এই সূত্রে - " ঈশোপনিষদ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "
এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১ "
ঋষিদের বংশ পরিচয়
শ্রী মৈত্রেয় বললেন, “শতরূপার
গর্ভে স্বায়ম্ভূব মনুর আকূতি, দেবহূতি ও প্রসূতি, এই তিন কন্যা ও দুই পুত্রের জন্ম
হয়েছিল। মহারাজ মনু, শতরূপার অনুমিতি নিয়ে পুত্র বর্তমান থাকা সত্ত্বেও
পুত্রিকাধর্ম মতে কন্যা আকূতিকে ঋষি রুচির হাতে সম্প্রদান করেছিলেন। পুত্রিকাধর্ম
কী, সে কথা বলছি। কন্যাকে সম্প্রদান কালে পিতা যদি
বলেন, আমার এই কন্যার কোন ভ্রাতা নেই, এই সালঙ্কারা কন্যাকে আমি সম্প্রদান করছি;
কিন্তু এই কন্যার গর্ভে যে পুত্র সন্তান হবে, সেই পুত্র আমার পুত্র হবে; সেই
সম্প্রদানকে পুত্রিকাধর্ম বলে। মনুর পুত্র থাকলেও, তিনি বহু পুত্রের কামনায় এই রকম
করেছিলেন। ব্রহ্মতেজা প্রজাপতি রুচি আকূতির গর্ভে এক পুত্র ও এক কন্যার সৃষ্টি
করলেন। পুত্রের নাম যজ্ঞ, তিনি যজ্ঞরূপী ভগবান বিষ্ণু, আর কন্যার নাম দক্ষিণা,
তিনি সাক্ষাৎ লক্ষ্মীদেবীর অক্ষয় অংশস্বরূপা। স্বায়ম্ভূব মনু দৌহিত্র যজ্ঞকে নিজের
সঙ্গে নিয়ে গেলেন, কিন্তু দক্ষিণা পিতার আলয়েই থেকে গেলেন। ভগবান যজ্ঞরূপী বিষ্ণু
দক্ষিণাকে বিবাহ করেন এবং তাঁদের দ্বাদশ পুত্র হয়। এই দ্বাদশ পুত্রের নাম, তোষ,
প্রতোষ, সন্তোষ, ভদ্র, শান্তি, ইড়াপতি, ইষ্ম, কবি, বিভু, স্বাহ্ন, সুদেব ও রোচন। স্বায়ম্ভূব মনুর অধিকারে অর্থাৎ
মন্বন্তরে এই দ্বাদশ পুত্র “তুষিত” নামে দ্বাদশ দেবতা হয়েছিলেন। এই মন্বন্তরে
মরীচি প্রমুখ ঋষি, রুচিপুত্র যজ্ঞ শ্রীহরির অংশ অবতার ও ইন্দ্র হয়েছিলেন।
প্রিয়ব্রত ও উত্তানপাদ এই দুই মুনিপুত্র নরপতি হয়েছিলেন। এই দুই নরপতির পুত্র ও
পৌত্রেরা এই মন্বন্তর পালন করেছিলেন।
হে বিদুর, স্বায়ম্ভূব মনু ও তাঁর
স্ত্রী শতরূপার কন্যা দেবহূতি ও তাঁর পতি ঋষি কর্দমের কথা, তোমাকে আগেই বর্ণনা
করলাম। মহর্ষি কর্দমের নয়টি কন্যা যে নয়জন ব্রহ্মর্ষির পত্নী হয়েছিলেন, সেকথাও
আগেই বলেছি। এখন তাঁদের পুত্র পৌত্রদের কথা বলছি, শোন। কর্দমকন্যা কলাদেবীর গর্ভে মরীচির,
কশ্যপ ও পূর্ণিমা এই দুই পুত্রের জন্ম হয়। এঁদের বংশেই জগৎ পরিপূর্ণ হয়েছিল।
পূর্ণিমার বিরজ ও বিশ্বগ নামে দুই পুত্র ও দেবকুল্য নামে এক কন্যা হয়। এই কন্যাই
শ্রীহরির চরণ ধোয়ার পুণ্য প্রভাবে, অন্য জন্মে সুরসরিৎ গঙ্গা হয়েছিলেন। অত্রি
পত্নী অনসূয়া, দত্ত, দুর্বাসা ও সোম এই তিন যশস্বী পুত্রের জন্ম দেন। তার মধ্যে
দত্ত বিষ্ণুর অংশে, দুর্বাসা রুদ্রের অংশে এবং সোম ব্রহ্মার অংশে আবির্ভূত
হয়েছিলেন”।
শ্রীবিদুর বললেন, “হে গুরুদেব,
সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয়কারী তিন দেবশ্রেষ্ঠ কি উদ্দেশে অত্রির গর্ভে জন্ম
নিয়েছিলেন, দয়া করে বলুন”।
শ্রী মৈত্রেয় বললেন, “ব্রহ্মার
কাছে সৃষ্টি করার আজ্ঞা পেয়ে অত্রি পত্নীকে নিয়ে ঋক্ষ নামক কুলপর্বতে গেলেন এবং
সেখানে সৃষ্টির উদ্দেশে তপস্যায় ব্রতী হলেন। তিনি প্রাণায়ামে মন সংযত করে সর্বদা
চিন্তা করতেন, যিনি জগদীশ্বর আমি তাঁর শরণাপন্ন হলাম, তিনি আমাকে তাঁর অনুরূপ
সন্তান প্রদান করুন। তাঁর তীব্র প্রাণায়াম তপস্যার ফলে, তাঁর মাথার অগ্নিপ্রভায়
ত্রিভুবন উত্তপ্ত হয়ে উঠল। তখন ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও রুদ্র তাঁর আশ্রমে উপস্থিত হলেন।
তাঁরা হংস, গরুড় ও বৃষের উপর বসেছিলেন। তাঁদের হাতে ছিল কমণ্ডলু, চক্র ও ত্রিশূল।
তাঁদের সহাস্য মুখ এবং করুণাঘন দৃষ্টি। মুনিবর অত্রি তাঁদের দণ্ডবৎ প্রণাম করলেন,
তারপর করজোড়ে বিনীতভাবে স্তব করে বললেন”,
শ্রীঅত্রি বললেন, “এই বিশ্বের
সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয়ের জন্য প্রত্যেক কল্পে আপনারা মায়ার প্রভাবে ব্রহ্মা,
বিষ্ণু ও গিরীশের দেহ ধারণ করে প্রকাশ হয়ে থাকেন, আপনাদের বন্দনা করি। আমি
প্রজাসৃষ্টির সঙ্কল্পে দেবশ্রেষ্ঠ একমাত্র ভগবানকে আমার চিত্তে ধারণ করেছিলাম।
আপনাদের মধ্যে তিনি কে, আপনারাই আমাকে তার আদেশ দিন। আপনারা দেহীদের মনের অগোচর
হয়েও, কী করে একসঙ্গে সকলে এখানে এলেন? আমি অত্যন্ত অবাক হয়েছি, আপনারা দয়া করে
আমাকে বলুন”।
শ্রী মৈত্রেয় বললেন, “বৎস বিদুর,
সেই তিন শ্রেষ্ঠদেবতা অত্রির কথায় সন্তুষ্ট হয়ে সহাস্যমুখে বললেন, “হে ব্রহ্মন,
তুমি সত্যসঙ্কল্প, সেই কারণে তুমি যা সঙ্কল্প করেছ, তার অন্যথা হবে না। তুমি যে
একমাত্র ঈশ্বরতত্ত্বের ধ্যান করেছ, আমরা তিন হয়েও সেই একই তত্ত্ব, এই কথাটি জেনে
রাখো। বস্তুতঃ আমাদের মধ্যে কোন প্রভেদ নেই। হে মুনিবর, তোমার মঙ্গল হোক, আমাদের
অংশে তোমার তিন পুত্রের জন্ম হবে এবং তারা লোক বিখ্যাত হয়ে তোমার যশ বিস্তার করবে”। এই বর প্রদান করে, তিন সুরেশ্বর,
অত্রি দম্পতির পূজা গ্রহণ করলেন এবং তাঁদের সামনেই অন্তর্হিত হয়ে গেলেন। এরপর
ব্রহ্মার অংশে সোম, শংকরের অংশে দুর্বাসা ও বিষ্ণুর অংশে যোগবিৎ দত্ত জন্ম গ্রহণ
করেছিলেন।
[দুর্বাসা মুনি বিখ্যাত তাঁর ক্ষণক্রোধের জন্য, তাঁর কথা বহুবার আসবে এই পুরাণে, দত্ত বা যোগী দত্তাত্রেয়র কথাও আসবে যথা সময়ে।]
এখন অঙ্গিরার বংশবিস্তার বর্ণনা
করি। অঙ্গিরা পত্নী শ্রদ্ধা চার কন্যা প্রসব করেন, তাঁদের নাম সিনীবালী, কূহু,
রাকা ও আনুমতি। এছাড়া তাঁদের দুই পুত্রও হয়, তাঁরা “স্বরোচিষ” মন্বন্তরে উতথ্য ও
বৃহষ্পতি নামে বিখ্যাত হয়েছিলেন। উতথ্য সাক্ষাৎ ভগবানের অবতার এবং বৃহষ্পতি
ব্রহ্মনিষ্ঠ ছিলেন। পুলস্ত্য ও তাঁর পত্নী হবির্ভূ অগস্ত্য ও বিশ্রবা, এই দুই
পুত্রের জন্ম দেন। অগস্ত্য জন্মান্তরে জঠরাগ্নি ও বিশ্রবাঃ মহাতপা হয়েছিলেন।
বিশ্রবার প্রথমা পত্নী ইলবিলার পুত্র যক্ষপতি দেব কুবের এবং দ্বিতীয়া পত্নী
কেশিনীর পুত্র রাবণ, কুম্ভকর্ণ ও বিভীষণ।পুলহ ও তাঁর পত্নী গতিদেবীর তিন পুত্র,
তাঁদের নাম কর্মশ্রেষ্ঠ, বরীয়ান ও সহিষ্ণু। ক্রতু ও তাঁর পত্নী ক্রিয়াদেবীর
ষাটহাজার বালখিল্য ঋষিপুত্র জন্মগ্রহণ করেছিল, তাঁরা সকলেই ব্রহ্মতেজে প্রোজ্জ্বল।
হে বিদুর, বশিষ্ঠ ও উর্জাদেবীর চিত্রকেতু প্রমুখ সাত পুত্র হয়। তাঁরা সপ্তর্ষি
হয়েছেন। এই সপ্তর্ষির নাম চিত্রকেতু, সুরোচি, বিরজা, মিত্র, উল্বণ, বসুভৃদ্যান ও
দ্যুমান্। শক্তৃ প্রমুখ তাঁর অন্য পত্নীর পুত্র। অথর্বার পত্নী চিত্তি, তাঁদের
একটিমাত্র পুত্র তপোনিষ্ঠ দধীচি বা অশ্বশিরা।
এখন মহাভাগ ভৃগুর বংশ বর্ণনা করছি। মহাভাগ ভৃগু ও তাঁর পত্নী খ্যাতিদেবীর দুইপুত্র ও এক কন্যা। দুই পুত্রের নাম ধাতা ও বিধাতা এবং কন্যার নাম শ্রী। ধাতা ও বিধাতা মেরুকন্যা আয়তি ও নিয়তিকে পত্নীরূপে স্বীকার করেছিলেন। তাঁদের মৃকণ্ড ও প্রাণ নামে দুই পুত্র হয়। এই মৃকণ্ডের পুত্রই মার্কণ্ডেয় এবং মুনি বেদশিরা প্রাণের পুত্র। ভৃগুর কবি নামে আরেক পুত্র ছিলেন। উশনা অর্থাৎ শুক্রাচার্য তাঁরই পুত্র। এই সকল মুনি জগতে সৃষ্টি করে লোক বিস্তার করেছিলেন। বৎস বিদুর, তোমার কাছে কর্দমের দৌহিত্র বংশ বর্ণনা করলাম, এই কথা শুনলে সকল পাপমুক্ত হওয়া যায়।
দক্ষের ষোলটি কন্যা
এবার তাঁর অন্য কন্যা প্রসূতির
কথা বলব, শোনো। ভগবান মনু তাঁর এই কন্যাকে ব্রহ্মার পুত্র দক্ষকে সম্প্রদান
করেছিলেন। এই প্রসূতির গর্ভে সর্বগুণসম্পন্না, সুন্দরী ষোলটি কন্যার জন্ম হয়েছিল। এই কন্যাদের মধ্যে শ্রদ্ধা,
মৈত্রী, দয়া, শান্তি, তুষ্টি, পুষ্টি, ক্রিয়া, উন্নতি, বুদ্ধি, মেধা, তিতিক্ষা,
হ্রী ও মূর্তি এই তেরজন কন্যার সঙ্গে ধর্মের পরিণয় হয়েছিল। এই কন্যারা ধর্মের
পত্নী হয়ে যথাক্রমে, ঋৎ, প্রসাদ, অভয়, সুখ, মুদ, স্ময় অর্থাৎ ধর্মে উৎসাহ, যোগ,
দর্প, অর্থ, স্মৃতি, ক্ষেম, প্রশ্রয় ও নর-নারায়ণ দুই ঋষিকে প্রসব করেছিলেন। জননী
মূর্তির দুই পুত্র নর-নারায়ণ ঋষির প্রসবকালে সমস্ত জগৎ প্রসন্ন হয়েছিল। সমস্ত দিক,
সকল জীব, বায়ু, নদী, সরোবর ও পাহাড়-পর্বত প্রসন্ন হয়েছিল। এই দুই ঋষির আবির্ভাবে
স্বর্গে তূর্যধ্বনি ও সেখান থেকে পুষ্পবৃষ্টি হয়েছিল। মুনিরা আনন্দে স্তব
করেছিলেন, গন্ধর্ব ও কিন্নররা এই দুই ঋষির গুণ কীর্তন করেছিলেন এবং স্বর্গের
নারীরা আনন্দে নৃত্য করেছিলেন। সে সময়ে সর্বত্র পরম মঙ্গলের ভাব অনুভূত হয়েছিল।
[সহোদর এই দুই ভ্রাতা - নর ও নারায়ণ ঋষিই নাকি দ্বাপরে অর্জুন ও শ্রীকৃষ্ণ রূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন। ভক্তদের বিশ্বাস তাঁদের এই কলিযুগেও আবির্ভাব হয়েছিল বিবেকানন্দ ও শ্রীরামকৃষ্ণ রূপে। অর্থাৎ পুরাণ আজও রচিত হয়ে চলেছে।]
হে বিদুর, এই দুই নর ও নারায়ণ
শ্রীহরির অংশ। ব্রহ্মা ও অন্যান্য দেবতারা তাঁদের স্তব করে বলেছিলেন, “মহাশূণ্যের
মধ্যে নিজের মায়ায়, শ্রীহরি এই সমস্ত বিশ্বকে নিজের আত্মাতে সৃষ্টি করেছেন। আজ ভক্তদের কাছে সেই আত্মাকে
প্রকাশ করার জন্যেই ধর্মের গৃহে, মূর্তির কোলে দুই ঋষির মূর্তিতে স্বয়ং শ্রী হরি
অবতীর্ণ হলেন। আমরা এই পরমপুরুষকে প্রণাম করি। যাঁর দুই করুণাঘন নয়ন পদ্মের পবিত্র
পাপড়িকেও লজ্জা দেয়, যাঁর দৃষ্টিতে দেবীলক্ষ্মীর স্থায়ী নিবাস, সেই পরমপ্রভু
আমাদের প্রতি করুণা দৃষ্টি দিন। শ্রীহরির এই মহান তত্ত্ব আমরা পরোক্ষভাবে অর্থাৎ
শুধুমাত্র শাস্ত্রচর্চা থেকেই পাই, এখন তাঁর সাক্ষাতে আমরা কৃতার্থ হলাম”। দেবতাদের দর্শন দিয়ে এবং তাঁদের
এই স্তুতিতে প্রসন্ন হয়ে দুই ঋষি গন্ধমাদনে চলে গেলেন। শ্রীহরির অংশর সেই দুই ঋষি এখন এই যুগেও আবার
অবতীর্ণ হয়েছেন, পৃথিবীর অধর্মের ভার হাল্কা করার জন্যে। তাঁরা হলেন যদুশ্রেষ্ঠ
শ্রীকৃষ্ণ এবং কুরুশ্রেষ্ঠ শ্রীঅর্জুন।
হে বিদুর, প্রজাপিতা দক্ষ ও
প্রসূতির ষোলোটি কন্যার মধ্যে ধর্মেরপত্নী তেরটি কন্যার কথা বললাম। এক কন্যা
স্বাহাদেবীর পাণিগ্রহণ করে ছিলেন অগ্নি। এই অগ্নি ও স্বাহাদেবী তিন পুত্রের নাম পাবক, পবমান ও শুচি। এঁরা প্রত্যেকেই
যজ্ঞের হবিঃ ভোজন করে থাকেন। এই তিন পুত্রের পঁয়তাল্লিশটি পুত্র জন্মে ছিল। এই
পুত্ররা, তাঁদের তিন পিতা ও পিতামহ অগ্নি মিলে মোট ঊণপঞ্চাশ সংখ্যক হয়েছেন, বৈদিক
কর্মে ও যজ্ঞে এঁরা সকলেই অগ্নি।
পিতৃগণের মধ্যে “অগ্নিষ্বাতাঃ”, “বহির্ষদঃ”,
“সৌম্যাঃ” ও “আজ্যপাঃ”ই প্রধান। এঁদের মধ্যে যাঁদের উদ্দেশে অগ্নিতে হোম করা হয়,
তাঁদের সাগ্নিক বলে, আর যাঁদের জন্যে অগ্নি ছাড়াই হোম করা হয়, তাঁদের বলে অনগ্নি।
দক্ষ কন্যা স্বধা এই পিতৃগণের পত্নী ছিলেন। স্বধার গর্ভে বয়ুনা ও ধারিণী নামে দুই
কন্যার জন্ম হয়, এই কন্যা দুইজনেই জ্ঞানবিজ্ঞানে পারদর্শিনী ও ব্রহ্মবাদিনী ছিলেন।
দক্ষ কন্যা সতীদেবী ছিলেন মহাদেবের পত্নী। তিনি স্বামীর প্রতি একান্ত ভক্তিমতী হওয়া সত্ত্বেও, তিনি কোন সন্তান লাভ করতে পারেন নি। তাঁর পিতা দক্ষ নিরপরাধ মহাদেবের সঙ্গে অকারণ বিরুদ্ধাচরণ করাতেই, তিনি পিতার প্রতি ক্রোধে স্বয়ং দেহত্যাগ করেন।
বিদুর বললেন, মহাদেব ভব সাধুব্যক্তিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ এবং
দক্ষ তাঁর কন্যার প্রতি যথেষ্ট স্নেহবৎসল হওয়া সত্ত্বেও এমন ঘটনা কি করে হল, দয়া
করে বর্ণনা করুন। দক্ষ কেনই বা নিজের মেয়ে ও জামাইকে অনাদর করলেন? যে মহাদেব
চরাচরগুরু, জগতে যাঁর সঙ্গে কারও শত্রুভাব নেই, তাঁর প্রতি দক্ষের মনে কেন এতটা
বিদ্বেষভাব এল, যে সতীর মতো কন্যাকে নিজের প্রাণ ত্যাগ করতে হলো?
দক্ষ-মহাদেব বিদ্বেষ
ঋষি মৈত্রেয় বললেন, বহুদিন আগে,
প্রজাপতিদের একটি যজ্ঞে অনেক মহাঋষি, মহামুনি, দেবতারা এবং অগ্নিরাও সমবেত
হয়েছিলেন। প্রজাপতি দক্ষ সেই সভায় উপস্থিত হলে, তাঁর তেজে সেই সভাস্থল উজ্জ্বল
আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। তাঁর এই দীপ্ত মহিমায় মুগ্ধ হয়ে, তাঁকে সম্মান জানানোর
জন্যে উপস্থিত মুনি ঋষি দেবতা অগ্নি সকলেই উঠে দাঁড়ালেন। উঠে দাঁড়ান নি শুধু দুজন,
ব্রহ্মা আর মহাদেব শিব। তাঁর প্রতি শিবের এই অসম্মান দেখে, দক্ষ রাগে জ্বলে উঠলেন,
তিনি ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে মহাদেবের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন,
“হে অগ্নি, মহর্ষি ও দেবগণ,
সাধুব্যক্তিদের চরিত্র কেমন হওয়া উচিৎ শুনুন। এই শিব লোকপালদের বদনাম করল।
সাধুগণের কি ভাবে আচরণ করা উচিৎ, নির্লজ্জ শিব তার কিছুই না জেনে, এই পরিবেশের
পবিত্রতা নষ্ট করে ফেলল। এই ব্যক্তি অগ্নি ও ব্রাহ্মণকে সাক্ষী রেখে আমার কন্যা সতীকে
বিয়ে করার পর, আমার পুত্রের মতোই হয়ে উঠেছে। আমার সামনে উঠে দাঁড়িয়ে আমাকে প্রণাম
করাই ওর উচিৎ ছিল, কিন্তু তা করে নি। আমার কন্যা সতীর নয়ন হরিণের মতো সুন্দর আর এর
দুই চোখ বানরের মতো। এই ব্যক্তি নগ্নগায়ে, মাথায় উৎকট জটা, ভূতপ্রেতদের সঙ্গে
শ্মশানে উন্মাদের মতো ঘুরে বেড়ায়। এই ব্যক্তি গায়ে চিতার ছাই মাখে, গয়নার মতো মড়ার
হাড়গোড় পরে। এর নাম শিব হলেও, আচারব্যবহার তমঃস্বভাব অশিবের মতো। হায়, ব্রহ্মার
কথায় আমি এই অশুচি ও দুষ্ট লোকের হাতে আমার কন্যা সম্প্রদান করে আমি ভুল
করেছি”!
দক্ষ এত কথা বললেও মহাদেব কোনরকম
উত্তর দিলেন না, চঞ্চলও হলেন না। তখন ক্রুদ্ধ দক্ষ মহাদেবকে অভিশাপ করে বললেন,
“দেবতাদের অধম এই শিব কখনো যজ্ঞের ভাগ পাবে না”। এই অভিশাপের পর দক্ষ সভা ত্যাগ
করে নিজের প্রাসাদে চলে গেলেন। মহাদেবের অনুচরদের প্রধান নন্দীশ্বরও সে সভায়
উপস্থিত ছিলেন, দক্ষ ও তাঁর অনুগামীদের প্রতি ক্রুদ্ধ নন্দীশ্বর বললেন, “ভগবান শিব
কাউকে বিদ্বেষ করেন না, কারোর সঙ্গে বিরুদ্ধ আচরণও করেন না। এই দক্ষ পশুর মতো,
কারণ প্রকৃত আত্মস্বরূপ থেকে বিচ্যুত হয়ে, সে দেহকেই আত্মা বলে মনে করছে। এই
দক্ষের মাথা, ছাগলের মাথা হয়ে উঠবে এবং এই দক্ষ অত্যন্ত স্ত্রীকামী হয়ে অবিদ্যাকেই
তত্ত্ববিদ্যা মনে করবে”। এরপর
দক্ষের অনুগামী দ্বিজদেরকে বললেন, “উপস্থিত দ্বিজগণ, যারা শিবদ্বেষী, তারা সংসারে জন্মমৃত্যু অনুভব করুক।
এই দ্বিজগণ নিজেদের দেহ আর কামনার জন্যেই বিদ্যাভ্যাস করবে, অর্থ, দেহ ও
ইন্দ্রিয়সুখের জন্যে খাদ্য অখাদ্য বিচার না করে যেখানে সেখানে ঘুরে বেড়াবে”।
সেইসময় দ্বিজগণের মধ্যে ভৃগুও
উপস্থিত ছিলেন, দ্বিজদের প্রতি এই অভিশাপ শুনে তিনিও ক্রুদ্ধ হয়ে ব্রহ্মদণ্ড শাপ
দিলেন, “যারা শিবের ব্রতধারী, যারা শিবের অনুগামী তারা বেদশাস্ত্রবিরুদ্ধ পাষণ্ডি
হয়ে উঠুক। এই মূঢ় ব্যক্তিরা সমস্ত পবিত্রতা থেকে ভ্রষ্ট হয়ে, জটা, ছাই আর হাড়গোড়
ধারণ করে শিবদীক্ষা নিক এবং সুরা ও মদ্যকে দেবতার মতো সমাদর করুক। যে বেদমার্গ
পরমমঙ্গলময় ও সনাতন, যে বেদমার্গের মূল স্বয়ং ভগবান জনার্দন, যে বেদমার্গ
প্রাচীনকাল থেকে ঋষিগণ আশ্রয় করে আছেন, সেই পরমশুদ্ধ বেদমার্গের নিন্দা করার কারণে
শিবের অনুচরগণের পাষণ্ডপথে পতন হোক”।
শ্রী মৈত্রেয় বললেন, “উভয়পক্ষের
এই নিন্দাবাক্য ও অভিশাপবাক্য শুনে ভগবান ভব বিষণ্ণ মনে তাঁর অনুচরদের নিয়ে
যজ্ঞসভা ত্যাগ করলেন”।
[একটু আগে মৈত্রেয় মহাশয় বলেছিলেন, ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও গিরীশ তিন শ্রেষ্ঠ দেবতা, কিন্তু এখানে দেখা যাচ্ছে প্রজাপতি দক্ষ শ্বশুর হিসাবে শিবের থেকে যথোচিত সম্মান পাননি বলে, তাঁকে যাচ্ছেতাই অপমান করলেন। তাঁর সঙ্গে মহর্ষি ভৃগুও অপমান করলেন, তাচ্ছিল্য করলেন এবং অভিশাপও দিলেন। এই পুরাণে ভৃগু পরম বিষ্ণুভক্ত অথচ লিঙ্গপুরাণ ও অন্যান্য শিব পুরাণগুলিতে দেখা যায় ভৃগুর মতো শিবভক্ত এই ধরাধামে আর কেউ নেই। বেশ মজার ব্যাপার না?]
চলবে...
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন