প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "
দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "
তৃতীয় ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "
চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ "
পঞ্চম ধারাবাহিকের শুরু - " স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "
অন্যান্য সম্পূর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "; "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "
এই উপন্যাসের আগের পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩৯ "
৪৫
রাত্রি তিন প্রহরের একটু আগেই ওরা
বেরিয়ে গেল কমলিমাকে প্রণাম করে, তাঁর আশীর্বাদ মাথায় নিয়ে। আজ সারাটা দিন যেন তাঁর
নিমেষে কেটে গেল নানান কাজে এবং বিচিত্র ব্যস্ততায়। আশ্চর্য এক উন্মাদনায় তিনি যেন
মগ্ন ছিলেন। ওরা বেরিয়ে যাওয়ার পরেই তিনি বসলেন বিরাট দরজার কাঠের পাল্লায় হেলান
দিয়ে। খুব ক্লান্তি অনুভব করলেন এবং উদ্বিগ্ন। এখন তাঁর আর কোন কাজ নেই – ছেলেগুলোর
প্রতীক্ষায় বসে থাকা ছাড়া।
কমলিমায়ের ডাকে নোনাপুর থেকে আরও দুই
মহিলা এসেছেন, অমরার মা সুরমি, আর সুদাসের মা পালি। আরও এসেছে আহোকের বোন কুসি আর দীপানের
ভাই ভুটিক। কবিরাজ বড়্বলা তো রয়েছেই। ওরা সকলে বেরিয়ে যাওয়ার পর পালি বললেন,
“ওখানে ওভাবে বসলে কেন, ঘরে এসে চোখ বুঝে গতরটা একটু এলিয়ে দাও না, দিদি। ঘুম হবে
না জানি, একটু জিরেন তো হবে। এসো দিদি, ঘরে এস”।
কমলিমা বললেন, “আসছি রে বোন, বাইরে বেশ
হাওয়া বইছে – একটু বসি – তোরা একটু ঘুমিয়ে নে – কী অবস্থায় ওরা ফিরবে কে জানে? তখন
আর হাঁফ ফেলার সময়ই পাবি না হয়তো”।
সুরমি বললেন, “চিন্তা করো না তো
কমলিদিদি, কিচ্ছু হবে না। ওরা সবাই যেমন বুক চিতিয়ে গেল, তেমনিই আবার ফিরে আসবে”।
“আহা তোর মুখে ঘি-মধু পড়ুক রে সুরমি।
তাই যেন হয়। তোরা শুয়ে পড়, আমি এখনই আসছি। বড়্বলার তো নাক ডাকছে...কুসি আর ভুটিও মনে
হয়ে ঘুমিয়ে পড়ল”।
কুসি চাপা স্বরে উত্তর দিল, “আমি
মোটেও ঘুমোইনি জেঠিমা। সব শুনছি...”।
“আচ্ছা, আচ্ছা, পাকু মা আমার...ঘুমোও
দেখি এবার...” কমলিমা স্নেহঢালা সুরে কুসিকে বললেন।
সারাদিনের পরিশ্রমের ক্লান্তিতে
সকলের চোখেই এখন নেমে আসছে গাঢ় ঘুমের কালো পর্দাখানা। কমলিমায়ের জন্যে সকলেই একটু
অস্বস্তি বোধ করলেও – দু-চারবার উশখুস করতে করতে, কিছুক্ষণের মধ্যে সকলেই ঘুমিয়ে
পড়ল। কমলিমা নিশ্চিন্ত হলেন। তিনি উঠে গিয়ে প্রদীপের সলতেটা কমাতে গিয়ে দেখলেন,
তেল ফুরিয়ে আসছে। প্রদীপে তেল ভরলেন, কানায় কানায়। অমাবস্যার অন্ধকারে কাজ সেরে ওরা
যখন ফিরবে – তখন ঘরে যেন থাকে দীপের আলো! তারপর আবার গিয়ে বসলেন দরজার সামনে,
কাঠের পাল্লায় হেলান দিয়ে।
ঘরের সামনে এক টানা বাঁধানো দাওয়া –
মাটি থেকে তিনধাপ উঁচু। ডানদিকে দাওয়া থেকে হাত পাঁচেক দূরেই রয়েছে বেশ বড়ো ইঁদারা
– কোমরভর উঁচু পাড়-বাঁধানো । সামনে অনেকটা চওড়া ঘেসো জমি – তার মধ্যে কিছু কিছু
বুনো ঝোপঝাড়। তার আশেপাশে এলোমেলো পড়ে আছে প্রচুর ইঁট, কাঠ আর বাঁশের ছোট-বড়ো
টুকরো - নির্মাণ কাজের অবশেষ। তারপরেই প্রায় দেড় মানুষ-ভর উঁচু মোটা গাঁথনির
পাঁচিল। পাঁচিলের বাইরেই জঙ্গল আছে, সে কথা জানেন কমলিমা – কিন্তু কিছুই দেখা যায়
না এখান থেকে। এখান থেকে এখন মাথার ওপরে চোখে পড়ে শুধুই কালো আকাশ – অজস্র তারায় ঝলমল। কমলিমা শুনেছেন – বড়ো বড়ো পণ্ডিতরা নাকি
অনেক গণনা করে দেখেছেন – জন্মমুহূর্ত থেকেই প্রতিটি মানুষের ভাগ্য নাকি কোন না কোন
তারকাগুচ্ছের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় – যুক্ত হয়ে যায় কোন না কোন গ্রহের সঙ্গেও। একমাত্র
মৃত্যুর পরেই নাকি সেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন হতে পারে।
প্রধান এবং তাঁর দুই পুত্রের ভাগ্য কোন
তারকারাজির বন্ধনে আবদ্ধ ছিল – তিনি জানেন না। তাঁর নিজের ভাগ্যের নির্দিষ্ট তারকাগুচ্ছ
কোনটি – তাও তিনি জানেন না। পুত্রশোক ভুলেছিলেন পাশের মানুষটিকে
আঁকড়ে ধরে। সেই পাশের মানুষটিও অত্যন্ত অসম্মানে যেদিন চলে গেল – সেদিন নিজেকে বড়ো
অসহায় নিরালম্ব মনে হয়েছিল। হাহাকার করে অন্ততঃ একবারও কেঁদে উঠতেও পারেননি – এতই
শূণ্য হয়ে উঠেছিলেন তিনি। কার বুকে মাথা রেখে কাঁদবেন তিনি, কে তাঁকে দেবে সান্ত্বনা?
মন তো মারা গেছে কবেই - প্রধানের সঙ্গেই। তিনি
নিশ্চিত মৃত্যুর দিকেই নিজের দেহটাকে হিঁচড়ে টেনে নিয়ে চলছিলেন...।
হতভাগা ভল্লা – কমলিমা দীর্ঘশ্বাস
ফেলে, চোখের জল মুছলেন আঁচলে – সেদিন ঝড়ের মতো ধেয়ে এল, ভেঙে তছনছ করে দিল তাঁর যত
শূণ্যতা – নিরেট শোকের যত পাষাণ দেওয়াল। অন্ধকারে তিনি যে অবলম্বন খুঁজছিলেন, তখন পাননি।
আজ পেয়েছেন - এতগুলি ছেলের সম্মিলিত ক্রোধ আর মনের আগুনই এখন তাঁর একমাত্র অবলম্বন। শুধু তাই নয় –
তিনি নিজেও আজ এতগুলি ছেলের অবলম্বন!
সুদূর আকাশের কোন নক্ষত্রপুঞ্জ অথবা
কোন গ্রহ তাঁর ভাগ্যকে আজ এইখানে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে – তাদের চিনে নিতে, আজ বড়ো
সাধ হয়। কমলিমা আকাশের দিকেই নির্নিমেষ চেয়ে রইলেন...
কখন যে তাঁর দুচোখ লেগে এসেছিল, কমলিমা টের পাননি। লোহার গেটটা ঠেলে খোলার শব্দে
তিনি চমকে উঠে দাঁড়ালেন, বললেন, “এসেছিস? কারা এলি, বাবা...?”
কাঁধে খাটুলা নিয়ে দাওয়ায় উঠে এল চিকনা
আর মেদুল। বিষণ্ণ স্বরে চিকনা বলল, “বার্তা শুভ নয় কমলিমা, মইলি...”
কমলিমা শিউরে চিৎকার করে উঠলেন, “মইলি...”?
খাটুলায় শুয়ে মইলি বলল, “আমি আছি জেঠিমা
- আমি আছি, বল্লমের সামান্য খোঁচা খেয়েছি – চিকনাটা একেবারে গাধা – ওই ভাবে কেউ
বলে জেঠিমার সামনে?”
কমলিমার চিৎকারে আর ওদের কথাবার্তায়
ঘরের সকলেই উঠে পড়ল। কমলিমা শশব্যস্ত হয়ে বললেন, “কুসিমা প্রদীপের সলতেটা উস্কে দিয়ে,
আরও দুটো প্রদীপ ঝট করে জ্বেলে এদিকে নিয়ে আয় না, মা। এখানে বাবা চিকনা, এখানে
নামা – মইলিকে – দেখিস খুব সাবধানে। ধীরে ধীরে... বাবা বলা, এদিকে এসে দেখ দেখি
ভাল করে, ছেলেটা বাঁচবে তো?”
তিনটে প্রদীপের আলোয়, ঘর এখন অনেকটাই
উজ্জ্বল। মইলি কমলিমায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে, হাসল, বলল, “তুমি অত ব্যস্ত হয়ো না জ্যেঠিমা,
আমি ঠিক আছি – এক রক্ষীব্যাটার ছোঁড়া বল্লমটা আমার দাবনা ঘেঁষে লাগল... ভল্লাদাদা
আর সুরুল কাপড় দিয়ে চেপে বেঁধে দিয়েছিল তখনই... ওঃহো, ভালো খবরটাতো বলিই নি –
উপানু মরেছে, জেঠিমা। হতভাগার মুখটা ফেঁড়ে দিয়েছিল সুরুল – আর রামালি ব্যাটার খুলি
ফাটিয়ে দিয়েছে...”।
কমলিমা বললেন, “এখন চুপ করে শুয়ে থাক,
পরে সব শুনবো...আগে বলাকে দেখতে দে”।
বলা খাটুলির পাশে বসে, মইলির ক্ষতের
কাপড়ের পরত খুলছিল...বলল, “ভল্লাদাদা বেঁধেছে, একদম কবিরাজের মতোই ..বেশি রক্ত
ঝরেনি – হুঁ কেটেছে অনেকটাই – গোটা ছয়েক টাঁকা দিতে হবে...একটু লাগবে মইলি...সহ্য
করতে হবে...”।
মইলি বলল, “করে নেব...শালা উপানুটা
মরেছে, মরেছে অন্ততঃ গোটা দশেক রক্ষী, আমার আবার ব্যথা কিসের?”
মইলির ক্ষতে সাতটা টাঁকা পড়ল – ঘন
প্রলেপ লাগিয়ে – গুল্মপাতা দিয়ে ক্ষতস্থান ঢেকে দিল বলা – তারপর কাপড়ের পরতে মুড়ে
দিল ক্ষতস্থান।
“কমলিমা, একটু জল দাও না, মইলিকে
দুটো বটিকা খেতে হবে...”। বলার কথা শেষ না হতেই, কুসি দৌড়ে গেল – ছোট্ট ঘটিতে জল
আনল। বলা তার হাতে দুটো বটিকা দিয়ে বলল, “এ দুটো খাইয়ে দে...”।
কমলিমা জিজ্ঞাসা করলেন, “বাকিদের কী
হল রে, মইলি? এত দেরি হচ্ছে কেন?”
“বাকিরা রয়ে গেল - কবিরাজকাকাকে
ছাড়িয়ে আনতে হবে বলে...আমাকে ঠেলে পাঠিয়ে দিল ভল্লাদাদা আর গোলোকদাদা মিলে... এসে
যাবে এখনই, জ্যেঠিমা, তুমি ভেব না...” মইলির চোখ বুজে এল।
কমলিমা ভয় পেয়ে বললেন, “কথা বলতে
বলতে...ও কী হল মইলির, বাবা বলা...?”।
বলা হেসে বলল, “চিন্তা করো না, কমলিমা,
ঘুমের বটিকা দিয়েছি, মইলি এখন ঘুমোক কিছুক্ষণ”।
একটু পরেই কাঁধে আরও দুটো খাটুলা
নিয়ে ঢুকল চারজন। দীপান আর বিশুনেরও আঘাত লেগেছে। ভল্লর আঘাতে দুজনেরই কাঁধে গভীর
ক্ষত। তবে গুরুতর নয়। মারুলা দুজনের ক্ষতই কাপড়ের পরতে বেঁধে দিয়েছিল, তাই মারাত্মক
রক্ত ক্ষরণ হয়নি। বলা পরপর দুজনেরই ক্ষত চিকিৎসা করে – ঘুমের বটিকা দিল।
এই সময়েই দলের প্রায় সকলেই ফিরে এল, পাঁচজন
ছাড়া – ভল্লা, সুরুল, রামালি, সম্পৎ আর দেবান। উত্তেজনা আর
আনন্দে সকলেই হই হই আরম্ভ করেছিল – বড়্বলা আর কমলিমা সকলকেই বকলেন, ঘরের মধ্যে
হইচই করিস না, ওরা তিনজন ঘুমোচ্ছে। ঘরের বাইরে চল, আমরাও যাচ্ছি। কুসি মা তুই একটু
থাক না, ওদের পাশে। ঘুমের ঘোরে ওরা যদি কিছু বলে বা জল চায় – আমাকে ডাকিস”।
চলবে...
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন