সোমবার, ২৩ জুন, ২০২৫

প্রতিবাদের আলো

আগের বড়োদের গল্প - " কমপ্লেক্স "



  'আমাদের দেশে গরমকালটাই বেশ, জানেন বাবু। এই দ্যাকেন না, সাড়ে ছটা পার হয়ে গেল, একনো আকাশে আলো বাজতিচে। সু্য্যি ডুবে গ্যাচে ঠিকই, কিন্তু আলোর রং আর জুলুসে কেমন মাকামাকি হয়ে গিয়েচে আকাশখান। দিব্যি একখান বেনিয়ান গায়ে লদির ধারে হাওয়ার মজা লিচ্ছি আমরা। আর এ যদি হত শীতকাল? বাসরে – এতক্ষণ চারদিক আঁধার। লদির বুক থেকে গুঁড়ি মেরে উঠে আসত চাপ চাপ কুয়াশা। আর এদিকে মানুষগুলান কোতায় পিরেন, কোতায় চাদর, মাথা মুড়ো ঢেকে, কাঠের আগুন জ্বেলে জবুথবু – লদির ধারে বসার সাহস হত কারো? বলেন না, হতো’?

ধীরেন এভাবেই কথা বলে। ওর সব কথাতেই থাকে দর্শনের ছোঁয়া আর জীবনের অদ্ভূত আস্বাদ। এই চায়ের দোকানটা ধীরেনের আর আমি রোজই সন্ধের ঝোঁকে আসি, এখানে চা খেতে। নদীর পাথুরে কিনারায় একটা বেঞ্চি পেতে দেয় ধীরেন, কাঁচের গ্লাস ভরা ঘন দুধের চা খাই আর ওর কথা শুনি। নদীর আওয়াজ শুনি। বাঁদিকে খানিকটা নীচেয় আছে শ্মশান – সেখান থেকে মাঝে মধ্যে শ্মশানযাত্রীদের হরিধ্বনি - তাও শুনি। আর চিন্তার জাল বুনি। সব মিলিয়ে বেশ লাগে। ধীরেনের ভাষায় বললে, বলতে হয় “জেবনের রসে জ্যাবজ্যাবে”। ধীরেন এমনই সব কথা বলে আর সুন্দর হাসে। হাসলে তার চোখ ছোট হয়ে যায়, চোখের কোণের চামড়া কুঁচকে গিয়ে, চামড়ার ভাঁজ থেকে ঝরে পড়ে অভিজ্ঞতার রেণু।

ওর এই কথা, আন্তরিক হাসি ছাড়াও, ওর আছে এক অদ্ভূত মায়ার সম্পর্ক। ওর কাছে একটি মেয়ে থাকে, তার নাম ফুলি। বছর চোদ্দ বয়েস হবে বড় জোর। শামলা রংয়ের ডাগর চোখের মেয়ে। ছটফটে, চঞ্চল আর বাপের মতোই হাসিমুখি। বাপের সবকাজেই সে হাত লাগায় সমান তালে, আর আমি এসে দোকানে বসলে, যদি সে সময় খদ্দেরের চাপ কম থাকে, মেয়ে তার বাপকে আমার কাছে গল্প করার জন্যে পাঠিয়ে দেয়। ফুলি জানে, ওর বাবা কথা বলতে ভালোবাসে আর আমার মতো ভালো শ্রোতা, তার আর কে আছে?

বাবা বললাম বটে। ধীরেন কিন্তু ফুলির জনক বাবা নয়। ফুলির বাবা হয়ে ওঠার পিছনে আছে এক অদ্ভূত ঘটনা। ধীরেনের মুখে সে বৃত্তান্ত শুনে যতটা অবাক হয়েছিলাম, তার চেয়ে অনেক বেশি মুগ্ধ হয়েছিলাম ধীরেনের প্রতি।  

‘সেদিন সকাল থিকে টানা ঝড় আর বিষ্টি। মনে হতেচিল বাতাসের ঝাপটে এই বুঝি খুলে গেল মাথার ওপর এ দোকানের চাল। বাঁশের খাঁচায় বারবার মচ মচ শব্দ উঠতেছেল হাওয়ার দাপটে। দোকানে খদ্দের নেই – বিক্রিবাটা নেই সারাটা দিন, একটু বেলার দিকে বিষ্টির ঝাপটে নিভে গেল উনুনটাও – আর জ্বালি নাই। রাধামা্দবের ইচ্চে নয় যখন, তখন তোলাই থাক না আজ, আমার বিকিকিনি। আমার বুকের খাঁচাটাও বাবু, নড়বড় করে উঠেতেচেল সেদিন। এমন দিনেই বাবু, উথাল পাথাল করে মনটা। সঙ্গী নাই সাথি নাই, মনের কথা কইবার লোক নাই, কার সাথে দুটা কথা কয়ে মনটারে হাল্কা করব, কন দেকি? ওই বেঞ্চে বসে বসেই সারাটা দিন কেটে গেল। কেউ আসে না। মনের মানুষ না আসু্‌ক, একজন খদ্দেরও এদিক মাড়ায় নাই সেদিন। খদ্দেরও তো মানুষ, নাকি বলেন। তার সাথে মনের কথা না হোক, কিছু কথা তো কওয়া যায়। চুলার আগুন মরে গেচে, মনের আগুন তো নেভে না বাবু – সে তো জ্বলতেই থাকে। সেদিন বাবু আমি ক্রাসিনের ইস্টোভও রেডি রেকেচিলাম – যদি কেউ আসে তার জন্যি চা বানাবো বলে। কিন্তু কেউ এল না। আমার বিকল মনের পরীক্ষা লিতেই কিনা কে জানে, রাধামাদব সেদিন দিনটা্রেই করে দিলেন ছোট্ট। সন্ধ্যে হবার অনেক আগেই আঁধার ঘনিয়ে এল অসময়ে। আমি দোকানের ঝাঁপ নামিয়ে ঘরের ভেতর যেয়ে বসলাম। বাসরে, তাতে পকিতি আরো যেন রেগে উঠল। সে কি ঝড় তুফান, আর কি বিষ্টি। আমার দোকানে আমি ছাড়া দ্বিতীয় প্রাণীও নাই, কিন্তু টিনের চালে, টিনের দেওয়ালে সে কি দাপাদাপি – মনে হয় একশ’ মানুষ হামলে পড়ে ঝাঁকাচ্চে তারে – তাদের গায়ে খ্যাপা হাতির বল। মুখে তাদের বাক্যি নাই, শুধু গর্জন – কিসের আক্রোশ, সে তারাই জানে আর জানেন রাধামাদব।

রাত তখন কত কে জানে। ঘড়ি তো নাই। ক্রাসিনের স্টোভে ভাত চড়ায়েচেলাম, সঙ্গে দুটা আলু পটল। দেওয়ালের ফাঁক ফোকরে আসা হাওয়ায় সে ইস্টোভের আগুনও সেদিন নির্জীবের মতো ভিতু ভিতু। তবু ফুটতেচিল – চাল ফুটে ভাত হওয়ার সময় বাবু – হাঁড়িও খুব কথা কয়। লক্ষ্য করেচেন কি বাবু। সে অনেক কথা। খিদের কথা। তৃপ্তির কথা। ভালোবাসার কথা। খিদের মুখে দুটো অন্নর মতো ভালোবাসা জীবকে আর কে দেয়, কন তো বাবু? আমি বেশ বুঝতে পারি – ওদের কথা। ওদের ঘ্রাণ। আমি খাটিয়ায় বসে, একমনে তাদের কথা শুনতেচিলাম আর দেখতেচেলাম ইস্টোভে নীল আগুনের কাঁপা কাঁপা শিখা। মনের অন্দরে ছিলেন রাধামাদব আর তাঁর অনন্ত লীলা। বাইরে তখন অশৈলী তাণ্ডব আর ঘরে চলতিচে অন্নের যোগাড়, এ কি রাধামাদবের লীলা নয়, কি বলেন বাবু?

সেই সময়ে ঝাঁপ পড়া দরজায় আওয়াজ উঠল ঝমঝমিয়ে। প্রথমটায় বুজিনি বাবু ভেবেচেলাম ঝড়ের বাতাসে অমন হচ্চে। বেশ অনেকক্ষণ পর কান করে যেন শুনতে পেলাম এক মেয়েমানুষের গলা – কেউ আচো, খোল না – দোরটা খোলো না একটিবার। আর তার সঙ্গে ঝমঝম দরজা ঝাঁকানোর আওয়াজ। মনে হল ভুল শোনলাম। এই দুর্যোগের রাত্রে কে আমার এই দোকানে আসতে যাবে। ভয় হল। অশরীরি কেউ নয়তো – শুনেচি এমনি রাতেই তাঁদের আনাগোনা বাড়ে। আবার মনে হল তেনাদের কাছে আমার ওই পলকা দোর কিসেরই বা বাধা? তেনাদের ইচ্চে হলে, অমনিই তো আসতে পারেন। রাধামাদব শক্তি দিলেন, বিবেক দিলেন। দোরটা খুললাম। দামাল ঝোড়ো হাওয়া আর তুমুল বিষ্টির ঝাপটার সঙ্গে ঘরে এসে ঢুকে পড়ল একজন মেয়েমানুষ। এক ঝলক দেখার পর সব অন্ধকার – ঝোড়ো হাওয়ায় আমার ঘরে জ্বলতে থাকা কুপিটা তখন নিভে গেচে।

ঝাঁপ বন্ধ করে, দেশলাই খুঁজে আবার কুপিটা জ্বালালাম আর তার আলোয় দেখলাম সেই মেয়েরে। মাথা থেকে পা অব্দি ভিজে সপসপ করচে, পরনের কাপড় চুপ্পুরি ভেজা আর কাদামাখা। মাটিতে শুয়ে অসহ্য যন্ত্রণায় কাতরাচ্চে সেই মেয়ে – তার পায়ের তলার মাটি ভেসে যাচ্চে জলে আর রক্তে। মেয়েটি বাবু ভরা পোয়াতি। আমি দৌড়ে গিয়ে ভাতের হাঁড়ি নামিয়ে ইস্টোভে জল চাপায়ে দিলাম। এই অসময়ে কার কাচে যাবো, এ অবস্থার মেয়েটারে নিয়েই বা এখন কি করব ভাবতেচেলাম, আর অপেক্ষা করতেচেলাম জল গরমের, ততক্ষণে শুনতে পেলাম বাবু কচি শিশুর কান্না। সেকি জোর বাবু তার গলার। বাইরের এত ঝড়ের গর্জন, বিষ্টির মাতন - সব ছাপিয়ে জেগে উঠল তার কান্না। এ নতুন জেবনের কান্না, তাকে আটকায় এমন সাধ্যি কার। কোনদিন, বাবু, সংসার ধর্ম করি নাই, রাধামাদবের নাম নিয়েই দিব্বি কাল কাটাইতেচেলাম, সেই আমার কাচেই কিনা এসে জুটল এমন ঝক্কি? এমন খেলা রাধামাদব ছাড়া, আর কেই বা খেলতে পারেন বলেন দিকি।

পেথমেই বাচ্চাটার নাড়ি কেটে মুক্ত করে দেলাম তার মায়ের বাঁধন। তারপর গরমজলে সাফসুতরো করে আমার পুরোনো ধুতির পুঁটলিতে জড়িয়ে ফেললাম তাকে। এতক্ষণ তার মাকে লক্ষ্য করি নাই, এখন মায়ের কোলে বাচ্চারে তুলে দিতে গিয়ে দেখি মায়ের অবস্থা সঙ্গীণ। বাচ্চারে কোলে নিতে হাত বাড়ানোর চেষ্টা করে্চিল একবার – কিন্তু পারল না। তার চোখের দৃষ্টি তখন থির, চোকের কোলে জমে উঠেচে জল, কিন্তু তার ফ্যাকাসে ঠোঁটের কোণায় হাসির রেখা। বাচ্চার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই তার চোখ বুজে এল বাবু, আর সে চোখ মেলল না।

আচ্ছা, রাধামাদবের এ কেমন লীলা আপনি আমারে বোজান দেকি। আমি কথা বলার জন্যি মানুষ খুঁজতেচিলাম, তা না হয় সত্যি, তাই বলে এমন মানুষ। চেনা নাই, জানা নাই। কোথায় বাড়ি, কাদের মেয়ে। না আমি জানি তার কিছু, না সে আমারে জানে। অথচ দেখেন, সে চলে গেল আমার হাতে এই টুকুন এক জেবন গচ্ছিত রেখে? আমার চাল নাই চুলা নাই, রাধামাদবের ইচ্চেয় আমার দিন চলে যায় কোনমতে, সেখানে একি বিপদ কন দিকি। আজ রাতটুকুন হয়তো কোন পেকারে চলে যাবে – কিন্তু কাল সকালে? লোক আচে, জন আচে, থানা আচে, পুলিশ আচে – তা্রা কি আমারে ছেড়ে দিবে? কি করব কিছুই যখন ভেবে কূল করতে পারতেচি না, আমার কোলের পুঁটলিতে ওই মেয়ে কথা কয়ে উঠল। কি কথা কে জানে – শিশুর ভাষা বোঝার সাধ্যি তো আমার নাই বাবু। আমি ওর মুখের দিকে চাইলাম – দেখি আমার দিকেই তাকিয়ে আচে টালুক টালুক চোখে – সে দৃষ্টিতে কি যে ছেল বাবু, বলতে পারব নি। ভরসা ছেল। বিশ্বাস ছেল। সদ্যজাত শিশু আরেকজন মানুষের মুখের দিকে তাকিয়ে কিসের সন্ধান করে? বাঁচার পেত্যয় ছাড়া? বড়ো মায়া হল বাবু, অর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে, অরে আরো জোরে চেপে ধরলাম বুকে। অর ওই ছোট্ট বুকের ধুকধুকুনি আমার বুকে এসে বাজতে থাকল, বাবু। আমি রাধামাদবকে বললাম, এ আমার কি করলে ঠাকুর, আমারে এ কি মায়ার বাঁধনে বেঁধে দিলে অচেনা অজানা কার এক শিশুর সঙ্গে?

দিনকতক বাবু এ ঘটনা নিয়ে খুব টানাপোড়েন, দৌড়ঝাঁপ, কথা চালাচালি চলল। আস্তে আস্তে একদিন থিতিয়ে গেল, মিটেও গেল সব। ও মেয়ে আমার কোলেই বড় হতে লাগল দিন কে দিন। আজ পর্যন্ত কেউ আসে নি বাবু, অর মায়ের কিংবা অর খোঁজ নিতে। ওর মায়ের কোতায় বাড়ি, কাদের মেয়ে, কাদের বউ – কিছুই জানা গেল নি বাবু। মাঝের থিকে আমার সঙ্গে জুড়ে গেল ওর নিবিড় সম্পর্ক। রাধামাদবের এ বিচিত্র লীলা নয়, কি বলেন, বাবু’?

ধীরেনের প্রশ্নের কোন উত্তর দিতে পারিনি, কিন্তু সেদিন খুব মন দিয়ে লক্ষ্য করেছিলাম মেয়েটিকে। সপ্রতিভ সুন্দর তার ব্যবহার। একা হাতেই দোকানের প্রায় সব কাজ সামলায়, আবার বাপেরও খেয়াল রাখে পুরোদস্তুর। তার চোখের আলোয় ধরা পড়ে তার পড়ে পাওয়া বাবার প্রতি, তার এই ছোট্ট দোকানদারি দুনিয়ার প্রতি, অসীম মায়া আর ভালোবাসা।

  

 মাঝখানে চাকরি সূত্রে আমায় অন্যত্র চলে যেতে হয়েছিল। প্রায় বছর পাঁচেক পরে আবার এই মফস্বল শহরে যেদিন ফিরে এলাম, দেখলাম অনেক পাল্টে গেছে জায়গাটা। সব জায়গাতেই নিজস্ব নিয়মে লোক সংখ্যা বাড়ে, উন্নতি হয় – যুগের হাওয়া এসে নাড়িয়ে দিয়ে যায় তার সনাতন ভাবগতিক। সেটাই স্বাভাবিক।

ধীরেন আর তার মেয়ে ফুলির কথা ভুলেই গিয়েছিলাম, এই শহরে ফিরে এসে আবার মনে পড়ল। কাজের অবসরে একদিন সন্ধ্যেবেলা সেই নদীর ধারে ধীরেনের দোকানে গেলাম। হদিসই পেলাম না সে দোকানের। অনেক দোকান আর ঝুপড়ি গজিয়ে উঠেছে আশে পাশে। তাদের চারপাঁচজনকে জিগ্যেস করলাম ধীরেনের কথা, তার মেয়ে ফুলির কথা। কেউই জানে না ওদের সম্পর্কে, শুধু একজন আমাকে খুব সন্দেহভরে জিগ্যেস করল, আমি কে? ধীরেনের খোঁজে আমার কি দরকার? আরো সাতপাঁচ অবান্তর প্রশ্ন। আমি নির্বিবাদি ভদ্রলোক, আমি বেশি দূর আর ঘাঁটালাম না, সরে এলাম সেখান থেকে। শ্মশানের কাছেও একবার গেলাম। সিমেন্টের বাঁধানো পরিচ্ছন্ন চাতাল, নদীর ঘাটে নামার জন্যে সুন্দর বাঁধানো সিঁড়ি। আর নীচে নামার পথের ডানদিকে গড়ে উঠেছে একটি ছোট্ট নতুন কালীমন্দির। এসবই নতুন হয়েছে, আর ধীরেনের দোকানটা এই খানেই কোথাও ছিল – প্রগতির ধাক্কায় সে দোকান আজ বিলুপ্ত। মনে রেখেই বা কি লাভ? তাই ভুলেই গিয়েছিলাম ওদের কথা।

সামান্য ঠান্ডা লেগে জ্বর হওয়াতে সেদিন অফিসে বের হইনি, বাড়িতেই ছিলাম। শুয়েছিলাম আমার একলা বাসাবাড়ির বিছানায়। আধো ঘুমে আচ্ছন্ন আমার চেতনায় হঠাৎ যেন শুনলাম খুব চেনা কণ্ঠস্বর। ‘জয় গুরু। জয় রাধামাদবের জয়, কিচু ভিক্ষে পাই মা’। এ স্বর আর ওই বাচন ভঙ্গী আমার খুব চেনা – এ ধীরেন ছাড়া কেউ নয়। আমি বারান্দায় দৌড়ে গেলাম, নীচে তাকিয়ে দেখতে পেলাম ধীরেনকে। জোড় হাতে খুব সংকুচিত ভঙ্গীতে দরজার সামনে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে।

আমি ডাকলাম তাকে, ‘ধীরেন, না’? সে মুখ তুলে ওপরের দিকে তাকাল। আমায় চিনতে পারল কিনা বুঝতে পারলাম না। বললাম, ‘ভেতরে এসো, কথা আছে তোমার সঙ্গে’। আমি নেমে গেলাম, নীচের বসার ঘরে। ধীরেন এসে দাঁড়াল দরজায়। বললাম, ‘দাঁড়িয়ে কেন, ভেতরে এসো। আমাকে চিনতে পারছ না’?

‘পারচি বাবু, চিনতে পারচি’।

‘তবে? ভিক্ষে করে বেড়াচ্ছ কেন, তোমার দোকান কি হল? তোমার সেই মেয়ে ফুলি কি করছে? জান, তোমার দোকানের খোঁজে একদিন গিয়েছিলাম নদীর ধারে, কেউ বলতেই পারল না তোমার খবর’? আমার কৌতূহলে আর আগ্রহে ধীরেন হাসল। তার হাসি আর আগের মতো নেই, এ হাসিতে সেই আগেকার ধীরেনকে আর পেলাম না। এ হাসি ভীষণ করুণ আর কষ্টের হাসি। ধীরেন বলল, ‘সে অনেক কথা, বাবু। যদি অনুমতি করেন, সন্ধ্যের পর এসে আপনারে শোনাতে পারি’।

‘আচ্ছা, তাই এসো’। আমিও এতক্ষণে লক্ষ্য করলাম তার ভেঙে যাওয়া শরীরি ভাষা। যাবার সময় সে ফিরে দাঁড়িয়ে বলল,

‘কিচু দেবেন নি, বাবু’? সে ছিল এক দোকানের মালিক, সে দোকান যত ছোটই হোক না কেন। আজ তার এই হাত পেতে ভিক্ষে করার প্রবৃত্তিতে আমি একটু বিরক্তই হলাম, তবুও পার্স খুলে তার হাতে তুলে দিলাম একটা দশ টাকার নোট। উত্তরে সে বলল – ‘জয় রাধামাদবের জয়’।

 

 ‘আমার সে দোকান দেকতে আপনি গেচলেন, বাবু? কেমন দেকলেন জায়গাটা? আমি অনেকদিন যাই না, ওদিকে। গেলে ওরা ধমকায়, চড় থাপ্পড় মারে। আর কেনই বা যাব বলেন তো, গেলেই তো সব মনে পড়ে যায়। মনে পড়ে যায় সব কথা।

ভয় জিনিষটা বাবু মানুষকে কুরে কুরে খায়। ওপর থেকে বোঝা যায় না, কিন্তু ভেতরটা একদম ফোঁপরা হয়ে যায়। সারাদিনে সব কাজই করবেন, কিন্তু মনের ভেতরটাতে সারাক্ষণ টিক টিক করতে থাকবে ভয়। খেয়ে শুয়ে আপনি শান্তি পাবেন নি। আমাদের সেই ভয়টাই ধরিয়ে দিয়েচেল কটা লোক। আমাদের দোকানে আসত। তাদের কুনজর পড়ল ফুলির পরে। পেথম পেথম আজে বাজে কথা বলত, আমরা গায়ে মাকতাম না। তারপর শুরু হল বাবু ওর হাত ধরে টানাটানি আর এমন সব কথা বার্তা, বাপ হয়ে সে কথা কানে তোলা যায় না। প্রতিবাদ করলাম একদিন, আমাকেও যাচ্ছেতাই বললে বাবু, বললে আমি ওর কিসের বাপ? বাপ মায়ের ঠিক নেই যে মেয়ের, সে মেয়েকে নিয়ে আমার এত পীরিত কিসের? এ পীরিত কিসের পীরিত - তারা যে ইঙ্গিত করল বাবু, সে আমি মুখে আনতে পারব নি। তারপর খুব হাসলে বাবু ওই লোকগুলো, হ্যা হ্যা করে – আমাদের ভয় পাওয়া মুখ দেখে। অপমানে আর লজ্জায় ঝলসে যাওয়া আমাদের মুখ দেখে, ওরা খুব হাসলে। দোকানে আরও অনেক লোক ছেল বাবু - কেউ চা খাচ্চিল, কেউ খাবার খাচ্চিল, তারা যেন কেউ শুনতেই পেল না, এমন ভাবে মুখ নামিয়ে রইল। সেই শুরু হল বাবু, আমাদের কোনরকমে বেঁচে থাকা – ভয়কে সঙ্গী করে টিকে থাকা।

দুর্যোগ কি শুধু পকিতি আনতে পারে, বাবু? মানুষও পারে। পকিতির চেয়েও সে দুর্যোগ অনেক নিষ্ঠুর। পকিতি আমাদের শুধু ধ্বংসই করতে পারে, মৃত্যু এনে দিতে পারে, কিন্তু চরম লজ্জা দেয় না কিংবা বীভৎস অপমানও করতে পারে না। মানুষ পারে। এই জন্যেই মানুষ অনেক বড়ো, পকিতির চেয়েও বড়ো। একদিন সেই দুর্যোগ, বাবু, এসেই গেল আমাদের ওপর।

হুলির দিনে মানুষজন বড় বেহিসেবী হয়ে যায়, রংযের নেশায়, মদের নেশায় – আরো নানান নেশায়। আমরা এমনিতেই ভয়ে খুব সিঁটিয়ে থাকতাম, সেদিন তাই সাততাড়াতাড়ি ঝাঁপ ফেলে আমরা ঢুকে পড়েচেলাম দোকানের ঘরে। বাপ মেয়েতে রাতের খাওয়া দাওয়া সেরে, শুয়েও পড়েচেলাম তাড়াতাড়ি। রাত কত হবে বাবু, জানি না, দোর ভেঙে ঢুকে পড়ল ওরা পাঁচজন। সকলেই নেশায় মত্ত। গায়ে তাদের অসম্ভব শক্তি। আমার ফুলিকে তুলে নে যাচ্চিল ওরা। আমি আটকাতে গেলাম, আমাকে খুব মারল – মেঝেয় ফেলে সে কি ভীষণ মার। পাল্টা মার দেবার শক্তি তো আমার নাই, সহ্য করার শক্তিই বা কতটুকু আমার? ওদের মার খেতে খেতে আমি অজ্ঞান হয়ে গেলাম।

জ্ঞান যখন ফিরল, সব চুপচাপ - নিস্তব্ধ। জ্ঞান ফেরার পর প্রথম কি মনে হয়েচেল বাবু, জানেন? কিচুই যেন হয় নি, সব বুঝি দুঃস্বপ্ন। মানুষের মন কি আশ্চর্য, তাই না বাবু। মেঝেয় উঠে বসে, ঘরের চারদিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলাম – নাঃ, স্বপ্ন তো নয়, সব কিছু তছনছ, এলোমেলো, ভেঙে চুরে সর্বনাশ। ফুলি কোথায়? এ কথা মনে হতেই আমার শরীলে শেতল স্রোত বয়ে গেল। মাথার ভেতরটা বেবাক শূণ্য। নিজের আড়ষ্ট শরীলের যন্ত্রণা ভুলে, উঠে দাঁড়ালাম। দোকানের একধারে দুটো বেঞ্চ জুড়ে এক করে রাখা - তার ওপরে শুয়ে আচে ফুলি। হাত পা ছড়িয়ে উদাসীন উলঙ্গ - আমার ফুলি মা শুয়ে আছে। কি বীভৎস সে দৃশ্য – একখান শাড়ি দিয়ে তারে ঢেকে দিলাম আর তুলে নিলাম বুকে – তকনো তার প্রাণ ছেল বাবু, আমার বুকের সঙ্গে তার বুকের ধুকধুক তকনো বাজতেচেল।

দোকানের ভাঙা ঝাঁপ সরিয়ে বের হলাম বাইরে। একখান ভ্যান চাই – ফুলিরে হাসপাতাল নে যেতে হবে। তকন শেষ রাত। আমার ডাকাডাকিতে বেরিয়ে আসতেচেল, কিন্তু আমাদের অবস্থা দেখে কেউ রাজি হচ্চিল না। সকলেই জানে কিনা, কে আর বিপদের মধ্যে জড়াতে চায় নিজেরে? অনেক কাকুতি মিনতির পর একজন রাজি হল – তার ভ্যানে যখন তুললাম ফুলিরে, আর কোন সাড়া পেলাম না ফুলির। আর এই প্রথম লক্ষ্য করলাম বাবু, ফুলির দুটো হাতই ভাঙা, ফুলির দুটো হাত যেন ফুলির নয় – এমত ঝুলছেল দুপাশে।

শেষ রাতের হাসপাতালে ঘুম থেকে উঠে এসে ডাক্তার, নার্স খুব বিরক্ত হয়ে চেক করল, ফুলিরে। তারপর খুব নিশ্চিন্তে তারা বলে দিলে ফুলি মারা গেচে – আর কিচু করার নেই। নিয়ম কানুন যা হবে, সকালের বড়ো ডাক্তাররা না এলে হবে না। বসেই রইলাম ফুলির মড়া শরীর কোলে আগলে। সকাল হল। ডাক্তারবাবুরা সব এলেন। তেনারা থানায় খবর দিলেন। পুলিশ এল। আমার বয়ান নিল। ওরা ফুলিরে নিয়ে গেল কাঁটা ছেঁড়া করে রিপোর্ট বানাতে – আরও বাকি ছিল, বাবু, আমার ফুলিরে কাটতে, ছিঁড়তে, ভাঙতে। সারা জেবনে এত টিপ ছাপ দিই নি বাবু – সেদিন আমার ফুলির মড়া শরীরটা ফিরে পেতে এত জায়গায় টিপ লাগাতে হল – বাস্‌ রে, দেশের আইন বাবু এত্ত কড়া? কোত্থাও একটু এদিক সেদিক হবার যেন জো নাই, বলেন? ওই শ্মশানেই বাবু আমার ফুলিরে দাহ করে দোকানে যখন ফিরলাম, সেও রাত প্রায় শেষ।

তারপর আর কি হবে বাবু, খুব কদিন থানায় হাজরি, দৌড়ঝাঁপ - টানাপোড়েন চলল।  খদ্দেররাও তেমন আর দোকানমুখো হচ্ছিল না, সারাটাদিন বসে বসে অনর্থক চিন্তা করতাম আর আমি চমকে চমকে উলুকভুলুক তাকাতাম – মনে হত ফুলি যেন ডাকল, বলল – “বাবা, চারটে চায়ের দাম নাও”। দোকানে মন বসছেল না। এরই মধ্যে একদিন সন্ধ্যে বেলা সেই চারজন আবার এল, খুব গালাগাল, ধমক আর সঙ্গে চড় থাপ্পড় দিয়ে শাসিয়ে গেল আমায়। সেই সন্ধ্যেতেই, বাবু আমি বের হয়ে পড়লাম, সামান্য কিছু টাকা পয়সা ছেল আর সঙ্গে কিছু কাপড় চোপড় নিয়ে। দোকান পড়ে রইল দোকানের মতো।

সরকারি রেল স্টেশনের একধারে থাকার জায়গা জুটে গেল। আর হাতের জমানো পয়সা শেষ হতে, শুরু করে দিলাম ভিক্ষে। এখন বেশ আচি বাবু। যেদিন পয়সা জোটে খাই, যেদিন জোটে না – সেদিন হরিমটর। কমাস আগে, একদিন হোটেলে বসে খাচ্চিলাম। টিভিতে খবর দেকতেচিলাম, শহরের বাবুরা রাস্তায় নেমে মোমবাতি জ্বালাইতেচেন, সক্কলের হাতে জ্বলচে মোমবাতি – কোন এক মেয়েকে অনেকে মিলে রেপ করেচে - তার প্রতিবাদে। আপনিও দেখেচেন নিশ্চয়ই – আপনি জ্বালাননি, বাবু? সেদিন থেকে আমিও আমার ভিক্ষের পয়সা থেকে দুটো তিনটে টাকা বাঁচিয়ে ফেলি, বাবু, আর ওই টাকায় আমিও রোজ একটা করে মোমবাতি কিনে জ্বালিয়ে রাখি শিয়রে। জ্বলন্ত শিখার দিকে তাকিয়ে থাকি – বেশ লাগে, একদম আমার ফুলির মতো, বাবু। একটু ভীতু আর অসহায় - হাল্কা বাতাসে কেঁপে কেঁপে ওঠে – দমকা বাতাসে নিভে যায়। আচ্ছা বাবু, আমার ফুলিরেও তো ওরা রেপই করেছেল, না’?

ধীরেন মাথা নীচু করে বসে রইল বেশ খানিকক্ষণ। ধীরেনের মনে এখনও অনেক প্রশ্ন, কিন্তু কোন প্রশ্নেরই উত্তরের জন্যে আর ওর মাথাব্যথা নেই। আর সত্যি বলতে আমি কি উত্তর দেব?  এতদিন এ সমস্ত কথা ও কাউকে বলতে পারে নি, মনের মধ্যে গুমরে মরছিল। আজ আমাকে বলে কিছুটা ভারমুক্ত হল। আমার কাছে কিচ্‌ছু প্রত্যাশা করে না ও, কারণ ও জানে - আমিও একজন ভদ্রলোক। যে রাধামাধবের লীলা্রসে ধীরেন আগে মজে থাকত, তাঁর নাম আজ মাত্র একবারই শুনলাম ওর মুখে – সকালবেলায় ভিক্ষের উপকরণ হিসেবে। যেখানে রাধামা্ধবের ওপরই আর ওর ভরসা নেই, সেখানে আমার কি অধিকার আছে ওকে সান্ত্বনা দেবার! আমিও মাথা হেঁট করে বসে রইলাম চেয়ারে।

অনেকক্ষণ পর, ধীরেন উঠে দাঁড়াল, বলল, ‘অনেক রাত হল, বাবু, আজ আমি চলি। তবে যাবার আগে বাবু একখান কথা কবো’?

‘বলো’।

কাঁধের ঝোলার ভেতর হাত ঢুকিয়ে ধীরেন একখানা মোমবাতি বের করল, বলল, ‘আপনার দেওয়া সকালের টাকা থেকে একখান মোমবাতি কিনেচিলাম বাবু, যদি জ্বালতে দেন, কে জানে, মেয়েটা হয়তো একটু শান্তি পাবে। ও আপনারেও খুব মান্যি করত, বাবু’।

আমি বললাম, ‘দাও’।

ধীরেন বসার ঘরের টেবিলে মোমবাতিটি জ্বালিয়ে রাখল, আর নিভিয়ে দিল ঘরের বিজলি আলো। তারপর ধীরেন অস্ফুট স্বরে বলল, ‘আজ তবে আসি, বাবু’।

 ও চলে যাবার পরও আমি একলা নির্বাক বসেই রইলাম বহুক্ষণ। আমার ঘরে তখন মোমবাতির কাঁপাকাঁপা দুর্বল শিখার স্নিগ্ধ আলো। এ আলো ধীরেনের প্রতিবাদের আলো এ শিখায় সে নিজে পুড়তে থাকবে প্রতিক্ষণ, কিন্তু কোনদিন কোথাও আগুন ধরাতে পারবে না।



"দশে দশ" গ্রন্থে এই গল্পটি সংকলিত। বইটির প্রকাশক সৃষ্টিসুখ প্রকাশন - নীচের লিংকে ক্লিক করে অর্ডার করলেই ঘরে বসে পাওয়া যাবে বইটি 




এর পরের বড়োদের  গল্প  - জঙ্গী ব্যবসা  "


শনিবার, ২১ জুন, ২০২৫

প্রদীপ্তা মুখার্জি (কুটু)-র আত্মকথন - বিশ্বলোকের সাড়া - পর্ব ১

 

[ব্লগার কিশোরের মন্তব্যঃ আমার স্কুল জীবনের বন্ধু কাজল মুখার্জি - অধুনা নিউজিল্যাণ্ডের তোরঙ্গা নিবাসী। বন্ধুপত্নী কুটু (ভালো নাম প্রদীপ্তা মুখার্জি) গৃহবধূ - কিন্তু চারদেয়ালের ঘেরাটোপে বন্দী হয়ে কোনদিন থাকেননি। কুটু সমাজসেবী, সমাজ সংগঠক এবং যথেষ্ট প্রতিভাময়ী রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী। সত্যি বলতে সমগ্র নিউজিল্যাণ্ডে বিশেষ করে নিউজিল্যাণ্ড এবং অস্ট্রেলিয়ার বঙ্গ সমাজে কুটু অবিসংবাদিত একজন সাংস্কৃতিক মানুষ। তাঁর রচিত আত্মকথন "বিশ্বলোকের সাড়া" আমার এই ব্লগে প্রকাশ করার অনুমতি পেয়ে আমি সম্মানিত।]

 

 

বিশ্বলোকের সাড়া - প্রথম পর্ব 

প্রদীপ্তা মুখার্জি (কুটু)

তুমি মোর পাও নাই পরিচয়

 আমি প্রদীপ্তা, প্রদীপ্তা মুখার্জি; ডাক নাম কুটু, এনামেই আমায় সবাই চেনে। পূর্ব ভারতের কোলকাতা শহর নিবাসী এক মধ্যবিত্ত পরিবারে আমার জন্ম।

বাবা ছিলেন পেশায় শিক্ষক, মা ঘর-সংসার সামলাতেন। চার ভাই আর চার বোনের মধ্যে আমিই ছিলাম সবার ছোট। বড় হয়েছি খুব হৈচৈ করা আনন্দে এবং স্নেহময় শাসনের মিশেলে। 

ছোটবেলা থেকেই কেন জানি না সঙ্গীত আমাকে টানতো। পড়াশোনার থেকে গান, নাচ, নাটক এই সবই অনেক বেশী পছন্দের। কিন্তু মধ্যবিত্ত সংসারে লেখাপড়ার দিকেই অনুরাগ ছিল বেশি, অতএব পড়াশোনা করাতেই অনেক বেশী সময় দিতে হত। কিন্তু পরবর্তী কালে উচ্চশিক্ষার জন্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায়  সুযোগ পাওয়া মাত্র সঙ্গীতকেই বেছে নিলাম। ব্যাচেলর অফ মিউজিক। এটাই আমার মনোমত বিষয় ছিল বলেই হয়তো, পরীক্ষাগুলোও ভালোভাবে উৎরেও গেলাম।

ছোটবেলাটা কেটেছে মা, বাবা, দাদা, দিদিদের যুগপৎ আদর ও শাসনে। যদিও বাড়িতে নিয়ম-কানুন মানানোর যথেষ্ট প্রচেষ্টা ছিল - রোজ ভোরে উঠে পড়তে বসতে হত, এমনকি ছুটির দিনেও, তার অন্যথা করার অনুমতি মিলত না।

তবে মজাদার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলিও নিয়মিত পালন করা হত। বছরের প্রথম দিকে হত সরস্বতীপুজো। এই পুজো যেমন বাড়িতে হত, তেমনই হত স্কুল এবং বড়ো হওয়ার পর কলেজেও। ছোট্টবেলায় যখন আমরা প্রাইমারি স্কুলের ছাত্রী, বছরে ওই এই একটি দিনই, শাড়ি পরার সুযোগ পেতাম। বড়োসড়ো শাড়ির পুঁটলি শরীরে জড়িয়ে, আঁচল-টাঁচল সামলে, নানান স্কুলে ঘুরে ঘুরে প্রসাদ খাওয়া আর নতুন বন্ধু পাতানোর মজা আর আনন্দের স্মৃতি আজও মধুর। সে দিনগুলি ছিল বিরাট উত্তেজনার, পুজোটা যেন গৌণ, মুখ্য ছিল ওই আনন্দ আর মজাটাই।

তার পরেই আসত মার্চ মাস বসন্তের উতল হাওয়া নিয়ে, মনে ধরত নানান রঙ ও গান, কারণ দোল আসছে। ওই দিন মা পুজোর ঘরে পায়েস বানাতেন, তারপরে রাধা-কৃষ্ণের পুজো করতেন, ঠাকুরকে আবীর দেওয়া হতো। তারপর আমরা ছোটরা বাবা, মা ও গুরুজনদের আবীর দিতাম। তারপরেই শুরু হতো আমাদের ভাই-বোনদের মধ্যে আর পাড়ার বন্ধুদের সঙ্গে রঙিন হয়ে ওঠা এবং অন্যকে রঙিন করে তোলার উচ্চকিত আনন্দ আর মজা।

এপ্রিলে আসতো ১লা বৈশাখ, বাঙালীদের নববর্ষ। সেও এক মহানন্দের উৎসব। নতুন নতুন পোষাকনানান রান্না বান্না, খাওয়া দাওয়া, তার সাথে গান বাজনা ও নাচ, হৈচৈ নিয়ে একশ মজা।

অক্টোবর বা নভেম্বরে আসতো বাঙালির বহু আকাঙ্ক্ষিত মহোৎসব দুর্গাপুজো, সঙ্গে নিয়ে আসত কালীপুজো, দীপাবলি, ভাইফোঁটার অনেক ছুটি আর হাজার মজার সম্ভার নিয়ে। 

 

স্বপন যদি মধুর এমন

 খুব মনে পড়ে আমার প্রাইমারী স্কুলের দিন গুলো। বাড়ি থেকে অল্প হেঁটেই স্কুল। বিরাট জমি নিয়ে ইংরেজি আমলের তৈরি মস্ত স্কুল বাড়ি; কলকাতার নাকতলাতে, আনন্দ আশ্রম বালিকা বিদ্যালয়। পড়াশুনো করতে হত ঠিকই কিন্তু ছোট্টবেলা থেকেই সঙ্গীতই ছিল আমার সব থেকে প্রিয়।

বাড়িতে রেকর্ডে গান শুনতাম। রবীন্দ্রনাথকে আঁকড়ে ধরেছিলাম সেই ছোটবেলা থেকে। প্রথমে তাঁর গান, তারপর বড় হয়ে তাঁর গল্প, উপন্যাস, নাটক এর প্রেমে পড়ি। নিজের ভালো লাগার জন্যই রেকর্ড শুনে শুনে গান তুলতাম সাত আট বছর বয়েস থেকে। নয় বছর বয়েসে আকাশবাণী থেকে ডাক পেলাম, শিশুদের অনুষ্ঠানে গান গাইবার জন্য।

আমার বড় দিদি, আমায় ভর্তি করে দিয়েছিলেন গানের স্কুলে। এরই মধ্যে আমাদের পাড়ায় বা পাশের পাড়ায় প্রায়ই আমার ডাক পড়ত গান শোনাবার জন্য। ওই বয়েসেই রবীন্দ্রসঙ্গীতে এতই ডুবে ছিলাম যে পড়াশোনায় ফাঁক পড়ত প্রায়ই। স্কুলের দিদিমণিরা বাবার কাছে নালিশ করেছিলেন যে আমি পড়াশোনা না করে গানের পেছনে বেশী সময় দিই।

আমার স্বপ্ন ছিল সঙ্গীত নিয়ে পড়া। তাই যখন পরীক্ষা দিয়ে সুযোগ পেলাম তখন ভীষণ খুশী হয়েছিলাম, গর্বিত বোধ করেছিলাম। মনে হয়েছিল আমার গানের পাখি এতদিনে খুঁজে পেল ওড়ার মতো মুক্ত আকাশ।  কলেজে পড়ার সময় তখনকার দিনের বহু নামী শিল্পীর সান্নিধ্যে আসতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করেছি। ওঁদের কাছ থেকে অনেক যত্নে গান শিখেছি, ওঁদের পরিচালনায় অনেক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে গর্বিত বোধ করেছি।

এর মধ্যেই কোন একদিন বিবাহ বন্ধনে বাঁধা পড়লাম। আমার স্বামী ছিলেন আমার বহুদিনের মনের মানুষ, কাজেই আমাদের মনের অমিলটুকুও মধুর হয়ে উঠল আমাদের দাম্পত্য সম্পর্কে।

আমার পুত্র আবীরের বয়েস যখন সবে এক, তখন আমার প্রথম বিদেশ যাত্রার সূত্রপাত। দিল্লীর চাকরি ছেড়ে একটি ইতালীয় কোম্পানিতে চার বছরের চুক্তিতে কাজল জয়েন করল, আর ইরানে একটি পাওয়ার প্ল্যাণ্ট নির্মাণের জন্যে ওর সঙ্গে আমরা রওনা দিলাম ইরান। আমরা ইরান পৌঁছলাম ১৯৯২ সালে।

দিল্লী থেকে দুবাই হয়ে তেহরান পৌঁছলাম এমিরেটসের বিমানে। প্রথম বিদেশ ভ্রমণে আমাদের বেজায় উত্তেজনা ছিল, এবং ভীষণ ভালো লেগেছিল বিমান সেবিকাদের, যেমন সুন্দরী, তেমনি আন্তরিক ব্যবহার।

ইরান সম্পর্কে তখন তেমন কিছুই জানতাম না, শুধু জানতাম ওখানকার গোলাপ বিখ্যাত, পড়েছিলাম রবিঠাকুরের “পারস্যে” প্রবন্ধে। ওই প্রবন্ধেই জেনেছিলাম ওদেশের সঙ্গীতের কথা, মানুষজনের কথা। রবীন্দ্রনাথ ১৯৩২-এর মে মাসে পারস্যে ছিলেন তাঁর জন্মদিনের সময়, উনি লিখেছেন, “আমার পারসি বন্ধুরা সকাল থেকে পুষ্পবৃষ্টি করেছেন, নানা বর্ণের ফুল, বিশেষতঃ গোলাপ”। আর জানতাম পারস্যের বিখ্যাত কবি, আমার ভীষণ প্রিয় কবি হাফেজের কথা। হাফেজের শহর সিরাজ ও ইস্পাহান; আমরা পরে ইস্পাহানে কবি হাফেজের স্মৃতি সৌধ দেখতে গিয়েছিলাম, ওঁনার সমাধিতে ফুল ছড়িয়ে আমার মন ভরে গিয়েছিল।

তেহরানে প্লেন নামলো। প্লেন থেকে নামার আগে আমায় পরতে হল, “মান্টো” আর “রুসেরি”। মান্টো হল প্রায় গোড়ালি অব্দি ঝুলওয়ালা ওভারকোটের মতো পোষাক, তবে সাধারণ কাপড়ের। আর রুসেরি হলো স্কার্ফ, মাথা ঢাকা দেওয়ার জন্যে। তবে মুখ ঢাকার কোন প্রয়োজন হয়নি। এই পোষাক আমরা ভারত থেকেই বানিয়ে নিয়ে গিয়েছিলাম।

তেহরান এয়ারপোর্টে নেমে প্রথমেই যেটা চোখে পড়েছিল সেটা হল Temperature Board – বাইরের তাপমান তখন শূণ্যের পাঁচ ডিগ্রি নিচে। যদিও আমরা প্রস্তুত ছিলাম, পর্যাপ্ত গরম পোষাক ছিল সাথে, তবুও জীবনের প্রথম মাইনাস তাপমানের সম্যক মুখোমুখি হওয়ার আগে ওই লেখাটা দেখেই যেন শীতের শিহরণ টের পেলাম শরীরে।

তেহরান থেকে প্রায় ন/দশ ঘণ্টার ড্রাইভে আমাদের গন্তব্য কেরমানশাহ, কাজলের কর্মস্থল। অধিকাংশ রাস্তাই তখন বরফে ঢাকা, রাস্তার দুপাশ ঘুমিয়ে আছে সাদা বরফের চাদর মুড়ি দিয়ে। প্রায় শেষ বিকেলে আমরা পৌঁছলা, কেরমানশাহ। ছোট্ট সুন্দর জনপদ, তার চারদিক ঘিরে রয়েছে বরফে মোড়া ছোট ছোট পাহাড়।

সবার জীবনে “প্রথম” যে কোন ব্যাপারই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা, এবং আনন্দের তো বটেই। ইরান আমার কাছে সেই প্রথম বিদেশ যাত্রা। পরে বহু দেশ গিয়েছি, এখন যেমন দীর্ঘ প্রবাসী রয়েছি নিউজিল্যাণ্ডে, কিন্তু প্রথম বিদেশ যাত্রার আনন্দ ও উত্তেজনার অভিজ্ঞতা অতুলনীয়। ইরান এমন একটি দেশ, যেখানে আমি সবদিক থেকেই বিদেশিনী, তাদের ভাষা জানি না, বুঝি না। তাদের জীবনযাত্রা, পোষাক-আষাক, সামাজিক চালচলন, রূপ, সঙ্গীত, সবকিছুই আমাদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।

খুব সুন্দর একটা তিনতলা বাড়িতে আমাদের প্রবাসের নীড় গড়ে উঠল। নিচের তলায় থাকতেন আমাদের বাড়িওয়ালা, সপরিবারে মহম্মদ আমিনী। আমাদের ফ্ল্যাটের প্রায় প্রতিটি ঘরের জানালা থেকেই দূরের বরফে ঢাকা পাহাড় দেখা যেত। ভোরের আলোয় সোনালী রঙে রঙীন হয়ে সেজে উঠতো তারা। ঘরের ভেতরে সেন্ট্রাল হিটিং থাকায় সাধারণ পোষাকেই থাকা যেত, কিন্তু বাইরে তখন অসম্ভব ঠাণ্ডা। আমাদের ওই ইরান বাসের কয়েক বছরে, আমরা সর্বনিম্ন তাপমাত্রা পেয়েছিলাম মাইনাস বাইশ ডিগ্রি! ওরই মধ্যে ছোট্ট আবীরকে নিয়ে শুক্রবারের সপ্তাহান্তে চলত আমাদের বরফ নিয়ে খেলা, বরফের পুতুল বানানোর নানান মজা।

ইরানে গিয়ে বাধ্য হয়েছিলাম ফারসী ভাষা শিখতে। প্রথমে বেজায় অসুবিধে হয়েছিল, কারণ আমাদের আশেপাশের প্রতিবেশী ও পড়শিদের কেউই হিন্দি তো বটেই, এমনকি কাজচলা গোছের ইংরিজিও জানত না। হাত-পা নেড়ে, নানান অঙ্গভঙ্গী করে নিজের বক্তব্য পেশ করার প্রচেষ্টা যাঁরা করেছেন, একমাত্র তাঁরাই বুঝবেন, সে সময় আমি কতখানি অসহায় বোধ করতাম।  অতএব আমাকেই ওদের ভাষা শেখার উদ্যোগ নিতে হল। নিজের এই অভিজ্ঞতার জন্যে, পরবর্তী জীবনে নিউজিল্যাণ্ডে বাস করার সময় যখন শরণার্থীদের সঙ্গে মিশেছি এবং তাঁদের নিয়ে কাজ করেছি, তখন ভাষা নিয়ে অসহায়তার বিষয়টা আমাকে নতুন করে বুঝতে হয়নি।

যাই হোক, ধীরে ধীরে স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে পরিচিতি বাড়ল, কাজলের সহকর্মী ও তাঁদের পরিবারের সঙ্গেও আলাপ হল। আমার পুত্র আবীরও সমবয়সী বন্ধু পেয়ে গেল অচিরেই। এভাবেই আমার ফারসী জ্ঞানের পরিধি বাড়তে লাগল অত্যন্ত ধীর লয়ে, এবং আবীর আমাকে পেছনে ফেলে, ফারসীতে শিখে ফেলল অতি দ্রুত, এবং ন-দশ মাসের মধ্যেই ও দিব্যি ফারসী বলতে শিখে গেল। আমি কোথাও আটকে গেলে, আমার বালক-গুরুর কাছেই চলত আমার শিক্ষানবিশী। ওইটুকু বয়সেই আবির বাংলা, ইংরিজি এবং ফারসী মোটামুটি একই তালে বলতে পারত। আমার ইরানী বান্ধবীরা আবিরকে বলত, “ডিকশনারি”, কারণ আমাদের বাড়িতে এলে আলাপের সময়, তাঁরাও আবিরেরই সাহায্য নিতেন, interpreter হিসেবে।

কাজল রোজই ভোরে বেড়িয়ে যেত, শহর থেকে অনেকটাই দূরে ছিল ওদের কর্মস্থল, construction siteআমি আর ছোট্ট আবীর আমাদের বিশাল বড় অ্যাপার্টমেন্টে থাকতাম এক্কেবারে একা। সদ্য ভারত থেকে গিয়ে ওই সময়ের প্রত্যেকটি দিন খুবই একঘেয়ে আর বিষণ্ণ লাগত। দেশে থাকতে যেখানে খুশি, যখন খুশি বেরিয়ে পড়ায় কোন বাধা ছিল না। এখানেও বেরিয়ে পড়তে অন্য বাধা কিছু ছিল না, একমাত্র অন্তরায় ছিল ভাষা। বাইরে বেরিয়ে ট্যাক্সিকে কী বলবো? তখনও ইরানে, অন্ততঃ আমাদের ছোট্ট শহরে সুপার মার্কেট গড়ে ওঠেনি। দোকানে কিংবা বাজারে গিয়ে কী বলবো? মাঝে মাঝেই পুত্রকে নিয়ে পার্কে যেতাম, ও অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে খুব দৌড়োদৌড়ি করত এবং মিশেও যেত খুব তাড়াতাড়ি। শৈশবের সারল্যে ভাষা কোন অন্তরায় হত না।

পার্ক থেকে ফেরার পথে একদিন একটি দোকানে গিয়েছিলাম, কিছু চকলেট, ড্রাই ফ্রুট্‌স্‌ আর বিস্কিট কিনতে। দোকানে সাজানো জিনিষগুলোর দিকে আঙুল দেখিয়ে সংগ্রহ করা গেল। দোকানী ভদ্রলোক সব জিনিষ একটি প্যাকেটে ঢুকিয়ে তুলে দিলেন আবিরের হাতে, আবিরের বয়েস তখন বছর দুয়েক। আমি টাকা দিতে গেলাম, ভদ্রলোক কিছুতেই নেবেন না, আমি খুব অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, কেন? উনি স্মিতমুখে বললেন, “শামা মেহমান-এ ইরান” – অর্থাৎ আপনারা ইরানের অতিথি। আপ্লুত হয়েছিলাম ভদ্রলোকের অসাধারণ আপ্যায়নে। অবিশ্যি এমন আপ্যায়ন এরপরেও বেশ কয়েকবার মিলেছিল, নানান মানুষের থেকে - ট্যাক্সিতে, দোকানে, বাজারে। ভারতীয়দের প্রতি সাধারণ ইরানীদের এই ভালোবাসা আমার ইরান বাসের অভিজ্ঞতায় অন্যতম মধুর স্মৃতি।

এভাবেই দিন গড়াতে লাগল। নির্বান্ধব দিনগুলিতে ওই পার্কটিই ছিল আমার ও আমার পুত্রের মুক্ত বাতাস।  একদিন হঠাৎ করেই আলাপ করতে এলেন এক মধ্যবয়স্ক মহিলাতাঁর সঙ্গে ছিল তাঁর পুত্র ও কন্যা, তাদের বয়েস কুড়ি একুশ তো হবেই। আলাপে দেখা গেল ছেলেটি অল্পবিস্তর ইংরিজি জানে। অতএব সেই দোভাষী হয়ে আমার এবং ওর মায়ের কথাগুলি বলতে লাগল। এখানে আসার পর এতদিনে কেউ আমার কথা শুনছেন, আমিও শুনছি তাঁর কথা। সেদিন কী যে ভালো লেগেছিল, সে কথা আজও মনে পড়লে রোমাঞ্চ অনুভব করি। এমন পরিস্থিতিতে যাঁরা না পড়েছেন, তাঁরা বুঝতে পারবেন না, এই আনন্দ।

আলাপে জানলাম পরিবারটি “সসজেদি” পরিবার। মহিলা বললেন, আমি তাঁকে ‘আন্টি’ ডাকতে পারিজেনে ভালো লাগলো ইরানেও “মামা”, “মাসি” সম্বোধনে সম্পর্ক গড়ার প্রচলন আছে। আমাকে উনি আশ্বাস দিলেন, প্রয়োজনে ওঁর সঙ্গে এবং ওঁর ছেলের সঙ্গে আমি নির্দ্বিধায় যোগাযোগ করতে পারি। আমরা উভয়েই ফোন নম্বর লিখে রাখলাম।

এর কিছুদিন পরেই পেলাম ওঁদের বাড়ি সান্ধ্যভোজের নিমন্ত্রণ। ততদিনে ওখানকার সামাজিক আদব-কায়দা কিছু কিছু রপ্ত করেছি, কিছু শিখেছি বই পড়ে, টিভি দেখে, এবং কাজলের সহকর্মীদের বাড়ি গিয়ে। আন্টি আমাদের নিতে গাড়ি পাঠিয়েছিলেন, ওঁনার ছেলে “পুয়ান” এসেছিল সঙ্গে। ওঁনার বাড়িতে পৌঁছে দেখি, পুরো পরিবার – তিন ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে গেট অব্দি এগিয়ে এসেছেন, আমাদের অভ্যর্থনা করতে। সংস্কৃতের সংস্কৃতিতে একেই বলে “প্রত্যুদ্গমন”।

বিশাল প্রাসাদোপম বাড়ি, সারা বাড়ি পারস্য কার্পেটে মোড়া। দেওয়ালে সিল্কের কার্পেট ঝোলানো, হাতে আঁকা ছবির মতো সুন্দর কার্পেটগুলি অনবদ্য সুন্দর, এমনটা আগে কোনদিন দেখিনি। পরে জেনেছিলাম শ্রীযুক্ত মসজেদি, ওই শহরের অন্যতম ধনী ও বিখ্যাত মানুষ, স্থানীয় সমাজে তাঁর বিপুল সম্মান।

সারা সন্ধ্যে প্রচুর খাওয়াদাওয়া হল, আড্ডা হল, আমি গান শোনালাম, ওঁরাও গান শোনালেন। এভাবেই ওই পরিবারের সঙ্গে গড়ে উঠল নিবিড় সম্পর্ক, যা আজও অটুট। আজও আন্টির সঙ্গে ফোনে কথা হয়, আন্টি কান্নাকাটি করেন, বলেন, “তোমাদের এ জীবনে আর দেখবো না, ভাবতে পারি না...”।                                     

স্বামীর চাকরি সূত্রে আমরা ভারত ছেড়ে ইরানে পৌঁছে, অপরিচিত পরিবেশের রূঢ় বাস্তবের অভিঘাতে আমার সঙ্গীত চর্চা প্রায় বন্ধই হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু হঠাৎই সেখানে এক পিয়ানো শিল্পীর সাথে আলাপ হয় এবং সামান্য অনুরোধেই তিনি আমায় পিয়ানো শেখাতে রাজী হয়ে গেলেন। নির্বান্ধব পরিবেশের মধ্যে এমন একটা সুযোগ পেয়ে ভীষণ খুশী হয়েছিলাম। ছোটবেলা থেকেই আমি হারমোনিয়াম বাজাতাম, তাই পিয়ানোতে গানের সুর তুলতে পারতাম সহজে।

একটা ফারসি গান আমার খুব ভালো লাগতো। সেটাই আমি পিয়ানোতে তুলে নিয়েছিলাম। একদিন যখন আমি ক্লাসে সেই গানের সুর পিয়ানোতে বাজিয়ে শোনাচ্ছিলাম, আমার শিক্ষক আনন্দে দৌড়ে গিয়ে অন্দরমহল থেকে তাঁর মাকে ডেকে নিয়ে এলেন। তাঁরা দুজনেই অভিভূত হয়েছিলেন, একজন ভারতীয়কে ইরানের অতি প্রচলিত গান পিয়ানোয় বাজিয়ে শোনানোর জন্যে। আমি আজও দেখতে পাই, ফরজাদের মায়ের চোখের সরল বিস্ময় আর আনন্দ। কেন যে মানুষ গান গেয়ে মনের আলাপ না করে, Gun-point-এ মনের প্রলাপ বাধায় আজও বুঝে উঠতে পারিনি।

সে যাই হোক, সুদূর ইরানেই গানের চর্চা আবার শুরু হয়ে গেলো। বেশ কিছু ফার্সী গান শিখেছিপিয়ানো বাজানো শিখেছি ওখানেই। 


চলবে...



শুক্রবার, ২০ জুন, ২০২৫

ঈশোপনিষদ


এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১ "




 প্রাককথা

 এই উপনিষদের প্রথম শব্দ ‘ঈশা’ – ‘ঈশা বাস্যমিদং...’ ইত্যাদি, এই ঈশা শব্দ থেকেই এই উপনিষদের নাম ঈশোপনিষদ্‌।

মূল ঈশোপনিষদ্‌খানি পদ্যের আকারে লেখা এবং অনেক পণ্ডিত এটিকে সবথেকে প্রাচীন বলে অনুমান করেন। মাত্র আঠারোটি মন্ত্রের এই উপনিষদে, মূল তত্ত্বের যে ভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, তাতে পণ্ডিত ব্যক্তিরা এই উপনিষদ্‌টিকে, শ্রেষ্ঠ উপনিষদ্‌গুলির মধ্যে অন্যতম মনে করেন। সুপ্রাচীন কাল থেকে বহু পণ্ডিতজন এই উপনিষদের ব্যাখ্যা এবং ভাষ্য লিখে গেছেন। তাঁদের মধ্যে সে যুগের আচার্যশংকর, মধ্ব, রামানুজপন্থী নারায়ণ যেমন আছেন, তেমনি আছেন এ যুগের দিকপাল মনস্বী ও বিদগ্ধজনেরাও। ঋষি শ্রীঅরবিন্দ, ডাঃ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণাণ এঁদের মধ্যে অন্যতম।

এই উপনিষদের প্রথম মন্ত্রঃ

“ঈশা বাস্যমিদং সর্বং যৎ কিঞ্চ জগত্যাং জগৎ।

তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জীথা মা গৃধঃ কস্য স্বিদ্ধনম্‌”।।

 এই উপনিষদের এই প্রথম শ্লোকটি মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ধর্মজীবনে আমূল পরিবর্তন এনে দিয়েছিল। মহাত্মা গান্ধী এই মন্ত্রটি সম্বন্ধে বলেছেন, “...যদি সমস্ত উপনিষদ্‌ ও শাস্ত্র পুড়ে নষ্ট হয়ে, শুধু এই মন্ত্রটি রক্ষা পায়, তাহলে এই একটি মন্ত্রের জন্যই সকল হিন্দুদের মনে হিন্দুধর্ম চিরকাল সজীব থাকবে”। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও মহাত্মা গান্ধীও এই উপনিষদের কোন কোন অংশের ব্যাখ্যা করেছিলেন।

 এই বিশ্ব চরাচরের সমস্ত জড় ও জীবে ব্রহ্ম ব্যাপ্ত রয়েছেন – অর্থাৎ তিনি সর্বব্যাপী। তিনি জ্যোতির্ময়, অশরীরি, বিশুদ্ধ, নিষ্পাপ, সর্বদর্শী ও স্বয়ম্ভূ। ব্রহ্মের এই স্বরূপ যিনি অন্তরে উপলব্ধি করতে পারেন, তিনি সর্বভূতে নিজেকেই দেখতে পান, সকলকে একাত্ম অনুভব করেন। অতএব তিনি কাউকে বিদ্বেষ বা ঘৃণা করতে পারেন না।

এই বহুত্বের সঙ্গে একাত্মতার অনুভবকেই বলা হয়েছে ‘বিদ্যা’। আর একাত্মতা অনুভব না করে, প্রত্যেকের আলাদা আলাদা অস্তিত্বের অনুভবকে বলা হয়েছে ‘অবিদ্যা’। যা কিছু সৃষ্টি হয়েছে, বা নির্মিত হয়েছে, তাকে বলা হয়েছে ‘সম্ভূতি’, আর যা কিছু শাশ্বত ও সনাতন তাকে বলা হয়েছে ‘অসম্ভূতি’। ‘অহং’ অর্থাৎ আমিত্ব বোধ থেকে মানুষের মনে অহংকার আসে, আর এই প্রকৃতিতে জন্মের বন্ধন আসে মনের অহংকার থেকে। মন থেকে এই অহংবোধ বিনাশ করতে পারলে মানুষ অসম্ভূতি অবস্থা লাভ করে, এই অবস্থাকে তাই ‘বিনাশ’ও বলা হয়েছে।

ব্রহ্ম একদিকে বিদ্যা, অন্য দিকে অবিদ্যা; একদিকে সম্ভূতি, অন্য দিকে অসম্ভূতি। মানুষ তার জন্মগত অহংবোধের বিনাশ করতে পারলে, সে মুক্তি লাভ করে এবং সম্ভূতি অবস্থাতে থেকেও অসম্ভূতি অবস্থার অমৃতত্ব ভোগ করতে পারে।

                                                   শান্তিপাঠ

ওঁ পূর্ণমদঃ পূর্ণমিদং পূর্ণাৎ পূর্ণমুচ্যতে।

পূর্ণস্য পূর্ণমাদায় পূর্ণমেবাবশিষ্যতে।।

ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ

ওঁ পূর্ণম্‌ অদঃ পূর্ণম্‌ ইদং পূর্ণাৎ পূর্ণম্‌ উচ্যতে।

পূর্ণস্য পূর্ণম্‌ আদায় পূর্ণম্‌ এব অবশিষ্যতে।।

ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ

ব্রহ্মাণ্ডে নিরাকার রূপে যিনি পূর্ণ, এই জগতে সাকার রূপেও তিনি পূর্ণ,

পূর্ণ থেকেই পূর্ণের সৃষ্টি, পূর্ণ থেকে পূর্ণ গ্রহণ করলেও, পূর্ণই অবশিষ্ট থাকেন।

সকল বিঘ্নের শান্তি হোক।  

অর্থাৎ ব্রহ্ম এই জগতের ঊর্ধে, আবার এই জগতের সর্বত্রই তিনি ব্যাপ্ত। এই জগতের সৃষ্টি কিংবা বিনাশে তিনি কোনভাবেই প্রভাবিত হন না

[জীবের তিন ধরনের বিঘ্ন, আধ্যাত্মিক, আধিদৈবিক এবং আধিভৌতিক। আধ্যাত্মিক বিঘ্ন বলতে, শারীরিক কিংবা মানসিক রোগ বোঝায়, আধিদৈবিক বিঘ্ন বলতে, প্রাকৃতিক অর্থাৎ ঝড়, বন্যা, ভূমিকম্প ইত্যাদি বোঝায়, আর আধিভৌতিক বলতে হিংস্র প্রাণী, সাপ, বিছে ইত্যাদির দংশনের বিপদ বোঝায়।]

 

ঈশা বাস্যমিদং সর্বং যৎ কিঞ্চ জগত্যাং জগৎ।

তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জীথা মা গৃধঃ কস্য স্বিদ্ধনম্‌।। ১

ঈশা বাস্যম্‌ ইদম্‌ সর্বম্‌ যৎ কিঞ্চ জগত্যাং জগৎ।

তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জীথা মা গৃধঃ কস্য স্বিৎ ধনম্‌।।

এই জগতে যা কিছু অনিত্য বিষয় আছে, সর্বত্রই ঈশ্বর ব্যাপ্ত আছেন। এই জাগতিক বিষয়ের আসক্তি ত্যাগ ক’রে আনন্দ করো। ধন-সম্পদের কামনা ক’রো না, কারণ সে ধন-সম্পদ কার? (অর্থাৎ ঈশ্বরের)  

[এই শ্লোকটির সরলার্থ নিয়ে অনেকে তাঁদের সংশয়ের কথা বলেছেন, তাই মনে হল আরেকটু ব্যাখ্যার প্রয়োজন। অতএব এই সংযোজনঃ 

অতুলবাবু বলছেন "তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জিথা"- অর্থ "ত্যাগের সহিত ভোগ করিবে"। আবার স্বামীজী বলছেন, "উত্তমরূপে ত্যাগের দ্বারা (আত্মাকে) পালন কর"। কিন্তু এই দুটি অর্থের কোনটিই আমার মনঃপূত হয়নি। আমার যেটা মনে হয়েছে সেটা বিস্তারে বলি - 

শ্লোকের প্রথম লাইনে ঋষি বলছেন, এই ব্রহ্মাণ্ডের অনিত্য সব কিছুতেই ঈশ্বর ব্যাপ্ত রয়েছেন। অর্থাৎ তার মধ্যে থেকে খাদ্য, বস্ত্র এবং গৃহ উপাদান আমরা সংগ্রহ করতেই পারি - কারণ সেটা আমাদের প্রাপ্য - আমাদের ভোগ্য - আমাদের জীবনধারণের জন্যে। এ শ্লোকের "ভুঞ্জিথা" শব্দটাও খুব তাৎপর্যপূর্ণ বলে আমার মনে হয়েছে। মনে হয় একথাটির অর্থ  সাধারণ "ভোগ" বলতে আমরা যা বুঝি - তার থেকেও অনেক ব্যাপ্ত। ভুঞ্জিথার নিকটতম তৎসম শব্দ আমার মনে হয় ভোজন। সেক্ষেত্রে ভোজন-সীমা বলে একটা ব্যাপার মাথায় আসে - অর্থাৎ ভালো থাকার জন্যে যে পরিমাণ খাদ্য গ্রহণ করলে আমরা সুস্থ-কুশল থাকি - সেটাই ভুঞ্জিথা - ভোজন বা ভোগের সীমা। তার অতিরিক্ত খাদ্য ত্যাগ করাই কর্তব্য। এখানে খাদ্য কথাটা বললাম একটা উদাহরণ হিসাবে - খাদ্য ছাড়াও  মাত্রাতিরিক্ত অর্থ, মাত্রাতিরিক্ত সম্পদাদি সমান ভাবে প্রযোজ্য।  এই সীমার বাইরে অতিরিক্ত যা কিছু সব ত্যাগ করতে হবে। 

দ্বিতীয় লাইনের "মা গৃধঃ" কথাটিও আমার ভীষণ তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়েছে। উল্লিখিত দুটি গ্রন্থেই "মা গৃধঃ" -র অর্থ বলা হয়েছে "লোভ করিও না"। সংস্কৃতে লোভ এবং তার সমার্থক শব্দ বেশ কিছু আছে - কিন্তু "গৃধঃ" কথাটা বেশ অসাধারণ। গৃধঃ শব্দের মূল গৃধ্‌, এই মূল থেকেই গৃধ্র কথাটি এসেছে যার অর্থ শকুনি - আমরা মনে করি "শকুনি" মানে অত্যন্ত লোভী - যে অন্যের মুখের গ্রাস ছিনিয়ে নেয়। সেক্ষেত্রে সম্পূর্ণ দ্বিতীয় লাইনটির অর্থ হতে পারে - অত্যন্ত লোভ করো না, (যতটুকু প্রয়োজন তার বেশি সব কিছু) ত্যাগ করে ভোগ করো - কারণ এই সম্পদ বা ধন কার? ঈশ্বরের।] 

[এই ব্যাখ্যাতে আমি আরেকটি ভয়ানক বিতর্কের অবতারণা করলাম - সেটা ওঠার আগেই মিটিয়ে দিই। শকুনি একধরনের পাখি - বেশ বিপন্ন প্রাণী। মহাভারতের শকুনি মামা, শকুনের চোখ, এমনকি ইংরিজিতেও একটি প্রবাদ শুনেছি - "Vulture is a patient bird" - কারণ মৃতপ্রায় প্রাণীর মৃত্যুর অপেক্ষায় শকুনি বহুক্ষণ বসে থাকতে পারে এবং প্রাচীন কাল থেকেই ধরে নেওয়া হয়েছে - শকুন ওই মৃতপ্রায় প্রাণীর মৃত্যু কামনা করে - সে এতটাই লোভী। একই কথা প্রযোজ্য হিন্‌স্‌ মূল থেকে উৎপন্ন দুটি শব্দ - হিংসা এবং হিংস্র - বাঘ, সিংহের অত্যন্ত হিংসার জন্যেই তাদের আমরা হিংস্র বলি। 

কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় শকুনি কিংবা বাঘ-সিংহ চনমনে খিদে না পেলে খাদ্য সংগ্রহে বা শিকারে বের হয় না এবং ভবিষ্যতের জন্যে হরিণের মাংস সঞ্চয় করে রাখার কোন ব্যবস্থা তারা আজ পর্যন্ত গড়ে তুলতে পারেনি।  অর্থাৎ শকুনি, বাঘ, সিংহাদি মাংসাশী প্রাণীর ঘাড়ে বদনাম চাপিয়ে, মানুষই পারে - লক্ষ-কোটি মানুষ ও প্রাণীকে বঞ্চিত করে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ সঞ্চয় করতে - সে নামে হোক, বেনামে হোক, স্বদেশে হোক বা বিদেশে হোক। সেক্ষেত্রে আজকের দিনে বসে ঋষিমশাই হয়তো বলতেন "মা মানুষ্যঃ" - মানুষের মতো তীব্র লোভ কর না।] 

এই গভীর তাৎপর্যের কারণেই এই উপনিষদের এই শ্লোকটির এত গুরুত্ব - যেটি পড়ে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ "মহর্ষি" হয়ে উঠেছিলেন - মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন শুধু এই শ্লোকটি ছাড়া অন্য সব শাস্ত্র পুড়ে গেলেও কোন ক্ষতি নেই - তবু হিন্দু ধর্মের চেতনা অটুট থাকবে।         


কুর্বন্নেবেহ কর্মাণি জিজীবিষেচ্ছতং সমাঃ।

এবং ত্বয়ি নান্যথেতোঽস্তি ন কর্ম লিপ্যতে নর।। ২

কুর্বন্‌ এব ইহ কর্মাণি জিজীবিষেৎ শতম্‌ সমাঃ।

এবং ত্বয়ি ন অন্যথা ইতঃ অস্তি ন কর্ম লিপ্যতে নর।।

কোন ব্যক্তির শতবর্ষ বাঁচার ইচ্ছে হলেও, তাকে সর্বদাই কর্তব্য কর্ম করে যেতে হয়; এ ছাড়া অন্য উপায় নেই, কিন্তু এই কর্তব্য কর্ম যেন তার মনে আসক্তি সৃষ্টি না করে।

 

অসূর্যাঃ নাম তে লোকা অন্ধেন তমসাবৃতাঃ।

তাংস্তে প্রেত্যাভিগচ্ছন্তি যে কে চাত্মহনো জনাঃ।। ৩

অসূর্যাঃ নাম তে লোকা অন্ধেন তমসা-আবৃতাঃ।

তান্‌ তে প্রেত্য অভিগচ্ছন্তি যে কে চ আত্মহনঃ জনাঃ।।

আত্মার উপলব্ধি নেই যে সকল ব্যক্তির, তারা মৃত্যুর পর অজ্ঞানের অন্ধকারে, অন্ধের মতো জ্যোতিহীন তমসাচ্ছন্ন অসুরলোকে যাত্রা করে।


অনেজদেকং মনসো জবীয়ো

নৈনদ্দেবা আপ্নুবন্‌ পূর্বমর্ষৎ।

তদ্ধাবতোঽন্যানত্যেতি তিষ্ঠৎ

তস্মিন্নপো মাতরিশ্বা দধাতি।। ৪

অনেজৎ একম্‌ মনসঃ জবীয়ঃ

ন এনৎ দেবাঃ আপ্নুবন্‌ পূর্বম্‌ অর্ষৎ।

তৎ ধাবতঃ অন্যান্‌ অতি-এতি তিষ্ঠৎ

তস্মিৎ অপঃ মাতরিশ্বা দধাতি।।

এই আত্মা গতিহীন, অথচ মনের থেকেও দ্রুত গতিশীল। আত্মা অত্যন্ত দ্রুতগামী বলেই ইন্দ্রিয়সমূহ আত্মার সন্ধান পায় না। আত্মা স্থির থেকেও মন ও ইন্দ্রিয়সকলকে অতিক্রম করেন। আত্মার উপস্থিতির কারণেই বায়ু সমস্ত কর্মের বিভাগ করতে পারেন।

[আগুনের দাহিকা, সূর্যের জ্যোতি, মেঘের বর্ষণ ইত্যাদি কর্মের বিভাগ।]

 

তদেজতি তন্নৈজতি তদ্দূরে তদ্বন্তিকে।

তদন্তরস্য সর্বস্য তদু সর্বস্যাস্য বাহ্যতঃ।। ৫

তৎ এজতি তৎ ন এজতি তৎ দূরে তৎ উ অন্তিকে।

তৎ অন্তরস্য সর্বস্য তৎ উ সর্বস্য অস্য বাহ্যতঃ।। ৫

আত্মা স্থির, আত্মা চঞ্চল। অজ্ঞানীর থেকে তিনি দূরে থাকেন, কিন্তু জ্ঞানীর খুব কাছেই থাকেন। তিনি সমস্ত জগতের অন্তরে রয়েছেন, আবার বাইরেও তিনিই রয়েছেন

 

যস্তু সর্বাণি ভূতান্যাত্মন্যেবানুপশ্যতি।

সর্বভূতেষু চাত্মানং ততো ন বিজুগুপ্সতে।। ৬

যঃ তু সর্বাণি ভূতানি আত্মনি এব অনুপশ্যতি।

সর্বভূতেষু চ আত্মানং ততঃ ন বিজুগুপ্সতে।।

কিন্তু যে ব্যক্তি জগতের সমস্ত বিষয়কে আত্মস্বরূপে এবং সর্ব বিষয়ের মধ্যে নিজের আত্মাকে দেখতে পান, তিনি কাউকেই বিদ্বেষ করতে পারেন না।

 

যস্মিন্‌ সর্বাণি ভূতান্যাত্মৈবাভূদ্বিজানতঃ।

তত্র কো মোহঃ কঃ শোক একত্বমনুপশ্যতঃ।। ৭

যস্মিন্‌ সর্বাণি ভূতানি আত্ম এব অভূৎ বিজানতঃ।

তত্র কঃ মোহঃ কঃ শোকঃ একত্বম্‌ অনুপশ্যতঃ।।

জগতের সমস্ত বিষয়ের আত্মা যখন জ্ঞানীর আত্মার সঙ্গে মিলে একাকার হয়ে যায়, তখন সেই একাত্ম জ্ঞানীর কাছে, মোহই বা কি; শোকই বা কিসের?

 

স পর্যগাচ্ছুক্রমকায়মব্রণমস্নাবিরং শুদ্ধমপাপবিদ্ধম্‌।

কবির্মনীষী পরিভূঃ স্বয়ম্ভূর্যাথাতথ্যতোঽর্থান্‌ ব্যদধাচ্ছাশ্বতীভ্যঃ সমাভ্যঃ।। ৮

স পর্যগাৎ শুক্রম্‌ অকায়ম্‌ অব্রণম্‌ অস্নাবিরম্‌ শুদ্ধম্‌ অপাপবিদ্ধম্‌।

কবিঃ মনীষী পরিভূঃ স্বয়ম্ভূঃ যাথা-তথ্যতঃ অর্থান্‌ ব্যদধাৎ শাশ্বতীভ্যঃ সমাভ্যঃ।।

এই আত্মা সর্বব্যাপী, জ্যোতির্ময়, অবয়বহীন, অক্ষত, স্নায়ুশিরাহীন, পবিত্র ও অপাপবিদ্ধ। সর্বদর্শী মনের অধিকারী, সবার শ্রেষ্ঠ এবং স্বয়ম্ভূ এই আত্মা, কর্মফল ও তত্ত্বজ্ঞান অনুযায়ী শাশ্বতকাল ধরে যথাযথ কর্তব্য কর্ম স্থির করে দিয়েছেন।

 

অন্ধং তমঃ প্রবিশন্তি যেঽবিদ্যামুপাসতে।

ততো ভূয় ইব তে তমো য উ বিদ্যায়াং রতাঃ।। ৯

অন্ধং তমঃ প্রবিশন্তি যে অবিদ্যাম্‌ উপাসতে।

ততঃ ভূয়ঃ ইব তে তমঃ য উ বিদ্যায়াং রতাঃ।।

যাঁরা অবিদ্যা কর্মের উপাসনা করেন, তাঁরা অজ্ঞানের অন্ধকারে প্রবেশ করেনযাঁরা কর্মহীন হয়ে দেবতাদের উপাসনাকে বিদ্যা মনে করেন, তাঁরা আরো বেশি অন্ধকারে নিমজ্জিত হন।

 

অন্যদেবাহুর্বিদ্যয়াঽন্যদাহুরবিদ্যয়া।

ইতি শুক্রম্‌ ধীরাণাং যে নস্তদ্বিচচক্ষিরে।। ১০

অন্যৎ এব আহুঃ বিদ্যয়া অন্যৎ আহুঃ অবিদ্যয়া।

ইতি শুক্রম্‌ ধীরাণাং যে নঃ তৎ বিচচক্ষিরে।।

যে সকল জ্ঞানী ব্যক্তি এই অবিদ্যা ও বিদ্যার ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তাঁরা বলেছেন, ‘অবিদ্যা ও বিদ্যার ফল আলাদা হয়, আমরা এমনই শুনেছি’

 

বিদ্যাং চাবিদ্যাং চ যস্তদ্বেদোভয়ং সহ।

অবিদ্যয়া মৃত্যুং তীর্ত্বা বিদ্যয়াঽমৃতমশ্নুতে।। ১১

বিদ্যাম্‌ চ অবিদ্যাম্‌ চ যঃ তৎ বেদ উভয়ং সহ।

অবিদ্যয়া মৃত্যুং তীর্ত্বা বিদ্যয়া অমৃতম্‌ অশ্নুতে।।

যিনি অবিদ্যা ও বিদ্যা উভয়ই জানেন, অর্থাৎ অবিদ্যার কর্ম দিয়ে দেবতার উপাসনারূপ বিদ্যার চর্চা করেন, তিনি সেই কর্ম দিয়ে মৃত্যুকে জয় করেন ও বিদ্যা দিয়ে দেবাত্মভাব লাভ করেন।

 

অন্ধং তমঃ প্রবিশন্তি যেঽসম্ভূতিমুপাসতে।

ততো ভূয় ইব তে তমো য উ সম্ভূত্যাং রতাঃ।। ১২

অন্ধম্‌ তমঃ প্রবিশন্তি যে অসম্ভূতিম্‌ উপাসতে।

ততঃ ভূয় ইব তে তমঃ য উ সম্ভূত্যাং রতাঃ।।

যাঁরা অসম্ভূতি অর্থাৎ অবিদ্যাস্বরূপ প্রকৃতির উপাসনা করেন, তাঁরা অন্ধকারে অন্ধের মতো প্রবেশ করেন। কিন্তু যাঁরা সম্ভূতি অর্থাৎ প্রকৃতির থেকে উৎপন্ন কার্যব্রহ্মের উপাসনা করেন, তাঁরা আরো ঘন অন্ধকারে প্রবেশ করেন।

 

অন্যদেবাহুঃ সম্ভবাদন্যদাহুরসম্ভবাৎ।

ইতি শুশ্রুম্‌ ধীরাণাং যে নস্তদ্বিচচক্ষিরে।। ১৩

অন্যৎ এব আহুঃ সম্ভবাৎ অন্যৎ আহুঃ অসম্ভবাৎ।

ইতি শুশ্রুম্‌ ধীরাণাং যে নঃ তৎ বিচচক্ষিরে।।

যাঁরা এই দুই উপাসনায় ফলের ব্যাখ্যা করেছেন, সেই জ্ঞানীদের কাছে আমরা শুনেছি, ‘প্রকৃতির উপাসনার ফল একরকম এবং পরমব্রহ্মের উপাসনার ফল অন্যরকম’।

 


সম্ভূতিং চ বিনাশং চ যস্তদ্বেদোভয়ং সহ।

বিনাশেন মৃত্যুং তীর্ত্বাঽসম্ভূত্যাঽমৃতমশ্নুতে।। ১৪

সম্ভূতিম্‌ চ বিনাশম্‌ চ যঃ তৎ বেদ অভয়ং সহ।

বিনাশেন মৃত্যুম্‌ তীর্ত্বা অসম্ভূত্যা অমৃতম্‌ অশ্নুতে।।

যিনি সম্ভূতি ও বিনাশ – এই দুই তত্ত্বই উপলব্ধি করেছেন, তিনি বিনাশের সাহায্যে মৃত্যুকে অতিক্রম করে, সম্ভূতিরূপ অমৃতত্ব লাভ করতে পারেন।

 

হিরণ্ময়েন পাত্রেণ সত্যস্যাপিহিতং মুখম্‌।

তত্ত্বং পূষন্নপাবৃণু সত্যধর্মায় দৃষ্টয়ে।। ১৫

হিরণ্ময়েন পাত্রেণ সত্যস্য অপিহিতং মুখম্‌।

তৎ ত্বম্‌ পূষন্‌ অপাবৃণু সত্যধর্মায় দৃষ্টয়ে।।

হে পূষন, সোনার পাত্রের আড়ালে আপনি যেন সত্যের মুখ ঢেকে রেখেছেন, আমাদের সত্যচেতনার জন্য আপনি তাকে উন্মুক্ত করুন।

 

পূষন্নেকর্ষে যম সূর্য প্রাজাপত্য ব্যূহ রশ্মীন্‌

সমূহ তেজো যত্তে রূপ্নগ কল্যাণতমং তত্তে পশ্যামি।

যোঽসাবসৌ পুরুষঃ সোঽমস্মি।। ১৬

পূষন্‌ এক-ঋষে  যম সূর্য প্রাজাপত্য ব্যূহ রশ্মীন্‌

সমূহ তেজঃ যৎ তে রূপম্‌ 

কল্যাণতমম্‌ তৎ তে  পশ্যামি।

যঃ অসৌ অসৌ পুরুষঃ সঃ অহম্‌ অস্মি।।

  হে পূষন, হে একর্ষি, হে যম, হে সূর্য, হে প্রজাপতিপুত্র, আপনি উজ্জ্বল কিরণ সংযত করুন, আপনার তেজ প্রশমিত করুন, আপনার পরমকল্যাণ রূপ আমি দেখব। ঐ আদিত্যমণ্ডলে অবস্থিত যে পুরুষ রয়েছেন, তিনিই আমি।

[পূষন- যিনি জগতের পোষণ করেন, একর্ষি > এক ঋষি – যিনি একা বিচরণ করেন এবং বহুর মধ্যে যে একের প্রকাশ, তিনি সেই এককে দেখতে পান। সূর্য জগতের পোষণ করেন, অতএব তিনি পূষণ। তিনি আকাশপথে একাই বিচরণ করেন, অতএব তিনি একর্ষি। তিনি ধর্মের নিয়ামক রূপে যম। যজ্ঞের আরেক নাম প্রজাপতি, এই যজ্ঞ সূর্যের জনক এবং ঊষা তাঁর জননী, অতএব সূর্য প্রজাপতির পুত্র।]     

 

বায়ুরনিলমমৃতমেদং  ভস্মান্তং শরীরম্‌।

ওঁ ক্রতো স্মর কৃতং স্মর ক্রতো কৃতং স্মর।। ১৭

বায়ুঃ অনিলম্‌ অমৃতম্‌ ইদম্‌ ভস্ম-অন্তম্‌ শরীরম্‌।

ওঁ ক্রতঃ স্মর কৃতম্‌ স্মর ক্রতঃ কৃতম্‌ স্মর।।

মৃত্যুর সময় আমার এই প্রাণবায়ু চিরন্তনী মহাবায়ুর সঙ্গে মিলিত হোক। আমার এই শরীর ভস্ম হয়ে যাক। হে পরমাত্মন্‌ অগ্নি, আমার মনের সকল সংকল্প স্মরণ করুন, আমি যা কিছু করেছি, সে সবও স্মরণ করুন। আমার সংকল্প স্মরণ করুন, আমার কৃতকর্ম স্মরণ করুন।

 

অগ্নে নয় সুপথা রায়ে অস্মান্‌

বিশ্বানি দেব বয়ুনানি বিদ্বান্‌।

যুযোধ্যস্মজ্জুহুরাণমেনো ভূয়িষ্ঠাং

তে নম-উক্তিং বিধেম।। ১৮

অগ্নে নয় সুপথা রায়ে অস্মান্‌

বিশ্বানি দেব বয়ুনানি বিদ্বান্‌।

যুযোধি অস্মৎ জুহুরাণম্‌ এনঃ ভূয়িষ্ঠাং

তে নম-উক্তিং বিধেম।। ১৮

হে অগ্নি, সম্পদ্‌লাভের জন্য আপনি আমাদের সুপথে নিয়ে চলুন। হে দেব, আপনি এই বিশ্বচরাচরে সকলের কর্ম ও প্রবৃত্তির কথা জানেন। অতএব, কুটিল পাপ থেকে আপনি আমাদের মুক্ত করুন। আপনার প্রতি বারবার প্রণাম-বচন উচ্চারণ করি।

  নিরাকার রূপেও তিনি পূর্ণ, সাকার রূপেও তিনি পূর্ণ,

পূর্ণ থেকেই পূর্ণের সৃষ্টি, পূর্ণ থেকে পূর্ণ গ্রহণ করলেও, পূর্ণই অবশিষ্ট থাকেন।

হে পরমাত্মন, সকল বিঘ্নের শান্তি হোক।


কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ স্বামী গম্ভীরানন্দ, উদ্বোধন কার্যালয় ও শ্রীযুক্ত অতুলচন্দ্র সেন, হরফ প্রকাশণী।

                                                        -০০-  

   

পরের পর্ব - " কঠোপনিষদ - ১/১

  


নতুন পোস্টগুলি

শুধু _তুই .কম - পর্ব ২০

 প্রথম   ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "  দ্বিতীয়  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন র...