ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "
ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১ "
ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "
ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "
ধর্মাধর্ম শেষ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৫/১ "
"ধর্মাধর্ম" গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -
গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২
(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)
অথবা
+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।
[এর আগের পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৫/১৩ "]
৫.৪.১.৪ দ্বারকাধীশ কৃষ্ণ
দ্বারকা ও রাজস্থানে কৃষ্ণ “রণছোড়জী” নামেই প্রসিদ্ধ। এই নামটি সম্ভবতঃ
মধ্যযুগ থেকে প্রচলিত হয়েছিল। যেমন আমাদের পূর্বভারতে, কৃষ্ণ নামটি কাহ্ন, কানু, কানাই নামেও জনপ্রিয়
হয়েছে মধ্যযুগের বৈষ্ণব পদকর্তাদের প্রভাবে।
অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ “রণছোড়” শব্দটির অর্থ – যিনি যুদ্ধ ছেড়ে এসেছেন।
মথুরায় কংসবধের পর, রাজা
কংসের শ্বশুর পরাক্রান্ত চেদিরাজ জরাসন্ধ, কৃষ্ণ-নিধনের জন্যে বারবার
(পৌরাণিক মতে আঠারোবার) মথুরা আক্রমণ করেছিলেন। সে যুদ্ধে কোন পক্ষই জয়ী হতে
পারেননি,
কিন্তু
প্রতিটি যুদ্ধেই দুই পক্ষের বহু নিরীহ সৈন্য নিহত/ আহত এবং অজস্র সম্পদ হানি হত।
এই অকারণ রক্তপাত এবং শক্তি ও সম্পদ-ক্ষয় এড়াতে কৃষ্ণ যুদ্ধ ছেড়ে সুদূর দ্বারকায়
সরে গিয়েছিলেন। নিঃসন্দেহে এ তাঁর অসাধারণ দূরদর্শীতা, ধৈর্য ও বিচক্ষণতার পরিচয়। কারণ
পরবর্তীকালে তিনি মধ্যম পাণ্ডব ভীমের সঙ্গে একক যুদ্ধে প্ররোচিত করে জরাসন্ধকে
নিহত করিয়ে শত্রুমুক্ত হয়েছিলেন, সেখানে কোন নিরীহের রক্তপাত হয়নি। প্রতিকূল সময়ে যুদ্ধ
ছেড়ে আসা যে আসলে অনুকূল সময়ে যুদ্ধজয়ের প্রস্তুতি, সে কথাটাই শ্রীকৃষ্ণের “রণছোড়জি”
নামের মহিমা।
দ্বারকাধীশ কৃষ্ণের দশজন প্রধানা পত্নীর নাম শোনা যায় - রুক্মিণী, সত্যভামা, জাম্ববতী, নাগ্নজিতী, কালিন্দী, মাদ্রী, মিত্রবৃন্দা, ভদ্রা। প্রাগজ্যোতিষপুরের
ভৌমাসুর বহু রাজাকে পরাস্ত করে ষোল হাজার রাজকন্যাকে বন্দী করে রেখেছিলেন।
প্রাগজ্যোতিষপুরের নরকাসুরকে বধ করে, কৃষ্ণ ভৌমাসুরের অন্তঃপুরে যান এবং বন্দিনী রাজকন্যাদের
মুক্ত করার আদেশ দিলে, ষোল
হাজার রাজকন্যা তাঁকেই পতিরূপে বরণ করেছিলেন। কৃষ্ণও সানন্দে তাঁদের গ্রহণ করে, দ্বারকায় পাঠিয়েছিলেন, এবং প্রত্যেক পত্নীর
জন্যে সুন্দর গৃহ নির্মাণ করিয়েছিলেন। প্রধানা দশ মহিষীর প্রত্যেকের গর্ভে ভগবান
কৃষ্ণের দশটি করে পুত্রের জন্ম হয়েছিল, তাঁদের মধ্যে বিখ্যাত ছিলেন, প্রদ্যুম্ন, চারুদেষ্ণ, ভানু, শাম্ব, সুমিত্র, পুরুজিৎ, বীর, সুবাহু, প্রঘোষ, বৃক, হর্ষ, সংগ্রামজিৎ, বৃহৎসেন প্রমুখ। শোনা যায়
তাঁর মোট পুত্রসংখ্যা নাকি সহস্রাধিক।
ব্রজবাসী কৃষ্ণের আরও একটি বহুল জনপ্রিয় প্রেমের উপাখ্যানের উল্লেখ মহাভারত বা শ্রীমদ্ভাগবতে পাওয়া যায় না। সেটি হল পরবর্তী কালের বহুল জনপ্রিয় রাধা-কৃষ্ণ উপাখ্যান। মহাভারতের পরিপূরক গ্রন্থ “খিলহরিবংশ”-এ – কৃষ্ণের রাসলীলার বর্ণনায় কৃষ্ণের মুখে দুটি মাত্র নামের উদ্দেশে বিরহ ভাবের উল্লেখ পাওয়া যায়, “হা রাধে! হা চন্দ্রমুখি!” (খিল হরিবংশ, অধ্যায় ৭৬), কিন্তু তাঁদের সম্পর্কে আর কোন বিবরণ বা তথ্য পাওয়া যায় না। অথচ পরবর্তী কালের কবিকুল, বিশেষত বঙ্গের কবিকুল এই যুগলকে নিয়ে অজস্র ভাবের ও আবেগের গান ও পদাবলী রচনা করেছেন। কৃষ্ণভক্ত যুগাবতার শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর (১৪৮৬-১৫৩৩ সি.ই) আবির্ভাবের পর, বঙ্গদেশে রাধা-কৃষ্ণই অন্যতম প্রধান উপাস্য হয়ে উঠেছিলেন।
৫.৪.২ ভক্তিযোগের ঐক্য
জ্ঞানযোগ, কর্মযোগের
পর যে ভক্তিযোগের কথা আগে বলেছিলাম, গুপ্তযুগের সমসাময়িক কালে সেই ভক্তিযোগ সম্পূর্ণ রূপ নিয়ে
বিকশিত হয়ে উঠেছিল এবং প্রধানতঃ এই ভক্তি আন্দোলনের বিপুল জনপ্রিয়তাই সমগ্র
ভারতবর্ষে পূর্ণতঃ হিন্দুধর্মকে প্রতিষ্ঠা করল। হিন্দু ধর্ম এই সময়ে শুধু যে
রাজন্য বর্গের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করল তাই নয়, দেশের সাধারণ জন সমাজ, আর্য এবং অনার্য উভয়েই, হিন্দু ধর্মের প্লাবনে
একই সূত্রে বাঁধা হয়ে গেল। আর্য-অনার্যের প্রধান বিভেদটা দূর হয়ে গেল, অর্থাৎ আর্যরা ভারতবর্ষের
প্রতিটি প্রান্তের অনার্যদের সঙ্গে মিশে যেতে পারল। কিন্তু এই সময় থেকেই জন্মগত
বর্ণভেদ অনেকটা নমনীয় হলেও অর্থনৈতিক বর্ণভেদটা আরও প্রকট হয়ে উঠতে লাগল। অর্থাৎ
তখন থেকে প্রভাবশালী ও বিত্তশালী বৈশ্য এবং শূদ্ররাও সমাজে সম্মানীয় হয়ে উঠল, কিন্তু সমাজের প্রান্তিক
ও দরিদ্র বৈশ্য এবং শূদ্ররা হয়ে উঠল অন্ত্যজ, অস্পৃশ্য বা অচ্ছ্যুৎ। চার বর্ণের
থেকেও ভয়ংকর হয়ে উঠল “জাতি” এবং “বর্গ” – সে কথা পরে আলোচনা করা যাবে।
ভাগবত ধর্মে অনার্য এবং ব্রাহ্মণ্য ধর্মের সমন্বয় বিধান করেছেন, স্বয়ং কৃষ্ণ -
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার বিভূতি যোগে এবং শ্রীমদ্ভাগবতের একাদশ স্কন্ধের ষোড়শ অধ্যায়ে।
প্রথম ক্ষেত্রে তিনি প্রিয়সখা অর্জুনকে বলেছিলেন, দ্বিতীয় ক্ষেত্রে আরও সবিস্তারে
বলেছেন ভাগবত উদ্ধবকে। তিনি বলছেন, “উদ্ধব, আমি সর্বভূতের সুহৃদ, আত্মা, ঈশ্বর; আমিই সর্বভূতস্বরূপ এবং আমিই
সর্বভূতের সৃষ্টি, স্থিতি
ও সংহার-হেতু”। তিনি আরো বলছেন,
১. সকল দেবতাদের মধ্যে তিনিই হিরণ্যগর্ভ (ব্রহ্ম), বিষ্ণু, শিব, ইন্দ্র, অগ্নি, বরুণ। অতএব সকল
দেবভক্তদের মধ্যে তিনিই পরম উপাস্য, তাঁর উপাসনা করলে সকলেরই উপাসনা হয়ে যায়।
২. সকল তত্ত্বের মধ্যে তিনিই মহৎ-তত্ত্ব, তিনিই ওঁকার, তিনিই অ-কার, তিনিই গায়ত্রী ছন্দ। অতএব
তিনিই সকল তত্ত্বের আধার।
৩. সকল ঋষিদের মধ্যে তিনিই মহর্ষি ভৃগু, রাজর্ষি মনু, দেবর্ষি নারদ, সিদ্ধেশ্বর কপিল, মুনিদের মধ্যে নারায়ণ, ব্রহ্মচারীদের মধ্যে
সনৎকুমার।
৪. সকল প্রাণী - গবাদি পশুর মধ্যে তিনিই কামধেনু, পাখিদের মধ্যে গরুড়, উচ্চৈঃশ্রবা অশ্ব, ঐরাবত হাতি, বাসুকি সাপ, অনন্ত নাগ, তৃণভোজীদের মধ্যে
কৃষ্ণসার হরিণ এবং মাংসাশীদের মধ্যে সিংহ। জলচর প্রাণীদের দেবতা তিনিই বরুণ। এই
প্রাণীদের মধ্যে অনেকগুলিই অনার্য মানবগোষ্ঠীদের দেব-আত্মা হিসেবে পূজিত হতেন, যেমন গরুড়, হাতি, সাপ, নাগ, সিংহ ইত্যাদি - তাঁরা
সকলেই এখন হয়ে গেলেন কৃষ্ণের স্বরূপ। মাত্র কয়েকবছর আগে সংবাদে এসেছিল রাজস্থানের
কিছু জনগোষ্ঠী “কৃষ্ণসার” হরিণকে দেবতা বলে মান্য করেন।
৫. উপদেবতাদের মধ্যে তিনিই অর্যমা (পিতৃদেব), দক্ষ (প্রজাপতি)।
৬. বিভিন্ন মানব গোষ্ঠী – তিনিই দৈত্য ও অসুরদের প্রহ্লাদ, যক্ষ ও রাক্ষসদের কুবের।
অর্থাৎ এতদিন রাক্ষস, দৈত্য, দানবদের সম্বন্ধে আর্যদের
যে উদ্ভট বৈরীভাব ছিল, সেটাও
দূর হয়ে গেল। তিনিই গন্ধর্ব ও অপ্সরাদের মধ্যে বিশ্বাবসু ও পূর্বচিত্তি, (বানরগোষ্ঠীর) হনুমান।
৭. পণ্ডিত ব্যক্তি - তিনিই ধীর
ব্যক্তিদের মধ্যে অসিত, (ইনিই বুদ্ধদেবের জন্মের পর রাজা শুদ্ধোদনের সঙ্গে দেখা
করেছিলেন),
দ্বৈপায়ন
বেদব্যাস,
দেবগুরু
বৃহষ্পতি ও দৈত্যগুরু শুক্রাচার্য। স্ত্রীগণের মধ্যে শতরূপা, পুরুষদের মধ্যে
স্বায়ম্ভূব মনু। পুরোহিতদের মধ্যে বশিষ্ঠ।
৮. গুণ ও দোষ – তিনিই ক্ষমাশীলদের ক্ষমা, সত্ত্বশীলদের সত্ত্ব, বীরদের জিগীষা, বণিকদের সম্পদ-আহরণ।
তিনিই ধূর্তদের ছল, পাশাখেলার
চাতুরি।
৯. বীরত্ব ও যুদ্ধ – তিনিই বীর শ্রেষ্ঠ অর্জুন, দেবসেনাপতি কার্তিকেয়।
১০. প্রকৃতি – তিনিই নদীর মধ্যে গঙ্গা, জলাশয়ের মধ্যে সমুদ্র, দুর্গম পর্বতের মধ্যে
হিমালয়, বৃক্ষের মধ্যে অশ্বত্থ, শস্যের মধ্যে যব।
গঙ্গানদী,
হিমালয়
পর্বত এবং অশ্বত্থে দেবত্ব আরোপ বহু প্রাচীন প্রচলিত বিশ্বাস। প্রধান ফসল উৎপাদনে
নবান্ন উৎসব কৃষিজীবনের শুরুর থেকে ওতপ্রোত জড়িত, অঞ্চল ভেদে সে গম, যব বা ধান যাই হোক না
কেন।
ভাগবত ধর্ম তথা হিন্দুধর্ম ভগবান কৃষ্ণের বিভূতি অর্থাৎ তাঁর ঐশ্বর্য দিয়ে জয় করে ফেললেন সমগ্র ভারতের সমাজ। হিন্দু ধর্মের এই প্রবল প্রসারের ফলে ভারতবর্ষের জনসমাজ থেকে বৌদ্ধধর্মের প্রভাবও ধীরে ধীরে ক্ষীণ হতে লাগল। তবে বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাবকে দুর্বল করার আরও একটি কারণ হল, বুদ্ধকে বিষ্ণুর অবতার বানিয়ে তোলা। ব্রাহ্মণ্যধর্ম বিদ্বেষী বা বিরোধী প্রাচীন অনার্য সমাজ, যাঁরা বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি কিছুটা সহানুভূতিশীল ছিলেন, তাঁদের বোঝানো হল, ভগবান বুদ্ধও ভগবান বিষ্ণুর অবতার। অতএব ভগবান বুদ্ধও যখন হিন্দুধর্মেরই একজন দেবতা, তখন না হক বৌদ্ধধর্মে গ্রহণে তাঁরা উৎসাহ হারালেন। তবে বিষ্ণু-অবতারের সাম্মানিক পদটুকু ছাড়া হিন্দুধর্ম থেকে ভগবান বুদ্ধ, কোনদিন আর কিছুই পাননি।
কিন্তু হিন্দু ধর্ম হঠাৎ এমন জনপ্রিয় হয়ে উঠল কী করে? এর উত্তর একটাই ভক্তিযোগ। হিন্দুধর্মের নতুন শাস্ত্র ও পুরাণে রাজা-রাজড়াদের জন্যে যজ্ঞ অনুষ্ঠানের কথা থাকলেও, সাধারণ মানুষের জন্যে প্রচলন হল সহজ পুজো পার্বণের, আর তার সঙ্গে যাঁরা মুক্তি বা মোক্ষ পথের পথিক, তাঁদের বলা হল, নিঃস্বার্থ অর্থাৎ অহৈতুকী ভক্তি করো। সে ভক্তিরও নানান পথ আছে, যার যেমন পছন্দ, যার যেমন বিশ্বাস। পুরাণে বলা হয়েছে, ভক্তিভাবের পাঁচটি প্রকার আছে, যাদের একত্রে পঞ্চভাব বলে। যেমন,
১. শান্ত ভাব – বিষ্ণুর প্রতি একনিষ্ঠ শ্রদ্ধা ও জ্ঞান - সনক, সনন্দন, সনাতন ও সনৎকুমার, শুকদেব, দেবর্ষি নারদ।
২. দাস্য ভাব – কোন উদ্দেশ্য ছাড়া বিষ্ণুর সেবা করাই দাসের কর্তব্য, যেমন জয়-বিজয়, হনুমান, উদ্ধব।
৩. সখ্য বা ভ্রাতৃত্ব ভাব – নিঃস্বার্থ বন্ধু হিসেবে ভক্তি, যেমন বলরাম, ব্রজের গোপ বালকেরা, অর্জুন, দ্রৌপদী, সুদামা, বিদুর, অক্রুর।
৪. বাৎসল্য ভাব – পিতৃত্ব বা মাতৃত্ব ভাব, মা-বাবা যেমন কোন স্বার্থ ছাড়াই
সন্তানের সেবা করেন, যেমন
মাতা যশোদা,
গোপরাজ নন্দ, বসুদেব, মাতা দেবকী, মাতা কুন্তী, বিদুর।
৫. মধুর বা প্রেমভাব– প্রেমিকা হিসেবে নিঃস্বার্থ ভালবাসা, যেমন শ্রীরাধিকা, গোপরমণীগণ, কুব্জা, দেবী মীরা, শ্রীচৈতন্যদেব।
এই পাঁচটি ভক্তিভাবের মধ্যে পঞ্চমটি শ্রেষ্ঠ ও সহজতম ভক্তি পথ এবং
প্রথমটি জ্ঞানীর তপস্যাজনিত কঠিন পথ।
এছাড়াও আরেকটি ভাবের কথা শ্রীমদ্ভাগবতে বলা হয়েছে, যদিও সেই ভাব কখনোই
সাধারণের আচরণীয় নয়, সেটি
হল শত্রুভাব। চরম বিষ্ণু-বিদ্বেষী হয়েও বিষ্ণুকে খুব দ্রুত লাভ করা যায়। যেমন, সত্যযুগে
হিরণ্যাক্ষ-হিরণ্যকশিপু, ত্রেতাযুগে রাবণ-কুম্ভকর্ণ এবং দ্বাপরে শিশুপাল-বক্রদন্ত
ভয়ংকর বিষ্ণু-বিদ্বেষী ছিলেন। এঁরা সকলেই স্বয়ং বিষ্ণুর অবতারের হাতে নিহত
হয়েছিলেন বলে,
সকলেই
সরাসরি বিষ্ণুতে লীন হয়ে বৈকুণ্ঠলোকে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিলেন। অবিশ্যি এর পিছনে যে
পৌরাণিক কাহিনী আছে, সেটি
হল,-
বৈকুণ্ঠে বিষ্ণুলোকের দুই বিষ্ণুভক্ত দ্বারপাল ছিলেন জয় ও বিজয়। একবার
যোগসিদ্ধ ও পরম বিষ্ণুভক্ত চার কুমার – সনক, সনন্দন, সনাতন ও সনৎকুমার (এঁরা সকলেই
শান্তভাবের ভক্ত) বৈকুণ্ঠে গিয়েছিলেন বিষ্ণুর সঙ্গে দেখা করতে। সিদ্ধযোগী অর্থাৎ
বালকের মতোই সরল ও নগ্ন ওই চারকুমারকে জয়-বিজয়, বিষ্ণু-নিবাসের দ্বারে প্রবেশের
অনুমতি দেননি। তাতে চার কুমার তাঁদের অভিশাপ দিয়েছিলেন, জয়-বিজয়কে মর্ত্যে জন্ম নিতে হবে।
প্রধান দ্বারে গোলমালের সংবাদ শুনে স্বয়ং বিষ্ণু এসে উপস্থিত হলেন।
তিনি তাঁর পরমভক্ত চার কুমারকেই সমর্থন করলেন এবং জয়-বিজয়ের মর্ত্যে পতনকে, তিনি যদিও রদ করতে পারতেন, কিন্তু করলেন না। তিনি
জয়-বিজয়কে প্রস্তাব দিলেন, তাঁরা যদি মর্ত্যে গিয়ে মিত্রভাবে বিষ্ণুর উপাসনা করেন, তাহলে তাঁদের বৈকুণ্ঠে
ফিরে আসার আগে বহুজন্ম মর্ত্যেই কাটাতে হবে। আর যদি শত্রুভাবে বিষ্ণুকে বিদ্বেষ
করেন, তাহলে মাত্র তিন জন্মেই
তাঁদের উদ্ধার হওয়া সম্ভব। জয়-বিজয় বিষ্ণুর পরমভক্ত ছিলেন, তাঁরা চাইছিলেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব
বৈকুণ্ঠে ফিরে ভগবান বিষ্ণুর সেবা করতে এবং প্রত্যেকদিন তাঁর দর্শন পেতে। অতএব
তাঁরা দ্বিতীয় প্রস্তাবেই রাজি হয়েছিলেন। এই জয়-বিজয়ই তিন যুগে তিন
বিষ্ণু-বিদ্বেষী ভাই হয়ে জন্ম নিয়েছিলেন এবং সরাসরি বিষ্ণু অবতারের হাতে নিহত হয়ে
বৈকুণ্ঠলোকে ফিরে গিয়েছিলেন।
এই কাহিনীর গূঢ় তত্ত্ব হল, বেদ-ব্রাহ্মণ্য তথা বিষ্ণু-বিরোধী অনার্য বা আর্য রাজাদের
হত্যাকে যুক্তিসিদ্ধ করা। আদতে এঁরা যেন সকলেই ছিলেন বিষ্ণুর পরমভক্ত জয়-বিজয়ের
শাপগ্রস্ত জাতক,
তাঁরা সকলেই
বিষ্ণুর বিরোধীতা করেছিলেন, বিষ্ণুর হাতেই নিহত হয়ে দ্রুত বিষ্ণুলোক অর্জনের লক্ষ্যে।
অনার্য গোষ্ঠীদের মনে কোথাও কোন বিদ্বেষভাব যদি থেকেও থাকে – এই কাহিনী তাতে
সান্ত্বনাময় প্রলেপের কাজ করেছিল, সন্দেহ নেই। কিন্তু বিদ্বেষ-ভক্তির এই পথ অবশ্য
পরিত্যাজ্য। কারণ আমাদের মতো সাধারণ মানুষরা কেউই শাপভ্রষ্ট জয়-বিজয়ের জাতক নই।
অতএব বিষ্ণুবিরোধী ভক্তিপথে গেলে, বিষ্ণুর অবতারের হাতে নয়, তাঁর ধর্মরক্ষকদের হাতে
গণধোলাইতেই নিহত হতে হবে।
চলবে...
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন