এই সূত্রে - " ঈশোপনিষদ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "
এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১ "
হিরণ্যাক্ষের
জন্ম,
বিষ্ণুবৈরীতা ও বিনাশ
সাধ্বী দিতি একশ বছর গর্ভ ধারণের
পর যমজ পুত্রের জন্ম দিলেন। তাদের জন্মক্ষণে সর্ব লোকে ভয়ংকর উপদ্রব শুরু হয়ে গেল।
দিতির পুত্র সেই আদি দৈত্য দুই ভাইয়ের নাম হিরণ্যকশিপু ও হিরণ্যাক্ষ। তাদের শরীর
পাহাড়ের মতো বিশাল, পাথরের মতো কঠিন ও শক্তিশালী। বাহুবলে তারা অসাধারণ বীর এবং
একমাত্র ভগবান বিষ্ণু ছাড়া তাদের মৃত্যুর ভয়ও ছিল না। অতএব হিরণ্যকশিপু খুব অল্প
দিনের মধ্যেই লোকপালদের ও সেই সঙ্গে সকল লোকই জয় করে ফেলল। আর তার প্রিয় ভাই
হিরণ্যাক্ষ দাদাকে খুশি করার জন্যে গদাহাতে বেরিয়ে পড়ল স্বর্গ জয়ের ইচ্ছায়।
তার পায়ে সোনার নূপুর, গলায়
বৈজয়ন্তী মালা আর কাঁধে বিশাল গদা। হিরণ্যাক্ষকে দুর্দান্ত গতিতে স্বর্গের দিকে
আসতে দেখেই, দেবতারা স্বর্গ ছেড়ে গা ঢাকা দিল। কারণ দেবরাজ ও অন্যান্য দেবতারা তার
শৌর্য, বীর্য, সাহস আর পরাক্রমের কথা সবই জানতেন। কিন্তু দৈত্যরাজ মনে করল,
দেবতারা কাপুরুষ এবং তার তেজেই দেবতারা স্বর্গ ত্যাগ করে পালিয়েছে। স্বর্গে যুদ্ধ
হল না বলে, হিরণ্যাক্ষ খ্যাপা হাতির মতো সমুদ্রের জলে আলোড়ন তুলতে লাগল।
জলের দেবতা বরুণের জলচর সৈনিকেরা, সেই ভয়ংকর আলোড়নে ভয়ে ও আতঙ্কে দূরে পালিয়ে গেল।
মহাবল হিরণ্যাক্ষ এরপর সমুদ্রের মধ্যে প্রবেশ করল, তার নিঃশ্বাসের ধাক্কায়
বিক্ষুব্ধ সমুদ্রের বুকে উত্তাল ঢেউ সৃষ্টি হতে থাকল। হিরণ্যাক্ষ পাতালপতি ও জলচর
প্রাণিদের দেবতা বরুণের ভবনে গিয়ে উপস্থিত হল।
[দাদারা দাদাগিরি করতে গিয়ে অন্য পাড়ায় ঢুকে যদি দেখে যে, সে পাড়ায় কেউ নেই - সব্বাই গা ঢাকা দিয়েছে, কেমন লাগবে সেই দাদার? রাগে ফেটে পড়বে না? স্বর্গ জয় করতে গিয়ে হিরণ্যাক্ষর মনেও ঠিক সেই অনুভূতি হয়েছিল।]
সেখানে হিরণ্যাক্ষ তাঁকে উপহাস করে বলল, “হে মহারাজ, দয়া করে আপনি আমার সঙ্গে যুদ্ধ করবেন কি? শুনেছি আপনি লোকপালের অধিপতি। আপনি অনেক দুর্দান্ত বীরের দর্প চূর্ণ করেছেন। অনেক অসুর ও দানবদের হারিয়ে রাজসূয় যজ্ঞের আয়োজন করেছিলেন। এখন আমাকে হারিয়ে আপনার বীরত্বের সুনাম রক্ষা করুন”।
জলপতি বরুণের মনে ক্রোধ সঞ্চার
হলেও, অকারণ যুদ্ধে লোকক্ষয় এড়ানোর জন্যে তিনি সংযত হলেন, বললেন, “হে
অসুররাজ, আজ অনেক কাল আমি এই যুদ্ধ যুদ্ধ
খেলা ছেড়ে দিয়েছি। আর তোমার মতো যুদ্ধনিপুণ মহাবীরের সমান বীর কাউকেই তো দেখছি না।
একমাত্র বিষ্ণুই তোমার এই যুদ্ধের শখ মিটিয়ে দিতে পারেন। তুমি তাঁর কাছে যাও, তাঁর
সঙ্গে যুদ্ধেই তুমি বীরগতি পাবে। ভগবান বিষ্ণু তোমার মতো বীরের জন্যেই অপেক্ষা
করছেন”।
উদ্ধত হিরণ্যাক্ষ বরুণদেবের কথায়
উন্মত্তের মতো বিষ্ণুর খোঁজ করতে লাগল এবং মহামুনি নারদের কাছে সংবাদ পেল,
শ্রীবিষ্ণু পৃথিবী উদ্ধারের জন্যে এখন রসাতলে রয়েছেন। হিরণ্যাক্ষ সঙ্গে সঙ্গেই
রসাতলে প্রবেশ করল, সেখানে গিয়ে সে দেখল বিশাল পাহাড়ের মতো এক প্রাণী, তার দুই
দাঁতের উপর পৃথিবীকে তুলছে। সেই প্রাণির অঙ্গ প্রভায় হিরণ্যাক্ষর জ্যোতি ঢাকা পড়ে
গেল।
হিরণ্যাক্ষ সামনে
প্রতিদ্বন্দ্বীরূপে এক জলচর বরাহকে দেখে হেসে উঠে বলল, “আমি বিষ্ণুর সন্ধানে এখানে
এলাম, এসে দেখছি এতো একটা বরাহ। মূর্খ বিষ্ণু, শূকরের বেশ ধরেছ বলে তুমি আমার হাত
থেকে পরিত্রাণ পাবে, এমন চিন্তাও করো না। পৃথিবীকে রেখে দাও, প্লাবনে ভেসে আসা
পৃথিবী এখন রসাতলেই থাকবে, কারণ এই রসাতল আমারই অধীন। তুমি আমার সঙ্গে যুদ্ধের
জন্য প্রস্তুত হও। তোমার যুদ্ধজয়ের যত কাহিনী শুনেছি, সে সবে তোমার পৌরুষ
নামমাত্র, তোমার যোগমায়াই তোমার আসল শক্তি। মূঢ়, আজ আমি তোমাকে হত্যা করে, আমার
নিহত বন্ধুদের মৃত্যুর প্রতিশোধ নেব। আমার ভীষণ গদার আঘাতে তোমার মাথা চূর্ণ করে
দিলেই, তোমার ভরসায় থাকা যতো ব্রাহ্মণ, দেবতা, মুনি, ঋষি সকলেই অনাথ অসহায় হয়ে
পড়বে”।
বরাহরূপী ভগবান সেই অসুরের কুকথা
শুনেও কর্ণপাত করলেন না। তাঁর দুই দাঁতের উপর ধরে রাখা পৃথিবীকে নিয়ে তিনি জলের
উপরে উঠে এলেন। জল থেকে বাইরে এসে, তিনি পৃথিবীকে প্রতিষ্ঠা করলেন এবং পৃথিবীর
মধ্যে আধারশক্তি সঞ্চার করলেন। সেই ক্ষণ থেকেই পৃথিবী সকল ভূতের বাসযোগ্য হয়ে উঠল।
এই আশ্চর্য ঘটনায় মুগ্ধ হয়ে, ব্রহ্মা শ্রীবরাহের স্তব করতে লাগলেন, স্বর্গ থেকে
দেবতারা আনন্দে পুষ্পবৃষ্টি করতে লাগলেন।
ভগবানের পিছনে তাড়া করে আসছিল
হিরণ্যাক্ষ, তাঁকে জলের বাইরে চলে আসতে দেখে, সে বলল, “তোমার মতো নির্লজ্জ আর
কাপুরুষের নিন্দার ভয় না থাকাই স্বাভাবিক, সেই কারণেই তুমি পালিয়ে আসতে পারলে”।
ভগবান পৃথিবীর প্রতিষ্ঠার জন্যে
অনেকক্ষণ ধৈর্য ধরে ছিলেন, এবার তিনিও ক্রোধে গর্জন করে বললেন, “ওরে অভদ্র অসুর,
তুই যে আমাকে জলচর বরাহ বললি, সত্যিই আমি তাই, কিন্তু আমি তোর মতো কুকুরেরই সন্ধান
করে থাকি। আমি তোর ভয়ে পাতালে বদ্ধ থাকা পৃথিবীকে নিয়ে নির্লজ্জের মতো পালিয়ে
এলাম। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি, তোর মতো বীরের থেকে পালিয়ে আমি কোথায় যাবো? আয়,
আমাকে হত্যা করে তোর আত্মীয়দের চোখের জল মুছিয়ে দেবার তোর প্রতিজ্ঞা তুই রক্ষা কর,
তা নইলে তুই আর কিসের বীর”?
ভগবানের এই বিদ্রূপে হিরণ্যাক্ষ
ক্রোধে উন্মাদের মতো ভগবানের বুকে গদার আঘাত করতে গেল, কিন্তু ক্ষিপ্রবেগে সেই
আঘাত এড়িয়ে গেলেন ভগবান বিষ্ণু। অসুর হিরণ্যাক্ষ বীর্যে, শক্তিতে ও রণকৌশলে
অত্যন্ত দক্ষ হওয়া সত্ত্বেও, ভগবান বিষ্ণু তার আক্রমণ বারবার প্রতিহত করছিলেন,
কিন্তু নিজে আঘাত করছিলেন না। চপল বালক খেলার ছলে যেমন ক্রুদ্ধ সাপের লেজ আকর্ষণ
করে, তার ছোবলকে ব্যর্থ করে দেয়, তিনিও হিরণ্যাক্ষকে নিয়ে যেন যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায়
মত্ত হলেন।
এইভাবে দুপুর পার হয়ে যখন বিকেল
হতে চলল, ঋষিদের নিয়ে ব্রহ্মা সেখানে উপস্থিত হলেন, ব্রহ্মা বললেন, “হে অচ্যুত, এই
দৈত্য অত্যন্ত দুর্ধর্ষ দুর্বৃত্ত, একে হত্যা না করলে, তোমার আশ্রয়ে থাকা দেবতা,
গো, ব্রাহ্মণ ও নিরপরাধ জীব বিপন্ন বোধ করবে। হে দেব, এর সঙ্গে যুদ্ধের খেলায় সময়
নষ্ট করো না। দেখ সন্ধ্যা আসতে আর দেরি নেই, আর সন্ধ্যা উপস্থিত হলে, এই অসুরকে আজ
হত্যা করা সম্ভব হবে না। হে ভগবান, জয় ও বিজয়ের শাপ মোচনের বিধানে, তুমি স্বয়ং এই
অসুরকে বধ করবে, এমনই বিধান দিয়েছিলে। অতএব আর বিলম্ব করো না”।
তারপর সেই ভয়ংকর যুদ্ধে হিরণ্যাক্ষের গদা ও
ত্রিশূল বিনষ্ট হল। নিরস্ত্র হিরণ্যাক্ষ
বরাহরূপী ভগবানের বক্ষে বজ্রমুষ্টিতে আঘাত করল। সেই আঘাতে পাহাড় কেঁপে ওঠে কিন্তু
ভগবান এতটুকুও বিচলিত হলেন না। হিরণ্যাক্ষ এবার ভগবানকে দুই বাহুর আলিঙ্গনে পীড়িত
করতে সর্বশক্তি প্রয়োগ করল। কিন্তু কি আশ্চর্য, ভগবান সেই ভীষণ আলিঙ্গনের মধ্যে
থেকেও, অসুরের কর্ণমূলে তাঁর চরণের ক্ষুর দিয়ে বজ্রের মতো আঘাত করলেন। সেই আঘাতেই
সেই দুর্দান্ত অসুর ছিন্নমূল বিশাল গাছের মতো মাটিতে আছড়ে পড়ল। ধরাশায়ী মহাদৈত্য
হিরণ্যাক্ষ বরাহরূপী শ্রীবিষ্ণুর মুখ দর্শন করতে করতেই প্রাণ ত্যাগ করল।
মৈত্রেয় বললেন, “এই ভাবেই আদিবরাহ শ্রীহরি দুর্দান্তবিক্রম হিরণ্যাক্ষকে খেলার ছলে সংহার করেছিলেন এবং তারপর তাঁর আনন্দের নিলয় নিজের বৈকুণ্ঠলোকে ফিরে গিয়েছিলেন”।
মহামুনি কর্দম ও দেবহূতির পরিণয়
বিদুর বললেন, “হে ঋষিবর,
সাধুজনেরা স্বায়ম্ভূব মনুর বংশের খুব প্রশংসা করে থাকেন। এই বংশেই স্ত্রী-পুরুষ
সংসর্গে প্রজা সৃষ্টি হয়েছিল, অতএব এই বংশের কথা আমাকে বর্ণনা করুন। স্বায়ম্ভূব
মনুর দুই পুত্র প্রিয়ব্রত ও উত্তানপাদ এবং এক কন্যা দেবহূতি। এই দেবহূতির
পাণিগ্রহণ করেছিলেন, ব্রহ্মার ছায়া থেকে উৎপন্ন প্রজাপতি ঋষি কর্দম। আমাকে সেই বৃত্তান্ত দয়া করে
বর্ণনা করুন”।
শ্রী মৈত্রেয় বললেন, “প্রজাপতি কর্দমের জন্মের পর, তাঁকে ব্রহ্মা প্রজা সৃষ্টি করার নির্দেশ দিলেন। সেই নির্দেশ পালনের জন্য মহর্ষি কর্দম সরস্বতীনদীর তীরে দশ হাজার বছর ধরে ভক্তিভরে শ্রীহরির তপস্যা করলেন। এইভাবে তপস্যার পর, সত্যযুগে তাঁর আরাধনায় সন্তুষ্ট হয়ে শ্রীহরি ব্রহ্মময় তনুতে তাঁর সামনে প্রকাশিত হলেন। শ্রীহরির সেই রূপ নির্মল ও সূর্যের মতো উজ্জ্বল। তাঁর কণ্ঠে দিনের প্রকাশরূপ শ্বেতপদ্ম ও রাত্রির প্রকাশরূপ নীল উৎপলের মালা। তাঁর বসন নির্মল; তাঁর মাথায় রত্নখচিত মুকুট, কানে সোনার কুণ্ডল। তাঁর তিন হাতে তিনি শঙ্খ, চক্র ও গদা ধারণ করে আছেন। চতুর্থ হাতে শ্বেত লীলাপদ্ম। তাঁর গলায় কৌস্তুভমণির মালা, তাঁর বক্ষে লক্ষ্মীদেবীর নিলয়। তাঁর দুই চরণকমল গরুড়ের কাঁধে বিন্যস্ত। তাঁর অধরে মৃদু হাসি এবং দুই নয়নে মনোহর দৃষ্টি। প্রজাপতি কর্দম আকাশবিহারী শ্রীহরির এই রূপ দেখে ধন্য হলেন।
[আজকাল কৌস্তভ নামটি বাঙালীদের মধ্যে বহুল প্রচলিত, কিন্তু নামটি হওয়া উচিৎ ছিল কৌস্তুভ - স্ত-এর সঙ্গে একটি হ্রস্ব-উ যোগ করলে - স্তু হয় - বিষ্ণুর কণ্ঠে কৌস্তুভমণিরই মালা থাকে - কৌস্তভ মণির নয়।]
পরমানন্দে তিনি শ্রীহরিকে প্রণাম করে, জোড়হাতে নিবেদন করলেন, “হে পূজনীয় দেব, তুমি অখিল সত্ত্বার আধার, আজ তোমাকে দর্শন করে আমার নয়নযুগল সার্থক হল। হে পরমেশ, তুমি প্রজাপতি ব্রহ্মারূপে আমাকে প্রজা সৃষ্টি করার যে নির্দেশ দিয়েছেন, সেই আজ্ঞা পালনের জন্যে আমি তোমার কাছে একজন যোগ্য সহধর্মিণী প্রার্থনা করছি। গৃহাশ্রমে ভার্যার থেকেই ধর্ম, অর্থ ও কাম এই ত্রিবর্গ লাভ করা সম্ভব। ধর্মপত্নী থেকে শুধু যে লোকসৃষ্টি সম্ভব তাই নয়; ঋষি-ঋণ, দেব-ঋণ ও পিতৃ-ঋণ এই তিন রকমের ঋণ থেকেও মুক্তি পাওয়া যায়। হে দেব, তুমি এক হয়েও জগৎ সৃষ্টির জন্যে নিজের মধ্যেই স্থিত যোগমায়ার প্রভাবে এই বিশ্ব সৃষ্টি করেছ, পালন করছ আবার তুমিই এই বিশ্বের বিনাশও করবে। হে ভগবান, তুমিই মুক্তি দান করো, কারণ তোমার পরমজ্ঞানের জন্যে কর্মের ফল তোমাকে স্পর্শ করতে পারে না। আবার তুমি ভোগও দান করে থাকো, কারণ তুমিই তোমার মায়ায় বিশ্বের সকল ভোগের উপকরণ উৎপাদন করে থাকো। তুমি কামনায় আসক্ত ব্যক্তিদের বাসনাও পূর্ণ করে থাকো। এই কারণেই কামনায় আসক্ত অথবা নিরাসক্ত, সকলেই তোমার চরণে আশ্রয় নিয়ে থাকে। আমিও তোমার ঐ চরণ কমলে অসংখ্য প্রণাম করি”।
ঋষিবর কর্দমের এই স্তব শুনে,
ভগবান শ্রীহরি বললেন, “হে প্রজাপতি কর্দম, আমার অর্চনা কোনদিন ব্যর্থ হতে পারে না।
আমি তোমার এই উদ্দেশ্য আমি জানি, তাই আগে থেকেই তোমার জন্যে আমি সব ঠিক করেই
রেখেছি। যিনি সসাগরা এই ধরণী শাসন করছেন, ব্রহ্মার পুত্র সেই রাজর্ষি স্বায়ম্ভূব
মনু তাঁর ধর্মপত্নী শতরূপাকে নিয়ে পরশুদিন আসছেন তোমার সঙ্গে দেখা করতে। তাঁর
দেবহূতি নামে এক কন্যা আছে। তিনি
নবীনা, সুশীলা ও বহুগুণের আধার। রাজর্ষি মনু তোমাকেই সেই কন্যা সম্প্রদান করবেন।
হে ব্রহ্মন, তোমার এই ভার্যা তোমার নয়টি কন্যার জননী হবেন এবং এই নয় কন্যার সহিত
মরীচি প্রমুখ ঋষিদের বিবাহ হয়ে বহু সন্তান সৃষ্টি হবে। হে মহামুনি, তোমার ভার্যা
দেবহূতির গর্ভে স্বয়ং আমি নিজের অংশকলায় জন্ম নেব এবং তত্ত্বসংহিতা রচনা করব”।
[দশ হাজার বছরের তপস্যায় তুষ্ট হয়ে, শ্রীহরি নিজেই ঘটকালি করে, দশহাজার বছরের বুড়ো ঋষি কর্দমের জন্যে যে পাত্রী ঠিক করে দিলেন, তিনি নবীনা, সুশীলা ও বহুগুণের আধার। এর তুলনায় আমাদের কৌলীন্যপ্রথায় আশি বছরের বুড়োর সঙ্গে যে আট বছরের বালিকার বিয়ে হত, সে তো তুচ্ছ।]
ভগবান শ্রীহরি মহর্ষি কর্দমকে এই
উপদেশ দিয়ে সরস্বতীনদীতীরের বিন্দুসর নামের সেই আশ্রম থেকে বিদায় নিলেন ও গরুড়ের
পিঠে আরোহণ করলেন। মহর্ষি দেখলেন, শ্রীহরি গরুড়ের
পিঠে চড়ে চলেছেন এবং সিদ্ধগণ নিখিল তপোমন্ত্র সাধনায় তাঁর স্তব করছেন। এদিকে
গরুড়ের পাখার ধ্বনিতে সামবেদের অভিব্যক্তি ও সামবেদের আধারস্বরূপ ঋকবেদ সমূহ
উচ্চারিত হয়ে শোনা যাচ্ছিল। শ্রীহরি
দৃষ্টির বাইরে চলে যাবার পর, মহর্ষি কর্দম স্বায়ম্ভূব মনুর আসার অপেক্ষায় বিন্দুসর
আশ্রমেই রয়ে গেলেন”।
শ্রী মৈত্রেয় বললেন, “এদিকে
উপযুক্তা কন্যার জন্য পতির সন্ধানে স্বায়ম্ভূব মনু তাঁর সোনার অলংকারে সাজানো রথে
বেশ কিছুদিন ধরেই পর্যটন করছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন পত্নী শতরূপা ও সুশীলা কন্যা
দেবহূতি। নানান দেশ, নানান রাজ্যে ঘুরতে ঘুরতে তাঁরা এসে পৌঁছলেন, সরস্বতী নদীর
তীরে বিন্দুসর আশ্রমে। এই ক্ষেত্রে শরণাপন্ন কর্দমের প্রতি করুণাবশতঃ ভগবানের নয়ন
থেকে একবিন্দু আনন্দ অশ্রু পড়েছিল, সেই থেকেই ওই স্থানের নাম বিন্দুসরঃ হয়েছিল। এই
আশ্রম সরস্বতীর পুণ্যজলে সিক্ত এবং মহর্ষিগণের অবস্থানে পবিত্র।
রাজর্ষি মনু তাঁর অনুচরদের সঙ্গে আশ্রমে প্রবেশ করলেন। সেই সময় মুনিবর কর্দম সবেমাত্র হোম সমাধা করে বিশ্রাম করছেন। সদ্য হোম সমাপনের জন্যে তাঁর শরীর উজ্জ্বল তেজময় ছিল। রাজর্ষি তাঁর কাছে গিয়ে দেখলেন, মহর্ষির শরীর ঋজু, তাঁর দুই চোখ পদ্মের পাপড়ির মতো, তাঁর মাথায় জটা এবং অঙ্গে বল্কল বসন। অসংস্কৃত মহামণিকে যেমন কিছুটা মলিন দেখায়, তাঁকে দেখে রাজর্ষির সেরকমই মনে হল। রাজর্ষি তাঁর পায়ের কাছে প্রণত হলে, মহামুনি কর্দম তাঁকে আশীর্বাদ করলেন ও অভিনন্দন করে হাত পা ধোবার জল ও বসার জন্য দিলেন কুশাসন।
হাত পা ধুয়ে রাজর্ষি আসনে বসার পর, মহর্ষি কর্দম বললেন, “আপনি সাধু ব্যক্তির রক্ষা ও অসাধু ব্যক্তিদের শাস্তি বিধানের জন্য সর্বদাই ব্যস্ত থাকেন। কারণ আপনিই ভগবান শ্রীহরির পালনী শক্তি। আপনি প্রতাপে সূর্য, যশে চন্দ্র, পরাক্রমে অগ্নি, ঐশ্বর্যে ইন্দ্র এবং দুষ্ট নিগ্রহে যম। আমার মনে হচ্ছে, আমার ইষ্টদেব শ্রীবিষ্ণুই যেন আপনার রূপ ধরে আর একবার আমার সামনে উপস্থিত হয়েছেন, আপনি আমার নমস্কার গ্রহণ করুন। রাজ্য শাসনের স্বাভাবিক নিয়মেই আপনি ঘুরতে ঘুরতে হয়তো আমাদের আশ্রমে এসেছেন, কিন্তু আপনার এই আশ্রমে আসার যদি বিশেষ কোন কারণ থেকেও থাকে, অনুগ্রহ করে ব্যক্ত করুন, হে মহারাজ। আমরা খুব আনন্দের সঙ্গে আপনার উদ্দেশ্যসাধনের প্রয়াস করবো”।
চলবে...
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন