প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "
দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "
তৃতীয় ধারাবাহিক উপন্যসের প্রথম পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "
চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ "
পঞ্চম ধারাবাহিক উপন্যাস প্রথম পর্ব - "স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "
সম্পুর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "; "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "
২
প্রবীণবাবু অনেকক্ষণ একটানা কথা বলে থামলেন। ঘরের
সকলেই তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে সেই দিনগুলির কথা কল্পনা করছিলেন। ব্রিটিশদের হিংস্র
থাবা থেকে ভারতবর্ষকে বাঁচাতে কত মানুষকেই যে সে সময় প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে কত
যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছিল, সে কথা ভাবতে গেলেই মন ভার হয়ে যায়। সেই সব মানুষদের
লড়াই আর সহ্যশক্তির ফসল আজকের স্বাধীনতা। অহীন ভাবল, স্বাধীনতা অর্জন করে বৃটিশের
হিংস্রতা থেকে আমরা মুক্তি পেয়েছি ঠিকই, কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে আমাদের দেশের
শাসকরা যেভাবে সাধারণ মানুষকে যন্ত্রণা আর দুর্ভোগের আবর্তে ঠেলে দিচ্ছে – সেটা কি
ওই স্বদেশপ্রেমী মানুষরা কোনদিন কল্পনা করতে পেরেছিলেন?
প্রবীণবাবু অহীনের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “অহীনবাবু,
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস তো তোমরা পড়েছ?”
অহীন বলল, “পড়েছি – আমাদের স্কুলের সিলেবাসে ছিল”।
প্রবীণবাবু বললেন, “সে পড়ে কিস্সু বোঝা যাবে না।
খুব সংক্ষেপে তোমাকে বলছি শোন। বলা হয় ১৯৩৯ সালের পয়লা সেপ্টেম্বর দ্বিতীয়
বিশ্বযুদ্ধের শুরু। ওই দিন জার্মানি পোল্যাণ্ড দখল করার জন্যে যুদ্ধ শুরু করল, আর
তার দুদিন পরে জার্মানিকে শায়েস্তা করতে ব্রিটিশ আর ফরাসী বাহিনী যুদ্ধ করতে মাঠে
নামল। অবিশ্যি তার বেশ কয়েক বছর আগে থেকেই ইওরোপের নানান দেশে, এমনকি এশিয়াতেও জাপান
আর চিনের মধ্যে লাগাতার যুদ্ধ চলছিল।
ব্রিটিশদের তখন খুব দেমাক – তারা ধরাকে সরা জ্ঞান
করত। তাদের সাম্রাজ্যে কোনদিন সূর্য অস্ত যায় না। আর তাদের সাম্রাজ্যের সব থেকে
দামি রাজ্যটি হল আমাদের এই ভারতবর্ষ। ভারতের মাঠে মাঠে অজস্র শস্য, মাটির তলায়
অঢেল খনিজ সম্পদ। তার ওপর সোনা, রূপো, মণি রত্নের অফুরন্ত ভাণ্ডার। প্রচুর লুঠ করা
গেছে – কিন্তু তাতেও আশ মেটেনি – তাদের লোভ আরও আরও অনেক কিছু লুঠ করার – যতদিন
ইচ্ছা।
সে সময় গুটিকতক সর্বভারতীয় নেতা চাইছিলেন ব্রিটিশ রাজত্বই থাক। তাঁরা ব্রিটিশদের থেকে কিছু কিছু সুযোগ সুবিধে পেলেই খুশি। তাদের নিয়ে ব্রিটিশদের খুব মজা। ধরা যাক ওই নেতারা খেতে চাইলেন রসগোল্লা। অনেক হম্বিতম্বি, টালবাহানা করে ব্রিটিশরা তাঁদের দিল একটা নকুলদানা। সেই নকুলদানা নিয়েই ওই নেতারা খুশি। তাঁরা ভাবলেন আজ পেয়েছি নকুলদানা, এরপর কোনদিন পাব বাতাসা। এভাবেই একদিন ঠিক রসগোল্লা পেয়ে যাবো। আমার মনে হয় ব্রিটিশরা ওই নেতাদের কীর্তির কথা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করত আর আমাদের আহাম্মকিতে হেসে কুটিপাটি হত।
কিন্তু অন্যদিকে বেশ কিছু নেতা চাইছিলেন ভারতবর্ষ থেকে ব্রিটিশদের তাড়াতে। ব্রিটিশদের কাছে এই নেতারা খুবই বিপজ্জনক – এরা দিন কে দিন দলে ভারি হচ্ছিল। শুধু রাজধানী কিংবা বড়ো শহরে নয় – জেলায় জেলায়, গ্রামে গ্রামে এই নেতাদের অনুগামীরা বিপ্লবের দীক্ষা নিয়ে, ব্রিটিশদের জ্বালিয়ে মারছিল। এই রেল লাইন উপড়ে ফেলছে। এই টেলিগ্রাফের তার, টেলিফোনের তার ছিঁড়ে, যোগাযোগ ব্যবস্থা তছনছ করে দিচ্ছে বারবার। পোস্ট অফিস, ট্রেজারি থেকে টাকা লুঠ করছে। বাঘা বাঘা ব্রিটিশ অফিসারদের তারা গুলি করে মারছে, কিংবা মারার চেষ্টা করছে বারবার।
কথায় আছে বাঁশের থেকে কঞ্চি দড়। ব্রিটিশ সরকারের
অধীনে চাকরি করা দেশীয় অফিসাররা ব্রিটিশদের থেকেও স্বদেশী-বিপ্লবীদের ওপর অত্যাচারে
ছিল অনেক কাঠি ওপরে। তাদেরকেও ছেড়ে কথা বলছে না স্বদেশী বিপ্লবীরা। টিপে টিপে মারছিল ছারপোকার মতো।
এক কথায় ভারতবর্ষ নামক সোনার ডিম পাড়া হাঁসটিকে সামলাতে
সে সময় ব্রিটিশরা তাদের সর্বশক্তি নিয়েও হাঁসফাঁস করছিল। তাদের অহরহ ব্যতিব্যস্ত
করে রাখছিল, স্বদেশী করা এই সংগ্রামী মানুষগুলো। ওদিকে ইওরোপে নিজের প্রতিবেশী জার্মানিদের
খোঁচা দিয়ে – বেশ প্যাঁচে পড়ে গেল ব্রিটিশরা। তারা ভেবেছিল খুব সহজেই জার্মানিদের
ঢিট করে যুদ্ধ করার শখ মিটিয়ে দেবে। সে তো হলই না – বরং যুদ্ধের তেজ বেড়ে উঠল এবং
বিয়াল্লিশ সাল নাগাদ গোটা ইওরোপ জুড়েই যুদ্ধের আগুন জ্বলে উঠল। চরমে উঠল দ্বিতীয়
বিশ্বযুদ্ধ।
ভারতের নরমপন্থী নেতাদেরও এবার চোখ খুলল, এই
সুযোগটা ছাড়লেন না, তাঁরা ওই বিয়াল্লিশেই ভারত ছাড়ো আন্দোলনের ডাক দিলেন। আর
নেতাজী সুভাষ বিদেশে গিয়ে ব্রিটিশদের শত্রুদের সঙ্গে হাত মেলালেন এবং জাপানের সাহায্যে
ব্রিটিশ ভারতকে আক্রমণ করার জন্যে বিয়াল্লিশ সালেই গড়ে তুললেন আজাদ হিন্দ ফৌজ। এই
সবের মধ্যে ব্রিটিশরা যে চরম বজ্জাতিটা করল, সেটা হল বাংলার মুখের গ্রাস কেড়ে নিল।
ইওরোপের নানান যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেদের সৈন্যদের রসদ যোগাতে তারা বাংলা থেকে শয়ে শয়ে
জাহাজ ভরে পাচার করতে লাগল খাদ্য শস্য, মানে চাল-ডাল-গম এইসব। বিয়াল্লিশ থেকে
তেতাল্লিশ সাল পর্যন্ত গোটা অভিন্ন বাংলা এবং পূর্ব ভারত জুড়ে চলল ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ।
লক্ষ লক্ষ – কেউ বলে শুধু বাংলাতেই আট লাখ, আর গোটা ভারতে প্রায় তিরিশ লাখ - মানুষ
মারা গেল অনাহারে। বাংলার ইতিহাসে যাকে ১৩৫০ বা পঞ্চাশের মন্বন্তর বলে।
পঁয়তাল্লিশ সালের সেপ্টেম্বরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ
শেষ হল, জাপান ও জার্মানির চূড়ান্ত হার হল ঠিকই, কিন্তু ব্রিটিশদেরও কোমর ভেঙে গিয়েছিল।
এর দুবছরের মধ্যেই সাতচল্লিশের আগষ্টে ব্রিটিশদের ভারত থেকে পাততাড়ি গোটাতে হল। পলাশীর
যুদ্ধ জয় থেকে যদি ব্রিটিশদের রাজত্বকাল ধরা হয় তাহলে একশ নব্বই বছরের যন্ত্রণা
থেকে মুক্তি পেয়ে ভারত স্বস্তি পেল। কিন্তু আমাদের দুশ্চিন্তার যন্ত্রণা বেড়ে গেল।
দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পেল না আমার ছোটকা!”
অহীন অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, “কেন?”
মেঝের দিকে তাকিয়ে প্রবীণবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে
রইলেন, তারপর বললেন, “মা, ঠাকুমার মুখে শুনেছি ঠাকুর সিদ্ধানন্দ নাকি
ত্রিকালদর্শী। ত্রিকালদর্শী মানে জানো তো? অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যৎ যিনি দেখতে
পান। তা সে ত্রিকাল তো অনেক দূরের কথা, বছর চারেকের মধ্যেই যে আমরা স্বাধীন হতে
চলেছি সেটা তিনি দেখতেই পেলেন না! বাবা ও মায়ের কাছে শুনেছি, তেতাল্লিশ সালে বসে ঠাকুর
সিদ্ধানন্দ ভেবেছিলেন, পঞ্চাশ-ষাট বছরের আগে ব্রিটিশদের এদেশ থেকে বিদেয় করা যাবে
না। কাজেই অতি সাবধানী হয়ে, তিনি অনেক ভেবেচিন্তে ছোটকাকে প্রায় আশি বছরের জন্যে
সমাধির ব্যবস্থা করেছিলেন। অর্থাৎ ছোটকার বয়েস একশ বছর পূর্ণ হলে, তবেই তার সমাধি
ভাঙবে। এদিকে ভারত তো স্বাধীন হয়ে গেল চার বছরের মধ্যে! বেচারা ছোটকাকে অকারণে এতগুলো
বছর ওই পাতালঘরে বন্দী থাকতে হবে? কোন মানে হয়?
আমার ঠাকুমা, বাবা-মা সকলেই পাগলের মতো ঠাকুর
সিদ্ধানন্দের খোঁজ শুরু করলেন। তাঁকে খবর দেওয়ার নানান ব্যবস্থা করলেন। কিন্তু প্রায়
বছর চারেক তাঁর কোন সন্ধানই পাওয়া গেল না। তারপর একদিন বাবার নামে একটা চিঠি এল। সেই
ভদ্রলোকও ঠাকুর সিদ্ধানন্দের কাছে দীক্ষা নেওয়া শিষ্য, অর্থাৎ আমার বাবা-মায়ের
গুরুভাই”।
উদ্বিগ্ন অহীন জিজ্ঞাসা করল, “তিনি কী লিখেছিলেন,
দাদু”?
প্রবীণবাবু সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালেন। দেওয়াল আলমারির সামনে গিয়ে, তার পাল্লা খুলে একটা বহু পুরোন ফাইল বের করলেন। সেটা হাতে নিয়ে সোফায় এসে বসলেন। ফাইলের ফিঁতে খুলে, অনেক কাগজ পত্রের মধ্যে থেকে একটা চিঠি বের করলেন। সেটা হাতে নিয়ে বললেন, “এই সেই চিঠি। পড়ছি, মন দিয়ে শোন”।
“।। ওঁ শ্রী শ্রী গুরবে নমঃ।। ওঁ শ্রী শ্রী গুরু কৃপাহি কেবলম্।।
ভবদীয় সুধীনবাবু মহাশয়,
পত্রারম্ভে আপনার ও আপনার পরিবারের সকলের
সর্ব্বাঙ্গীন কুশল কামনা করি।
শ্রীশ্রী গুরুদেবকে আপনি যে তিনখানি পত্র প্রেরণ
করিয়াছিলেন, সেগুলি একত্রে গতকল্য আমার হস্তগত হইয়াছে। লিফাফার উপর আপনার লিখিত
ঠিকানার বারংবার পরিশোধন দেখিয়া, বুঝিতে অসুবিধা হয় নাই যে, পত্রগুলি বহুজনের হস্ত
মারফৎ redirect হইয়া অবশেষে আমার নিকট আসিয়া পঁহুছিয়াছে।
শ্রীশ্রী গুরুদেব আমাদিগের ন্যায় অভাগা শিষ্যদের বিবিধ
দুর্ভোগ ও দুর্দশা হইতে উদ্ধার করিতেন। সে সব গোপন দুর্ভাগ্যের কাহিনী তৃতীয় কোন ব্যক্তির
অবজ্ঞাত হওয়া সমীচিন নহে বিবেচনা করিয়া, আমি আপনার কোন পত্রই পাঠ করি নাই, এ বিষয়ে আপনি
নিশ্চিন্ত থাকিতে পারেন। এই পত্রের সঙ্গে আপনার অন্য তিনখানি লিফাফাও আমি প্রেরণ
করিলাম। কারণ এই পত্রাদি কোন দুর্জনের হস্তগত হইলে কী বিপদ ঘটিতে পারে, সে কথা কে
বলিতে পারে?
এই ঝঞ্ঝাসংকুল ভব-সাগরে নিশ্চিন্ত তরণী হইয়া যিনি
আমাদের বারংবার উদ্ধার করিয়াছিলেন। বিশাল বটবৃক্ষের ন্যায় যিনি আমাদের শরণস্বরূপ
সদা বিরাজ করিতেন। একমাত্র তিনিই সকল বিপদে আপনার সহায় হইতে পারিতেন। কিন্তু হৃদয়বিদারী দুঃখের কথা আর কী বলিব - আজ
দ্বিবৎসর হয়, তিনি আমাদিগের ন্যায় অভাগাজনকে ত্যাগ করিয়া পরমলোকে পরমপদ লাভ করিয়াছেন।
ইহজগতে কেহই অমর নহে, সে কথার উল্লেখ বাহুল্যমাত্র।
কালের অনুশাসনে তাঁহার দেহাবসানের শোক অচিরেই
হয়তো অপনোদন হইত। কিন্তু যাবজ্জীবিত রহিব, একথা কখনও বিস্মৃত হইব না যে, তাঁহার
মৃত্যু স্বাভাবিক নহে, সে মৃত্যু বড়ই মর্মন্তুদ। আপনি অবগত আছেন, দেশবিভাগের
ডামাডোলে, হিন্দু-মুসলিম পরষ্পরকে হত্যার যজ্ঞে মাতিয়া উঠিয়াছিল। সেই প্রবল
দাঙ্গার পরিস্থিতিতে, ৪৬ সালে আমাদিগের গুরুদেব যশোহর জিলার
শিমুলিয়ায় জনৈক শিষ্যভবনে অধিষ্ঠান করিতেছিলেন। সেখানেই বীভৎস এক সাম্প্রদায়িক
ঘটনায় আমাদিগের গুরুদেব সহ ওই পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষরা সকলেই নিহত হন। শুনিয়াছি
বাড়ির মহিলা ও শিশুরা প্রতিবেশী কোন বাড়িতে আশ্রয় পাইয়াছিলেন এবং এক্ষণে জীবন্মৃতবৎ
দুর্দশায় কাল কাটাইতেছেন।
আর লিখিতে পারি না। আমার চক্ষুদ্বয় বাষ্পময় হইয়া উঠিতেছে। ইদৃশ
দুঃসংবাদে সপরিবার আপনিও স্তম্ভিত হইবেন জানি। শোকে, আক্ষেপে ব্যাকুল হইবেন। কিন্তু
কোন ভাষায় আপনাকে সান্ত্বনা জানাইব, তাহা জানা নাই।
ইতি
শ্রী সজনীকান্ত মল্লিক,
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন