শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ৪

 প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

তৃতীয় ধারাবাহিক উপন্যসের প্রথম পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ " 

    পঞ্চম ধারাবাহিক উপন্যাস প্রথম পর্ব - "স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "

সম্পুর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "; "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "



এর আগের পর্ব - " স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ৩ "


মুখবন্ধঃ 
[১৯৪৭ সালের ১৫ই আগষ্ট মধ্যরাত্রে বৃটিশ অপশাসন থেকে আমরা মুক্ত হয়েছি। আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। সেই মাহেন্দ্রক্ষণটিকে স্বাগত জানাতে গিয়ে নেহরুজির বক্তব্যের প্রথম বাক্যটি ছিল, “Long years ago we made a tryst with destiny, and now the time comes when we shall redeem our pledge, not wholly or in full measure, but very substantially”.। আজ স্বাধীনতার আশিতম বছরে পা রেখে, সত্যিই কি আমরা পেরেছি এবং পারছি আমাদের যাবতীয় pledge redeem করতে? এক কল্পিত স্বাধীনতা সংগ্রামীর সঙ্গে আজকের জেন-জি তরুণের কথোপকথনে এই উপন্যাস তুলে ধরবে আমাদের যাবতীয় পাওয়া-না পাওয়ার কাহিনী।]

১৩ই জুলাই রবিবার, ২০২৬, সকাল পৌনে দশটা

চিলেকোঠার ঘরে একটা চৌকি ছিল, সেটায় অহীন আর সর্বজিৎ বসল। তারপর সর্বজিৎ বলল, “তোরাও ভেতরে আয়”। সর্বজিৎ আর বৌদির কথাবার্তা শুনে অহীনের মনের ভয় এখন অনেকটাই কেটেছে। সে অবাক হয়ে দেখল, দরজা এবং জানালা দিয়ে পাঁচ-ছটা ছায়া শরীর ঘরের ভেতর ঢুকে এসে দাঁড়াল। তাদের মধ্যে দুটি ছায়া দাঁড়াল সর্বজিতের সামনে।

সর্বজিৎ মুচকি হেসে অহীনকে জিজ্ঞাসা করল, “তুমি কি ওদের দেখতে পাচ্ছো, অহীন?”

অহীন বলল, “তা পাচ্ছি, তবে বড্ডো ঝাপসা”।

সর্বজিৎ হেসে ফেলে বলল, “ব্যাস, ব্যাস। ওতেই চলবে – তার মানে তোমার মন থেকে ভয়ের মেঘ কাটছে। আমার সামনে যে দুজন দাঁড়িয়ে আছে – ওরা রুকু-সুকু যমজ ভাই – ছোটবেলায় খুব দুরন্ত ছিল – পুকুরে স্নান করতে গিয়ে জলে ডুবে মারা যায়। ওদের সঙ্গে তিৎলির যমজ দুই বোন রুন্টি-ঝুন্টির প্রথম বন্ধুত্ব হয়েছিল। তারপর থেকে আমাদের সকলের সঙ্গে। এখন ওরাও আমার ছোটভাই। বাকিদের সঙ্গে পরে পরিচয় হবে। এখন কাজের কথায় আসি। অহীন, মেসোমশাই যেমন বলছিলেন, তাতে মনে হয় ওই বাড়িটাই তোমাদের আদি বাড়ি, না?” পিছনের জানালা দিয়ে বাড়িটা দেখাল সর্বজিৎ।

অহীন বলল, “হ্যাঁ ওই বাড়িটাই”।

“পাতালঘরে ঢোকার সুড়ঙ্গ বা সিঁড়িটা ঠিক কোন ঘরটার মধ্যে আছে, তুমি জান?”

“না সরুদা, জানি না। আসলে আমার জন্ম এই বাড়িতেই – আর আমি জ্ঞান হয়ে থেকেই বাড়িটাকে হানাবাড়ি অবস্থাতেই দেখেছি – কাজেই ও বাড়িতে ঢোকার কোনদিন চেষ্টাও করিনি। তবে মা ঠাকুমাদের কাছে শুনেছি একতলার পশ্চিমদিকের কোন একটা ঘরের মেঝেয় পাতালঘরে ঢোকার গোপন রাস্তা আছে। শুনেছি ওই ঘরের মেঝের পুরোটাই বড়ো বড়ো পাথরের স্ল্যাব দিয়ে বাঁধানো...তার কোন একটা সরালেই...”।

“অন্য আর কোন ঘরের মেঝে পাথর দিয়ে বাঁধানো নয়?”

“বোধ হয় না, শুনেছি অন্য ঘরের মেঝেগুলো লাল সিমেন্ট দিয়ে পালিশ করা ছিল – আগেকার দিনে যেমন হত আর কি।”

“গুড। তোমাদের বাড়িতে লোহার শাবল-টাবল ধরনের কিছু আছে, গোটা তিন চার হলে ভাল হত। আর গোটা দুয়েক ঝ্যাঁটা”?

“ঝ্যাঁটা হয়ে যাবে, তবে শাবল একটাই হবে”।

রুকু জিজ্ঞাসা করল, “কিছু লোহার টুকরো হবে? দেড় দুহাত লম্বা?”

অহীন এবার রুকুর কথাগুলো বেশ স্পষ্ট শুনতে পেল, এবং স্পষ্ট দেখতেও পেল। রুকুর দিকে তাকিয়ে বলল, “তা হয়ে যাবে”।

রুকু বলল, “বড়দি জানে কোথায় আছে? নীচেয় গিয়ে আমরা নিয়ে নিচ্ছি”।

অহীন জিজ্ঞাসা করল, “বড়দি মানে?”

সর্বজিৎ বলল, “তিৎলি, মানে তোমার বৌদি। ওদের চার বোনের মধ্যে ওই বড়, তাই বড়দি”।

অহীন বলল, “ও, ভূতেদেরও বড়দি হয় বুঝি? হ্যাঁ হ্যাঁ, তা জানে। কিন্তু বৌদিকে ব্যস্ত করার দরকার কি? আমিই যাচ্ছি। সরুদা এখানে আমাদের আর কোন কাজ আছে?”

সর্বজিৎ বলল, “না, না এখানে আর কাজ কি? চল, আমরা বরং ওই বাড়িটার দিকেই যাই – জায়গাটা একটু দেখে আসি”।

৭ 

অহীনের সঙ্গে বাড়ি থেকে বেরিয়ে, বাঁদিকের ছোট একটা গলিতে ঢুকল। গলির বাঁদিকে অহীনদের নতুন বাড়ির পাঁচিল, আর ডান দিকে ছোটবড় বাড়ির সারি। পথে দু একজন পরিচিত মানুষ অহীনের সঙ্গে কথা বলছিল। প্রায় সাড়ে তিনশ-চারশ মিটার হেঁটে গিয়ে অহীনদের পাঁচিল শেষ হতেই, সর্বজিতের চোখে পড়ল – প্রায় জঙ্গল হয়ে ওঠা বেশ বড়োসড়ো একটা পোড়ো জমি।

অহীন হাঁটতে হাঁটতে বলল, “এখান থেকেই আমাদের পুরোনো বাড়ির সীমানা শুরু হল। আগে উঁচু পাঁচিল ছিল, এখন অধিকাংশই ভেঙে পড়েছে ...ভাঙা ইঁট পাটকেলগুলো লোকে নিজেদের কাজে লাগিয়েছে। আর এই যে - এইটা ছিল মেন গেট। শুনেছি, ইঁটের তৈরি বেশ উঁচু আর বড়ো পিলার ছিল দুপাশে – মাঝখানে ছিল লোহার গেট। ঝোপের মধ্যে পিলারদুটোর কিছু এখনো অবশিষ্ট রয়েছে, বাকি সব...। ভেতরে ঢুকবে নাকি সরুদা?”

“চলো না, যতদূর যাওয়া যায়”।

গেটের সামনে থেকে পাথর বিছানো সরু রাস্তা চলে গেছে ভিতরের দিকে। আগে কোনদিন হয়তো মোরাম বিছানো ছিল – এখন সে সবের চিহ্নমাত্র নেই। পাথরের খাঁজে খাঁজে গজিয়ে উঠেছে ঘাস আর আগাছা। সর্বজিতের মনে হল, গেটের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে, এ রাস্তা নিশ্চয়ই অনেকটাই চওড়া ছিল। মোরাম বিছানো এই রাস্তা দিয়েই অহীনের পূর্বপুরুষরা ঘোড়ারগাড়িতে যাওয়া আসা করতেন। পরে মোটর গাড়িও চলেছে এই রাস্তায়। কিন্তু এখন দেখলে বোঝাই যায় না। দুপাশের জঙ্গল ধীরে ধীরে গ্রাস করে নিয়েছে রাস্তার অধিকাংশ। রাস্তায় একজনের পক্ষেও হেঁটে যাওয়া দুষ্কর। ঝোপঝাড়, গাছের ডালপালা সরিয়ে সাবধানে এগোতে হয়। অসাবধান হলেই চোখেমুখে খোঁচা লেগে যেতে পারে। ছিঁড়ে যেতে পারে জামা-প্যান্ট।   

দুপাশের জঙ্গলও কি আর জঙ্গল ছিল? নিশ্চয়ই সাজানো বাগান ছিল। হয়তো আম, জাম, কাঁঠাল গাছ। অজস্র ফুল গাছ। সবুজ ঘাসের সুন্দর লন। সে সব কবেই উজাড় হয়ে গিয়েছে আগাছার আগ্রাসনে। সর্বজিতের হঠাৎ মনে হল, এটাই কি প্রকৃতির নিয়ম? এও কি একধরনের প্রতিহিংসা? এই বাড়ি যখন বানানো হয়েছিল, তখন হয়তো আগাছার জঙ্গল, ঝোপঝাড় কেটে এই বিশাল জমি হাসিল করা হয়েছিল। তারপর সে জমিতে মানুষ মনের মতো প্রাসাদ বানিয়েছিল, মনপসন্দ গাছপালায় সাজিয়ে তুলেছিল চারপাশের বাগান। উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘিরে ফেলেছিল সমস্ত জমিটা, বাইরের অবাঞ্ছিত কোন কিছুই যেন ভিতরে ঢুকতে না পারে।

কিন্তু প্রকৃতি কোনদিনই মেনে নেয়নি, মানুষের এই অত্যাচার। মানুষের প্রাসাদকে দুর্বল করতে বারবার পাঠিয়েছে ঝড় এবং নাড়া দিয়েছে ভূমিকম্পে। পাখিদের সাহায্যে পাঠিয়েছে অজস্র গাছের বীজ - বট, অশ্বত্থ, পিপুল। বাড়ির কার্ণিশে, নকশার খাঁজে খাঁজে তারা শিকড় চারিয়ে দুর্বল করতে শুরু করেছে বাড়ির পোক্ত দেওয়াল। ধনাঢ্য মানুষটির যতদিন অর্থবল, লোকবল থাকে, এই সব আঘাত সে সামলে নেয়। কিন্তু যখনই সে দুর্বল হতে থাকে, মানুষের নির্মাণকে ধ্বংস করতে প্রকৃতি তার সমস্ত শক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সে সময় তারা মানুষের আদরের ফুল-ফলের গাছ, কিংবা বাহারি গাছ, কিংবা লনের সবুজ ঘাস - কাউকেই রেয়াত করে না। সমস্ত বন্যতা নিয়ে জঙ্গল তার মৌরসীপাট্টা বিছিয়ে দেয়। জঙ্গলরাজের প্রজারাও সেখানে নিশ্চিন্তে বসত শুরু করে - নানান পাখি, কীটপতঙ্গ, মাকড়সা, সরীসৃপ, বিছে...।

“সরুদা, এই যে – এই হচ্ছে, আমাদের সেই প্রাচীন প্রাসাদ!”

অহীনের কথায় সর্বজিৎ তার ভাবনার জগৎ থেকে ফিরে এল। সামনে তাকিয়ে দেখল, চওড়া সিঁড়ি উঠে গিয়ে মিশেছে মস্ত এক চাতালে। তারপর চাতালে উঠে ডাইনে বাঁয়ে অনেকগুলি ঘর - মধ্যিখানে উঁচু দরজা। সারি সারি জানালার এবং সামনের দরজার সমস্ত পাল্লা উধাও – নিস্তব্দ শূণ্যতা নিয়ে তারা যেন বিশাল হাঁ করে হাহাকার করছে। দোতলার ছাদ ভেঙে পড়েছে, একতলার ছাদও বহু জায়গাতেই ধ্বসে পড়েছে। তবে দেওয়ালগুলো আজও বিমর্ষ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রয়েছে।

বিশাল উজ্জ্বল এই প্রাসাদ নিয়ে কত গর্বই না করতেন এই প্রাসাদের মালিক ও বাসিন্দারা। সাধারণ মানুষ দূর থেকে দেখত আর ঐশ্বর্যের অহংকার দেখে কেউ মুগ্ধ হত, কেউ বা ঈর্ষা করত। আজ সেই মানুষগুলোর সকলেই বহুদিন হল মৃত্যুর কবলে – তাঁদের গর্বের সেই প্রাসাদটিও আজ ভগ্নস্তূপ। প্রাসাদের দর্পিত দেওয়ালগুলোও যেন বয়সের ভারে, ক্লান্তিতে মাটিতে মিশে যেতে চাইছে। কিন্তু তাদের ভেঙে পড়ার জো নেই, কারণ তারা অজস্র গাছের মোটামোটা শিকড়ে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা। সর্বজিতের ভেতরটা কেমন যেন শিউরে উঠল। একি প্রকৃতির প্রতিহিংসা নয়?

“সরুদা কতক্ষণ এলে?” ঝোপের ভেতর থেকে অবলীলা ক্রমে বেরিয়ে এসে রুকু জিজ্ঞাসা করল, “বাড়ির ভেতরে ঢোকার মতলব করছো না তো? করো না, অবস্থা খুবই খারাপ”।

“নাঃ ভেতরে ঢুকব না। বাইরে থেকে দেখেই মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল, ভেতরে গিয়ে আর কাজ নেই। কিন্তু তোদের কি খবর? কিছু বুঝতে পারলি?”

রুকুর পিছনে সুকুও এসে দাঁড়াল, বলল, “পাতালঘর খুঁজে পেয়েছি, সরুদা। সেই মানুষটিকেও খুঁজে পেয়েছি। অহীনদা উনি আপনার দাদুর কাকা হন, তাই না? বেঁচে আছেন কিনা নিশ্চিত হতে পারিনি। শরীর ভীষণ রোগা। অস্থি-চর্ম সার। তবে মনে হয় প্রাণ আছে, তা নাহলে এতদিনে কঙ্কাল হয়ে যাওয়ার কথা”।

অহীন সরুদার মুখের দিকে তাকাল, উত্তেজিত হয়ে বলল, “ওঃ দাদুকে খবর দিলে ভীষণ খুশি হবেন। সরুদা ইউ আর গ্রেট, এইটুকু সময়ের মধ্যে…”।

সর্বজিৎ বলল, “আমি কিছুই করিনি, অহীন। করেছে, রুকুসুকু আর ওদের টিম। ওরা না থাকলে কিছুই হত না। রুকু-সুকু, বাড়ির ভেতর থেকে কিসের একটা আওয়াজ আসছে রে, ঠং ঠং করে?”

রুকু বলল, “পাতালঘরের ঢোকার জন্যে পাথরের স্ল্যাবটা অনেক কষ্টে খুঁজে পাওয়া গেছে। সেটাকেই খোলার চেষ্টা করছে ওরা। এত বছর ধরে পড়ে আছে তো, জ্যাম হয়ে গেছে…”।

অহীন বলল, “যেমন আছে থাক না, ওটা খোলার কি দরকার?”

সর্বজিৎ হাল্কা হেসে বলল, “ভুলে যাচ্ছ অহীন, রুকুসুকু অশরীরী – ওরা যেখান দিয়ে ইচ্ছে ঢুকে পড়তে পারে। কিন্তু দাদু তো আর অশরীরী নন। তাঁকে তো বের করতে হবে। আচ্ছা, রুকুসুকু একটা কথা বল তো, যে ঘরটায় দাদু রয়েছেন, সেটা তো এত বছর বন্ধ হয়ে পড়ে আছে! সে ঘরে ধুলো বা পোকামাকড়, মশা-মাছি, মাকড়সা-টিকটিকি, কিছু দেখতে পেলি না”?

রুকু বলল, “না, সরুদা। কিচ্ছু দেখিনি – ধুলো জমেছে, কিন্তু বাইরের ঘরেগুলোর তুলনায় সে অতি সামান্য। আর একটা আশ্চর্য ব্যাপার আমরা ঘরে ঢুকতেই অদ্ভূত একটা গন্ধ পেলাম – কিছুটা কর্পূর, ধুনো, ধুপের গন্ধ মেশানো...এই গন্ধের কোনটাই আমাদের সহ্য হয় না – সে তো তুমি জান”।

সরুদা চিন্তিত গলায় বলল, “তোদের কি মনে হয়? ওই গন্ধের জন্যেই পোকামাকড়, মশামাছি ঢোকে না?”

সুকু বলল, “হতে পারে”।

অহীন অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, “আপনাদের এ গন্ধ সহ্য হয় না কেন? কর্পূর, ধুনো, ধুপ – আমাদের তো ভাল লাগে – বেশ একটা পুজো-পুজো গন্ধ...”।

সর্বজিৎ হেসে বলল, “ওরা অশরীরী যে। ওই জন্যেই তো ওদের ওই গন্ধ সহ্য হয় না। রামনাম শুনলে ওদের যেমন অস্বস্তি হয় – সেরকম আর কি! কিন্তু রুকু, তোরা যে ওই পাতালঘরে ঢুকলি, দরজাটা খুলে রেখে আসিসনি তো? ঘরের ওই গন্ধ বেরিয়ে গেলে – মশামাছির উপদ্রব হতে পারে”।

রুকু বলল, “দরজা তো আমরা খুলিইনি – ও নিয়ে চিন্তা করো না, রুকুদা। ঘর যেমন ছিল তেমনই আছে”।

সর্বজিৎ বলল, “গুড। কাজের শুরুটা তো তোরা ভালোই করলি, কিন্তু আসল সমস্যা তো এবার আরম্ভ হবে”।

রুকুসুকু এবং অহীন একসঙ্গে বলে উঠল, “আবার কিসের সমস্যা, সরুদা?”

সর্বজিৎ বলল, “এই সিঁড়িতে বসা যাবে, রুকুসুকু? সাপখোপ, বিছেটিছে ঝামেলা পাকাবে না তো?”

রুকুসুকু বলল, “আমরা আছি কী করতে, বসো না। কিচ্ছু হবে না”।

অহীন আর সর্বজিৎ দালানে ওঠার সিঁড়ির ধাপে বসতে, রুকু জিজ্ঞাসা করল, “কিসের সমস্যার কথা বলছিলে, সরুদা”?

একটু চিন্তা করে সর্বজিৎ বলল, “মানুষটা এতদিন নাওয়া নেই, খাওয়া নেই, বদ্ধ একটা ঘরে বন্দী হয়ে রয়েছেন। তাঁকে বের করে এনে – প্রথম কী খাওয়ানো হবে? বাইরের আলো, হাওয়াতে তাঁর শরীর খারাপও তো হতে পারে। আমাদের চারপাশে কতরকমের ভাইরাস, ব্যাকটিরিয়া বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে! আমরা অনেকটাই অভ্যস্ত হয়ে গেছি, কিন্তু তাতেও আমাদের জ্বর হয়, সর্দি হয়, নিমোনিয়া হয়, যক্ষ্মা হয় ...। এই তো ক’বছর আগে কোরোনা ভাইরাসে, কত লোক যে প্রাণ হারাল, তার সঠিক হিসাব কি আমরা জানি। অতএব, এতদিন পর আচমকা বাইরে এসে, দাদু সে সব সহ্য করতে পারবেন কি? অহীন, তোমাদের পরিচিত ভালো কোন ডাক্তারকে সব কিছু জানিয়ে, সঙ্গে রাখতে হবে।”

অহীন সর্বজিতের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। সর্বজিৎ অহীনের কাঁধে হাত রেখে বলল, “ভগবান না করুন, যদি কোন জটিলতা হয়, তখন হাসপাতাল বা নার্সিং হোমে ভর্তি করতে হবে। সেখানে ওঁনার আইডেনটিটি হিসেবে আধারকার্ড বা ভোটার কার্ড চাইবে, আমরা সে সব কিছুই দেখাতে পারব না”।

অহীন অসহায় মুখে জিজ্ঞাসা করল, “তাহলে কী হবে, সরুদা?”

সর্বজিৎ চিন্তিত মুখে বলল, “উপায় কিছু বের করতে হবে। এবং খুব তাড়াতাড়ি। মহীনদা কবে আসছে? মহীনদাকে এই সময় ভীষণ দরকার”। মহীন অহীনের দাদা, সর্বজিতের ভগ্নীপতি।

 অহীন বলল, “দাদা সবই জানে। ও তো সবকিছুই আজগুবি বলে উড়িয়ে দিয়েছে...”।

    সর্বজিৎ বলল, “এখন তো আর আজগুবি বলে মনে হচ্ছে না, অহীন। মহীনদাকে বলো, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চলে আসতে”।  



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নতুন পোস্টগুলি

ধর্মাধর্ম - ৫/২২

   ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ " ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১   " ধর্মাধর্ম তৃ...