শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

শুধু _তুই .কম - পর্ব ২৩

 প্রথম  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

দ্বিতীয়  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

তৃতীয়  ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১

পঞ্চম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "

সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য ";  "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "



এর আগের পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ২২ "  


২৩

 

সুনুদা,

গতকাল তোমার থেকে দু’দিনের সময় চেয়ে নিয়েছিলাম এবং তোমাকে ধৈর্য ধরতে লিখেছিলাম। তুমি যতখানি অধৈর্য হয়ে উঠেছ আমার না-বলা কথা শোনার জন্যে – আমিও ঠিক ততখানিই উতলা হয়ে উঠছি...কতক্ষণে বা কতদিনে তোমাকে আমার জীবনের সকল কথা বলে উঠতে পারব। তোমার মুখোমুখি বসে এসব কথা কি বলতে পারতাম না? না, পারতাম না। তোমার সামনে বসে, তোমার চোখে চোখ রেখে এসব কথা, আমার সকল কথা এভাবে গুছিয়ে বলার সুযোগ কোনদিনই হত না। মনের মধ্যে জড়ো হয়ে উঠত অজস্র বাধা-বিঘ্নের কড়া প্রহরা – অহমিকা, সঙ্কোচ, “এসব কথা এতদিন পরে, তোমাকে বলে আমার কীই বা লাভ? অথবা এসব কথা না শুনলেই বা তোমার কী এমন ক্ষতি” – এই চিন্তাটাও আমার মনের আগলটুকু জোর করে আগলে থাকত।

সেই সেদিন হলদিয়া ফেরার পথে তোমার সঙ্গে অকস্মাৎ যে দেখা হয়ে গেল, সেই থেকেই হেমন্তর একটা গান আজকাল ঘুরে ফিরে মনে আসে, যখন তখন –

“সব কথা বলা হল, বাকি রয়ে গেল শুধু বলিতে

যে কথা মনের কথা, কতবার থেমে গেছি

বলিতে বলিতে বলিতে বলিতে।

সব পথ শেষ হল, আর বাকি নাই পথ চলিতে

তোমার আঙিনাটুকু পার হতে থেমে গেছি

কতবার চলিতে চলিতে চলিতে”।*

 এমনিতেই একটু তাড়াতাড়ি পৌঁছে গিয়েছি দমদম এয়ারপোর্টে। চেকইন সেরে এসে এখন আবার শুনছি – অন্ততঃ ঘন্টা খানেক ডিলে করতে পারে আমার ফ্লাইটটা। অতএব প্রায় ঘন্টাদুয়েক উটকো সময় যখন হাতে এসেই গেল, মনে হল, তোমার সঙ্গে আরও কিছু কথা বলার এমন সুযোগটা হাতছাড়া করার কোন মানে হয় না।

 

শশাঙ্কর আচমকা প্রস্তাবে যতখানি ভয় পেয়েছিলাম। ধীরে ধীরে বুঝতে পারলাম, অতটা আতঙ্কিত হওয়ার তেমন কোন যুক্তি ছিল না। ঘর-পোড়া গরু শুনেছি রাঙা মেঘ দেখলেও ডরায়। এ কথাটা মাকে প্রায়ই বলতে শুনেছিলাম। আমার অবস্থা তখন সেরকমই। ঘনিষ্ঠ হতে চাওয়া যে কোন পুরুষকেই আমার মনে হত আমার জীবনের পক্ষে পোটেন্সিয়াল থ্রেট। মিঠি মিঠি স্বপ্ন দেখিয়ে তছনছ করে দেবে সদ্য মুক্তির স্বাস পাওয়া আমার এই স্বস্তির জীবনটা।  

আজ বলতে দ্বিধা নেই, সেই সেদিনের পর শশাঙ্ক কোনদিনই আর কোনরকম আভাস ইঙ্গিত দেওয়ার চেষ্টাও করেনি। এবং ওর অফিসে আমার চাকরিটি নির্বিঘ্নেই চলতে লাগল। আমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারে শর্ত ছিল মিনিমাম বারো মাসের প্রভিসনাল পিরিয়ড। বারো মাস পরে ম্যানেজমেন্ট আমার পার্ফম্যান্স রিভিউ করবে – যদি তারা স্যাটিস্ফায়েড হয়, তাহলে নতুন করে পার্মানেন্ট এমপ্লয়মেন্টের অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেওয়া হবে আমাকে। বারো মাস নয় আটমাসের শেষেই আমাকে পার্মানেন্ট করে নেওয়া হল। আমার পে-স্ট্রাকচারটা পালটে গেল এবং টেক হোম অ্যামাউন্টটাও বাড়ল সিগনিফিক্যান্টলি। অর্থাৎ সব মিলিয়ে আমার দারুণ খুশি হওয়ার যথেষ্ট কারণ ছিল। এবং হয়েওছিলাম।

সেদিন অফিস থেকে ফেরার পথে গড়িয়াহাট থেকে, বাবার জন্যে একটা কাশ্মীরী শাল, মায়ের জন্যে ভালো সিল্কের একটা শাড়ি, আর পুত্রের জন্যে ব্যাটারি দেওয়া তিন-কামরার একটা রেলগাড়ি কিনে বাড়ি ফিরলাম। সঙ্গে আরও নিয়েছিলাম এক বাক্স সন্দেশ। ঘরে ফিরে বাবা ও মাকে প্রণাম করলাম। সেদিন আমার অনেক বেশি বেশি আদরও কেড়ে নিল আমার সুধন্বা।  

বাবা খুব খুশী হয়ে আমার মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করে বললেন, “এই কাজটা তোকে গভীর এক সংকট থেকে উদ্ধার করেছে মা, নিশ্চিন্ত করেছে আমাদের সকলকে। ভুলেও কোনদিন অবহেলা করিস না কাজটাকে”। মা বাবার সামনে খুব খুশি খুশি ভাব দেখালেও, আড়ালে বললেন, “এ সবই তোকে ফাঁদে ফেলার টোপ, সুকু। এই সব করে তোর মন ভোলাচ্ছে”। আমার কাছে শশাঙ্কর সেইদিনের সেই প্রস্তাব রাখার কথাটা মাকে বলেছিলাম। বাবাকে বলিনি, তবে মা বাবাকে বলেছিলেন কিনা জানা ছিল না। মায়ের ওই মন্তব্যে সেদিন জানি না কেন মনে অন্যরকম একটা প্রতিক্রিয়া হল। সে প্রতিক্রিয়াটা প্রতিকূল নয়, বরং শশাঙ্কর পক্ষে খানিকটা অনুকূলই বলা যায়।

শশাঙ্ক যথেষ্ট সুপুরুষ। শিক্ষিত, ভদ্র, মার্জিত এবং রুচিবান। আমাদের তুলনায় সে অনেকটাই অর্থবান ও সমাজে প্রতিপত্তিশালীও বটে। তার পরিচিতি মহলে প্রেমে পড়ার তো বটেই এমনকি ঘনিষ্ঠ হওয়ার মতো উদ্গ্রীব রমণীকুলের অভাব নিশ্চয়ই নেই। বিপরীতে আমি কোনদিক থেকেই এমন কিছু লোভনীয় নারী নই। আবার এতদিনের পরিচয়ে তার আচরণে এমন কোন ইঙ্গিতও পাইনি, যে সে খুব ধান্দাবাজ। আমার অসহায়তার সুযোগে সে আমাকে নানান উপকারের টোপ ফেলে তার দিকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। মায়ের মন্তব্যের প্রেক্ষাপটে আমি খুব মন দিয়ে তার নানা দিনে নানান উপলক্ষে, শুধু আমার প্রতিই নয় – অফিসের অন্যান্য সহকর্মীদের সঙ্গেও তার আচরণের চুলচেরা বিশ্লেষণ করলাম বেশ কয়েকদিন। মনে হল, না শশাঙ্ককে, আর যাই হোক, ধান্দাবাজ লেডি-কিলার টাইপ ভাবার কোন কারণ এখনও পর্যন্ত কিছু ঘটেনি।

এর ফলে শশাঙ্কর প্রতি আমার মনে যে একটা ত্রস্ত ও শঙ্কিত বীতরাগ জমা হয়েছিল, সেটা দূর হতে লাগল। তা বলে ভেবে নিও না, শশাঙ্কের প্রতি আমার মনে অনুরাগের সঞ্চার শুরু হল। একেবারেই না। যেটা হল সেটা সখ্যতার অনুভব। মন থেকে বিদ্বেষ-বিষ যত কমতে লাগল, ততই বাড়তে লাগল নির্ভরতা, শুভানুধ্যায়ীর প্রতি কৃতজ্ঞতা।

সে যাই হোক এভাবেই কেটে গেল বেশ কয়েকটা বছর। ধীরে ধীরে আমি অফিসে হয়ে উঠলাম অপরিহার্য, আত্মবিশ্বাসী এবং দায়িত্ববতী একজন সহকর্মী। অর্থাৎ অফিসে আমার কাজের দায়িত্ব একদিকে বাড়তে লাগল, অন্যদিকে বাড়তে লাগল আমার পুত্রকে বড়ো করে তোলার দায়িত্বও। এতদিন সে তার দিদিমা আর দাদুর আদর ও যত্নের গণ্ডিতে বড়ো হচ্ছিল, এবারে তার সময় হল বাইরের জগতে পা ফেলার। আমাদের পাড়ারই একটি প্রেপ স্কুলে ওকে ভর্তি করাতে গেলাম। আমার সঙ্গে ছিলেন আমার বাবা। ওখানকার হাসি-মুখ সপ্রতিভ বয়স্থা হেড-ম্যাডামের সঙ্গে কথা বললাম। তাঁর সামনেই ফর্ম ফিল-আপ করে জমা করলাম।

ফর্মটি পড়ে তিনি বেশ গম্ভীর হয়ে গেলেন। মুখ তুলে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি সিঙ্গল? মানে ডিভোর্সি না আনম্যারেড?” তাঁর কথার উত্তরে যা ফ্যাক্ট তাই বললাম। গম্ভীর মুখে তিনি বললেন, “ম্যাডাম, আপনার বাচ্চার স্কুলের অ্যাডমিশনের ব্যাপারে আমার কোন আপত্তি নেই। এরকম কেস আগেও দু’-তিনটে হ্যাণ্ড্‌ল্‌ করেছি, কিন্তু সমস্যা হয় বাচ্চাদের নিয়ে। ওরা নিজেদের মধ্যে পরিচয়ের সময়, বাবা না থাকাটাকে খুব অবাক করা ব্যাপার মনে করে। এবং যেহেতু ওরা বাবা না থাকাটাকে একটা ব্যতিক্রমী বিষয় মনে করে, সবাই নয়, ওদের মধ্যে কেউ কেউ, অ্যাকচুয়ালি দোজ হু থিংক দে আর ভেরি কানিং, তারা নিজেদের মধ্যে একটা গ্রুপ বানিয়ে ফেলবে। তারা আপনার ছেলেকে সুযোগ পেলেই ট্রোল করবে। আপনার ছেলেকে শুনিয়ে শুনিয়ে ঠাট্টা, হাসাহাসি করবে। আপনার ছেলের পক্ষে সেই মানসিক যন্ত্রণা ভয়ংকর হয়ে উঠবে। আমরা স্কুল থেকে ওই গ্রুপের ছেলে-মেয়েদের বকতে পারি, শাস্তি দিতে পারি, তাতে তাদের গার্ডিয়ানরা আবার বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠবে। আমাকে ভুল বুঝবেন না, আপনাকে আগে থেকেই বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করে রাখলাম”।

বাবা কিছুটা বিরক্তি নিয়ে বললেন, “আজকাল শুনি ব্যক্তি স্বাধীনতার যুগ। আমরা দাবি করি আমাদের সমাজ এখন আগের তুলনায় অনেক প্রগ্রেসিভ। কিন্তু আপনি যা বলছেন, তাতে তো দেখতে পাচ্ছি, আমরা আজও সেই “জন্মেছিস ভর্তৃহীনা জবালার ক্রোড়ে”-র জামানাতেই পড়ে আছি। এ যুগের মোড়কটা বেশ চকচকে, দেখনদারি – কিন্তু ভেতরটা তো কদর্য, ক্লিন্ন”।

হেড-ম্যাম বললেন, “ঠিকই বলেছেন, স্যার। যে সংস্কারগুলো আজ থেকে একশ বছর আগে অত্যন্ত প্রকট ছিল, আজকের সমাজ সংস্কারের নামে আমরা সেই সংস্কারগুলোকে একটু আড়ালে রেখেছি মাত্র। সবকিছুই অটুট আছে। মাতৃপরিচয়হীন বাচ্চার পিতাকে তেমন সমস্যায় পড়তে হয় না। কিন্তু পিতৃপরিচয়হীন বাচ্চার মায়ের চরিত্রটাকেই সমাজ বাঁকা চোখে দেখে”।

আমি বললাম, “ফাদার্স নেমের জায়গায় একটা ফিকটিশাস নাম দিলে কি সমস্যাটা মিটে যেতে পারে?”

হেড-ম্যাম বললেন, “সাময়িকভাবে মিটবে তো বটেই, কিন্তু ইন দা লং রান – ধরুন পেরেন্ট-টিচার্স মিটিংয়ে, বাচ্চার বাবা কোন সময়েই না এলে – কতদিন ঠেকিয়ে রাখবেন, মানুষের অকারণ কৌতূহল? এমনকি আপনার বাচ্চাও বারবার জিজ্ঞেস করবে, বাবা কোথায় মা? কতদিন ঠেকিয়ে রাখবেন, তোমার বাবা অফিসের কাজে বাইরে গেছে। কিংবা বিদেশে থাকে, সেখানে কাজের খুব চাপ...”।

আমি কিছুক্ষণ চিন্তা করে, ম্যাডামের টেবিল থেকে ফর্মটা তুলে নিয়ে বললাম, “ম্যাডাম, একটা ফ্রেশ ফর্ম দিতে পারেন? এই ফর্মটা আমি স্ক্র্যাপ করে দিতে চাই”।

ড্রয়ার থেকে নতুন একটা ফর্ম বের করে আমার সামনে রেখে ম্যাডাম বললেন, “ও শিওর, হিয়ার ইট ইজ”।

  ফর্মটা নিয়ে আগের মতোই নতুন করে ফিল আপ করলাম। শুধু মেরিট্যাল স্ট্যাটাসের জায়গায় “সিঙ্গল”-এর জায়গায় লিখলাম, ম্যারেড। আমার নামের পদবিটা বদলে দিলাম, আর ফাদার্স নেমের জায়গায় আমার সন্তানের পিতার নাম লিখে ফর্মটা ফেরত দিয়ে বললাম, “এবার নিশ্চয় তেমন অসুবিধে হবে না। আশা করি কোন বিতর্কেরও সম্মুখীন হতে হবে না”। বাবা আমার মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকালেন, কিন্তু কিছু বললেন না।

বিস্মিত ম্যাডাম বললেন, “ইনি যে আপনার সন্তানের পিতা নয়, সে তো বুঝতে পারছি। আমার কোন আপত্তি নেই, আপনার পুত্রের অ্যাডমিশনও আমি এখনই করিয়ে দিচ্ছি। কিন্তু ভবিষ্যতে কোন কারণে ভেরিফিকেশনের প্রয়োজন হলে এই ভদ্রলোক আপনার বাচ্চার পিতৃত্ব স্বীকার করবেন তো?”

আমি ম্যাডামের চোখে চোখ রেখে বলেছিলাম, “হাণ্ড্রেড পার্সেন্ট, ম্যাডাম”।

 এখন এইটুকুই থাক, সুনুদা। বোর্ডিং কল শুরু হয়ে গেছে। সময় পেলেই লিখব আবার। ততক্ষণ না হয় একটু ধৈর্য ধরেই থাকলে।  

 তোমার কনি।

* এই গানটির সুরকার ও গীতিকার শ্রীযুক্ত হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, "মণিহার" সিনেমায় শ্রীযুক্ত সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ওষ্ঠে গানটি সমর্পিত হয়েছিল ১৯৬৬ সালে। 

চলবে...    

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নতুন পোস্টগুলি

ধর্মাধর্ম - ৫/১৬

  ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ " ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১   " ধর্মাধর্ম তৃত...