প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "
দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "
তৃতীয় ধারাবাহিক উপন্যসের প্রথম পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "
চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ "
পঞ্চম ধারাবাহিক উপন্যাস প্রথম পর্ব - "স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "
সম্পুর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "; "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "
১৩ই
জুলাই, ২০২৬, রবিবারের সন্ধে
সন্ধেবেলা
প্রবীণবাবুর ঘরে সকলেই জড়ো হল। নবীনবাবু, অহীন, সর্বজিৎ এবং নবীনবাবুদের
গৃহ চিকিৎসক ডাক্তার বিপিন সরকার। প্রবীণবাবু ডাক্তারবাবুকে তাঁর ছোটকা অবিনবাবুর
পাতালঘরে বন্দী থাকার কথা সবিস্তারে বললেন। সর্বর্জিৎ আজ সকালে যা যা ঘটেছে সব
কথাই বলল এবং অবিনবাবুর স্বাস্থ্য সম্পর্কে তার উদ্বেগের কথাও বলল।
সবকথা শুনে ডাক্তার সরকার
দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন, তারপর বললেন, “প্রবীণকাকু, তোমার ছোটকার কথা আমার দাদু, ঠাকুমা
এবং বাবা-মার মুখে বেশ কয়েকবার শুনেছি। তবে সত্যি বলতে আমরা সেকথা বিশ্বাস করিনি।
তবে আজ সর্বজিতের কথায় আশ্চর্য হচ্ছি – আমাদের ডাক্তারি শাস্ত্রে এমন ঘটনার কথা
কোনদিন পড়িনি, আর আমার দীর্ঘ ডাক্তারি জীবনে এমন ঘটনা কখনও দেখিনি বা শুনিনি।
সর্বজিৎ তার দুশ্চিন্তার কথা যা বলল, সেগুলোও খুবই যুক্তিযুক্ত। ১৯৪৩ থেকে ২০২৬
মানে এই তিরাশি বছরে আমাদের পরিবেশ পরিস্থিতি অনেকটাই বদলে গিয়েছে। ম্যালেরিয়া,
ডেঙ্গু আগেও ছিল এখনও আছে। নিমোনিয়া, যক্ষ্মা, টাইফয়েড, সর্দিজ্বর তখনও ছিল, আজও
আছে। কিন্তু এখনকার ভাইরাসগুলোর চরিত্র অনেক বদলে গেছে, যেমন আমরাও বদলে গেছি। তার
পাশাপাশি আমরা ভয়ংকর কিছু নতুন ভাইরাসের সঙ্গে লড়াই করে সদ্য জিতেছি। যেমন কোরোনা
ভাইরাস। অবিনদাদুর পক্ষে এর যে কোন একটা সংক্রমণই প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে”।
প্রবীণবাবু বললে, “ঠিক কথা,
ডাক্তার। ঠাকুর সিদ্ধানন্দ কোন মন্ত্র আর কৌশলে এমন একটি কাণ্ড ঘটিয়েছিলেন, সে কথা
তিনিই জানেন। কিন্তু আজ তিরাশি বছর পরে - মানুষটি জেগে উঠলে আমাদের কী করতে হবে সে
নির্দেশ তিনি দিয়েছিলেন কিনা – সেও তো আমরা জানি না, ছাই। আচ্ছা, ত্রিকালদর্শী
মানুষ যা হোক, হুঁঃ। নিজের মৃত্যুটাই কবে হবে এবং কিভাবে হবে সেটাই তিনি জানতে
পারেননি!”
ডাক্তার সরকার বললেন, “সে কথা
জানার কোন উপায় যখন নেই, তখন আমার মতে অবিনদাদুকে পাতালঘর থেকে বের করে, সরাসরি
কোন হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করে দেওয়াই সমীচীন। সারাক্ষণ অবজার্ভেশনে রেখে ওঁনার
শরীর-স্বাস্থ্য মনিটর করতে সুবিধে হবে”।
সর্বজিৎ আনন্দে বলে উঠল, “বাঃ
এর থেকে ভালো ব্যবস্থা আর কিছু হতেই পারে না। কিন্তু সেখানেও কিছু সমস্যা দেখা
দেবে...”।
ডাক্তার সরকার জিজ্ঞাসা
করলেন, “কিসের সমস্যা সর্বজিৎ?”
সর্বজিৎ বলল, “নার্সিং হোমে
অ্যাডমিট করতে গেলেই দাদুর আইডেন্টিটি লাগবে, ওঁনার আধার কার্ড বা ভোটার কার্ড
কিছুই নেই”।
ডাক্তার সরকার বললেন, “একদম
ঠিক বলেছ। নবীনদা, ওঁনার আধার আর ভোটার কার্ড, যত শিগ্গিরি সম্ভব বানিয়ে ফেলতেই
হবে। তবে আপাততঃ আমার নার্সিং হোমে আমি ভর্তি করে, অবজার্ভেশন চালু করে দেব...তবে
সেক্ষেত্রেও বড় একটা সমস্যার কথা মাথায় রাখতে হবে”।
প্রবীণবাবু বললেন, “আবার কি
সমস্যা, ডাক্তার?”
একটু ইতস্ততঃ করে ডাক্তার
সরকার বললেন, “যদি অবিনদাদু ঠিকঠাক থাকেন – কোন সমস্যা হবে না। কিন্তু যদি খারাপ
কিছু হয়ে যায় – আমি ও আমার নার্সিং হোম ভীষণ বিপদে পড়ে যাব। থানা-পুলিশ আমাকে ছেড়ে
দেবে না...আমার নার্সিং হোম তো বন্ধ হয়ে যাবেই – আমার ডাক্তারির লাইসেন্সও হয়তো...”।
প্রবীণবাবু বললেন, “তুমি কি
ছোটকার মারা যাওয়া নিয়ে ভাবছ, ডাক্তার? দুর্ভাগ্যক্রমে যদি তা হয়ও, তোমার বিপদ হবে
কেন? চিকিৎসাধীন মানুষের কি হাসপাতালে বা নার্সিং হোমে মৃত্যু হয় না?”
ডাক্তার সরকার বললেন, “সে তো
হতেই পারে, কাকু। কিন্তু অবিনদাদুর কোন পরিচয় নেই যে। উনি এতদিন কোথায় ছিলেন? কোন
কাজের জন্যে উনি পাতালঘরে গা ঢাকা দিয়েছিলেন? সে কথা এতদিন স্থানীয় পৌরসভা বা
থানায় জানানো হয়নি কেন? এসব প্রশ্ন উঠে আসবেই। আজ যদি হঠাৎ আমরা বলি, ঠাকুর
সিদ্ধানন্দ অবিনদাদুকে তিরাশি বছরের জন্যে সমাধি করে রেখেছিলেন। এবং এতদিনে তাঁর
সমাধি ভঙ্গ হয়েছে। কেউ বিশ্বাস করবে? আমাদের সকলকেই চরম হেনস্থার মধ্যে পড়তে হবে!”
প্রবীণবাবু বললেন, “হুম্,
বুঝলাম। কথাটা তুমি ঠিকই বলেছ, ডাক্তার। বর্তমানে দেশের যা পরিস্থিতি, তাতে
বিশ্বাস ব্যাপারটাই লোপ পেয়ে গেছে। কেউ ভাল কাজ করলে বলি, ব্যাটার কোন ধান্দা আছে।
আর কেউ খারাপ কাজ করে ধরা পড়লে বলি, তাকে ফাঁসানোর জন্যে ঘটনাটা সাজানো হয়েছে। আমার
ছোটকার ব্যাপারটাও জানাজানি হলে, লোকে বলবে – বড়সড় কোন কেলেংকারি করে গা ঢাকা
দিয়েছিল। এখন আমরা সবাই মিলে আষাঢ়ে গল্প ফাঁদছি, তাকে বাঁচানোর জন্যে। তাহলে তোমার
মতে এখন কী করণীয়?”
ডাক্তার সরকার বললেন, “করণীয়
বলতে একটাই, আমরা আগামীকালই অবিনদাদুকে বের করে নিয়ে সোজা আমার নার্সিং হোমে নিয়ে
যাবো। তার সঙ্গে পুলিশ, প্রশাসন সকলকেই জানিয়ে দেব। প্রেস এবং মিডিয়ার ব্যাপারটা
পুলিশকেই সামলাতে বলব”।
নবীনবাবু এতক্ষণ চুপ করে সবার
কথা শুনছিলেন, এখন উত্তেজিত হয়ে বললেন, “ঠিক বলেছেন, ডাক্তারবাবু, প্রেসকে আমরা
কিছু বলতে গেলে, গুড়ের নাগরিতে মাছি পড়ার মতো, আমাদের ছেঁকে ধরবে – তখন এদিককার
আসল কাজই হয়তো পণ্ড হয়ে যাবে”।
প্রবীণবাবু বললেন, “কিন্তু ছোটকার
সমাধির তিরাশি বছর পূর্ণ হবে, এমাসের ১৯ তারিখে। তার মানে এখনও ছদিন বাকি। আমার
মতে, ডাক্তার, এ কটাদিন অপেক্ষা করি না। ওই ঊণিশ তারিখেই ছোটকাকে বের করে আনার ব্যবস্থা
করলে ভালো হত না?”
সকলেই চুপ করে তাকিয়ে রইলেন
প্রবীণবাবুর মুখের দিকে। বৃদ্ধের দুচোখে আশা আর আনন্দের দ্যুতি। মুখে ধৈর্যের দৃঢ়তা। প্রিয় ছোটকাকে সুস্থ দেখতে
তিনি উদ্গ্রীব – কিন্তু সামান্য এই কটা দিনের জন্যে – তিনি কোন ঝুঁকি নিতে চান না।
কিছুক্ষণ পরে সর্বজিৎ বলল,
“তাই হবে দাদু। এই কটা দিন সময় পেলে আমরাও কিছুটা গুছিয়ে নিতে পারবো। অহীন, মহীনদা
কাল দুপুরের দিকে পৌঁছাচ্ছে বললে, না?”
অহীন বলল, “হ্যাঁ। আমদাবাদ
থেকে ভোরের ফ্লাইট – কলকাতা থেকে বাড়ি আসতে একটা-দেড়টা হয়ে যাবে”।
“গুড। ডাক্তারকাকু, আগামীকাল
সন্ধেবেলা আমরা আরেকবার বসতে পারি কি? মহীনদা থাকবে। আপনাদের পরিচিত এ শহরের কয়েকজন
গণ্যমান্য মানুষকেও যদি ডাকেন, তাঁদের সকলকে সব কথা জানিয়ে আমরা তাঁদের পরামর্শও
নিতে পারবো। তাতে আমাদের সব ব্যবস্থা সামলে নিতেও সুবিধে হবে”।
ডাক্তারবাবু একটু চিন্তা করে
বললেন, “হুঁ আমি চলে আসতেই পারি। আসলে অবিনদাদুর এই কেসটা নিয়ে আমি খুবই এক্সাইটেড
ফিল করছি। মেডিকেল সায়েন্সে এই ঘটনা হয়তো অসাধারণ এক রেকর্ড গড়ে তুলবে। ঠিক আছে,
আজ তাহলে আমি উঠি। কাল সন্ধে সাড়ে ছটা-সাতটা নাগাদ আসব। প্রশাসনের দু একজন মাথাকেও
সঙ্গে নিয়ে আসার চেষ্টা করব”।
নবীনবাবু বললেন, “বাঃ তাহলে তো খুবই উপকার হয়”।
চলবে...
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন