রবিবার, ৩ আগস্ট, ২০২৫

মশা-ই

এর আগের বড়োদের গল্প - " ভেন্টিলেশান "  




[ আজকাল বাংলা সাহিত্যচর্চা করে, চায়ের জলও গরম হয় না - অতএব কিছু স্পনসর যোগাড় করে এই গল্প লিখতে হল দুটো পয়সার লোভে। ]


[গল্পের এই অংশটি প্রযোজনা করেছেনঃ-

“বালকেশরী”®

রাত্রে শোবার আগে চুলের গোড়ায় রগড়ে নিন, চুল পড়া বন্ধ হয়, নতুন চুল গজায়

(ব্যবহারবিধিঃ ব্যবহারের আগে হাতে গ্লাভ্‌স্‌ পড়ে নেবেন, হাতের তালুতে চুল গজালে কোং দায়ি নয়)

ণকোল হইতে সাবধাণ]

রাত্রে শোবার আগে চুল বাঁধা মণিমালার অনেকদিনের অভ্যেস। খাওয়া দাওয়ার পর রান্নাঘরে সব গোছগাছ করে এসে সে রোজ ড্রেসিং টেবিলের সামনে চুল আঁচড়ায়। চুলের গোড়ায় ঘষে ঘষে বালকেশরী মাখে। সে তেলের দারুণ খোশবু। আঁচড়ানো শেষ করে খুব টান টান করে চুল বেঁধে বিনুনি বানায় রোজ। বিনুনি বাঁধার সময় ঘাড়টা বাঁ দিকে একটু হেলিয়ে দেখতে থাকে বিনুনির পাক, আর চাপা ঠোঁটে ধরে রাখে কালো ফিতের একটা ধার। অবাধ্য দু একটা চুল – তার কপালে উড়ে এসে জুড়ে বসে। কখনও শাড়ির আঁচল একটু সরে যায়, জানালার পর্দা সরিয়ে মুখ বাড়ানোর মতো বেরিয়ে পড়ে ব্লাউজে ঢাকা বুকের এক আধটা দুষ্টু। অথবা সামান্য মেদ সমৃদ্ধ পেটের দুষ্টুটা। 

সিগারেট টানতে টানতে বিছানায় শুয়ে লোলুপ নজরে এই সব দেখছিল সুকান্ত। গায়ে তার জন্মদিন আর লুঙ্গি। এত রাত্রে মণিমালার শোবার ঘরের বিছানায় আধশোয়া সুকান্ত লুঙ্গি পড়ে সিগারেট টানছে কী করে? কী করেই বা সে এখন বিছানা থেকে নেমে মণিমালাকে জড়িয়ে ধরতে পারল পিছন থেকে? মণিমালার ঘাড়ে ঠোঁট রাখতে পারল? কেনই বা শিউরে উঠল মণিমালা আর প্রশ্রয়ের হাসি মুখে নিয়ে গলা দিয়ে আদুরে মেকুরের মতো আওয়াজ করতে পারল? তার কারণ সুকান্ত মণিমালার স্বামী। স্বাভাবিকভাবেই মণিমালাও সুকান্তর বউ।

 [গল্পের এই অংশটি প্রযোজনা করেছেনঃ-

“সুখশয্যা”®

মনের মতো ম্যাট্রেস

ঘুমে রাত করে দিন ভোর, সুখ স্বপ্নে থাকুন বিভোর,

সকাল হবে একদম ফ্রেস]

 

চুল বাঁধা হয়ে গেল, চিরুনিতে লেগে থাকা চুলগুলি ছাড়িয়ে নিয়ে মণিমালা ছোট্ট একটা নুটি বানিয়ে তুলল, তারপর অস্ফুটস্বরে সুকান্তকে বলল অ্যাই ছাড়ো না, আজকে ঘুমোবে না, নাকি? সুকান্ত ছেড়ে দিতে, মণিমালা মুচকি হেসে বলল লক্ষ্মী ছেলে, সোনা ছেলে। বলতে বলতে বেরিয়ে গেল ঘরের লাগোয়া বারান্দায়, বারান্দায় দাঁড়িয়ে চুলের নুটিতে সশব্দে একটু থুথু দিয়ে, নুটিটা ছেড়ে দিল শূণ্যে। বেচারা চুলের নুটি! একটু আগেও সুন্দরী রমণীর কেশদামের অংশ হয়ে বেশ ছিল, শ্যাম্পু আর বালকেশরীতে নিত্য নিষিক্ত হয়ে। এখন এই প্রায় মধ্যনিশিতে অবহেলিত, পরিত্যক্ত হয়ে, মুক্ত বাতাসে ভেসে বেড়াতে লাগল – কার জানালা দিয়ে কোথায় ঢুকে পড়বে কে জানে! 

বারান্দার দরজা বন্ধ করে, মণিমালা পাশের ডাইনিং হলে গেল, ফ্রিজ খুলে একটা বোতল আর টেবিল থেকে দুটো গ্লাস নিয়ে এল। একটা গ্লাসে জল ঢেলে বলল জল খাবে? সুকান্ত গোমড়া মুখে ঘাড় নেড়ে না বলল। মণিমালা হাতে ধরা গ্লাসের জলটা এক নিশ্বাসে খেয়ে নিয়ে আওয়াজ করল আঃ, বলল সেই থেকে যা তেষ্টা পেয়েছিল। গ্লাস দুটো আর বাকি জলের বোতলটা মাথার কাছে ছোট টেবিলে রেখে, মণিমালা সুখশয্যায় বসতে এসেও আবার উঠে গেল। ডাইনিং টেবিলের ওপরে রাখা ভাজা মৌড়ির কৌটো নিয়ে এসে খাটের পাশে দাঁড়াল। কৌটো থেকে একটু ভাজা মৌড়ি ডানহাতের তালুতে ঢেলে বলল ভাজা মশলা খাবে? সুকান্ত হাত বাড়াল না, হাঁ করল। মণিমালা নীচু হয়ে সুখশয্যায় শোয়া সুকান্তের মুখের সামনে হাত নিয়ে ঢেলে দিল ভাজা মৌড়ি। সুকান্ত মুখ বন্ধ করে জড়িয়ে ধরল মণিমালাকে, টেনে নিল নিজের বুকের ওপরসুকান্তর বুকে মণিমালার বুক থেপসে গেল। একটুও আগুন জ্বলল না, কিন্তু সুকান্ত পুড়ে ছাই হতে লাগল। ছাড়ো, ছাড়ো আমার এখনো রাজ্যের কাজ বাকি। আমার পাশে শোয়াটাও তোমার একটা কাজ। ছাই কাজ। ঠিক তাই, সেই থেকে পুড়ে পুড়ে আমি ছাই হচ্ছি। ইস, আমি এখন তাহলে এসে ছাইয়ের গাদায় শুলাম? ছাইয়ের গাদা, উঁ, ছাইয়ের গাদা, দেখাচ্ছি কেমন ছাইয়ের গাদা। নরম সুখশয্যার ওপর সুকান্ত চেপে ধরল আগুনতপ্ত মণিমালাকে। তারপর মণিমালার মুখের কাছে মুখ নামিয়ে বলল মশলা খাবে। মণিমালার দু চোখে সর্বনাশের ডাক, তার আঁখিপাখি পাখা ঝাপটিয়ে বলল খাবো। সুকান্ত ডুব ডুব ডুব দিল মণিমালার অধরে, তার জিভ মৌড়ির কয়েকটা দানা সমেত ঢুকে পড়ল মণিমালার অন্দরে।    

 

[গল্পের এই অংশটি প্রযোজনা করেছেনঃ-

“রমণীয় বস্ত্র বিপণি”®

সৌন্দর্যে সেজে ওঠার শেষ কথা আমাদের বিপুল বস্ত্র সম্ভার

শাড়ি শায়া ব্লাউজের একমাত্র বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান

বিঃ দ্রঃ- আমরা ‘শরাবি’ শাড়ি, ‘নটখট’ প্যান্টি ও ‘হাসিনা’ ব্রেসিয়ারের একমাত্র স্টকিষ্ট

আমাদের কোন শাখা নাই]

 

খোলা জানালা দিয়ে উড়ে এসেই আমার চক্ষু চড়কগাছ। জবর ভোজের এমন সুন্দর সুযোগ আর পাব কিনা জানি না। অন্যদিন খাটের ওপর মশারি ঝোলে, সারারাত কেটে যায় মশারির ফাঁক খুঁজতে অথবা মশারির দেওয়ালে ছোট্ট ফুটো খুঁজতে। যদি কোনরকমে ঢুকতে পাই। মশারির চালের দিকে যাওয়া যায় না, এতো হাওয়া! দু একদিন মশারি তুলে বাথরুমে গেলে, সেই ফাঁকেও ঢুকে পড়েছি মশারির ভেতর। যদিও ব্যাপারটা খুব বিপজ্জনক, অনেক সময় এক পেট গিলে মশারি থেকে বের হতে না পেরে, সকালবেলায় হাতের চাপড়ে মৃত্যু ঘটে গেছে আমার দু একজন সঙ্গীর। আজ মশারি নেই। তার ওপর দুজন মানুষ একসঙ্গে। যে অবস্থায় আছে, হি হি, আমরা হলে বলতাম মেয়েটা কদিন পরেই ডিম দেবে। মানুষগুলো খুব চালাক, ডিম পাড়ে না। মেয়েগুলো বাচ্চাকে পেটের মধ্যে লুকিয়ে রাখে। খাটের ওপর ভাঁজ করা মশারির একধারে বসে দেখতে লাগলাম। আর অপেক্ষায় রইলাম সুযোগের।

 

ছেলে মানুষটা খালি গা হয়ে গেছে, এবার মেয়ে মানুষটা খালি গা হচ্ছে। খাটের মাথা থেকে গড়িয়ে মেঝেয় পড়ে গেল শরাবিখানা, খাটের মাথায় হাসিনাটা লটকাতে লাগল। আর সবশেষে নটখটটা বিছানাতেই পড়ে রইল ওদের পায়ের কাছেআমি ওদের দুজনকে দেখে মুখ চাপা দিলাম, লজ্জায়। ছি,ছি, এতোটুকু লজ্জা নেই গা, বেহায়া একনম্বরের। হি হি, হি হি হাসির শব্দে আশেপাশে তাকিয়ে দেখি, আরো কয়েকটা নচ্ছার ছুকরি আমার মতোই মশারির চালে বসে বসে সব দেখছে। কি তাদের হাসাহাসি, আর কি তাদের ঢলাঢলি!

 

[গল্পের এই অংশটি প্রযোজনা করেছেনঃ-

“হলাহুল”®

ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, এনসেফেলাইটিস হইতে বাঁচার একমাত্র উপায় হলাহুল

প্রত্যেকটি মশাকে ধরিয়া, হুলের মধ্যে একবিন্দু সেবন করাইলেই অব্যর্থ ফল

বিফলে মূল্য ফেরত।

নবদম্পতিদের জন্য বিশেষ ছাড় ২০% পর্যন্ত*

*শর্তাবলী প্রযোজ্য]

 

কি যে বাপু করছে এই মানুষ জোড়া কে জানে, সেই থেকে জোড় লেগে রয়েছে, তবু ঝুটোপুটির অন্ত নেই। আমাদের বাবা এত কল্লা নেই, উড়তে উড়তেই ছেলেগুলো আমাদের পিঠ খামচে বসে পড়ে, একটু সময় হতে না হতেই মিটে যায় ব্যাপারটা। খিদে পেয়েছে খুব, তবে এই সময় গায়ে বসাও যাবে না, হুটোপুটিতে কোথায় চাপা পড়ে শেষ অব্দি প্রাণটাই খোয়াব নাকি? তার চেয়ে আরেকটু অপেক্ষা করাই ভালো।

 

তাছাড়া আমাদের শাস্ত্রেও বলা আছে এই সময়ে কাউকে কোন চোট আঘাত করতে নেই। মানুষদেরই কেউ একজন হোমড়াচোমড়া বহুদিন আগে এমনই একটা কেলেংকারি করে সারাটা জীবন পস্তেছিল খুব। হয়েছিল কি, বনের মধ্যে একটা হরিণ তার বউকে খুব আদর করছিল। দুজনেরই তখন যাকে বলে বিহ্বল অবস্থাএদিকে সেই হোমড়াচোমড়া মানুষটা ওই বনেই শিকার করতে বেরিয়ে ঘুরতে ঘুরতে সেই জায়গাতেই চলে এসেছে, যে জায়গায় হরিণদুটো ফস্টিনস্টি করছিল। সে মানুষটার আর তর সয় নি, ছুঁড়ে দিল দু দুটো তীর, ব্যস পটল তুলল ছেলে হরিণটাও, মেয়ে হরিণটাও। বেচারারা লক্ষ্যই করে নি কিনা, করলে তো পালিয়ে বাঁচত। সে যাই হোক মরার আগে তারা খুব শাপ দিলে সেই হোমড়াচোমড়াকেযতোই তুমি হোমড়া হও, হে, সারাজীবন তুমি আর ভালোবাসতে পারবে না। ও মা, সত্যি সত্যি সেই হোমড়াচোমড়া মানুষটা সারা জীবনে কিচ্ছু করতে পারে নি, দু দুটো বউ থাকা সত্ত্বেও। করবে কি তার তো হি হি খাড়াই হয় না। অন্য লোকে এসে তার দু বউকে ছেলে দিয়ে যেত। সেই থেকে আমাদের মানা, ওই সময় কোন চোট দেওয়া যাবে না, এমনকি হুলও না।

 

[গল্পের এই অংশটি প্রযোজনা করেছেনঃ-

“স্বাস্থ্যরক্ষা ডায়াগ্নস্টিক এণ্ড রিসার্চ সেন্টার”®

সুলভে সকল চিকিৎসার সুবন্দোবস্ত আছে।

যেখানে সেখানে জল জমতে দেবেন না, জমা জল মশার আঁতুড় ঘর।

রাত্রে শোবার সময় মশারি টাঙাতে ভুলবেন না।

জনস্বার্থে প্রচারিত।]

 

মেয়েটা এখন যেরকম ডাকাডাকি করছে, মনে হচ্ছে হয়ে এসেছে। আমি আমার ডানাদু্টো আর হুলটাকে একবার চেক করে নিলাম। বলা যায় না, বয়েস হয়েছে তো, লাস্ট মোমেন্টে হয়তো ডানা দুটো খুলল না, বা দেখলাম হুলটা একটু ভোঁতা হয়ে গেছে ওদিকে নীচে, যা ভেবেছিলাম তাই, হয়ে গেছে, ছেলেটা মেয়েটার থেকে নেমে পাশে শুল, আর মেয়েটা ছেলেটার বুকে মাথা রাখল। দুজনে খুব আরাম করে সুখশয্যায় শুয়ে চোখ বুজল। আমি এবং আমার দেখাদেখি অন্যরাও একসঙ্গে নেমে এলাম, ভাগাভাগি করে বসে পড়লাম ওদের গায়ে।

 

মণিমালার কদিন ধরেই খুব জ্বর। প্রথমে মনে হয়েছিল সাধারণ সর্দিজ্বর। তারপর ভাইরাল ফিভার। ডাক্তারবাবু উল্টে পাল্টে নানান অ্যান্টিবায়োটিক আর প্যারাসিটেমল ট্রাই করেও জ্বরতো ছাড়লই না, দিন দিন দুর্বল হয়ে অবস্থা ক্রিটিক্যাল হয়ে উঠতে লাগল। ডাক্তার প্রেসক্রাইব করলেন, ব্লাড টেস্ট করানোর জন্যে। ব্লাড রিপোর্টে পাওয়া গেল প্লাজমোডিয়াম ফ্যালসিপেরামের প্যারাসাইটঅর্থাৎ ম্যালেরিয়া, ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়া। অ্যাডমিট করে দেওয়া হল স্বাস্থ্যরক্ষা ডায়াগ্নস্টিক এণ্ড রিসার্চ সেন্টারে।

 

[গল্পের এই অংশটি প্রযোজনা করেছেনঃ-

“টুকটুকি”®

সধবার নিত্য সঙ্গী টুকটুকি সিন্দুর ও তরল আলতা।

(প্রতারিত হইবেন না, প্রতারিত হইবেন না)

কিনিবার পূর্বে ৺শ্রীযুক্ত হারাধন পতিতুণ্ডর ছবি ও স্বাক্ষর দেখিয়া লইবেন)]

                                       

দিন কতক খুব যমে মানুষে টানা পোড়েনের পর, মণিমালা ইহলোকের মায়া ত্যাগ করল। অনেকে বলল মণিমালা নিখাদ সতী, জলজ্যান্ত স্বামী রেখে, হাতের শাঁখানোয়া, সিঁথিতে ডগডগে টুকটুকি সিঁদুর নিয়ে ড্যাং ড্যাং করে স্বর্গে চলে গেছে। টুকটুকি অলক্তক রাগে রাঙানো তার দুই রাতুল চরণের ছাপ সাদা কাগজে তুলে নিল সকলে। শ্রাদ্ধের দিন ফ্রেমে বাঁধাই হয়ে বাসরে রাখা হল সেই চরণ চিহ্ণ। তার ওপরে লেখা, ‘তোমা বিনা সংসার নিদারুণ শূণ্য’ আর নিচেয় লেখা ‘দুটিহাত ভরে দিলে সাধ্বীর পুণ্য’। সুকান্তর ক্লাস নাইনে পড়া ডেঁপো ভাগ্নের এমন কাব্য প্রতিভা সকলকে অবাক করে দিল।    

 

মণিমালা খুবই ভাগ্যবতী তাতে কোন সন্দেহ নেই। সে না মরে যদি আজ সুকান্ত মারা যেত, তার কপালে অশেষ দুঃখ ছিল। পাড়া প্রতিবেশীরা চোখ গোলগোল করে, গালে আঙুল ঠেকিয়ে বলত, যেদিন ও বউ হয়ে এ বাড়িতে ঢুক্কেছে সেদিনই আমি বুয়েছিলাম গো দিদি, এ রাক্কুসী আমাদের সুকুকে গিলে খেতে এয়েচে। তুমি সরল মনের মানুষ দিদি, কোন ঘোরপ্যাঁচ নেইওর বুকের গড়ন দেখেচ? আর পাছা? সব ডাইনীর লক্ষণ, থা নইলে আমাদের সুকু, অমন ডাকাবুকো স্বাস্থ্য, বেঘোরে প্রাণ দেয়? মায়ের কোল এমন করে খালি করে দিতে আছে, রে পোড়ারমুকি। অশ্রুহীন চোখের জল মুছতে আঁচলে মুখ ঢাকত সেই প্রতিবেশী। সেই বিদ্যাসাগরও নেই এবং তাঁর বিধবা-বিবাহ অ্যালাউন্সও নেই, মণিমালার চট করে বিয়ে হওয়াও মুশকিল হত মাঝের থেকে বেশ কিছু ছুঁচকো লোকের আনাগোনা বাড়ত, তাকে ফুঁসলে নির্দায় ফস্টিনস্টি সারার ধান্দায়।

 

[গল্পের এই অংশটি প্রযোজনা করেছেনঃ-

“গ্রীন লিও”®

প্রতিটি সন্ধ্যায় হতে থাকুক জমজমাট মজা,

আপনি, আপনার বন্ধুরা সঙ্গে বনের রাজা।  

(পরিশ্রুত পানীয় জল – ২৫০, ৩৭৫, ৭৫০ ও ১০০০ মিলির বোতলে উপলব্ধ)]

 

মণিমালার মৃত্যুটা সুকান্তর বুকে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করে দিল। বহুদিন আগে শরৎ চাটুজ্জের এক মুকুজ্জে হিরোর ধারা অনুসরণ করে, সুকান্ত রোজ সন্ধ্যেবেলা সস্তা বারের এক কোণায় এসে জুটতে লাগলতার সঙ্গী হল গ্রীণ লিওর হাল্কা সবুজ ৭৫০ মিলির বোতল। আগে যাদের সে সযত্নে এড়িয়ে চলত, সেই সেব মদ্যপ বন্ধুরা এখন তার নিত্যসঙ্গী ও প্রাণের দোসর। সারাদিন বাবা-মা, বন্ধুবান্ধবের, আবার বিয়ে করে নতুন সংসার পাতার সদুপদেশে তার কানপাতা দায় হয়ে উঠেছে। তার এই সব ফিরে পাওয়া বন্ধুরা ঠিক তার উল্টো। তার এই প্রেম যে অমর এবং মণিমালা মারা গেলেও, সে যে তার এই অমর প্রেমের নিত্যসঙ্গী হয়ে তার পাশটিতেই থাকবে, এমন নিশ্চিত প্রতিশ্রুতি সুকান্ত পেয়েছিল তার এই বন্ধুদের থেকেইতবে একটু যত্ন করতে হবে। সেটা কি রকম? তার এই প্রেম যেন একটি ছোট্ট চারাগাছ। একে নিত্য গ্রীন লিও সিঞ্চনে, বাড়িয়ে মহীরূহে পরিণত করাই এখন সুকান্তর নিত্যব্রত হওয়া উচিৎ। আর এই ব্রতপালনে তার বন্ধুরা সানন্দে নিত্যসঙ্গী হতে রাজি।

 

মাস ছয়েক পর এক রোববার তার জেঠতুতো বোন আর মা, সুকান্তর ঘুম ভাঙালো একটা মেয়ের ছবি দেখিয়ে। অনেকটা মণিমালার মতো দেখতে। ঘুমভাঙা চোখে তার মন্দ লাগল না। কিন্তু মণিমালাকে সে কী করে ভুলে যাবে? সে মাকে বলল পাষাণী। বোনকে বলল নারদ-বুড়ি, আমাদের দাম্পত্যে ভাঙন ধরাতে এসেছিস? মা আর বোন রাগ করে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল, বিছানায় ফেলে গেল প্রায়-মণিমালার ছবি। ওরা বেরিয়ে যেতে ছবিটা হাতে নিয়ে মন দিয়ে দেখল সুকান্ত। নাঃ, বিয়ে যদি করতেই হয় এই মেয়েকে নয়। এক মণিমালা থাকবে তার বুকের ভেতর, আর বাইরে ঘুরবে আরেক প্রায়-মণিমালা, এ অসম্ভব। ছবি রেখে সুকান্ত উঠে পড়ল।

    

[গল্পের এই অংশটি প্রযোজনা করেছেনঃ-

“সাতপাক.কম”®

 আছে পাত্র পাত্রী শতশত, বেছে নিন ঠিক মনের মতো,

 (বিধবা, বিপত্নীক ও ডিভোর্সি-দের জন্য বিশেষ ছাড়*)

*নামমাত্র বিবাহ ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য ]

 

ব্রেকফাস্ট টেবিলে নারদ-বুড়ি বোন ল্যাপটপে সাতপাক.কম খুলে মেয়ে দেখছিল। সুকান্তকে দেখে রাগে দুমদুম পায়ের শব্দে বের হয়ে গেল ঘর থেকে। ল্যাপটপের পর্দায় একের পর এক সুন্দরীর ছবি আসতে লাগল লাগাতার। আড়চোখে সুকান্ত দেখতে লাগল আর খেতে লাগল। বাটার টোস্ট, কলা, অমলেট আর চাআনমনে অমলেটের আধখানা খেয়ে ফেলার পর সুকান্ত মাকে খুব ধমকাল। মণিমালা মারা যাওয়া্র পর থেকে সে নিরিমিষ খাচ্ছিল, তার নারদ-বুড়ি বোনের কারসাজি এটা, বুঝতে তার বাকি রইল না। বহুদিন পর অমলেটটা তার বেশ লাগল, কিন্তু পুরোটা খেল না, একটুখানি ফেলে রাখল প্লেটে। অমলেট নিয়ে মাকে ধমকানোর সময়, অনেকগুলি মেয়ের ছবি মিস হয়ে গিয়েছিল। সুকান্ত আশে পাশে কেউ নেই দেখে ফটো ফাইলটা রিওয়াইন্ড করে দেখতে দেখতে চায়ে চুমুক দিল। খিক খিক হাসির আওয়াজটা কানে এলেও, ওটা তার মনের ভুল হিসেবে পাত্তাই দিল না।

 

মিলেনিয়াম পার্কে মুক্তামালার হাত ধরে সুকান্ত সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে একটা জুতসই গানের কলি খুঁজছিল। মুক্তামালা জিগ্যেস করল মণিমালাদিকে, তুমি মিস করো না? করতাম, ভীষণ করতাম। তুমি যেদিন থেকে আমার জীবনে ল্যাণ্ড করেছ, তাকে মুক্তি দিয়ে দিলাম। পার্থিব মায়ার বাঁধনে বিদেহী আত্মাকে বেঁধে রাখার কোন মানে হয় না, জানো? শুনেছি, মণিমালাদি হেব্বি সুন্দরী ছিল। কে বলেছে তোমায় জানিনা, তার চোখের দোষ আছে নিশ্চয়ই। তুমি ভাববে তোমায় গ্যাস খাওয়াচ্ছি, কিন্তু বাস্তব হল, তোমার কাছে, সে একদম তুচ্ছ, কাকের পিঠে যেন ময়ুরের পুচ্ছ! আমি যদি বিয়ের পর মরে যাই, রতনমালাকেও এইরকমই বলবে? রতনমালা কে? তোমার পরের বউ। তুমি নাকি সাতপাক.কম থেকে পনের পার্সেন্ট ডিসকাউন্ট পেয়েছ? তোমার আর মণিমালাদির মধ্যে নাকি কোন সম্পর্কই তৈরি হয় নি, মণিমালাদি খুব অসুস্থ ছিল, না? ভীষণ, বিয়ের আগে তো বোঝা যায় নি। বিয়ের পর খালি বলত জ্বর, মাথা ব্যথা, কোমরে ব্যথা। বেচারা খুব রুগ্ন ছিল। ওসব দুঃখের কথা এখন ছাড়ো তো। আমাদের নতুন জীবন নিয়ে, এসো ভাবি। ডিসেম্বরের আঠাশ তারিখ আমাদের বিয়ের দিন ঠিক করছি, ওসময় ছুটি পেতে অসুবিধে হবে না। ওইসময় স্কুল কলেজেও ছুটিই থাকে, তোমার কি মত? আমি জানিনা, আমি বাপিকে গিয়ে বলব, বাপি তোমার সঙ্গে কথা বলে নেবে।

             

[গল্পের এই অংশটি প্রযোজনা করেছেনঃ-

“সদানন্দ ভবন”

 বিবাহ, পৈতা, অন্নপ্রাশন, যে কোন আনন্দ উৎসবের জন্য যোগাযোগ করুন

 (পুনর্বিবাহের ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড়*)

*শর্তাবলী প্রযোজ্য]

     মুক্তামালার বাবা ফোনে কথা বললেন সুকান্তর বাবার সঙ্গে, দিন স্থির হয়ে গেল ওই আঠাশে ডিসেম্বরেই। সুকান্তর বাবা সেদিনই বুক করে দিলেন সদানন্দ ভবন। সুকান্তকে এখন গুণে গুনে ১৮৫টা দিন পার করতে হবে। নারদ-বুড়ি বোনের সঙ্গে সুকান্তর এখন আবার খুব ভাব। সুকান্তর মা তার হাতেই তুলে দিয়েছেন বিয়ের যাবতীয় কেনাকাটার দায়িত্ব। প্রায় প্রত্যেক শনিবারেই বোন, মুক্তামালা আর সুকান্ত রমণীয় বস্ত্র বিপণিতে শাড়ি, জামা কাপড় পছন্দ করতে যাচ্ছে। কনে্র জন্যে আর তত্ত্বের জন্যে কেনা হচ্ছে অনেক শরাবী, হাসিনা আর নটখট। তত্ত্বে দেওয়ার জন্যে টুকটুকির সিন্দুর আর তরল আলতাও অনেক কেনা হলকিছুদিন আগে মোবাইলের সিমকার্ড বদলে সে নতুন নাম্বার নিয়েছে, তার সেই মদ্যপ দোসরদের এড়াতে। একটু খালি হওয়া গ্রীন লিওর ৭৫০ মিলির বোতলটা দিয়ে দিয়েছে জমাদার ঝড়ু সিংকে। বলেছিল টয়লেট সাফ করার ওষুধ। রাত্রে তার বস্তিতে বিবির সঙ্গে ঝগড়া করে সুইসাইড করতে গিয়েছিল ঝড়ু, কিন্তু অনেকটা গ্রীন লিও খেয়েও সে মরে নি। বরং পরের দিন এসে সুকান্তকে বলেছিল ওইসান বোতল আওর চাহিয়ে, বাবু, টয়লেট একদম চকাচক হো যাতা হ্যায়।

 

মুক্তামালার সঙ্গে অনেক ঝগড়াঝাঁটি মানঅভিমানের পর মধুচন্দ্রিমা যাওয়ার লোকেশনও ঠিক হয়ে গেলপটায়াবাসি বিয়ে সেরেই টাটকা হানিমুনে যাওয়ার ডেট ঠিক হল ৪ঠা জানুয়ারি। ওইসময় পটায়ায় ঠাণ্ডা কেমন পরে। কতটা পরে। কলকাতার শীতের মতো, নাকি বেশি। নাকি কম। নাকি একদম না। সেইমতো তৈরি করতে হবে ড্রেস কোড। গুগ্‌ল্‌ খুঁজে পাওয়া গেল অনেক তথ্য। ডিসেম্বর জানুয়ারিতে ম্যাক্সিমাম ২৯ থেকে ৩১ আর মিনিমাম ২২-২৩ ডিগ্রী। মুক্তামালা বলল সেন্টিগ্রেড না ফারেনহাইট? সেন্টিগ্রেড। খুব একটা ঠাণ্ডা নয়, যদি একটু আধটু লাগেও, তুমি তো রয়েছ, মুক্তা। আমি কি করবো? বারে, তুমিই তো করবে। একে তো দেশটা থাইল্যাণ্ড, ওদেশে ল্যান্ড করে কাছে যদি পাই, তোমার থাই। হাত ছাড়িয়ে নিয়ে মুক্তামালা বলল, পিজে, এনজে। মানে? পচা জোক, নোংরা জোক, আনলাইক।   

 

[গল্পের এই অংশটি প্রযোজনা করেছেনঃ-

“ভূরিভোজ”

 বিবাহ, উপনয়ন, অন্নপ্রাশন, শ্রাদ্ধ যে কোন অনুষ্ঠানে সুস্বাদু ডিশের জন্য যোগাযোগ করুন.

আমরা সাউথ ও নর্থ ইণ্ডিয়ান, পাঞ্জাবী, কাশ্মীরি, মোগলাই,

চাইনিজ, মালয়েশিয়া, থাই, ইটালি, মেক্সিকান ডিশের জন্য সবিশেষ প্রসিদ্ধ।

পরীক্ষা প্রার্থনীয়

 (বাঙালী ডিশের জন্য অনুরোধ করিয়া লজ্জা দিবেন না।)]

 

মুক্তামালার সঙ্গে কনসাল্ট করে, সুকান্ত আর তার নারদ-বুড়ি বোন মেনু ঠিক করে ফেলল। কাশ্মীরি আলুর কোপ্তা, আনারসের মেক্সিক্যান স্যালাড, চিকেন পনীর রোল, নান, জিরা রাইস, রুই মাছের ওরেটা আল ফার্নো, পাঁঠার নুইয়া পিং, আলুবোখরার চাটনি, সাবুরপাঁপড়, রসগোল্লা, লেবুর ফালি দেওয়া হাত ধোবার গরম জল, ভ্যানিলা আইসক্রিম, চিনিমোড়া রঙিন মৌরির পাউচ, টুথপিক। বউভাতের নিমন্ত্রিতের দল আধপেটা খেয়ে, গিফটের আবর্জনা ঢেলে দিয়ে সবাই চলে গেল ভূরিভোজের ভূয়সী প্রশংসা করতে করতে। বাড়ির লোকজনরা সবাই মিলে খেতে বসল। সুকান্তর নারদ-বুড়ি বোন আর তার বর ক্যাটারারকে আগেই বলে রেখেছিল, ভাত রুই মাছের কালিয়া আর পাঁঠার কালিয়া ছাড়া কিছুই খেল না। বোন বলল, যাই বলিস তুই দাদা, তোর ওই মালয়েশিয়ান, ইটালিয়ান ডিশের চেয়ে এই বেশ ভালো খেলাম। কেউ কিছু বলল না, লোলুপ দৃষ্টিতে তাদের খাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল অন্য সবাই। 

বউভাতের সব অনুষ্ঠান মিটে যাওয়ার পর মুক্তামালা ফুলসজ্জিত শোবার ঘরে ঢুকেই চালু করে দিল মশ-কিল, মসকুইটো রিপেল্যান্ট। বিছানা থেকে ফুলের পাপড়ি ঝেড়ে ফেলে মশারি টাঙিয়ে নিল চটপট। বিছানার তিনদিকে মশারি গুঁজে নিয়ে, সুকান্তকে ডাকল, খাটে উঠে পড়ো, সাবধানে, একটাও মশা যেন না ঢোকে। বাধ্য ছেলের মতো সুকান্ত মশারির মধ্যে ঢোকার পর বলল, মশ-কিলতো চলছে, মশারি টাঙানোর দরকার ছিল? মুক্তামালা কোন উত্তর দিল না, ঢোকার দিকের মশারি গুঁজে, ভেতরে মুখ উঁচু করে দেখতে লাগল, মশারির মধ্যে কোন মশা ঢুকেছে কিনা। নিশ্চিত হয়ে বলল, প্রথমদিন দেখিয়ে দিলাম, কাল থেকে মশারি গুঁজে মশা চেক করবে তুমি।

[গল্পের এই অংশটি প্রযোজনা করেছেনঃ-

“মশ-কিল”

মশা আর নয় মুশকিল, বাড়িতে আনুন মশ-কিল

আপনার বাড়ি থেকে সারারাত সাতহাত দূরে রাখুন মশাদের

আল্ট্রাপাওয়ার ও সুপারপাওয়ার কোয়ালিটিও উপলব্ধ। ] 

একদল মশা মশ-কিলের গন্ধ সত্ত্বেও আড়চোখে ওটার দিকে তাকাতে তাকাতে, নাক চিপে ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ল। মশারির বাইরে পাঁচ দিক ঘুরেও তারা না পেল কোন ফুটো, না পেল কোন ফাঁক, যেখান দিয়ে ঢুকে পড়া সম্ভব। হয়রান হয়ে আবার জানালা দিয়ে বেরিয়ে জানালার পাল্লায় বসে সকলে দম নিতে লাগল। সবচেয়ে বুড়ি মশাটা তার আবার হাঁপানির টান, বেশ খানিকক্ষণ দম নিয়ে বলল, এই বয়সে এত হয়রানি আর পোষায় না, বাপু। এর জন্যে দায়ী তো আমরাই। সে কি রকম? আজ থেকে প্রায় সতের পুরুষ আগে, আমার এক ঠাকুমার হুলের খোঁচায় এ বাড়ির পেতম বউ ম্যালোরি হয়ে মরে গেছিল, সেই থেকে মানুষগুলো খুব সেয়ানা হয়ে গেছে! লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বুড়ি মশা আবার বলল, মানুষরা বাঁচে বছরে, আর আমরা ঘণ্টায়। চল চল, খিদে পেয়েছে খুব, অন্য কোথাও দেখি। মিহিন পাখনা মেলে উড়ে গেল মশাদের দলটা     

 -*-

এর পরের বড়োদের গল্প - " পরির রূপকথা "

বৃহস্পতিবার, ৩১ জুলাই, ২০২৫

মায়া

 

এর আগের ছোটদের গল্প - " ব্যাঘ্র যখন ব্যগ্র "





প্রায় মাস তিনেক হল, আমার বোন ছুটির একটি মেয়ে হয়েছে জেনেও, ওদের বাড়ি যেতে পারিনি। খুবই খারাপ লাগে। কিন্তু কিছু করারও ছিল না। তার কয়েকদিন আগেই মা ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। তাঁকে নিয়ে হাসপাতাল, ডাক্তার, ওষুধ আর দৌড়োদৌড়িতেই ভীষণ ব্যস্ত ছিলাম। তারপর যা হল, সে তো আরও ভয়ংকর। মা চলেই গেলেন। সে সময়টা যে কী অবস্থার মধ্যে দিয়ে গেছি, ভাবলে এখনও মন খারাপ হয়ে যায়। সব কাজকর্ম, শ্রাদ্ধশান্তি একা হাতেই সামলাতে হল। ওই সময় ছুটি আর আমার ভগ্নীপতি, বিভাস পাশে থাকলে, একটু মনের জোর পেতাম। কিন্তু ছুটির সে সময় আসার উপায় ছিল না। বিভাস একদিন এসেছিল কিন্তু থাকতে পারেনি। সকালে এসে রাত্রের ট্রেনেই ফিরতে হয়েছিল তাকে। ছুটির এই সময়ে, তাকে ছেড়ে বিভাস থাকবেই বা কী করে?

মায়ের অসুস্থতা আর ওই শ্রাদ্ধশান্তির কাজে বেশ কিছুদিন অফিস কামাই হয়েছিল। কাজেই হুট করে আবার ছুটি নিয়ে ছুটির কাছে যাওয়াটা সম্ভব হচ্ছিল না। উপরন্তু পাড়ার বয়স্ক কজন উপদেশ দিলেন, মা হচ্ছেন মহাগুরু। মায়ের মৃত্যু মানে মহাগুরু নিপাত। এই সময় একটু সাবধানে চলাফেরা করা উচিৎ। তাছাড়া এই অবস্থায় সদ্যজাত শিশুর কাছেও যাওয়াটা নাকি উচিৎ নয়। মন থেকে বিশ্বাস না করলেও, একটু ভয়ই পেয়েছিলাম। সে সময়ের মানসিক দুর্বলতার জন্যেই বোধ হয়, মনে হয়েছিল, আমার বোনের বা তার মেয়ের কোন অমঙ্গল যদি সত্যিসত্যিই ঘটে যায়!

আসলে মা যেদিন মারা গেলেন, তার দশদিন পরেই ছুটির মেয়ে হল। বোনের শাশুড়িমা নাতনীর নাম রেখেছেন, টিপ। টিপের জন্মের সময়ে কিছু জটিলতা হওয়ায়, ছুটিও বেশ অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। এখন অনেকটাই সেরে উঠেছে, কিন্তু তাও ট্রেন জার্নির এতটা ধকল নেওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার মচলন্দনগর থেকে জলপাইগুড়ির মোহিতপুর, আসা যাওয়ার ধকলটাও তো নেহাত কম নয়। তাছাড়া আমার  মা-হারা এই একার সংসারে শিশু মেয়েকে সে সামলাবেই বা কী করে? বিভাসের মা খুবই মমতাময়ী মহিলা, তিনি ছুটিকে নিজের মেয়ের মতোই যত্নআত্তি করেন।

যাই হোক ছুটি আর বিভাসের বারবার ডাকাডাকিতে, আমি শেষ অব্দি ওদের বাড়ি যেতে রাজি হলাম। দিন সাতেকের ছুটি নিয়ে রওনা হলাম জলপাইগুড়ি। পাশের বাড়ির কাকিমাকে চাবি দিতে গিয়েছিলাম, আমি ছুটি নিয়ে ছুটির বাড়ি যাচ্ছি শুনে খুব খুশি হলেন না, বললেন, একটা বছর কাটিয়ে গেলে পারতিস। বললাম, ঘুরেই আসি একবার। ছুটি বড্ডো কান্নাকাটি করছে, বারবার বলছে, দাদা একবারটি আয়।  

 

মোহিতপুর বাসস্ট্যাণ্ডে বিভাস আমার জন্যে সাইকেল নিয়ে অপেক্ষা করছিল। বাস থেকে নেমে, আমার ব্যাগটা হ্যান্ডেলে ঝুলিয়ে বিভাসের পিছনের উঠে বসলাম। বিভাস জিগ্যেস করল, “সাইকেলে যেতে পারবি, নাকি রিকশা করবো”? বিভাস আর আমি কলকাতায় একই কলেজে পড়তাম। খুবই ভালো বন্ধু, তারপর তো ছুটির সঙ্গে ওর বিয়ে হল। আমি একটু হেসে বললাম, “তোর ঘাড়ে চেপে যাওয়ার মজাই আলাদা, সাইকেল ছেড়ে রিকশায় চড়তে যাবো কোন দুঃখে?” কথা না বাড়িয়ে বিভাস সাইকেল চালু করল, আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কাল রাত্রে বলছিলি, টিপের গাটা একটু গরম গরম লাগছে, জ্বর-টর আসেনি তো?”

“নাঃ জ্বর-টর নয়। কিন্তু মেয়েটা কাল প্রায় সারারাতই ঘুমোয়নি। বারবার আমার নয়তো ছুটির ফোনটা হাতে নিয়ে কী যে বলতে চাইছিল বুঝলাম না। একটু হয়তো শুল, আমরাও শুলাম। আধঘন্টা না যেতেই উঠে পড়ে, আমাকে নয় ওর মাকে থাবড়া দিয়ে জাগিয়ে ফোন দেখায়”।

“ফোনে কোন গেম-টেম বা সিনেমা দেখে ভালো লেগেছে হয়তো, বারবার দেখতে চাইছে। আজকাল বাচ্চাদের ফোনের ওপর খুব ঝোঁক”।

“না রে, আমরাও তাই ভেবেছিলাম। খাবার সময় ওকে ভোলানোর জন্যে কয়েকটা গানের ভিডিও দেখান হয়, সেগুলো দেখিয়ে শান্ত করতে গিয়েছিলাম। কিন্তু দেখেইনি, বরং বিরক্ত হচ্ছিল খুব...অন্য কিছু করতে বলছিল, সেটা কী, বুঝতে বুঝতেই রাত কাবার হয়ে গেল।”

“বাব্বা, একরত্তি মেয়ের এত কৌতূহল?” কিছুক্ষণ আমরা কেউ কথা বললাম না। বিভাস সাইকেল চালাতে লাগল। কেন জানি না আমার মনে হল, বিভাস সাইকেলটা খুব আস্তে চালাচ্ছে, এখনই একদৌড়ে গিয়ে মেয়েটাকে বুকের মধ্যে নিয়ে খুব আদর করতে ইচ্ছে হচ্ছিল। বিভাস বড়ো রাস্তা থেকে বাঁদিকের ছোট ঢালু রাস্তায় নামতে নামতে বলল, “আমার মনে হচ্ছে, তোর আসার অপেক্ষাতেই ও এত ছটফট করছে!”

 “যাঃ। আমাকে তো দেখেইনি। চেনেই না। তাছাড়া তিনমাসের একটা শিশু, মামা কী বস্তু, খায় না মাথায় মাখে বুঝতে পারে নাকি?”

“তা ঠিক। কিন্তু যেদিন থেকে আমাদের এখানে তুই আসছিস, এ কথা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, সেদিন থেকেই ও যেন খুব চঞ্চল হয়ে উঠেছে”।

“তাই?”

“হুঁ। কাল মনে হয়নি। এখন মনে হচ্ছে, মেয়েটা গতকাল ফোনে হয়তো তোর সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলছিল। কদ্দূর এলি, ট্রেন লেট কী না, ট্রেনে খাওয়াদাওয়া কী করলি...এসব জানার কৌতূহল হচ্ছিল হয়তো!”

“কী বলছিস? এমন হতে পারে নাকি?”

“জানি না, মনে হল, তাই বললাম। হতেও তো পারে”!

আমারও টিপ বলে ছোট্ট একরত্তি ওই মেয়েটাকে দেখার জন্যে মনটা ভীষণ উদ্গ্রীব হয়ে উঠেছে।

 কিছুটা দূর থেকেই ওদের দেখতে পেলাম। বিভাসের মা, ছুটি আর ছুটির কোলে ছোট্ট টিপ। গ্রিল-গেটের বাইরেই ওঁরা দাঁড়িয়েছিলেন। বিভাস সাইকেল নিয়ে সামনে দাঁড়াতেই, বিভাসের মা বললেন, “ওফ্‌, মেয়ে বটে; অচেনা অদেখা মামাকে দেখার জন্যে কী ছটফটই না করছে! ঘরে থাকতে দিচ্ছে না”।

ছুটি মিষ্টি হেসে বলল, “আয়। ভাল আছিস, দাদা”?

আমি সাইকেল থেকে নেমে মাসিমা, বিভাসের মাকে প্রণাম করলাম। ছুটির কোল থেকে টিপ হাত বাড়াল আমার কাছে আসবে বলে। ওকে কোলে নিতে ইচ্ছে হচ্ছিল খুব, কিন্তু ভয়ও পাচ্ছিলাম। সারারাতের ট্রেন জার্নি, তারপরে ভোরবেলার বাসে এতটা এলাম! সারা গায়ে – জামাকাপড়ে ধুলোময়লার তো অন্ত নেই। এই অবস্থায় শিশুকে কোলে নেওয়া মোটেই উচিৎ নয়।

আমি টিপকে বললাম, “একটু দাঁড়াও মা, জামাকাপড় ছেড়ে, মুখহাত ধুয়ে তোমায় কোলে নেব। বিচ্ছিরি ধুলো আর নোংরা সারা গায়ে”।

বিভাসের মা বললেন, “ঠিক বলেছ বাবা, আমি বলি কি, গরম জলে চানটাও সেরে নাও, স্বস্তি পাবে। এতটা পথ জার্নি করে এলে। চলো চলো, ঘরে চলো”

আমরা সবাই বাড়িতে ঢুকলাম, বিভাস সাইকেলে আমার ব্যাগটা নিয়ে পেছনে আসতে লাগল।

 স্নান সেরে এসে পরিষ্কার পাজামা পাঞ্জাবি পরেই আমি ডাক দিলাম, “কই রে, আমার টিপ সোনা কই?” ছুটি টিপকে কোলে নিয়ে সামনে এলো, বলল, “ওফ্‌, মেয়ে সেই থেকে বাথরুমের দরজার দিকে তাকিয়ে আছে...কখন তুই বেরোবি। এ রাম, চুল আঁচড়ালি না?” চুল আঁচড়ানোর কথা আমার মনেই ছিল না, আসলে আমিও টিপকে কোলে নিতে চাইছিলাম, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।

চুলের ওপর হাত বুলিয়ে বললাম, “ঠিক আছে। কে আর দেখবে এখানে, তোরাই তো। এচো, এচো, ছোনা মাটা...” বলে হাত বাড়িয়ে খুব সাবধানে আমি টিপকে কোলে নিলাম। টিপও উদ্গ্রীব ছিল, টুক করে কোলে এসে, আমার গলা জড়িয়ে ধরল। ছুটি হেসে বলল, “বাবাঃ, মায়ের চেয়েও মামা বেশি আদরের...টিপকে নিয়ে তুই বোস, দাদা, আমি তোর জলখাবার আনছি। মা, লুচি আর বেগুন ভাজছেন”।

আমি টিপকে দুহাতে বুকে জড়িয়ে নিয়ে বললাম, “তাই যা। আমি ততক্ষণ টিপের সঙ্গে একটু ভাব করি”।

টিপকে কোলে নিয়ে আমি বাইরের বারান্দায় এলাম। এতক্ষণ টিপ আমার গলা জড়িয়ে কাঁধে মুখ রেখেছিল, এবার সে গলা ছেড়ে আমার মুখের দিকে তাকাল। তার দু চোখের দিকে তাকিয়ে আমার অদ্ভূত এক অনুভূতি হল। হাল্কা নীলচে সাদা টলটলে চোখের মধ্যে ঘন কালো চোখের তারা, আমার দিকেই তাকিয়ে আছে। কী দেখছে? কী খুঁজছে আমার মুখে?

“এত দিন লাগল তোর এখানে আসতে? ছুটি পাসনি, না? এমন আর কক্‌খনো করিস না...”।

কে বলল কথাটা? আশেপাশে ঘাড় ঘোরালাম। কেউ কোত্থাও নেই। সামনের ঘাসে আর গাছের ডালে কিছু চড়ুই, শালিক, ঘুঘু আর কাক ওড়াওড়ি করছে। আমার ঘাড় থেকে শিরশিরে একটা অনুভূতি পিঠের দিকে নামতে লাগল। এই কণ্ঠস্বর আমার খুবই পরিচিত। ভীষণ পরিচিত। হাজার লোকের কণ্ঠস্বরের মধ্যেও এই স্বর আমি ঠিক চিনে ফেলতে পারি! আমি টিপের মুখের দিকে আবার তাকালাম। আগের মতোই সে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। তার পবিত্র পাতলা রাঙা দুই ঠোঁটে এখন মুচকি হাসি।

“এমন কক্‌খনো করিস না আর, তোকে দেখতে যে, বড্ডো ইচ্ছে করে, বাবা। ছুটি-ছাটা পেলেই চলে আসবি, কেমন?”

আমি তাকিয়ে রইলাম শিশুর চোখের দিকে। টিপ কথাগুলো বলেনি। তাঁর দুই ঠোঁট এতটুকুও নড়েনি। কিন্তু আমার চেতনায় কথাগুলো বেজে উঠল। কীভাবে জানি না। এখন টিপ তার দুই হাত বাড়িয়ে মোচার ছোট্টছোট্ট কলির মতো আঙুলগুলি রাখল আমার গালে, কপালে।

আমার দুই চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে এল, আমি অস্ফুট স্বরে বলে উঠলাম, “মা”!

টিপ ফোকলা মুখে ছোট্ট ছোট্ট হাত চাপা দিয়ে হেসে উঠল খিলখিল করে, অপূর্ব স্বর্গীয় সেই হাসি। আমি বুকের মধ্যে চেপে ধরলাম টিপকে। “চিনতে পেরেছিস তাহলে?” কথাটা স্পষ্ট শুনলাম, আর শুনে আমার দু চোখ ঝাপসা করে নেমে এল অশ্রুধারা!

..০০..

   এর পরের ছোটদের গল্প - " ছোট্ট হওয়া "

বুধবার, ৩০ জুলাই, ২০২৫

ভেন্টিলেশান

 এর আগের বড়োদের গল্প - " বুনো ওল "






[বিছানায় টানটান শুয়ে ঠ্যাং নাচাচ্ছিল পৈলান, পৈলান মণ্ডলঘাড়ের নিচে ভাঁজ করা হাত। বেশ হাল্কাপুল্কা মেজাজ। এখন সবে ভোর। আরেকটু বেলা হলেই লোকজন আসা শুরু হবে। সঠিক কতদিন তা মনে নেই, তবে অনেকদিন কেটে গেল বিছানায় শুয়ে। আজকে একটু বেরোবে ভাবছে। নিঃশব্দে দরজা ঠেলে যে ঢুকল, সে বেঁটেখাটো, লাল্টুস দেখতে একজন। তার নাম হুহু!]

 

হুহুঃ               সুপ্রভাত! আপনার ঘুম ভেঙে গেছে, দেখছি! তাহলে একটু চা দিয়ে যাই, প্রভু’?

পৈলানঃ           সুপ্পোভাত? এখানে গুডমন্নিং বলার রেওয়াজ নেই নাকি হে? তার ওপর আবার পোভু? এমন তো শুনি নাই কভু? হা হা হা হা। বলি যাত্রা-পালা হচ্ছে নাকি বলো তো, পৌরাণিক পালার রিহার্শল করছো? আমি বাপু, ওসব একদম পছন্দ করি না। আমি খাঁটি বাঙালি, বাংলা মায়ের দামাল ছেলে। আমি গুডমন্নিং, স্যার, এই সব শুনতেই অভ্যস্ত। ওই সব আলফাল বকে আমার মেজাজ খিচড়ে দিও না, বুঝলে?

হুহুঃ               আজ্ঞে হ্যাঁ, প্রভু...ইয়ে মানে, স্যার। আর ভুল হবে না। আজ্ঞে, এখানে নতুন নতুন তো, সড়গড় হতে একটু সময় লাগবে বৈকি। তবে স্যার, ওই যে বলছিলাম, চা দেবো, না কফি দেবো, স্যার?

পৈলানঃ           চা-ই দাও। সকাল সকাল কফিটা তেমন জমে না। আমার চাটা কেমন হয় জানো তো? চিনি ছাড়া, হাল্কা লিকার, মিষ্টির বড়ি - দুটো

হুহুঃ               লিকার চায়ে মিষ্টির বড়ি? তাহলে একটা কথা জিগ্যেস করি, স্যার? আপনি লিকার চা কী ভালোবেসে খান? নাকি নাচার হয়ে খান?

পৈলানঃ           চিনি ছাড়া লিকার চা শখ করে, কে খায় চাঁদ? সাড়ে চারশোর ওপর সুগার, তার ওপর বুকজ্বলা অম্বল। বাধ্য হয়ে খাই। তিন চামচ চিনি, ঘন দুধের সর জমে ওঠা চা। তবে না চা খেয়ে আরাম, চা খেয়ে মজা!

হুহুঃ               সে আর বলতে, স্যার? কিন্তু এখানে স্যার নো সুগার, নো অম্বল। এক কাপ নিয়ে আসছি খেয়ে দেখুন, স্যার। এখানকার সুগারে সুগার হয় না। এখানকার চায়ে চাইলেও চোঁয়া ঢেঁকুর কিংবা অম্বল হয় না।

পৈলানঃ        গ্রান্টিক দিচ্ছ? তবে হলেই বা, আমার আর কী হবে? তোমারই ভোগান্তি হবে। ডাক্তারবাবুকে বলে তোমার চাকরিটা খাবো। তেমন তেমন হলে জেলেও ভরে দেব। বিনা বিচারে সতের বছর। আমাকে বিভভান্ত করার চেষ্টা এবং আমাকে হোত্তা করা চক্কান্ত..., এমন কেস খাওয়াবো না, টের পেয়ে যাবে বাছাধন!

হুহুঃ               [হেসে] না স্যার। গ্যারান্টি। একবার তো ট্রাই করে দেখুন। [দরজার দিকে ফিরতে যায়]

পৈলানঃ           ওহে, শোনো হে, শোনো। হন হন করে তো চললে, বলি নামটা কী তোমার? কী বলে ডাকব?

হুহুঃ               হে হে, স্যার। আমার নাম? আমার নাম শুনে হাসবেন, স্যার।

পৈলানঃ            হে হে...  সে না হয় হাসলামই, কিন্তু নামটা কী শুনিই না।

হুহুঃ               হুহু, স্যার। হুহু গন্ধর্ব

পৈলানঃ          [ভুরু কুঁচকে] হুহু? বেশ বেআক্কেলে নামটা তো, হে! বাঙালি যে নও, সে তো বুঝতেই পারছি। ইউপি না বিহার, নাকি তেলেগু? তা এখানে জুটলে কোত্থেকে?

হুহুঃ               আমরা বহিরাগত নই, স্যার! এইখানেই আমাদের বরাবরের বাসবহুদিনের।

পৈলানঃ        তবে যে একটু আগে বললে, এখানে নতুন নতুন, সড়গড় হতে সময় লাগবে! তোমার রকম সকম আমার একটুও ভাল ঠেকছে না, হে। তোমার ওপর আমার নজর থাকবে, এই বলে দিলাম। এখন যাও, চাটা নিয়ে এসো, তারপর তোমার হচ্ছে...তোমার ওই গন্ধটাও ধরবো।

হুহুঃ               হে হে, গন্ধ নয় স্যার, গন্ধর্ব। [হুহু হাসতে হাসতে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে]

 

[পৈলান বিছানা থেকে নেমে মেঝেয় দাঁড়ালনিজেকে খুব হাল্কা মনে হচ্ছে তার, যেন কোন ভার নেই! ফাঁকা ঘরে কিছুটা নেচেও নিল আপন মনেতার এই হুমদো চেহারাটার জন্যে গত বছর তিরিশেক নানান অসুবিধে হচ্ছিল, কিন্তু এখন আর সে সব নেই। নিজেকে বিশ-বাইশ বছরের ছোকরা মনে হচ্ছে। ঘরের মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে দেওয়ালে টোকা মেরে...]

পৈলানঃ         এ ঘরের দেওয়ালগুলো কাচের, নাকি পেলাস্টিকের, কে জানে! একটাও জানালা নেই। বাইরের কিছুই দেখা যাচ্ছে না। বাইরে কি কুয়াশা হয়েচে, নাকি মেঘ করেচে? সুজ্যি ওঠার নাম নেই। সেই থেকে মনে হচ্ছে যেন ভোর। মেঘে মেঘে বেলা কত হল কে জানে? এ ঘরে, ব্যাটারা একটা ঘড়িও দেয়নি। ওই গন্ধধরবো নাকি, ব্যাটাকে বলতে হবে একটা ঘড়ি দিতে। আরেকটা...আরেকটা কি যেন, হ্যাঁ মনে পড়েছে, ফোন, ইন্টারকম। না, না ইন্টারকম নয় কলিংবেল হলেই ভালো। বেলটা হাতের কাছে রেখে দিলেই ল্যাঠা চুকে যাবে। বারবার উঠে ফোন ডায়াল করতে হবেনা। তবে ব্যাটাদের ঘরদোর, বিছানাপত্র বেশ ভালোই। বেশ একটা ঠাণ্ডাঠাণ্ডা ভাব আছে। দেওয়ালে ইস্প্লিট কিংবা কোন এসি দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু...অ, বুঝেছি, এখানে সেন্টাল এসি। শালা সবকিছুই কেন্দ - সেন্টালের হাতে!  

                   [হুহু হাতে ট্রের ওপর চায়ের কাপ নিয়ে ঢুকল]

                   অ্যাই। শোনো হে, তোমাকে কটা কথা বলবো বলেই ভাবছিলাম। ঘরে একটা ঘড়ি রাখোনি কেন বলতো? এটাও কী আমাকে বলে দিতে হবে? তোমার ম্যানেজার কে আছে? ডেকে দিও তো। আর ওই সঙ্গে একটা কলিং বেলও যেন ব্যবস্থা করে। আশ্চর্য। এতটুকু সাধারণ কমন সেন্স যদি থাকে!  আর এই ঘরটাতে জানালা নেই কেন, হে? বাইরের আলো হাওয়া একটু পাওয়া যেত। 

হুহুঃ               আজ্ঞে স্যার এই যে আপনার চা, একটু চুমুক দিয়ে দেখুন তো। মনোমত হল কিনা?

[চায়ের কাপ হাতে নিয়ে সুড়ুৎ শব্দে লম্বা চুমুক দিয়ে]

পৈলানঃ           আঃ। বেড়ে হয়েছে চাটা। মাইরি। মনে হচ্ছে সেই ইয়ং বয়সে যেমন খেতাম আর কি। যেমন মিঠে, তেমনি কড়া লিকারে ঘন দুধ। না তোমাকে যতটা অকম্মা মনে হচ্ছিল, ততটা নও। কিন্তু সেই সুগার আর অম্বলের ব্যাপারটা কিন্তু আমি ভুলছি না, মনে রেখো।

হুহুঃ                ওসব, একদম ভুলে যাবেন স্যার। কোনদিন যে ছিল এমন মনেও হবে না।

পৈলানঃ           বাইরে কি, কুয়াশা করে আছে? নাকি মেঘলা? সেই থেকে সুজ্যি দেখা যাচ্ছে না কেন?

হুহুঃ               আজ্ঞে স্যার, এখানে সবসময় এরকমই – ভোরের আলোর মতো। রোদ্দুরের ধাঁধানো আলোও হয় না, আবার অমবস্যার মিশমিশে অন্ধকারও হয় না।

পৈলানঃ          অ, সব চাইনিজ এলইডি মাল- বুজে গেছি, আমাকে আর বোকা বুঝিও না হে, তোমার চালবাজির কথায় আমি ভুলছি না। ম্যানেজারকে বলে এক্ষুনি একটা ঘড়ি, ওই সঙ্গে ক্যালেন্ডার আমার চাই। আজকে কত তারিখ আর এখন কটা বাজছে, বলো দেখি।

হুহুঃ               আজ্ঞে, এখানে ঘড়ি পাওয়া যায় না, স্যার। ক্যালেণ্ডারও না। এখানে কেউ সময়ও মাপে না, কারো মেয়াদও ফুরোয় না, স্যার। এখানে আসতেই যা কষ্ট, তারপরেই ব্যস - হয়ে গেল। সময় থমকে যায়!

পৈলানঃ          [ভুরু কুঁচকে ধমকের সুরে] কোথায় এসেছি আমি? কিসের কী হয়ে গেল? কী সব আবোলতাবোল বকছো বলো তো?

হুহুঃ               মানে স্যার, ব্যাপারটা চট করে বুঝে ওঠা ভারি শক্ত। নতুন নতুন তো, কদিন থাকুন, ধীরে ধীরে সবই বুঝে যাবেন। এখানে এলে সবাই অনাদি আর অনন্ত হয়ে যায়

পৈলানঃ          [খুব রেগে। আঙুল তুলে] অ্যাই শালা, অনাদি, অনন্তর নাম তুলে আমাকে ভয় দেখাচ্ছিস? ওদের সব খবর আমি জানতাম বলেই, ওদের দুটোরই আমি খবর লিয়ে লিয়েচিলাম, হ্যাঁ[একটু থেমে] অ, তাই বল, এইবার বুঝেচি, তোরা সব শালা কোন দলের লোক। কিন্তু ভালো কথা বলচি শোন, আমাকে একদম ঘাঁটাস না। সেই থেকে আমাকে তাপ্পি মারচিস? শালা, তোরা আমায় কিডন্যাপ করে এনেচিস, না? [চাটা শেষ করে, হুহুর হাতে খালি কাপটা ধরিয়ে দিল]

হুহুঃ               ব্রেকফাস্টে কী খাবেন, স্যার? মাংসের হালকা ঝোল আর মাংসেরপুর দেওয়া পাঁউরুটি টোস্ট, দিই?

পৈলানঃ           সোজা কথার উত্তর দিবি না, না? তুই খুব হারামি, জানিস তো? সাত হারামির এক হারামি বললেও কম বলা হয়। তোর নামটা বললি গানধরবো! তখন বুঝিনি, আমিও শ্লা টিউবলাইট মেরে গেচি, এখন বুঝছি তুই পাক্কা টেররিস্ট। শুরুর থেকেই তুই আমাকে, গান ধরবো, গান ধরবো করে থেট করচিস, বন্দুক ধরবি? ভেবেছিস আমি গেঁড়ে ভোঁৎনা? ভয় দেখালেই সিঁটিয়ে কাদা? এখন আবার মাংসের ইস্টু, সেন্ডউইচ টুচ খাইয়ে আমার মন ভুলোতে চাচ্চিস? আমার পছন্দ-অপছন্দ সবই তোদের খবরে আছে, কেমন?

হুহুঃ               আপনি খুব বিচলিত হয়ে উঠছেন, স্যার। সবার সব খবরই, আমাদের রাখতে হয়, সেটাই আমাদের কাজ স্যার। যে যেমন কাজ করে, সে তেমনই ফল পায়, এ নিয়ম স্যার, আমাদেরও, আপনাদেরও। বিচলিত হবেন না স্যার। খাবারের সঙ্গে এবার কফি এনে দিই স্যার? আরাম করে খান।

পৈলানঃ           [ভুরু কুঁচকে] অ্যাই, বিচলিত আবার কী রে? তোকে আগেই বললাম না, বাংলায় বল।

হুহুঃ               হে হে। বিচলিত-র বাংলা টেনসান, স্যার।

পৈলানঃ        টেনসান? অ তাই বল। অ্যাঁ কী বললি, টেনসান? শালা তুই আমাকে টেনসান শেখাচ্চিস? আমার মোবাইলটা কোতায়? আমার মোওওবাইলটা কোতায়? ওটা আমাকে একবার দে, তারপর তোদের কেমন টেনসনে দৌড় করাই দেখ। আমার ছেলেরা একবার খবর পেলে না? তোদের হাঁড়ির হাল করে ছাড়বে জেনে রেখে দে।

হুহুঃ               আপনার খাবারটা আমি নিয়ে আসি, স্যার। আরাম করে খানখেতে খেতে না হয় আপনার কথার উত্তর দেওয়া যাবে। [হুহু বেরিয়ে গেল]

পৈলানঃ          [চিন্তিত মুখে, পায়চারি করতে করতে] ছিলাম তো শালা কলকাতার সেরা নাস্সিং‌ হোমে। কতদিন ছিলাম, সে তো মনেও নেই ছাতা। কখন ঘুমোতাম, কখন জাগতাম কে জানে। মাঝে মাঝে চোখ মেলে দেখতাম মাথার ওপর সিলিংয়ের ফুটোয় লুকোনো মিটমিটে আলো। বিছানায় শুয়ে আচি বুঝতে পারতাম। আড়ষ্ট ঘাড় ঘুরিয়ে দেখার ক্ষমতাও ছিল না। তবে সারা গায়ে, নাকে, মুখে গুচ্ছের নল লাগানো ছিল দেখতাম। ডানপাশের দেওয়ালে একটা টিভির মতো নীল পর্দার বাস্কো! বাস্কো নয়, বাস্কো নয়, কি যেন বলে, হ্যাঁ মনে পড়েচে মনিটর মনিটর। স্কুলে ন বছর পড়েছিলাম, সব কেলাসে আমিই মনিটর হতাম। মনিটর মানেই মাতব্বর। মাতব্বরি ব্যাপারটা আমার জন্ম থেকেই। সেই ভাঙিয়েই তো এত ক্ষমতা আর দাপট। আমার নাম শুনলে, পোয়াতি মেয়েদের গবভোপাত হয়ে যায়। মায়ের কোলে ঘুমকাতুরে খোকারা ডুকরে কেঁদে ওঠে। বিরোধী দলের নেতাদের ধুতি হলুদ হয়ে কেচ্ছা কেলেংকারি হয়। কিন্তু এ ব্যাটারা কারা? কোন দলের? আমাকে তুলে এনেছে বুঝতে পারচিকিন্তু কী চায় কি আমার থেকে! দু-চার পেটি হলে, তেমন পবলেম নেই। সে আমার ঘরেই গোয়ালের মাচায় রাখা আচে। কিন্তু না হলে? এ জায়গাটা কোথায়? এখান থেকে বেরোনোর উপায় কী? তবে হ্যাঁ, একবার বেরোতে পারলে, শালাদের গুষ্টির ষষ্টিপুজো যদি না করে ছাড়ি তো আমার নাম পৈলেন নয়। ওই গান ধরবোটা এবার এলেই, একটু ধাতানি দিয়ে কথা বলতে হবে। আমার ধাতানি হজম করার লোক এ তল্লাটে তেমন আর কই?

[ট্রে হাতে হুহু ঢুকল। প্লেটে স্যাণ্ডউইচ টোস্ট, বোওলে মাংসের স্টু আর কাপে গরম কফি]

হুহুঃ               একদম গরম গরম খেয়ে নিন, স্যার।

পৈলানঃ           হুঁ। তেমন খিদে মনে হচ্চিল না, কিন্তু গন্ধটা হেবি ছেড়েচে, তাতেই কেমন যেন খিদেটা চনমনে হয়ে উঠেচেতোদের পেটের মধ্যে কী মতলবটা আচে বুঝতে পারচি না, তবে ভয় পেয়ে আমি পেটে না খেয়ে দুব্বল হবো, এমন আহাম্মক আমায় ভাবিসনি, রে!

                   [স্যাণ্ডউইচে কামড় দিয়ে, এক চামচ সুপ নিল]

                   বাঃ। রান্নাবান্না তো ভালই তোদের ক্যান্টিনে। তা তোদের মতলবটা কী খুলে বলবি? আমাকে এখানে এনে বন্দী রেখে তোদের লাভটা কী হবে? এই এত দামি ঘর, এই রকম খাওয়া দাওয়া...তোদের বস কে আচে? তাকে বল না, এসব ভাঁটের খরচা আর সময় নষ্ট না করে, সামনে এসে ঝেড়ে কাশতে!

হুহুঃ               না, না, আপনাকে বন্দী রাখা হয়েচে, এ আপনার ভ্রান্ত ধারণা স্যার! আপনি তো বন্দী নন। আপনি মুক্ত হয়েই তো এখানে এসেছেন! বরং এতদিন যেখানে ছিলেন, সেখানেই আপনি বন্দী ছিলেন!

পৈলানঃ           এখানে বন্দী নই? এই ঘরের বাইরে, যেখানে খুশি আমি যেতে পারি? কী ফালতো বকচিস মাইরি।

হুহুঃ              হ্যাঁ স্যার। যেখানে খুশি আপনি যেতে পারেন। কোন বাধা নেই। তবে এই লোকে পনের দিনের মেয়াদ, তার পরে অন্য লোক।

পৈলানঃ           অ তোর ওই সময় ডিউটি চেঞ্জ হয়ে যাবে বুঝি? অন্য লোক আসবে? তবে পনের দিন তো অনেক দিন রে? তার আগেই আমি চলে যাবো। আচ্ছা, আমি যদি বন্দী না হই, তাহলে আমার মোবাইলটা দিচ্চিস না কেন?

হুহুঃ             এখানে ওটার কাজ কী, স্যার? টালির টুকরো। এখানে নেট ওয়ার্ক নেই, মোবাইল থাকা না থাকা সমান।

পৈলানঃ           এ জায়গাটা কলকাতা থেকে অনেক দূরে?

হুহুঃ               তা স্যার, বেশ খানিকটা দূরেই।

পৈলানঃ           [মুখ ভেংচে] বেশ খানিকটা দূরে, আবে কতটা দূরে বল না?  হতভাগা, আমাকে বন্দী করেই যদি না রাখবি, তাহলে কলকাতা ছেড়ে এখানে নিয়ে এলি কী করতে?

হুহুঃ               আজ্ঞে মুক্তি পেলে এখানেই আসতে হয় প্রথমে, তারপর অন্য লোকে। হে হে, আপনি এতদিন যে ফাঁদে বন্দী ছিলেন, তারপরে আপনাকে কে আবার বন্দী করবে?

পৈলানঃ         আমি বন্দী ছিলাম? হারামজাদা, এমন দেব না কানের গোড়ায়। আমাকে বন্দী করতে পারে এমন কারো ক্ষমতা ছিল বাংলায়?

হুহুঃ               হে হে ছিলেন বৈকি, স্যার। সে এমনই বন্দী, বুঝতেও পারেননি। এই এখন যেমন বুঝতে পারছেন না, যে আপনি মুক্ত। আর আপনি স্যার এখন বাংলাতেও আর নেই।

পৈলানঃ           (চমকে) বাংলাতেও নেই মানে? আমি তাহলে এখন কোথায়? বিহার, ইউপি না দিল্লিতে? কী ভজকট বকচিস মাইরি!

হুহুঃ               ওসব নয়, ওসব নয়, হে হে এ একেবারে অন্যলোকের জায়গা। তবে এ লোকে সবাইকেই একবার আসতেই হয়। 

পৈলানঃ           হতভাগা জেনে রাখ, অন্যলোকের এলাকাতে আমি একলা যাই না। আমার সঙ্গে সাঙ্গপাঙ্গ থাকে, তাদের হাতে দানা থাকে, নারকেল থাকে। বলা নেই কওয়া নেই, অন্য লোকের এলাকায় এনেচিস কেন বে, আঁটকুড়ির ব্যাটা?

হুহুঃ             আপনি স্যার, সেই থেকে অনেক আকথা কুকথা বলছেন, সেটা না বললেই ভালো, স্যার। আমি আপনার নাড়ি নক্ষত্র, হাঁড়ির খবর সব জানি, কিন্তু আপনি আমার কিছুই জানেন না। কার মধ্যে কী লুকিয়ে আছে কে জানে, স্যার? আর কী কথায় কখন কী ঘটে যায়, কে বলতে পারে? এখানে আবার সব কথার এবং কাজের হিসেবও রাখা হয়, সেটাই মুশকিল।

পৈলানঃ           (সুড়ুৎ সুড়ুৎ করে স্যুপ খেতে খেতে) (জনান্তিকে) ব্যাটাকে অ্যাত হড়কাচ্চি, তাও হেব্বি ক্যাজুয়াল রয়েছে কিন্তু। উলটে মাঝে মাঝে, আমাকেই দেখচি কচি করে হড়কে দিচ্চে হারামীটার পেছনে বেশ লম্বা হাত আচে বোঝা যাচ্চেহয়তো সিবিআই, ইডি। বুঝেচি, এ শালা নিগ্‌ঘাৎ কেন্দের চক্কান্ত। যাই হোক মাথা গরম করে লাভ হবে না মনে হচ্চেব্যাটাকে অন্য ভাবে ম্যানেজ করা যায় কিন দেখি।

                   (স্যুপ স্যাণ্ডউইচ শেষ, এবার কফির কাপে চুমুক দিয়ে) (প্রকাশ্যে) তা বাপু, তোমার ওপর যতোই রাগটাগ করি না কেন, একটা কথা মানতেই হবে, রান্নার হাতটা খাসা। কিসের মাংস ঠিক বুঝলাম না, তবে খুব তার হয়েচে রান্নায়! কোথাকার ঠাকুর হে? আর মাংসটাই বা কিসের?

হুহুঃ               ঠাকুর বলে এখানে কেউ নেই, রান্নাটান্নাও করতে হয় না, স্যার। যে যেমন কর্ম করে, তার মনোমত ঠিকঠাক জিনিষ এখানে তৈরি হয়েই থাকে।

পৈলানঃ           এতো বেশ বেড়ে জায়গা মাইরি। এর পর যেন বলে বসো না, যে এর জন্যে কোন খরচাও হয় না!

হুহুঃ             হে হে, স্যার ঠিকই ধরেছেন, সত্যিই কোন খরচা নেই। সারা জীবনের লুঠপাট, চুরিচামারি করে জমানো পয়সায় ছ্যাদলা ধরে। তারপর সাত ভূতে কামড়াকামড়ি করে সে পয়সার ষষ্ঠীপুজো করে।

পৈলানঃ           তা ঠিক, তবু মন তো মানে না। পোথম পোথম তোমার ওপর একটু বিরক্ত হয়েচিলাম ঠিকই, এখন দেখচি তোমার মধ্যে অনেক গুণ আচে হে। আর পৈলেন মণ্ডল গুণের কদর জানে। ঐ যে অনন্ত, ব্যাটার অনেক গুণ ছিল, খালপাড়ের বস্তি থেকে একদিন ভোরবেলা ফেরার সময় ওকে দেখেছিলাম। আর দেখেই বুঝেছিলাম ওর ভেতরে মাল আচেতুলে এনে সঙ্গে রাখলাম কদিন। ঝট করে তৈরি হয়ে গেল, জান?

হুহুঃ               হে হে, সে আপনার হাত যশ।

পৈলানঃ           সেই অনন্ত, আস্তাকুঁড় থেকে তুলে এনে, দু বছরে রাজার ব্যাটা কেরাসিনওয়ালা বানিয়ে দিলাম! আর সেই কিনা এলো আমার পেছনে কাটি করতে? এমন বিশ্বেসঘাতক! দিলেম শালাকে টপকে।

হুহুঃ               জানি, স্যার।

পৈলানঃ           আর ওই অনাদি? আমার বিরোধী দলে ছিল, ওখানে ব্যাটাকে ল্যাজেগোবরে অবস্থা করে ছেড়েছিল। যে কোনদিন লাশ হয়ে ভুরভুরি কাটত পোড়ো সেপটিক ট্যাংকে। একদিন মাঝ রাত্রে ধড়াস করে পায়ে এসে পড়ল, পলুদা বাঁচাও। আমার চোখের কোলটা কেমন যেন ঝাপসা হয়ে উঠল।

হুহুঃ               হে হে, সে আর বলতে? আপনার দয়ার শরীর।

পৈলানঃ         আরে তা নয়, তা নয়। পেটে জল পড়লে আমার মনটা কেমন যেন মাখো মাখো হয়ে যায়। সেই অনাদি অনন্তর সঙ্গে ভিড়ে ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাবার ছক কষছিল। দিলাম শালার ঘন্টা বাজিয়ে।

হুহুঃ               হে হে, আপনিই তো শেষ বিচারের মালিক। এই তুলছেন, এই খালাস করছেন।

পৈলানঃ         ছেঁদো গ্যাস দিয়ে লাভ নেই, গন্ধকাজের কথাটা শোন। এখানে কত পাস? বলি ফিউচারের কথা কিছু ভেবেছিস? সারা জীবন এভাবেই কাটাবি? নাকি দু পয়সা কামিয়ে, একটু রোখঠোক রোয়াবি দেখিয়ে রাজার হালে থাকবি?

হুহুঃ               আজ্ঞে, সে আর বলতে? আর উণিশ বিশ হলেই খালে লাশ - একেবারে খাল্লাস।

পৈলানঃ           আরে তা কেন? সবাই কী আর ওদের মতো নাকি? ও নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না।

হুহুঃ         সে কথা একশবার, আমাদের ভাবনা তো আপনি ভেবেই রেখেছেন। আপনার নিজের দলেরই আটত্রিশজন এখন মাটির তলায় কংকাল হয়ে নিশ্চিন্তে শুয়ে আছে। আর ষোলজনের, বানিয়ে তোলা মামলায় যাবজ্জীবন চলছে।

পৈলানঃ           (ভুরু কুঁচকে) বেশ ছোকরা হে, তুই! আমার থেকেও তোর দেখি সব হিসেব একেবারে মুখস্থ!

হুহুঃ               আজ্ঞে তা তো হবেই! আপনার হরেক লীলা, সব কী আর আপনার মনে রাখা ঠিক হয়? এরপর আছে বিরোধী দলের একশ আটত্রিশ জন, আর নিরীহ আম জনগণ গোটা চল্লিশেক তো হবেই! তার মধ্যে আছে আটজন বাচ্চা ছেলেমেয়েও। 

পৈলানঃ           (কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে) সব কী আর মনে আছে? কাজের মধ্যে অমন দু চারটে হয়েই যায়। আর ওসব না করলে লোকে মান্যিগণ্যিই বা করবে কেন? আর পাব্লিকের মনে ভয়ভক্তিই বা আসবে কোত্থেকে, হে? ওটাই তো আমাদের পোফেসন, ওটাই তো আমাদের ইউএসপি। ওটুকু না থাকলে, পলিটিক্যাল ন্যাতারা আমাদের দিয়ে ঘরও মোছাবে না, হে।

হুহুঃ               আর পলিটিক্যাল হাতটা যদি মাথায় না থাকে, ক্ষমতার ল্যাজ নাড়াই বা থাকবে কোথায়?

পৈলানঃ           তুই বেশ চালাকচতুরও আচিস, অ্যাঁ? ভেজা বেড়ালটা সেজে থাকিস, দেখে বোঝাই যায় না। এখনই কিছু বলতে হবে না। ভালো করে চিন্তা ভাবনা করে দেখ। এখান থেকে সটকে নিয়ে একবারটি আমায় কলকাতায় নিয়ে চল, তারপর তোর লাইফ কেমন বানিয়ে দিই দেখবি! হে হে, এটুকু না বোঝার মতো বোকা তো তুই নস, রে!

হুহুঃ               আজ্ঞে, ভাবনা চিন্তার বাকি আর কী রাখলেন বলুন দেখি?

পৈলানঃ        বলিস কী রে, ভাবনা চিন্তা করেই ফেলেছিস? বা বেশ বেশ। তা বেরোবার আগে লাঞ্চের ব্যবস্থা কিছু করেচিস নাকি? দুপুরে ওই মাংসের কষা আর খান কতক পরোটা বানাবি নাকি? যাওয়ার আগে এ পাড়ার খাবারটা জমিয়ে খেয়েই যায়। আচ্ছা, ওই মাংসটা কিসের বল তো হে, অমন স্বাদ এর আগে কোনদিন পাই নি।

হুহুঃ               ও তেমন কিছু না, স্যার। যেমন সস্তা, তেমনি সহজেই পাওয়া যায়। মানে এ মাংসের কোনদিন অভাব হয় না, স্যার। হালাল কিংবা ঝটকা; গরু না শুয়োর –এসব কোন লাফড়াও নেই, স্যার!।

পৈলানঃ           বলিস কী রে? সস্তায় এমন মাংস, কিসের বল তো?

হুহুঃ               আপনি জানেন, স্যার, আপনার খুবই প্রিয় মাংস। ওটা নরমাংস, স্যার।

পৈলানঃ           অ তাই বল! অ্যাঁঃ কী বললি? নরমাংস? আরে ছ্যাঃ ছ্যাঃ তোর পেটে পেটে এই ছিল, গন্ধ?

হুহুঃ              কেন স্যার? কিছু অন্যায় করে ফেললাম নাকি, স্যার? একটা মানুষখেকো বাঘ, কিংবা একটা হাঙর সারা জীবনেও অতো মানুষ খেতে পারে না স্যার, এই ক বছরে আপনি যা খেয়েছেন।

পৈলানঃ           হ্যাক থুঃ থুঃ। ছিঃ ছিঃ। কোন শালা বলে আমি নরমাংস খেয়েছি? লাশ ফেললেই তার মাংস খাওয়া হয়ে যায়? আমার মতো একজন সমাজসেবীকে তুই নরমাংস খাওয়ালি?

হুহুঃ               এ হে হে, আপনি এত ছ্যাছ্যা থুথু করছেন কেন স্যার, মানুষ কি এতই অখাদ্য স্যার? বাঘ ভাল্লুক স্যার কখনো কখনো মানুষ মারে পেটের জ্বালায়, আপনি মারেন, স্যার ক্ষমতা আর টাকার জ্বালায়। ইলেকশনের আগে পরে, এলাকা দখলের সময়, কত মানুষ মেরেছেন স্যার, মনে পড়ে? ছেলে-মেয়ে বুড়ো-বুড়ি, যুবক-যুবতী - তাদের মাংস একটু আধটু একটু খেয়ে দেখতে দোষ কী, স্যার? 

পৈলানঃ           তোকে আমি ফাঁসিতে চড়াবো। তোকে আমি... আমি...ওয়াক ওয়াক...ওরে বাবা আমার কেমন গা গুলোচ্ছে...ইস...ইস...ছ্যাঃ ছ্যাঃ...ওয়াক ওয়াক...

হুহুঃ            সে কি, স্যার? কত লোকের গলা কেটে, শরীরে ছুরি চালিয়ে দু'হাত রক্তে মাখামাখি করেছেন, লোকদের ধমকেচেন কতবার - তেরা খুন পি যাউঙ্গা...বলে।  দুপুরের খাওয়ার পাতে একবাটি সেই রক্ত এনে দেব স্যার? ও কি স্যার, অমন করছেন কেন? মরতে খুব কষ্ট হচ্ছে বুঝি?      


[আলো নিভে গেল, কিছুক্ষণ পৈলানের ‘ওয়াক ওয়াক, থু থু’ আর হুহুর ‘ঘাবড়াবেন না স্যার, সব ঠিক হয়ে যাবে। মানুষ মারতে কোনদিন কষ্ট পাননি, আর এখন নিজে মরতে এত কষ্ট... প্রথম প্রথম অমন হতে পারে স্যার’ শোনা যেতে লাগল...। 

তারপর হুহুর কণ্ঠের বদলে একটি মেয়ের কণ্ঠ শোনা গেল, ‘স্যার, স্যার একটু শান্ত হোন স্যার, ও স্যার, স্যার...’আলো জ্বলে উঠলে দেখা গেল, নার্সিং হোমের বেডে পৈলেন শুয়ে শুয়ে ছটফট করছে, তাকে শান্ত করার চেষ্টা করছে একটি নার্স, নাম পিংকি পৈলানের সারা গায়ে নাকে মুখে নানান টিউব, সে সব খুলে সে উঠে পড়তে চাইছে।]

 

পিংকিঃ          বীণাদি, শিখাদি একবার আসবে গো, পেশেন্ট হঠাৎ কেমন করছে দেখে যাও। সামলাতে পারছি না। ও বীণাদি, ও শিখাদি।

                   [আরো দুই নার্স বীণা আর শিখা দৌড়ে ঢুকল কেবিনে]

বীণাঃ              ও মা, এ আবার কী হল রে? কোমার পেশেন্ট এমন কাটা পাঁঠার মতো ছটফট করে এই প্রথম দেখছি শিখা তুই স্যারকে বরং একবার ফোন কর। আমি আর পিংকি ততক্ষণ দেখছি একে শান্ত করা যায় কি না

                   [শিখা মোবাইলে ডায়াল করতে লাগল]

শিখাঃ             যাচ্চলে, নেট ওয়ার্ক সীমার বাইরে বলছে।

বীণাঃ              যাচ্ছেতাই নেট ওয়ার্ক। আবার কর

শিখাঃ             দাঁড়া দাঁড়া রিং হচ্ছে...রিং হচ্ছে...রিং হচ্ছে...যাঃ, স্যার তুললেন না।

বীণাঃ            ছেড়ে দে, এখন আর তাড়া নেই। পেশেন্ট ঠাণ্ডা মেরে গেছে...এখন আর কোমা নয়, একদম ফুলস্টপ।

পিংকিঃ           তাহলে, ভেন্টিলেশান খুলে দিই?

বীণাঃ          পাগল হয়েছিস? ভেণ্টিলেশন চলুক...বড়ো বড়ো ডাক্তাররা আসুক, তাঁরা যা করার করবেনরাত এখনো ঢের বাকি, যা একটু ঘুমিয়ে নে। কাল সকাল থেকে আবার কোমার ডিউটি... এ কোমা কবে কমবে, কে জানে? 

 

[তিনজন বেডের দুপাশে দাঁড়িয়ে পৈলানের দিকে তাকিয়ে রইল। পর্দা নেমে এল]

 

..০০..   

এর পরের বড়োদের গল্প - মশা-ই          

নতুন পোস্টগুলি

শুধু _তুই .কম - পর্ব ২০

 প্রথম   ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "  দ্বিতীয়  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন র...