।  

নিশীথবাবু ব্যস্ত হয়ে বেরিয়ে এলেন, “কী ব্যাপার, বাবা জীতেন?”

সোমেশ্বরবাবু বললেন, “ইয়ে মানে, আজ নিতাইয়ের দোকানে আপনার থলির সঙ্গে আমার বাজারের থলিটা মনে হয় ...”। সোমেশ্বরবাবুর কথা শেষ করতে দিলেন না নিশীথবাবু, উত্তেজিত হয়ে বলে উঠলেন, “ওফ, আপনি আমায় বাঁচালেন, ভাই...বাড়ি এসে বাজারের থলি আজার করে যা আতান্তরে পড়েছিলাম...ভেতরে আসুন, ভাই, ভেতরে আসুন, হ্যাগো শুনছ, ওঁনার থলিটা গুছিয়ে দিয়ে দাও...”।

তনুজা থলিটা নিয়ে উঠোনে এল, মুচকি হেসে বলল, “কাকু, এই যে আপনার থলে”।

নিশীথবাবু সোমেশ্বরবাবুর হাত থেকে নিজের থলিটা নিয়ে তনুজাকে বললেন, “যা মা, মাকে গিয়ে বল, সব সমস্যার মীমাংসা হয়ে গেছে”।

সোমেশ্বরবাবু বললেন, “থলিটা একবার চেক করে নিন ...”।

নিশীথবাবু উচ্চকণ্ঠে হেসে উঠে বললেন, “ধুর মশাই, পুঁই-কুমড়ো আর মৌরলা বুঝি চেক করা যায়? মৌরলা কেউ কোনদিন গুনেগুনে কেনে নাকি? বরং আপনার চিংড়ি আর ভেটকির পিস গোনাগুনতি...”।

সোমেশ্বরবাবু হাত তুলে কোনরকমে নমস্কারের ইশারা করে বললেন, “আচ্ছা, এখন তাহলে চলি?”

“আপনাকে নাহক হয়রান হতে হল...”

 

জিতেনের রিকশায় উঠে সোমেশ্বরবাবু পায়ের কাছে রাখা থলি থেকে চিংড়ি আর ভেটকির প্যাকেটদুটো হাতে নিয়ে অনুভব করার চেষ্টা করলেন…পনের পিস চিংড়ি আর ভেটকির পিস ছিল ষোলটা। জিতেন হঠাৎই রাস্তার বাঁদিক ঘেঁষে রিকশাটা দাঁড় করাল, ঘাড় ফিরিয়ে বলল, “দেখে নিন, সব ঠিকঠাক আছে তো?” সোমেশ্বরবাবু একটু ইতস্ততঃ করেও প্যাকেট খুলে গুনলেন। তারপর মুখে বোদা হাসি ফুটিয়ে বললেন, “ঠিকই আছে। জিতেন আবার রিকশা চালাতে শুরু করে জিগ্‌গেস করল, “আপনার কোন কমপ্লেক্স?”

“আকাশপথ”।

“ওঃ ও তো বিশাল কমপ্লেক্স… কমপ্লেক্স মানে অনেক বাড়ি বা মনের জটিল কারবার, তাই না দাদা? নিশীথস্যারের কাছে পড়েছিলাম, উনিই আমাদের স্কুলে ইংরিজি পড়াতেন…ইলেভেনে বাবা মারা গেলেন, তারপর থেকেই এই রিকশ…”।

অ্যাপার্টমেন্টের সামনে নেমে, সোমেশ্বরবাবুর মনে হল - তাঁর আড়াইহাজারি বাজারের থলিটা দেওয়ার সময় ওই মাস্টার চেক করতে বলল না। কিন্তু দেড়শটাকার বাজারের জন্যে চেক করার কথা কেন তিনি ওই মাস্টারকে বলতে গেলেন? আসলে তিনি যে শুধু মস্তো এক কমপ্লেক্সেই থাকেন তা নয়, তাঁর মনের মধ্যেও গড়ে তুলেছেন গভীর কিছু কমপ্লেক্স, যে কথা মনে করিয়ে দিল জিতেন নামক রিকশাওয়ালাটাও!  

--০০--

পরের বড়োদের গল্প - " প্রতিবাদের আলো

সোমবার, ৯ জুন, ২০২৫

হরিহর আত্মা

 এর আগের বড়োদের গল্প - " এখনও মারীচ "




 

 

কদিন ধরে টানা নিম্নচাপের দরুণ খুব বৃষ্টি আর মেঘলা গেল। আজ সকালটা ঝকঝক করছে পরিষ্কার। আড়ালবাবু এখনো নিচেয় নামেননি, নামলে, এমন দিনে বলতেন, “আজ সকালটা বেশ চকচক করছে, দেখেছেন? নীল আকাশটাকে আজ যেন পালিশ দিয়ে, আয়না করে ছেড়ে দিয়েছে। একটু লক্ষ্য করলে, এই পৃথিবীর ছায়াও হয়তো দেখা যাবে আকাশের গায়। আর ওদিকে স্যাঁকরার দোকান থেকে সদ্য গড়িয়ে আনা সোনার থালার মতো ঝকঝকে সূর্যটার আলো, চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে। গাছের পাতায় ঝিলমিল করছে সোনা রোদ্দুর। গাছের পাতায় পাতায় আজ জবরদস্ত ভোজবাড়ির মতো ব্যস্ততাহাওয়ায় দুলতে থাকা পাতারা বাতাস থেকে হুস হুস করে কার্বন ডায়ক্সাইড টেনে নিচ্ছে, আর ওদিকে শেকড়-বাকড় ভেজামাটি থেকে চোঁ চোঁ করে জল টেনে, পৌঁছে দিচ্ছে পাতায়, পাতায়তারপর সূর্যের আলোর সঙ্গে সবুজ পাতায় সালোকসংশ্লেষ ঘটিয়ে, বাতাসে কয়লার উনুনের ধোঁয়ার মতো ছাড়ছে অক্সিজেন আর বাষ্পআজ গাছের আশপাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে, বুক ভরে শ্বাস নিতে কী আরাম, কী আরাম! গাছের ছাড়া ওই বাষ্পের জন্যে দরদরিয়ে ঘামটা হয় ঠিকই, কিন্তু বাস ট্যাক্সি অটোর ধোঁয়ার জন্যে, ফুসফুসের কেলটে তেলচিটে ন্যাতা-ন্যাকড়া ব্যাপারটা যে কমে যায়, সেটা বেশ টের পাই”   

আড়ালবাবুর কথাবার্তার এরকমই ধরন। রোজ সকাল সকাল আমরা একসঙ্গে হাঁটতে যাই। আড়ালবাবু আর আমি। আড়াল রয়আড়ালবাবুর নাম আসলে রঙ্গলাল রয়, প্রথম পরিচয়ের দিনই আমাকে মজা করে বলেছিলেন, “আমি হচ্ছি রঙ্গলাল রায়, সংক্ষেপে আর এল রয়, তার মানে, আড়াল রয়, আমি আড়ালেই তো থাকি মশাই, প্রকাশ্যে বড়ো আসি না, হে হে হে হে”।

আড়ালবাবু আর আমি একই অ্যাপার্টমেন্টের বাসিন্দা। উনি থাকেন চারতলায়, আমি আটতলায়। এ নিয়েও উনি মজা করে আমাকে বলেন, “আপনারা সব উঁচু তলার বাসিন্দা”সারাদিন নিজের নিজের কাজ কর্মে আমরা ব্যস্ত থাকি, তাই দেখা সাক্ষাৎ কমই হয় তবে মর্নিং ওয়াকের সময় উনি আমার নিত্যসঙ্গীআর ছুটির দিনগুলোতে দিনের বেশ কিছুটা সময়, হয় আমি ওঁনার ফ্ল্যাটে কাটাই, নয়তো উনি আমার ফ্ল্যাটে। তার কারণও আছে, আমি ব্যাচিলর আর আড়ালবাবু বিপত্নীক তাঁর একমাত্র কন্যা বিয়ে থা করে সুদূর সিয়াটেল শহরের স্থায়ি বাসিন্দা। তিনি ফ্ল্যাটে একলাই থাকেন। অবরে সবরে কন্যা-জামাই-নাতি-নাতনীদের কলকাতায় আবির্ভাব হলে, কয়েকটা দিন আড়ালবাবু ব্যতিব্যস্ত থাকেন। “আবির্ভাব” আর “ব্যতিব্যস্ত” কথাগুলো উনিই বলেন। একবার জিগ্যেস করেছিলাম, “ওদের আসাকে হঠাৎ আবির্ভাব বলেন কেন”?

“কী বলছেন মশাই, আবির্ভাব নয়? এঁনারা সকলেই এনারাই, মানে এন আর আই। প্রবাসী। যতদিন এখানে থাকে ব্যতিব্যস্ত হয়ে থাকি। এই যেমন ধরুন টয়লেট শুকনো নয়। টয়লেট কোনদিন শুকনো হয় শুনেছেন? আমি তো শুনিনি মশাই। আমাদের ছোটবেলায় দেশের বাড়ির কলতলায় টিউকল ছিল, সেখানেই আমাদের চান, হাত-পা ধোয়া, মুখধোয়া, আঁচানো, ছোঁচানো সবই চলত। গরমের নির্জন দুপুরেও টিউকলের তলায় বালতি রাখার গাব্বুতে জল খেতে আসত কাকের দল। হাগু করতে যেতাম ঘর থেকে একটু দূরে, এক টেরে। এখন “হাগু” বলুন না, রে রে করে সবাই তেড়ে আসবে। পটি বলতে হয়। পটি বললেই যেন জিনিষটা শুদ্ধ হয়ে গেল। আমার বাপু অত সব মাথায় থাকেও না, মাঝে মধ্যেই এমন সব বদখৎ কথা বলে ফেলি। আমার কিছু হয় না, আমার মেয়ে অপ্রস্তত হয়। আড়ালে ডেকে চুপি চুপি বলে, “বাপি, তুমি আর শুধরোলে না”নাতি আর নাতনীদের সঙ্গে ইংরিজিতে কথা বলতে হয়। অফিসে মাঝে মধ্যে ইংরিজিতে কথাবার্তা বলতে হত, বুঝলেন? তা সে সব কথা অফিসিয়াল কথা, তার এক বাঁধাধরা গৎ আছে, কিন্তু ঘরোয়া কথাবার্তায় ইংরিজি কী বলি বলুন দেখি” আমিও সমর্থন না করে পারি না।

“তা ঠিক, সাদা বাংলার কথাবার্তা ইংরিজিতে বলতে গেলে, বেশ খটমটো হয়ে যায় ব্যাপারটা”

“হয় না? বলুন দেখি। এই তো গেলবার যখন এসেছিল। একদিন দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর, ভাবলাম নাতি-নাতনী দুটোকে ঠাকুমার ঝুলির গল্প শোনাই। প্রথমেই এক বেমক্কা হোঁচট খেলামবললাম গ্র্যাণ্ডমামা’স ব্যাগ। নাতি জিগ্যেস করে বসল, হোয়াট টাইপ অফ ব্যাগ? লেদার অর সিন্থেটিক? কটন অর জুট? যতো তাকে বোঝাতে যাই ইটস নট লাইক দ্যাট, ইটস সিম্বলিক। ইউ মে থিংক অফ কালেকশান অফ গ্র্যাণ্ডমামা’স স্টোরিসসে মশাই, তাদের ঝুলি বোঝাতেই আমার সময় কেটে গেল, গল্প আর শুরুই করা হল না। ওদিকে মেয়ে আর জামাই নিজেদের মধ্যে অনর্গল ইংরিজিতে বকে চলেছে, জামাই বলছে ওর কলেজের বন্ধুদের গেট টুগেদারে যেতেই হবে, মেয়ে বলছে তার কলেজের বন্ধুদের...”                             

 

 

আমাদের ব্লকের একপাশে ছোটছোট চারাগাছে ফুল এসেছে বিস্তর। দোপাটি, নয়নতারা, বেলি। লতায় লতায় মাধবীলতা, জুঁই আর ঝুমকো কুরুপাণ্ডব। মিনিট দশেক ঘুরে ঘুরে ফুল-টুল দেখার পর আমাদের ব্লকের সিকিউরিটি অনাদি পোল্লেকে জিগ্যেস করলাম, “রঙ্গলালবাবু নামেন নি এখনো?”

সিকিউরিটি অনাদি পোল্লে উত্তর দিল, “না স্যার, এখনো তো দেখিনি ওঁনাকে”

“এত দেরি তো করেন না, শরীর-টরীর খারাপ করল নাকি?”

আমি আমার মোবাইল থেকে আড়ালবাবুকে কল করলাম। চারবার রিং হ’য়ে কেটে গেল। তার মানে আড়ালবাবু আসছেন বোধ হয়। এদিকে আমাদের ব্লকের লিফ্‌ট্‌টাও নেমে আসছে দেখলামনিচেয় এসে লিফ্‌ট্‌টা দাঁড়াতে, দরজা খুলে আড়ালবাবুই এগিয়ে এলেন, বললেন, “আমার একটু দেরি হয়ে গেল। আপনার কল পেয়েই বুঝলাম আপনি অপেক্ষা করছেন। আজকের রোদ্দুরটা দেখেছেন, মশাই? কদিন মেঘলার জন্যে বেশ ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা ছিল ওয়েদারটা, আজ একেবারে বকেয়া গরম যেন ঢেলে দিচ্ছে হুড় হুড় করে। সকালেই এই, বেলায় দেখবেন, রোদ্দুরে বেরোনো যাবে না; ঘাড় পিঠ, মুখ একেবারে ড্রাগনের নিশ্বাসের মতো জ্বালিয়ে দেবে। চলুন, রোদ্দুরটা ঝাঁঝালো হবার আগেই হেঁটে আসি। ভাদুরে ভ্যাপসা গরমে একটু হাঁটাচলা করলেই ঘাম! একটু ছায়া ছায়া দেখে হাঁটবো মশাই, অকারণ পিঠ পুড়িয়ে, মুখ পুড়িয়ে লাভ নেই।”

“সেই ভালো, আর দেরি না করে, চলুন ঘুরে আসি”আমাদের আবাসনের মধ্যেই ইঁট সাজানো সুন্দর পথের ওপর নেমে আমি বললাম। পিছন থেকে সিকিউরিটি অনাদি পোল্লে হঠাৎ পিছু ডাকল, “স্যার, স্যার”

আমি ও আড়ালবাবু দুজনেই থমকে দাঁড়িয়ে ঘাড় ফিরিয়ে তাকালাম। 

“কিছু বলবে, অনাদি?” আমি জিগ্যেস করলাম।

“আচ্ছা, এখন থাক স্যার। ফিরে আসুন, এলে বলব”

সিকিউরিটি অনাদির আচরণে আমি একটু বিরক্তই হলাম, কিন্তু কিছু বললাম না। হাঁটতে শুরু করলাম, আমার পাশে পাশে আড়ালবাবুও হাঁটতে আরম্ভ করলেন।

 

অন্যদিন আড়ালবাবু অনর্গল বকবক করেন, অথচ আজ মিনিট পাঁচেক হাঁটার পরেও উনি কথা বলছেন না দেখে আমি বেশ আশ্চর্যই হলাম। ওঁকে কথা বলানোর জন্যে আমিই কথা শুরু করলাম, “অনাদি পিছু ডেকে কী বলতে চাইছিল, বলুন তো? আমি তো ওর সামনে মিনিট দশেকের ওপর দাঁড়িয়েই ছিলাম, ফুলগাছ দেখছিলাম, তখন কিছু বলল না।”

“যা বলেছেন, সকাল সকাল পিছু ডাকলে মাথাটা খুব গরম হয়ে যায়, জানেন? খনার বচন জানেন তো “ভরা থেকে খালি ভালো, যদি ভরতে যায়; আগে থেকে পিছে ভালো, যদি ডাকে মায়”

“তার মানে? বুঝলাম না ঠিক” আমি হেসে বললাম।

“বুঝলেন না? ছড়ায় বলছে, একমাত্র মা যদি পিছু ডাকেন তাহলে খুব শুভ, অন্য কেউ ডাকলে নয়”

“তাই? আর ওই ভরা-টরা নিয়ে যেটা বললেন?” হো হো করে খানিক হাসলেন আড়ালবাবু, তারপর হাসি থামিয়ে বললেন, “এগুলো সব দিদিমার থেকে শোনা, বুজেছেন? সে সব অন্যরকম দিন ছিল, ভালো কি মন্দ সে তর্কে যাচ্ছি না, তবে একদম অন্যরকম। দিদিমা বলতেন, কোথাও যাত্রার সময়, ভরা কুম্ভ, মানে জলভরা কলসী দেখা শুভ, আর খালি কলসী খুব অশুভ। কিন্তু শূণ্য কুম্ভ নিয়ে কেউ নদীতে বা পুকুরে জল ভরতে যাচ্ছে, এই দৃশ্য নাকি দারুণ শুভ”

“বাঃ”আমি মৃদু হেসে উত্তর দিলাম, “আপনার থেকে পুরনো দিনের অনেক কিছু জানা যায়”

“আরো আছে, অনেক আছে। দিদিমার যা স্টক ছিল, ভাবা যায় না। সে যাকগে ওই পিছু ডাকা নিয়ে খামোখা ভাববেন না। হে হে হে হে, ও হচ্ছে অনাদি অনন্ত। ওর অভিযোগের আর শেষ নেই। কিছু একটা অভিযোগের কথা বলতো, হয়তো ওর ঘরের ফ্যানটা চলছে না, কাল রাতে ঘুমোতে পারেনি”

“রাতে ঘুমোবে কেন? রাতের ডিউটি না করে, ঘরে ঘুমোবে”?

“এ কি আর সেই আগেকার দিনের রাতের পাহারাওয়ালা পেয়েছেন? “জাগতে রহো” হেঁকে হেঁকে পাড়ায় ঘুরে বেড়াবে? ফ্ল্যাটের সবাই ফিরে এলে, রাত্রে ও সদর দরজায় তালা ঝুলিয়ে, নিজের ঘরে ফ্যান চালিয়ে ঘুমোয়। সে অবশ্য একদিকে ভালো। আগেকার দিনের পাহারাদাররা পাড়ার লোককে জাগিয়ে অশান্তি বাড়াত। অনাদি নিজেও শান্তিতে ঘুমোয়, আমাদেরও অশান্তি করে নাকালই দেখুন না, এমন ঘুমিয়েছি, ঘুম ভাঙতেই চায় না। আপনার মিস কল পেয়ে দৌড়তে দৌড়তে নেমে এলাম”

“সে কি? আমার মিস কল পাওয়ার মিনিট খানেকের মধ্যেই তো আপনি নেমে এলেন। ফ্রেস হতে বাথরুমও যাননি”?

আড়ালবাবু হেসে বললেন, “হে হে, এমন সুন্দর ফ্রেস সকালে, আবার কী ফ্রেস হবো? তার ওপর আপনার ওই মিস কল। এই কল ব্যাপারাটা নেহাত কম গোলমেলে নয়, জানেন? ইংরিজিতে কল মানে ডাক। আবার বাংলায় দেখুন কল মানে যন্ত্রপাতি, কল-কারখানাকল মানে জলের কল। ছোটবেলায় আমরা উত্তর কলকাতায় থাকতাম, বুজেছেন? একবার ছোট ভাইয়ের খুব জ্বর হয়েছিল, আমাদের পাড়াতেই থাকতেন ডাক্তারজ্যেঠু। সকাল সাড়ে আটটা নাগাদ তাঁর বাড়ি গেছি, জ্যেঠিমা বললেন, “তোর জ্যেঠু কলে গেছেন”“আচ্ছা” বলে আমি দাঁড়িয়ে আছি, বাড়ির সদরের সামনে। তা বেশ অনেকক্ষণ হবে। কি কাজে জ্যেঠিমা আবার বাইরে এসে আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বললেন, “দাঁড়িয়ে আছিস যে, বললাম না কলে গেছে, ফিরতে দেরি হবে। ফিরলে বলে দেব, তোদের বাড়ি যেতে”বুজুন। ডাক্তার বাবু কলে গিয়েছেন, মানে পেশেন্ট দেখতে বাইরে গেছেন। অথচ  আগেকার দিনে কলঘরে যাওয়া মানে স্নান করাও বোঝাতো, সেও এক ফ্রেস হওয়ার ব্যাপার। ফ্রেস মানে পরিষ্কার। পরিষ্কার মানে সাফ সুতরো, স্বচ্ছ ভারত। তার মানে ঝেঁটিয়ে সাফ করে ফেলা”

“আপনি পারেন বটে, কোথাকার কথা কোথায় নিয়ে চলে এলেন”আমি হাঁটতে হাঁটতে হাসলাম।

“না, না, অনলবাবু, আপনি চিন্তা করে দেখুন এই ফ্রেস কথাটা কত সুদূরপ্রসারী। ঝেঁটিয়ে সাফ করা নিয়ে একটা বিখ্যাত গানও আছে, “মার ঝাড়ু মার, ঝাড়ু মেরে ঝেঁটিয়ে বিদেয় কর”। তার মানে, সাফ করা মানে বিদেয় করাও হয়বিদায় করা নিয়েও খুব দুঃখের গান আছে, “বিদায় করেছ যারে নয়ন জলে, এখন ফিরাবে তারে কিসের ছলে?” মানে যে একবার বিদায় নেয় এই পৃথিবী থেকে, তাকে আর ফিরিয়ে আনা যায়? যায় না। তাছাড়া ফিরিয়ে আনবেই বা কে? আর নয়নজল ফেলবেই বা কে? আমার স্ত্রীর জন্যে আমি নয়ন জল ফেলেছিলাম, কিন্তু আমার জন্যে মেয়ে কী আর নয়ন জল ফেলার সময় পাবে? আমার বিদায়ের খবর পেয়েই তাকে ছুটির জন্যে দরখাস্ত করতে হবে, কলকাতা আসার টিকিট বুক করতে হবেসেই সিয়াটেল থেকে কলকাতায় আসা কী চাট্টিখানি হ্যাপা? ওই ভয়ে তো গেলামই না কোনদিন, মেয়ে-জামাই কতবার বলেছে। ওরাই সব করে দিত, ভিসা, যাওয়ার টিকিট, ফেরার টিকিট, কিন্তু ওই ঝামেলা! ঝামেলার কথা ভেবে আর যাওয়াই হল না, আর হবেও না কোনদিন”

আড়ালবাবুর এই বিদায় নেওয়ার দুঃখু-দুঃখু কথার মোড় ঘোরাতে আমি বললাম, “না হওয়ার কী আছে? আপনার মেয়ে জামাই, এর পরে আবার কবে আসছে, নভেম্বরে তো? ওদের সঙ্গেই চলে যান, ঘুরে আসুন কয়েকমাসের জন্যেনতুন দেশ দেখাও হবে, কলকাতার একঘেয়ে জীবন থেকে একটা চেঞ্জও হবে”

“অ্যাই, খুব ভাল বলেছেন, এই চেঞ্জ কথাটাই ধরুন। চেঞ্জ মানে বদলও হয়, আবার খুচরো টাকাও হয়। হলুদ ট্যাক্সিওয়ালাদের কাছে সকাল, বিকেল, সন্ধ্যে কোন সময়েই চেঞ্জ থাকে না। পঁয়তাল্লিশ টাকা মিটারে পঞ্চাশ টাকা নেবে, বাহাত্তর টাকার মিটারে আশিটাকা নেবে, ওরাও বলে “চেঞ্জ নেই, দাদা”, মানে খুচরো টাকা নেই তবে ওদের কাছে ওই চেঞ্জ না থাকার ব্যাপারটা কোনদিনই চেঞ্জ হবে না। কিন্তু খুচরো কিছু কাজ বাকি রয়ে গেল, সেগুলো শেষ করতে পারলে ভালো হতো”

“এখন তো সবে আগষ্ট মাস, আপনার মেয়ে-জামাই আসতে অনেক দেরি, এর মধ্যে আপনার খুচরো কাজগুলো আস্তে আস্তে সেরে ফেলুন”

“আপনি ব্যাপারটা বুঝছেন না, অনলবাবু, কাজগুলো আস্তে আস্তে সেরে ফেলার সময়ও আর রইল না যে। আমার মেয়ের আসতে আসতে খুব জোর দিন দুই তিনের বেশী বাকি নেই! ওই, আবার দেখুন, আস্তে আস্তে আর আসতে আসতে। একই উচ্চারণ, কিন্তু মানেটা আলাদা। লিখতে গেলে আমরা একটু আলাদা লিখি ঠিকই কিন্তু বলার সময়? ধরুন বললাম, আমি আসতে আসতে দেখলাম, দরজাটা বন্ধ। এর মানে কী। আমি ধীরে ধীরে দেখলাম, নাকি আসার পথে দেখলাম। হে হে হে হে। দেখবেন, আজকে ফেরার সময় খেয়াল করে দেখবেন। আমার ফ্ল্যাটের দরজাটা আস্তে আস্তে দেখবেন! নাকি আসতে আসতে দেখবেন? যে ভাবেই হোক দেখতে আপনাকে হবেই”

“দু একদিনের মধ্যেই আপনার মেয়ে আসছে? বাঃ খুব ভালো খবর তো! কালকেও কিছু বলেন নি, হঠাৎ ঠিক হল বুঝি?”

“হঠাৎ? হ্যাঁ, তা হঠাৎই বলতে পারেন। মেয়েও এখনও জানে না, যে তাকে আসতে হবে, আস্তে আস্তে জানবে। আর জানলেই দৌড়ে আসতে হবে, তখন আর আস্তে আস্তে আসতে পারবে না”

আমি খুব হাসলাম, তারপর বললাম, “হে হে হে হে, আজ আপনি খুব হেঁয়ালি করে কথা বলছেন, হে হে। আপনার মেয়ে জানে না, যে তাকে দু তিনদিনের মধ্যে আসতে হবে, অথচ আপনি জানেন? এ আপনার ভারি অন্যায় আড়ালবাবু। আপনার মেয়ে-জামাই বিদেশ বিভুঁইয়ে বড়ো বড়ো পদে কাজ করে, তাদের একটু সময় দেবেন তো, গুছিয়ে নিতে? তারপর ছেলেমেয়েদের স্কুল আছে, সেখানেও বলে আসতে হবেহুট বললেই কী চলে আসতে পারবে? একটু আস্তে, ধীরে সুস্থেই আসতে পারবে। হে হে হে হে, এই দেখুন, আমিও আপনার মতোই কথা বলা শুরু করে দিয়েছি”

আড়ালবাবু হঠাৎই থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন, বললেন, “নেহাত কম হাঁটা হল না, কিন্তু! চলুন কথায় কথায় অনেকটা চলে এসেছি, এবার ফিরি”

“কই আর তেমন হাঁটা হল, অন্যদিন তো এর থেকে আমরা বেশিই হাঁটি। তবে আজ বেরোতেও একটু দেরি হল, তার ওপর আমায় আজ একটু তাড়াতাড়ি অফিসে বেরোতে হতচলুন ফিরেই যাই। সকালে অফিসে ঢুকেই আজ একটা মিটিং ছিল, কিন্তু...।”

“খুব জরুরি মিটিং? মানে, না গেলেই নয়?”

“তা একটু জরুরি, প্রতি মাসে এই সময়ই হয়। এমাসে কলকাতায় কত টাকার ব্যবসা হল, তার হিসেব পাঠাতে হয় মুম্বাইয়ের হেড অফিসে, সেই নিয়েই মিটিং আর কি। সে এমন কিছু নয়, কিন্তু আপনার শরীর-টরীর খারাপ লাগছে নাকি?”

“কেন বলুন তো?”

“ওই যে বললেন, মেয়েকে দু তিনদিনের মধ্যে আসতে হতে পারে। তাহলে আজই মেয়েকে আসতে বলে দিন” 

“শরীর খারাপের এখনই হয়েছে কী, কিছুই হয় নি। এই তো সবে শুরু। হে হে হে হে। শরীরটা নিয়ে ভাবছি না, বুঝেছেন। ঘরের কোণে পড়ে আছে যেমন পড়ে থাক, আমার কী? হে হে হে হে। আর মেয়েকে বলার লোকেরও অভাব হবে না। ঠিক ঠিক সময় মতো সব ঠিকঠাক হয়ে যাবে। আজকের এই সুন্দর সকালে এই যে আপনার সঙ্গে হাঁটছি, আর বকে বকে আপনার মাথা খারাপ করে দিচ্ছি, এতেই আমার খুব আনন্দ হচ্ছে, জানেন?”

আড়ালবাবু আড়চোখে আমার দিকে তাকিয়ে মিচকে হাসলেন। আমিও এই কথায় মজাই পেলাম, বললাম “আমার মাথা খারাপ করতে আপনার আনন্দ হচ্ছে?”

“হবে না, অনলবাবু? আজকে অফিসের মিটিংয়ে বসে আপনি যখন সকালের এই কথাগুলো ভাববেন, দেখবেন বিরক্তিকর মিটিংয়ে বসেও আপনি মিটিমিটি হাসছেন। মুখে না হাসলেও মনে মনে হাসবেন। মিটিমিটি হাসি পায় বলেই তো নাম মিটিং। আমাদের আপিসেও যখন এরকম মিটিং হত, আমার হাসিই পেত, কিন্তু গম্ভীর মুখ করে বসে শুনতে হত। কি জ্বালাতন বলুন তো। বড়ো কর্তারা এমন সব টার্গেট দেবে, কোন মাসেই করা যাবে না। তবু সেই নিয়ে তুলকালাম বকাবকি। পরের মাসের জন্যে আবার একটা অসম্ভব টার্গেট, হে হে হে হে, হাসি পাবে না? তবে হ্যাঁ, আমার আর এখন কোন টার্গেট নেই”

“আমারও মনে হয় আজ থেকে আর টার্গেট থাকবে না। আপনার মতো ঝাড়া হাতপা, নিশ্চিন্ত। ভাবলেই কী যে মজা হচ্ছে, বলে বোঝাতে পারবো না”

 

 

আমাদের ব্লকের লবিতে ফিরে এলাম যখন, দেখি অনাদি গোল গোল চোখে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। কেমন অদ্ভূত লাগল। অনাদির সঙ্গে আমার ভালই আলাপ আছে, কোনদিনই ওর মধ্যে বেচাল কিছু দেখিনি। তবে আজকে যাবার সময়, ওর সেই পিছু ডাক, আর এখন এই ড্যাবডেবিয়ে আমাদের দিকে তাকানো দেখে বেশ বিরক্তই হলাম।

লিফটটা নিচেয় ছিল না, লিফটের সুইচ টিপে আমরা অপেক্ষা করতে লাগলাম। কি মনে হতে অনাদিকে আমি জিগ্যেস করলাম, “অনাদি, তখন পিছু ডাকছিলে, কিছু বলবে”?

অনাদি থতমত খেয়ে ঢোঁক গিলে বলল, “আজ্ঞে স্যার, একটা ক-কথা ছিল, আ-আপনার সঙ্গে, মানে ইয়ে...”

আড়ালবাবু আমার দিকে চোখ টিপে বললেন, “আপনার সঙ্গে প্রাইভেট টক করতে চায়, মশাই, টক করে সবার সামনে বলতে পারছে না, বেচারা। আপনি ওর সঙ্গে টকটা সেরেই নিন, টক না মিষ্টি দেখুন না, কী বলেআমি বরং ওপরে চললাম”

“সেই ভাল, আপনি এগোন। আমি দেখি কী বলতে চায়”

লিফটা নিচেয় এসে পড়েছিল, আড়ালবাবু লিফটে উঠে যেতে, অনাদি সন্তর্পণে পা টিপে টিপে আমার দিকে এগিয়ে এল। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল, লিফটা দোতলা ছাড়িয়ে উঠে গেছে। আমি বললাম, “কি হয়েছে কী, কী ব্যাপার বলো তো”?

অনাদি আগের মতোই তোতলাতে তোতলাতে বলল, “কি-কিছু বুঝতে পারেননি, স্যার? আমার মনে হচ্ছে, র-রঙ্গলালবাবু আমাদের মধ্যে আর নেই!”

আমার খুব রাগ হয়ে গেল, মাথা থেকে পা অব্দি জ্বলে উঠল। স্পষ্ট বুঝলাম ব্যাটা আজকাল নির্ঘাৎ গাঁজা টানছে। সিকিউরিটি এজেন্সির মালিক, নিরাপদবাবুকে এখনই ফোন করতে হবে, এমন লোক আমরা চাই নাখুব কড়া গলায় বললাম, “সারারাত ক পুরিয়া ঘাস টেনেছো, অনাদি? তার রেশ এখনো রয়ে গেল”?

একহাত জিভ বের করে প্রথমে জিভ কাটল, তারপর দুই কানে হাত রেখে অনাদি হাউমাউ করে উঠল, “মা কালীর দিব্বি, স্যার। চা আর গুটখা ছাড়া জীবনে কোন নেশা নেই। আপনি আমার কথা বিশ্বাস করছেন না, স্যার। আপনি আর রঙ্গলালবাবু যাবার সময় যখন, ওই যে, ওইখানটায় দাঁড়িয়ে ছিলেন, ওদিকটা পুবদিক। আপনাদের সামনে সূর্য ছিল, আর পিছনে ছিল লম্বা ছায়া। মানে, ইয়ে...আপনার ছায়া ছিল, ওঁনার ছিল না”

ওর এই অদ্ভূত কথায় আমি এমন অবাক হলাম যে, এটিএম থেকে দশহাজার তোলার সময়, আটটা পাঁচশ আর ষাটটা একশর নোট পেলেও হতাম না। বললাম, “আমার ছায়া ছিল, ওঁনার ছায়া নেই মানে”?

“হ্যাঁ স্যার। সত্যি বলছি। আরো আছে, স্যার। ওঁনার দুটো গোড়ালিই উলটো দিকে...”

“গোড়ালি? উলটো? অনাদি, নিরাপদবাবুকে আমি তোমার নামে কমপ্লেন করবোই, আমি চাই না, তোমার মতো নেশাখোর এক লোকের হাতে, আমাদের এই বাড়ির এতগুলো লোকের সিকিউরিটি জলাঞ্জলি যাক”আমি রাগে গনগনে গলায় বললাম।

“স্যার, আপনি খামোখা আমার মতো গরিবের ওপর রেগে যাচ্ছেন। আমি বলছি স্যার, রঙ্গলালবাবু আমাদের মধ্যে আর নেই”

আমার ঝাঁজালো ধমকানিতেও ওর কোন হেলদোল না হওয়াতে, আমিই কেমন দমে গেলাম, জিগ্যেস করলাম, “তাহলে, এতক্ষণ আমার সঙ্গে যে ভদ্রলোক ছিলেন, তিনি কে”?

“স্যার, উনিই তো তিনি! ইয়ে, মানে...তিনিই কিন্তু তিনি নন, তাঁর অশরীরি ছায়া। ছায়ার কী আর ছায়া হয়, স্যার? সূর্যের দিকে টর্চ মারলে কী আর বেশি আলো হয়, স্যার? আর গোড়ালি উলটে যাওয়া মানে, আসছে না যাচ্ছে, বোঝা যাবে না। অশরীরি স্যার, হাওয়ার মতো, সব জায়গাতেই আছে, তার আবার আসা যাওয়া কী”?

আমি খুব সন্দেহের চোখে অনাদিকে দেখতে দেখতে বললাম, “এসব তোমাকে কে শেখালো বল দেখি?”

“আজ্ঞে ছোটবেলায়, মা, ঠাকুমাদের কাছে শুনেছি, তখন বিশ্বাস করিনি, আজ নিজের চোখে দেখে বিশ্বাস হল”

“বোঝো। তোমারও রঙ্গলালবাবুর মতো সবজান্তা দিদিমা-ঠাকুমা ছিলেন বুঝি”?

“হ্যাঁ স্যার। তাতো থাকতেই হবে, তা না হলে, আমরা হলাম কী করে? ঠাকুমার মুখে শুনেছি, মারা যাবার ঘন্টা ছয়েক পরে আত্মা দেখা দিতে পারে, তবে দেখা দিলেও, তার ছায়া হয় না, গোড়ালি উলটে যায়”

“তাই বুঝি? আর তার চেয়ে কম সময় হলে”? আমি সন্দিগ্ধ চোখে তাকিয়ে জিগ্যেস করলাম অনাদিকে। 

“সে আরো ভয়ংকর, স্যার। সে আত্মা দেখা দিলে, অবিকল মানুষের মতো মনে হয়। চট করে চেনা যায় না। কিন্তু ওই ঘন্টা ছয়েক – ব্যস, তারপর আর তার জারিজুরি খাটে না”   

নিখিলবাবু, অমরবাবু, সামন্তবাবু আরো জনা পাঁচেক সেই সময় বাজার থেকে ফিরছিলেন, আমাদের কথা বলতে দেখে, ওঁনারাও আমাদের ঘিরে ধরে সব কথা শুনতে লাগলেন। ওঁনাদের কৌতূহলের উত্তরে অনাদিকেও বারবার একই কথা বলতে হচ্ছিল। আমার ভালো লাগছিল না, আমি ভিড়ের থেকে আস্তে আস্তে সরে আসতে আসতে লিফটের সামনে গেলাম। লিফটে উঠে গেটটা বন্ধ করে, আট নম্বর বোতামটা টিপতেই লিফটটা উঠতে শুরু করল।

 


সামন্তবাবু এই আবাসনের সেক্রেটারি। রাত সাড়ে আটটা নাগাদ, সামন্তবাবুর ড্রইংরুমে নিখিলবাবু, অমরবাবু এবং আরো জনা দশেক আবাসিক, চা খেতে খেতে কথাবার্তা বলছিলেন। সেখানে সিকিউরিটি এজেন্সির নিরাপদবাবুও ছিলেন। সকালেই থানায় খবর দেওয়া হয়েছিল, পুলিশ এসে ফ্ল্যাটের দরজা ভেঙে লাশ বের করেছেতারপর সারাদিন ধরে, ফ্ল্যাটের প্রায় সবাইকে পুলিশের লোকজন জেরা করেছেসারাটাদিন যা ধকল গেল, সে আর বলার নয়। বেচারা অনাদির অবস্থাই সবথেকে খারাপ। আবাসনের সবাই, তারপর পুলিশের লোকরা সারাদিন এসে তাকে জেরা করে করে জেরবার করে দিয়েছে। ভয়ে আর আতঙ্কে দিশাহারা হয়ে, দিন কয়েকের ছুটি নিয়ে সে দেশে যাবার জন্যে নিরাপদবাবুকে রিকোয়েস্ট করেছিল। নিরাপদবাবু অনুমতি দিলেও পুলিশের অফিসাররা দেননি। তাঁরা বলেছেন, তদন্ত শুরু হয়েছে, শেষ না হওয়া পর্যন্ত, অনাদি কলকাতার বাইরে যেতে পারবে না।

নিরাপদবাবু চায়ের কাপে শেষ চুমুকটা দিয়ে, খালি কাপটা টেবিলের নিচেয় রাখতে রাখতে বললেন, “একেই বোধহয় হরিহর আত্তাঁ বলে, মশাই!”

সামন্তবাবু তাঁকে বাধা দিয়ে বললেন, “ওফ। নিরাপদবাবু, ওই আত্মার কথা আর উচ্চারণও করবেন না। এমনিতেই বাড়ির মেয়েরা আর ছোটরা খুব ভয় পেয়েছে। ওদের সামনে এসব কথা আর না তোলাই ভালো”

“আমরাও কী কম চমকে গেছি, সামন্তমশাই? আজকাল লোডশেডিং হয় না তাই, নইলে রাতের অন্ধকারে টয়লেটে একলা পেচ্ছাপ করতে যাওয়াও এখন দুষ্কর হয়ে উঠত”নিখিলবাবু বললেন।

“যা বলেছেন”অনেকেই নিখিলবাবুর কথার সমর্থন করলেন, আর অমরবাবু কিছুটা আপনমনেই বললেন, “তবে নিরাপদবাবু কথাটা মন্দ বলেননি। দুই বন্ধুর মিলটাও দেখার মতো। রঙ্গলালবাবু দেহ রাখলেন রাত বারোটা নাগাদ আর অনলবাবু ভোরের দিকে। একজনের সেরিব্রাল, তো আর একজনের হার্ট অ্যাটাক।  দুজনে আবার মর্নিং ওয়াকেও গেলেন একই সঙ্গে। এ একেবারে সত্যিই হরিহর...”।

আঁতকে উঠে, দুই কান চেপে সামন্তবাবু বলে উঠলেন, “রাম রাম রাম রাম, শেষ কথাটি আর নাই বা বললেন অমরবাবু!”  

----০০---

পরের বড়োদের গল্প - " কমপ্লেক্স "

নতুন পোস্টগুলি

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩৬

    প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "  দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্...