ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "
ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১ "
ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "
ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "
ধর্মাধর্ম শেষ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৫/১ "
"ধর্মাধর্ম" গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -
গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২
(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)
অথবা
+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।
[এর আগের পর্বাংশ - "ধর্মাধর্ম - ৫/১৬"]
৫.৫.৪ শিবের অসুর বা দৈত্য নিধন
বিষ্ণুর মতো তাঁরও বেশ কিছু অবতারের কথা শোনা যায়, কিন্তু যে কোন কারণেই হোক, সেগুলির জনপ্রিয়তা নেই।
বিষ্ণু এবং কৃষ্ণ যেমন দলে দলে অসুর দলন করেছেন, মহাদেব সে তুলনায় বেশ কম। যে
কয়েকজন বিখ্যাত অসুরকে তিনি বধ করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে প্রধান হলেন ত্রিপুরাসুর।
ত্রিপুরাসুর - মহাভারতে ঋষি বেদব্যাস অর্জুনকে
ত্রিপুরাসুর-সংহার-সংবাদ বর্ণনা করেছেন। প্রাচীনকালে[1] অসুরদের তিনটি পুর বা দুর্গ
ছিল, এই তিনটি পুর যথাক্রমে
সোনা, রূপো ও লোহা দিয়ে নির্মিত
হয়েছিল। স্বর্ণময় পুরের অধিকারী ছিল কমলাক্ষ, রৌপ্যময়ের তারকাক্ষ এবং লৌহময়ের
বিদ্যুন্মালী। দেবরাজ ইন্দ্র এই তিনটি পুরের বিনাশ না করতে পেরে মহেশ্বরের
শরণাপন্ন হলেন এবং বললেন “ব্রহ্মার বরে ওই তিন অসুর সবার উপরে অত্যাচার করছে, আপনি ছাড়া কেউ ওদের বিনাশ
করতে পারবে না। অতএব আপনিই ওদের বিনাশ করুন”। ভগবান ভূতভাবন, তিনটি পুরকে ঘিরে
দুর্ভেদ্য চক্রব্যূহ নিমার্ণ করে সহস্র বছর ধরে অবরোধ করে রইলেন। তারপর তিনটি
পর্বযুক্ত শল্যের আঘাতে তিনটি পুর দগ্ধ করলেন।
দৈত্য অন্ধক - এই অন্ধকের জন্ম কাহিনী খুবই অদ্ভূত। একবার কৈলাসে
মহেশ্বর যখন তপস্যায় মগ্ন, পত্নী দেবী পার্বতী খেলাচ্ছলে পিছন থেকে দুই হাতে তাঁর চোখ
বন্ধ করে দেন। এর ফলে বিশ্বচরাচর অন্ধকার হয়ে যায় এবং মহেশ্বর ও পার্বতীর স্বেদ
থেকে এক অন্ধ শিশুর জন্ম হয়। দেবীপার্বতী এই অদ্ভূত ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে ওঠায়, মহেশ্বর তাঁকে সান্ত্বনা
দিয়ে বললেন,
যেহেতু এই
পুত্র তাঁদের অঙ্গস্পর্শ থেকেই জাত, অতএব এই পুত্র তাঁদেরই। এরপর নিঃসন্তান হিরণ্যাক্ষ পুত্র
কামনায় মহেশ্বরের তপস্যা করলে, মহাদেব তাঁর হাতে অন্ধককে তুলে দেন। ভগবান বিষ্ণুর হাতে
হিরণ্যাক্ষের মৃত্যুর পর, অন্ধক রাজা হলেন, কিন্তু তাঁর গোষ্ঠীর দৈত্যরা তাঁকে মেনে নিল না, কারণ তিনি দৈত্যপুত্র নন, দেবপুত্র এবং অন্ধ। তখন
অন্ধক ঘোর তপস্যা করে ব্রহ্মাকে সন্তুষ্ট করলেন এবং ভগবান ব্রহ্মার বরে তাঁর
অন্ধত্ব দূর হল এবং একমাত্র মহাদেব ছাড়া তিনি সকলের অবধ্য হয়ে গেলেন। বিপুল
পরাক্রম অর্জন করে, এরপর
তিনি স্বর্গরাজ্য আক্রমণ করে দেবরাজ ইন্দ্র ও দেবতাদের উপর খুবই অত্যাচার শুরু
করেছিলেন। যথারীতি অন্ধকের অত্যাচারে অতিষ্ঠ দেবতারা ব্রহ্মার শরণাপন্ন হওয়াতে, তিনি মহাদেবকে এর
প্রতিকারের অনুরোধ করলেন। মহাদেব অনায়াসেই অন্ধকের “কোটি-কোটি (!)” অসুর-সৈন্যদের
বিনাশ করে,
অন্ধককে
তাঁর ত্রিশূলে গেঁথে ফেললেন। অন্ধকের পতনে ত্রিলোকের দেবতা, মুনি-ঋষি, নর আনন্দে মহাদেবের
জয়ধ্বনি করতে লাগল। এদিকে মহাদেবের শূলে বিদ্ধ অন্ধকের মনে তখন সাত্ত্বিক ভাবের
উদয় হল, তিনি বহু স্তব ও স্তুতিতে
মহাদেবকে সন্তুষ্ট করলেন। মহাদেব তাঁকে শূল থেকে নামিয়ে মুক্তি দিলেন এবং
“প্রমথাধিপত্য[2]” দান করলেন। সেই থেকে
অন্ধক গাণপত্যে প্রতিষ্ঠিত হলেন, এবং ইন্দ্রাদি দেবতারা তাঁকে প্রণাম করলেন।
(লিঙ্গপুরাণ/৯৩)
জলন্ধর – পুরাকালে জলন্ধর এক প্রবল পরাক্রমী অসুর ছিলেন। সেই অসুর দেব, দানব, যক্ষ, রাক্ষস, পন্নগ এমনকি স্বয়ং
ব্রহ্মাকেও পরাজিত করেছিলেন। এরপর তিনি বিশ্বহর বিষ্ণুকে আক্রমণ করে, অবিরত যুদ্ধের পর
বিষ্ণুকেও পরাজিত করলেন। বিষ্ণুকে পরাজিত করে তিনি ভগবান পিনাকীকে জয় করার ইচ্ছা
নিয়ে মহাদেবের কাছে গিয়ে বললেন, “হে দেবদেব, আপনার সঙ্গে যুদ্ধ করার ইচ্ছাতেই এখানে এসেছি”। অসুরের কথা
শুনে ভগবান মহেশ্বর সমুদ্রের মধ্যে পায়ের আঙুল ডুবিয়ে ভীষণ সুদর্শন চক্র উৎপন্ন
করলেন। কিন্তু পাছে এই চক্রে ত্রিজগৎ ও দেবতারা নিহত হয় ভেবে, তিনি সমুদ্রের জলেই
চক্রটি রেখে দিলেন। এখন অসুরের কথায় হাসতে হাসতে বললেন, “ওহে অসুরেন্দ্র জলন্ধর, তুমি যদি সমুদ্র থেকে ওই
চক্র তুলে আনতে পারো, তবেই
আমি তোমার সঙ্গে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হব, নচেৎ হব না”। ভগবান মহাদেবের কথায় জলন্ধর রাগে অগ্নিশর্মা
হয়ে বললেন,
“হে শঙ্কর, গরুড় যেমন নির্বিষ
ডুণ্ডুভ (ঢোঁড়া) সাপকে অবলীলায় বিনাশ করে, সেভাবে আজ আমিও তোমাকে, নন্দীকে এবং তোমার সব
পারিষদদের সংহার করব। আমি ভগবান বিষ্ণু, ইন্দ্র, অগ্নি, যম, কুবের, বায়ু, বরুণ সকল দেবতাকেই পরাজিত
করেছি। স্বর্গে-মর্তে যুদ্ধ করার মতো কোন প্রতিপক্ষ না থাকায় একবার আমার হাত
সুড়সুড় করছিল বলে, পাহাড়ের
গায়ে হাত ঘষেছিলাম। তাতে মন্দর, শ্রীমান, নীল, সুশোভন সুমেরু পাহাড় পড়ে গিয়েছিল। মজা দেখার জন্যে আমি
হিমালয়ে একবার গঙ্গার গতিরোধ করে দিয়েছিলাম। আমার পত্নীর ভৃত্যেরা পর্যন্ত
দেবতাদের বজ্র আটকে দিয়েছে। আমি গরুড় ও বিষ্ণুকে একসঙ্গে নাগপাশে বদ্ধ রেখেছিলাম।
ইন্দ্রের পত্নী শচী এবং উর্বশী সহ সকল অপ্সরাকে কারাগারে বন্দী করে রেখেছিলাম।
ইন্দ্র আমার কাছে এসে অনেক অনুনয়-বিনয় করাতে, শচীকে ছেড়ে দিয়েছি। এ হেন মহাবীর
জলন্ধরকে তুমি চেন না?”
জলন্ধরের এই রকম আস্ফালন শুনে মহাদেব বেশ বিরক্ত হলেন। তাঁর তৃতীয়
নয়নের প্রান্ত থেকে অগ্নিকণা বের হয়ে অসুরের রথ, অশ্ব, হাতি এবং অজস্র দৈত্য দগ্ধ হয়ে
মারা গেল। জলন্ধর তাতেও ক্ষান্ত না হয়ে উন্মত্ত ক্রোধে সমুদ্র থেকে সেই চক্র তুলতে
প্রবৃত্ত হল। অতি কষ্টে সেই চক্র সে যেমনি কাঁধে তুলল, তখনি তার দেহ দু’টুকরো হয়ে, কাটা গাছের মতো, আছড়ে পড়ল মাটিতে। জলন্ধর
নিহত হওয়াতে ত্রিজগতের দেব, গন্ধর্ব, দানব এবং নর - সকলেই আনন্দে “সাধু সাধু” বলতে লাগল। এই
জলন্ধর-বিমর্দন উপাখ্যান যিনি পাঠ করবেন বা শুনবেন বা শোনাবেন, তিনি গাণপত্য লাভ করে
অপার আনন্দ ভোগ করতে পারবেন। (লিঙ্গপুরাণ/ ৯৭)
দক্ষের যজ্ঞে সতীদেবীর দেহত্যাগের পর, মহাদেব সুদীর্ঘ তপস্যায় মগ্ন
রয়েছেন, পুনর্বিবাহের কথা তাঁর
মনেও আসেনি। অন্য দিকে সতীদেবী মহাদেবকেই আবার পতিরূপে লাভ করতে নিজের ইচ্ছেয় জন্ম
নিলেন, হিমালয়-পত্নী মেনকা দেবীর
গর্ভে। এই জন্মে তাঁর নাম হল হিমালয়-দুহিতা পার্বতী। দেবী পার্বতীর যখন বারো বছর
বয়স হল, তিনি তপস্যায় প্রবৃত্তা
হলেন।
এদিকে দুর্দান্ত অসুরদের প্রথা অনুযায়ী প্রাচীনকালে তারকাসুরও দেবতাদের
পরাজিত করে তাঁদের ওপর ভীষণ অত্যাচার করছেন। কিন্তু কোন দেবতাই তাঁর পরাক্রম সহ্য
করতে পারছিলেন না, এমনকি
ভগবান বিষ্ণুও নাকি তাঁর সঙ্গে “কুড়ি হাজার বছর” ধরে, যুদ্ধ করে পরাজিত হয়েছেন।
দেবাদিদেব কঠোর তপস্যায় মগ্ন, তাঁর কাছে যাওয়া যাচ্ছে না। উদ্বিগ্ন দেবতারা তারকাসুরের
অত্যাচার থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় জানতে ভগবান ব্রহ্মার কাছে গেলেন। ভগবান ব্রহ্মা
সব শুনে বললেন,
“দেবতাদের
এই দুর্গতির কথা আমি সবই জানি। কিন্তু তাও কেন নিশ্চিন্তে আছি তোমাদের বলি।
সতীদেবী এই জন্মে গিরিরাজ হিমালয়ের কন্যা হয়ে জন্ম নিয়েছেন। তোমরা সকলে হিমালয়
কন্যা পার্বতীদেবীর সঙ্গে রুদ্র মহাদেবের বিবাহে সচেষ্ট হও। তাঁদের মিলনে বীর্যবান
এক পুত্রের জন্ম হবে, তাঁর
নাম কার্তিকেয়। তিনি ষড়ানন (ছটি মুখ) এবং দ্বাদশ বাহু নিয়ে মহা শক্তিধর বীর হবেন।
একমাত্র তাঁর হাতেই তারকাসুরের সংহার সম্ভব। তিনিই দেবতাদের সেনাপতি হয়ে
দেবসেনাপতি নাম গ্রহণ করবেন। এছাড়াও তাঁর অন্যান্য নাম হবে স্কন্দ, শাল্য, বিশাল্য, নৈগমেয় ইত্যদি”।
দেবতারা খুশি হয়ে প্রথমেই সুমেরু পর্বতের শিখরে কামদেবতার উদ্যানে
গেলেন। সেখানে কামনার দেবতা কন্দর্প ও তাঁর পত্নী রতিকে দেবরাজ ইন্দ্র সব কথা বলতে, কন্দর্প ও রতি তখনই
মহাদেবের তপস্যা স্থলে উপস্থিত হলেন। মদনদেব ও রতি সেখানে উপস্থিত হওয়ার সঙ্গে
সঙ্গেই, কঠোর তপস্যার রুক্ষ
পরিবেশ সরে গিয়ে, প্রকৃতিতে
বসন্তের স্পর্শ লাগল। হঠাৎ এই ঋতু পরিবর্তনে ভগবান ত্র্যম্বক বিস্মিত হলেন, তিনি তৃতীয় নয়ন মেলে
তপস্যারতা সুন্দরী কন্যা পার্বতীকে দেখলেন এবং এ সবের আড়ালে দেখতে পেলেন মদনদেবকে।
তাঁর মনে চঞ্চলতা আনার জন্যে এসব মদনদেবেরই কারসাজি বুঝে, তিনি তৃতীয় নয়নের অগ্নিতে
মদনদেবকে দগ্ধ করে ফেললেন। স্বামীর মৃত্যুতে শোকাতুরা রতি মহাদেবের চরণে বিলাপ
করাতে, মহাদেব বললেন, “হে ভদ্রে, তোমার পতি অনঙ্গ
(কায়াহীন) হলেও তোমাদের দাম্পত্যে কোন বিঘ্ন ঘটবে না। ভগবান বিষ্ণু যখন সর্বজনের
হিতের জন্যে বসুদেব-তনয় বাসুদেব হয়ে মর্ত্যে জন্ম নেবেন, তাঁর পুত্র হয়ে মদন আবার জন্ম
নেবে”। মহাদেবের বরে কিছুটা নিশ্চিন্ত হয়ে রতিদেবী তাঁর বসন্ত পারিষদদের নিয়ে
সেখান থেকে বিদায় নিলেন।
কন্দর্পের এই দুর্দশা দেখে দেবী পার্বর্তী আরও কঠোর তপস্যায় মগ্না
হলেন। এই তপস্যায় সারাদিনে তিনি একট পাতাও মুখে দিতেন না, এই কারণে তাঁর নাম হল অপর্ণা।
তাঁর এই কঠোর তপস্যায় মহাদেব বিচলিত হলেন এবং সন্তুষ্টও হলেন। তিনি ব্রাহ্মণের
বেশে দেবী অপর্ণার আশ্রমে গেলেন। অলৌকিক দিব্য লক্ষণাদি দেখে দেবী তাঁকে মহেশ্বর
বলে চিনতে পেরে পূজা ও স্তব করলেন। মহাদেব তখন স্বরূপ ধারণ করে স্মিতমুখে বললেন, “হে দেবি, সকলকে আমাদের লীলা
দেখানোর জন্যেই তোমার বিবাহের স্বয়ংবরে, আমি তোমার সঙ্গে মিলিত হব”। এই কথা বলে তিনি নিজের আশ্রমে চলে গেলেন, দেবী পার্বতীও তপস্যা
ভঙ্গ করে ফিরে এলেন পিতৃগৃহে।
দেবী পার্বতী ঘরে ফিরে আসাতে মাতা মেনকা ও পিতা গিরিরাজ আনন্দে বিহ্বল
হলেন এবং কন্যার মুখে দেবাদিদেবের মন্ত্রণার কথা শুনে সর্বলোকে কন্যার স্বয়ংবর
ঘোষণা করলেন। সেই সভায় ব্রহ্মা, বিষ্ণু থেকে সকল দেবতাই উপস্থিত হলেন। সর্ব অলংকারে ভূষিতা
গিরিকন্যা যখন সভায় উপস্থিত হলেন, তাঁর সঙ্গী ছিলেন কল্পদ্রুম-পুষ্পের মালা হাতে জয়া এবং
ব্যজন (চামর) হাতে বীজন করছিলেন বিজয়া। সভাস্থলে দেবী পার্বতী যখন বরমাল্য হাতে
নিলেন, তখন অকস্মাৎ ভগবান মহাদেব
লীলা করার ইচ্ছায় শিশুরূপ ধারণ করে তাঁর কোলে শুয়ে পড়লেন। এই দৃশ্য দেখে উপস্থিত
দেবতারা সকলেই ক্ষুব্ধ হলেন, এই শিশু কে? দেবরাজ ইন্দ্র শিশুকে হত্যা করার জন্যে বজ্র নিক্ষেপ করতে
উদ্যত হতেই,
শিশুর হাতের
ইঙ্গিতে ইন্দ্র পুতুলের মতো নিঃসাড় হয়ে গেলেন। এভাবেই যে যে দেবতা তাঁদের অস্ত্র
হাতে শিশুকে আঘাত করতে উদ্যত হলেন, সকলেই স্থির, নিশ্চেষ্ট, স্পন্দনহীন হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। দেবতাদের এই অদ্ভূত দুর্দশা
দেখে ব্রহ্মা ধ্যানমগ্ন হলেন এবং জানতে পারলেন, ওই শিশুই ভূতভাবন ভূতপতি মহেশ্বর।
তিনি তখন উঠে দাঁড়িয়ে শিশু দেবাদিদেবকে নমস্কার করে, তাঁর স্তব ও স্তুতি করতে লাগলেন।
তারপর ব্রহ্মা সকল স্তম্ভিত দেবতাদের উদ্দেশে বললেন, “ওহে দেবতাগণ, দেবাদিদেব মহেশ্বর যে
শিশুরূপে এখানে উপস্থিত হয়েছেন, তা তোমাদের কেউই বুঝতে পারোনি? অতএব তোমরা সকলেই মূঢ় প্রতিপন্ন
হয়েছ। এখন সকলে মহেশ্বর ও মহেশ্বরীর শরণাপন্ন হও। দেবতারা সকলেই মোহমুক্ত হয়ে
দেবাদিদেব শঙ্কর ও দেবী পার্বতীকে ভক্তিভরে প্রণাম করলেন এবং নানান স্তবস্তুতিতে
তাঁদের অর্চনা করলেন।
এরপর বহুবিধ আড়ম্বরে সকল দেবতাদের উপস্থিতিতে উভয়ের বিবাহ সম্পন্ন হল
এবং যথাকালে তাঁদের পুত্র কার্তিকেয়র জন্ম হওয়ার পরে, বালক কার্তিকের হাতেই তারকাসুর
নিহত হল (লিঙ্গপুরাণ/১০১, ১০২, ১০৩)।
এই কাহিনী নিয়ে কোন মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন, কিন্তু একটা বিষয় বেশ উপভোগ্য।
দেবরাজ ইন্দ্র অসুর ও দৈত্যদের সঙ্গে যুদ্ধে প্রায়শঃ পরাজিত ও স্বর্গ থেকে বিচ্যুত
হয়ে পরিত্রাণের জন্য ত্রিদেবের শরণ নিয়ে থাকেন। কিন্তু এক্ষেত্রে দেবী পার্বতীর
কোলে থাকা একটি শিশুকে বধ করার জন্য তাঁকে প্রথমেই হাতে বজ্র তুলে নিতে হল! আবার
শিশুরূপী দেবাদিদেবের হাতের ইশারায় তিনি একেবারে জড়বৎ পুতুল হয়ে গেলেন! দেখা
যাচ্ছে ভাগবত এবং শৈব - উভয় পুরাণকারই সুযোগ পেলেই বৈদিক দেবরাজ ইন্দ্রকে অপদস্থ
করতে দ্বিধা করেননি।
চলবে...
[1] সম্ভবতঃ
সত্যযুগে– এই সময়েই বিখ্যাত অসুর এবং দৈত্যদের সংহার করে আর্যরা তাদের আধিপত্য
বিস্তার করছিলেন, এই
অসুর, দৈত্য, দানব সকলেই যে অবৈদিক
অনার্য সেকথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।
[2] প্রমথাধিপত্য>প্রমথদের আধিপত্য – প্রমথ
মানে ভূত বা প্রেত – মহাদেবের পারিষদদের “গণ” বলা হত, গণপতি তাদের প্রধান।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন