মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩৯

 প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

 তৃতীয় ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ "

পঞ্চম ধারাবাহিকের শুরু - " স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "; "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "




[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩৮ "


৪৪

 

কাজের কথা সেরে বালিয়া আর বড়্‌বলা চলে যেতেই, ভল্লা বলল, “এক ঘটি জল খাওয়াবি, মা? তেষ্টায় ছাতিটা ফেটে যাচ্ছে”। কমলিমা উঠে গেলেন জল আনতে, ভল্লা বলল, “তোর রাতের রান্না কী হয়ে গেছে, মা?”

কমলিমা জলের ঘটি ভল্লার হাতে দিয়ে বললেন, “খাবি তো সেই দুপুররাত্তিরে – বসাব এখন...”

“বলছিলাম, তোর আরেকটি ছেলে এই এল বলে, প্রতি রাত্রেই সে আমাদের সঙ্গে খায়। দুটো-তিনটে রুটি বেশি করিস মা”।

“সে ছেলে দিনে না এসে, রাতে কেন আসে?”

মারুলা বেড়ার কাছে চলে এসেছিল, ভল্লার বাসা থেকে মহিলার কণ্ঠ শুনে অবাক হয়ে থমকে দাঁড়াল।

ভল্লা টের পেয়ে বলল, “সে ছেলে নিশাচর, রে মা। পেঁচা কিংবা বাদুড়ের মতো। দিনের আলোয় চোখে অন্ধকার দেখে...ওই তো এসে গেছে...অনেকদিন বাঁচবি হতভাগা, এই যে মা, এর নাম মারুলা”।

মারুলা উঠোনে এসে দাঁড়াল, কমলিমায়ের পাঁ ছুঁয়ে প্রণাম করে জিজ্ঞাসা করল, “কমলিমা? আমার নামে কী বলছিল মা, মুখপোড়াটা? আমি পেঁচা, বাদুড়?”

কমলিমা হেসে ফেলে বললেন, “তার আমি কী জানি – সে তোমাদের বন্ধুদের ব্যাপার। কিন্তু তুমি আমাকে কী করে চিনতে পারলে, বাবা?”

“তোমাকে না চিনলে কী হবে, তোমার কথা এত শুনেছি এই ভল্লা আর রামালির কাছে – না চিনে যে উপায় নেই মা”।

কমলিমা হেসে বললেন, “তা বেশ বাবা, তোমরা বসে কথা বল, আমি রান্নার জোগাড় দেখি”।

ভল্লা বলল, “তোর সঙ্গেও দুটো কথা আছে মা, একটু বসে যা। আমাদের ছেলেদের একটা দল আছে নিশ্চয়ই শুনেছিস, মা। সেই দলের সবাই যদি নাম পালটে নিজেদের ‘জুজাক’ বলে ডাকে, তুই রেগে যাবি মা?”

কমলিমা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন ভল্লার মুখের দিকে, বললেন, “তার মানে? মরা মানুষটাকে নিয়ে হঠাৎ এ আবার কী পাগলামি?”

“দেখ মা। তোকে খোলাখুলিই বলি। এই অমাবস্যায় আমাদের ছেলেরা আস্থান আক্রমণ করবে – সেখানে ছেলেরা নিজেদের নাম নিয়ে ডাকাডাকি করলে, আস্থানের রক্ষীরা তাদের চিনে নেবে। সেই কারণে সবারই নাম হবে জুজাক। রক্ষীরা বুঝবে এ আক্রমণ কিসের জন্যে – তারা হাড়ে হাড়ে টের পাবে একজন জুজাককে মারলে – তিরিশজন জুজাক তার শোধ নেবে...”

কমলিমার দুই চোখ জলে ভরে উঠল, কান্নার বেগ কিছুটা সামলে ধরা গলায় বললেন, “সত্যিই তোরা শোধ নিবি? রামালি সে রাত্রে বলেছিল বটে – ভেবেছিলাম ছেলেমানুষী আবেগ...”।

“না মা, এ আবেগ নয় – প্রতিজ্ঞা। তুই জানিস না মা – রামালি, সুরুল, আহোক, কিশনা এই ক’মাসে কী দারুণ লড়াই করতে শিখেছে। এই অমাবস্যায় সেই পরীক্ষা। রামালি আর সুরুল ঠিক করেছে – নিজের হাতে উপানুকে হত্যা করবে... উপানুর নাম শুনেছিস মা?”

কমলিমায়ের অশ্রুসিক্ত দুই চোখ যেন ঝলসে উঠল, বললেন, “অনামুখো, বাঁশবুকো মিনসের নাম শুনবো না? রামালিদের হাতে ও যেদিন ঘেয়ো কুকুরের মতো মরবে, সেইদিন শান্তি পাবো আমি এবং আমার প্রধান”।

রামালি উঠে এসে কমলিমায়ের হাঁটুতে হাত রেখে বসে, দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “তুমি নিশ্চিন্ত থাক জেঠিমা – আমি আর সুরুল ওর এমন অবস্থা করব – ওকে চেনা যাবে না...”।

কমলিমা রামালির মাথায় হাত রেখে বললেন, “আমি তোদের সবাইকে আশীর্বাদ করছি বাবা, তোদের প্রতিজ্ঞা নিশ্চিত পালন হবে – তোদের গায়ে একটা আঁচড়ও লাগবে না...”।

একটু সময় নিয়ে ভল্লা খুব নরম করে বলল, “আমাদের দলের আমরা সবাই জুজাক, তাই তো মা?”

কমলিমা মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেন, অস্ফুট অথচ দৃঢ় স্বরে বললেন, “হ্যাঁ জুজাক”।

“আরেকটা কথা আছে মা। আমাকে যেমন সেবা করে বাঁচিয়ে তুলেছিলি, আমার বা আমাদের ছেলেদের যদি তেমন সেবা দরকার হয়, করবি মা?”

কমলিমা উৎকণ্ঠায় বলে উঠলেন, “কেন কার কী হয়েছে?”

ভল্লা কমলিমায়ের একটা হাত ধরে বলল, “বালাই ষাট, কারও কিছু হয়নি। কিন্তু ওদিন যদি কেউ চোট-আঘাত পায় – বড়্‌বলা তাদের চিকিৎসা করবে আর তুই করবি সেবা...পারবি না, মা?”

কমলিমা বললেন, “তা করব না কেন? আমার আর কাজ কি? কিন্তু এই ঘরে তাদের রাখবি কী করে?”

ভল্লা নিশ্চিন্ত স্বরে বলল, “এ ঘরে নয় মা। এখান থেকে একটু দূরে আমাদের নতুন পাকা বড়ো বড়ো ঘর হয়েছে। অমাবস্যার দিন তোকে নিয়ে যাবো মা, সেখানেই আমরা সবাই মিলে কয়েকদিন থাকব”।

“আমার ছেলেদের সঙ্গে আমি সর্বদাই জুড়ে থাকব, ভল্লা, ভাবিস না। এখন উঠি – রাত হল অনেক...রান্না বসাই...”।

“আচ্ছা, আরেকটা কথা বলে রাখি মা, কাল থেকে আমাদের এখানেও পাকা ঘর বানানোর কাজ শুরু হবে। কাল সকালে কুলিকপ্রধান আসবে তার লোকজন নিয়ে। কোন অসুবিধে হবে না তো?”

“এখান থেকে একটু সরে করতে বলিস – হই-হট্টগোল আমার ভাল লাগে না। আর তারাও সবাই পুকুরে যাবে তো?” কমলিমা একটু উদ্বেগের সঙ্গে জিজ্ঞাসা করলেন।

“তা তো যাবেই। কিন্তু ভাবিস না মা, ওদের বলে দেব। তোকে ওরা বিরক্ত করবে না”।

 

ভল্লা মারুলার দিকে তাকিয়ে বলল, “ওদিকের কী খবর?”

“বীজপুর থেকে অস্ত্র-শস্ত্র আজ রাতে রওনা হচ্ছে। আশা করি কাল রাত্রে আমাদের ভাণ্ডারে পৌঁছে যাবে। কিন্তু উপানু শালা কাঠি করতে শুরু করেছে। আজ সকালে শষ্পকের কাছে গিয়ে নাকি বলেছে, ওর কাছে খবর এসেছে, চারখানা গোশকট বোঝাই অস্ত্র-শস্ত্র, বীজপুরের পাশে জঙ্গলের মধ্যে রাখা আছে। কোন এক বণিক – তার নাম জানে না – আমাদের রাজধানী থেকে ওগুলো কিনে এপথে নিয়ে যাচ্ছে। বুঝে দ্যাখ, ভল্লা, হতভাগার আড়কাঠি সর্বত্র ঘুরে বেড়াচ্ছে”।

“তা তো থাকবেই। আমাদেরও তো আছে – কিন্তু শুনে শষ্পক কী বলল?”

“শষ্পক আমাকে যা বলল, ওকে জিজ্ঞাসা করেছে,

“তোমার লোক বণিকের মোহর-পত্র দেখেছে?”

“দেখেছে, সব ঠিক আছে। কিন্তু বণিক নিজে তো সঙ্গে নেই, আছে তার করণিক আর রক্ষীদল”।

“মোহর-পত্র যদি ঠিক থাকে, তোমার - আমার মাথাব্যথা কিসের? রাজধানী বুঝবে আর বুঝবে সেই বণিক”।

“তা ঠিক কিন্তু...”।

“কিচ্ছু কিন্তু নেই, উপানু। আমি এই আস্থান আর ওই দুই গ্রাম নিয়েই ব্যতিব্যস্ত হয়ে রয়েছি। আর বিপদ ডেকে এনো না””।

ভল্লা বলল, “শষ্পক তো ঠিকই করেছে। কিন্তু উপানু হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না। ওর সেই চরটাকে খুঁজে বের করতে পারবি?”

“পারবো। বীজপুরের জনাই – আর ওই বণিকের রক্ষীসর্দার – ওদের থেকেই ব্যাটার সব তত্ত্ব জেনে নেব – তারপর ধরতে আর কতক্ষণ”?

“তবে আর কি? যা করার করে ফ্যাল। আর উপানুর আয়ু তো অমাবস্যা অব্দি, তাই তো রামালি?”

“ওই রাতের পর উপানুর আর বাঁচার কোন আশাই নেই – আমরা কমলিমায়ের আশীর্বাদ পেয়েছি, ভয় কি?”

কমলিমা রান্না করতে করতে বললেন, “ভল্লা, আমার রান্নার ভাঁড়ার কিন্তু বাড়ন্ত – বড়ো জোর দু একদিন চলবে...”।

ভল্লা হেসে বলল, “ভাবিস না মা, কাল ভোরে উঠেই দেখবি, তোর ঘরের দরজার সামনে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার রাখা আছে”।

ভল্লা মারুলাকে বলল, “বটতলির ছেলেদের তাহলে, পরশু সকাল সকাল পাঠাব – অস্ত্র-শস্ত্র আনার জন্যে?”

“পরশু সকালে? ঠিক আছে – বলে রাখব। ও হ্যাঁ, বটতলির ছেলেদের গয়না-পত্র বিক্রি হয়ে বীজপুর থেকে টাকা চলে এসেছে। কত টাকা, শুনলে চমকে যাবি”।

“কত?”

“তিনশ চল্লিশ রূপোর মুদ্রা!”

“বলিস কী? বটতলির ছেলেগুলোকে খুব হাল্কাভাবে নিয়েছিলাম – কিন্তু এখন দেখছি বেশ কাজের তো?”

“সে আর বলতে? আচ্ছা, কাল দুপুরে রামালি যাচ্ছিস তো? আর ভল্লা যাচ্ছিস বিকেলের দিকে, তাই তো?”

“হ্যাঁ রামালি দুপুরে খেয়ে সোজা চলে যাবে – আমি মাকে আর ছেলেদের নিয়ে ঘন্টা দুয়েক পরে যাবো”।

কমলিমা জিজ্ঞাসা করলেন, “আমাকে নিয়ে কোথায় যাবি? কালকেই নতুন ঘরে চলে যাবি নাকি?”

“না রে মা, কালকে গিয়ে তুইও একবার দেখে নে। তোর প্রয়োজন মত, কোথায় কী করতে হবে বলে দিবি। তারপর সন্ধেতেই আমরা ফিরে আসব। তারপর অমাবস্যার বিকেলে আমরা সবকিছু নিয়ে চলে যাবো – কিছুদিনের জন্যে আমরা ওখানেই থাকব”।       

মারুলা বলল, “কিন্তু কমলিমাকে নিয়ে তোরা হেঁটে যাবি নাকি?”

ভল্লা বলল, “সে চিন্তা তোকে করতে হবে না, সে মা জানে… তোকে একটা কথা বলে রাখি – সবই তো শুনলি মায়ের সঙ্গে কথা হয়ে গেছে – আক্রমণের দিন আমরা সবাই সবাইকে ‘জুজাক’ বলে ডাকব – কারো কোন নাম থাকবে না। তুই, আমি, রামালি সবাই জুজাক – জুজাকদাদাও নয় – ঠিক আছে?”

মারুলা বলল, “ঠিক আছে

মারুলার কথা শেষ হওয়ার আগেই বাইরে থেকে বণিক অহিদত্তের ডাক শোনা গেল, “ভল্লামশাই রয়েছেন নাকি?”

“রয়েছি - চলে আসুন বণিকমশাই, আপনার রক্ষীদের বলুন আমাদের বাসাটা ঘিরে থাকুক – কেউ যেন কাছে না আসতে পারে…” ভল্লা গলা তুলে সাড়া দিল।

অহিদত্ত উঠোনে এসে একটু চমকে গেলেন, তারপর জিজ্ঞাসা করলেন, “কমলিমা না? বাঃ খুব ভালো করেছেন। ছেলেগুলোর মাথার ওপরে একজন মা থাকলে – ওদের শক্তি বেড়ে যাবে”।

ভল্লা বলল, “এখানে বসুন বণিকমশাই। তারপর পরিস্থিতি কী বলুন”।

ভল্লার পাশে বসে বণিকমশাই বললেন, “এমনিতে সবই ঠিক আছে, বার্তা পেলাম বীজপুর থেকে আমাদের শকট রওনা হয়ে গেছে –  ওখান থেকে নতুন বলদ জুড়েছে, বেশ তাড়াতাড়িই টানবে মনে হয়। বলছে আগামীকাল দুপুরের আগেই... কিন্তু একটা আপদ এসে জুটেছে...এঁটুলির মতো”।

মারুলা বলল, “কোন ফেউ পিছু নিয়েছে?”

অহিদত্ত ভল্লার দিকে তাকালেন, ভল্লা বলল, “আমারই ভুল – আপনার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়নি – ও হচ্ছে মারুলা – আমরা একসঙ্গেই...”

ভল্লার কথা শেষ করতে না দিয়ে অহিদত্ত বললেন, “মারুলামশাই – বিলক্ষণ রাজধানীতে আপনার কথাও বলেছে – আপনিই নাকি সবদিক দেখা শোনা করবেন। নমস্কার।”

মারুলাও নমস্কার করে বলল, “আপদটা কি?”

“আর বলবেন না, বীজপুরে ঢোকা থেকে কে একটা লোক আমাদের লোকগুলোর পিছনে পড়ে গেছে, মোহর-পত্র দেখেছে। জিগ্যেস করছে কোথায় যাবে, বণিকের নাম কী, এত অস্ত্র-শস্ত্র কী হবে...হাজারটা প্রশ্ন”।

“ও কি সঙ্গে সঙ্গে রয়েছে?” মারুলা জিজ্ঞাসা করল।

“না – একটু পিছনে – নাগাড়ে অনুসরণ করে চলেছে...আমাদের রক্ষীরা কিছু করতেও পারছে না, অচেনা-অজানা – কার লোক কে জানে?”

মারুলা ভল্লার দিকে তাকাতে, ভল্লা ঘাড় নাড়ল – তারপর বলল, “ঠিক আছে ও নিয়ে চিন্তা করবেন না, বণিকমশাই। আপনার সঙ্গে লোকজন আছে তো? শকট খালি করে ভাণ্ডারে ঢোকাতে বেশ কিছু লোক লাগবে কিন্তু...”।

“লোক সঙ্গেই আছে, ওরা খালি করে শকট নিয়ে ফিরে যাবে। আর আছে আটজন সশস্ত্র রক্ষী, একজন করণিক, তার একজন সহকারী, আর চারজন ভৃত্য। ভাণ্ডারে সব কিছু ঢুকে গেলেই দরজায় তালা পড়ে যাবে - সকলে নিজের নিজের কাজ সামলাবে...”।

ভল্লা বলল, “বাঃ ব্যবস্থা তো ভালোই... আগামীকাল ভালোয় ভালোয় মিটে গেলে নিশ্চিন্ত। ও আরেকটা কথা বণিকমশাই – আমাদের মায়ের রান্নার ভাণ্ডার প্রায় শেষ হতে চলল, আজ রাত্রে অন্নপূর্ণার ভাণ্ডার এসে যাবে তো?”

অহিদত্ত বললেন, “হ্যাঁ আজ ওর আসার কথা তো, নিশ্চয়ই দিয়ে যাবে...”

“আরেকটা অনুরোধ – অমাবস্যার রাতে আমাদের একটা বড়ো কাজ আছে – ওই দিন থেকে আমরা বেশ কিছুদিন অস্ত্র ভাণ্ডারেরই একটা ঘরে সবাই থাকব – প্রায় চল্লিশজন – তাদের পেটের সমাধানটাও আপনাকেই করতে হবে... অমাবস্যার আগেই। কোন ঘরে রাখতে হবে মারুলা, করণিকবাবুকে বুঝিয়ে দিস”।

“অনুরোধ বলবেন না ভল্লামশাই – আপনি আমার থেকে কোনদিন কোন সাহায্যই নেননি – দু মণ তুলো আর দু’মণ বাদামের বীজ দিয়েছিলাম – তার মূল্যও আপনি পাই-পয়সায় মিটিয়ে দিয়েছেন...আমার কাছে আপনার যা মুদ্রা এখনও জমা আছে...তাতে চল্লিশজনের মাসখানেকের খাদ্যের সংস্থান হয়ে যাবে...ও নিয়ে মোটেও চিন্তা করবেন না। আমি বণিক - এটাই আমার কাজ”।

“ঠিক আছে, বণিকমশাই। এরপর আমাদের সময় করে একদিন বসতে হবে – কিন্তু সেটা ওই অমাবস্যার পরেই কোন একদিন – আপনাকে সংবাদ দেব। আমরা চারজন – আপনি, মারুলা, রামালি এবং আমি বসে দর-মূল্য সব ঠিক করে নেব – ওই দিন আদান-প্রদানও সেরে নেব...”।

অহিদত্ত অবাক হয়ে বললেন, “বলছেন কী ভল্লামশাই, আদান-প্রদানও...”।

ভল্লা মৃদু হেসে ঠোঁটের ওপর আঙুল রাখল, “এখন আর কোন কথা নয়”।

        অহিদত্ত হাসতে হাসতে উঠে দাঁড়ালেন, বললেন, “আমি এখন আসি। কমলিমা, প্রণাম নেবেন। চললাম, দেখা হবে     আবার"। 


চলবে... 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নতুন পোস্টগুলি

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩৯

  প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "  দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব ...