শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ৩

 প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

তৃতীয় ধারাবাহিক উপন্যসের প্রথম পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১

    পঞ্চম ধারাবাহিক উপন্যাস প্রথম পর্ব - "স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "

সম্পুর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "; "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "



এর আগের পর্ব - " স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ২ "


মুখবন্ধঃ 
[১৯৪৭ সালের ১৫ই আগষ্ট মধ্যরাত্রে বৃটিশ অপশাসন থেকে আমরা মুক্ত হয়েছি। আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। সেই মাহেন্দ্রক্ষণটিকে স্বাগত জানাতে গিয়ে নেহরুজির বক্তব্যের প্রথম বাক্যটি ছিল, Long years ago we made a tryst with destiny, and now the time comes when we shall redeem our pledge, not wholly or in full measure, but very substantially”.। আজ স্বাধীনতার আশিতম বছরে পা রেখে, সত্যিই কি আমরা পেরেছি এবং পারছি আমাদের যাবতীয় pledge redeem করতে? এক কল্পিত স্বাধীনতা সংগ্রামীর সঙ্গে আজকের জেন-জি তরুণের কথোপকথনে এই উপন্যাস তুলে ধরবে আমাদের যাবতীয় পাওয়া-না পাওয়ার কাহিনী।]  


বারোই জুলাই, ২০২৬ শনিবার (আগের পর্বের পরে) 

 

পড়া শেষ হতে দাদু চিঠিটা যত্ন করে আবার ফাইলে রাখলেন। তারপর বললেন, “এই চিঠি সজনীবাবু লিখেছিলেন উণিশশ একান্নর ৭ই জানুয়ারি। আমরা পেয়েছিলাম প্রায় তিনমাস পরে এপ্রিলের মাঝামাঝি। এই চিঠির কথা শুনেই আমার ঠাকুমা হাহাকার করে উঠলেন। আমার বয়েস তখন বছর সতের। ওফ্‌ ঠাকুমার সেই কান্না আর বুক ভাঙা আক্ষেপ মনে পড়লে আজও শিউরে উঠি। সেই শোক আর তিনি কাটিয়ে উঠতে পারেননি। নাওয়া-খাওয়া-ঘুম ছেড়ে দিয়েছিলেন। অহোরাত্র তাঁর একটাই কথা “ছোটটা নীচেয় আটকা পড়ে আছে – ওকে বের আন না, বড় খোকা। ও বউমা – ছেলেটা যে ডেকে ডেকে সারা হল – শুনতে পাচ্ছো না...?”

দাদু বিষণ্ণ মুখে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ, তারপর মাথা নেড়ে গভীর খেদের সঙ্গে বললেন, “এই শোক ঠাকুমা সহ্য করতে পারলেন না, ছ’মাসের মধ্যেই দেহরক্ষা করলেন। সন্তান মারা গেলেও মানুষ এক সময় সান্ত্বনা খুঁজে নেয়। কিন্তু জীবিত সন্তান ঘুমিয়ে রয়েছে মায়ের পায়ের নীচেয় পাতালঘরে –তাকে জাগিয়ে তুলবে কে? কে জানে সেই মন্ত্র? এই আক্ষেপ কোন মায়ের কি সহ্য হয়?”

আমার মা যখন বউ হয়ে এ বাড়িতে আসেন, তাঁর বয়েস চোদ্দ, আর ছোটকার বয়েস সাত। বাপের বাড়িতে ছেড়ে আসা মায়ের ছোটভাইয়ের বয়েসও ছিল সাত। কাজেই মা ছোটকাকে নিজের ভাইয়ের মতোই স্নেহ করতেন। তিনিও তাঁর বুকে এই কাঁটার যন্ত্রণা আমৃত্যু সহ্য করেছেন”।  

কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর আবার বললেন, “এই হচ্ছে ঘটনা। এখন ছোটকাকে কী করে উদ্ধার করা যায়, সকলে মিলে সে কথাটাই আলোচনা করা যাক। নবু তোর কী মত?”

নবীনবাবু চিন্তিত মুখে বললেন, “ছোটদাদু রয়েছেন তো পাতালঘরে। সে ঘর ঠিক কোথায় তুমি কি জান? আমরা তো জানিই না”।

প্রবীণবাবু মাথা নাড়লেন, “নাঃ সে ঘরে ঢোকার রাস্তা আমারও জানা নেই। তার ওপর সে বাড়ির যা অবস্থা কোন লোকই সেখানে ঢুকতে রাজি হবে না”।

কথাটা সত্যি। অহীনরা এখন যে বাড়িতে থাকে, সে বাড়িটা নতুন। বছর চল্লিশেক আগে তার দাদু এই প্রবীণবাবুই বানিয়েছিলেন। অহীনের জন্ম এবং বেড়ে ওঠা এই নতুন বাড়িতেই। আর ওদের পুরোনো বাড়িটা এই নতুন বাড়ির পিছনে – বেশ খানিকটা দূরে। ছোটবেলা থেকেই অহীন বা তার বন্ধুরা ওই বাড়ির আশেপাশে গিয়েছে বহুবার – কিন্তু কোনদিনই ভেতরে ঢুকতে সাহস হয়নি। দোতলা বাড়ির কাঠামোটা কোনরকমে দাঁড়িয়ে আছে। দোতলার ছাদ কবে ভেঙে পড়েছে সে কথা অহীন জানে না। বড়ো বড়ো ফাটল ধরা ইঁটের দেওয়ালগুলোর বেশ কিছুটা দাঁড়িয়ে আছে ঠিকই, কিন্তু অশ্বত্থ আর বটের জঙ্গল শেকড় নামিয়ে দিয়েছে সর্বত্র। বাড়ির চারপাশে – আগে নিশ্চয়ই বাগান-টাগান ছিল – কিন্তু এখন সেখানে দুর্ভেদ্য আগাছার জঙ্গল। প্রত্যেকবার বর্ষায় সে জঙ্গল আরো বেশি ঘন আর ঠাসবুনোট হয়ে ওঠে।

অহীন ঠাকুমা আর মায়ের কাছে গল্প শুনেছে, ওই বাড়ির একতলার পশ্চিমদিকের একটি ঘরের মেঝের পুরোটাই বড়ো বড়ো পাথর দিয়ে বাঁধানো। সেই ঘরের এক কোণায় একটা পাথর সরালে বেরিয়ে পড়ে চারকোণা একটা গর্ত। সেই গর্ত দিয়ে নীচে  নামা যায় – ছোট ছোট ধাপের সিঁড়ি আছে। কিন্তু সেই বিয়াল্লিশ সাল থেকে এই দুহাজার ছাব্বিশ – প্রায় তিরাশি বছর সেই গর্তে কেউ নামেনি। কারণ ঠাকুর সিদ্ধানন্দের নিষেধ। অবিশ্যি অহীন তার বাবার কাছে শুনেছে, আজ থেকে প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে থেকেই ওই বাড়ির ভগ্নদশা শুরু হয়েছিল। অত বড়ো বাড়ি এবং তাকে ঘিরে চারপাশের বাগান-টাগান - ঠিকঠাক সংস্কার করা। তাকে বাসযোগ্য রাখা আর সম্ভব হয়ে উঠছিল না। সেই কারণেই বড়ো রাস্তার ধারে দাদু এই নতুন বাড়ি বানিয়েছিলেন। আর পিছনের দিকে পাঁচিল তুলে আলাদা করে দিয়েছিলেন জঙ্গলে মোড়া প্রাচীন বাড়ির ধ্বংসাবশেষ।

অহীন বলল, “ওই বাড়িতে ঢোকার মতো রাস্তা বানাতে গেলে অনেক লোক লাগিয়ে, আগে ওই জঙ্গল কাটাতে হবে, দাদু। এই ভরা বর্ষায় কে ঢুকবে? তাছাড়া হঠাৎ এতদিন পরে লোকজন লাগিয়ে জঙ্গল সাফ করাতে গেলেই পাড়ায় হৈচৈ পড়ে যাবে। আমাদের ছোড়-প্রপিতামহের সমাধিভাঙার কথা কেউ বিশ্বাসই করবে না। বরং ভাববে আমরা নিশ্চয়ই কোন গুপ্তধনের সন্ধান পেয়েছি। সে এক বিশ্রী ব্যাপার হবে। থানা-পুলিশ-মিউনিসিপ্যালিটির লোকজন হানা দেবে বাড়িতে। হয়তো নিউজ চ্যানেলের লোকরাও চলে আসবে…”।

প্রবীণবাবু মন দিয়ে শুলেন অহীনের কথা। তিনি সায় দিয়ে বললেন, “ঠিকই বলেছ অহীন। কিন্তু যদি সত্যি সত্যিই ছোড়দাদু বেঁচে থাকে? সে কি ওই ঘরে বন্দী অবস্থাতেই মারা যাবে? আর আমরা হাতপা গুটিয়ে বসে থাকব? কোন উপায়ই বের করা যাবে না?” প্রবীণবাবুর ব্যাকুল কথায় সকলেই বিচলিত হয়ে উঠলেন, কিন্তু সমাধানের কোন রাস্তা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

নবীনবাবু বললেন, “বাবা এত উতলা হয়ে উঠ না তো! আমাদের একটু ভাবতে সময় দাও – কিছু একটা সুরাহা হয়েই যাবে – চিন্তা করো না”।

ঘরে থাকা মহিলারা এতক্ষণ কোন কথাই বলেননি। এখন অহীনের বৌদি তিৎলি নবীনবাবুকে বললেন, “আমার সেই মাসতুতো দাদা – আপনারা চেনেন তো, সেই সরুদাকে বলব, বাবা? ও যদি কোন উপায় বের করতে পারে?”

নবীনবাবু বললেন, “সর্বজিৎকে বলবে? কিন্তু সে কি সময় করতে পারবে? এখন আছে কোথায়? কানপুরে না কলকাতায়?”

তিৎলি বলল, “কলকাতাতেই আছে। ফাইন্যাল পরীক্ষা দিয়ে কলকাতায় এসেছে - শুনেছি বেশ কয়েকদিন বাড়িতেই থাকবে। আমি বলে দেখতে পারি, যদি কাল পরশুর মধ্যে চলে আসতে পারে”।

প্রবীণবাবু বললেন, “বলো, বলে দেখ। বেশ বুদ্ধিমান ভাল ছেলে। সে যদি কোন উপায় বের করতে পারে, সে তো ভালো কথা।”

অহীন বলল, “বৌদি, তুমি বলেই দেখ না, যদি আসতে পারে। তোমার মুখে সরুদার নানান কীর্তির কথা যা শুনেছি, ও কিছু একটা উপায় বের করে ফেলবেই”।

তিৎলি বলল, “ঠিক আছে, আমি ফোন করে, জানাচ্ছি”। 

১৩ই জুলাই, রবিবার, ২০২৬

সকাল সাড়ে আটটা নাগাদ সর্বজিৎ তিৎলিদের বাড়ি এসে হাজির। অহীন সদর দরজা খুলেই বলল, “এস এস সরুদা, তোমার জন্যেই আমরা ওয়েট করছিলাম। মুখহাত ধুয়ে টেবিলে বসে পড়। তোমার অনারে আজ মা লুচি ভাজছে, আর বৌদি আলু ছেঁচকি বানাচ্ছে”।

সরুদা মুখহাত ধুয়ে রান্নাঘরের দরজায় একবার উঁকি দিয়ে বলল, “মাসিমা, অহীনের সঙ্গে আমি টেবিলে বসে পড়েছি, খুব খিদে পেয়েছে”।

তিৎলির শ্বাশুড়ি বললেন, “এক্‌খুনি তোমার বোন নিয়ে যাচ্ছে, বাবা সরু। তোমার মেসোমশাইকে ডেকে টেবিলে বসে পড়”।

গতকাল তিৎলির সঙ্গে ফোনে কথা বলার সময়, ওদের দাদুর সমস্যার কথা সর্বজিৎ কিছুটা শুনেছিল, আজ ব্রেকফাস্ট সারতে সারতে পুরোটাই শুনে ফেলল।

তারপর নবীনবাবু চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন, “আমার কিন্তু পুরো ব্যাপারটাই এখনও একটা গুজব বলে মনে হচ্ছে, সর্বজিৎ। নাওয়া নেই খাওয়া নেই টয়লেট যাওয়া নেই – একজন মানুষের পক্ষে এতবছর বেঁচে থাকা সম্ভব? বাবার এখন প্রায় নব্বই চলছে, দেখেছ তো উনি এই বয়েসেও কেমন ঋজু আর শক্ত-সমর্থ। বাল্যকাল থেকেই তিনি স্বদেশী করা ছোটকাকে ভীষণ শ্রদ্ধা করেন। সত্যি বলতে, আমার বাবার চোখে তিনিই তাঁর আসল হিরো! তাঁর সেই সেন্টিমেন্টে আঘাত করার সাহস আমার নেই। অতএব আমাদের ছোট-প্রপিতামহ আদৌ ওই পাতালঘরে রয়েছেন কিনা। আর থাকলেও তিনি জীবিত কিনা সেটা প্রথমে নিশ্চিত হওয়া দরকার। বৌমা বলল, তুমি নাকি প্রফুল্লনগরে অনেক কাণ্ড করেছ! তার মধ্যে অনেকগুলিই নাকি প্রায় অলৌকিক! এখন দেখ, তুমি যদি এ ব্যাপারে আমাদের কোন সাহায্য করতে পারো। আমরা সব্বাই বড্ডো দুশ্চিন্তায় রয়েছি, বাবা”।

সর্বজিৎ বলল, “আপনি চিন্তা করবেন না, মেসোমশাই। আমি তো একলা নই – আমার সঙ্গে বেশ বড়োসড়ো একটা দল আছে – তাদের সঙ্গে নিয়ে আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করব”।

নবীনবাবু বললেন, “ও, তা তোমার দলের ছেলেপিলেরা আসবে কখন?”

সর্বজিৎ হাসি মুখে বলল, “তারা এসে গেছে, মেসোমশাই। আমাদের আশেপাশেই আছে, এবং আমাদের সব কথাই তারা শুনছে”।

নবীনবাবু আঁতকে উঠলেন, “বলো কি? কই আমি তো কাউকে দেখতে পাচ্ছি না...তার মানে বৌমার কাছে যা শুনেছি, সে সব সত্যি?”

সর্বজিৎ বলল, “হ্যাঁ মেসোমশাই, আপনারা তাদের দেখতে পাবেন না, তারা অশরীরী”।

নবীনবাবু আতঙ্কিত স্বরে বললেন, “ও বাবা, কী ভয়ংকর ব্যাপার! তুমি তাদের সঙ্গে মেলামেশা-ওঠাবসা করো?”

সর্বজিৎ তাঁকে আশ্বস্ত করার জন্য বলল, “কিচ্ছু ভয় নেই, মেসোমশাই। আমার বোনেরা, আমার মাসিমা-মেসোমশাই – সবার সঙ্গেই ওদের বন্ধুত্ব”।

“আচ্ছা, বাবা, ত্‌-তাহলে দেখ ত্‌-তুমি কি ক্‌-করতে পারো? আ-আমি এখন ঘ্‌-ঘরে যাই কেমন?” নবীনবাবু সর্বজিতের কথায় তেমন আশ্বস্ত হলেন বলে মনে হল না, তিনি তাড়াহুড়ো করে চেয়ার ছেড়ে দ্রুত বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে।

মেসোমশাই ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে, সর্বজিৎ অহীনের দিকে তাকাল, অহীনের মুখেও বেশ ভয় পাওয়া ভাব। অহীন খুব চাপা স্বরে বলল, “তোমার ওই ভূতগুলো সত্যি সত্যিই এই ঘরের আশেপাশে আছে, সরুদা?”

সর্বজিৎ একটু গম্ভীর গলায় বলল, “ওরা ভূত নয় অহীন, ওরা অশরীরী। ভূত বলতেই আমরা যা শুনে এসেছি ছোটবেলা থেকে – মুলোর মত দাঁত, কুলোর মতন কান, আগুনের গোলার মত চোখ, ওসব এদের কিছুই নেই। এরা মানুষের ঘাড় মটকে রক্তও খায় না। এরা অশরীরী। তুমি যদি মন থেকে ভয়টা মুছে নিতে পার, আমাদের মতো তুমিও ওদের দেখতে পাবে। ওদের কথা শুনতে পাবে, সেকথা খোনা বা নাকি সুরের কথা নয়”।

তাতেও অহীনের ভয় ভাঙল না দেখে সর্বজিৎ অহীনের পিঠে হালকা চাপড় মেরে হাসল, বলল, “ভয় ব্যাপারটা হল মাকড়সার জালের মত – মনের কোণে বাসা বাঁধতে চায় – সেটাকে মাঝে মাঝে সাফ না করলে, সে জালের ফাঁদে মনটা বাঁধা পড়ে যায়। তোমাদের ছাদের ঘরটা বেশ নিরিবিলি। ওখানে তোমার সঙ্গে ওদের পরিচয় করিয়ে দেব, আর কাজের কথাও শুরু করতে হবে। চলো”।

দুজনে বারান্দায় আসতেই, তিৎলি সরুদাকে বলল, “সরুদা, রুকু-সুকুকে বলছি দুপুরে আমাদের এখানে খেয়ে নিতে, কথা শুনছেই না। তুমি একটু ধমকে দাও না?”

অহীন আশ্চর্য হয়ে দেখল, সরুদা বাঁদিকে বোনের মুখের দিকে তাকিয়ে কথা শুনল, তারপর উল্টো দিকে মুখ ফিরিয়ে বলল, “ওদের আজ চাপাচাপি করিস না, তিৎলিসোনা। আজ তো ওরা দুজন নয় – অনেকে আছে। কি রে তাইতো?”

“ঠিক বলেছ, সরুদা”। সর্বজিৎ কার সঙ্গে কথা বলল, কারাই বা সে কথার উত্তর দিল? যদিও ওদের কথাগুলো একটু অস্পষ্ট – যেন অনেক দূর থেকে কেউ উত্তর দিল।

সরুদা তিৎলিকে বলল, “রুকু-সুকুকে ডেকে অন্য একদিন খাওয়াস – আজ নয়”।

তিৎলি রাগ রাগ গলায় বলল, “কতবার বলেছি, আমাদের বাড়ি একবারটি চ’ – কোনদিন আসেনি। তুমি ডেকেছ তাই এসেছে...”।

সরুদা তিৎলির গালে হাত রেখে আদর করে বলল, “পাগলি, ওরা কী আমাদের মতো সাধারণ ছেলেপুলে? ওরা অশরীরী।  হুট করে তোদের বাড়িতে নেমন্তন্ন খেতে এলে, বাড়ির সকলেই ভয় পেয়ে যেত যে – এটা বুঝিস না কেন? এবার সবার সঙ্গে পরিচয় হবে...আশা করি তোদের বাড়ির সবাই এবার ভরসা পাবেন। যাকগে, অহীন চলো – রুকুসুকু তোরাও সবাই ছাদের ঘরে চল – কাজে নামতে হবে। বেশি সময় নেই”।

অহীন বলল, “চলো”। অহীনের পিছনে সর্বজিৎ সিঁড়ি দিয়ে উঠতে লাগল। এখন অহীনের মনে ভয় ভয় ব্যাপারটা অনেকটাই কমেছে।

চলবে... 


বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/৯

 এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১


  আগের পর্ব - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/৮ "


  তৃতীয় স্কন্ধ - পর্ব ৯


মহামুনি কর্দম ও দেবহূতির পরিণয় (আগের পর্বের পর)

মহারাজ মহামুনি কর্দমের প্রশংসাবাক্য শুনে খুবই লজ্জিত হয়ে, বিনীত ভাবে বললেন, “বেদময় ব্রহ্মা নিজের মুখ থেকে তপস্যা, বিদ্যা ও নিরাসক্ত যোগনিরত আপনাদের মতো ব্রাহ্মণের সৃষ্টি করেছেন। ব্রাহ্মণদের পরিপালনের জন্যে তিনি তাঁর বাহু থেকে আমাদের মতো ক্ষত্রিয়ের সৃষ্টি করেছেন। অর্থাৎ ব্রাহ্মণজাতি ভগবান ব্রহ্মার হৃদয় স্বরূপ এবং ক্ষত্রিয় তাঁর অঙ্গ স্বরূপ বলা যায়। এই ভাবেই ব্রাহ্মণেরা তাঁদের তপোবলে ক্ষত্রিয়কে এবং ক্ষত্রিয়রা বাহুবলে ব্রাহ্মণকে রক্ষা করে থাকে। বাস্তবে, যিনি সকলের আত্মা হয়েও নির্বিকার, সেই পরমেশ্বরই আমাদের উভয়কে রক্ষা করেন, পালনও করেন। হে মহর্ষি, আপনাকে দেখেই আমার মনের সমস্ত সংশয় দূর হয়ে গেছে। আপনার মধুর কথা শুনে, আপনার পায়ের ধুলিকণা মাথায় নিয়ে আমি নিজেকে কৃতার্থ মনে করছি। আপনি কৃপাসিন্ধু, আপনার কাছে আমার একটি নিবেদন আমি রাখতে চাই। 

আমার একটি বিবাহযোগ্যা কন্যা আছে। এই কন্যা বয়সে, স্বভাবে ও গুণে অত্যন্ত সুশীলা। দেবর্ষি নারদের মুখে আপনার চরিত্র, বিদ্যা, রূপ, বয়েস ও গুণের কথা শুনে অব্দি, আমার এই কন্যা মনে মনে আপনাকেই পতিরূপে বরণ করার সংকল্প করে নিয়েছে। হে দ্বিজবর, আপনি আমার এই কন্যারত্নটিকে গ্রহণ করুন। আমি শুনেছি, আপনিও ব্রহ্মচর্য সমাপ্তির পর গার্হস্থ্য আশ্রম অবলম্বনের কথা চিন্তা করছেন এবং এই কারণে বিবাহের জন্যেও প্রস্তুত হচ্ছেন। অতএব, আমার এই কন্যাকেই আপনি ভার্যারূপে স্বীকার করুন”

মহামুনি কর্দম বললেন, “আমি বিবাহে ইচ্ছুক এবং আপনার কন্যাও অবিবাহিতা, অতএব আমাদের উভয়ের মধ্যে সমুচিত বিবাহ সংস্কারের অনুষ্ঠান হোক। হে মহারাজ, আপনার আত্মজার মনের ইচ্ছে বেদমন্ত্রের উচ্চারণে পূর্ণ হয়ে উঠুক। আপনার কন্যার নিজের কান্তির আভায়, তাঁর অঙ্গের অলঙ্কারসমূহকে নিষ্প্রভ মনে হচ্ছে। একবার আপনার কন্যা প্রাসাদের উপরে খেলা করছিলেন, তাঁর পায়ের নূপুর চরণের শোভা বিস্তার করে, ধ্বনিতে মুখর হয়েছিল এবং ক্রীড়াগোলকের প্রতি লক্ষ্য থাকায় তার চোখ বিহ্বল হয়েছিল। সেই সময় বিশ্বাবসু আকাশপথে যাবার সময় আপনার কন্যার রূপে মুগ্ধ হয়ে নিজের বিমান থেকে পড়ে গিয়েছিলেন। হে মহারাজ, আপনার এই কন্যা ললনাদের শিরোমণি। আপনার দুহিতার রূপ লাবণ্য তাঁর অঙ্গের অলংকারের ঔজ্জ্বল্যকে ম্লান করে দিয়েছে। আমি আপনার কন্যাকে পত্নীরূপে গ্রহণ করবো, কিন্তু আপনার কন্যা যেদিন আমার ঔরসে গর্ভধারণ করবেন, সেই দিন থেকেই আমি সন্ন্যাসধর্ম অবলম্বন করবো। কারণ সন্তান থেকে ঋষিঋণ, দেবঋণ ও পিতৃঋণ; এই তিন ঋণ থেকে মুক্তি পাওয়া যায় এবং এই ঋণমুক্তির পর সন্ন্যাস ধর্ম পালন করাই কর্তব্য। এই নির্দেশ আমাকে দিয়ে গেছেন ভগবান শ্রীঅনন্ত, অতএব তাঁর বাক্যের অন্যথা আমার পক্ষে সম্ভব নয়”।      এরপর, মহারাজ নিজের পত্নী ও দুহিতার মনের ইচ্ছা অনুসারে আনন্দিত চিত্তে মহর্ষি কর্দমকে নিজের কন্যা দেবহূতিকে সম্প্রদান করলেন। মহারাজ্ঞী শতরূপা নবদম্পতিকে প্রচুর যৌতুক, বসন, ভূষণ অন্যান্য গৃহের উপকরণ প্রদান করলেন। সম্রাট মনু মনোমতো পাত্রে কন্যাকে সম্প্রদান করে নিশ্চিন্ত হলেন ঠিকই, কিন্তু কন্যার প্রতি গভীর স্নেহবশে, কন্যার বিরহ চিন্তা করে তাঁর মন চঞ্চল হয়ে উঠলতিনি বারবার কন্যাকে বুকে জড়িয়ে ধরে চোখের জলে তার কেশরাশি সিক্ত করে তুললেন। অবশেষে মুনিবরের থেকে ফেরার অনুমতি নিয়ে, পত্নী শতরূপার সঙ্গে মহারাজ রথে চড়লেন, সঙ্গে রইল তাঁর অনুচরেরাও। 

[দশ হাজার বছর ধরে তপস্যা করা অর্থাৎ ১০,০০০+ বয়স্ক এক মহামুনি পাত্রের সঙ্গে দ্বাদশী বা ত্রয়োদশী রাজকুমারী পাত্রীর শুভ পরিণয় সম্পন্ন হল। এই না হলে আমাদের পুরাণ কথা! কিন্তু পণ্ডিতেরা বলবেন এটি একটি রূপক কাহিনী, এর মধ্যে নিহিত গূঢ় তত্ত্বটি বোঝার সাধ্য আমাদের মতো অর্বাচীনের থাকার কথা নয়, এবং নেইও।]

দেবহূতি ও কর্দমের দাম্পত্য

মহর্ষি মৈত্রেয় বললেন, “হে বিদুর, বাবা ও মা বিদায় নেবার পর সাধ্বী দেবহূতি ভবানী যেমন প্রভু ভবের সেবা করেন, সেইভাবে স্বামীর সেবা করতে লাগলেন। সম্মান, সেবা, মধুর আলাপ ও ভক্তি দিয়ে স্বামীকে সর্বদাই সন্তুষ্ট রাখতেন আর নিজের মন থেকে তিনি ত্যাগ করলেন, কাম, ক্রোধ, লোভ, ছলনা, বিদ্বেষ এবং অহঙ্কার। এই ভাবে, সর্বদা স্বামীর সন্তুষ্টির জন্যে তিনি কঠোর ব্রতচারণ করতে করতে, তপস্বিনীর মতো কৃশ ও  দুর্বল হয়ে পড়লেন। দেবর্ষি কর্দম মনুকন্যার এই কঠোর ব্রতচারণ দেখে খুবই ব্যথিত হয়ে, প্রেমময় বাক্যে বললেন, “হে মনুপুত্রি, তুমি ধন্য। যে শরীর, দেহীদের কাছে খুবই প্রিয়, তুমি সেই শরীরকে অবহেলা করে আমার প্রতি পরম ভক্তি ও ভালোবাসায় সেবা করে চলেছ। আমার যোগ শক্তিতে ভগবানের প্রসাদ স্বরূপ, অনেক দিব্যভোগ আমি লাভ করেছি। সেই সব ভোগ্যবিষয় আমি তোমাকে দান করব, তুমি ভোগ করো। কারণ তুমি পাতিব্রত্য ধর্ম পালন করে সিদ্ধিলাভ করেছ”।         

দেবহূতি পতির এই কথায় নিশ্চিন্ত হলেন, তিনি সলজ্জ নয়নে, সহাস্য মুখে বিনীত ও প্রেমমধুর স্বরে বললেন,  “হে দ্বিজবর স্বামী। আমাদের বিয়ের আগে আপনি বলেছিলেন আমার গর্ভসঞ্চারের আগে পর্যন্ত আমার সঙ্গে আপনার অঙ্গসঙ্গ হবে। তাই হোক, কারণ পতিসঙ্গে সন্তানের সৃষ্টি, স্ত্রীদের মহৎ গুণ হিসেবে বিবেচিত হয়। হে নাথ, কামশাস্ত্র মতে আমার এই দুর্বল দেহকে রতিসমর্থ করার জন্যে যে ওষুধ, খাদ্য ও পানীয়ের কথা বলা আছে, অঙ্গসঙ্গের জন্য সেই সমস্ত উপকরণের ব্যবস্থা করুন। হে প্রভু, মন্মথ আপনার কাছে বিফল হয়ে বারবার আমাকেই উত্যক্ত করছেন। অতএব, আমাদের মিলনের জন্য একটি ভবনও নির্মাণ করুন"।

মহর্ষি কর্দম প্রিয়ার ইচ্ছা পূরণের জন্য, সেই ক্ষণেই যোগশক্তিতে একটি কামচারী বিমানের ব্যবস্থা করলেন, ঐ বিমান, বিশ্বের সমস্ত কাম্য বস্তু দান করতে পারে। ওই বিমান দিব্য রত্নখচিত এবং মণিময় স্তম্ভে শোভিত। ঐ বিমানে নানা রঙের সুগন্ধী ফুলের মালা আছে। নানান রকম উৎকৃষ্ট কার্পাস বস্ত্র ও পট্টবস্ত্র সাজানো আছে। সেই বিমানে অনেকগুলি ঘর আলাদা করে রচিত হয়েছে। প্রত্যেক ঘরেই নরম শয্যার পালঙ্ক, ব্যজনের ব্যবস্থা, বসবার আসন ও স্থানে স্থানে নানান শিল্প দ্রব্যে সাজানো।  এতসব দেখেও দেবহূতির চিত্ত প্রসন্ন হল না, কারণ ওই গৃহে কোন পরিচারিকা নেই এবং নিজের অঙ্গে মলিনতা নিয়ে ঐ ঘরে তিনি প্রবেশ করতে চাইছিলেন না। দেবর্ষি কর্দম প্রিয়ার মনের ইচ্ছা বুঝতে পেরে বললেন, “হে সুশীলে, তুমি এই বিন্দুসর সরোবরে স্নান করো, কারণ এই সরোবরের সৃষ্টি হয়েছে শ্রীবিষ্ণুর আনন্দ অশ্রুপাতে, এই তীর্থে স্নান করলে মনের ইচ্ছা পূর্ণ হয়।“ স্বামীর নির্দেশ মতো দেবহূতি সরোবরে অবগাহনের জন্য নামলেন, একবার অবগাহনের পর তিনি দেখলেন শত শত কিশোরী পরিচারিকা তাঁর চারিদিকে অপেক্ষারতা। তাদের সকলের গায়ে পদ্মগন্ধ। সেই ললনারা তাঁকে দেখেই জোড়হাতে বলল, আমরা আপনার দাসী, আমাদের এখন কি করতে হবে, আপনি নির্দেশ করুন”তারপর সেই পরিচারিকারা তাঁকে বহুমূল্য তেল দিয়ে স্নান করাল, উৎকৃষ্ট পাটের বস্ত্র পরিয়ে দিল, উৎকৃষ্ট প্রসাধনে ও অলংকারে তাঁকে সাজিয়ে তুলল। তারপর তাঁর প্রিয় নানাবিধ সুস্বাদু অন্ন ও অমৃতের মতো স্বাদু মদিরা দিল পানের জন্য।

দেবর্ষি কর্দমের মনে প্রিয়তমা সুসজ্জিতা পত্নীকে দেখে প্রেমভাব সঞ্চারিত হল। তিনি দেবহূতিকে সঙ্গে নিয়ে সেই দিব্য বিমানে আরোহণ করলেন। সেই বিমানে করে তাঁরা প্রসন্ন চিত্তে বৈশম্ভক, সুরসন, নন্দন, পুষ্পভদ্রক ও চৈত্ররথ্য নামক দেব কাননে ও মানসরোবরে ভ্রমণ করলেন। এইভাবে তিনি ভূমণ্ডলের সমস্ত দ্বীপ ও দর্শনীয় সকল স্থান পত্নী দেবহূতিকে দেখালেন। তারপর ফিরে এলেন নিজের আশ্রমে। আশ্রমে ফিরে বিমানের অতি সুখকর শয্যায় পত্নীর সঙ্গে রমণে নিরত হলেন। মহর্ষি কর্দম আত্মজ্ঞ ছিলেন, অতএব পত্নী দেবহূতি তাঁর প্রতি অত্যন্ত অনুরক্ত হলেও, পত্নীর প্রতি তাঁর আসক্তি সংযত ছিল। তিনি নিজের রূপকে নয় ভাগে বিভক্ত করে, পত্নীর গর্ভে নয়প্রকার বীর্যাধান করলেন এবং ভগবান শ্রীহরির নির্দেশ মতোই দেবহূতি নয়টি সুলক্ষণা কন্যা প্রসব করলেন। সেই নয় কন্যার গায়ে যেন রক্তকমলের সৌরভ।

[মহামুনি কর্দম তাঁর প্রিয়া ভার্যাকে নিয়ে নানান দেব কানন এবং মানস সরোবরে গেলেন মধুচন্দ্রিমা সারতে। কে বলে সায়েবরা আমাদের হনিমুন করতে শিখিয়েছে?]  

সন্তানের জন্মের পরেই মহর্ষি কর্দম সন্ন্যাস আশ্রমে যাবার কথা বলেছিলেন, সে কথা মনে পড়তে দেবহূতি ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। তিনি মাথা নীচু করে পায়ের নখ দিয়ে মাটিতে আঁচড় কাটতে কাটতে বললেন, “হে স্বামী, আপনি যা যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সবই আপনি সম্পূর্ণ করেছেন। কিন্তু আমি যেহেতু আপনার শরণাগত, আমাকে অভয় দেওয়াও আপনার কর্তব্য”দুই নয়নে অশ্রু, কিন্তু মুখে ম্লান হাসি নিয়ে বললেন, “হে ব্রহ্মন, আপনি প্রব্রজ্যা নিয়ে বনে গেলে, আমাদের নয় কন্যাকেই স্বয়ং পতি সন্ধান করতে হবে এবং আমাকেও সঠিক পথ নির্দেশ করার মতো কেউ থাকবে না। অতএব আপনি যদি আরও কিছুদিন আমার সঙ্গে বাস করেন, আমার একটি ব্রহ্মজ্ঞ পুত্র লাভ হতে পারে। হে প্রভু, আপনার প্রতি অনুরাগে আমার সুদীর্ঘ সময় বৃথাই কেটে গেল। আপনার মতো ব্রহ্মবিদের সঙ্গে এতদিন বাস করেও, আমি আপনার সেই ভাব এতটুকুও নিতে পারিনি”।                  

দেবহূতির এই ব্যাকুলতায়  দেবর্ষি কর্দমের মনে দয়ার সঞ্চার করল। উপরন্তু, শ্রীহরির প্রতিশ্রুতির কথাও তাঁর মনে পড়ল, তিনি বললেন, হে রাজকন্যা, তোমার চরিত্র অত্যন্ত নির্মল। নিজেকে ভাগ্যহীনা চিন্তা করে দুঃখ করো না। তুমি আগে থেকেই ব্রত পালন করছো, এখন ইন্দ্রিয়ের সংযম, ধর্মাচরণ, তপস্যা, দান ও ভক্তির সঙ্গে ভগবান শ্রীহরির আরাধনা করো। তোমার আরাধনায় ভগবান শ্রীহরি সন্তুষ্ট হয়ে তাঁর অংশ কলায়, তোমার পুত্ররূপে জন্ম গ্রহণ করবেন। তিনি ব্রহ্মজ্ঞ হয়ে জগতে বিখ্যাত হবেন এবং আমিও তাঁর পিতা রূপে পৃথিবীতে প্রচুর সম্মান পাবো।

দেবহূতি স্বামী কর্দমের নির্দেশ অনুযায়ী পূর্ণ বিশ্বাসে ভগবানের আরাধনা করতে লাগলেন। এইভাবে অনেকদিন ভজনার পর, শ্রীহরি তাঁর ক্রোড়ে আবির্ভূত হলেন। আগুন যেমন কাঠের মধ্যেই নিহিত থাকে এবং কাঠের মধ্যেই প্রকাশ পায়। তেমনই সাধ্বী দেবহূতির আত্মায় ভগবান অবস্থান করছিলেন, এখন পুত্র রূপে প্রকাশিত হলেন। তাঁর আবির্ভাবের সংবাদে ব্রহ্মা ও মরীচি প্রমুখ ঋষিরা সরস্বতী নদীর তীরে মহর্ষি কর্দমের আশ্রমে গেলেন। ব্রহ্মা ঋষি কর্দমকে বললেন, “বৎস কর্দম, তুমি আমাদের নির্দেশ অকপট মনে পালন করে, আমাদের সবচেয়ে বড়ো পুজো ও সম্মান করেছ। তোমার এই সুন্দরী কন্যাদের চরিত্র ও রুচি অনুসারে মরীচি প্রমুখ ঋষিদের হাতে সম্প্রদান করো। ভুবনে তোমার খ্যাতি ও তোমার বংশের প্রভূত বিস্তার হবে। হে মনুদুহিতা দেবহূতি, তোমার এই পুত্রের দুই চোখ পদ্মের পাপড়ির মতো এবং চরণযুগলের আকার পদ্মের মতো। তোমার এই পুত্র সাক্ষাৎ ভগবান। ইনি শাস্ত্রপাঠের পরোক্ষজ্ঞান ও উপলব্ধির অনুভব থেকে পাওয়া প্রত্যক্ষজ্ঞানের উপদেশ দিয়ে জীবের কর্মবাসনার নিবৃত্তি করতে এসেছেন। ইনি জগতের সমস্ত সিদ্ধ তত্ত্বজ্ঞানের আধার ও সাংখ্য তত্ত্বের স্বরূপ প্রকাশ করবেন। ইনি কপিল নামে জগতে তোমার কীর্তি প্রতিষ্ঠা করবেন। ইনি তোমার অন্তরের অবিদ্যা অর্থাৎ স্বরূপতত্ত্ববিষয়ে অজ্ঞান দূর করে দেবেন”

[আমাদের সনাতনী ধর্মের প্রথম ও মূল সাংখ্য দর্শনের প্রবক্তা কপিলমুনি - শ্রীবিষ্ণুর অংশ-অবতার। সেই কারণেই পিতা কর্দমমুনি পুত্রকে 'আপনি' সম্বোধন করেছেন, আর পিতাকে পুত্র কপিল 'তুমি' বলেছেন।  ]  

ব্রহ্মা এই কথা বলে, হংসযানে সত্যলোকে চলে যাওয়ার পর, ঋষি কর্দম ঋষিদের হাতে যথা নিয়মে, তাঁর নয় কন্যাকে সম্প্রদান করলেন। তিনি মরীচিকে কলা, অত্রিকে অনসূয়া, অঙ্গিরাকে শ্রদ্ধা, পুলস্ত্যকে হবির্ভূ, পুলহকে গতি, ক্রতুকে সতী, ভৃগুকে খ্যাতি, বশিষ্ঠকে অরুন্ধতী এবং অথর্বা ঋষিকে শান্তি নাম্নী কন্যা সম্প্রদান করলেন। তাঁর এই কাজে তাঁর কন্যারা ও জামাতা ঋষিরা সন্তুষ্ট হলেন এবং দেবর্ষি কর্দমের অনুমতি নিয়ে ঋষিরা সস্ত্রীক নিজের নিজের আশ্রমে চলে গেলেন। 

এরপর ঋষি কর্দম, তাঁর পুত্ররূপী ভগবান বিষ্ণুর কাছে একান্তে গিয়ে বললেন, “ভগবান, আপনি নিজের মুখেই আমার পুত্র হয়ে জন্মানোর কথা বলেছিলেন। এখন আমার মতো এক অতি সাধারণ মানুষের ঘরে জন্ম নিয়ে, আপনি যে ভক্তকে কৃপা করে তার মান বৃদ্ধি করলেন, এতে সন্দেহ নেই। আপনি প্রকৃতপক্ষে নিরাকার, কিন্তু আপনার যে অলৌকিক চতুর্ভুজ রূপ, সেই রূপই আপনার যোগ্য রূপ।  আপনি প্রকৃতির আবির্ভাব ও লয়ের সাক্ষীস্বরূপ; অতএব আপনিই সর্বজ্ঞ কপিলদেব, আমি আপনাকে প্রণাম করে, আপনার শরণে আশ্রয় নিলাম। হে প্রজাপালক, আপনি আমার পুত্ররূপে আবির্ভূত হয়ে, সকল ঋণ থেকেই আমাকে মুক্ত করেছেনএখন আপনাকে সর্বদা মনের মধ্যে রেখে, আমি সন্ন্যাসী আশ্রমের পথ অবলম্বন করতে চাই, আপনার কাছে এই আমার প্রার্থনা”

শ্রীভগবান বললেন, “হে মহর্ষি, বৈদিক কিংবা লৌকিক সকল কার্যে, জ্ঞানীরা আমার বাক্যকেই প্রমাণ বলে মনে করেনসেই কারণে, আমি আগে যা বলেছিলাম, তা সত্য প্রমাণের জন্যই আমি তোমার পুত্ররূপে জন্ম নিয়েছি। এই জগতে যাঁরা আত্মদর্শন করে, লিঙ্গশরীর থেকে মুক্তি লাভের কথা চিন্তা করেন, তাঁদের প্রকৃতি-পুরুষ প্রভৃতি পরমতত্ত্বের নির্দেশ করার জন্যেই আমার এই জন্ম। অনেকদিন আগে ভুলে যাওয়া এই সূক্ষ্ম আত্মতত্ত্বকে আবার জগতে সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্যেই আমি জন্ম নিয়েছি। আমি তোমাকে তোমার ইচ্ছামতো নির্দেশ দিচ্ছি, তুমি সন্ন্যাস আশ্রমের মার্গে যাও। তোমার সমস্ত কর্ম তুমি আমাতে সমর্পণ করে আমার ভজনা করলেই তুমি অমৃতময় পরমানন্দ লাভ করতে পারবে। সর্বভূতের অন্তরের মধ্যে আমিই স্বপ্রকাশ পরমাত্মা। নিজের আত্মায় আমাকে প্রত্যক্ষ উপলব্ধি করে তুমি মোক্ষপদ লাভ করো। আমি মাতা দেবহূতিকেও এই অধ্যাত্মবিদ্যা দান করব, যে জ্ঞানে তিনিও মৃত্যুভয়কে জয় করে, পরমানন্দ লাভ করতে পারবেন”

শ্রীভগবানের নির্দেশ পাওয়ার পর প্রজাপতি কর্দম তাঁকে প্রদক্ষিণ করে আশ্রম ছেড়ে বনে চলে গেলেন। সেখানে অহিংসা ব্রত নিয়ে যজ্ঞহীন ও গৃহহীন অবস্থায়, একমাত্র পরমাত্মার শরণাপন্ন হয়ে বাস করতে লাগলেনযিনি সৎ ও অসতের ঊর্ধে, সকল কারণ ও কার্যের যিনি অতীত; যিনি সত্ত্ব, তম ও রজো এই তিন গুণ বিহীন নির্গুণ, সেই পরমব্রহ্মতত্ত্ব তিনি প্রত্যক্ষ উপলব্ধি করলেন। তাঁর সমস্ত অহং দূর হয়ে গেল। তাঁর চিত্ত থেকে সুখ-দুঃখ, শোক-আনন্দ, শীত-গ্রীষ্ম ইত্যাদি সমস্ত দ্বন্দ্বের অবসান হল। অবশেষে তিনি অজ্ঞানের সমস্ত বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে, পরম ভক্তভাবে ভগবান শ্রীবাসুদেবে লীন হয়ে গেলেন।

চলবে... 



মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩৭

 প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

 তৃতীয় ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ "

পঞ্চম ধারাবাহিকের শুরু - " স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "; "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "




[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩৬ "


৪২ 

দিনের প্রথম প্রহরটা এখন মিলাদের মহড়ার মাঠেই নিয়মিত থাকে ভল্লা। প্রথম-প্রথম তার মনে হয়েছিল ছেলেগুলোর আসল উদ্দেশ্য দ্রুত অর্থ উপার্জন করা – সে ডাকাতি করেই হোক বা সার্থবাহদের গো-শকটবাহিনীর ওপর আচমকা আক্রমণ করেই হোক।  কিন্তু জনা এবং মিলাদের সঙ্গে এই কদিনের ঘনিষ্ঠতায় ভল্লার সে ভুল ভেঙেছে। দুনীতিগ্রস্ত রাজকর্মচারী এবং আঞ্চলিক প্রশাসকদের দমন করা এবং প্রয়োজনে নিকেশ করাই যে জনাদের মুখ্য উদ্দেশ্য সেটা এখন বুঝেছে ভল্লা।

ওদের জন্যে মাত্র ছটা রণপাই দিতে পেরেছে ভল্লা। ভল্ল দিয়েছে কুড়িটা আর বল্লম চারটে। উপকরণের স্বল্পতা সত্ত্বেও ছেলেদের শেখার উৎসাহে ঘাটতি নেই এবং বটতলির দল দ্রুত উন্নতি করছে। ভল্লার ধারণা সকলের জন্যে পর্যাপ্ত অস্ত্র এসে গেলে – বটতলির দলও, মাসান্তে, নোনাপুরের ছেলেদের মতোই দক্ষ হয়ে উঠবে।

ছেলেদের কিছু কিছু মহড়া দেখিয়ে দিয়ে ভল্লা মাঠের একধারে বসল। ডেকে নিল মিলা আর জনাকে। বলল, “আমাদের অস্ত্রসম্ভার গত রাত্রেই বীজপুর পৌঁছে গেছে। দু-তিনদিনের মধ্যে আমাদের অস্ত্র ভাণ্ডারে পৌঁছে যাবে। আমাদের কাছে দুটো হাতে-টানা শকট আছে, তোরা ওগুলো নিতে পারিস – অস্ত্র-শস্ত্র বয়ে আনতে সুবিধে হবে। কাজ হয়ে গেলে ফেরত দিয়ে দিবি”।

“বাঃ, সে তো ভালোই হবে। কিন্তু তোমাদের অস্ত্রভাণ্ডার মানে? কোথায় বানিয়েছ? এত তাড়াতাড়ি বানালে কী করে?”

ভল্লা বলল, “নোনাপুরের মহড়ার মাঠটা তোরা চিনিস তো? ওখান থেকে ক্রোশ দুয়েক দূরে – সোজা দক্ষিণে। জঙ্গলের ভেতর। চিনতে অসুবিধে হবে না। আমাদের লোকজন থাকবে – ভাণ্ডারে অস্ত্র ঢুকুক। সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে”।

জনা বলল, “অস্ত্রগুলো হাতে পেলে, রামালিদের মতো আমরাও দিন-রাত এক করে মহড়া দেব ভল্লাদাদা। তারপর প্রথম আঘাতটা হানব গ্রামপ্রধানের বাড়িতে”।

“গ্রামপ্রধানের বাড়ি? তোদের বটতলি গ্রামের?”

“তাকে তুমি নোনাপুরের গ্রামপ্রধানমশাইয়ের মতো ভাবছো, ভল্লাদাদা? হুঁঃ - সে হচ্ছে শকুন – গ্রামের লোকেদের রক্ত চুষে খায়। তার বাড়ি-ঘর, বিলাসিতা, আর উৎসবের জমক দেখলে মনে হবে – ছোটখাটো রাজাই বোধ হয়। এরকম বহু আছে আশেপাশের সব গ্রামেই”।

“কী করবি?”

মিলার চোখ যেন ঝলসে উঠল, বলল, “ভিখিরি করে দেব – ওর গোলার শস্য বিলিয়ে দেব গ্রামের গরীব মানুষগুলোকে। পেতল-কাঁসার বাসন-পত্র, কাপড়-চোপড় – যা পাবো সব বিলিয়ে দেব। আর টাকাকড়ি গয়না-গাঁটি যা পাবো – কিছুটা রাখব – কিছুটা গ্রামের কাজে লাগাবো। ওই প্রধানের বাড়িতেই একটা পুকুর আছে, ভল্লাদাদা, সেখানে গ্রামের কাউকে নামতে দেয় না। সেটাকে আরও বড়ো করে কাটাবো, কাছাকাছি লোকেরা ওই পুকুরের জল ব্যবহার করুক না – টুকটাক সেচের কাজে কিংবা নিত্য প্রয়োজনে…”।

ভল্লা একটু চিন্তা করে বলল, “সামনের অমাবস্যায় আমাদের একটা পরিকল্পনা আছে। হাতে খুব বেশি সময় নেই – এ কটাদিন আমি আর রামালি একটু ব্যস্ত থাকব। ওটা হয়ে গেলে, আমি তোদের সঙ্গেই বেশি থাকব। শুধু দক্ষতা দিয়ে লড়াই জেতা যায় না, মিলা – তার জন্যে আগে থেকে পরিকল্পনা করতে হয়। সেটাও তোদের শিখতে হবে”।

“পরিকল্পনা মানে”।

ভল্লা একটু হেসে বলল, “এখনই পুরোটা বলব না – শুরুটা বলছি। তোদের ওই প্রধানের বাড়িতে দিনে-রাতে দুটো চালাক-চতুর ছেলে লাগিয়ে রাখ – পারলে, কোন কাজের ছুতোয় বাড়িতে ঢুকিয়ে দে। তারা সব কিছু জেনে নিক। কোন ঘরে কে থাকে? কোন ঘরে টাকা-কড়ি গয়না-গাঁটি রাখা থাকে? সিন্দুকের চাবি কার কাছে থাকে?  রাত্রে কজন পাহারা দেয় – তাদের ভাবগতিক কেমন? এরকম আর কি – এই সন্ধানগুলো আগে থেকে জানলে – খুব কমসময়ে কাজটা মনোমত ভাবে সেরে ফেলা যায়। নিজেদের বিপদও কমানো যায়”।

জনা আর মিলা অবাক হয়ে ভল্লার কথা শুনছিল, বলল, “বাস্‌ রে, ঠিক তো…, বুঝতে পারছি একটু একটু…”।

ভল্লা উঠে দাঁড়াল, বলল, “এখন এটুকুই কর - বাকি পরে বলব। এখন চলি রে। ওঃ মনে আছে তো, কাল সকালে কুলিকপ্রধান তার লোকজন নিয়ে আসবে তোদের ঘর বানানোর কাজ শুরু করতে। এলেই আমি বা রামালি নিয়ে আসব এখানে…”।

ভল্লা রণপায়ে চড়ে দৌড়ে চলল নোনাপুরের মহড়া-মাঠের দিকে।  

মহড়া-মাঠে পোঁছে ভল্লা একধারে বসল। দেখল ছেলেরা তির ছোঁড়া অভ্যেস করছে। ভল্লাকে দেখেই আহোক আর বিশুন দৌড়ে এল, বলল, “ভল্লাদাদা, শুনেছো? সেদিন থেকে শল্কুর তো কোন সন্ধান পাওয়াই গেল না, তার ওপর আজ ভোর থেকে কমলিমাকেও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না”।

“শল্কুর মামাবাড়িতে যারা গিয়েছিল, তারা ফিরে এসেছে?”

“হ্যাঁ ভল্লাদাদা, শল্কুর দুই দাদা গিয়েছিল। ওখানে শল্কু যায়নি”।

“যাচ্চলে – গেল কোথায় ছেলেটা? আশ্চর্য ব্যাপার! সন্ন্যাসী হয়ে কোথাও চলে যায়নি তো, নেড়ামুণ্ডিদের সংঘে? আমাদের ওদিকের ছেলেপুলেরা খুব যায়”।

“কিন্তু কমলিমায়ের কী হল?”

ভল্লা হাসল, বলল, “কমলিমায়ের আবার কী হবে? কিছুই হয়নি। গতকাল মাঝরাত্রে কমলিমাকে আমি আর রামালি গিয়ে তুলে এনেছি। আমার বাসাতেই আছে…আমাদের জন্যে দুপুরের রান্না করছে”।

“তোমরা? কমলিমাকে তুলে এনেছ?”

“হ্যাঁ – কেন? কিছু অন্যায় করে ফেললাম নাকি? কালকে দেখতে গিয়েছিলাম – দেখেই বুঝলাম কমলিমায়ের বাঁচার কোন ইচ্ছে নেই। চান নেই, খাওয়া নেই, ঘুম নেই…কী দশা হয়েছে আমার কমলিমায়ের! বললাম, আমার সঙ্গে চল - কিছুতেই আসবে না। তারপর জোর করে ধরে এনেছি। বাসায় ফিরে রামালি রান্না করল। ওই রাত্রেই কমলিমা পুকুরে গেল চান করতে – কতদিন পরে নাইল কে জানে? ফিরে এসে রামালির রান্না খেয়ে কেঁদেকেটে একসা। আজ ভোরে বেরোনোর সময় দেখি – বেড়ার দরজায় – জলছড়া দিচ্ছে। বুঝলাম কমলিমা আবার “কমলিমা” হয়ে উঠছে”।

“ইস্‌, এত কাণ্ড করেছো – কিন্তু রামালি কিছু বলল না কেন?”

“রামালিকে চিনিস না? সাত চড়ে রা কাড়ে? হতভাগার কথা বলতে, গায়ে যেন জ্বর আসে। কিন্তু শল্কুটা গেল কোন চুলোয়? ছেলেটা ভাবিয়ে তুলল তো…”। কথা বলতে বলতেও ভল্লা ছেলেদের দিকে লক্ষ্য রাখছিল – তির ছোঁড়াটা ওরা বেশ ভালোই রপ্ত করে ফেলেছে। “বাঃ তির ছোঁড়াটাও ভালোই শিখছিস”।

বিশুন বলল, “তোমার ওই বল্লম বা ভল্ল ছোঁড়ার থেকে তির ছোঁড়া অনেক সহজ। তুমি যে আগেই কেন তির ছোঁড়াটা শেখাওনি…!”

ভল্লা বিশুনের মাথায় হাল্কা চাঁটি মেরে বলল, “তোর মুণ্ডু। তির ছোঁড়াটাই সব থেকে কঠিন – ওটা প্রথমে শুরু করলে – আজও তির ছোঁড়াতেই আটকে থাকতিস। ভল্ল আর বল্লমের অভ্যাস করার জন্যে তোদের হাত আর চোখের তাল-মিলটা তৈরি হয়ে গেছে। সেই জন্যেই সহজ লাগছে তির ছোঁড়াটা। মহড়া তো ভালই হচ্ছে -  এখন সবাইকে ডাক, একটু উপদেশ দিই”।

আহোক আর বিশুন ডাকতে সকলে ওদের কাছে এল, ভল্লা বলল, “সবাই বস, কাল রাত্রে কতক্ষণ মহড়া দিলি?”

আহোক বলল, “প্রায় এক প্রহর”।

“বাঃ। কিন্তু অতক্ষণ এখানে থাকলে বিশ্রাম নিবি কখন? মহড়ার শেষে তোদের বাড়ি ফিরতেও তো দণ্ড দুয়েক লাগে…। রাত্রের মহড়াউদ্দেশ্য হল আলো-ছায়াতে চোখের দৃষ্টিটাকে তীক্ষ্ণ করা। দিনেরবেলায় সূর্যের আলোতে দৃষ্টিবিভ্রম হয় না বললেই চলে। কিন্তু আলো-আঁধারে খুব হয় – বিশেষ করে জ্যোৎস্না রাতে। মাঠের দিকে তাকালে একটু দূরের ঝোপঝাড়গুলোকে মনে হয় কোন জন্তু। এমনও মনে হয় সেগুলো বুঝি চলে ফিরে বেড়াচ্ছে – একটু আগে ওটা কি এত কাছে ছিল? একটু দূরে ছিল না? ঝোপঝাড়কে জন্তু ভাবলে কোন ক্ষতি নেই – কিন্তু একটা লোক একটু অন্ধকারে ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে – তোর চোখে পড়ল – কিন্তু তুই ভাবলি - ধুর গাছের ছায়াটাকে মানুষ মনে হচ্ছে। সেটা কিন্তু মারাত্মক হতে পারে। অন্ধকারে তীক্ষ্ণ নজরের অভ্যাস সেই বিভ্রমটা কাটিয়ে দেয়। রাত্রের দিকে যখনই ঘরের বাইরে বেরোবি – একটু দূরের অন্ধকারের যে কোন বস্তুকে সঠিক চিনতে চেষ্টা করবি। তাহলেই দেখবি অন্ধকারেও চোখ চলবে…। বোঝা গেল?”

একটু থেমে ভল্লা সবার মুখের দিকে তাকিয়ে আবার বলল, “এতদিন আমিই লক্ষ্যভেদ বলতে মানুষের হৃৎপিণ্ডের কথা বলেছি তোদের – তোরাও সেভাবেই অভ্যাস করেছিস। আজ বলছি – লক্ষ্যটা প্রয়োজনে বদলাতেও পারে। অনেক সময় রাজরক্ষীরা গায়ে লোহার কবচ পড়ে – তার বুকে ভল্ল ছুঁড়লে ঠিকরে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে আমাদের লক্ষ্য বদলাতে হবে। একটা লোককে মারতে আর কোথায় কোথায় চরম আঘাত হানা যায়? মাথায়, চোখে, কানে, গলায় এবং পিছন থেকে হলে ঘাড়ে। মাথাতেও অনেকসময় রক্ষীরা কবচ পরে – তার নাম শিরস্ত্রাণ। সেক্ষেত্রে বাকি রইল চোখ, কান, গলা অথবা ঘাড়। বল্লমের অথবা তিরের বা ভল্লর ফলা এই মোক্ষম জায়গাগুলিতে গেঁথে দিতে পারলেই – শত্রুর শেষ। বল্লমটা লাগে সামনাসামনি লড়াইয়ের সময়। একটা বল্লম আমাকে দে – দেখাই। এই দ্যাখ বল্লমের ফলাটা যখন ঢোকে – খুব সহজেই ঢুকে যায় – কিন্তু বের করার সময় –ফলার এই কানদুটো – আশেপাশের মাংসপেশী এবং ধমনী বা শিরাকে ছিঁড়ে নিয়ে বের হয় – সেটা আরও বেশি মারাত্মক। কাজেই বল্লমে কাউকে গাঁথলে অবশ্যই গায়ের জোরে টানবি। ভল্ল বা তির অনেকটাই দূর থেকে ছোঁড়া হয় বলে, সহজে টেনে নেওয়ার উপায় নেই – শত্রু মরেছে নিশ্চিত হলেই কাছে গিয়ে টেনে তোলার প্রশ্ন আসবে”।

সুরুল বলল, “শত্রু নিশ্চিত মরেছে কিনা জানার কোন উপায় আছে, ভল্লাদাদা?”

“ভালো প্রশ্ন করেছিস, সুরুল। সহজ কোন উপায় নেই। তোর আঘাতে শত্রু ধর মাটিতে পড়ে ছটফট করছে – অথবা টলতে টলতে দৌড়ে পালাচ্ছে। সেক্ষেত্রে সন্তর্পণে এগিয়ে যাবি এবং শেষ আঘাতে শত্রুকে শেষ করবি। কিন্তু খুব সাবধান – তুই হয়তো একজনের দিকে লক্ষ্য রেখে এগোচ্ছিস – কিন্তু তোর আশেপাশে বা পিছনে অন্য শত্রু হয়তো এগিয়ে আসছে – সেক্ষেত্রে আহত শত্রুকে তখনকার মতো ছেড়ে দে – অন্য শত্রুর দিকে মন  দে। এখানে আরও বলি – আস্থানের ছবিটা তোদের নিশ্চয়ই মনে আছে – সে ঘরগুলোর কিছু ঘরে ছাদ আছে, কিছু ঘরে টালির চাল। সেক্ষেত্রে তোর শত্রু ওপরেও থাকতে পারে। অতএব একজনকে লক্ষ্য রাখছিস বলে – অন্যদিকে চোখ রাখবি না – এমন যেন কখনোই না হয়। যে যতবেশী সতর্ক – সে ততবেশি নিরাপদ”।

সকলকে কিছুটা সময় দিয়ে ভল্লা আবার বলল, “কিছু কিছু অভিজ্ঞ যোদ্ধাদের আবার আশ্চর্য মানসিক নিয়ন্ত্রণ থাকে – তারা মরণ আঘাতের যন্ত্রণা সহ্য করেও মাটিতে মরার মতো নিশ্চল শুয়ে থাকতে পারে। কাজেই তোর আঘাতের পরেই কেউ মাটিতে পড়ে স্থির হয়ে গেল দেখে – চট করে তার কাছে যাবি না – সে হয়তো অপেক্ষাতে আছে – মরার আগে তোকে একটা শেষ আঘাত হানার জন্যে। আবারও বলি - যে যতবেশী সতর্ক – সে ততবেশি নিরাপদ। মনে রাখিস - নিজের জীবনের থেকে মূল্যবান, জগতে আর কিচ্ছু হতে পারে না”।

সকলেই চুপ করে রইল ভল্লার মুখের দিকে তাকিয়ে। ভল্লা হাসল, বলল, “কী হল? সবাই ভয়ে ভেবলে গেলি নাকি? প্রথম দিন থেকেই তোদের বলেছিলাম, ভালো যোদ্ধা হতে হলে দরকার শক্তি, দক্ষতা এবং মস্তিষ্ক। মনে আছে? তোরা দক্ষ হচ্ছিস, তোদের শক্তি বাড়ছে – সেই সঙ্গে বাড়িয়ে তোল মস্তিষ্কের দক্ষতাও! তবে না লড়াইয়ের মজা”।

একটু সময় দিয়ে প্রসঙ্গ বদলাতে ভল্লা বলে উঠল, “হ্যারে রামালি, তোদের সেই কবিরাজ ছেলেটি, বড়্‌বলাকে বার্তা পাঠিয়েছিস?”

“না গো ওদের খাবার আনতে গ্রাম থেকে যারা আসবে, তাদের বলে দেব - সন্ধ্যে বেলায় তোমার বাসায় যেন দেখা করে”।

“ঠিক আছে”। তারপর সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে ভল্লা মজা পাওয়া মুখে বলল, “কিন্তু ছেলেটি আমাদের বাসায় গিয়ে চমকে উঠবে, বল? কমলিমা বেরিয়ে এসে যখন বলবেন – কেমন আছিস, বাবা?”

তিনজন ছাড়া সকলেই একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল, “তোমার বাসায় কমলিমা?”

“কেমন দিলাম বল? রামালি তো সবটাই জানে – আহোক আর বিশুনকে একটু আগেই সব বলেছি – ওদের থেকে শুনে নিস। কিন্তু শল্কুটার কী হল বল তো? বিশুন বলছিল ও নাকি মামাবাড়িতেও যায়নি”।

সুরুল বলল, “সত্যি কিনা জানি না। আমাদের গ্রামের এক রাখাল বলছিল, ওই দিন একজন লোককে নাকি সে – আমাদের গ্রামের পিছনদিকের মাঠ পেরিয়ে দক্ষিণদিকে যেতে দেখেছিল। মোটামুটি প্রথম প্রহরের শেষ কিংবা দ্বিতীয় প্রহরের শুরুতে। রাখালটা নাকি জিজ্ঞাসাও করেছিল – কোথা থেকে আসা হচ্ছে কত্তা – যাবেই বা কোথায়? তাতে লোকটা নাকি কোন সাড়া না দিয়ে – মুখটা গামছায় ঢেকে দৌড়তে শুরু করেছিল। রাখাল ছেলেটি লোকটার চেহারার যা বর্ণনা দিল, সে শল্কু হলেও হতে পারে। আমাদের গ্রাম ছেড়ে দক্ষিণে আস্থান ছাড়া ও আর কোথায় যাবে, ভল্লাদাদা? ওদিকে কাছাকাছি বলতে, পাঁচ-ক্রোশের আগে আর তো কোন গ্রাম নেই!”

“একা একা আস্থানে গিয়েছিল? কী বলছিস? এতটা সাহস ওর হবে? আমার মনে হয় না, সুরুল। ও অন্য কেউ হবে…। কিন্তু… যদি শল্কুই হয়, আর যদি সত্যিই ও আস্থানে গিয়ে থাকে…তাহলে এতদিনেও ফিরল না কেন? ওকে কি বন্দী করে রেখে দিয়েছে? শল্কু যদি গিয়ে থাকে – কী করতে গিয়েছিল? আমরা কী করছি না করছি - সব কথা জানাতে গিয়েছিল? তাহলে তো সে এখন রাজসাক্ষী। তার মানে, ও কি এখন আস্থানেই আছে?  কিন্তু আস্থানের রক্ষীরা এই কদিনে এদিকে এল না কেন? যে কোনদিন এলেই তো রক্ষীরা আমাদের সকলকে এই মহড়া মাঠে পেয়ে যেত – আস্থান থেকে লুঠ করে আনা সমস্ত অস্ত্রশস্ত্র সহ…। উঁহু। আমার মনে হচ্ছে শল্কু আস্থানে যায়নি। অন্য কোথাও গিয়েছে”।

ছেলেরা ভল্লার যুক্তিতে কোন ফাঁক খুঁজে পেল না। চুপ করে সবাই ভাবতে লাগল। ভল্লা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “এখন চলি রে। খেয়ে এসে আমাদের পরিকল্পনাটা আরেকবার ঝালিয়ে নেব। শল্কুর কথা চিন্তা করে লাভ নেই – ও নিজে না ফিরলে আমাদের আর কী করার আছে? রামালি চল। কমলিমা আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছেন…”।

পরের পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩৮ "


সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৫/১৪

  ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "

ধর্মাধর্ম শেষ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৫/১ "

 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  

[এর আগের পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৫/১৩ "]

৫.৪.১.৪ দ্বারকাধীশ কৃষ্ণ

দ্বারকা ও রাজস্থানে কৃষ্ণ “রণছোড়জী” নামেই প্রসিদ্ধ। এই নামটি সম্ভবতঃ মধ্যযুগ থেকে প্রচলিত হয়েছিল। যেমন আমাদের পূর্বভারতে, কৃষ্ণ নামটি কাহ্ন, কানু, কানাই নামেও জনপ্রিয় হয়েছে মধ্যযুগের বৈষ্ণব পদকর্তাদের প্রভাবে।

অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ “রণছোড়” শব্দটির অর্থ – যিনি যুদ্ধ ছেড়ে এসেছেন। মথুরায় কংসবধের পর, রাজা কংসের শ্বশুর পরাক্রান্ত চেদিরাজ জরাসন্ধ, কৃষ্ণ-নিধনের জন্যে বারবার (পৌরাণিক মতে আঠারোবার) মথুরা আক্রমণ করেছিলেন। সে যুদ্ধে কোন পক্ষই জয়ী হতে পারেননি, কিন্তু প্রতিটি যুদ্ধেই দুই পক্ষের বহু নিরীহ সৈন্য নিহত/ আহত এবং অজস্র সম্পদ হানি হত। এই অকারণ রক্তপাত এবং শক্তি ও সম্পদ-ক্ষয় এড়াতে কৃষ্ণ যুদ্ধ ছেড়ে সুদূর দ্বারকায় সরে গিয়েছিলেন। নিঃসন্দেহে এ তাঁর অসাধারণ দূরদর্শীতা, ধৈর্য ও বিচক্ষণতার পরিচয়। কারণ পরবর্তীকালে তিনি মধ্যম পাণ্ডব ভীমের সঙ্গে একক যুদ্ধে প্ররোচিত করে জরাসন্ধকে নিহত করিয়ে শত্রুমুক্ত হয়েছিলেন, সেখানে কোন নিরীহের রক্তপাত হয়নি। প্রতিকূল সময়ে যুদ্ধ ছেড়ে আসা যে আসলে অনুকূল সময়ে যুদ্ধজয়ের প্রস্তুতি, সে কথাটাই শ্রীকৃষ্ণের “রণছোড়জি” নামের মহিমা।                

দ্বারকাধীশ কৃষ্ণের দশজন প্রধানা পত্নীর নাম শোনা যায় - রুক্মিণী, সত্যভামা, জাম্ববতী, নাগ্নজিতী, কালিন্দী, মাদ্রী, মিত্রবৃন্দা, ভদ্রা। প্রাগজ্যোতিষপুরের ভৌমাসুর বহু রাজাকে পরাস্ত করে ষোল হাজার রাজকন্যাকে বন্দী করে রেখেছিলেন। প্রাগজ্যোতিষপুরের নরকাসুরকে বধ করে, কৃষ্ণ ভৌমাসুরের অন্তঃপুরে যান এবং বন্দিনী রাজকন্যাদের মুক্ত করার আদেশ দিলে, ষোল হাজার রাজকন্যা তাঁকেই পতিরূপে বরণ করেছিলেন। কৃষ্ণও সানন্দে তাঁদের গ্রহণ করে, দ্বারকায় পাঠিয়েছিলেন, এবং প্রত্যেক পত্নীর জন্যে সুন্দর গৃহ নির্মাণ করিয়েছিলেন। প্রধানা দশ মহিষীর প্রত্যেকের গর্ভে ভগবান কৃষ্ণের দশটি করে পুত্রের জন্ম হয়েছিল, তাঁদের মধ্যে বিখ্যাত ছিলেন, প্রদ্যুম্ন, চারুদেষ্ণ, ভানু, শাম্ব, সুমিত্র, পুরুজিৎ, বীর, সুবাহু, প্রঘোষ, বৃক, হর্ষ, সংগ্রামজিৎ, বৃহৎসেন প্রমুখ। শোনা যায় তাঁর মোট পুত্রসংখ্যা নাকি সহস্রাধিক।

ব্রজবাসী কৃষ্ণের আরও একটি বহুল জনপ্রিয় প্রেমের উপাখ্যানের উল্লেখ মহাভারত বা শ্রীমদ্ভাগবতে পাওয়া যায় না। সেটি হল পরবর্তী কালের বহুল জনপ্রিয় রাধা-কৃষ্ণ উপাখ্যান। মহাভারতের পরিপূরক গ্রন্থ “খিলহরিবংশ”-এ – কৃষ্ণের রাসলীলার বর্ণনায় কৃষ্ণের মুখে দুটি মাত্র নামের উদ্দেশে বিরহ ভাবের উল্লেখ পাওয়া যায়, “হা রাধে! হা চন্দ্রমুখি!” (খিল হরিবংশ, অধ্যায় ৭৬), কিন্তু তাঁদের সম্পর্কে আর কোন বিবরণ বা তথ্য পাওয়া যায় না। অথচ পরবর্তী কালের কবিকুল, বিশেষত বঙ্গের কবিকুল এই যুগলকে নিয়ে অজস্র ভাবের ও আবেগের গান ও পদাবলী রচনা করেছেন। কৃষ্ণভক্ত যুগাবতার শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর (১৪৮৬-১৫৩৩ সি.ই) আবির্ভাবের পর, বঙ্গদেশে রাধা-কৃষ্ণই অন্যতম প্রধান উপাস্য হয়ে উঠেছিলেন।  

৫.৪.২ ভক্তিযোগের ঐক্য

জ্ঞানযোগ, কর্মযোগের পর যে ভক্তিযোগের কথা আগে বলেছিলাম, গুপ্তযুগের সমসাময়িক কালে সেই ভক্তিযোগ সম্পূর্ণ রূপ নিয়ে বিকশিত হয়ে উঠেছিল এবং প্রধানতঃ এই ভক্তি আন্দোলনের বিপুল জনপ্রিয়তাই সমগ্র ভারতবর্ষে পূর্ণতঃ হিন্দুধর্মকে প্রতিষ্ঠা করল। হিন্দু ধর্ম এই সময়ে শুধু যে রাজন্য বর্গের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করল তাই নয়, দেশের সাধারণ জন সমাজ, আর্য এবং অনার্য উভয়েই, হিন্দু ধর্মের প্লাবনে একই সূত্রে বাঁধা হয়ে গেল। আর্য-অনার্যের প্রধান বিভেদটা দূর হয়ে গেল, অর্থাৎ আর্যরা ভারতবর্ষের প্রতিটি প্রান্তের অনার্যদের সঙ্গে মিশে যেতে পারল। কিন্তু এই সময় থেকেই জন্মগত বর্ণভেদ অনেকটা নমনীয় হলেও অর্থনৈতিক বর্ণভেদটা আরও প্রকট হয়ে উঠতে লাগল। অর্থাৎ তখন থেকে প্রভাবশালী ও বিত্তশালী বৈশ্য এবং শূদ্ররাও সমাজে সম্মানীয় হয়ে উঠল, কিন্তু সমাজের প্রান্তিক ও দরিদ্র বৈশ্য এবং শূদ্ররা হয়ে উঠল অন্ত্যজ, অস্পৃশ্য বা অচ্ছ্যুৎ। চার বর্ণের থেকেও ভয়ংকর হয়ে উঠল “জাতি” এবং “বর্গ” – সে কথা পরে আলোচনা করা যাবে।

ভাগবত ধর্মে অনার্য এবং ব্রাহ্মণ্য ধর্মের সমন্বয় বিধান করেছেন, স্বয়ং কৃষ্ণ - শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতার বিভূতি যোগে এবং শ্রীমদ্ভাগবতের একাদশ স্কন্ধের ষোড়শ অধ্যায়ে। প্রথম ক্ষেত্রে তিনি প্রিয়সখা অর্জুনকে বলেছিলেন, দ্বিতীয় ক্ষেত্রে আরও সবিস্তারে বলেছেন ভাগবত উদ্ধবকে। তিনি বলছেন, “উদ্ধব, আমি সর্বভূতের সুহৃদ, আত্মা, ঈশ্বর; আমিই সর্বভূতস্বরূপ এবং আমিই সর্বভূতের সৃষ্টি, স্থিতি ও সংহার-হেতু”। তিনি আরো বলছেন,

১. সকল দেবতাদের মধ্যে তিনিই হিরণ্যগর্ভ (ব্রহ্ম), বিষ্ণু, শিব, ইন্দ্র, অগ্নি, বরুণ। অতএব সকল দেবভক্তদের মধ্যে তিনিই পরম উপাস্য, তাঁর উপাসনা করলে সকলেরই উপাসনা হয়ে যায়।

২. সকল তত্ত্বের মধ্যে তিনিই মহৎ-তত্ত্ব, তিনিই ওঁকার, তিনিই অ-কার, তিনিই গায়ত্রী ছন্দ। অতএব তিনিই সকল তত্ত্বের আধার।

৩. সকল ঋষিদের মধ্যে তিনিই মহর্ষি ভৃগু, রাজর্ষি মনু, দেবর্ষি নারদ, সিদ্ধেশ্বর কপিল, মুনিদের মধ্যে নারায়ণ, ব্রহ্মচারীদের মধ্যে সনৎকুমার।

৪. সকল প্রাণী - গবাদি পশুর মধ্যে তিনিই কামধেনু, পাখিদের মধ্যে গরুড়, উচ্চৈঃশ্রবা অশ্ব, ঐরাবত হাতি, বাসুকি সাপ, অনন্ত নাগ, তৃণভোজীদের মধ্যে কৃষ্ণসার হরিণ এবং মাংসাশীদের মধ্যে সিংহ। জলচর প্রাণীদের দেবতা তিনিই বরুণ। এই প্রাণীদের মধ্যে অনেকগুলিই অনার্য মানবগোষ্ঠীদের দেব-আত্মা হিসেবে পূজিত হতেন, যেমন গরুড়, হাতি, সাপ, নাগ, সিংহ ইত্যাদি - তাঁরা সকলেই এখন হয়ে গেলেন কৃষ্ণের স্বরূপ। মাত্র কয়েকবছর আগে সংবাদে এসেছিল রাজস্থানের কিছু জনগোষ্ঠী “কৃষ্ণসার” হরিণকে দেবতা বলে মান্য করেন।

৫. উপদেবতাদের মধ্যে তিনিই অর্যমা (পিতৃদেব), দক্ষ (প্রজাপতি)।

৬. বিভিন্ন মানব গোষ্ঠী – তিনিই দৈত্য ও অসুরদের প্রহ্লাদ, যক্ষ ও রাক্ষসদের কুবের। অর্থাৎ এতদিন রাক্ষস, দৈত্য, দানবদের সম্বন্ধে আর্যদের যে উদ্ভট বৈরীভাব ছিল, সেটাও দূর হয়ে গেল। তিনিই গন্ধর্ব ও অপ্সরাদের মধ্যে বিশ্বাবসু ও পূর্বচিত্তি, (বানরগোষ্ঠীর) হনুমান।

৭. পণ্ডিত ব্যক্তি -  তিনিই ধীর ব্যক্তিদের মধ্যে অসিত, (ইনিই বুদ্ধদেবের জন্মের পর রাজা শুদ্ধোদনের সঙ্গে দেখা করেছিলেন), দ্বৈপায়ন বেদব্যাস, দেবগুরু বৃহষ্পতি ও দৈত্যগুরু শুক্রাচার্য। স্ত্রীগণের মধ্যে শতরূপা, পুরুষদের মধ্যে স্বায়ম্ভূব মনু। পুরোহিতদের মধ্যে বশিষ্ঠ।

৮. গুণ ও দোষ – তিনিই ক্ষমাশীলদের ক্ষমা, সত্ত্বশীলদের সত্ত্ব, বীরদের জিগীষা, বণিকদের সম্পদ-আহরণ। তিনিই ধূর্তদের ছল, পাশাখেলার চাতুরি।

৯. বীরত্ব ও যুদ্ধ – তিনিই বীর শ্রেষ্ঠ অর্জুন, দেবসেনাপতি কার্তিকেয়।

১০. প্রকৃতি – তিনিই নদীর মধ্যে গঙ্গা, জলাশয়ের মধ্যে সমুদ্র, দুর্গম পর্বতের মধ্যে হিমালয়, বৃক্ষের মধ্যে অশ্বত্থ, শস্যের মধ্যে যব। গঙ্গানদী, হিমালয় পর্বত এবং অশ্বত্থে দেবত্ব আরোপ বহু প্রাচীন প্রচলিত বিশ্বাস। প্রধান ফসল উৎপাদনে নবান্ন উৎসব কৃষিজীবনের শুরুর থেকে ওতপ্রোত জড়িত, অঞ্চল ভেদে সে গম, যব বা ধান যাই হোক না কেন।

ভাগবত ধর্ম তথা হিন্দুধর্ম ভগবান কৃষ্ণের বিভূতি অর্থাৎ তাঁর ঐশ্বর্য দিয়ে জয় করে ফেললেন সমগ্র ভারতের সমাজ। হিন্দু ধর্মের এই প্রবল প্রসারের ফলে ভারতবর্ষের জনসমাজ থেকে বৌদ্ধধর্মের প্রভাবও ধীরে ধীরে ক্ষীণ হতে লাগল। তবে বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাবকে দুর্বল করার আরও একটি কারণ হল, বুদ্ধকে বিষ্ণুর অবতার বানিয়ে তোলা। ব্রাহ্মণ্যধর্ম বিদ্বেষী বা বিরোধী প্রাচীন অনার্য সমাজ, যাঁরা বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি কিছুটা সহানুভূতিশীল ছিলেন, তাঁদের বোঝানো হল, ভগবান বুদ্ধও ভগবান বিষ্ণুর অবতার। অতএব ভগবান বুদ্ধও যখন হিন্দুধর্মেরই একজন দেবতা, তখন না হক বৌদ্ধধর্মে গ্রহণে তাঁরা উৎসাহ হারালেন। তবে বিষ্ণু-অবতারের সাম্মানিক পদটুকু ছাড়া হিন্দুধর্ম থেকে ভগবান বুদ্ধ, কোনদিন আর কিছুই পাননি।   

কিন্তু হিন্দু ধর্ম হঠাৎ এমন জনপ্রিয় হয়ে উঠল কী করে? এর উত্তর একটাই ভক্তিযোগ। হিন্দুধর্মের নতুন শাস্ত্র ও পুরাণে রাজা-রাজড়াদের জন্যে যজ্ঞ অনুষ্ঠানের কথা থাকলেও, সাধারণ মানুষের জন্যে প্রচলন হল সহজ পুজো পার্বণের, আর তার সঙ্গে যাঁরা মুক্তি বা মোক্ষ পথের পথিক, তাঁদের বলা হল, নিঃস্বার্থ অর্থাৎ অহৈতুকী ভক্তি করো। সে ভক্তিরও নানান পথ আছে, যার যেমন পছন্দ, যার যেমন বিশ্বাস। পুরাণে বলা হয়েছে, ভক্তিভাবের পাঁচটি প্রকার আছে, যাদের একত্রে পঞ্চভাব বলে। যেমন,

১. শান্ত ভাব – বিষ্ণুর প্রতি একনিষ্ঠ শ্রদ্ধা ও জ্ঞান - সনক, সনন্দন, সনাতন ও সনৎকুমার, শুকদেব, দেবর্ষি নারদ।

২. দাস্য ভাব – কোন উদ্দেশ্য ছাড়া বিষ্ণুর সেবা করাই দাসের কর্তব্য, যেমন জয়-বিজয়, হনুমান, উদ্ধব।

৩. সখ্য বা ভ্রাতৃত্ব ভাব – নিঃস্বার্থ বন্ধু হিসেবে ভক্তি, যেমন বলরাম, ব্রজের গোপ বালকেরা, অর্জুন, দ্রৌপদী, সুদামা, বিদুর, অক্রুর।

৪. বাৎসল্য ভাব – পিতৃত্ব বা মাতৃত্ব ভাব, মা-বাবা যেমন কোন স্বার্থ ছাড়াই সন্তানের সেবা করেন, যেমন মাতা যশোদা, গোপরাজ নন্দ, বসুদেব, মাতা দেবকী, মাতা কুন্তী, বিদুর।      

৫. মধুর বা প্রেমভাব– প্রেমিকা হিসেবে নিঃস্বার্থ ভালবাসা, যেমন শ্রীরাধিকা, গোপরমণীগণ, কুব্জা, দেবী মীরা, শ্রীচৈতন্যদেব।

এই পাঁচটি ভক্তিভাবের মধ্যে পঞ্চমটি শ্রেষ্ঠ ও সহজতম ভক্তি পথ এবং প্রথমটি জ্ঞানীর তপস্যাজনিত কঠিন পথ।  

এছাড়াও আরেকটি ভাবের কথা শ্রীমদ্ভাগবতে বলা হয়েছে, যদিও সেই ভাব কখনোই সাধারণের আচরণীয় নয়, সেটি হল শত্রুভাব। চরম বিষ্ণু-বিদ্বেষী হয়েও বিষ্ণুকে খুব দ্রুত লাভ করা যায়। যেমন, সত্যযুগে হিরণ্যাক্ষ-হিরণ্যকশিপু, ত্রেতাযুগে রাবণ-কুম্ভকর্ণ এবং দ্বাপরে শিশুপাল-বক্রদন্ত ভয়ংকর বিষ্ণু-বিদ্বেষী ছিলেন। এঁরা সকলেই স্বয়ং বিষ্ণুর অবতারের হাতে নিহত হয়েছিলেন বলে, সকলেই সরাসরি বিষ্ণুতে লীন হয়ে বৈকুণ্ঠলোকে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিলেন। অবিশ্যি এর পিছনে যে পৌরাণিক কাহিনী আছে, সেটি হল,-

বৈকুণ্ঠে বিষ্ণুলোকের দুই বিষ্ণুভক্ত দ্বারপাল ছিলেন জয় ও বিজয়। একবার যোগসিদ্ধ ও পরম বিষ্ণুভক্ত চার কুমার – সনক, সনন্দন, সনাতন ও সনৎকুমার (এঁরা সকলেই শান্তভাবের ভক্ত) বৈকুণ্ঠে গিয়েছিলেন বিষ্ণুর সঙ্গে দেখা করতে। সিদ্ধযোগী অর্থাৎ বালকের মতোই সরল ও নগ্ন ওই চারকুমারকে জয়-বিজয়, বিষ্ণু-নিবাসের দ্বারে প্রবেশের অনুমতি দেননি। তাতে চার কুমার তাঁদের অভিশাপ দিয়েছিলেন, জয়-বিজয়কে মর্ত্যে জন্ম নিতে হবে।

প্রধান দ্বারে গোলমালের সংবাদ শুনে স্বয়ং বিষ্ণু এসে উপস্থিত হলেন। তিনি তাঁর পরমভক্ত চার কুমারকেই সমর্থন করলেন এবং জয়-বিজয়ের মর্ত্যে পতনকে, তিনি যদিও রদ করতে পারতেন, কিন্তু করলেন না। তিনি জয়-বিজয়কে প্রস্তাব দিলেন, তাঁরা যদি মর্ত্যে গিয়ে মিত্রভাবে বিষ্ণুর উপাসনা করেন, তাহলে তাঁদের বৈকুণ্ঠে ফিরে আসার আগে বহুজন্ম মর্ত্যেই কাটাতে হবে। আর যদি শত্রুভাবে বিষ্ণুকে বিদ্বেষ করেন, তাহলে মাত্র তিন জন্মেই তাঁদের উদ্ধার হওয়া সম্ভব। জয়-বিজয় বিষ্ণুর পরমভক্ত ছিলেন, তাঁরা চাইছিলেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বৈকুণ্ঠে ফিরে ভগবান বিষ্ণুর সেবা করতে এবং প্রত্যেকদিন তাঁর দর্শন পেতে। অতএব তাঁরা দ্বিতীয় প্রস্তাবেই রাজি হয়েছিলেন। এই জয়-বিজয়ই তিন যুগে তিন বিষ্ণু-বিদ্বেষী ভাই হয়ে জন্ম নিয়েছিলেন এবং সরাসরি বিষ্ণু অবতারের হাতে নিহত হয়ে বৈকুণ্ঠলোকে ফিরে গিয়েছিলেন।

এই কাহিনীর গূঢ় তত্ত্ব হল, বেদ-ব্রাহ্মণ্য তথা বিষ্ণু-বিরোধী অনার্য বা আর্য রাজাদের হত্যাকে যুক্তিসিদ্ধ করা। আদতে এঁরা যেন সকলেই ছিলেন বিষ্ণুর পরমভক্ত জয়-বিজয়ের শাপগ্রস্ত জাতক, তাঁরা সকলেই বিষ্ণুর বিরোধীতা করেছিলেন, বিষ্ণুর হাতেই নিহত হয়ে দ্রুত বিষ্ণুলোক অর্জনের লক্ষ্যে। অনার্য গোষ্ঠীদের মনে কোথাও কোন বিদ্বেষভাব যদি থেকেও থাকে – এই কাহিনী তাতে সান্ত্বনাময় প্রলেপের কাজ করেছিল, সন্দেহ নেই। কিন্তু বিদ্বেষ-ভক্তির এই পথ অবশ্য পরিত্যাজ্য। কারণ আমাদের মতো সাধারণ মানুষরা কেউই শাপভ্রষ্ট জয়-বিজয়ের জাতক নই। অতএব বিষ্ণুবিরোধী ভক্তিপথে গেলে, বিষ্ণুর অবতারের হাতে নয়, তাঁর ধর্মরক্ষকদের হাতে গণধোলাইতেই নিহত হতে হবে।

পরের পর্ব - " ধর্মাধর্ম - ৫/১৫ "


নতুন পোস্টগুলি

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩৮

প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "  দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব ...