বুধবার, ৯ জুলাই, ২০২৫

বিসর্জন

এর আগের নাটুকে গল্প " চ্যালেঞ্জ  "  





 দুগ্‌গা

“ওফ আর পারা যাচ্ছে না। এই অষ্টমীর দিনেই বড্ডো ধকল যায়। সকাল থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পুজো নাও, অঞ্জলি নাও। তারপর সন্ধিপুজোর যোগাড় সারা হলে, সন্ধি পুজো নাও। একটানা এতক্ষণ, পা দুটো ভেরিয়ে যায়। আআআআঃ (মস্ত হাই), মণ্ডপের কাঠের মেঝেয় বসে পাদুটো ছড়িয়ে বসে কী আরাম! লক্ষ্মী ওদিকটা লক্ষ্য রাখিস তো, হুট করে এদিকে কেউ যেন চলে না আসে”।

“দেখেছি, মা। সবাই নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছে। ওরা তো আমাদের থেকেও ক্লান্ত। পারে নাকি আর?”

“যাক আর তো দুটো দিন, নবমী পুজো আর দশমীর বরণ। ব্যস, তারপরেই ফিরে যাওয়া”।

“আমার ফিরে যাওয়াই সার। আবার তো ফিরে আসতে হবে, পাঁচদিন পরেই পূর্ণিমাতে”।

“সে আর কী করবি, বাছা? দুটো পয়সার জন্যে আকুলিবিকুলি করছে মানুষগুলো। তোকে পুজো দিয়ে তারা একটু সুখে সম্পদে থাকতে চায়, এইটুকু বৈ তো না”।

“সে ঠিক আছে। কিন্তু আমার জার্নিটা দেখছো না? কাতু আসে কার্তিকের শেষে, প্রায় মাসদেড়েক পরে। আমাদের মধ্যে সরুটা খুব সেয়ানা, সে আসে সাড়ে তিন-চারমাস পড়ে, বেশ ঠাণ্ডার সময়। যত ঝক্কি আমার আর গণুদার। গণুদা এই কদিন আগে আগে একা এসেছিল, আবার আমাদের সঙ্গে এল। আর আমাকে গিয়েই আবার ফিরে আসতে হবে!”

সরু হাসতে হাসতে বলল, “অ্যাই দিদি, তোর হিংসে হচ্ছে, বুঝি? দাঁড়া একটু গান শোন, তাহলেই দেখবি মনটা ভালো হয়ে যাবে! মন থেকে রাগ টাগ সব পরিষ্কার হয়ে যাবে!”

“অ সরু, তুই আবার এই রাত দুপুরে বীণা নিয়ে বসলি? তোরা হাঁসটাও তো এবার হাসবে, মা”।

“একটু শোনো না, মা। নতুন একটা সুর সেধেছি। শুনে, বলো না, কেমন হয়েছে?”

“না শুনিয়ে তুই কী আর ছাড়বি, বোন। শোনা, তাড়াতাড়ি শোনা”। গণুদা বললেন।

খুশি হয়ে সরু বললেন, “থ্যাংকিউ, গণুদা”।

বীণায় সুন্দর সুর বেজে উঠল সকলে চোখ বন্ধ করে শুনছিলেন। সরুর হাতে সত্যি জাদু আছে। পিড়িং পিড়িং শব্দে কী যে আশ্চর্য সুর বের করে ফেলে, মনটা হালকা হয়ে যায়। শরীরের ক্লান্তিও দূর হয়ে যায়। কিন্তু হঠাৎ অচেনা গলার আওয়াজ পেয়ে সকলেই একটু চমকে উঠলেন।  

 

“তুমি বীণা বাজাতে পারো, আমাকে শিখিয়ে দেবে?” সরুর হাঁটুতে ছোট্ট ছোট্ট হাত রেখে একটি মেয়ে জিগ্যেস করল। সকলেই একটু সতর্ক হয়ে উঠলেও, মা তেমন উতলা হলেন না, বললেন, “থাক থাক, বাছা। তোরা সব ব্যস্ত হস না। ও‌ ছোট্ট পুঁচকে মেয়ে। বড়দের মতো এখনো কুচুটেপনা শেখেনি। ও আমাদের দেখে ফেললে কোন ক্ষতি নেই। তোর নাম কী রে, মা?”

“আমার নাম? আমার নাম দুগ্‌গা”  

দুগ্‌গা নাম শুনে সরু হেসে ফেললেন, বললেন, “ওয়াও, হোয়াট আ সারপ্রাইজ”! 

লক্ষ্মী বললেন, “এতে আর আশ্চর্য হবার কী আছে? আমার নামের মেয়েরা কাজের মাসি বা কাজের দিদি হয়। “অ লক্ষ্মী, এঁটো থালাবাসন কটা চট করে ধুয়ে দাও না গো”। লক্ষ্মী অবিকল বাড়ির গিন্নিদের মতো বললেন। “আর তোর নাম রাখে না, তোর নামের বানানের জন্যে। এমন খটোমটো বানান, ইংরিজিতে তাও একটু সহজ, কিন্তু বাংলায়? বাপরে!”

গণুদা বললেন, “বোঝো কাণ্ড। তোরা আবার নাম নিয়ে পড়লি কেন?” ছোট্ট মিষ্টি মেয়েটার নাম দুগ্‌গা শুনে মা দুগ্‌গা খুব খুশি হয়েছেন, কিন্তু মেয়েরা দুঃখ পাবে বলে, গম্ভীরভাবে বললেন, “ও লক্ষ্মী, ওসব ভাবিস কেন, মা? নামে কী আসে যায়। হ্যাঁরে, সরু কোন এক সায়েব যেন বলেছিল ?”

“সেক্সপিয়ার”। সরু বললেন। মা বললেন, “ওই ওই। গোলাপকে ঘেঁটু বললে, গোলাপ ঘেঁটু হয়ে যায় বুঝি?”

সরু হিহি করে হেসে বললেন, “মা, তুমি না যাতা। ঠিক ওভাবে বলে নি, তবে অনেকটা ওরকমই”।

 

ছোট্ট দুগ্‌গা দূর থেকে দাঁড়িয়ে গত মাস খানেক ধরেই এঁদের প্রতিমা গড়ে উঠতে দেখেছে। আর এ কদিন ধরে দেখেছে কত কত লোক, ছেলে মেয়ে, বুড়োবুড়ি সুন্দর সুন্দর নতুন জামাকাপড়, শাড়িটাড়ি পরে রোজ এসে পুজো দেয়। আরতি দেখে। চারদিকে আলোর সাজ। সকাল সন্ধ্যে অজস্র ফুল, ধুপ, ধুনোর গন্ধ। গোটা পাড়াটাই সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছে। এই পুজোর সময় সব কিছুই ভালো, শুধু ঢাক বাজে, কাঁসর ঘন্টা বাজে, শাঁখ বাজেআর মাসিমা, কাকিমারা জিভ নাড়িয়ে ঊলু দেয়। মা সামনে আসতে পারে না, একটু দূর থেকে দেখে চলে যায়। যাঁর পুজো হচ্ছে, তাঁর নাম দূর্গা, সেই দূর্গা যে দুগ্‌গাও, সে কথাটি সেই মেয়েটি তো আর জানে না। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। তাই নির্জন মণ্ডপে উঠে এসে, বড়ো দিদির মতো দেখতে মেয়েটির হাঁটুতে ছোট্ট হাত রেখে দাঁড়িয়েছিল।

বীণা বাজাচ্ছিল যে মেয়েটি, সে তার দিদির মতোই দেখতে, তবে তার দিদি এত ফর্সা নয়। পরনের শাড়িটাও এত সুন্দর, ঝলমলে, ভাল নয়। এই দিদিটা গলায়, হাতে, পায়ে যে এত গয়না পরেছে, তার দিদির তাও নেই। তার ওপর সকলের কথাবার্তা শুনে দুগ্‌গা একটু ঘাবড়ে গেল। ভয় পাওয়া বড়ো বড়ো চোখে তাকিয়ে রইল সরুর মুখের দিকে। সরু মুখ নামিয়ে তাকালেন দুগ্‌গার দিকে, মিষ্টি হেসে বললেন, “বীণা শিখবি? কিন্তু একদিনে তো হবে না, সোনা! অনেক দিন ধরে শিখতে হবে। তোর বাড়ি কোথায়?”

দুগ্‌গা সরুদিদির কথায় কিছুটা আশ্বস্ত হল। অনেক দূরের দিকে হাত বাড়িয়ে সে দেখাল, বলল, “ওই হোথা”। দুগ্‌গার কথায় সরু হেসে ফেললেন, মজাও পেলেন, ঘাড় ঝাঁকিয়ে বললেন, “কোথা?”

“দুলে পাড়া। আমার বাবা, বলরাম দুলে। ঢাক বাজায়। আমার ছোড়দা ঘনশ্যাম ঘন্টা বাজায়”। তারপর হাত তুলে দেখালো, মণ্ডপের নীচে মাটির এক কোণে ঢাকের পিছনে গুটিশুটি শুয়ে আছে একজন লোক আর একটা ছেলে - সেদিকে।

সরু দুগ্‌গার থুতনিতে হাত দিয়ে হাল্কা আদর করে বললেন, “তুই বাবার সঙ্গে এসেছিস, ঠাকুর দেখতে?” দুগ্‌গা ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ বলল। এতক্ষণ সরু আর দুগ্‌গার কথা শুনছিলেন, এখন একটু উদ্বিগ্ন সুরে মা বললেন, “ও সরু। ওকে ছুঁয়ে ফেললি যে, লোকে দেখে ফেললে কুরুক্ষেত্র বাধাবে”।

“ছুঁয়ে ফেললে কী হয়েছে, মা? আমাদের কী জাত যাবে? দেবতার কী জাত আছে মা?”

“আমাদের জাতের কথা কে ভাবছে, বাছা? তা নয়। কিন্তু ভোর হতে দেরি নেই। লোকেদের কেউ দেখে ফেললে এক কাণ্ড বাধিয়ে বসবে। আমাদের কিছুই হবে না। ওদের তাড়িয়ে দেবে, মারধোর করবে। হয়তো...” ভয়ংকর কথাটা মা বলতে পারলেন না।

লক্ষ্মীও বললেন, “সত্যি, তোরই বা অত আদিখ্যেতা দেখানোর দরকারটা কী শুনি? দু চারটে কথা বলে সরিয়ে দে। কী থেকে কী হয় বলা যায়?”

সরু কিছুটা বিরক্ত হলেন এবার, বললেন, “তোমরা একটু বেশীই ভাবছো, মা। ওসব আগেকার দিনে হতো। আজকাল ছেলেমেয়েরা কত লেখাপড়া শিখছে। বুঝতে শিখছে। কম্পিউটার, ইন্টারনেট সারাবিশ্বের পড়াশুনো এখন হাতের মুঠোয়। এ মেয়েটি ভারি মিষ্টি, আমি একে বীণা শেখাবো। ওর মনের যতো সুর, আমি ওর হাতে বসিয়ে দেবোদেখো, বড় হয়ে ও কেমন বীণা বাজায়”।

“কী জানি বাপু, আমার মন কিন্তু কু গাইছে, সরু। ওকে দূরে সরে যেতে বল”।

 

মানদাসুন্দরী রাত থাকতেই উঠে পড়েন। কোমর বেঁকে গেছে, হাঁটুতে জোর পান না, তবুও এ সময় তাঁর মন্দিরতলায় রোজ আসা চাই। এখন তো আবার দূর্গাপুজো হচ্ছে, জগজ্জননী মা ছেলেমেয়েদের নিয়ে এসেছেন, বাপের ঘরে। তাঁর না এলে চলে? বিড়বিড় করে দূর্গাস্তোত্র বলতে বলতে তিনি এসে দাঁড়ালেন মণ্ডপের সামনে। মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে তাঁর বুক জুড়িয়ে গেল। একটিমাত্র শিশুপুত্র নিয়ে তিনি বিধবা হয়েছিলেনবহু দুঃখকষ্ট সহ্য করে তাকে বড়ো করেছেন। বিয়ে দিয়েছেন। একটি নাতি আর একটি নাতনি নিয়ে তাঁর ভরা সংসার হবার কথা ছিল। হল না, আঁটকুড়ির বেটি, ছেলের বউটার জন্যে। তাঁর শিবের তুল্য ছেলের কানে কুমন্ত্রণা দিয়ে, ফুসলে আলাদা হয়ে গেল। বেশ ক’বছর হল, মানদাসুন্দরী আবার অসহায় বেধবা।

স্তোত্র আওড়াতে আওড়াতে চোখ বন্ধ করে জোড়হাত করলেন মানদাসুন্দরী, মা দূর্গার কাছে আকুতি জানালেন, “ও মা, শেষ বয়সে একটু সুখ আর শান্তি দাও, মা। আমার ভোলাকে, আমার বুকে ফিরিয়ে দাও মা।” আবেগের বশে তাঁর দু চোখে জল চলে এল। চোখ মেলে, সকল প্রতিমার মুখের দিকে তাকাতে গিয়ে তাঁর চোখে পড়ল, সরস্বতী মায়ের হাঁটু ধরে, ওই ছুঁড়িটা কে? ঝাপসা চোখে ঠিক দেখছেন তো? নাঃ, ঠিকই তো দেখছেন, একটা হতভাগী মেয়ে। যেমন তার শাঁকচুন্নীর মতো চেহারা, তেমনি তার জামাকাপড়ের ছিরি। নিশ্চয়ই কোন ছোটনোকের মেয়েঝ্যাঁটা মার, ঝ্যাঁটা মার, আকাচা কাপড়ে ঠাকুরের গায়ে কেমন লেপটে ছুঁয়ে আছে দেখো।

তাঁর কর্কশ খনখন স্বরে নবমীর স্নিগ্ধ ভোর চমকে উঠল, “ওরে ও আবাগীর বেটি, তুই ওখানে কেন রে, হতচ্ছাড়ি? দেব্‌তার পিতিমে কী তোর খেলার পুতুল? নেমে আয় নেমে আয়, শিগ্‌গিরি। কী আস্পদ্দা রে, তোর? কার মেয়ে তুই, কোন পাড়ায় বাড়ি”। ছোট্ট দুগ্‌গা ভয়ে আতঙ্কে দৌড়ে নামতে গিয়ে মণ্ডপের সিঁড়ি থেকে গড়িয়ে পড়ল মাটিতে। কাঠের সিঁড়ির কোণায় লেগে তার হাঁটু ছড়ে গেল। মণ্ডপে তিন দেবী শিউরে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন, “ইস্‌, আহা রে”।

মানদাসুন্দরী দেবী ছুঁতে পারবেন না, তা নাহলে তিনি চুলের মুঠি ধরে মেয়ের ঝিঁকুটি নাড়িয়ে দিতেন। তিনি আগুন ঝরানো চোখে এগিয়ে চললেন, হাঁটু চেপে বসে থাকা দুগ্‌গার দিকে, দুগ্‌গার ক্ষতে রক্ত জমছে। মানদাসুন্দরীর চেঁচামেচিতে বলরাম দুলের ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। ঘুমভাঙা চোখে সমস্ত ব্যাপারটা বুঝতে পেরে সেও শিউরে উঠল আতঙ্কে।

সে দৌড়ে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসল, মানদাসুন্দরীর পায়ের কাছে, “মা ঠাকরেন, আমার মেয়েরে ছেড়ে দ্যান, মা ঠাকরেন, ছোট মেয়ে বুঝতে পারে নাই, করে ফ্যালেচে। আমি ওকে খুব পিটবো, খুব বকবো, পুজোর থানে আর কোনদিন আনবুনি”

আগুনে যেন ঘি পড়ল, মানদাসুন্দরী বিকৃত স্বরে চেঁচিয়ে উঠলেন, “তোর মেয়ে, হারামজাদা? দুলে, ছোটলোক? তোদের এতদূর আস্পদ্দা? ঠাকুরের গায়ে হাত দিস? ওরে অ সিধু, অ স্বপ্না, অ দেবু, কোতায় গেলি সব, এদিকে যে অনাছিস্টির কাণ্ড ঘটে যাচ্ছে... এখনো ঘুমিয়ে থাকবি? বলি দেশে কী জাতধর্ম, সৈরণ অসৈরণ কিছুই থাকবে নি কো? কিছু করবি? নাকি আমি অনত্থ বাধাবো?”

মানদাসুন্দরীর চেঁচামেচি শুনে দৌড়ে এল সবাই।

“কী হয়েছ, ঠাকুমা?”

“হবার আর বাকি কী রইল, বাছা? সারারাত ওই ছোটলোকের দল যে পিতিমে নিয়ে পুতুল খেলা করছে, বলি আর হবে কী?”

দেবাশীষ গেল মেয়েটির কাছে। সিদ্ধার্থ মাটিতে মাথানীচু করে বসে থাকা বলরামের দিকে এগিয়ে গেল।

“কী হয়েছে, বলরামদা? কী করেছ?”

“আমরা ঘুমোচ্ছিলাম, আমার ওই মেয়েটা কখন উঠে গিয়ে, মায়ের গায়ে হাত দিয়ে ফেলেছে। আর কোনদিন ওকে পুজোয় আনবুনি সিধুবাবু। ছোট মেয়ে জানেনা, এবারের মতো ক্ষ্যামাঘেন্না করে দাওআজই ওকে বাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছি। কোনদিন আর পুজোয় আনবুনি”হাঁটুর ব্যাথায়, ভয়ে বিবর্ণ মেয়েটিকে দেবাশিষ সামনে আনল।

সিদ্ধার্থ বলল, “আরে, এ তো রক্ত পড়ছে। দেবু তুই ওকে তোর বাড়ি নিয়ে যা, ব্যাণ্ডএড-টেড কিছু আছে? ফার্স্ট এড করে দে। কী নাম রে তোর?” মেয়েটি নাম বলতে আর ভরসা পেল না, চুপ করে মাথা নিচু করে রয়েছে, তার চোখ থেকে জল ঝরছে। বলরাম বলল, “আমার মেয়ে বাবু, নাম দুগ্‌গা”।

“সেকি? আজকের দিনে দুগ্‌গামায়ের চোখে জল? ছি ছি ছি”।

মানদাসুন্দরী অবাক হয়ে দেখছিলেন, ছোকরাদের কাণ্ড, দেখে আর থাকতে পারলেন না, তীব্রস্বরে চেঁচিয়ে উঠলেন, “তোরা কী পাগল হলি নাকি? একি অধম্মের কাণ্ড, ওই মেয়েকে ঝেঁটিয়ে বিদেয় কর বলছি, নাহলে ঘোর অমঙ্গল”।

সিদ্ধার্থ দুগ্‌গাকে কোলে তুলে নিল, বলল, “আর কাঁদিস না, চল, আমার সঙ্গেঊর্মি, আমার বোন, তোকে পেলে আর ছাড়বে না। কী রে যাবি না ঊর্মিদিদির কাছে?”

অশ্রুভেজা চোখেও দুগ্‌গা ফিক করে হাসল, সিদ্ধার্থদাদার কাঁধের ওপর দিয়ে তাকিয়ে রইল মণ্ডপের দিকে। সরুদিদি হাসছেন

* * *

 

গল্পটা শেষ করে, আলপনা মোবাইলে একটা নম্বর খুঁজে ডায়াল করল। আলপনা একটা বাংলা পত্রিকার সম্পাদক। রিং হচ্ছে, তিনবার রিং হবার পর উত্তর এল, “হ্যালো।”

“হ্যালো, বিষ্ণুদা। আলপনা বলছি। আপনার পাঠানো গল্পটা, পড়লাম। থ্যাংকুউ, দারুণ মিষ্টি একটা গল্প। খুব সুন্দর মেসেজও রয়েছে একটা”

“ওয়েলকাম, ভাই। কিন্তু কোন গল্পটার কথা বলছো বলো তো?”

“বা রে, যেটা আমাদের পত্রিকার জন্যে পাঠালেন। “দুগ্‌গা”। ভুলে গেলেন?”

“ওঃ দুগ্‌গা? ভালো লেগেছে তোমার? অনেক ধন্যবাদ ভাই”।

“ওটা আমরা পরের সংখ্যায় ছাপছি। ভুলে অন্য কোথাও আবার দিয়ে দেবেন না যেন। আপনার যা ভুলো মন”।

“হা হা হা হা। যা বলেছো। তবে গল্পটা সাজানো, মিথ্যে - তাই ভুলে গেছিলাম। সত্যিটা ভুলতে পারি না যে!”

“তার মানে? গল্পের আবার সত্যি মিথ্যে কী? কী যে বলেন, দাদা?”

“জীবনের সত্যি নিয়ে গল্প - কটা হয় বলো তো? অধিকাংশই তো সাজানো গল্প”।

“হুঁ, তাই? এই গল্পের সত্যি কিছু আছে নাকি, দাদা। বলুন না শুনি”। আলপনা হালকা গলায় বলল।

“সিরিয়াসলি শুনবে? মিষ্টি নয় কিন্তু”।

“আচ্ছা, সে আমি বুঝবো। আমি একজন সম্পাদক, ভুলে যাবেন না। হা হা হা হা”।

“তা ঠিক। সম্পাদককে অনেক যন্ত্রণাই পুষে রাখতে হয়। শুনবে, তাহলে?”

“শিয়োর, বলুন”।

“বলছি। গল্প প্রায় সবটাই থাকবে, ওই শেষের দিকে কিছুটা...

“মানদাসুন্দরীর চেঁচামেচি শুনে দৌড়ে এল সবাই। তাদের নিঃশ্বাসে তীব্র মদের গন্ধ। গতকাল রাত থেকে শুরু হয়েছে নেশার আয়োজন, এখনো চলছে।

“কী হয়েচে অ্যাই বুড়ি? ভোর রাতে পাড়া মাতায় তুলেচিস কেন?”

“হবার আর বাকি কী রইল, বাছা? সারারাত ওই ছোটলোকের দল যে পিতিমে নিয়ে পুতুল খেলা করছে, বলি আর হবেটা কী?”

দেবু গেল মেয়েটির কাছে। সিধু মাটিতে মাথানীচু করে বসে থাকা বলরামের দিকে এগিয়ে গেল। তারা দুজনেই টলছে।   

“কী হয়েছে বে, অ্যাই বলরাম? কী করেছিস?”

“আমরা ঘুমোচ্ছিলাম, আমার ওই মেয়েটা কখন উঠে গিয়ে, মায়ের গায়ে হাত দিয়ে ফেলেছে। আর কোনদিন ওকে পুজোয় আনবুনি সিধুবাবু। ছোট মেয়ে জানেনা, এবারের মতো ক্ষ্যামাঘেন্না করে দাও। আজই ওকে বাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছি। কোনদিন আর পুজোয় আনবুনি”। হাঁটুর ব্যাথায়, ভয়ে বিবর্ণ মেয়েটিকে দেবু সামনে আনল। ঘোলাটে চোখে সিধু তাকিয়ে দেখল মেয়েটাকে। তার মুখে চিকচিকে হাসি, বলল।

“আবে, এর তো রক্ত পড়ছে। কী নাম রে তোর?” মেয়েটি নাম বলতে আর ভরসা পেল না, চুপ করে মাথা নিচু করে রইল, তার দু চোখ ভরা জল

বলরাম বলল, “আমার মেয়ে বাবু, নাম দুগ্‌গা”।

“দুগ্‌গা? দুগ্‌গা দুগ্‌গা” সিধু মেয়েটিকে কোলে তুলে নিল, বলল, “আজকের দিনে দুগ্‌গার চোখে জল কেন বাওয়া?”মানদাসুন্দরী অবাক হয়ে দেখছিলেন, ছোকরাদের কাণ্ড, দেখে আর থাকতে পারলেন না, তীব্রস্বরে চেঁচিয়ে উঠলেন, “তোরা কী পাগল হলি নাকি? এ কী অধম্মের কাণ্ড, ওই মেয়েকে ঝেঁটিয়ে বিদেয় কর বলছি, নাহলে ঘোর অমঙ্গল”

সিধুর ডান হাতটা ঢাকা পড়ে গেল দুগ্‌গার পুজোর আগেই সদ্য কেনা সুন্দর ফুলফুল ছাপ ফ্রকের তলায়।

ধমকে উঠল জোর গলায়, “অ্যাই বুড়ি, চোপ।  আর একটা কথা বললে, গলা টিপে খালে ভাসিয়ে দেবো” তারপর অদ্ভূত একটা বিকৃত হাসি মুখে নিয়ে, দুগ্‌গাকে বলল, “আর কাঁদিস নি, চল আমার সঙ্গে” দুগ্‌গার চোখের জল শুকিয়ে এসেছে, অদ্ভূত আতঙ্কে সে তাকিয়ে আছে সিধুর দিকে। তার ছোট্ট জীবনে এমন ভয় সে কোনদিন পায়নি। সে ছোট্ট ছোট্ট হাতে সিধুর ফ্রকের আড়ালে থাকা হাতটা টেনে সরিয়ে দিতে চেষ্টা করতে লাগল। পারল না। তাকে কোলে নিয়ে সিধু হাঁটতে লাগল ভোরের মাঠের দিকে। আকাশে এখনো আলো ফোটেনি। পাখিদের ঘুম ভাঙতে শুরু করেছে। দুগ্‌গা ছোট্ট পাখির মতো ছটফট করে ছাড়া পেতে চাইছিল, পারছিল না। ভয়ে চিৎকার করে উঠল। অন্যহাতে সিধু তার মুখটা চেপে ধরল।

হতভম্ব বলরাম চিৎকার করে উঠল, “ও বাবু, দুগ্‌গাকে কোথায় নে যাচ্ছেন, বাবু?  দুগ্‌গা, ও দুগ্‌গা”। দেবু সিধুর একটু পিছনে ছিল। ফিরে দাঁড়িয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “আর একটা কথা বললে না, তুইও যাবি। মেয়েটাও মায়ের ভোগে যাবে...”।

 

“বিষ্ণুদা, প্লিজ এ গল্পটা মোটেই সত্যি নয়। আপনি মিথ্যে বলছেন। প্লিজ চুপ করুন”।

“তাই? তোমার মিথ্যে মনে হচ্ছে? থাক তাহলে আর বলব না। তবে শেষটা শুনবে না? সেদিন দুপুরের দিকে দুগ্‌গাকে পাওয়া গিয়েছিল, কিছুটা দূরে খালের ধারে। মৃতা এবং উলঙ্গ, সে কথা বলাই বাহুল্য। তোমার যখন ভালো লাগছে না, আর কিছু বলবো নানা বললেও বুঝতে পারছো নিশ্চয়ই!”

আলপনা অস্ফুট গলায় বলল, “রাখছি, বিষ্ণুদা”।

“এক মিনিট, গল্পটা ছাপছো কী? ছাপলে কোনটা? আগেরটা? তাহলে কোন সমস্যা নেই - খুব নিরাপদ। সন্ধেবেলার চায়ের আসরে নিশ্চিন্তে আলোচনা করতে পারবে - সত্যি বিষ্ণুদার কলমে জাদু আছে। আর যদি পরেরটা ছাপতে চাও, গল্পের নাম দিও “বিসর্জন”। দশমীর দিন ওই খালেই মা দূর্গারও বিসর্জন হয়েছিল। বিসর্জনের পর জলে ভেজা, রঙ ওঠা, খড় বেরিয়ে আসা, সে কী বীভৎস কদর্য সব প্রতিমা। রাখি? ভালো থেকো”।

 

..০০..


এর পরের গল্প " মৃত্যুর মিছিল "

সোমবার, ৭ জুলাই, ২০২৫

বাংলার কিছু স্টেশন – কিছু অনুভব

 এর আগের প্রবন্ধ - " বাংলার রেল




আমার সুদীর্ঘ জীবনের প্রত্যেকটি রেলযাত্রায় প্রতিবারই নির্দিষ্ট গন্তব্যে যেমন পৌঁছেছি তেমনই সে পথে কখনো পেয়েছি ইতিহাসের স্পর্শ, কখনো জাগিয়েছে কৌতূহল, কখনো পেয়েছি নির্মল আনন্দ। কিছু স্টেশন নিয়ে আমার সেই নানান অনুভবের কথাই এখন বলব।  

১) আদিসপ্তগ্রামঃ - হাওড়া-বর্ধমান মেন লাইনে ব্যাণ্ডেল জংশন থেকে ৪ কিমি দূরত্বে আদি সপ্তগ্রাম স্টেশন বাংলার মধ্যযুগে অত্যন্ত সম্পন্ন বন্দর নগর ছিল, যদিও সে সময় তার নাম ছিল সপ্তগ্রাম। সরস্বতী নদীর তীরে অবস্থিত এই বন্দরনগরীর গৌরবকথার বারবার উল্লেখ পাওয়া যায় বাংলার মঙ্গল কাব্যগুলিতে। হিন্দু রাজত্বের পর মুসলিম রাজত্বেও এই বন্দর-নগরের গুরুত্ব এতটুকু কমেনি। শোনা যায় মরক্কো নিবাসী ভূপর্যটক ইবন বতুতা (১৩০৪-১৩৬৮), ১৩৫০ সালে কিছু দিন এই নগরে বাস করেছিলেন। তাঁর লেখা ভ্রমণ বৃত্তান্ত থেকে এই নগরের এবং দক্ষিণ বাংলার সমসাময়িক বহু মূল্যবান তথ্য পাওয়া যায়। ১৫৩৫ থেকে বহু বাধা, বিঘ্ন এবং বারবার যুদ্ধের পর ১৫৫০ সালে বাংলার তৎকালীন আফগান শাসকের থেকে পর্তুগীজরা এই বন্দর থেকে বাণিজ্য করার অনুমতি পায়। যদিও পরবর্তী কালে সরস্বতী নদী নাব্যতা হারায় এবং তার প্রবাহ একসময় ক্ষীণ হতে হতে অবলুপ্ত হয়ে যায়। সেই সঙ্গে সপ্তগ্রামও অতীতের সমস্ত গৌরব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ে।

  

২) আমবাড়ি – ফালাকাটাঃ - নিউজলপাইগুড়ি থেকে আসামগামী রেলপথে, জলপাইগুড়ি জেলার একটি রেল স্টেশন। দ্রুতগামী রেলগাড়ি এই স্টেশনকে না ধরলেও, নিউজলপাইগুড়ি এবং হলদিবাড়ি থেকে প্যাসেঞ্জার ট্রেনের রেলপথে এই স্টেশনটি বেশ বিখ্যাত। এই স্টেশনের নামটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ – কারণ নামের প্রথম অংশটি গ্রামের নাম – আমবাড়ি এবং দ্বিতীয় নামটি ওই গ্রামের আরাধ্য দেবমূর্তি রাজা ফালাকাটার নামে।



চিত্রের জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা - জিও বাংলা ডট কম।

শোনা যায় প্রায় ৩০০ বছর আগে যে ফালাকাটা দেবতার পুজো শুরু হয় – সেটি প্রকৃতপক্ষে শিবঠাকুর। যে মন্দিরে এখন ফালাকাটা দেবের পুজো হয় সেটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন দেবী চৌধুরানি, যাঁর কথা চিরন্তন করে গিয়েছেন সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিম। কথিত আছে দেবী চৌধুরানির সঙ্গে ভবানী পাঠকও এই মন্দিরে নিয়মিত পুজো দিতে আসতেন। প্রাচীন পরম্পরা অনুযায়ী আষাঢ় মাসের প্রতি শনি ও মঙ্গলবারে, মন্দিরে স্থাপিত তিনটি বিগ্রহের পুজা হয় – রাজা ফালাকাটা, তুলাকাটা এবং ধনাকাটা। এই পুজোর পরেই জমিতে আমন ধান রোপনের কাজ শুরু হয়। এই পুজো উপলক্ষে যেহেতু দূরদূরান্ত থেকে ভক্ত সমাবেশ হয়, সেই কারণে অন্য সময় স্টেশনটি নির্জন থাকলেও, আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে খুবই ব্যস্ত হয়ে ওঠে।  

     

২) কর্ণ সুবর্ণঃ - কাটোয়া – আজিমগঞ্জ রেলপথে একটি ছোট স্টেশন কর্ণসুবর্ণ, বাংলার প্রথম স্বাধীন রাজা শশাঙ্কর (রাজত্বকাল ৬০৬-৬৩৭ খ্রীষ্টাব্দ) রাজধানীর স্মৃতি বহন করে চলেছে আজও। যদিও এই শহরের গৌরব অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী মাত্র ৩১ বছর, রাজা শশাঙ্কর মৃত্যুর পরেই এই শহর ধীরে ধীরে পরিত্যক্ত হয় এবং কালের নিয়মে ধ্বংস হয়ে যায়। এই রাজধানী শহরের অদূরেই ছিল বৌদ্ধদের রক্তমৃত্তিকা মহাবিহার স্থানীয় মানুষের মুখে সে নাম ছিল রাঙামাটি বিহার। এই বিহার ঠিক কবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সে নিয়ে যদিও বিতর্ক আছে, তবে অনেক বিশেষজ্ঞের মতে এটির প্রতিষ্ঠাতা মৌর্য সম্রাট ধর্মাশোক। কর্ণসুবর্ণ এবং রাঙামাটি বিহার সম্পর্কে অনেক তথ্য পাওয়া যায় হিউ-য়েন-সাং-য়ের ভ্রমণ বৃত্তান্ত থেকে। ভারতের ইতিহাসে শশাঙ্ক বিখ্যাত কারণ সম্রাট হর্ষবর্ধন অন্ততঃ বার দুয়েক চেষ্টা করেও তাঁকে যুদ্ধে পরাস্ত করতে পারেননি। বরং হর্ষবর্ধন সিংহাসনে বসার আগে, তাঁর দাদা রাজ্যবর্ধনকে (৬০৬ সালে) শশাঙ্ক যুদ্ধে পরাস্ত করে হত্যা করেছিলেন। সিংহাসনে বসার কিছুদিন পর হর্ষবর্ধন বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেন, এবং বৌদ্ধ ধর্মের পৃষ্ঠপোষক হয়ে চিরশত্রু হিন্দু রাজা শশাঙ্ককে বৌদ্ধ বিদ্বেষী মনে করতেন। কিন্তু হিউ-য়েন-সাং-য়ের ভ্রমণ বৃত্তান্তে রাঙামাটি বিহারের বৌদ্ধ ভিক্ষু এবং কর্ণসুবর্ণ (যার চলিত নাম ছিল কানসোনা) নগরের হিন্দুদের মধ্যে কোন বৈরীতার উল্লেখ নেই – বরং দুই ধর্মের মধ্যে তিনি সম্প্রীতিই লক্ষ্য করেছিলেন।          

 

৩) কৃষ্ণনগরঃ বাংলার ইতিহাসে নদীয়ার রাজা এবং রাজধানী শহর কৃষ্ণনগরের প্রতিষ্ঠাতা মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় (১৭১০-৮৩) এক স্মরণীয় নাম। তিনি সংস্কৃত ও ফার্সী দুটি ভাষাতেই যেমন বিদ্বান ছিলেন, তেমনি তিনি সঙ্গীত ও অস্ত্রবিদ্যাতেও পারদর্শী ছিলেন। বিদ্যাচর্চার জন্যে মধ্যযুগে বাংলার নদীয়া জেলার যে সর্বভারতীয় খ্যাতি ছিল, তার অনেকটাই তিনি ফিরিয়ে আনতে পেরেছিলেন। তাঁর সভায় নবরত্ন সভার মতোই জ্ঞানী-গুণীজনের সমাবেশ ছিল। তাঁর সভাকবি ছিলেন সাধক রামপ্রসাদ ও ভারতচন্দ্র রায় গুণাকর। রামপ্রসাদের শ্যামাসঙ্গীত আজও বাংলার ঘরে ঘরে অত্যন্ত জনপ্রিয়। ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল কাব্য, শত খানেক বছর আগেও অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। তাঁর সভায় আরও ছিলেন, পুরাণ বিশারদ পণ্ডিত গদাধর তর্কালঙ্কার, পণ্ডিত কালিদাস সিদ্ধান্ত ও কন্দর্প সিদ্ধান্ত, রাজজ্যোতিষী অনুকূল বাচস্পতি, রাজবৈদ্য ও আয়ুর্বেদাচার্য গোবিন্দরাম, বাণেশ্বর বিদ্যালঙ্কার,  হরিরাম তর্কসিদ্ধান্ত প্রমুখ। এছাড়াও ছিলেন গোপালচন্দ্র বিদূষক – যিনি গোপাল ভাঁড় নামে আজও বঙ্গ সমাজে তাঁর তাৎক্ষণিক বুদ্ধি এবং তীক্ষ্ণ রসবোধের জন্য সুপরিচিত। শোনা যায়, মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র বাংলায় জগদ্ধাত্রী পূজারও প্রচলন করেছিলেন।         

 

৪) খাগড়াঘাট রোডঃ - কাটোয়া – মালদহ রুটে এই স্টেশনের অতীত ঐতিহ্য আধুনিক যুগে কেউই মনে রাখেনি। খাগড়াঘাট ভাগিরথীর পশ্চিম তীরে হলেও – নদীর পূর্ব পাড়ের খাগড়া গ্রাম বিগত হাজার খানেক বছর আগে থেকে বিখ্যাত ছিল কাঁসা এবং পিতলের বাসনপত্রের জন্য। শুধু মাত্র বাসনপত্র নয়, কাঁসা, পিতল এবং অষ্টধাতুর  মূর্তিশিল্পেও এই গ্রামটির সুনাম ছিল দেশেবিদেশে। আমাদের ছোটবেলাতেও দেখেছি, কন্যার বিবাহে বরকে “খাগড়াই কাঁসার” দানসামগ্রী দিতে পেরে কন্যার পিতারা বড়ো তৃপ্তি পেতেন। স্টেনলেস স্টিল এবং অন্যান্য আধুনিক উপকরণ আমাদের এই প্রাচীন শিল্পটিকে মোটামুটি শেষ করে ছেড়েছে। গুরুত্ব হারিয়েছে খাগড়া।

 

৫) গুঞ্জরিয়াঃ - ছাত্রাবস্থায় জলপাইগুড়িতে থাকার সময় শেয়ালদা থেকে নিউজলপাইগুড়িগামী দার্জিলিং মেল ছিল আমাদের নিত্যসাথী। সেরকমই কোন এক যাত্রার সময়, সিগন্যাল না পেয়ে দার্জিলিং মেল দাঁড়িয়ে গেল “গুঞ্জরিয়া” স্টেশনে। জায়গাটি উত্তর দিনাজপুর জেলায়তখন সবে ভোরের আলো ফুটেছে, নির্জন-নিরিবিলি, গাছপালা ঘেরা ফাঁকামাঠের মধ্যে স্টেশন। আমাদের এক বন্ধু বলেছিল, এই স্টেশনের নাম নিশ্চয়ই রবিঠাকুর রেখেছিলেন। মংপু, দার্জিলিং, কালিম্পং যাওয়ার পথে তিনি নিশ্চয়ই কোনদিন এইখানে নেমেছিলেনগাছগাছালি ঘেরা নিরিবিলি এই জায়গাটি ঋষিপ্রতিম কবির মনে হয়তো কোন অনুভূতির গুঞ্জরন তুলেছিল। বন্ধুর গল্পটি সত্যি কিনা জানি না, অন্য কোন সূত্রে এই তথ্যটি আজ পর্যন্ত পাইনি। কিন্তু আজও ওই লাইনে যাওয়ার সময় মনে মনে আশা করি, ট্রেনটি যেন সিগন্যাল না পায়, ওই স্টেশনে যেন একবারটি দাঁড়ায়, মনে পড়ে যায় কবিগুরুর গানের দুটি পংক্তি -

“ফিরে ফিরে চিত্তবীণায় দাও যে নাড়া,

গুঞ্জরিয়া গুঞ্জরিয়া দেয় সে সাড়া”।

 

৬) জয়নগর-মজিলপুরঃ শেয়ালদা-লক্ষ্মীকান্তপুর রেলপথে জয়নগর-মজিলপুর বেশ ব্যস্ত একটি স্টেশন। শেয়ালদা থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৪৯ কিমি। জয়নগরের নাম শুনলেই আমাদের প্রথমেই মনে আসে এই অঞ্চলের বিখ্যাত মোয়ার কথা। নলেনগুড় এবং ক্ষীর দিয়ে মাখা সুগন্ধী খইয়ের মোয়াগুলি শীতের দিনের অত্যন্ত লোভনীয় একটি খাবার সন্দেহ নেই। মোয়া ছাড়াও এই অঞ্চলটি মনে রাখার মতো – এর প্রাচীন ঐতিহ্যের জন্য, কিন্তু সে সব কথা আমরা এখন প্রায় ভুলতে বসেছি। নিমতা গ্রামের বাসিন্দা কবি কৃষ্ণরাম দাসের রায়মঙ্গল কাব্যে এই অঞ্চলের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় ১৬৫৮ সালে। সে সময় এই সম্পন্ন গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যেত হুগলি নদীর প্রধান শাখানদী আদি গঙ্গা। এই নদী পথে বাণিজ্যের কারণেই এই অঞ্চল সে সময় অত্যন্ত বর্ধিষ্ণু গ্রাম হয়ে উঠেছিল। পরবর্তী কালে আদিগঙ্গার প্রবাহ ক্ষীণ হয়ে যাওয়ার কারণে এই অঞ্চলটির গৌরব অনেকটাই ম্লান হয়ে আসে। শোনা যায় সপ্তদশ শতাব্দীর শুরুতে, বাংলার সুবাদার ইসলাম খানের কাছে যশোরের (আধুনিক বাংলাদশে)  রাজা প্রতাপাদিত্য পরাজিত হওয়ায়, চন্দ্রকেতু দত্ত নামক জনৈক ভাগ্যান্বেষী সম্পন্ন ব্যক্তি যশোর ছেড়ে মজিলপুরে চলে আসেন। তাঁর সঙ্গে আসেন তাঁদের পারিবারিক পুরোহিত শ্রীকৃষ্ণ উদ্গাতা এবং রঘুনন্দন পোতা। পরবর্তী সময়ে দত্ত পরিবার বাণিজ্য করে প্রভূত সম্পদের অধিকারী হয়ে ওঠেন। অন্যদিকে শ্রীকৃষ্ণ উদ্গাতার বংশধরেরা ভট্টাচার্য উপাধি গ্রহণ করেন, এবং শিক্ষা-দীক্ষায় এই বংশ অত্যন্ত সুনাম অর্জন করেন। বিখ্যাত সমাজ সংস্কারক ও অসামান্য পণ্ডিত শিবনাথ শাস্ত্রী এই বংশেরই সন্তান। এই বংশের আরেক কৃতী সন্তান হলেন বিখ্যাত স্বাধীনতা সংগ্রামী কানাইলাল ভট্টাচার্য।

সেই প্রাচীন ঐতিহ্যের নিদর্শন কালের গ্রাসে অনেকটাই নষ্ট হয়ে গেলেও, বেশ কিছু নিদর্শন আজও জয়নগরের তৎকালীন গৌরব ও সমৃদ্ধির সাক্ষ্য দেয়। যেমন, জয়চণ্ডী মন্দির, নাটমন্দির সহ রাধাবল্লভ মন্দির ও তার সংলগ্ন চারচালা দোলমঞ্চ, দ্বাদশ শিবমন্দির ইত্যাদি।     

    

) ঝাপটের ঢাল, পিচকুরির ঢাল এবং নোয়াদার ঢালঃ পূর্ব বর্ধমানে সাহেবগঞ্জ লুপে এই তিনটি স্টেশনের অবস্থান। প্রায় পাশাপাশি এই তিনটি স্টেশনের নামে ঢাল শব্দটিতেই আমার কৌতূহলএই অঞ্চলের পশ্চাৎভূমি কি অনেকটাই উঁচু, এই তিনটি এলাকা কি নিম্নগামী, ঢালু? সেই কারণেই কি তিনটি গ্রামের নামে ঢাল যুক্ত হয়েছে? ওইদিকের কিছু অধিবাসীদের কাছে জিজ্ঞাসা করে কোন উত্তর পাইনি – বলেছিলেন - নাম-নামই তার আবার কারণ কি? তবে নোয়াদার ঢাল সম্বন্ধে একটি জনশ্রুতি শোনা যায় – পরপর দুটি স্টেশনের নামে ঢাল শব্দটি শুনে ইংরেজ ইঞ্জিনিয়ার নাকি বিরক্ত হয়ে বলেছিল, “নো আদার ঢাল”। কিন্তু ভালো ইংরিজি না জানা বাঙালী ওভারসিয়ার ভেবেছিল সায়েব স্টেশনটির নাম রাখল- “নোয়াদার ঢাল”।

 

) পলাশীঃ শেয়ালদা-বহরমপুর শাখায় পলাশী স্টেশনের অদূরের আমবাগানে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজদ্দৌলার সঙ্গে যুদ্ধ হয়েছিল ব্রিটিশ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির কর্নেল রবার্ট ক্লাইভের। নবাবের সৈন্য বাহিনীর তুলনায় যদিও কোম্পানির সৈন্য সংখ্যা ছিল তুচ্ছ। কিন্তু সিরাজের প্রধান সেনাপতি ও অন্যান্য আমলাদের ষড়যন্ত্রে নবাব সেই যুদ্ধে শুধু পরাজিত হননি, নিহতও হয়েছিলেন তাঁর নিজেরই বিশ্বাসঘাতক এক কর্মচারীর হাতে। দিনটা ছিল ১৭৫৭ সালের ২৩শে জুন। এই সাফল্য লোভী ও হিংস্র স্বার্থপর ব্রিটিশজাতিকে পথ দেখিয়েছিল কীভাবে ধীরে ধীরে সমগ্র ভারতকে গ্রাস করে চরম শোষণ করা সম্ভব। অর্থাৎ প্রভাবশালী সামান্য কিছু মুসলিম ও হিন্দুর ব্যক্তিগত স্বার্থজনিত চক্রান্তের কারণে, ভারতের আপামর জনসাধারণকে চরম দুর্ভোগে প্রায় ১৯০ বছর ব্রিটিশের পদানত থাকতে হয়েছিল। ভারতের যাবতীয় সম্পদ প্রায় নিঃশেষে লুঠ করে, সে সময় ব্রিটেন হয়ে উঠেছিল বিশ্বের এক নম্বর বৈভবশালী, সভ্য, শিক্ষিত ও রুচিশীল দেশ! তার সূত্রপাত হয়েছিল এই পলাশীতেই।           

       

) বর্ধমানঃ - হাওড়া-দিল্লি রেলপথে বর্ধমান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ব্যস্ত জংশন স্টেশন। মিহিদানা-সীতাভোগের জন্য বিখ্যাত এই শহরটির ঐতিহাসিক গুরুত্বও কিন্তু অপরিসীম, যদিচ আমরা অনেকেই সেকথা মনে রাখি না। বর্ধমান পূর্ব ভারতের প্রাচীনতম জনপদের একটি। এই জনপদের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় জৈন কল্পসূত্রে। বলা হয় ২৪তম তীর্থঙ্কর মহাবীর যাঁর পিতৃদত্ত নাম ছিল বর্ধমান – ধর্মপ্রচারের জন্য কিছুদিন আস্তিকগ্রামে ছিলেন। তাঁর পুণ্য স্মৃতিতে এই জনপদের নাম হয় বর্ধমান। হিন্দু, বৌদ্ধ এবং মুসলিম শাসনকালেও এই শহর এবং জনপদের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। যার ফলে এই শহরটিকেই বাংলার প্রাচীনতম শহর বলা যায় – যা আজও সগৌরবে বিদ্যমান।   

       

১০) বোলপুর-শান্তিনিকেতনঃ - বর্ধমান–রামপুরহাট রেলপথে বোলপুর স্টেশন। প্রথমেই এই বোলপুর নামের ইতিহাসটা জেনে নেওয়া যাক। মার্কণ্ডেয়পুরাণ অনুযায়ী রাজা সুরথ ছিলেন এই অঞ্চলের রাজা, এবং তাঁর রাজধানী ছিল বোলপুর সংলগ্ন সুপুর এলাকা। এই রাজা সুরথের নাম মহালয়ার ভোরে শ্রীশ্রীচণ্ডীপাঠের সময় আমরা শুনেছি এবং তিনিই মর্তে মহিষাসুরমর্দিনী দূর্গাপূজার প্রচলন করেন। সন্ধিপূজার সময় তিনি নাকি লক্ষাধিক ছাগবলি দিতেন এবং সেই রক্ত প্রবাহ আটকাতে বাঁধ দেওয়া হত প্রতিবছর। এই বলি থেকেই ওই অঞ্চলের নাম হয়েছিল বলিপুর, যা লোকমুখে হয়ে ওঠে বোলপুর এবং সেই বাঁধের নামেই আজকের বাঁধগোড়া এলাকা।

প্রাচীন কাহিনী যাই হোক, আধুনিক বোলপুরের সঙ্গে সর্বতোভাবে জড়িয়ে রয়েছে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ এবং কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গভীর স্বপ্ন ও অজস্র স্মৃতি।

মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ একবার পশ্চিম-ভ্রমণ থেকে ফেরার পথে আমদপুর স্টেশনে নেমে পাল্কি চড়ে বোলপুর হয়ে রায়পুর যাচ্ছিলেন। তাঁর ভক্ত-শিষ্য শ্রীকণ্ঠ সিংহরায় ছিলেন রায়পুরের জমিদার। যাওয়ার পথে তাঁর চোখে পড়ে প্রায় জনবিরল অনন্ত-বিস্তৃত এই নিঃস্ব প্রান্তরটি – যার এক প্রান্তে সম্বল ছিল দুটি মাত্র ছাতিমগাছ। জায়গাটি তাঁর ভালো লেগে যায় এবং ধ্যানী ও প্রকৃতিরসিক মহর্ষি স্থির করেন – এইখানেই আসন পেতে তিনি মগ্ন থাকবেন তাঁর পরমপিতার ধ্যানে – এই বিবাগী প্রান্তরই হবে তাঁর শান্তিনিকেতন। রায়পুরের জমিদারের থেকে প্রায় ২০ একর জমি লিজ নিয়ে তিনি ১৮৬৩ সালে প্রতিষ্ঠা করেন শান্তিনিকেতন আশ্রম।

সেই আশ্রমটিই তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের হাতে পড়ে হয়ে উঠল বিশ্ব-মনীষার মিলনক্ষেত্র। আশ্রম ভিত্তিক বিদ্যালয় দিয়ে শুরু করে, আমৃত্যু কঠোর পরিশ্রমে গড়ে তুললেন বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়। তাঁর আমন্ত্রণে বিশ্বের কত দেশ থেকে সম্মিলিত হয়েছিলেন কত যে মনীষী। শুধু বিদ্যাচর্চাই নয় – ছবি আঁকা, ভাস্কর্য, নৃত্য, গীত, অভিনয় – এককথায় ললিতকলার সর্ববিষয়েই সে সময় ভারতবর্ষে শান্তিনিকেতনই ছিল পথিকৃৎ।    

সেই স্মৃতি বাঙালী হিসেবে আমাদের যেমন গর্বিত করে, তেমনই তাকে ঘিরে আধুনিক বিদ্বজ্জনদের নানান কলহ চরম লজ্জা দেয়।

 

) মুর্শিদাবাদঃ শেয়ালদা-লালগোলা রেলপথে এ স্টেশনের অবস্থান। ১৭০৩ থেকে ১৭৭১ পর্যন্ত মুর্শিদাবাদ ছিল সুবে বংলার রাজধানী। মুঘল আমলে সুবে বাংলা বলতে আধুনিক পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ, বিহার ও ঊড়িষ্যা অঞ্চল বোঝাতো। শোনা যায় মুঘল সাম্রাজ্যের অন্যান্য যে কোন অঞ্চলের তুলনায় এই সুবে বাংলা থেকেই নাকি সর্বাধিক রাজস্ব আদায় হত। সেই কারণেই, মুঘল বাদশা আওরঙ্গজেব, ১৭০৩ সালে ঢাকার দেওয়ান মুর্শিদকুলি খাঁদক্ষতায় আস্থা রেখে, তাঁকে বাংলার দেওয়ান হিসাবে নিযুক্ত করেন। বাংলার দেওয়ান হয়ে মুর্শিদকুলি খাঁ ঢাকা থেকে ভাগীরথীর তীরের ছোট শহর মকসুদাবাদে তাঁর দপ্তর সরিয়ে আনেন এবং ১৭০৪ সালে বাদশা আওরঙ্গজেবের অনুমতি নিয়ে নিজের নামে এই শহরের নাম রাখেন মুর্শিদাবাদ। মুঘল বাদশাদের দেওয়ান হলেও প্রকৃতপক্ষে মুর্শিদাকুলি খাঁ হয়ে উঠলেন বাংলার নবাব – কারণ বাংলার শাসন ব্যবস্থায় দিল্লি তেমন নাক গলাত না, সময় মতো নির্দিষ্ট রাজস্ব পেয়ে গেলেই দিল্লি খুশি থাকত।

১৭০৭ সালে ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর দিল্লির মসনদ ঘিরে মুঘল পরিবারে যখন গৃহযুদ্ধ শুরু হল, স্বাধীন নবাব হয়ে উঠতে মুর্শিদকুলির কোন বাধাই রইল না। প্রশাসক হিসাবে অত্যন্ত দক্ষ মুর্শিদকুলি, এবার নিজের মনের মতো করে সাজিয়ে তুললেন মুর্শিদাবাদ শহর এবং রাজ্য প্রশাসন। তখনকার ঐতিহাসিকদের বর্ণনা থেকে জানা যায় – ভাগীরথীর তীরে রম্য প্রাসাদ ও বাগিচা ঘেরা মুর্শিদাবাদ ছিল উজ্জ্বল এক শহর – যেখানে সব সম্প্রদায়ের মানুষই আনন্দে, সুখে, শান্তিতে বাস করত।

১৭২৭ সালে মুর্শিদকুলির মৃত্যুর পর মুর্শিদাবাদের মসনদে বসলেন, তাঁর জামাই সুজাউদ্দিন। তাঁর আমলে শহরে আরও অনেক প্রাসাদ নির্মিত হয় এবং বেড়ে ওঠে শহরের জাঁকজমক। এরপর ১৭৩৯ সালে সুজাউদ্দিনের মৃত্যুর পর মসনদে বসলেন তাঁর পুত্র সরফরাজ। কিন্তু মাত্র একবছরের মধ্যে তাঁর পিতার অমাত্য ও পারিষদদের ষড়যন্ত্রে, তাঁর পিতার অধীনস্থ বিহারের দিওয়ান আলিবর্দী মুর্শিদাবাদ দখল করতে এলে, ১৭৪০ সালে গিরিয়ার যুদ্ধে সরফরাজ পরাজিত এবং নিহত হলেন। আলিবর্দী হলেন মুর্শিদাবাদের নতুন নবাব।

আলিবর্দী খাঁ অত্যন্ত দক্ষ প্রশাসক ছিলেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর আমলেই - ১৭৪২ থেকে ১৭৫১ - মারাঠা বর্গীদের আক্রমণে দক্ষিণবঙ্গ প্রত্যেকবছর বিধ্বস্ত হতে থাকে এবং তাঁকেও ব্যতিবস্ত থাকতে হত। অবশেষে আলিবর্দির সঙ্গে মারাঠাদের বার্ষিক ১২ লক্ষ টাকা দেওয়ার এক চুক্তির ভিত্তিতে ১৭৫১ সালের পর বর্গী আক্রমণ থেকে বাংলা পরিত্রাণ পায়।

১৭৫৬ সালে আলিবর্দীর মৃত্যুর পর, তাঁর মসনদে বসলেন তাঁর দৌহিত্র, মাত্র ২৩ বছর বয়সী সিরাজদ্দৌলা। প্রথম থেকেই তাঁকে ঘিরে প্রাসাদের ভিতরে এবং প্রশাসনিক মহলে ঘোরতর ষড়যন্ত্র দানা বাঁধতে থাকে। সেই ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েই ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে তিনি ব্রিটিশ সৈন্যদের হাতে চূড়ান্তভাবে পরাস্ত হন এবং পরে নিহত হন।

সিরাজের পতনের পর ব্রিটিশ গভর্নর ক্লাইভ মুর্শিদাবাদ শহর এবং তার ঐশ্বর্য দেখে বিস্মিত হয়ে লিখেছিলেন,মুর্শিদাবাদ লণ্ডন শহরের মতোই বিশাল, জনবহুল এবং ধনী শহর, কিন্তু দুটোর মধ্যে তফাত একটাই, এই শহরের অভিজাত সম্প্রদায়ের প্রত্যেক ব্যক্তি, যে বিপুল পরিমাণ সম্পদের অধিকারী, কোন লণ্ডনবাসীর পক্ষেই তা কল্পনা করা সম্ভব হবে না”।

খুব স্বাভাবিক ভাবেই ভারতের ছোট্ট অংশ বাংলার এই ঐশ্বর্য ভাণ্ডার লুঠ করে ব্রিটিশদের অর্থলিপ্সা বেড়ে গেল বহুগুণ। সম্পূর্ণ ভারত লুঠের জন্য তারা প্রস্তুতি শুরু করল এবং ১৭৭ সালে মুর্শিদাবাদ থেকে তারা বাংলার  রাজধানী সরিয়ে আনল কলকাতায়, পরে কলকাতাই হয়ে ওঠে ভারতের রাজধানী।

মুর্শিদাবাদ পড়ে রইল অবহেলায় এবং কালের নিয়মে ধ্বংস হয়ে গেল স্বাধীন বাংলার শেষ গৌরবময় ইতিহাস।       

 

) রাজাভাত খাওয়াঃ – নিউজলপাইগুড়ি – আলিপুরদুয়ার রেলপথে এই স্টেশনটির নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসাধারণ এক মৈত্রীর লোককথা। কোচবিহারের কোচ রাজাদের সঙ্গে ভূটানের ভোট রাজাদের ছিল তীব্র রেষারেষি, উভয় পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ লেগেই থাকত এবং উভয়েই হার মেনে মিত্রতা স্থাপনের পক্ষপাতী ছিলেন না। এইরকম পরিস্থিতিতে ১৮০০ সালের কোন এক সময় কোচ রাজা প্রতিজ্ঞা করলেন, ভোট রাজাকে পরাস্ত না করে তিনি ভাত খাবেন না।  এই প্রতিজ্ঞার কথা কানে আসতে ভূটানের রাজা বিচলিত হলেন এবং সপারিষদ দেখা করতে গেলেন কোচ রাজার সঙ্গে। দুই পক্ষের সাক্ষাৎ হয়েছিল এই গ্রামেই – কিন্তু সেবার আর যুদ্ধ নয় দুই রাজা মৈত্রী বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে একত্রে আহার করেছিলেন, বলা বাহুল্য ভাতই ছিল উভয় রাজার প্রধান খাদ্য। সেই থেকেই নাকি এই গ্রামের নাম রাজাভাত খাওয়া।

  --০০--

 প্রবন্ধটি একপর্ণিকা প্রকাশণী থেকে প্রকাশিত "বাংলার স্টেশন কথা"-র একটি অধ্যায়। বইটি সংগ্রহ করতে চাইলে যোগাযোগ করুন এই ঠিকানায় - 

                                          বাংলার স্টেশন কথা

                            সম্পা: পথিক রাহা ও রাজীবকুমার সাহা

                        একপর্ণিকা প্রকাশনী, ৪০০\- (১৫% ছাড় ও ফ্রি শিপিং)

                         WhatsApp Easy Order  +91 9366 531 526

                        কলেজ স্ট্রিটে জয়ঢাক প্রকাশন ১৮, সূর্য সেন স্ট্রিট দ্বিতল


 এর পরের প্রবন্ধ - " শ্রীমদ্ভাগবৎ কৃষ্ণ "  

তপু ও হেডস্যার

 

এর আগের ছোটদের গল্প - " ভূতের ভরসা (ভৌতিক) "




শ্রুতিনাটকে গল্পটি শুনে নিতে পারবেন ইউটিউবের এই সূত্র থেকে - তপু ও হেডস্যার "

এটির প্রযোজনা করেছেন "গল্প যখন তখন" টিমের কলাকুশলীরা। 




শক্ত মুঠিতে তপুর হাত ধরে সুধাকরদা হেডস্যারের ঘরে সটান হাজির হল, বলল, “এই যে স্যার, ক্লাস সিক্সের তপস্বী হাজরাচৌধুরী”

হেডস্যার টেবিলে রাখা অনেক কাগজপত্র নিয়ে কোন কাজে ব্যস্ত ছিলেন, প্রথমে বুঝতে পারলেন না। মুখ তুলে ওদের দুজনের দিকে তাকিয়ে দেখে বললেন, “বাঃ খুব ভালো, কিন্তু তাতে আমি কী করবো? আমার কাছে এনেছিস কেন?”

সুধাকরদা বলল, “আপনি স্যার বললেন না, ওকে ক্লাস থেকে ধরে আনতে?”

“আমি বলেছিলাম? কেন বল তো?”

“ওই যে স্যার, ইস্কুলের পেছনে বারবার আমগাছে চড়ছিল, আর গাছের ডাল ভাঙছিলপিটির অমলস্যারের মুখে শুনে, আপনি বললেন, বাঁদরটাকে ধরে আন তো, সুধাকর”!

“ও এই সেই বাঁদরটা! এ তো একেবারে নিরীহ বাঁদর রে!”

“না স্যার! এক নম্বরের ভিজে বেড়াল। আপনার সামনে ভালোছেলের মতো দাঁড়িয়ে আছে! এ ঘর থেকে বেরোলেই...”।

হেডস্যার গম্ভীর মুখে বললেন, “আচ্ছা, তুই এখন যা। আমি দেখছি”।

স্যারের কথাটা সুধাকরদার খুব একটা মনঃপূত হল না। ওর ধারণা ছিল, তপুর আঙুলের ফাঁকে পেনসিল, অথবা বাইরের বারান্দায় হাতে থান ইঁট নিয়ে নিল ডাউন, কিংবা নিদেনপক্ষে কান মলার ব্যবস্থা হবেই! সেটা দেখে, তবে ও যাবে। তপুর দিকে কটমট করে তাকিয়ে, সুধাকরদা হেডস্যারের ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

সুধাকরদা বেরিয়ে যাওয়ার পর স্যার তপুর দিকে তাকিয়ে বললেন, “তোর বাড়ি কোথায় রে?”

“চৌধুরী পাড়ায়, স্যার”তপুদের এই গ্রামের নাম শিমূলতলা। এই গ্রামেই অনেকগুলি হিন্দুপাড়া আছে, আর আছে দুটো মুসলিম পাড়া। তাদের গ্রামে এই একটাই স্কুল, শিমূলতলা বুনিয়াদি উচ্চ বিদ্যালয়।

“চৌধুরী পাড়া? তার মানে তুই কেষ্টদার ছেলে, নাকি নবুর ছেলে?”

তপু মাথা নিচু করে উত্তর দিল, “আজ্ঞে, কেষ্টদা আমার জ্যাঠামশাই হন”।

হেড স্যার রেগে উঠে বললেন, “ডেঁপো ছেলে, জ্যাঠামশাইকে কেষ্টদা বলা হচ্ছে?”

“না স্যার, জ্যাঠামশাইকে আমরা জ্যেঠু বলি, আপনি কেষ্টদা বললেন, তাই...”

“হুম্‌ম্‌ম্‌, তাহলে তোর বাবার নাম...?”

“আজ্ঞে, শ্রীযুক্ত নবনারায়ণ হাজরাচৌধুরী”।

মুচকি হেসে হেডস্যার বললেন, “ঠিকই ধরেছি, তুই নবুর ছেলে? নবু আর আমি এই স্কুলেই এক ক্লাসে পড়েছি, জানিস? খুব বন্ধু ছিলাম আমরা। তা তুই ক্লাস ছেড়ে, বারবার আমগাছে চড়ছিলি কেন? তোর জ্যেঠুকেও আমি খুব ভালো করে চিনি। তাছাড়া নবুকে বললে, তোর কী হাল হবে বল তো?”

তপু নির্বিকার মুখে বলল, “আপনি জ্যেঠুকে বলুন কিংবা বাবাকেই বলুন, আমি ঠাম্মাকে গিয়ে বলবো”!

খুব অবাক হয়ে হেডস্যার জিজ্ঞাসা করলেন, “কেন? ঠাম্মাকে বললে কী হবে?”

“ঠাম্মা জ্যেঠুকে খুব বকা দেবেন। তখন বাবা আর কিছু বলতেই পারবেন না। বরং সুজনদাদুর থেকে মাখা সন্দেশ কিনে এনে আমাদের খাওয়াবেন!” তপুদের গ্রামে “অমুক মিষ্টান্ন ভাণ্ডার” কিংবা “তমুক সুইট্‌স্‌”  নামের কোন মিষ্টির দোকান নেইমিষ্টির দোকান চলে, দোকানদারের নামে, ওদের গ্রামে সুজনদাদুর মণ্ডা, মিঠাই, সন্দেশের খুব নাম।

তপুর কথায় হেডস্যার বেজায় অবাক হয়ে বললেন, “কেন, কেন? সন্দেশ খাওয়াবে কেন?”

“বাবা আমাদের বেশি বকাবকি করলে, বাবা ছোটবেলায় যা যা দুষ্টুমি করতেন, দুরন্তপনা করতেন, সে সব ঠাম্মা আমাদের বলে দেবেন যে, সেই ভয়ে!”

“কী সাংঘাতিক। কাকিমা, ইয়ে মানে তোর ঠাকুমা এমন করেন নাকি?”

“করেন বৈকি! প্রায়ই করেন! জ্যেঠুকেও বকাবকি করেন”।

“জ্যেঠু, মানে কেষ্টদাকেও”!

“হ্যাঁ স্যার। ঠাম্মা কাউকেই ছেড়ে দেন না। উনি রেগে গেলে, আপনাকেও ছেড়ে দেন না, স্যার। বাবাকে বলেন, তুই আর দীপু কম দস্যি ছিলি? সেই দীপু এখন হেডস্যার হয়ে ছোট ছোট ছেলেগুলোকে, শুনি, খুব শাসন করছে”? শিমূলতলা বুনিয়াদি বিদ্যালয়ের হেডস্যারের নাম দীপক কুমার সান্যাল।

তপুর কথা শুনে হেডস্যার রীতিমতো চমকে উঠলেন, প্রসঙ্গ পাল্টানোর জন্যে জিজ্ঞাসা করলেন, “টিফিন করেছিস? মুখটা শুকনো দেখাচ্ছে! এঃহে, অনেকক্ষণ খাওয়া হয়নি মনে হয়, না”?

তারপর টেবিলের ওপর রাখা ঘন্টায় ঠং ঠং আওয়াজ তুললেন। ঘন্টার আওয়াজ শুনে সুধাকরদা হেডস্যারের চেম্বারের দরজা ঠেলে মুখ বাড়াল, বলল, “জল দিয়ে ধুয়ে, দুটো থান ইঁট এনে রাখা আছে, স্যার!”

বিরক্ত হয়ে হেডস্যার বললেন, “থান ইঁট? থান ইঁট কী হবে? তুই দ্যাখ তো, সামনের নলিন ময়রার দোকান থেকে মাখা সন্দেশ পাওয়া যায় কিনা। চার আনার নিয়ে আয়। এই পয়সা নিয়ে যা, দেখিস বাসি না হয় যেন!”

পাঞ্জাবীর পকেট থেকে পয়সা বের করে সুধাকরদাকে দিতে দিতে বললেন। অবাক হয়ে সুধাকরদা তপুর মুখের দিকে আড়চোখে তাকাল, তপু নির্বিকার মুখে হেডস্যারের টেবিলে রাখা গ্লোবটা নিরীক্ষণ করতে লাগল

সুধাকরদা পয়সা নিয়ে বেরিয়ে যেতেই হেডস্যার খুব নরম সুরে জিজ্ঞাসা করলেন, “তোর নাম তপস্বী, মানে তপু – আমাদের সেই নবুর ছেলে তপু, তাই তো? তা হ্যাঁরে, তোর ঠাম্মা আমার সম্বন্ধে কী বলেন রে?”

তপু ম্লান হেসে বলল, “সে স্যার, অনেক কথাতাছাড়া আপনি গুরুজন সে সব কথা আমার বলা ঠিক হবে কী?”

“অনেক কথা? আচ্ছা, ঠিক কি বেঠিক সে আমি বুঝবো...তা, দু একটা বল না”

তপু খুব ভারিক্কি চালে বলল, “আপনার সেই পোষা ব্যাংয়ের গল্পটা, ঠাম্মা প্রায়ই বলেন” 

হেডস্যার হেসে ফেলে বললেন, “য্যাঃ, বোকা ছেলে। লোকে কুকুর, বেড়াল, টিয়াপাখি পোষে, ব্যাং আবার কেউ পোষে নাকি?”

“কী জানি, স্যার! ঠাকুমা তো তাই বলেন। আপনি নাকি ওই ব্যাংয়ের পায়ে সুতো বেঁধে স্কুলে নিয়ে আসতেন! তারপর সংস্কৃত স্যারের ক্লাসে চেয়ারের পায়ে তাকে বেঁধে রাখতেন!” হেডস্যার রীতিমতো অপ্রস্তুত হয়ে নিজের মাথা চুলকোতে লাগলেন।

তারপর সামনের দিকে ঝুঁকে নিচু স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন, “এ সব কথা তোর বন্ধুদের কাউকে বলিসনি তো?”

“না, স্যার! এখনো অব্দি বলিনি! সেই ব্যাংটা নাকি ক্লাসে শব্দরূপ পড়ানোর সময় কটকট শব্দ করে ডাকত! আর আপনাদের সংস্কৃত স্যার, রেগে গিয়ে বলতেন, “যত্তো সব অর্বাচীন কূপমণ্ডুকের দল!” মণ্ডুক মানে তো ব্যাং, তাই না, স্যার? আচ্ছা স্যার, সংস্কৃত মানেই আমরা শুনেছি, অং বং চং মন্ত্র – ওটা কী অং ব্যাং চ্যাং মন্ত্র হবে?”

হেডস্যার খুব বিরক্ত হয়ে ধমক দিতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু দিলেন না, সামলে নিয়ে বললেন, “আর কী বলেছেন, তোর ঠাকুমা?”

“আর যা বলেছেন, সে তেমন কিছু নয়, স্যার। মানে বলার মতো নয় আর কী! সে সব শুনলে আপনি রেগে যাবেন, স্যার”!

“কেন? রেগে যাবো কেন?”

“ঠাম্মা বলেন, দীপু কেমন হেডমাস্টারি করছে, দেখতে তোদের স্কুলে যাবো একদিন। দরকার হলে বেশ করে কানটি মুলে দিয়ে আসবো!”

হেডস্যার চমকে উঠে নিজের দুকানে হাত দিলেন, বললেন, “কাকিমা এমন বলেন?”

এমন সময় সুধাকরদা শালপাতার ঠোঙায় মাখা সন্দেশ নিয়ে ভেতরে এল, হেডস্যারের সামনে ওটা রেখে বলল, “এখনই খাবেন, স্যার? প্লেট এনে দিই?”

হেডস্যার কান থেকে হাত সরিয়ে গম্ভীর হয়ে বললেন, “হ্যাঁ প্লেটে করে দে, তবে আমাকে নয়, তপুকে। কাচের গ্লাসে খাবার জলও দিস”। সুধাকরদা অবাক হয়ে তপুর মুখের দিকে বারবার তাকিয়ে দেখতে লাগল।

তপু খুব লজ্জা পেয়ে বলল, “আমার জন্যে আবার সন্দেশ আনালেন, স্যার?”

“কেন? তুই খুব ভালোবাসিস তো? তোর বাবাও তোকে মাখা সন্দেশ খাওয়ায় না? কই তখন তো এমন লজ্জা পাস না, পাস নাকি?” সুধাকরদা যে ভাবে কটমট করে তাকিয়ে তপুর সামনে প্লেটে সন্দেশ আর খাবার জলের গ্লাস রাখল, তপু বেশ মজা পেল

কিন্তু খুব লজ্জা লজ্জা মুখ করে বলল, “না তা পাই না। তবে আমি একা একা খাবো স্যার? সুধাকরদা একটু খাবে না?” 

হেডস্যার ভারি অবাক হয়ে বললেন, “কেন সুধাকর খাবে কেন? ও পরে খাবে, তুই এখন খা! সেই কখন বাড়ি থেকে খেয়ে এসেছিস, খিদে পায়নি?”

সুধাকরদা কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, “স্যার, ও তিনজনের থেকে...”

হেডস্যার বলতে দিলেন না, বললেন, “আঃ সুধাকর। ওকে এখন খেতে দে, পরে এসে প্লেট আর গ্লাস তুলে নিয়ে যাস”। সুধাকরদা খুব রাগ রাগ মুখ করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

তপু কিছুটা সন্দেশ মুখে নিয়ে, মুখটা একটু বেঁকিয়ে বলল, “নলিনকাকুর সন্দেশ তেমন ভালো নয়। ঠাম্মা বলেন নলিনকাকু সন্দেশে ময়দা মেশায়”।

“তোর ঠাম্মা আর কী বলে রে?”

তপু মন দিয়ে সন্দেশ খেতে খেতে বলল, “ঠাম্মা বলেন, নলিনকাকু নাকি, রসের কড়াইতে ডুবে মরা সব মাছি আর ডেঁওপিঁপড়ের পেট নিংড়ে রসগোল্লার রস বানায়”।

হেডস্যার মাথা নেড়ে বললেন, “ধ্যাত্তেরি, নলিনের কথা কে জানতে চেয়েছে? বলছি, তোর ঠাম্মা আমার সম্বন্ধে আর কী বলেন?”

“আপনার সম্বন্ধে? কই তেমন কিছু তো বলেন না?”

“বাঃ রে, এই যে একটু আগেই বললি, আমার সম্পর্কে, তোর ঠাম্মা অনেক কিছু বলেন?”

“ও সেই সব কথা? না স্যার, সে সব ছোট মুখে বড়ো কথা হয়ে যাবে!”

“আঃ, বলছি না, সে আমি বুঝবো। কাকিমা আমার সম্বন্ধে আর কী বলেছেন, বল!”

নিরীহ মুখ করে তপু বলল, “ঠাকুমার মুখে শুনেছি, ছোটবেলায় আপনি আর বাবা বেজায় দুষ্টু ছিলেন, স্যার। একবার একটা  জুতোর বাক্স সুন্দর রঙিন কাগজে মুড়ে স্কুলে নিয়ে এসেছিলেন!”

হেডস্যার এই অব্দি শুনেই টেবিল চাপড়ে হো হো করে হেসে উঠলেন। হেডস্যারের যে অমন সুন্দর ঝকঝকে দাঁত আছে, তিনি যে এমন প্রাণ খুলে হাসতে পারেন, এ ব্যাপারে তপুর কোন ধারণাই ছিল না। তার ধারণা ছিল গোমড়ামুখো মানুষ ছাড়া কেউ হেডস্যার হতেই পারেন না!  কিছুক্ষণ সন্দেশ খাওয়া ভুলে হেডস্যারের দিকে তপু তাকিয়ে রইল

হাসির দমক কমলে হেডস্যার বলতে লাগলেন, “ওফ্‌, সে যা মজা হয়েছিল না! নবু আর আমি আগে থেকেই মতলবটা এঁটেছিলাম। জুতোর বাক্সে পাঁচটা বোলতা ভরে, ফুলছাপ সুন্দর কাগজে মুড়ে, লাল ফিঁতে দিয়ে বেঁধে গিফ্‌ট্‌ বক্সটা বানিয়েছিলাম। পরদিন স্কুলে এসে আমি নবুর হাতে গিফ্‌ট্‌ বক্স দিয়ে বললাম, “হ্যাপি বার্থ ডে, নবু”। নবুও খুব খুশি খুশি মুখে বাক্সটা নিয়ে নিল। তারপর যা হয়, ক্লাসের অন্য সবাই আমাদের ঘিরে ধরল, বাক্সে কী আছে, রে? এই দীপু, নবুকে কী গিফ্‌ট্‌ দিলি রে? নবু বলল, আমার গিফ্‌ট্‌ আমি দেখাবো কেন? আমিও বললাম, নবুর গিফ্‌ট্‌ নবু বলবে, আমি কেন বলতে যাবো? ক্লাসের সব্বাই হামলে পড়ল, কিন্তু আমরা কেউই কিচ্‌ছু বললাম না। নবুও বাক্সটা আগলে রেখে দিল কোলে নিয়ে।

চারটে ক্লাস পরে টিফিনের সময়, নবু বাক্সটা আমার হাতে দিয়ে বলল, বাক্সটা একটু ধর তো, আমি একটু আসছি! নবু চলে যাওয়ার একটু পরে আমি ডেস্কের মধ্যে বাক্সটা রেখে, সবাইকে বললাম, অ্যাই তোরা কেউ এটায় হাত দিবি না। আমি এক্‌খুনি যাবো আর আসব! তারপর আমি ক্লাশ থেকে বেরিয়ে সবে বারান্দায় পা দিয়েছি, ক্লাসের ছেলেরা ঝাঁপিয়ে পড়ল বাক্সটার ওপর। মোড়ক-টোড়ক ছাড়িয়ে, যেমনি বাক্সটা খুলেছে...বাস্‌রে...পাঁচটা বোলতা ছাড়া পেয়ে ভোঁ ভোঁ করে উড়তে লেগেছে ক্লাসময়। আমি আর নবু, বারান্দা থেকে ক্লাসের জানালা দিয়ে তখন দেখছি, ছেলেদের লাফালাফি আর চেঁচামেচি! ডেস্ক বেঞ্চি উল্টে এ ওর ঘাড়ে পড়ছে, মেঝেয় গড়াগড়ি খাচ্ছে...বোলতার ভয়ে! হাসতে হাসতে আমাদের পেট ফেটে যাবার যোগাড়!” গল্পটা বলে হেডস্যার আবার হাসতে লাগলেন, হো হো করে!

তপুর সন্দেশ খাওয়া হয়ে গিয়েছিল, গ্লাসের জলটা খেয়ে, ছোট্ট একটা ঢেঁকুর তুলে বলল, “কাজটা মোটেই ভাল করেননি স্যার! বোলতাগুলো হুল ফুটিয়ে দিতে পারতো! ডেস্ক কিংবা বেঞ্চ উল্টে ছেলেদের হাতে পায়ে চোট লাগতে পারতো”!

হেডস্যারের হাসি হাসি মুখটা আবার গম্ভীর হয়ে গেল, বললেন, “অ্যাই, বাঁদর তুই আমার স্যার, না আমি তোর স্যার? তুই আমাকে উপদেশ দিচ্ছিস? ক্লাস কামাই করে, তুই কী করছিলি, আম গাছে উঠে?”

তপু হাতের পিঠ দিয়ে মুখ মুছে বলল, “অর্জুনের পাখি বসাচ্ছিলাম, স্যার”। 

অবাক হয়ে স্যার জিজ্ঞাসা করলেন, “তার মানে? অর্জুন আবার কে? কোন ক্লাসে পড়ে?”

“অর্জুন আমাদের স্কুলে নয় স্যার, অন্য স্কুলে পড়তেন। আপনাদের থেকেও অনেক সিনিয়র, স্যার! তাঁর হেডস্যার ছিলেন দ্রোণাচার্যতিনি পাখির চোখ ছাড়া আর কিছু দেখতে পাননি বলেই না, সবার সেরা বীর হয়েছিলেন! তাই আমিও ভাবছিলাম, গাছের ডালে মাটির পাখি রেখে শুধু চোখ দেখবো”!

ভুরু কুঁচকে হেডস্যার জিজ্ঞাসা করলেন, “এ বুদ্ধিটা আবার কে দিল?”

“অমলস্যার, স্যার। পরশুদিন পিটি করানোর সময়, বলছিলেন, মনটাকে একাগ্র করতে হবে। সেই সময় তিনি অর্জুনের গল্পটা বলেছিলেন। এইবারের রথের মেলা থেকে ছোড়দি একটা মাটির পায়রা কিনেছিল, সেটা লুকিয়ে এনে আমগাছের ডালে বসাচ্ছিলাম। কিন্তু আমগাছে বড্ডো পাতা, স্যার। পাখিটাই চোখে পড়ছে না, তো তার চোখ চোখে পড়বে কী করে? তাই বার বার উঠে নিচের ডালগুলো ভেঙে হাল্কা করছিলাম, যাতে পাখিটা দেখা যায়। দেখতে পেয়ে অমলস্যার খুব রেগে গেলেন, বললেন, হতভাগা ছোঁড়া গাছের ডাল ভাঙছিস? দাঁড়া দীপকস্যারকে কমপ্লেন করছি!” 

হেডস্যার তপুর মুখের দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন, তারপর বললেন, “ঠিক আছে, এখন তুই ক্লাসে যাঅমলস্যারের সঙ্গে আমি কথা বলবো। আর শোন, খামোখা আমগাছে চড়তে যাস না। হাত-পা ভেঙে শেষে একটা কাণ্ড বাধাবি?”

তপু চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, “না, স্যার গাছে আমি খুব চড়তে পারি। ঠাম্মা আমায় “গেছো ছোঁড়া” বলেন”।

“খুব একটা মন্দ বলেন না, কাকিমা। আচ্ছা, তুই এখন যা”।

“আসছি, স্যার”।

তপু হেডস্যারের চেম্বারের দরজার কাছে পৌঁছে গিয়েছিল, স্যার পিছু ডাকলেন, “আর শোন, কাকিমাকে আবার এসব কথা সাত কাহন করে বলতে যাসনি, যেন!”

“আপনার সন্দেশ খাওয়ানোর কথাও বলবো না, স্যার”?

“না। বলবি না। আর বাইরে সুধাকরকে দেখলে বলিস তো, আমি ডাকছি”। হেডস্যারের চেম্বারের বাইরে, একটা টুলে সুধাকরদা বসেছিল।

তার সামনে দাঁড়িয়ে ছোট্ট একটা ঢেঁকুর তুলল তপু, তারপর বলল, “সুধাকরদা, হেডস্যার তোমায় ডাকছেন, ভেতরে যাও”। তারপর তপু বীরদর্পে তার ক্লাসরুমের দিকে হাঁটা দিল, আর সুধাকরদা তপুর দিকে কটমট চোখে তাকিয়ে, হেডস্যারের চেম্বারে ঢুকল।

 

সুধাকরদা ঘরে ঢুকতেই দীপকস্যার বললেন, “টেবিল থেকে এঁটো প্লেট আর গ্লাসগুলো সরিয়ে নে। ছেলেটার বেজায় খিদে পেয়েছিল রে!”

সুধাকরদা টেবিল থেকে প্লেট আর গ্লাস তুলতে তুলতে বলল, “খিদে পেয়েছিল না, ছাই, স্যার। অলরেডি ক্লাসের তিনজনের থেকে চুরি করে তাদের টিফিন সাবাড় করে এসেছে! পরোটা আলুভাজা, ডিমসেদ্ধ, কলা, এই সব...”

“বলিস কী?”

সুধাকরদা গোমড়া মুখে বলল, “তবে আর বলছি কী, স্যার। ওর মতো বিচ্ছু ছেলে এ স্কুলে আর দুটি নেই!”

সুধাকর এঁটো প্লেট-গ্লাস নিয়ে ঘরের বাইরে যেতে, হেডস্যার কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন। তারপর আপন মনে হাসতে হাসতে ভাবলেন, “এমন ছেলে দু একজন না থাকলে স্কুলটাকে কেমন পানসে লাগে! আর ছেলেবেলাটাও কেমন নিরিমিষ হয়ে যায়!”

-- ০০ --


এর পরের ছোটদের গল্প - " ভূতের মুখে রামনাম  "




চিত্র কৃতজ্ঞতাঃ শ্রীযুক্ত প্রদীপ গোস্বামী

গল্পটি আমার এক কুড়ি কিশোর গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত। বইটি ঘরে বসে পেতে বুক করুন নীচের লিংকেঃ

রবিবার, ৬ জুলাই, ২০২৫

প্রদীপ্তা মুখার্জি (কুটু)-র আত্মকথন - বিশ্বলোকের সাড়া - পর্ব ৩

 বিশ্বলোকের সাড়া - তৃতীয় পর্ব 

প্রদীপ্তা মুখার্জি (কুটু)


বিশ্বজনের পায়ের তলে ধূলিময় যে ভূমি, সেই তো স্বর্গভূমি

অভিবাসী পরিবারের অন্দরমহলে এই রকম ঘনিষ্ঠতার জন্যেই কানে আসতে লাগল, ছাত্রীদের দৈনন্দিন জীবনের নানান সমস্যার কথা। তার মধ্যে থাকতো তাদের শারীরিক এবং মানসিক অত্যাচারের কথাও। এই ঘটনাগুলো আমায় ভীষণ ভাবে নাড়া দিত। আমি একই সঙ্গে চিন্তিত আর ব্যথিত হতাম। ভাবতাম ওঁদের জন্যে কী করে কিছু করা যায়, কারণ কিছু না করে চুপ করে মেনে নেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ছিল আমার কাছে। কী করে ভুলে যাই রবীন্দ্রনাথের সেই মন্ত্র, “অন্যায় যে করে অন্যায় যে সহে, তব ঘৃণা যেন তারে তৃণসম দহে”।  

ESOL এর সমন্বয় আধিকারিক (co-ordinator) Philippa Cairns-কে একদিন বলেই ফেললাম, আমি এঁদের জন্যে এ ব্যাপারে কিছু করতে চাই। ফিলিপা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন, তাঁর সহযোগিতায় আমি পড়াশোনা এবং খোঁজ-খবর শুরু করলাম, পারিবারিক-হিংসা (Family-Violence)-র ব্যাপারে এদেশের আইন-কানুন কতখানি সজাগ।   

এই সময়ে আমার সঙ্গে যোগাযোগ হল এক মহিলা’র তিনি তখন সবে অকল্যান্ডে একটি সামাজিক সংস্থা (Social Organisation) শুরু করেছেন পারিবারিক-হিংসা’র-শিকার মহিলাদের (Domestic Violence victim ) জন্য । আমি সেখানে প্রথম ট্রেনিং নিলাম এই নির্যাতিতাদের সাহায্য করার। ওখানে ছাড়াও আমি আরো কয়েকটি অন্যান্য সামাজিক সংস্থা থেকেও অন্য ট্রেনিংও নিলাম। এইভাবেই আমার কাজের শুরু। আমি যুক্ত হলাম Tauranga Women’s Refuge- বলে একটি সংস্থাইয়। এটি একটি নারী-আবাস, সেখানে পারিবারিক হিংসার শিকার মেয়েদের আশ্রয় দেওয়া হয়। এ ধরনের নারী-আবাস অবশ্য দেশের অন্য অনেক শহরেই আছে। 

এখানে কাজ করতে করতে আমি অনুভব করলাম, একজন ইংরেজি না জানা একা এক অভিবাসী নারীর পক্ষে, যে কিনা এসেছে সম্পূর্ণ অন্য সমাজ এবং ধর্ম থেকে, পরিস্থিতি কতটা ভয়ানক উঠতে পারে। এই সংগঠন তার দিকে সাহায্যের হাত বাড়ালেও, তার জীবনে আরও কত যে সমস্যা আছে যার কোন ধারণাই নেই এই সংগঠনের কর্মীদের। ইংরেজি না জানায়, এঁরা এঁদের সমস্যার কথা, মানসিক পীড়ার কথা আলোচনা করতে পারেন না, আর কাউন্সেলরদের পক্ষেও তাদের দৈনন্দিন জীবনের জটিলতার কথাও বুঝে ওঠা সম্ভব হয় না। এমন অনেক সামাজিক প্রথা, রীতিনীতি, অভ্যাস, সেগুলি সবই না বলা থেকে যায়, যেগুলি উন্নতদেশের বিদেশীদের চোখে মূল্যহীন। 

একদিন অনেক সাহস নিয়ে শুরু করলাম “দিশা” - Ethnic Women's Support Group। যে সংস্থা অসহায় নারীদের দিশা দেখাবে। আমার মূল উদ্দেশ্য ছিল Women Empowerment & womens’ rights। 

আমার সন্তানেরা তখন বেশ ছোট, ছোটটির বয়স দুই আর বড়জন আট। কিন্তু তাও সাহস করে নেমে পড়লাম; অভিবাসী মহিলাদের ওই কষ্ট আমি সহ্য করতে পারিনি। কাজল গোড়া থেকেই আমার পাশে ছিল, অনেক সাহায্য করেছে। প্রথমে বাড়ি থেকেই কাজ করতাম, তারপরে একটা অফিস শুরু করি।  কয়েক বছর পরে চালু করতে পারলাম সেফ হাউজ। এটি শুধু অভিবাসী মহিলাদের জন্যই। বহু নিপীড়িত মহিলাকে আশ্রয় দিতে পেরেছি। বহু মহিলা এখানে থেকে নিজের পায়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে বা আবার নতুন করে বাঁচতে শিখেছেন। এই কাজের সূত্রে আমি পেয়েছি এক ভালো বন্ধু। Angie Warren-Clarke। এঞ্জি ছিলেন তৌরাঙা রিফুজের কোওর্ডিনেটর। আমরা একসাথে কাজ করেছি। কাজের সূত্রে আমরা দুজনে ভালো বন্ধু হয়ে গেছি। এখন উনি আমাদের পার্লামেন্টের একজন এমপি। 

বাইশ বছর আগে যখন আমি “দিশা” শুরু করি, ওই মহিলাদের সামাজিক মননে ছিল অটল-অহমিকার চূড়ান্ত ভ্রান্তি। আমার কাজের কথা কাউকে বলতে পারতাম না। বহু মানুষের, বিশেষতঃ পুরুষদের ধারণা ছিল, আমার কাজের জন্যে তাঁদের সংসার ভাঙছে। এমনকি আমার মেয়েও যখন আমায় প্রশ্ন করতো 'মা, তুমি কি করো?', আমি মিথ্যে বলতাম, “আমি গান করি, মানুষকে গান শোনাই”! 

এতদিনে সাধারণ মানুষ অনেক সচেতন হয়েছেন। অনেক সামাজিক পরিবর্তন আমি লক্ষ্য করেছি। বাইশ বছর আগে যখন আমি এই কাজ শুরু করি, আমাদের সঙ্গে যে পুলিশরা আসতেন, তাঁদের সকলেই হতেন পুরুষ। সময় বদলে গেছে, এখন আমাদের সাহায্যের জন্যে আসেন মহিলা পুলিশেরা, তাঁরা ওই অসহায় মহিলাদের প্রতি অনেকটাই সংবেদনশীল এবং সহানুভূতিসম্পন্না।   

এই সমাজ সেবার সাথে সাথেই আমি চালিয়ে গেছি আমার গান আর রবীন্দ্রনাথের প্রচার। অবশ্য তার সাথে ছিল আমার স্বামী-সংসার, ছেলে-মেয়ের স্কুল, খেলা, ব্যালে। আমার ছেলে আবীর,  Earth-Science & Environmental Planning নিয়ে পড়াশোনা করেছে Waikato University থেকে, এখন চাকরি করে স্কটল্যান্ডের এডিনবরা শহরে। হকি খেলে, নিউজিল্যান্ডের হয়ে অনূর্ধ্ব একুশ (Under 21) দলের হয়েও সে খেলেছে। আমার মেয়ে অনাহিতা, ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে আইন আর সঙ্গীত নিয়ে পড়াশোনা করেছে। পড়াশোনার সাথে সাথে সে চালিয়ে গেছে তার নিজের সঙ্গীত সাধনা। সে নিজে গান লেখে, সুর দেয় আর performও করে পাশ্চাত্য সঙ্গীত।  আমার কাছে ছোটবেলা থেকে রবীন্দ্র সঙ্গীত শিখেছে, ও খব ভালবাসে রবীন্দ্রাসঙ্গীত। আমার সাথে অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়েছে। ওর জন্ম এইদেশে  কিন্তু আমাদের ছেলে মেয়ে দুজনেই বাংলা বলতে পারে।  Accent অন্যরকম কিন্তু বলতে পারে। মেয়ে আপাতত সুদুর লন্ডন শহরে বাস করে, চাকরী করে সেখানকার আইন-মন্ত্রনালয়ে । আমার স্বামী কাজল পেশায় ইঞ্জিনিয়ার। গত ৩০ বছর ধরে এখানকার এক নামকরা Consulting Company, BECA তে চাকরি করে। এদের তিন জনকে নিয়েই আমার নিউজিল্যান্ডের সংসার।

অনেক, অনেক কিছু পেয়েছি এদেশে এসে। ভালোবাসা পেয়েছি, মিশতে পেরেছি নানা দেশের মানুষের সাথে, অনেক কিছু শিখতে পেরেছি তাদের সংস্কৃতি থেকে। এদেশের একটা ব্যাপার ভীষণ মন কাড়ে, এখানকার সাধারণ মানুষের সত্যনিষ্ঠা। মানুষ মানুষকে অনেক বেশি মূল্য দেয়, সেটা অবশ্য সরকারের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সরকারের স্বচ্ছতাও উল্লেখযোগ্য।

নানা দেশের মানুষকে গান শিখিয়েছি ও এখনো শেখাই।  নানা অনুষ্ঠানে গান করেছি, আমি নিজে অনুষ্ঠান প্রযোজনাও করেছি আর তার সাথে সাথে রবীন্দ্রনাথের গান ছড়িয়ে দিয়েছি নিউজিল্যান্ডে। আমার জীবনে রবীন্দ্রনাথের সমস্ত সৃষ্টির বিরাট একটা ভূমিকা আছে। এই অধ্যায় না থাকলে আমার জীবন অপূর্ণ থেকে যেতো।

শিল্পী হিসেবে এই প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আমি নানান সঙ্গীত ও শিল্প সংস্থার স্বীকৃতি পেয়েছি। COGS (Community Organisation Grants Scheme) এর প্যানেল মেম্বার হিসেবে নির্বাচিত হয়েছি। Creative Tauranga-র প্যানেলেও নির্বাচিত হয়েছি। এসবই আমার কাজের ও অনুভূতির স্বীকৃতি, যা এঁদের কাছ থেকে পেয়েছি দুহাত ভরে। 

সমাজসেবা আর সঙ্গীতচর্চার সূত্রে যোগাযোগ হয়েছে বহু মানুষের সাথে, অনেক সাথী পেয়েছি আর পেয়েছি কিছু ভালো বন্ধু, যাঁরা আমাকে সব সময়ে উৎসাহ দিয়েছেন, উদ্দীপনা যুগিয়েছেন। তাদের মধ্যে তিন জন হলেন Angie Warren-Clarke, Jan Tinneti এবং Priyanca Radhakrishnan.

“দিশা” নিয়ে কাজ করা কালীন আরো একজন এর সাথে কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছিল, যার কথা না বললেই নয়। Merrivale Community Centre-এ এক মিটিংয়ে আলাপ হয়েছিল, মেরিভেল প্রাইমারী স্কুলের তখনকার প্রিন্সিপাল Jan Tinetti-র সাথে। তিনি প্রাইমারী স্কুলের প্রিন্সিপাল হওয়া সত্ত্বেও মেরিভেল Community-র সাথে যুক্ত ছিলেন অঙ্গাঙ্গীভাবে। ওঁনার সাথে আলোচনা হলো ইমিগ্র্যান্টদের সমস্যা নিয়ে এবং দিশার নানান কাজ নিয়ে। অনেক সমর্থন পেয়েছিলাম জ্যানের কাছ থেকে। সেই থেকে আমাদের বন্ধুত্বের সূত্রপাত। ২০২০-র নতুন সরকারে জ্যান এখন মন্ত্রীত্বের পদে নিযুক্ত।

একটা ছোট্ট ঘটনার কথা না বললেই নয়, যেটা আমার মনে ভীষণ ভাবে দাগ কেটেছিল। আমাদের নিউজিল্যান্ডে আসার দ্বিতীয় দিন। আমরা তখন একজনের বাড়িতে পেয়িংগেস্ট ছিলাম এবং কাজল সক্কাল সক্কাল বেরিয়ে গিয়েছিল ভাড়া বাড়ির খোঁজে। কাজল আগের দিন দেখিয়ে দিয়েছিল বাড়ির কাছেই একটা দোকান, যেখানে চাল ডাল এইসব পাওয়া যায়। আমি সকাল বেলা পুত্র ছোট্ট আবীরকে নিয়ে সেখানে গেলাম। চাল, ডাল এই সব সাংসারিক সামগ্রী কেনার পরে দাম দিতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম আমার কাছে নিজি ডলার নেই। আমি তাই দোকানীকে আমেরিকান ডলারই দিলাম। ভদ্রলোক বয়স্ক, পরে জেনেছিলাম পাকিস্তানের অভিবাসী; আমায় উর্দু মিশ্রিত হিন্দীতে জিগ্যেস করলেন, "বেটি কব আয়ি হো?" হাতে আমেরিকান ডলার দেখে উনি বুঝে নিয়েছিলেন যে আমরা সদ্য সদ্য এসেছি। বলেছিলেন, “আমি তো এই টাকা নিতে পারবো না, তবে তোমার খাবার দাবার তুমি নিয়ে যাও, পরে যখন ডলার ভাঙাবে আমায় দিয়ে যেও”।  আমি পরের দিনই টাকা ভাঙিয়ে গিয়ে দিয়েছিলাম আর অনেক ধন্যবাদও জানিয়েছিলাম। ১৯৯৫ সালে ভারত থেকে আসা আমি, ভাবতেও পারি নি, এই ধরনের মনুষ্যত্ব এখনো আছে মানুষের মনে। সম্পূর্ণ অজানা অচেনা এক মানুষকে এই ভাবে বিশ্বাস করা, ভাবা যায় না। ওই ভদ্রলোকের সেদিনের সহানুভূতি আমায় মনুষ্যত্বের এক নতুন পাঠ পড়িয়েছিল সেদিন। 

[নীচের লিংক থেকে প্রদীপ্তার গাওয়া একটি উচ্চাঙ্গ এবং একটি রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনে নিন - ব্লগার কিশোর]  


ন্যায়না ভর আয়ে

সেই ভাল সেই ভাল 

চলবে...


নতুন পোস্টগুলি

শুধু _তুই .কম - পর্ব ২০

 প্রথম   ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "  দ্বিতীয়  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন র...