বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/৯

 এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১ " 


  আগের পর্ব - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/৮ "


  তৃতীয় স্কন্ধ - পর্ব ৯


মহামুনি কর্দম ও দেবহূতির পরিণয় (আগের পর্বের পর)

মহারাজ মহামুনি কর্দমের প্রশংসাবাক্য শুনে খুবই লজ্জিত হয়ে, বিনীত ভাবে বললেন, “বেদময় ব্রহ্মা নিজের মুখ থেকে তপস্যা, বিদ্যা ও নিরাসক্ত যোগনিরত আপনাদের মতো ব্রাহ্মণের সৃষ্টি করেছেন। ব্রাহ্মণদের পরিপালনের জন্যে তিনি তাঁর বাহু থেকে আমাদের মতো ক্ষত্রিয়ের সৃষ্টি করেছেন। অর্থাৎ ব্রাহ্মণজাতি ভগবান ব্রহ্মার হৃদয় স্বরূপ এবং ক্ষত্রিয় তাঁর অঙ্গ স্বরূপ বলা যায়। এই ভাবেই ব্রাহ্মণেরা তাঁদের তপোবলে ক্ষত্রিয়কে এবং ক্ষত্রিয়রা বাহুবলে ব্রাহ্মণকে রক্ষা করে থাকে। বাস্তবে, যিনি সকলের আত্মা হয়েও নির্বিকার, সেই পরমেশ্বরই আমাদের উভয়কে রক্ষা করেন, পালনও করেন। হে মহর্ষি, আপনাকে দেখেই আমার মনের সমস্ত সংশয় দূর হয়ে গেছে। আপনার মধুর কথা শুনে, আপনার পায়ের ধুলিকণা মাথায় নিয়ে আমি নিজেকে কৃতার্থ মনে করছি। আপনি কৃপাসিন্ধু, আপনার কাছে আমার একটি নিবেদন আমি রাখতে চাই। 

আমার একটি বিবাহযোগ্যা কন্যা আছে। এই কন্যা বয়সে, স্বভাবে ও গুণে অত্যন্ত সুশীলা। দেবর্ষি নারদের মুখে আপনার চরিত্র, বিদ্যা, রূপ, বয়েস ও গুণের কথা শুনে অব্দি, আমার এই কন্যা মনে মনে আপনাকেই পতিরূপে বরণ করার সংকল্প করে নিয়েছে। হে দ্বিজবর, আপনি আমার এই কন্যারত্নটিকে গ্রহণ করুন। আমি শুনেছি, আপনিও ব্রহ্মচর্য সমাপ্তির পর গার্হস্থ্য আশ্রম অবলম্বনের কথা চিন্তা করছেন এবং এই কারণে বিবাহের জন্যেও প্রস্তুত হচ্ছেন। অতএব, আমার এই কন্যাকেই আপনি ভার্যারূপে স্বীকার করুন”।

মহামুনি কর্দম বললেন, “আমি বিবাহে ইচ্ছুক এবং আপনার কন্যাও অবিবাহিতা, অতএব আমাদের উভয়ের মধ্যে সমুচিত বিবাহ সংস্কারের অনুষ্ঠান হোক। হে মহারাজ, আপনার আত্মজার মনের ইচ্ছে বেদমন্ত্রের উচ্চারণে পূর্ণ হয়ে উঠুক। আপনার কন্যার নিজের কান্তির আভায়, তাঁর অঙ্গের অলঙ্কারসমূহকে নিষ্প্রভ মনে হচ্ছে। একবার আপনার কন্যা প্রাসাদের উপরে খেলা করছিলেন, তাঁর পায়ের নূপুর চরণের শোভা বিস্তার করে, ধ্বনিতে মুখর হয়েছিল এবং ক্রীড়াগোলকের প্রতি লক্ষ্য থাকায় তার চোখ বিহ্বল হয়েছিল। সেই সময় বিশ্বাবসু আকাশপথে যাবার সময় আপনার কন্যার রূপে মুগ্ধ হয়ে নিজের বিমান থেকে পড়ে গিয়েছিলেন। হে মহারাজ, আপনার এই কন্যা ললনাদের শিরোমণি। আপনার দুহিতার রূপ লাবণ্য তাঁর অঙ্গের অলংকারের ঔজ্জ্বল্যকে ম্লান করে দিয়েছে। আমি আপনার কন্যাকে পত্নীরূপে গ্রহণ করবো, কিন্তু আপনার কন্যা যেদিন আমার ঔরসে গর্ভধারণ করবেন, সেই দিন থেকেই আমি সন্ন্যাসধর্ম অবলম্বন করবো। কারণ সন্তান থেকে ঋষিঋণ, দেবঋণ ও পিতৃঋণ; এই তিন ঋণ থেকে মুক্তি পাওয়া যায় এবং এই ঋণমুক্তির পর সন্ন্যাস ধর্ম পালন করাই কর্তব্য। এই নির্দেশ আমাকে দিয়ে গেছেন ভগবান শ্রীঅনন্ত, অতএব তাঁর বাক্যের অন্যথা আমার পক্ষে সম্ভব নয়”।      এরপর, মহারাজ নিজের পত্নী ও দুহিতার মনের ইচ্ছা অনুসারে আনন্দিত চিত্তে মহর্ষি কর্দমকে নিজের কন্যা দেবহূতিকে সম্প্রদান করলেন। মহারাজ্ঞী শতরূপা নবদম্পতিকে প্রচুর যৌতুক, বসন, ভূষণ অন্যান্য গৃহের উপকরণ প্রদান করলেন। সম্রাট মনু মনোমতো পাত্রে কন্যাকে সম্প্রদান করে নিশ্চিন্ত হলেন ঠিকই, কিন্তু কন্যার প্রতি গভীর স্নেহবশে, কন্যার বিরহ চিন্তা করে তাঁর মন চঞ্চল হয়ে উঠল। তিনি বারবার কন্যাকে বুকে জড়িয়ে ধরে চোখের জলে তার কেশরাশি সিক্ত করে তুললেন। অবশেষে মুনিবরের থেকে ফেরার অনুমতি নিয়ে, পত্নী শতরূপার সঙ্গে মহারাজ রথে চড়লেন, সঙ্গে রইল তাঁর অনুচরেরাও। 

[দশ হাজার বছর ধরে তপস্যা করা অর্থাৎ ১০,০০০+ বয়স্ক এক মহামুনি পাত্রের সঙ্গে দ্বাদশী বা ত্রয়োদশী রাজকুমারী পাত্রীর শুভ পরিণয় সম্পন্ন হল। এই না হলে আমাদের পুরাণ কথা! কিন্তু পণ্ডিতেরা বলবেন এটি একটি রূপক কাহিনী, এর মধ্যে নিহিত গূঢ় তত্ত্বটি বোঝার সাধ্য আমাদের মতো অর্বাচীনের থাকার কথা নয়, এবং নেইও।]

দেবহূতি ও কর্দমের দাম্পত্য

মহর্ষি মৈত্রেয় বললেন, “হে বিদুর, বাবা ও মা বিদায় নেবার পর সাধ্বী দেবহূতি ভবানী যেমন প্রভু ভবের সেবা করেন, সেইভাবে স্বামীর সেবা করতে লাগলেন। সম্মান, সেবা, মধুর আলাপ ও ভক্তি দিয়ে স্বামীকে সর্বদাই সন্তুষ্ট রাখতেন আর নিজের মন থেকে তিনি ত্যাগ করলেন, কাম, ক্রোধ, লোভ, ছলনা, বিদ্বেষ এবং অহঙ্কার। এই ভাবে, সর্বদা স্বামীর সন্তুষ্টির জন্যে তিনি কঠোর ব্রতচারণ করতে করতে, তপস্বিনীর মতো কৃশ ও  দুর্বল হয়ে পড়লেন। দেবর্ষি কর্দম মনুকন্যার এই কঠোর ব্রতচারণ দেখে খুবই ব্যথিত হয়ে, প্রেমময় বাক্যে বললেন, “হে মনুপুত্রি, তুমি ধন্য। যে শরীর, দেহীদের কাছে খুবই প্রিয়, তুমি সেই শরীরকে অবহেলা করে আমার প্রতি পরম ভক্তি ও ভালোবাসায় সেবা করে চলেছ। আমার যোগ শক্তিতে ভগবানের প্রসাদ স্বরূপ, অনেক দিব্যভোগ আমি লাভ করেছি। সেই সব ভোগ্যবিষয় আমি তোমাকে দান করব, তুমি ভোগ করো। কারণ তুমি পাতিব্রত্য ধর্ম পালন করে সিদ্ধিলাভ করেছ”।         

দেবহূতি পতির এই কথায় নিশ্চিন্ত হলেন, তিনি সলজ্জ নয়নে, সহাস্য মুখে বিনীত ও প্রেমমধুর স্বরে বললেন,  “হে দ্বিজবর স্বামী। আমাদের বিয়ের আগে আপনি বলেছিলেন আমার গর্ভসঞ্চারের আগে পর্যন্ত আমার সঙ্গে আপনার অঙ্গসঙ্গ হবে। তাই হোক, কারণ পতিসঙ্গে সন্তানের সৃষ্টি, স্ত্রীদের মহৎ গুণ হিসেবে বিবেচিত হয়। হে নাথ, কামশাস্ত্র মতে আমার এই দুর্বল দেহকে রতিসমর্থ করার জন্যে যে ওষুধ, খাদ্য ও পানীয়ের কথা বলা আছে, অঙ্গসঙ্গের জন্য সেই সমস্ত উপকরণের ব্যবস্থা করুন। হে প্রভু, মন্মথ আপনার কাছে বিফল হয়ে বারবার আমাকেই উত্যক্ত করছেন। অতএব, আমাদের মিলনের জন্য একটি ভবনও নির্মাণ করুন"।

মহর্ষি কর্দম প্রিয়ার ইচ্ছা পূরণের জন্য, সেই ক্ষণেই যোগশক্তিতে একটি কামচারী বিমানের ব্যবস্থা করলেন, ঐ বিমান, বিশ্বের সমস্ত কাম্য বস্তু দান করতে পারে। ওই বিমান দিব্য রত্নখচিত এবং মণিময় স্তম্ভে শোভিত। ঐ বিমানে নানা রঙের সুগন্ধী ফুলের মালা আছে। নানান রকম উৎকৃষ্ট কার্পাস বস্ত্র ও পট্টবস্ত্র সাজানো আছে। সেই বিমানে অনেকগুলি ঘর আলাদা করে রচিত হয়েছে। প্রত্যেক ঘরেই নরম শয্যার পালঙ্ক, ব্যজনের ব্যবস্থা, বসবার আসন ও স্থানে স্থানে নানান শিল্প দ্রব্যে সাজানো।  এতসব দেখেও দেবহূতির চিত্ত প্রসন্ন হল না, কারণ ওই গৃহে কোন পরিচারিকা নেই এবং নিজের অঙ্গে মলিনতা নিয়ে ঐ ঘরে তিনি প্রবেশ করতে চাইছিলেন না। দেবর্ষি কর্দম প্রিয়ার মনের ইচ্ছা বুঝতে পেরে বললেন, “হে সুশীলে, তুমি এই বিন্দুসর সরোবরে স্নান করো, কারণ এই সরোবরের সৃষ্টি হয়েছে শ্রীবিষ্ণুর আনন্দ অশ্রুপাতে, এই তীর্থে স্নান করলে মনের ইচ্ছা পূর্ণ হয়।“ স্বামীর নির্দেশ মতো দেবহূতি সরোবরে অবগাহনের জন্য নামলেন, একবার অবগাহনের পর তিনি দেখলেন শত শত কিশোরী পরিচারিকা তাঁর চারিদিকে অপেক্ষারতা। তাদের সকলের গায়ে পদ্মগন্ধ। সেই ললনারা তাঁকে দেখেই জোড়হাতে বলল, আমরা আপনার দাসী, আমাদের এখন কি করতে হবে, আপনি নির্দেশ করুন”। তারপর সেই পরিচারিকারা তাঁকে বহুমূল্য তেল দিয়ে স্নান করাল, উৎকৃষ্ট পাটের বস্ত্র পরিয়ে দিল, উৎকৃষ্ট প্রসাধনে ও অলংকারে তাঁকে সাজিয়ে তুলল। তারপর তাঁর প্রিয় নানাবিধ সুস্বাদু অন্ন ও অমৃতের মতো স্বাদু মদিরা দিল পানের জন্য।

দেবর্ষি কর্দমের মনে প্রিয়তমা সুসজ্জিতা পত্নীকে দেখে প্রেমভাব সঞ্চারিত হল। তিনি দেবহূতিকে সঙ্গে নিয়ে সেই দিব্য বিমানে আরোহণ করলেন। সেই বিমানে করে তাঁরা প্রসন্ন চিত্তে বৈশম্ভক, সুরসন, নন্দন, পুষ্পভদ্রক ও চৈত্ররথ্য নামক দেব কাননে ও মানসরোবরে ভ্রমণ করলেন। এইভাবে তিনি ভূমণ্ডলের সমস্ত দ্বীপ ও দর্শনীয় সকল স্থান পত্নী দেবহূতিকে দেখালেন। তারপর ফিরে এলেন নিজের আশ্রমে। আশ্রমে ফিরে বিমানের অতি সুখকর শয্যায় পত্নীর সঙ্গে রমণে নিরত হলেন। মহর্ষি কর্দম আত্মজ্ঞ ছিলেন, অতএব পত্নী দেবহূতি তাঁর প্রতি অত্যন্ত অনুরক্ত হলেও, পত্নীর প্রতি তাঁর আসক্তি সংযত ছিল। তিনি নিজের রূপকে নয় ভাগে বিভক্ত করে, পত্নীর গর্ভে নয়প্রকার বীর্যাধান করলেন এবং ভগবান শ্রীহরির নির্দেশ মতোই দেবহূতি নয়টি সুলক্ষণা কন্যা প্রসব করলেন। সেই নয় কন্যার গায়ে যেন রক্তকমলের সৌরভ।

[মহামুনি কর্দম তাঁর প্রিয়া ভার্যাকে নিয়ে নানান দেব কানন এবং মানস সরোবরে গেলেন মধুচন্দ্রিমা সারতে। কে বলে সায়েবরা আমাদের হনিমুন করতে শিখিয়েছে?]  

সন্তানের জন্মের পরেই মহর্ষি কর্দম সন্ন্যাস আশ্রমে যাবার কথা বলেছিলেন, সে কথা মনে পড়তে দেবহূতি ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। তিনি মাথা নীচু করে পায়ের নখ দিয়ে মাটিতে আঁচড় কাটতে কাটতে বললেন, “হে স্বামী, আপনি যা যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সবই আপনি সম্পূর্ণ করেছেন। কিন্তু আমি যেহেতু আপনার শরণাগত, আমাকে অভয় দেওয়াও আপনার কর্তব্য”। দুই নয়নে অশ্রু, কিন্তু মুখে ম্লান হাসি নিয়ে বললেন, “হে ব্রহ্মন, আপনি প্রব্রজ্যা নিয়ে বনে গেলে, আমাদের নয় কন্যাকেই স্বয়ং পতি সন্ধান করতে হবে এবং আমাকেও সঠিক পথ নির্দেশ করার মতো কেউ থাকবে না। অতএব আপনি যদি আরও কিছুদিন আমার সঙ্গে বাস করেন, আমার একটি ব্রহ্মজ্ঞ পুত্র লাভ হতে পারে। হে প্রভু, আপনার প্রতি অনুরাগে আমার সুদীর্ঘ সময় বৃথাই কেটে গেল। আপনার মতো ব্রহ্মবিদের সঙ্গে এতদিন বাস করেও, আমি আপনার সেই ভাব এতটুকুও নিতে পারিনি”।                  

দেবহূতির এই ব্যাকুলতায়  দেবর্ষি কর্দমের মনে দয়ার সঞ্চার করল। উপরন্তু, শ্রীহরির প্রতিশ্রুতির কথাও তাঁর মনে পড়ল, তিনি বললেন, হে রাজকন্যা, তোমার চরিত্র অত্যন্ত নির্মল। নিজেকে ভাগ্যহীনা চিন্তা করে দুঃখ করো না। তুমি আগে থেকেই ব্রত পালন করছো, এখন ইন্দ্রিয়ের সংযম, ধর্মাচরণ, তপস্যা, দান ও ভক্তির সঙ্গে ভগবান শ্রীহরির আরাধনা করো। তোমার আরাধনায় ভগবান শ্রীহরি সন্তুষ্ট হয়ে তাঁর অংশ কলায়, তোমার পুত্ররূপে জন্ম গ্রহণ করবেন। তিনি ব্রহ্মজ্ঞ হয়ে জগতে বিখ্যাত হবেন এবং আমিও তাঁর পিতা রূপে পৃথিবীতে প্রচুর সম্মান পাবো।

দেবহূতি স্বামী কর্দমের নির্দেশ অনুযায়ী পূর্ণ বিশ্বাসে ভগবানের আরাধনা করতে লাগলেন। এইভাবে অনেকদিন ভজনার পর, শ্রীহরি তাঁর ক্রোড়ে আবির্ভূত হলেন। আগুন যেমন কাঠের মধ্যেই নিহিত থাকে এবং কাঠের মধ্যেই প্রকাশ পায়। তেমনই সাধ্বী দেবহূতির আত্মায় ভগবান অবস্থান করছিলেন, এখন পুত্র রূপে প্রকাশিত হলেন। তাঁর আবির্ভাবের সংবাদে ব্রহ্মা ও মরীচি প্রমুখ ঋষিরা সরস্বতী নদীর তীরে মহর্ষি কর্দমের আশ্রমে গেলেন। ব্রহ্মা ঋষি কর্দমকে বললেন, “বৎস কর্দম, তুমি আমাদের নির্দেশ অকপট মনে পালন করে, আমাদের সবচেয়ে বড়ো পুজো ও সম্মান করেছ। তোমার এই সুন্দরী কন্যাদের চরিত্র ও রুচি অনুসারে মরীচি প্রমুখ ঋষিদের হাতে সম্প্রদান করো। ভুবনে তোমার খ্যাতি ও তোমার বংশের প্রভূত বিস্তার হবে। হে মনুদুহিতা দেবহূতি, তোমার এই পুত্রের দুই চোখ পদ্মের পাপড়ির মতো এবং চরণযুগলের আকার পদ্মের মতো। তোমার এই পুত্র সাক্ষাৎ ভগবান। ইনি শাস্ত্রপাঠের পরোক্ষজ্ঞান ও উপলব্ধির অনুভব থেকে পাওয়া প্রত্যক্ষজ্ঞানের উপদেশ দিয়ে জীবের কর্মবাসনার নিবৃত্তি করতে এসেছেন। ইনি জগতের সমস্ত সিদ্ধ তত্ত্বজ্ঞানের আধার ও সাংখ্য তত্ত্বের স্বরূপ প্রকাশ করবেন। ইনি কপিল নামে জগতে তোমার কীর্তি প্রতিষ্ঠা করবেন। ইনি তোমার অন্তরের অবিদ্যা অর্থাৎ স্বরূপতত্ত্ববিষয়ে অজ্ঞান দূর করে দেবেন”।

[আমাদের সনাতনী ধর্মের প্রথম ও মূল সাংখ্য দর্শনের প্রবক্তা কপিলমুনি - শ্রীবিষ্ণুর অংশ-অবতার। সেই কারণেই পিতা কর্দমমুনি পুত্রকে 'আপনি' সম্বোধন করেছেন, আর পিতাকে পুত্র কপিল 'তুমি' বলেছেন।  ]  

ব্রহ্মা এই কথা বলে, হংসযানে সত্যলোকে চলে যাওয়ার পর, ঋষি কর্দম ঋষিদের হাতে যথা নিয়মে, তাঁর নয় কন্যাকে সম্প্রদান করলেন। তিনি মরীচিকে কলা, অত্রিকে অনসূয়া, অঙ্গিরাকে শ্রদ্ধা, পুলস্ত্যকে হবির্ভূ, পুলহকে গতি, ক্রতুকে সতী, ভৃগুকে খ্যাতি, বশিষ্ঠকে অরুন্ধতী এবং অথর্বা ঋষিকে শান্তি নাম্নী কন্যা সম্প্রদান করলেন। তাঁর এই কাজে তাঁর কন্যারা ও জামাতা ঋষিরা সন্তুষ্ট হলেন এবং দেবর্ষি কর্দমের অনুমতি নিয়ে ঋষিরা সস্ত্রীক নিজের নিজের আশ্রমে চলে গেলেন। 

এরপর ঋষি কর্দম, তাঁর পুত্ররূপী ভগবান বিষ্ণুর কাছে একান্তে গিয়ে বললেন, “ভগবান, আপনি নিজের মুখেই আমার পুত্র হয়ে জন্মানোর কথা বলেছিলেন। এখন আমার মতো এক অতি সাধারণ মানুষের ঘরে জন্ম নিয়ে, আপনি যে ভক্তকে কৃপা করে তার মান বৃদ্ধি করলেন, এতে সন্দেহ নেই। আপনি প্রকৃতপক্ষে নিরাকার, কিন্তু আপনার যে অলৌকিক চতুর্ভুজ রূপ, সেই রূপই আপনার যোগ্য রূপ।  আপনি প্রকৃতির আবির্ভাব ও লয়ের সাক্ষীস্বরূপ; অতএব আপনিই সর্বজ্ঞ কপিলদেব, আমি আপনাকে প্রণাম করে, আপনার শরণে আশ্রয় নিলাম। হে প্রজাপালক, আপনি আমার পুত্ররূপে আবির্ভূত হয়ে, সকল ঋণ থেকেই আমাকে মুক্ত করেছেন। এখন আপনাকে সর্বদা মনের মধ্যে রেখে, আমি সন্ন্যাসী আশ্রমের পথ অবলম্বন করতে চাই, আপনার কাছে এই আমার প্রার্থনা”।

শ্রীভগবান বললেন, “হে মহর্ষি, বৈদিক কিংবা লৌকিক সকল কার্যে, জ্ঞানীরা আমার বাক্যকেই প্রমাণ বলে মনে করেন। সেই কারণে, আমি আগে যা বলেছিলাম, তা সত্য প্রমাণের জন্যই আমি তোমার পুত্ররূপে জন্ম নিয়েছি। এই জগতে যাঁরা আত্মদর্শন করে, লিঙ্গশরীর থেকে মুক্তি লাভের কথা চিন্তা করেন, তাঁদের প্রকৃতি-পুরুষ প্রভৃতি পরমতত্ত্বের নির্দেশ করার জন্যেই আমার এই জন্ম। অনেকদিন আগে ভুলে যাওয়া এই সূক্ষ্ম আত্মতত্ত্বকে আবার জগতে সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্যেই আমি জন্ম নিয়েছি। আমি তোমাকে তোমার ইচ্ছামতো নির্দেশ দিচ্ছি, তুমি সন্ন্যাস আশ্রমের মার্গে যাও। তোমার সমস্ত কর্ম তুমি আমাতে সমর্পণ করে আমার ভজনা করলেই তুমি অমৃতময় পরমানন্দ লাভ করতে পারবে। সর্বভূতের অন্তরের মধ্যে আমিই স্বপ্রকাশ পরমাত্মা। নিজের আত্মায় আমাকে প্রত্যক্ষ উপলব্ধি করে তুমি মোক্ষপদ লাভ করো। আমি মাতা দেবহূতিকেও এই অধ্যাত্মবিদ্যা দান করব, যে জ্ঞানে তিনিও মৃত্যুভয়কে জয় করে, পরমানন্দ লাভ করতে পারবেন”।

শ্রীভগবানের নির্দেশ পাওয়ার পর প্রজাপতি কর্দম তাঁকে প্রদক্ষিণ করে আশ্রম ছেড়ে বনে চলে গেলেন। সেখানে অহিংসা ব্রত নিয়ে যজ্ঞহীন ও গৃহহীন অবস্থায়, একমাত্র পরমাত্মার শরণাপন্ন হয়ে বাস করতে লাগলেন। যিনি সৎ ও অসতের ঊর্ধে, সকল কারণ ও কার্যের যিনি অতীত; যিনি সত্ত্ব, তম ও রজো এই তিন গুণ বিহীন নির্গুণ, সেই পরমব্রহ্মতত্ত্ব তিনি প্রত্যক্ষ উপলব্ধি করলেন। তাঁর সমস্ত অহং দূর হয়ে গেল। তাঁর চিত্ত থেকে সুখ-দুঃখ, শোক-আনন্দ, শীত-গ্রীষ্ম ইত্যাদি সমস্ত দ্বন্দ্বের অবসান হল। অবশেষে তিনি অজ্ঞানের সমস্ত বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে, পরম ভক্তভাবে ভগবান শ্রীবাসুদেবে লীন হয়ে গেলেন।

পরের পর্ব - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/১০ "



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নতুন পোস্টগুলি

ধর্মাধর্ম - ৫/২১

  ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ " ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১   " ধর্মাধর্ম তৃত...