সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৫/১২

 ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "

ধর্মাধর্ম শেষ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৫/১ "

 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  


[এর আগের পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৫/১১ "]


৫.৩.৩ মহাভারতের অশুদ্ধি

মহর্ষি বেদব্যাস বেদের সংকলন এবং মহাভারত রচনা তখন সমাপ্ত করেছেন। তিনি তখন বৃদ্ধ। সমগ্র দেশের পণ্ডিতমহলে তাঁর অশেষ যশ ও সম্মান। কিন্তু তাঁর মনে শান্তি নেই। মহর্ষি বেদব্যাস অদ্ভূত এক মানসিক উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। তার কারণ তাঁর যুবক পুত্র শুকদেব, যিনি সর্বজন শ্রদ্ধেয় এক সিদ্ধযোগী ব্রহ্মর্ষি। সে কখনো কখনো শিশুর মতো নগ্ন অবস্থায় বিচরণ করে, তার থাকা-খাওয়ার কোন স্থিরতা নেই। মহর্ষি এই পুত্রের জন্যে বড়ো বিব্রত বোধ করেন। একদিন আশ্রম থেকে নগ্ন হয়ে শুকদেব বেরিয়ে পড়লেন, তাঁকে আটকাতে তিনিও দৌড়লেন পুত্রের পিছনে। পথের ধারে এক সরোবরে কয়েকজন অপ্সরা স্নান করছিল, যুবক শুকদেব নগ্ন অবস্থাতেই ওই সরোবরের পাশ দিয়ে যখন হেঁটে গেলেন, অপ্সরাগণ এতটুকু বিচলিত হল না। কিন্তু বৃদ্ধ বেদব্যাস পুত্রকে অনুসরণ করে সরোবরের কাছাকাছি যেতেই অপ্সরা কন্যারা লজ্জায় সচকিতে তাদের অঙ্গ আবৃত করল। মহর্ষি বেদব্যাস বিস্মিত হলেন, তিনি অপ্সরাদের এর কারণ জিজ্ঞাসা করাতে তারা সলজ্জ নতমুখে বলল, “দয়া করে অপরাধ নেবেন না, মহর্ষি বেদব্যাস, আপনার পুত্র শুকদেব শিশুর মতো, তাঁর নির্মল দৃষ্টিতে স্ত্রী-পুরুষে প্রভেদ নেই, কিন্তু আপনার...”।

মহর্ষি বেদব্যাস আরও বিষণ্ণ হলেন। তিনি চার বেদের সংকলন করেছেন, অজস্র শিষ্যকে বেদের পাঠ দিয়েছেন। শূদ্র এবং নারীদের বেদপাঠ নিষিদ্ধ বলে, তিনি পঞ্চম বেদস্বরূপ মহাভারত রচনা করে, সকলের কাছে বেদের জ্ঞান প্রকাশ করেছেন। তিনি উপলব্ধি করলেন, পূর্ণ জ্ঞান অর্জন করা সত্ত্বেও, তিনি পূর্ণ ব্রহ্মলাভ করতে পারেননি। সামান্য অপ্সরাগণও তাঁর মতো জ্ঞানবৃদ্ধের দৃষ্টিতে সমদর্শন দেখতে না পেয়ে, লজ্জিতা হয়, তাঁকে সাধারণ মানুষ বলেই মনে করে! সেদিন সরস্বতী নদীর তীরে বসে, নির্জন গোধূলিতে তিনি চিন্তা করতে বসলেন, তবে কী আমার জ্ঞান অসম্পূর্ণ এবং অপরিণত?

সেখানে উপস্থিত হলেন ত্রিকালজ্ঞ দেবর্ষি নারদ। তিনি মহর্ষিকে তাঁর বিষণ্ণতার কারণ জিজ্ঞাসা করলেন। মহর্ষি তাঁর মানসিক অবস্থার কথা সবিস্তারে যখন বললেন, দেবর্ষি মনোযোগে শুনলেন। তারপর দেবর্ষি বললেন, “হে মুনিবর, মহাভারতে আপনি নানাবিধ অলঙ্কার ও উপমায় ধর্ম সাধনার কথা বলেছেন, ধর্ম ও অধর্মের বিচার করেছেন, তার কর্মফলের নির্দেশ দিয়েছেন। এক কথায় মহাভারতের কাহিনীসমূহ বায়স-চিত্ত-বাসনাগ্রস্ত মানুষের উপযুক্ত হয়েছে। তারা কাকের মতোই ওই গ্রন্থের অলংকার, উপমা এবং সুরচিত কাহিনীগুলি ঠুকরে উপভোগ করে, অন্যত্র উড়ে যাবে। ব্রহ্মনিষ্ঠ সত্ত্বপ্রধান ভক্ত-হংসেরা কখনো মহাভারতে বিহার করবেন না। কারণ মহাভারতে ভগবানের যশোগান নেই, মহিমাগাথা নেই। অশুদ্ধপদে, ভ্রান্ত উপমায় বাসুদেবের মহিমা কীর্তন করে লেখা নিরলঙ্কার গ্রন্থও মহান গ্রন্থ, কিন্তু ভক্তিহীন জ্ঞানের আকর গ্রন্থ মূল্যহীন। কারণ ওই গ্রন্থপাঠে ভগবানকে অনুভব করা যায় না। আপনি দৃঢ়ব্রত, সত্যনিষ্ঠ, পুণ্যকীর্তি, বহুদর্শী ও বেদশাস্ত্রে পারদর্শী। আপনি অখিল বিশ্বের বন্ধনমুক্তির জন্যে শ্রীহরির লীলা কীর্তন করুন। যা পাঠ করলে, বিদ্বান ব্যক্তিদের জানার আর কোন বিষয় অবশিষ্ট থাকে না, আপনি সেই ভগবানের মহিমা কীর্তন করুন। 

উপরের ঘটনাটি শ্রীমদ্ভাগবত-সংহিতার (পুরাণ) প্রাক-কথনের সংক্ষিপ্তসার। এরপরেই মহর্ষি বেদব্যাস এই গ্রন্থ রচনা শুরু করেছিলেন। কিন্তু স্পষ্টতঃই এই কাহিনী কল্পিত এবং আরোপিত। কারণ আমরা আগেই দেখেছি, মহর্ষি বেদব্যাসের সময়কাল, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সমসাময়িক, মোটামুটি ৯০০ বি.সি.ই-তে। বিশেষজ্ঞরা বলেন পুরাণগুলির সম্ভাব্য রচনা কাল খ্রী.পূ. দ্বিতীয় শতাব্দী থেকে শুরু হয়ে গুপ্তযুগ পর্যন্ত। এবং আমার মনে হয় শ্রীমদ্ভাগবত সম্ভবতঃ গুপ্তযুগের সমকালীন রচনা, কারণ সে সময় ব্রাহ্মণ্য ধর্ম, সম্পূর্ণ হিন্দুধর্ম হয়ে উঠেছে। আমার এই অনুমানের আরও কারণ, অন্যান্য পুরাণ গ্রন্থগুলির তুলনায় শ্রীমদ্ভাগবত অনেক পরিণত রচনা এবং বক্তব্যের দিক দিয়েও অত্যন্ত স্বচ্ছ। মহাভারত রচনার প্রায় পনেরশ’ বছর পরে মহর্ষি বেদব্যাসের বিষণ্ণ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা কোথায়

 অতএব এমন সিদ্ধান্ত করাই যায়, মহাভারত রচয়িতা মহর্ষি বেদব্যাসের যশ ও জনপ্রিয়তাকে ব্যবহার করে, পুরাণকাররা, তাঁর নামের আড়ালে প্রায় সকল পুরাণ রচনা করেছেন। পৌরাণিক ভক্তিতে ভারতভূমিকে প্লাবিত করার আগে, উপরে বর্ণিত কাহিনীর একটি প্রেক্ষাপট রচনা তাঁদের প্রয়োজন ছিল। কাল্পনিক এই ঘটনা থেকে সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তাঁরা মহর্ষি বেদব্যাসের রচিত মহাভারতকেও ছেড়ে দেননি। কাক-ভক্ষ্য মহাভারতকে, হংস-বিহারী মহাভারতে রূপান্তরের জন্যে মহাভারতে তাঁরা বহু অধ্যায়েরই অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছেন। 

 

৫.৪.১ শ্রীমদ্ভাগবতের কৃষ্ণ

শ্রীমদ্ভাগবত পূর্ণতঃ বিষ্ণুর মহিমা বর্ণন। তার মধ্যে অবশ্যই সিংহভাগ দখল করেছেন শ্রীকৃষ্ণ। এই পুরাণে শ্রীকৃষ্ণের মর্ত্যলীলার যাবতীয় ঘটনার কথা জানা যায়। শ্রীকৃষ্ণের জন্ম বিবরণের কথা ভারতীয় হিন্দুদের অতি পরিচিত, সে বর্ণনায় যাচ্ছি না। একটিমাত্র বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। কৃষ্ণের জন্মের পরেই মাতা যশোদার কন্যার সঙ্গে মাতা দেবকীর পুত্রের বদলাবদলি ঘটিয়ে ছিলেন পিতা বসুদেব। মাতা দেবকীর অষ্টম গর্ভের সন্তান ভেবে, রাজা কংস এই কন্যাটিকে যখন হত্যা করতে গেলেন, দেখা গেল, এই কন্যা কোন সাধারণ শিশু নয়, তিনি দেবী যোগমায়া। তিনি অষ্টভুজা দেবী, তাঁর হাতে ধনু, শূল, বাণ, চর্ম, খড়গ, অসি, চক্র ও গদা। তিনি দিব্যমালা, বসন ও রত্ন-অলংকারে ভূষিতা। পুজোর অর্ঘ নিয়ে তাঁর সঙ্গীরা - সিদ্ধ, চারণ, গন্ধর্ব, কিন্নর, অপ্সরা ও উরগগণ - তাঁর স্তুতি করছিল। বলা বাহুল্য, এই দেবী অনার্য দেবী, কৃষ্ণের জন্মের নিরাপত্তার জন্যেই তিনি মাতা যশোদার গর্ভে আবির্ভূতা হয়েছিলেন।

এরপর কৃষ্ণের শৈশব, বাল্য ও কৈশোরের নানান আশ্চর্য লীলার কথা আমরা সকলেই জানি, তবুও আরেকবার সংক্ষেপে আলোচনা করে নেওয়া যাক।

রাজা কংস দেবকীর কন্যা সন্তানের দেবী রূপ দেখেও নিশ্চিন্ত হতে পারলেন না, কারণ অন্তর্হিত হওয়ার আগে দেবী ঘোষণা করেছিলেন, “রে দুষ্ট কংস, আমাকে মেরে তুই কী করবি? তোর শত্রু তোর মৃত্যুরূপে কোথাও না কোথাও জন্ম নিয়েছেন। অতএব, এরপর তুই আর অন্য নিরাপরাধ শিশুদের অকারণ বধ করিস না”। কংসের মন্ত্রণাদাতারা সকলেই ছিলেন, রাক্ষস বা দৈত্য-দানব। তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ করে, তিনি স্থির করলেন, মথুরা, ব্রজ (বৃন্দাবন) এবং আশেপাশের গ্রামের শিশুদের, যাদের বয়স দশদিনের আশেপাশে, তাদের হত্যা করবেন। ভোজরাজ কংসের এই “কৃষ্ণ-হত্যা” সিদ্ধান্তের সঙ্গে রোম প্রশাসক হেরডের “যিশু-হত্যা” ঘোষণার আশ্চর্য মিল। দুই কাহিনীর কোনটি মূল এবং কোনটি অন্যকে প্রভাবিত করেছিল, আজ তার হদিশ খুঁজে পাওয়া অসম্ভব।

শ্রীকৃষ্ণ শৈশব থেকেই অলৌকিক শক্তির অধিকারী, আর হবে নাই বা কেন, মানুষের রূপে তিনিই যে পরমপুরুষ পুরুষোত্তম ঈশ্বর বিষ্ণু। তাঁর নিত্য সঙ্গী ছিলেন তাঁর বৈমাত্রেয় দাদা, বলরাম, গোপরাজা নন্দর পত্নী রোহিণীর পুত্র। তিনিও বিষ্ণুর অংশ-অবতার। দুই ভাইকে একত্রে রাম-কৃষ্ণও বলা হত। শৈশব থেকে বাল্য বয়েসের মধ্যেই তিনি অনেকগুলি কীর্তি করে ফেললেন। কৃষ্ণকে বধ করতে রাজা কংস তাঁর যে অনুচরদের পাঠাচ্ছিলেন, যেমন পূতনা রাক্ষসী, দৈত্য তৃণাবর্ত বা চক্রবাত, বৎসাসুর, বকাসুর, ধেনুকাসুর, অঘাসুর বা অজগর অসুর, অরিষ্টাসুর, কেশী দৈত্য, প্রলম্ব– সকলেই কৃষ্ণের হাতে নিহত হলেন। তরুণ বয়সে তিনি দমন করলেন কালিয় নাগকে।

এই কাহিনীগুলিতে অলৌকিক রোমাঞ্চ অনুভব করা ছাড়া আর কোন তাৎপর্য নেই।  অবশ্য চিন্তা করলে একটি তাৎপর্য মনে আসে, শ্রীকৃষ্ণের মামা রাজা কংস নিশ্চয়ই অনার্য? তা নাহলে তাঁর মন্ত্রণাদাতা পারিষদ থেকে শিশু কৃষ্ণকে বধ করতে আসা অনুচরী/অনুচররা রাক্ষসী, দৈত্য, অসুর কেন? সদ্যজাত শ্রীকৃষ্ণকে রক্ষা করতে শিশুকন্যা রূপে জন্ম নিলেন অনার্য দেবী যোগমায়া, আবার তাঁকে হত্যা করতে রাজা কংস “সুপারি” দিলেন অনার্য খুনীদের! অতএব শ্রীকৃষ্ণর সঙ্গে মাতুল কংস ও মাতুলের শ্বশুর জরাসন্ধের সঙ্গে যে দীর্ঘ বিবাদ সেটি আসলে ছিল অনার্য যদু, বৃষ্ণি, শূরসেন, ভোজ, অন্ধক ও চেদি গোষ্ঠীর অন্তর্দ্বন্দ্ব। সে কথা আগেও বলেছি, এই গ্রন্থের ২.৬.২ অধ্যায়ে।

এবার শ্রীকৃষ্ণের বাল্যলীলার দুটি ঘটনা, আমার কাছে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়েছে, সে দুটির উল্লেখ এখানে করছি। 

 

৫.৪.১.১ ব্রাহ্মণযজ্ঞে অন্ন প্রার্থনা

একবার যমুনা তীরে গোচারণের সময় রাম-কৃষ্ণ সহ সকল গোপবালক ক্ষুধার্ত হয়ে পড়েছিলেন। শ্রীকৃষ্ণ গোপবালকদের বললেন, “একটু দূরেই দেখ, ব্রাহ্মণরা দেবযজ্ঞ করছেন। সেখানে গিয়ে তোরা দাদা আর আমার নাম করে বল, আমরা সবাই ক্ষুধার্ত আমাদের অন্নদান করুন”। গোপবালকরা যজ্ঞস্থলে গিয়ে ব্রাহ্মণদের সেকথা বলাতে, ব্রাহ্মণেরা “হ্যাঁ” বা “না” কোন উত্তর দিলেন না। গোপবালকরা ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসে শ্রীকৃষ্ণকে সব কথা বলাতে, কৃষ্ণ হাসলেন, বললেন, “এবার তোরা ব্রাহ্মণীদের কাছে যা, সেখানে গিয়ে একই কথা বলবি”। গোপবালকরা এবার ব্রাহ্মণীদের কাছে গিয়ে রাম ও কৃষ্ণের নামে অন্ন প্রার্থনা করল।

ব্রাহ্মণীরা কৃষ্ণের অনেক কথা আগেই শুনেছিলেন। তিনি কাছেই যমুনাতীরে রয়েছেন শুনে, তাঁরা উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন। প্রচুর অন্ন এবং সুস্বাদু খাদ্যের সম্ভার নিয়ে তাঁরা প্রায় দৌড়ে এলেন। কৃষ্ণের শ্যামলবরণ[1] কান্তি, পীতবসন, গলায় বনমালা, মাথায় শিখীপুচ্ছ দেখে তাঁরা বিহ্বলা হয়ে কৃষ্ণকে আলিঙ্গনও করে ফেললেন। রাম-কৃষ্ণ ও গোপবালকদের অন্ন ও খাদ্য নিবেদন করে, তাঁরা কিছুক্ষণ কৃষ্ণের সঙ্গে আলাপ করলেন। কিন্তু ফেরার সময় তাঁরা বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছিলেন, কারণ আসার সময় তাঁরা স্বামীদের অনুমতি না নিয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটে এসেছিলেন। উপরন্তু আবেগের বশে তাঁরা গোপবালক কৃষ্ণকে আলিঙ্গন করে ফেলেছিলেন। তাঁরা আশংকা করছিলেন, তাঁদের স্বামীরা হয়তো তাঁদের গ্রহণ করবেন না। কিন্তু কৃষ্ণ তাঁদের আশ্বাস দিলেন, সেরকম কিছু ঘটবে না, বললেন, “আপনারা আমাতেই সমর্পিত চিত্ত, নিবেদিত প্রাণ, অতএব কেউ আপনাদের কোন দোষ দেখবে না”। ব্রাহ্মণীরা যজ্ঞস্থলে ফিরে যেতে, সত্যিই কেউ কিছু বললেন না। ব্রাহ্মণরা নিজ নিজ পত্নীদের সঙ্গে যথারীতি যজ্ঞে আহুতি দিয়ে, যজ্ঞ সম্পন্ন করলেন।

ব্রাহ্মণ্য ধর্মের যজ্ঞ-অনুষ্ঠানে আহুতি দেওয়ার সময়, পত্নীদের পতির পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া আর কোন ভূমিকা থাকত না। সেই বুঝেই কী কৃষ্ণ এমন একটা ঘটনা ঘটিয়েছিলেন। তিনি কী অনুমান করেছিলেন, ব্রাহ্মণরা যজ্ঞের ব্যস্ততায় গোপবালকদের কথায় গুরুত্ব না দিলেও, অলস বসে থাকা দ্বিজপত্নীরা তাঁর নাম শুনলেই, তাঁকে দেখার জন্যে উদ্গ্রীব হয়ে উঠবেন? আশৈশব তাঁর অতিনায়কোচিত অলৌকিক কীর্তির সৌরভ যে মহিলা মহলে তাঁকে প্রবাদে পরিণত করেছে, সেটাও কী তিনি বুঝতে পেরেছিলেন? এও কী বুঝেছিলেন, নায়কের প্রতি মহিলাদের উদ্বেল আবেগকে তাঁদের স্বামীরা তেমন দোষাবহ মনে করেন না? ধন্য বটে তাঁর নারী ও নর-চরিত্র বিশ্লেষণ। 

চলবে...  



[1] ভালোবেসে আমরা যতই “শ্যামলবরণ” বা “রঙটা একটু চাপা” বলি না কেন, এই গাত্রবর্ণ অনার্য লক্ষণ। আদতে তিনি কৃষ্ণবর্ণই ছিলেন, তাই তাঁর নামও কৃষ্ণ। তাঁর কৃষ্ণবরণ বলিষ্ঠ কান্তিতে উজ্জ্বল পীতবসন, গলায় বনফুলের মালা, অঙ্গে হাল্কা স্বর্ণালঙ্কার এবং কেশে শিখীপক্ষ – অসাধারণ এক স্টাইল স্টেটমেন্ট। আর্য বা অনার্য – সে যে সভাতেই তিনি উপস্থিত হোন না কেন –তাঁর উপস্থিতি সর্বদাই প্রত্যয়ী পৌরুষরূপে অনন্য এক ঔজ্জ্বল্য সঞ্চার করে। এর সঙ্গে ছিল শৈশব থেকে আবাল্য, তাঁর নানান কীর্তির মহিমা। বাস্তবিক, এমন একজন ব্যক্তিত্ব সামনে এসে দাঁড়ালে, হয় মুগ্ধ হতে হয় অথবা ঈর্ষায় দগ্ধ হতে হয়, কিন্তু কোনমতেই অবহেলা করা যায় না। মহিলাদের আর দোষ কি?    


শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৬

শুধু _তুই .কম - পর্ব ১৯

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

এই উপন্যাসের শুরু - " @শুধু _তুই .কম - পর্ব ১



এর আগের পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১৮ 


১৯ 

সুনেত্র বরাবর দেখেছে, সোমবার দিন চেম্বারে পেশেন্টের সংখ্যা একটু বেড়ে ওঠে। সকালের দিকে কিছুটা বেশি, সন্ধের চেম্বারে বেশ কয়েকজন। অবশ্য একথাও ঠিক সকালের থেকে সন্ধ্যাতেই তার চেম্বারে বেশি ভিড় জমে। সকালের দিকে সাধারণতঃ বয়স্ক মানুষ ও মহিলাদের সংখ্যা বেশি থাকে। পুরুষরা সাধারণতঃ অবসরপ্রাপ্ত হন এবং মহিলারা হন বয়স্কা শ্বাশুড়ি, যাঁরা পুত্রবধূর হাতে সংসারের ভার তুলে দিয়ে চেম্বারে আসেন নিজেদের স্বাস্থ্য নিয়ে কিছুটা আলোচনা করতে। এই বয়স্ক মানুষরা সাধারণতঃ স্বচ্ছল এবং অতিমাত্রায় স্বাস্থ্য-সচেতন বা আরও একটু খুলে বললে, বাতিকগ্রস্ত হয়ে থাকেন। সামান্যতম শারীরিক অস্বস্তি হলেই তাঁরা ব্যস্ত হয়ে চলে আসেন ডাক্তারের কাছে।   

আর সন্ধ্যেয় আসেন অফিস বা কাজ থেকে ফেরা মানুষরা। কখনো নিজের জন্যেই, কখনো বা ছেলে-মেয়েদের জন্যে অথবা স্ত্রী-ভাই-বোনদের জন্যে। তাঁরা বৃদ্ধ বাবা-মাকেও নিয়ে আসেন, যাঁরা নিজেদের যে কোন অসুস্থতাকেই, মনে করেন সেরকম কিছুই হয়নি, কটা দিন ধৈর্য ধরলেই সেরে যাবে। অর্থাৎ সান্ধ্যকালীন চেম্বারেই শিশু থেকে বৃদ্ধ – সব বয়সের পেশেন্টদের বিচিত্র অসুস্থতা ও জটিলতা নিয়ে তাকে নাড়াচাড়া করতে হয়।

মা মারা যাবার কয়েকমাস পর, সে কর্পোরেট চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে, নিজস্ব চেম্বারে বসার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। প্রথম প্রথম সে বেশ বিবেকবান ডাক্তার হিসেবেই সকল নেট-ওয়ার্ক থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে চেয়েছিল। প্রায় বছর তিনেক প্রাইভেট প্র্যাকটিস করতে করতে সুনেত্র বুঝে গেছে, আজকাল মেডিক্যাল জগতটা আশ্চর্য নিখুঁত এক নেটওয়ার্কের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। অবশ্য এ নেটওয়ার্ক যে কর্পোরেট জগতে ছিল না তা নয়। কিন্তু তার অধিকাংশটাই নিঃশব্দে ঘটে যেত, এবং তার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সে জড়িত ছিল না। বুঝতে পারত সবই, কিন্তু সব কিছুই ছিল তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

কিন্তু আজ সে প্রত্যক্ষভাবেই এই নেট-ওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে। শহরের উল্লেখযোগ্য ডায়াগ্নস্টিক ল্যাবরেটরিগুলির সকলেই তার পক্ষপাতের প্রত্যাশা করে। এই ব্যাপারটা তার কাছে নতুন। কারণ তার কর্পোরেট হসপিট্যালেই ছিল ইন-হাউস অত্যন্ত উন্নতমানের ল্যাবরেটরি। সেখানে পক্ষপাতিত্বের কোন বিষয় কোনদিন স্থান পায়নি। কিন্তু আজ তার রেকমেণ্ড করা প্যাথলজিক্যাল বা অন্যান্য নানান টেস্ট-রিপোর্ট, তার পেশেন্টরা যে ল্যাবরেটরি থেকেই করিয়ে আনুক না কেন, মাসান্তে তার কাছে চলে আসে তার কমিশনের টাকা এবং কতজন পেশেন্ট সেখান থেকে কি কি টেস্ট করিয়েছে, তার সম্পূর্ণ হিসেব। এই টাকাটা আগে চেকে আসত, আজকাল সে নগদে নেয়। পরিস্থিতির চাপে কিছুটা চতুর তাকেও হতে হয়েছে।

এ ছাড়া আছে মেডিক্যাল রিপ্রেসেন্টেটিভদের চিরন্তনী নেট-ওয়ার্ক। এই নেট-ওয়ার্ক তার কর্পোরেট হসপিট্যালেও ছিল, এখানেও আছে। আরও আছে। কোন ক্রিটিক্যাল পেশেন্টকে কোন বিশেষ প্রাইভেট হসপিট্যালে রেফার করলে, সেখান থেকে চিকিৎসান্তে ডাক্তারের কমিশন।

অর্থাৎ আজকাল প্রেস্ক্রিপশনের প্রতিটি লাইন লিখতে লিখতে, তার সম্ভাব্য পাওনা কমিশন-মূল্যের একটা ধারণাও তার মনে মনে তৈরি হয়ে যায়। জটিল অসুখের পেশেন্টকে একদিকে সারিয়ে তোলাটা যেমন তার একটা চ্যালেঞ্জ মনে হয়, তেমনি তার কাছে সেই পেশেন্ট, দীর্ঘদিনের - হয়তো লাগাতার দু’-তিনমাসের – স্বর্ণাণ্ড-প্রসবকারী হাঁসও হয়ে উঠতে পারে। এভাবে ভাবতে সুনেত্রর ভালো লাগে না, কিন্তু আজকের দিনের মেডিকেল নেট-ওয়ার্ক তাকে এই পথেই চালিত করে চলেছে। তার সাধ্য কি, এর বাইরে সে বের হয়ে আসবে?

সকালের চেম্বার সেরে, দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর সুনেত্র ল্যাপটপ খুলে বসেছিল একবার, কনির কোন নতুন মেল এল কিনা চেক করতে। আসেনি। কনি লিখেছিল “অধৈর্য হয়ে আবার ফোন কোর না, বা চলে এস না আমার কাছে”। না সুনেত্র অধৈর্য হবে না, এতদিন অপেক্ষা করেছে যখন, আরও এক-দুদিন অপেক্ষা করতে কোন আপত্তি নেই তার। যে কথা মা এবং পিসিমা তাকে কোনদিন বলেননি বা বলতে পারেননি, সে কথার কিছুটা কাল রাত্রে জেনেছে। বুঝেছে, কনি নিজের জীবনে যে দুঃসহ যন্ত্রণা সহ্য করেছে, সেই যন্ত্রণার অংশীদার হওয়া কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। কিন্তু নিজের চোখে সন্তানের এই কষ্ট দিনের পর দিন প্রত্যক্ষ করার অসহ্য মনোকষ্ট তার মা-বাবা অর্থাৎ পিসিমা-পিসেমশাইয়ের কাছেও কম ভয়ানক নয়। সম পরিমাণ না হলেও তার নিজের মায়ের পক্ষেও, যথেষ্ট বেদনার।

মানসিক এই কারণেই পিসিমা হয়তো এত তাড়াতাড়ি চলে গেলেন - তার গৃহপ্রবেশের কয়েক-মাস পরেই। অথচ পিসেমশাই, যাঁর শরীর সেরিব্রাল অ্যাটাকে অনেকটাই ভঙ্গুর হয়ে উঠেছিল। সকলে ভেবেছিল তিনি পিসিমার অনেক আগেই চলে যাবেন। তিনি মারা গেলেন বছর খানেক আগে। সুনেত্রর দুর্ভাগ্য সে সময় দেশের বাইরে গিয়েছিল, বিখ্যাত এক মেডিসিন কোম্পানি-প্রায়োজিত সেমিনারে। পিসেমশাইয়ের শ্রাদ্ধ-শান্তির কাজ মিটে যাওয়ার পাঁচ-ছদিন পর সুনেত্র কলকাতা ফিরেছিল। পিসেমশাইয়ের বাড়িও গিয়েছিল, কনির সঙ্গে যদি দেখা হয়। দেখা হয়নি। প্রতিবেশীদের কাছে সুকন্যার খবর নিতে গিয়ে বুঝতে পেরেছিল, তারা কেউই সুকন্যার ব্যাপারে কোন কথা বলতে উৎসাহী নয়। তেমন খোঁজও রাখে না কেউ। একটি মেয়ে বলেছিল, “সুকুআন্টি শুনেছি কার্সিয়াং গিয়েছেন। কোথায় তা তো জানি না, আংকল”। বাড়ির তালাবন্ধ দরজা দেখেই তাকে হলদিয়ায় ফিরে আসতে হয়েছিল।

তার সামনে খুলে রাখা ল্যাপটপের স্ক্রিন স্লিপ মোডে চলে গেছিল অনেকক্ষণ। একসময় সুনেত্রর খুব ঘুম পেল। তার স্বভাবে ভাত-ঘুমের অভ্যাস এখনও বাসা বাঁধতে পারেনি, বেলা দুটো-আড়াইটে থেকে বিকেল পাঁচটা-সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত, যথেষ্ট অবসর থাকা সত্ত্বেও। কিন্তু বিগত রাত্রের প্রায় নিদ্রাহীন মস্তিষ্ক এখন বিশ্রাম চায়। টেবিলে মাথা রেখে গভীর নিদ্রায় ডুবে গেল।

 

বিকেল সোয়া পাঁচটা নাগাদ, সুনেত্রর ঘরে এল শম্পাদিদি। সুনেত্রর টেবিলে চায়ের কাপ নামিয়ে ডাকল, “দাদাবাবু, উঠে পড়ো, পাঁচটা বেজে গেছে অনেকক্ষণ। মিলকিদিদিভাই এখনই চলে আসবে”।

ঘুম ভেঙে তাকাল সুনেত্র, বলল, “এঃ এমন অসময়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম? অনেকক্ষণ ঘুমিয়েছি না, প্রায় ঘন্টা তিনেক?”

“আজ সকাল থেকেই দেখছি, তুমি কী যেন এক ভাবনার মধ্যে ডুবে রয়েছ, সারাক্ষণ। কী হয়েছে বলো তো তোমার?”

“কিচ্ছু হয়নি শম্পাদিদি, এমনিই একটু চোখ লেগে গিয়েছিল”। ওয়াশরুমের দিকে যেতে যেতে সুনেত্র বলল। মুখে চোখে জলের ছিটে দিয়ে বেশ আরাম পেল, সুনেত্র। ঘুমঘুম ভাবটা কেটে গেল, এবং লক্ষ্য করল ঘন্টা তিনেকের ঘুমটা ক্লান্তি এবং অবসাদ থেকেও তাকে অনেকটা মুক্তি দিয়েছে।

ঘরে ফিরে গরম চায়ে চুমুক দিয়ে নিজেকে খুব ফ্রেশ অনুভব করল সুনেত্র। রান্নাঘর থেকে শম্পাদিদির গলা পেল, “মাসিমা তো তোমাকে বলে বলে, হয়রান হয়ে চলেই গেলেন। এবার একটা বিয়ে করে স্থিতু হও দেখি দাদাবাবু”।

সুনেত্র হেসে ফেলল হো হো করে, তারপর বলল, “এতদিন পরে তোমার মাথায় এ ভূত কে ঢোকালো, শম্পাদিদি”?

শম্পাদিদি ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “এই রোববারে তোমাদের দুটিকে একসঙ্গে দেখেই ভূতটা আমার মাথায় ঢুকেছে, দাদাবাবু”।

“তুমি কি সুনুর কথা বলছো, শম্পাদিদি? তুমি কি জানো তুমি কী বলছ? তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে?” অবাক বিস্ময়ে শম্পাদিদির মুখের দিকে তাকিয়ে সুনেত্র বলল।

“আমি সব জানি। তোমাদের দুজনের সব কথা। মাসিমা, পিসিমণি দুজনেই আমাকে সব বলেছেন”। একটু থেমে আবার বলল, “তোমরা ছেলেরা চোখ থেকেও যেন কানা, সুনুদিদির মানসিক অবস্থাটা কি তুমি কিছুতেই বুঝবে না, দাদাবাবু?” শম্পাদিদি আর কিছু বলল না, ধীর পায়ে রান্নাঘরের দিকে নিজের কাজে চলে গেল।

সুনেত্র পাথরের মতো বসে রইল টেবিলের সামনে। কাপের অর্ধেক চায়ের ওপর জমতে লাগল সর।

 

মিনিট পনের পর, শম্পাদিদি ঘরে এল, বলল, “মিলকি দিদিভাই এসে চাবি নিয়ে গেল, দাদাবাবু। এঃ চাটা খেতে দেখছি ভুলেই গেছ, ঠাণ্ডা জল হয়ে গেল। আরেক কাপ বানিয়ে নিয়ে আসছি, তুমি রেডি হয়ে নাও”।

শম্পাদিদিকে কী বলে গিয়েছেন, তার মা ও পিসিমা? সেকথা সে জানে না, কেন? মা বা পিসিমা তাকে সরাসরি সে কথা বলতে পারেননি, কেন? কনির জীবনে এত দুর্যোগ ঘটে গেছে, সে কথা তাঁরা দুজনেই জানতেন, নিজের চোখে প্রত্যক্ষ করেছেন। কিন্তু সকল সঙ্কোচ ভেঙে কেন তাঁরা সুনেত্রকে বলতে পারলেন না? যে কথার অর্ধেকটা সে জেনেছে গতকাল রাত্রে এবং বাকিটা হয়তো জানবে আজ রাত্রে।

সুনেত্র চটপট রেডি হতে না হতেই, শম্পাদিদি এক কাপ চা, আর এক পিস কেকের টুকরো দিয়ে গেল প্লেটে। ঘর থেকে বেরিয়েই যাচ্ছিল শম্পাদিদি, সুনেত্র তাকে ডেকে জিজ্ঞেস করল, “শম্পাদিদি, মা পিসিমা, তোমাকে সব কথা বলতে পারলেন, অথচ আমাকে বলতে পারলেন না, কেন?”

শম্পাদিদি কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইল সুনেত্রর দিকে, তারপর বলল, “ওঁনারা দুজনেই বড়ো দ্বিধায় ছিলেন, দাদাবাবু। সুকুদিদির জীবনটা যে ভাবে তাঁরা দুজনে ছন্নছাড়া করে দিয়েছিলেন, সে কথা মুখ ফুটে নিজের ছেলেকে কী করে বলবেন, বলো তো, দাদাবাবু? কী করে বলবেন, সুকুদিদির জীবনের ফেলে আসা দিনগুলোকে মন থেকে মুছে ফেলে, এতবছর পরে তুমি তাকেই গ্রহণ করো...। আমি হলেও বলতে পারতাম না, দাদাবাবু। তুমি কী করে বুঝবে মায়েদের বুকের জ্বালা?”। একটু থেমে শম্পাদিদি আবার বলল, “যাগ্‌গে এখন ওসব চিন্তা ঝেড়ে ফেলে, তুমি চেম্বারে যাও, দাদাবাবু। মিলকি দিদিভাই বলছিল অনেক পেশেন্ট নাকি চলে এসেছে”।

সাড়ে নটা নাগাদ চেম্বার থেকে যখন মুক্তি পেল সুনেত্র, নিজেকে খুব ক্লান্ত-বিধ্বস্ত মনে হচ্ছিল। আজ পেশেন্টের সংখ্যা কিছু বেশি ছিল ঠিকই, কিন্তু তার ক্লান্তিটা ঠিক সে জন্যে নয়। তার মনটাকে জাস্ট সুইচ অফ করে, মনের মধ্যে নিরন্তর ঘটে চলা দ্বন্দ্বটাকে যদি বন্ধ করা যেত। এবং অন করে দেওয়া যেত তার প্রফেসন্যাল মনটাকে...তাহলে এই ক্লান্তিটা অনায়াসে এড়িয়ে যাওয়া যেত।

মনটাকে এই সুইচ-অফ/ সুইচ-অন মোডে রাখার উপদেশটা সে শুনছিল তাদের কর্পোরেট অফিসে। তাদের অফিসে প্রায়ই বাইরে থেকে কিছু ম্যানেজমেন্ট টিমকে ডেকে আনা হতো, যাদের অ্যাজেণ্ডা হতো রীতিমতো রোমহর্ষক। যেমন “প্রফেশনালিসম অ্যাণ্ড লাইফ – ইয়র পার্স্পেক্টিভ”, “ইয়োর ওয়ার্ক অ্যাণ্ড ইয়র লাভ”, ইত্যাদি। এরকমই একটা প্রোগ্রামে নানান গ্রাফিক্স এবং বার-চার্ট থেকে সে জেনেছিল, তার প্রফেশন এবং তার জীবনটাকে সুন্দর কয়েকটা ছকে বেঁধে ফেলা যায়। না, ভুল বলল সে, নির্দিষ্ট ছকে বেঁধে ফেলতে হবে। এবং তার সার কথাটি হল, যতক্ষণ তুমি কাজের মধ্যে রয়েছ নিজের ব্যক্তিগত জীবনটাকে মুছে ফেল। অর্থাৎ অসুস্থ মা-বাবা, কিংবা স্ত্রীর শপিং করার আব্দার, অথবা ছেলে-মেয়ের স্কুল থেকে ডাকা পেরেন্ট’স মিটিং অ্যাটেণ্ড করার টেনশন – বিলকুল মুছে ফেলতে হবে মন থেকে। ডাস্টার দিয়ে আঁকিবুকি লেখা বোর্ডটাকে এক লহমায় মুছে ফেলার মতো – ব্ল্যাংক করে ফেল মনটাকে। এটাই হল মনের সুইচ অফ মোড।

এর সঙ্গে সঙ্গেই অফিসের কাজের জন্যে তোমার মনটাকে সুইচ অন করে ফেল। গতকাল কী কী কাজ পেণ্ডিং ছিল, সেগুলো আজ কমপ্লিট করতে হবে। আজ কোন কোন মিটিং অ্যাটেণ্ড করতে হবে, তার জন্যে ডিসকাশন পয়েন্ট্‌স্‌ জট ডাউন করতে হবে। কাস্টমার ও সার্ভিস প্রোভাইডারদের ফলো আপ করে ফিড-ব্যাক নেওয়া...। তার মধ্যে কোনভাবেই তোমার মনে সংসার যেন উঁকি না মারতে পারে। দৈবাৎ, উঁকি মারলেই, ইউ উইল বি ইন মেস। বাংলা করে বললে, তুমি কেলোর কিত্তি বাধিয়ে তুলেছ, হে।

আবার সাড়ে সাতটা-আটটা নাগাদ অফিসের লিফটের গেট বন্ধ হওয়ার পর বেসমেন্ট ওয়ানে – যেখানে তোমার গাড়ি পার্ক করা আছে – নামার সুইচটা যখন টিপছ – তখনই সুইচ অফ করে দাও তোমার মনের অফিস মোডটাকে...। আর অন করে নাও তোমার ব্যক্তিগত জীবনের মানসিক মোড।

ব্যাপারটা এতই সহজ আর সরল, অন্ততঃ ওই প্রফেশনাল টিমগুলো যা বোঝাতো, তাতে প্রত্যেক মানুষের জীবন পাখির হালকা পালকের মতো ভেসে চলবে চিরকাল।

এই উপদেশ এবং স্বপ্নময় জীবনের নিশ্চিত আশ্বাস সত্ত্বেও সুনেত্র কোনদিনই ওই অন-অফ মোডে মনটাকে আনতে পারেনি। অফিসে গেলেও তার মনের মধ্যে কলকল ধ্বনিতে ঢুকে পড়েছে বাড়ির কথা এবং বাড়ি এসেও মনে মনে আফশোস করেছে, অফিসের কিছু কিছু কাজ সেরে আসতে ভুলে যাওয়ার জন্যে। এর কারণ কি তার মধ্যবিত্তসুলভ আবেগপ্রবণতা? না, তাও নয়, কারণ সে তার দাদাকে দেখেছে, বাবা কিংবা মায়ের সঙ্গে তুচ্ছ ও গুরুতর কারণে তুমুল ঝগড়া করে বাড়ি থেকে বেরিয়েই, পাড়ার মোড়ের চায়ের দোকানে বন্ধুদের সঙ্গে তুমুল আড্ডা দিতে। এটাও সেই মনের অন-অফ মোড, তার দাদা অর্জন করেছিল বাই ডিফল্ট।

কিন্তু সে পারেনি – সেদিনও না, আজও না। এরকম ঘটনার পরে স্কুলে গেলে, তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা তার মুখ দেখেই বুঝে যেত, আজ সুনেত্রর মুড খারাপ। মুখটা হাঁসের পেছন বানিয়ে তুলেছে। প্রতিটা ক্লাস, টিফিন - এমনকি ছুটির সময়েও তার মনের মোডটাকে স্বাভাবিক করে তুলতে পারেনি কতদিন...। আজও চেম্বারে ঢোকার আগে সে পারেনি মন থেকে শম্পাদিদির কথার অভিঘাত মুছে ফেলতে। আজও সে চিন্তাক্লিষ্ট আনমনা মুখেই কি সবার চিকিৎসা করল না? অথচ সে বহু পেশেন্টদের থেকে বহুবার কমপ্লিমেন্ট শুনেছে, “আপনার সামনে বসে আপনার মুখের হাসিটুকু দেখলেই আমাদের আর্ধেক রোগ পালায়, ডাক্তারবাবু। মনে হয় নিশ্চিন্তে নির্ভর করা যায় আপনাকে”। আজকের পেশেন্টদের জন্যে সে কথাটা নিশ্চয়ই খাটল না। তার মুখখানা দেখেই পেশেন্টদের অর্ধেক অসুখও আজ সারল না। সেক্ষেত্রে তার ফিজ্‌টাকেও অর্ধেক করা কি তার উচিৎ ছিল না?

পরের পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ২০ "


বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/৬

  এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১


  আগের পর্ব - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/৫ "


  তৃতীয় স্কন্ধ - পর্ব ৬

বরাহ অবতারের পৃথিবীর উদ্ধার (আগের পর্বে শুরু হয়েছিল, তারপর...)

পশু যেমন গন্ধ শুঁকে সবকিছুর সন্ধান করে, তিনিও গন্ধ শুঁকে পৃথিবীর সন্ধান করতে সমুদ্রের জলের মধ্যে ঝাঁপ দিলেন। তাঁর বিশাল আকার এবং তাঁর ভীষণ ধারালো ক্ষুরের আঘাতে সমুদ্র যেন দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেল। যে অর্ণবের জলে শ্রীনারায়ণ অনন্তশয়ান অবস্থানে ছিলেন, সেই শান্ত সমুদ্র এখন তোলপাড় হয়ে উঠল। সেই বিক্ষুব্ধ সমুদ্রের ঢেউয়ের নীচে খুঁজতে খুঁজতে তিনি পৃথিবীকে দেখতে পেয়েই, তাঁর বিশাল দুই দাঁতের উপর পৃথিবীকে তুলে নিলেন। সেই সময় সমুদ্রের মধ্যেই হিরণ্যাক্ষ নামে এক ভীষণ দৈত্য বাধা দিতে এলে, শ্রীবিষ্ণু ভয়ঙ্কর ক্রুদ্ধ হয়ে তাকে খুব সহজেই হত্যা করলেন। তারপর দুই দাঁতের মধ্যে পৃথিবীকে নিয়ে ভেসে উঠলেন সমুদ্রের উপর।

ব্রহ্মা ও অন্যান্য ঋষিগণ তমালনীল দৈব বরাহের দুই দাঁতের উপর ধরে রাখা শ্যামল সুন্দর পৃথিবীকে দেখে অভিভূত হলেনতাঁরা সকলে জোড় হাতে সেই বরাহদেবের স্তুতি করে বলতে লাগলেন,

“জয় জয় হে অজিত, তোমারই জয়। তুমিই যজ্ঞমূর্তি, বেদময় তোমার তনু। হে ভূধর, জলের মধ্যে গজশিশু তার দাঁতের ওপর পদ্ম ধারণ করলে যেমন শোভা হয়, তোমার দাঁতের উপর এই পৃথিবীর সেই রকম সুন্দর। পর্বত শিখরে বিশাল মেঘখণ্ডের মতো, দাঁতের উপর এই ভূমণ্ডল ধারণ করাতে, তোমার বেদময় বরাহরূপ অপরূপ দেখাচ্ছে। হে প্রভু, তুমি জগতের পিতা আর এই ধরিত্রীদেবী জগতের মাতা। যজ্ঞের সময়, যাজ্ঞিক যেমন কাঠে অগ্নি সংযোগ করে, তেমনি তুমিও এই পৃথিবীতে তোমার শক্তি নিহিত করেছ। এখন স্থাবর ও জঙ্গম সকল ভূতের আশ্রয় স্থানের জন্যে, এই পৃথিবীকে সংস্থাপন করো। আমরা সকলে এই পৃথিবীতে বসবাস করে তোমাদের দুজনকে জনক ও জননী রূপে প্রণাম করি।

হে জগন্নাথ, তুমি ছাড়া এমন শক্তিমান আর কে আছে, যে রসাতল থেকে এত আয়াসে পৃথিবীকে উদ্ধার করতে পারে? কিন্তু তোমার কাছে এ কাজ আদৌ আশ্চর্যের নয়। কারণ, তুমিই নিখিল বিশ্বের আধার, তুমি তোমার মায়ায় এই নিখিল বিশ্ব সৃষ্টি করেছ। হে ভগবান, এই নিখিল বিশ্ব তোমার যোগমায়ার গুণে তোমার সম্পর্কযুক্ত হয়ে মুগ্ধ। হে ঈশ্বর, তুমি বিশ্বের মঙ্গল সাধন করো। জীবগণ তোমার অনন্ত ও ধারণাতীত এই শক্তির তত্ত্ব উপলব্ধি করে, সব সময় যেন তোমার ভজনা করতে পারে, এই কৃপা তুমি দান করো”

শ্রীমৈত্রেয় বললেন, “এইভাবে ব্রহ্মবাদী ঋষিরা, লোকপালক বরাহদেবের স্তুতি করলে, তিনি নিজের ক্ষুরের আঘাতে অর্ণব সলিলে আধান শক্তি সঞ্চার করে, পৃথিবীকে জলের উপর প্রতিষ্ঠা করে দিলেন। তারপর তিনি অদৃশ্য হয়ে গেলেন। বৎস বিদুর, মেধা ও বুদ্ধি ভগবানে সমর্পণ করে দিলে, ভগবান সেই ভক্তের সকল ভার হরণ করে নেন। তাই তাঁর আর এক নাম হরিমেধা। তাঁর কথা সর্বদাই মঙ্গলময়, তাঁর মায়াময় চরিত্র সর্বজনের আদর্শ। ভগবান প্রসন্ন হলে, এই জগতে আর কোন বস্তু দুর্লভ থাকে? জগতের সমস্ত বস্তুকেই তখন তুচ্ছ মনে হয়কাজেই নিস্বার্থ ভক্তিতে যিনি ভগবানে মন প্রাণ সমর্পণ করতে পারেন, তিনি ভগবানের চরণে নিশ্চিত আশ্রয় পেয়ে থাকেন”

বরাহ অবতারের পৃথিবী উদ্ধারের কাহিনী শোনার পর, বিনীত বিদুর আবার জিজ্ঞেস করলেন, “হে ঋষিশ্রেষ্ঠ  মৈত্রেয়,  শ্রীভগবান, তাঁর বরাহলীলায় পৃথিবীকে উদ্ধার করার সময়, তাঁর সঙ্গে আদিদৈত্য হিরণ্যাক্ষের কিসের জন্যে যুদ্ধ হল”?

শ্রী মৈত্রেয় স্মিত মুখে বললেন, “ভগবানের মাহাত্ম্য ভক্তিভরে শুনতে শুরু করলে কিছুতেই আর তৃপ্তি হয় না, আরো শুনতে ইচ্ছে হয়। মহামুনি নারদের মুখে, ভগবানের এই লীলা মাহাত্ম্য শুনে মহারাজ উত্তানপাদের বালক পুত্র ধ্রুব শ্রীবিষ্ণুপদ লাভ করেছিলেন। আর আমি এই বৃত্তান্ত শুনেছিলাম, স্বয়ং ব্রহ্মার কাছে, তিনি দেবতাদের কাছে এই ইতিহাস বর্ণনা করছিলেন। তোমার এই প্রশ্নের উত্তরে আমি যা বলি, মন দিয়ে শোনো”


হিরণ্যাক্ষের জন্মরহস্য

শ্রীমৈত্রেয় বললেন, “একবার প্রজাপতি দক্ষের কন্যা দিতি, কামনার আগুনে অস্থির হয়ে তাঁর স্বামী মরীচিপুত্র কশ্যপের কাছে উপস্থিত হলেন। তখন সন্ধ্যাকাল, সবেমাত্র সূর্য অস্তে গিয়েছেন। মহামুনি কশ্যপ সারাদিন যজ্ঞের পর, যজ্ঞশালায় সমাহিত চিত্তে শ্রীবিষ্ণুর ধ্যান করছিলেন। 

দিতি বললেন, “হে স্বামী, আমার সমস্ত অঙ্গ কামনার অনলে জ্বলছে। আমি এখনই আমার গর্ভে তোমার সন্তানের উদ্রেক চাই। আমার সতীনেরা সকলেই আমার বোন। আমাদের পিতা মহারাজ দক্ষ আমাদের বিয়ের আগে আমাদের প্রত্যেককে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আমরা কাকে পতি হিসেবে পেতে চাই। আমাদের তেরজন বোনের সকলেই তোমার প্রতি অনুরক্ত ছিলাম, অতএব স্নেহবৎসল পিতা দক্ষ আমাদের তেরজনকেই তোমার হাতে সমর্পণ করেছিলেন। এখন পুত্রবতী সতীনদের ভাগ্য দেখে আমি ঈর্ষায় জ্বলছি, হে নাথ, তুমি আমাকেও পুত্র দাওতোমার মতো স্বামীর সমাদর লাভ করে, আমার গর্ভে তোমার পুত্র ধারণ করার গৌরব আমাকে দান করো, হে স্বামী। তুমি কল্যাণপ্রদ ও ব্রহ্মজ্ঞ, আমি তোমার পত্নী, তোমার কাছে আমার কাতর অনুরোধ, তুমি আমার প্রার্থনা ফিরিয়ে দিও না। এসো, আমরা এখনই মিলিত হই”

পত্নীর কামনা জর্জর ব্যাকুলতা দেখে মহামুনি কশ্যপ মধুরস্বরে বললেন, “হে প্রিয়ে, তোমার এই আশঙ্কার কোন কারণ নেই। তোমার মনের ইচ্ছে আমি অবশ্যই পূরণ করব। তোমার মতো পত্নীকে সুখী করলে ধর্ম, অর্থ ও কাম এই ত্রিবর্গ লাভ হয়, অতএব তোমার বাসনা কেন অপূর্ণ রাখব? জাহাজের নাবিক যেমন নিজেকে এবং অন্যান্য যাত্রীদের নিয়ে সমুদ্র পার হয়। তেমনই গৃহস্থাশ্রমে, গৃহস্থ পত্নীর সাহায্যেই নিজেকে ও অন্যান্য আশ্রমিকদের অন্ন ইত্যাদি দান করে সংসারের দুঃখসাগর পার হয়ে থাকে। হে অভিমানিনী, পত্নী সামান্য নয়, সৎ কর্ম অনুষ্ঠানে পত্নী সর্বদাই পুরুষের অর্ধাঙ্গরূপিণী স্বরূপ। হে গৃহেশ্বরী, আমি সর্বদাই তোমার গুণগ্রাহী, তোমার থেকে যে উপকার আমি নিয়ে থাকি, আমার পক্ষে তার প্রত্যুপকার করা এই জন্মে কিংবা পরের জন্মেও সম্ভব হবে না। হে সাধ্বী, তোমার পুত্রকামনা আমি অবশ্যই পূর্ণ করবো, কিন্তু এখন সন্ধ্যাকাল। এই সময় আমাদের মিলনের পক্ষে মোটেই মঙ্গলজনক নয়। এই সময় তোমার পিতা দক্ষের আরেক কন্যা সতীর পতি মহাদেব রুদ্র তাঁর বৃষ বাহনে চারদিকে ঘুরে বেড়ান। সঙ্গে থাকে তাঁর ভূত প্রেত অনুচরগণ। মহাদেবের ধূসর জটা, ভস্মে ঢাকা তাঁর সোনার শরীর,  চন্দ্র, সূর্য ও অগ্নি তাঁর এই তিন চোখএই তিন চোখে তিনি এখন সব কিছুই দেখতে পান এই অসময়ে আমাদের মিলন তিনি দেখতে পাবেন, তাতেও কি তোমার লজ্জা হবে না?

হে প্রিয়তমে, ভগবান শ্রীরুদ্রের ঐশ্বর্যের কথা বলে শেষ করা যায় না। তিনি জগতে কাউকেই আত্মীয় বা পর মনে করেন না। জগতে কোন জীবের প্রতিই তাঁর না অনুরাগ আছে, না তিনি কাউকে বিদ্বেষ করেন। তিনি পরমেশ্বরের প্রতি একাত্ম। তিনি আমাদের ত্যাগধর্ম শেখাবার জন্যেই স্বয়ং সমস্ত ভোগ ত্যাগ করে নগ্ন হয়ে, গায়ে ভস্ম মেখে ঘুরে বেড়ান। যারা দেহকেই আত্মা বলে মনে করে, কুকুর ও শেয়ালের ভক্ষ্য দেহকে যারা বস্ত্র, মালা, অলংকার ও চন্দন-কুঙ্কুম চর্চায় সাজিয়ে তোলে, সেই সব মূর্খ ব্যক্তি, মহাদেব রুদ্রের এই নগ্ন আচরণ দেখে উপহাস করে। তাঁর এই আচরণ লোকশিক্ষার জন্যেই। অতএব এই সময় মহাদেব রুদ্রের দৃষ্টির সামনে আমাদের এই অসংযম কখনো করা উচিৎ নয়”

স্বামী কশ্যপের এই উপদেশ বাক্য শুনেও কিন্তু দিতি সংযত হতে পারলেন না। তিনি কামনায় নির্লজ্জ হয়ে কশ্যপের বস্ত্র আকর্ষণ করলেন এবং মহর্ষি কশ্যপকে প্ররোচিত করলেন মিলিত হবার জন্যে। মহর্ষি কশ্যপ, এই নিষিদ্ধ কর্ম থেকে পত্নীকে নিরস্ত করতে না পেরে, ঈশ্বরকে স্মরণ করে অবশেষে দিতির সঙ্গে মিলিত হলেন। মিলনের পর মহর্ষি কশ্যপ স্নান করলেন, প্রাণায়াম করলেন এবং নির্গুণ জ্যোতি ধ্যান করতে করতে প্রণব জপ করতে লাগলেন।

এতক্ষণে নিজের অসংযমের জন্যে লজ্জিতা দিতি ব্রহ্মর্ষি কশ্যপের কাছে গিয়ে, মুখ নীচু করে বললেন, “হে ব্রহ্মন, আমি ভূতপতি রুদ্রের অবজ্ঞা করে ভীষণ অপরাধ করেছি, আমার গর্ভস্থ শিশুর যেন কোন ক্ষতি না হয়, তুমি এমন উপায় করো। তিনি ভগবান রুদ্র, তাঁর ক্রোধে বিশ্বের বিনাশ হয়, আমি তাঁকে প্রণাম করি। ভগবান মহাদেব আমার ভগ্নীপতি, তিনি অশেষ করুণাময়। তিনি সতীপতি, তিনি জানেন নারীরা অতি নিষ্ঠুর ব্যক্তিরও কৃপার পাত্র। তিনি আমার প্রতি যেন প্রসন্ন থাকেন”

সায়ন্তন ধ্যান শেষ করে প্রজাপতি কশ্যপ পত্নীর এই ভীত অবস্থা দেখে বিরক্ত মুখে বললেন, “হে অভদ্রে, তোমার স্বভাব অত্যন্ত ধৈর্যহীন এবং বড়ই ঈর্ষাগ্রস্ত। তোমার গর্ভের দুই নরাধম পুত্র, লোকপাল ও লোকসমূহের ভয়ানক কষ্টের কারণ হয়ে উঠবে। কারণ তোমার মন অপবিত্র ছিল, তুমি সন্ধ্যার কালদোষ চিন্তা করলে না, আমার আজ্ঞাও তুমি মানলে না। এমনকি মহাদেব রুদ্রকেও তুমি অবহেলা করলে। তোমার এই দুই পুত্র বড় হয়ে প্রাণিবধ করবে, নারীদের অত্যাচার করবে, সাধুব্যক্তিদের ক্রোধ সৃষ্টি করবে। সেই সময় বিশ্বেশ্বর ভগবান তাঁর লোক রক্ষার জন্যে জগতে আবির্ভূত হবেন এবং তাঁর হাতেই এই দুই নরাধমের বিনাশ হবে”। 

দিতি বললেন, “হে প্রভু, শ্রীভগবান চক্রধারী যদি আমার দুই পুত্রকে হত্যা করেন, আমার কোন দুঃখ নেই। কিন্তু কোন ক্রুদ্ধ ব্রাহ্মণের অভিশাপে যেন ওদের মৃত্যু না হয়। কারণ যারা ব্রহ্মশাপে বিনষ্ট হয়, তাদের সর্বলোক ভয় করে। তাদের নরকবাসীরাও ঘৃণা করে। পরে যে যে যোনিতে তাদের জন্ম হয়, সেই প্রাণিরাও তাদের প্রতি প্রসন্ন হয় না”। 

এই কথায় কশ্যপ কিছুটা শান্ত হয়ে বললেন, “যেহেতু তুমি তোমার কাজের জন্যে অনুতপ্ত এবং নিজের ভুল বুঝতে পেরে যুক্তিপূর্ণ বিচার দিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করেছ। যেহেতু আমার প্রতি তোমার প্রীতি ও ভগবানের প্রতি তোমার একান্ত ভক্তি দেখালে, সেহেতু তোমার পৌত্রদের মধ্যে একজন ভগবান শ্রীহরির মহান ভক্ত হবে। সাধু ব্যক্তিরা তার পবিত্র চরিত্র ও আচরণের অনুসরণ করবেন। ভগবান যার প্রতি প্রসন্ন হন, সমস্ত জগত তার প্রতি প্রসন্ন হয়ে থাকে, কারণ ভগবান জগতের আত্মা। সেই ভগবান তোমার পৌত্রের অনন্যভক্তিতে পরম প্রীত হবেনভগবান শ্রীহরি তোমার সেই পৌত্রকে ধ্যানযোগে এবং চোখের সামনে প্রত্যক্ষ স্বরূপে দর্শন দেবেন”

[দিতির পুত্ররা হলেন দৈত্য। কশ্যপ মুনি যে দুই নরাধম পুত্রের কথা বললেন, তাঁরা হলেন হিরণ্যাক্ষ এবং হিরণ্যকশিপু। এই দুই পুত্রই ভগবান বিষ্ণুর হাতে প্রাণ দিয়ে মুক্তি লাভ করবেন। আর এই দৈত্যকুলেই জন্ম হবে হিরণ্যকশিপুর পুত্র বিষ্ণুভক্ত প্রহ্লাদের। দৈত্য বলতে যদি অনার্য ধরা হয়, তাহলে এই দুই দৈত্যরাজকে হত্যা করেছিলেন বিষ্ণু। আর্য-অনার্য মিলেমিশে সনাতন বা হিন্দু ধর্ম সৃষ্টির সময়, অনার্যদের মনে যাতে কোন রকম ক্ষোভের উদ্রেক না ঘটে, সেই কারণে পুরাণকার এই কাহিনীটি রচনা করলেন। অসংযমী মায়ের দোষে নরাধম দৈত্যরাজের জন্ম ও মৃত্যু এবং তাদের পুত্রের ভক্ত হয়ে ওঠা -  সব কিছুই যেন পূর্ব পরিকল্পিত!]   

মৈত্রেয় বললেন, “তাঁর পৌত্র ভগবানের মহান ভক্ত হবে এবং ভগবান বিষ্ণুর হাতে তাঁর দুইপুত্রের বিনাশ হবে, অর্থাৎ তাঁর দুই পুত্রের কীর্তি ও সদ্গতি হবে জেনে দক্ষকন্যা দিতি ভীষণ আনন্দিত হলেন”

পরের পর্ব - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/৭ "


মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩৪

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "



[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩৩ 


৩৮

জনাই বেরিয়ে যেতে রামালি ভল্লাকে জিজ্ঞাসা করল, “ভল্লাদাদা, প্রতি প্রহর শেষ হলেই কি এখানে ঘন্টা বাজানোর নিয়ম? সকালে শুনলাম একবার, এখন দুবার। সারা দিনরাতে এরকম মোট আটবার ঘন্টা বাজানো হয় - প্রতিদিন?”

ভল্লা বলল, “হ্যাঁ। চটির অতিথি এবং কাজের লোকদের সুবিধের জন্যেই ঘন্টা বাজাতে হয়। কাকে কখন খেতে দিতে হবে। কার কখন কী কাজ - সেসব মনে করিয়ে দেওয়ার জন্যে…”।

“বাবা। কী করে বোঝে ঠিক কখন কখন প্রহর শুরু হচ্ছে আর শেষ হচ্ছে? সূর্য দেখে?”

“সূর্য দেখে মোটামুটি বোঝা যায় ঠিকই – কিন্তু মেঘলা দিনে কিংবা রাত্রে কি সূর্য দেখা যায়?”

“না। তাহলে?”

“ঘড়ি আছে – জলঘড়ি”।

“জলঘড়ি? সে এবার কী?”

“ঘড়ির দুটো মানে হয় – ঘটিকা বা ঘন্টা – মানে প্রতি প্রহরের তিনভাগের এক ভাগ। আবার যে যন্ত্র দিয়ে এই ঘটিকা মাপা যায় – তাকেও ঘড়ি বলে। বিকেলে জনাইকে বলব, জলঘড়ি কেমন হয় তোকে দেখিয়ে দেবে। ব্যাপারটা বেশ মজার। বড়োসড়ো একটা গামলায় জল ভরে রাখা থাকে। সেই জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয় ছোট্ট একটা ঘটি। সেই ঘটিটা সাধারণ নয় – তার তলায় খুব ছোট্ট একটা ছিদ্র করা থাকে। সেই ছিদ্র দিয়ে গামলার জল ধীরে ধীরে ঘটিতে চুঁয়ে চুঁয়ে ঢোকে। এভাবে জল ঢুকতে ঢুকতে ওই ফুটো-ঘটিটা ভরে গেলেই, টুপ করে গামলার জলে ডুবে যায়। ওই ঘটিটা ভরতে যত সময় লাগে সেটাই হল এক ঘটিকা বা ঘন্টা। এরকম তিনবার হলে – এক প্রহর হয়। এই ব্যবস্থার জন্যে নির্দিষ্ট লোক আছে – যাদের কাজ হল – ঘড়িটা সঠিক চালানো - এবং ঘটিকা গুণে প্রহর শেষের ঘন্টা বাজানো। বড়ো বড়ো শহরে – প্রতি ঘটিকাতেই ঘন্টা বাজানো হয়, আবার প্রহর শেষেও ঘন্টা বাজানো হয়”।             

   রামালি অবাক হয়ে ভল্লার কথা শুনছিল। কথা শেষ করে ভল্লা আবার বলল, “নে এবার বাঁধানো মেঝেয় গা এলিয়ে একটু আরাম করে নে, এমন সুযোগ আবার কবে পাবি কে জানে। কেমন দেখলি বীজপুর?”

রামালি মেঝেয় শুয়ে শুয়েই বলল, “কী বলি বলো তো ভল্লাদাদা? শহর তো কোনদিন দেখিনি, অন্যের মুখে শুনেছি। এখানে এসে ভাবলাম, এটাই বুঝি শহর। শাম্‌লাকে বলতে হেসে গড়িয়ে পড়ল, বলল, ধুস্‌ - এটা নাকি শহর! শহর হল অনন্তপুর – বছর চারেক আগে একবার গিয়েছিলাম। শহর বটে একখানা। জিজ্ঞাসা করলাম, সেটা আবার কোনদিকে? বলল, এখান থেকে তিনদিনের হাঁটা পথ – রাজপথ ধরে পুবমুখো গেলেই হল”।

ভল্লা হাসল, বলল, “এই তো সবে শুরু রে, রামালি। অনেকদূর যাবি, অনন্তপুর তো তুচ্ছ, রাজধানী কদম্বপুরে তুই দাবড়ে ঘুরে বেড়াবি”। রামালি স্বপ্ন দেখা চোখে বলল, “সে আর কবে হবে, ভল্লাদাদা। আমার কপালে এই অব্দি যে এসেছি সেই ঢের”।

ভল্লা এবার একটু বিরক্ত হল, “আজ থেকে ছমাস আগে বীজপুর আসবি ভেবেছিলি? কপাল-টপাল কোন কাজের কথা নয়, রামালি। ওসব অকর্মাদের ধূর্তামি – আধাখ্যাঁচড়া কাজ করে মনোমত ফল না পেলে, বলে কপালে নেই তো করবো কী? তুই তো তেমন নস, তুই কেন কপালের দোষ দিবি?”

রামালি ঠোঁটে বিটলেমির হাসি নিয়ে বলল, “তুমি যদি নোনাপুরে না এসে, অন্য কোন দূরের  গ্রামে যেতে – তাহলে আমার কপাল খুলত কি?”

মুখে বিরক্তির আওয়াজ তুলে কিছু বলতে যাচ্ছিল ভল্লা, রামালির মুখের দিকে তাকিয়ে থমকে গেল, তারপর হেসে বলল, “চ্যাংড়ামো করছিস না? কিন্তু সেটাও কপাল নয় – সুযোগ। তুই একটা সুযোগ পেয়েছিস – তার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করে চলেছিস। অনেকে সুযোগ পেয়েও যোগ্য হতে পারে না – তারা হিংসুটে শল্কু হয়। নে অনেক বকবক হয়েছে, জনাই আসা পর্যন্ত একটু ঘুমিয়ে নিই চল...। রাত্রে আবার দৌড়তে হবে।” 

৩৯ 

মহড়ার মাঠ থেকে সন্ধের পর ভল্লা আর রামালি বাসায় ফেরার সঙ্গে সঙ্গেই, বালিয়া এল। পিঠের বোঝা থেকে বের করল অনেকগুলো ভল্ল, বলল, “ভল্লাদাদা, পনের জোড়া মানে তিরিশখানা ভল্ল হয়ে গেছে। একবার দেখে নাও তো, ঠিকঠাক হয়েছে কিনা?” বালিয়া পাঁচটা ভল্ল এগিয়ে দিল ভল্লার দিকে।

“বাবা, একদিনের মধ্যে তিরিশখানা?” বালিয়ার হাত থেকে নিয়ে ভল্লগুলো পরখ করতে করতে, ভল্লা বলল।

“আমার ছোটভাইকেও লাগিয়ে দিয়েছি ভল্লাদাদা। ও লোহার পাত বানায়। আমি ফলার তির-মুখগুলো বানাই আর বাবা, ঘষে মেজে ফলাগুলোকে ধারালো বানায়। বাস, তারপর ভাই আর আমি দুজনে মিলে বাঁশের আগায় ওগুলো বসিয়ে দিই”।

ভল্লা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে বলল, “ভালই তো হয়েছে রে। এর আগে রণপার খুড়ো আর ফলাগুলোও ঠিকঠাক হয়েছিল। তুই এক কাজ কর, আজ জোড়া ছয় সাতেক রণপাও নিয়ে যা, কাল বাকি ভল্লগুলো আর যতগুলো সম্ভব রণপা বানিয়ে নিয়ে আসবি। কি রে রামালি, রণপা দিলে অসুবিধে হবে?”

রামালি বলল, “তা একটু হবে, কিন্তু রণপাগুলো তাড়াতাড়ি ঠিকঠাক করে না নিলে নষ্ট হয়ে যাবে। তুই ছজোড়া রণপা এখন নিয়ে যা, পারলে কালই নিয়ে আসিস”।            

বালিয়া চলে যেতে রামালি রান্নার যোগাড়ে বসল। ভল্লা একটু চাপা স্বরে রামালিকে জিজ্ঞাসা করল, “অমাবস্যার আর কয়েকটা দিনই বাকি। আমাদের ছেলেরা পারবে? তোর কী মনে হয়, রামালি?”

রামালি রান্না করতে করতে বলল, “আমাদের মধ্যে বারো-তের জন তো ভালই তৈরি হয়েছে…এ কদিনে বাকিরাও হয়ে যাবে। আমার মনে হয় একটা ঝুঁকি আমরা নিতেই পারি”।

ভল্লা বলল, “নিজের সম্পর্কে তোর কী ধারণা, পারবি রক্ষীদের কোমর ভাঙতে?”

রামালির চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, ঘাড় ঘুরিয়ে ভল্লার দিকে তাকিয়ে বলল, “পারতেই হবে - আর আমার হাতেই উপানুর মরণও হবে – এ আমি তোমায় বলে রাখলাম ভল্লাদাদা”।

ভল্লা দেখল রামালির মুখের ওপর আগুনের আভা খেলা করছে এবং তার দু চোখে জ্বলছে আগুন…। ভল্লা কিছু বলল না। তাকিয়ে রইল রামালির দিকে।

মারুলা নিঃশব্দে ঢুকল ভল্লার উঠোনে, ভল্লার পাশে বসে বলল, “কখন ফিরলি তোরা, বীজপুর থেকে?”

ভল্লা বলল, “শেষ রাতে”।

“রামালি, বীজপুর কেমন দেখলি? কিছু আনিসনি ওখান থেকে?”

“এনেছি বৈকি। ভালো চাল-ডাল, আনাজ-পত্র… চাল-ডালের খিচুড়ি আর ভাজি বানাচ্ছি…” রামালি হেসে উত্তর দিল।

“যাক বাবা, রোজ তোর ওই জোয়ারের রুটি আর ভুট্টার ঝোল খেতে খেতে জিভটা চামচিকের পাখনা হয়ে  উঠছিল - আজ স্বাদ বদলাবে। একটা সুখবর দিই ভল্লা, রাজধানীর গোশকটগুলো আজ রাত্রে বীজপুরে ঢোকার কথা। তার মানে আর তিন-চারদিনের মধ্যে আমাদের অস্ত্রভাণ্ডারে পৌঁছে যাবে”।

“অস্ত্র ভাণ্ডারের কী অবস্থা?”

“চারপাশের দেওয়াল হয়ে গেছে। সামনের দিকে আর উত্তরের দিকে লোহার গেট লেগে গেছে। তুই যে চারটে ঘর দেখে এসেছিলি, তার মধ্যে বড়ো ঘরদুটোর কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ভাণ্ডারের দেওয়ালে তাক ঝোলানোও হয়ে গেছে। তুই বলেছিলি দেওয়ালে বড়ো বড়ো লোহার কীল বসিয়ে কাঠের মোটা পাটা বসিয়ে দিতে। কুলিকপ্রধান কীলগুলোকে দেওয়ালে গেঁথেছে, তার ওপর, দেওয়ালের একটু ওপর থেকে লোহার শিকলের টানা লাগিয়ে দিয়েছে। বলেছে তাকগুলো এমন পোক্ত হবে, যত ভারই দিন – ভেঙে পড়বে না। তুই দেখলে তোর তাক লেগে যাবে, রে শালা”।

“বাঃ, রাজধানীর অস্ত্রভাণ্ডারের দেওয়ালেও একই রকম ব্যবস্থা দেখেছি। তার মানে কুলিকপ্রধান যথেষ্ট অভিজ্ঞ। কিন্তু বাকি ঘরদুটো কবে শেষ হবে”?

“ঘর হয়ে গেছে, ছাদের কাঠামোও হয়ে গেছে। টালি দিয়ে ছাইতে আর কদিন – খুব জোর তিন-চারদিন”?

“হুঁ, তার মানে, রাজধানীর অস্ত্র-শস্ত্র এসে গেলে, ওখানেই রাখা যাবে। কিন্তু শষ্পক কী করছে? বলেছিল সমস্ত ব্যয়-ট্যয় ধরে, অঙ্ক কষে অস্ত্র-শস্ত্রের কী মূল্য হতে পারে, জানাবে? জানালো না তো?”

“এখনও হয়নি। বলছে, গোশকট থেকে নামিয়ে, অস্ত্রভাণ্ডার পর্যন্ত সমস্ত অস্ত্র ঘরের ভিতর সাজিয়ে তুলতেও অনেক শ্রমিক লাগবে – সে সব ব্যয় ধরে, তারপর তোকে পাঠাবে”।

“ঠিক আছে, বুঝলাম”। একটু চিন্তা করে ভল্লা মারুলাকে জিজ্ঞাসা করল, “আস্থান থেকে অস্ত্রভান্ডারের দূরত্ব কতটা হবে বল তো?”

“আস্থান থেকে উত্তর-পশ্চিমে, তা ধর ক্রোশ দুয়ের বেশিই হবে”।

“অমাবস্যার রাতে আস্থান থেকে কাজ সেরে, আমাদের ছেলেরা যদি এদিকে না এসে অস্ত্রভাণ্ডারের দিকে যায় – ওখানে কয়েকটাদিন গা ঢাকা দিয়ে থাকা সম্ভব?”

মারুলা কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলল, “বুদ্ধিটা মন্দ নয় ভল্লা, রণপা চড়ে তোরা একবার জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে পড়তে পারলে – রক্ষীদের চোখে ফাঁকি দিয়ে ওদিকে চলে যাওয়া সহজ হবে…”।

“দাঁড়া, তার আগে আমাদের পুরো পরিকল্পনাটা তোকে বলি, তাহলে তোর বুঝতে সুবিধা হবে। রামালি তোর রান্না কদ্দূর?”

    “এই হয়ে এসেছে, তুমি শুরু কর আমি আসছি”। রামালি সাড়া দিল।


পরের পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩৫ "

নতুন পোস্টগুলি

শুধু _তুই .কম - পর্ব ২০

 প্রথম   ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "  দ্বিতীয়  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন র...