প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "
দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "
তৃতীয় ধারাবাহিক উপন্যসের প্রথম পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "
চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ "
পঞ্চম ধারাবাহিক উপন্যাস প্রথম পর্ব - "স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "
সম্পুর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "; "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "
চব্বিশে জুলাই, ২০২৬, সোমবার
আজ পাঁচদিন হল অবিনদাদু
ডাক্তারকাকুর নার্সিং হোমে, রয়েছেন। ঊণিশ তারিখ সকালেই তাঁকে নার্সিং হোমের ভর্তি
করা হয়েছিল। তিনদিন মানে বাহাত্তর ঘন্টা নার্সিংহোমের আইসিইউতে ছিলেন। ওই তিনদিন ডাক্তারকাকু
দিনে প্রায় কুড়ি ঘন্টা নার্সিং হোমেই থাকতেন। বলা বাহুল্য তার অধিকাংশ সময়টাই থাকতেন
অবিনদাদুর পাশে। উনি প্রতিনিয়ত দাদুর স্বাস্থ্যের
অবস্থা মনিটর করতেন। এই পাঁচটা রাত অহীন নার্সিংহোমের লবিতেই কাটিয়েছে, এবং লক্ষ্য
করেছে ডাক্তারকাকুর উদ্বেগ আর ব্যস্ততা। প্রথম তিনদিন মহীন তার সঙ্গে ছিল। কিন্তু
গত পরশু তাকে ফিরে যেতে হয়েছে নিজের কর্মস্থলে।
গতকাল সকাল সাড়ে সাতটায় আইসিইউ
থেকে বেরিয়ে ডাক্তারবাবু ওঁনার চেম্বারে যখন অহীনকে ডাকলেন, অহীনের বুকটা ধড়াস করে
উঠেছিল। এসময় ডাক্তারকাকু তো ডাকেন না। কিছু খারাপ খবর নয়তো?
অহীন সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে
ডাক্তারকাকুর চেম্বারে ঢুকতেই, ডাক্তারকাকু উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন, “এস এস অহীন, তোমার
দাদু তো মিরাক্ল্ দেখিয়ে দিলেন! ভাবা যায় না। সেই ঠাকুর, সিদ্ধানন্দ না কী যেন, প্রবীণকাকুর
বাবা-মার গুরুদেব, তাঁর এলেমও অসাধারণ। সে যুগে এমন একটা কীর্তি করে ফেললেন –
ভাবলেই কেমন যেন গায়ে কাঁটা দিচ্ছে – প্রাচীন ভারতের আয়ুর্বেদশাস্ত্র বা ভেষজবিজ্ঞান
বা তুকতাক যাই বল, এত উন্নত ছিল? নিজের চোখে সবকিছু দেখেও বিশ্বাস হচ্ছে না, মনে
হচ্ছে স্বপ্ন... ”।
অহীন অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল
ডাক্তারকাকুর মুখের দিকে। সে বুঝতে পারছিল, তেমন কোন দুশ্চিন্তার খবর নয়। নিজের
আবেগ আর উত্তেজনায় তিনি এতটাই ডুবে আছেন যে, আসল খবরটা সরাসরি বলে দিলে, অহীন যে
নিশ্চিন্ত হয়ে যায় – সে কথাটাই ভুলে গেছেন। অহীন খুব শান্তস্বরে জিজ্ঞাসা করল,
“দাদু এখন কেমন আছেন, কাকু?”
উচ্চস্বরে হেসে উঠলেন ডাক্তার
সরকার, বললেন, “ভাল আছেন মানে? সত্যি বলতে নবীনদা, মানে তোমার বাবার থেকেও অনেক
ভালো এবং সুস্থ আছেন। নবীনদার তো হার্টের ব্যারাম, রক্তে গ্লুকোজের হিসেবটাও মাঝে
মাঝে গোলমাল করে ফেলছেন। কিন্তু অবিনদাদু একদম চাঙ্গা...। দাঁড়াও চা বলি, তুমি খাবে
তো”? টেবিলের পাশে কলিংবেলের সুইচ টিপে বললেন, “কটা দিন যা গেল না, দেখেছ তো! খুব
দুশ্চিন্তার মধ্যে ছিলাম...”। বেলের আওয়াজে প্রভাকরদা ঘরে ঢুকতে ডাক্তার সরকার
বললেন, “প্রভাকর, ভালো করে চা খাওয়াও তো ভাই...দুটো...”।
প্রভাকরদা চলে যেতে, ডাক্তার
সরকার, টেবিলে রাখা পেপার ওয়েটটা নাড়াচাড়া করতে করতে বললেন, “সব থেকে আশ্চর্য কী
জান? অবিনদাদুর বয়েস বাড়েনি। প্রবীণকাকু বলেছিলেন, ঠাকুর সিদ্ধানন্দ অবিনদাদুকে
যখন সমাধিস্থ করেন, তখন ওঁনার বয়েস সতের/আঠারো। এখনও ওঁনার বয়েস ওই আঠারোতেই থমকে
আছে”। একটু থেমে অহীনের দিকে তাকিয়ে চোখ নাচিয়ে বললেন, “অহীন, তোমাদের দাদুর বয়েসের
হিসেব একশ হতে পারে, কিন্তু শরীর স্বাস্থ্যে তোমার সমবয়সী। কেমন লাগছে”?
অহীন বলে উঠল “কি বলছেন, কাকু?
এ তো অবিশ্বাস্য! আপনার ডাক্তারি শাস্ত্রে এর কোন ব্যাখ্যা নেই?” ডাক্তার সরকার অহীনের
দিকে তাকিয়ে ঘাড় নাড়লেন, আর দুহাতের বুড়ো আঙুল তুলে “কাঁচকলা” দেখিয়ে বললেন, “লবডংকা,
কিস্সু নেই। রোবোট, এআই, ক্লোনসেল-টেল নিয়ে, খুব ঢাকঢোল পিটিয়ে আমরা বাহাদুরি
দেখাচ্ছি বটে, কিন্তু তোমাদের ওই ঠাকুর সিদ্ধানন্দর কাছে ও সব নস্যি”।
প্রভাকরদা একটা ট্রেতে চা এনে
দুজনের সামনে দুটো কাপ রাখল, তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ডাক্তার সরকার চায়ে চুমুক
দিয়ে বললেন, “এবার কাজের কথায় আসি। আজ থেকে ওঁনাকে সলিডফুড খাওয়ানোর চেষ্টা করব, একদম
সিম্পল্ নরম নরম ভাত, ডাল, আর নানারকম সবজি দেওয়া মাছের পাৎলা ঝোল। আর একটু পরেই আইসিইউ
থেকে জেনেরেল কেবিনে শিফ্ট্ করে দেব। আমার আশা, কাল থেকে উনি উঠে বসবেন, এবং দু
একদিনের মধ্যে হাঁটতেও পারবেন। আমি আজ থেকে একজন ফিজিওথেরাপিস্টকে বলে দেব। সকালে-বিকেলে
দুবার হাত-পা গুলো ম্যাসাজ করে দেবে”।
অহীন জিজ্ঞাসা করল, “কথাবার্তা
বলছেন?”
“বলছেন বৈকি! তবে খুবই দুর্বল
আর ক্ষীণ কণ্ঠস্বর। তাছাড়া, আমার মনে হয়, উনি নিজের অবস্থাটা ঠিক বুঝতে পারছেন না।
চেনাজানা কাউকেই তো পাশে দেখছেন না। তার ওপর আইসিইউতে নানান যন্ত্রপাতি, হাতে পায়ে
নানান টিউব... নাকে অক্সিজেনের মাস্ক ...এসব তো উনি কোনদিনই দেখেননি... এ সবের
সঙ্গে নিজেকে ঠিক রিলেট করতে পারছেন না। তিরাশি বছর যে বড্ডো বেশি সময় অহীন। গত
দশ-বিশ বছরে আমাদের জীবনে যা পরিবর্তন হয়েছে, সে কথা চিন্তা করে আমরাই অবাক হয়ে
যাই। আর ইনি তো তিরাশি বছর পার করে হঠাৎ চোখ মেলেছেন”।
“বাড়িতে কবে নিয়ে যেতে পারব?”
ডাক্তার সরকার একটু চিন্তা
করে বললেন, “দিন সাতেক দেখি...তারপর। তবে বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার আগে আমাদের আরও অনেক
কিছু চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। এখন থাক, সে সব কথা পরে হবে। এখন নিশ্চিন্তে বাড়ি
যাও, নবীনদা, প্রবীণকাকুকে খবর দাও। মহীনকেও খবর দিও। আমিও এখন একবার বাড়ি যাব..ফ্রেশ
হয়ে দশটার মধ্যেই ফিরে আসব...আজকে আমার আবার দুটো অপারেশন আছে”।
অহীন চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে
বলল, “সত্যি এ কদিন আপনার যা চলছে... আমি তাহলে আসছি, কাকু”।
ডাক্তার সরকার হাসলেন, কিছু বললেন না। ফোন তুলে কাউকে ডাকলেন।
বাড়ি ফিরে অবিনদাদুর খবর দিতেই রীতিমতো সোরগোল পড়ে গেল। সকলেই বিকেলে নার্সিং হোমে যেতে
চান। এমনকি প্রবীণবাবুও। অনেক তর্কবিতর্কের পর নবীনবাবু সাব্যস্ত করলেন, আজ তিনি
নিজে অহীনের সঙ্গে অবিনদাদুকে দেখতে যাবেন। পরিস্থিতি বুঝে আগামীকাল বাকি সবাই
যাবে। এই ব্যবস্থা অবশ্য প্রবীণবাবুর মোটেই পছন্দ হল না। তিনি অস্ফুটস্বরে বললেন,
এমন ডেঁপো ছেলে, তিনি কোনদিন কোথাও নাকি দেখেননি। হতভাগা নিজের বাপকেই তোয়াক্কা
করে না!
চলবে...
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন