প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "
দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "
তৃতীয় ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "
চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ "
পঞ্চম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "
সম্পূর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "; "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "
এর আগের পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ২৩ "
২৪
সুনুদা,
গতকাল বাগডোগরা থেকে কার্সিয়াং গিয়ে সব কাজ কর্ম সারতে সারতে
প্রায় সন্ধ্যে হয়ে গিয়েছিল। কাজ শেষ করে নেমে এলাম শিলিগুড়িতে। বেশ রাত হয়ে গিয়েছিল,
প্রায় সাড়ে দশটা। হোটেলে উঠে ফ্রেশ হয়ে সামান্য ডিনার সারার পর, খুব টায়ার্ড ফিল করছিলাম।
তাছাড়া আজ ভোরে কলকাতা ফেরার ফ্লাইট ধরার টেনশন ছিল বলে, তোমাকে লিখতে
পারিনি। আজ এখন এয়ারপোর্টের ওয়েটিং লাউঞ্জে বসে আছি। হাতে বেশ খানিকটা সময় আছে। তাই
লিখতে বসলাম।
কলকাতার তুলনায় হলদিয়ার ভোরগুলি মাচ বেটার। আবার হলদিয়ার থেকেও
এদিককার ভোর আরও বেশি সুন্দর। তার কারণ কি প্রকৃতি? অজস্র গাছপালা, দিগন্ত জোড়া চা-বাগান, ছোট্ট একটা নদী, পাহাড়। হোটেল থেকে
বেরিয়েছিলাম ভোরে, আসার সময় কুয়াশা ছিল, খুব হালকা। তার সঙ্গে ছিল সামান্য শীতলতার আবেশ। এখন ওয়েদার
অনেকটাই ক্লিয়ার। এয়ারপোর্ট লাউঞ্জে শীতলতার আমেজ একটু বেশীই। তবে এই শীতলতা
প্রাকৃতিক নয়, সেন্ট্রাল এসির। সকাল সাড়ে
সাতটা বাজে
এখন। মেঘলা না হলে কলকাতা বা হলদিয়াতে এখন ঝলমলে রোদ্দুর উঠে
গেছে, কিন্তু এখানে ওই হাল্কা কুয়াশার কারণে রোদ্দুরের উজ্জ্বলতা কম, কিছুটা মলিন যেন বিষণ্ণ। আমার ফ্লাইটের
ডিপার্চার টাইম পৌনে নটা।
গতকাল যেখানে শেষ করেছিলাম, সেখান থেকেই আজ শুরু করি। আমার পুত্রের জীবনটা শুরুই হল একটা আপাত-মিথ্যা দিয়ে। যদিও আমি জানতাম, জগতের কাছে কথাটা মিথ্যে হলেও, আমার কাছে নয়। বরং আমার মনের দিক থেকে ওই কথাটা আজও আমার কাছে পরম সত্য। এবং সেই বিশ্বাসেই আমি ম্যাডামকে দৃঢ়ভাবে বলতে পেরেছিলাম, “হান্ড্রেড পারসেন্ট”।
ওই প্রেপ স্কুলের কাজকর্ম শেষ করে আমরা বাড়ি ফিরলাম, বাবা, সুধন্বা
ও আমি। আসার পথে বাবা খুব চাপা কণ্ঠে আমাকে বললেন, “এটা কি ঠিক করলি, সুকু?”
“এছাড়া আর অন্য কী উপায় আছে বলো? ম্যাডাম
তো ঠিকই বলেছেন, বাম্বাই এখন না হয় শিশু, চিরকাল তো আর থাকবে না। ওর সহপাঠী বন্ধুরা এই ব্যাপারটা
নিয়ে ওকে হ্যারাস করবে, ইন্সাল্ট করবে, কখনো
সামনা-সামনি, কখনো বা আড়ালে। ওর সেই মানসিক যন্ত্রণাটা হয়তো এক, দুবার আমাদের
সঙ্গে ও শেয়ার করবে, বাবা, একটু বড়ো হয়ে গেলে, নিজের মনেই গুমরে মরবে। আজকের ভাষায়
যাকে বলে ডিপ্রেশন, অবসাদ। যদি ভবিষ্যতে কোনদিন ভেরিফিকেশনের প্রয়োজন পড়েও, তখন
দেখা যাবে। আমার ধারণা আমি হতাশ হব না”।
কথা আর এগোয়নি সেদিন, কারণ ট্যাক্সিটা আমাদের বাড়ির কাছে
পৌঁছে গিয়েছিল। নামবার সময় ট্যাক্সির ভাড়া মেটানোর সময় দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বাবা
বলেছিলেন, “যা ভালো বুঝিস কর, আমি আর কী বলব, মা?”
তখনকার মতো কোন কথাবার্তা না হলেও, রাত্রে আমার শোবার ঘরে
এসে মা বললেন, “বাম্বাইয়ের জীবনটা শুরু করলি এমন একটা ডাঁহা মিথ্যে দিয়ে? আজকাল
শুনেছি স্কুল থেকে মা-বাবাকে প্রায়ই ডাকে ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া কেমন এগোচ্ছে সে
বিষয়ে আলোচনার জন্যে। সে মিটিংয়ে বারবার তুই যখন একলা যাবি, কী উত্তর দিবি
টিচারদের? কত মিথ্যে সাজাবি? সেই সাজানো মিথ্যে তো বাম্বাইও শুনবে, জানবে। তখন তো
তোর একূল-ওকূল দুকূলই যাবে, সুকু”!
“তাহলে, তুমি বলছো জ্যোতিষের নামটা ওখানে দেওয়াটাই উচিৎ
ছিল?”
“বুঝে দ্যাখ, আমাদের বাম্বাই জ্যোতিষেরই ছেলে, সে কথা
অস্বীকার করার কোন উপায় আছে? কিন্তু তার সঙ্গে আর কোন সম্পর্ক নেই, তোদের মধ্যে ডিভোর্স
হয়ে গেছে, এ কথাটা স্পষ্ট করে বলে দিলে ক্ষতি কী হত? আজকের যুগে কথাটা সবার কাছেই
গ্রহণযোগ্য হত। স্কুলের টিচারদের কাছে। এমনকি বাম্বাইয়ের কাছেও? ও একটু বড়ো হলে
নিজেই বুঝত, বাবার সঙ্গে থাকতে তার মায়ের খুব কষ্ট হত, তাই মা-বাবার ছাড়াছাড়ি হয়ে
গেছে”।
“কিন্তু আমার জীবনের ওই পর্বটাকে আমি যে সম্পূর্ণ ভুলে যেতে
চাই, মা”।
“সে কি আর আমি বুঝছি না, মা? কিন্তু মুছে ফেলব বললেই কি আর
মুছে ফেলা যায়? একি বাম্বাইয়ের খেলার সময় পড়ে গিয়ে হাঁটুর নুন-ছাল উঠে যাওয়া? যে কদিন
পরেই সে দাগ মিলিয়ে যাবে! জীবনের কিছু কিছু দাগ সারা জীবন বয়ে বেড়াতেই হয়, তাকে
নিঃশেষে মুছে ফেলতে যাওয়া কিচ্ছু নয়”।
সেদিন মায়ের কথার কোন উত্তর দিতে পারলাম না এবং এই নিয়ে কোন কথা বলতেও ইচ্ছে হচ্ছিল না। কিছুক্ষণ বসে থেকে মা উঠে যাওয়ার সময় বললেন, “রাত হল, ঘুমিয়ে পড়। কালকে তোর আবার অফিস আছে”।
যাই হোক এভাবেই আমার পুত্র শিশু সুধন্বার শিক্ষা জীবনের পথচলা
শুরু হল আমার বিতর্কিত সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে। সত্যি বলতে আমার ওই সিদ্ধান্তটা
ঠিক না ভুল, বুঝে উঠতে পারিনি আজও। বিভিন্ন স্কুলে টিচার্স মিটিং অ্যাটেণ্ড করেছি
বহুবার – ওর বাবার প্রসঙ্গ এসেছে বেশ কয়েকবার, কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে ওর বাবাকে এনে
হাজির করার জন্যে কেউ জোরজারি করেনি। এবং শিশু সুধন্বাও এখন আর শিশু নেই, কৈশোর
পেরিয়ে সে এখন তারুণ্যের দোরগোড়ায়। সেও কোনদিন তার মাকে তার বাবার সন্ধান এনে
দিতেই হবে, একথা মুখ ফুটে বলেনি। হতে পারে এই ব্যাপারটা সে তার দিদার থেকেই বুঝে
নিয়েছিল। হয়তো সেই কারণেই আমাদের কথাবার্তায় পিতৃ প্রসঙ্গ টেনে এনে তার মাকে সে
কোনদিন বিব্রত করেনি।
বেশ কয়েক বছর আমাদের জীবনটা বেশ সাবলীল চলার পর, প্রথম ঝড়টা
এল বাম্বাই যখন ক্লাস ফাইভে পড়ে। বাবার হঠাৎ সেরিব্রাল অ্যাটাক হল। হপ্তা দুয়েকের
টানা লড়াইয়ের পর বাবাকে নিয়ে বাড়িতে ফিরলাম, কিন্তু তাঁর বাঁদিকটা তখন প্রায় অসাড়।
তুমি ডাক্তার, তোমাকে আর নতুন কী বোঝাবো, সুনুদা? তাছাড়া তুমি তো সেসময় প্রায়ই
আসতে হসপিট্যালে এবং বাড়িতে। সে সময় তোমার সঙ্গে আমার দেখাও হয়েছিল বেশ কয়েকবার। বাবার
অসুস্থতা নিয়ে তোমার সঙ্গে আলোচনা করেছিলাম তখন। তখনও তোমাকে অনেক কথাই বলার ছিল,
হয়তো সুযোগও ছিল। কিন্তু তখনকার পরিস্থিতিতে সে সব কথা তোমাকে বললে তুমি হয়তো ভুল
বুঝতে। অথবা বলে ফেলার পর আমিই হয়তো মরমে মরে থাকতাম এই ভেবে যে, আমি কি সাংঘাতিক
স্বার্থপর! বাবা হসপিট্যালে জীবনের জন্যে
লড়াই করছেন। আর আমি, তাঁর বুকের মধ্যে অত্যন্ত যত্নে বড়ো হয়ে ওঠা কন্যা, নিজের
আখের গুছোচ্ছি!
সে সময় মামীমা আমাদের
বাড়িতেই ছিলেন দীর্ঘদিন। তিনি বুক দিয়ে সামলেছিলেন বাম্বাই ও মাকে। বুঝতেই পারছো
বাবার এই আকস্মিক অসুস্থতায় মা দুশ্চিন্তায় ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন এবং মামীমা
এসে আমাদের সংসারের হাল না ধরলে আরও বিপদে পড়তাম আমরা – সেকথা আজও স্বীকার করতে
আমার কোন দ্বিধা নেই, সুনুদা। আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানিয়ে মামীমার সেই ঋণ আমি এতটুকুও
শোধ করতে চাই না – বরং সেই ঋণ আমার অন্তরে আজীবন সজীব থাকুক।
মায়ের কথাই শুধু বলি কেন, আমিও কি কম আতান্তরে পড়েছিলাম? বড়ো
হতে হতে বাবা ও মায়ের সামান্য জ্বর-জ্বারি, সর্দি-কাশি, কিংবা দাঁতের ব্যথা অথবা
চোখের ক্যাটারাক্ট অপারেশন আমি সামলেছি নির্বিঘ্নে। মনে করেছিলাম এই তো বেশ বড়ো
হয়ে গেছি, স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছি। কিন্তু সেরিব্রাল অ্যাটাকের পর, পাশে দাঁড়িয়ে মৃত্যুর
সঙ্গে বাবার নিত্য পাঞ্জা কষার দৃশ্যগুলো আমার ভেতরটাকে বিধ্বস্ত করে দিয়েছিল,
সুনুদা।
কোথায় কোন হসপিট্যালে নিয়ে যাব। কোন ডাক্তার ভালো এবং
যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য কিছুই তো জানতাম না। কলকাতা শহরে কত ঝাঁ চকচকে প্রাইভেট
হসপিট্যাল, পাড়ায় পাড়ায় কত নার্সিং হোম। কিন্তু কোথায় গেলে হতে পারে বাবার সঠিক
চিকিৎসা? কিছুই ঠিক করতে পারছিলাম না। তাছাড়া শুধু চিকিৎসাও তো নয়, তার ব্যয়সীমাও
যে জানা দরকার। নামজাদা হসপিট্যালে ভর্তি করার পর, সেখানে প্রাত্যহিক খরচ যদি
আমাদের আয়ত্তসীমার বাইরে হয়, তাহলে কতদিন টানতে পারবে আমার পরিবার। এক কথায়
দিশাহারা হয়ে উঠেছিলাম।
সে সময় শশাঙ্কর সাহায্য নেওয়া ছাড়া আমার কোন গত্যন্তর ছিল
না। ওকে ফোন করে বিপদের কথা জানাতেই মিনিট পনেরর মধ্যে বিভাস এএলএস অ্যাম্বুলেন্স
নিয়ে চলে এল। এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই শশাঙ্ক উপস্থিত হল নিজের গাড়ি নিয়ে। পাঁচমিনিটের
মধ্যে বাড়িতে তালা দিয়ে আমরা সবাই বেরিয়ে পড়লাম, কোথায় যাচ্ছি তখনো জানতাম না। নিজের
গাড়িতে সামনের সিটে বসা শশাঙ্ক, সারাটা পথ মোবাইলে কথা বলে চলেছিল অনর্গল। মিনিট
দশের মধ্যে আমরা ঢুকে পড়লাম, একটা হসপিট্যালের পার্কিংয়ে। ওখানে অতুল আমাদের জন্যে
ওয়েট করেছিল।
পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে বাবাকে ভেতরে নিয়ে চলে গেল
অ্যাটেণ্ডেটরা। শশাঙ্ক আমাকে নিয়ে গেল ওদের ইনডোর রিসেপশনে। মাকে বলল, “মাসিমা,
চিন্তা করবেন না, চিকিৎসা শুরু হয়ে গেছে, আপনি এই চেয়ারে বসুন। আর সুকন্যা, ফর্ম-টর্ম
সব ফিলআপ করা হয়ে গেছে, তোমাকে কয়েকটা সিগনেচার শুধু করতে হবে”।
এই সময় বিভাসও সেখানে উপস্থিত হল, বলল, “মেসোমশাইকে
আইসিইউতে ঢুকিয়ে ট্রিটমেন্ট শুরু করে দিয়েছে। বেশ কয়েকটা টেস্ট আর চেক-আপ হবে। ঘন্টাখানেকের
মধ্যে ওরা মেসোমশাইয়ের কণ্ডিশন জানিয়ে দেবে”।
আমি বেশ কয়েক পাতার ফিল-আপ করা ফর্মটা খুব দ্রুত চোখ বুলিয়ে
নিয়ে প্রত্যেক পাতাতেই সই করে দিলাম। আমার ও বাবার নাম, ঠিকানা, বয়েস, আমাদের
মেডিক্যাল ইন্সিওরেন্সের নাম্বার, এমনকি ক্যাশলেস কার্ড, আমার আধার কার্ড, প্যানকার্ডের
ফোটোকপি পর্যন্ত অ্যাটাচ্ড্ রয়েছে ফর্মের সঙ্গে। বিভাসকে জিজ্ঞেস করলাম, “এত
ডিটেল্স্ আর ডকুমেন্ট্স্ পেলেন কোথায়, ফর্মটা ফিলআপই বা করল কে, অতুল?”
বিভাস মুচকি হেসে বলল, “ও নিয়ে আপনি ভাববেন না, ম্যাডাম।
এটাই আমাদের কাজ। কাল সকালে কিন্তু অতুলকে পাঠাবো, মনে করে মেসোমশাইয়ের আধার আর
প্যানকার্ডটা দিয়ে দেবেন, ম্যাডাম, ওগুলো না পেলে ফর্মটা কিন্তু প্রসেসে যাবে না”।
সই করা হয়ে যেতে বিভাস ফর্মটা জমা করে দিল রিসেপশনের
ম্যাডামকে। তিনিও বাবার আধার আর প্যান নিয়ে একই রিমাইণ্ডার দিলেন। উত্তরে বিভাস
বলল, “কাল সকাল নটার মধ্যে সব পেয়ে যাবেন, ম্যাডাম...”।
মা কোন উত্তর দিলেন না, আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন
কিছুক্ষণ। মায়ের দু চোখের দৃষ্টিতে কোন বোধ নেই যেন। তারপর সামনের দেয়ালে টাঙানো
বড় ঘড়িটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। খুব অসহায় মনে হয়েছিল নিজেকে, এখন থেকে
সারাক্ষণ মা কি সেকেণ্ড, মিনিট কাউন্ট করে যাবেন?
চলবে...
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন