ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "
ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১ "
ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "
ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "
ধর্মাধর্ম শেষ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৫/১ "
"ধর্মাধর্ম" গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -
গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২
(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)
অথবা
+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।
[এর আগের পর্বাংশ - "ধর্মাধর্ম - ৫/১৭"]
৫.৫.৫ হরি-হর
খ্রীষ্টপূর্ব শেষ শতাব্দী এবং পরবর্তী দুই শতাব্দীতে আমরা হিন্দু
ধর্মের ভাগবত এবং শৈব দুই শাখারই সুস্পষ্ট অস্তিত্ব দেখেছি। ভাগবত শাখার প্রধান দেবতা বিষ্ণু, যাঁর আরেক নাম হরি। এবং
শৈব শাখার প্রধান দেবতা শিব, যাঁর আরেক নাম হর। প্রাথমিক পর্যায়ে এই দুই শাখার মধ্যে
সহাবস্থান থাকলেও কিছুটা রেষারেষি এবং প্রতিদ্বন্দ্বীতার আভাস পাওয়া যায়
পুরাণগুলিতে। যেমন বিষ্ণু-মহিমার পুরাণগুলিতে, বিষ্ণুকেই পরমব্রহ্ম হিসাবে
প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এবং অন্যান্যরা তাঁর তুলনায় কিছুটা হলেও গৌণ।
যেমন শ্রীমদ্ভাগবতের সৃষ্টিতত্ত্বে বলা হয়েছে, যখন এই বিশ্ব একার্ণব[1] জলে নিমগ্ন ছিল, সেই সময় শ্রীনারায়ণ[2] অনন্তশয্যায় যোগনিদ্রায় শুয়ে
ছিলেন। তাঁর এই যোগনিদ্রার অর্থ, তাঁর চিৎ-শক্তি মায়া বিরহিত হয়ে, স্বরূপানন্দে নিমগ্ন ও নিষ্ক্রিয়
অবস্থায় বিরাজ করছিল। যোগনিদ্রায় সহস্র চতুর্যুগ পরিমিত কাল পার হওয়ার পর
কালশক্তির প্রভাবে তিনি সৃষ্টিক্রিয়ায় নিযুক্ত হলেন। প্রলয়ের সময় সমস্ত লোকসকল
সূক্ষ্মভাবে তাঁর শরীরেই লীন হয়ে থাকে, এখন সেই সূক্ষ্মতত্ত্ব তাঁর নাভি থেকে পদ্মকোষের আকারে উঠে
এল। সেই পদ্মকোষেই আবির্ভাব হল বেদময় ব্রহ্মার। তিনি সেই পদ্মাসনে বসে, চতুর্মুখে চারদিক
নিরীক্ষণ করেও কোন ভুবন বা জগৎ দেখতে পেলেন না। তিনি বিস্মিত হয়ে চিন্তা করলেন, এই পদ্মের কোথা থেকে
সৃষ্টি হল?
তিনি বহু
কাল অন্বেষণ করেও, এই
প্রশ্নের সমাধান খুঁজে পেলেন না। তখন তিনি সেই পদ্মাসনে যোগসমাধিতে প্রবৃত্ত হলেন।
দীর্ঘ শত বৎসর পর তাঁর যোগ সম্পন্ন হলে, তিনি নিজের হৃদয়ে উপলব্ধি করলেন, এক পুরুষ শেষনাগের শয্যায়
এবং অনন্তনাগের সহস্রফণার আচ্ছাদনে, প্রলয়-জলের উপরে শুয়ে আছেন। তাঁরই নাভি থেকে সৃষ্ট পদ্মের
উপর তিনি বসে আছেন। এবার ব্রহ্মা তাঁকে শ্রীহরি বলে চিনতে পারলেন এবং বুঝতে পারলেন
ভগবান হরির লোকসৃষ্টির ইচ্ছাতেই, এই নাভিপদ্ম এবং তিনি সৃষ্ট হয়েছেন। ব্রহ্মা এবার একনিষ্ঠ
মনে ভগবানের স্তব শুরু করলেন। দীর্ঘ তপস্যার পর, প্রকৃতি ও পুরুষের অধিপতি পদ্মনাভ
শ্রীহরি,
ব্রহ্মাকে
সৃষ্টির তত্ত্ব সকল বুঝিয়ে দিলেন এবং বললেন, “তুমি আমার থেকেই উৎপন্ন হয়েছ, অতএব তুমিও জ্ঞানশক্তি ও
ক্রিয়াশক্তির আধার। তুমি সর্ববেদময়। অতএব পূর্বকল্পের মতো সমগ্র ত্রিলোক, যা এখন আমার মধ্যেই নিহিত
আছে, সেই সব আবার সৃজন কর এবং
প্রকাশ কর”। এরপর পদ্মনাভ ভগবান শ্রী নারায়ণ রূপে অদৃশ্য হয়ে গেলেন।
(শ্রীমদ্ভাগবত/৮, ৯)।
শিব-মহিমা বর্ণিত লিঙ্গপুরাণের কাহিনী মূলতঃ একই, কিন্তু সেখানে অদ্ভূত এক
মোচড় আছে,
সেটাই
লক্ষ্য করার বিষয়। সেখানে বলা হয়েছে, পাদ্ম-কল্পের শুরুতে এই জগৎ অতি ভয়ংকর ও অন্ধকারময়
বিভাগশূণ্য একার্ণব ছিল। সেই একার্ণব জগতে একমাত্র প্রভু হরি সহস্রফণাবিশিষ্ট
অনন্তনাগের দেহ-শয্যায় অনির্বচনীয় যোগ আশ্রয় করে শুয়ে ছিলেন। অনন্তশয্যায় শয়ান
জগৎকারণ বিষ্ণু খেলাচ্ছলে নিজের নাভিদেশে একটি পুষ্কর সৃষ্টি করলেন, সেই পদ্ম শতযোজন
বিস্তীর্ণ। এই সময় সেখানে উপস্থিত হলেন চতুর্মুখ ব্রহ্মা, তিনি সুগন্ধি দিব্যপদ্ম নিয়ে
খেলায় নিরত দিব্য পুরুষকে দেখে বিস্মিত হলেন, এবং জিজ্ঞাসা করলেন, “হে সৌম্য, আপনি কে? জলের মধ্যে অনন্ত শয্যায়
শুয়ে আছেন কেন?”
তখন বিস্মিত
ভগবান অচ্যুত হরি শয্যা থেকে উঠে বসলেন এবং বললেন, “আমি জগন্নিবাস, প্রতি কল্পেই আমার এই
আশ্রয়। আমিই স্বর্গ ও পৃথিবী; আমিই পৃথিবীর পরমস্থান। কিন্তু তুমি কে? তুমি কোথা থেকে আমার কাছে
এলে, যাবেই বা কোথায়? তোমার আশ্রয় কোথায়?” ভগবান হরি এই কথা বলায়, পিতামহ তাঁকে বললেন, “শম্ভুর মায়ায় মুগ্ধ হয়ে
আমি আপনাকে চিনতে পারিনি, আপনিও আমায় চিনতে পারেননি। আপনি যেমন সৃষ্টিকর্তা ও
প্রজাপতি,
আমিও তেমনই
সৃষ্টিকর্তা ও প্রজাপতি”।
দুজনের এই রকম নানান কথোপকথনের মধ্যে সেখানে উপস্থিত হলেন শূলপাণি
মহাদেব, তিনি অনন্তশয্যার কাছে
উপস্থিত হলেন। তাঁর পায়ের আঘাতে সমুদ্রের বিক্ষিপ্ত জলকণা হয়ে উঠল মেঘ, স্থির বাতাসও হয়ে উঠল
চঞ্চল বহমান। ভগবান ভবকে সামনে দেখে বিষ্ণু বললেন, “আপনার পদভারে সমুদ্রের জল থেকে
আকাশমণ্ডলে জলধর সৃষ্টি হয়েছে। ঘ্রাণজ-বায়ু স্পন্দিত হয়ে উঠেছে। আপনি অনাদি
অন্তকৃৎ[3] ও প্রভু, আপনিই ঈশ্বর। আমি আপনার
স্তব ও উপাসনা করি। আপনিই মহাযোগের ইন্ধন, আপনি সাক্ষাৎ ধর্ম ও বরদাতা, এই জগতের হেতু। আপনি
পুরাণপুরুষ ও অব্যয়। আপনিই বীজবান, ব্রহ্মাই বীজ, আমি যোনি ও সনাতন”। বিষ্ণুর এই স্তববাক্য শুনে ব্রহ্মা
বিষ্ণুকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি যোনি, আমি বীজ, মহেশ্বর বীজবান– এই বিষয়ে আমার সংশয় হচ্ছে, হে বিষ্ণু, তুমি আমার সংশয় দূর কর”।
বিষ্ণু বললেন,
“আত্মা দুই
প্রকার – নির্গুণ ও সগুণ, এর মধ্যে নির্গুণ আত্মা অব্যক্ত এবং সগুণ আত্মাই মহেশ্বর।
হে ব্রহ্মা,
মহেশ্বরের
লিঙ্গ থেকে উৎপন্ন প্রথম বীজ তুমি। বীজস্বরূপ তুমিই আমার যোনিতে প্রতিষ্ঠিত হয়ে, কালপর্যায়ে হিরণ্ময় অণ্ড
জন্ম নিয়েছিল। জলের মধ্যেই অধিষ্ঠিত সেই অণ্ড সহস্র বছর পর দুইভাগে বিভক্ত হল, উপরের খণ্ড হল স্বর্গ, এবং অন্য খণ্ড হল পৃথিবী।
এইভাবেই জগতের সৃষ্টি সম্পাদন হয়”। (লিঙ্গপুরাণ/২০)
দুই পুরাণের সৃষ্টি কাহিনী থেকে স্পষ্টতঃই অনুমান করা যায়,
১. শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণের রচনাকাল লিঙ্গপুরাণের অনেকটাই আগে। ভাগবত
পুরাণের সৃষ্টিতত্ত্বে বিষ্ণুই পরমেশ্বর, ব্রহ্মা তাঁর অধীনস্থ সৃষ্টিকর্তা। মহেশ্বরের কোন উল্লেখই
নেই। লিঙ্গপুরাণ যখন রচনা করা হয়েছিল, সেসময় আগের পুরাণটি যথেষ্ট জনপ্রিয় এবং বহুল প্রচারিত হয়ে
গেছে। সে কারণেই লিঙ্গপুরাণের পুরাণকারকে, ভাগবত পুরাণের বিষ্ণু ও ব্রহ্মার
কাহিনী-কাঠামোর মধ্যে মহেশ্বরকে অনুপ্রবেশ করাতে হয়েছে।
২. লিঙ্গপুরাণ রচনার আগেই
বিষ্ণু পুরুষোত্তম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছেন, অতএব লিঙ্গপুরাণে সেই বিষ্ণুকে
দিয়েই বলাতে হয়েছে, মহেশ্বর
পুরুষোত্তম এবং বিষ্ণু ও ব্রহ্মা তাঁর অধীনস্থ।
অতএব এমত পরিস্থিতিতে সমাজে পূর্বপ্রতিষ্ঠিত ভাগবতদের সঙ্গে সমাজে
নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে চাওয়া শৈবদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ঘটতে থাকা খুবই স্বাভাবিক।
এই কারণেই এই পর্যায়ের শৈবরা বেশ কয়েকবার ভয়ংকর আগ্রাসী হয়ে উঠেছিলেন এবং সমাজের
শান্তিপ্রিয় মানুষের মনে তাঁদের “রুদ্র-ভৈরব”-আতঙ্কের একটা আবহ সৃষ্টি করতে
পেরেছিলেন। ভগবান বিষ্ণুর হাতে অজস্র অসুর, দৈত্য, রাক্ষস, নর নিধনের কাহিনী থাকা সত্ত্বেও, মানুষের মনে কোনদিনই তাঁর
যোদ্ধা ইমেজ গড়ে ওঠেনি, অথচ গুটিকয়েক অসুর নিধন করে, মহেশ্বর রূদ্র যোদ্ধারূপে
প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছেন। অতএব বুঝতে অসুবিধে হয় না, সামাজিক প্রতিষ্ঠা পেতে ভাগবতদের
তুলনায় শৈবদের অনেকবেশি আগ্রাসী হতে হয়েছিল, সেই স্মৃতিই সাধারণের মনে শিবের
রুদ্ররূপটি গেঁথে দিয়েছে।
যদিচ হরি ও হর ভক্ত গোষ্ঠীদের
মধ্যে এই দ্বন্দ্ব সম্ভবতঃ কোনদিনই ভয়াবহ হয়ে ওঠেনি, কিন্তু ছোটখাটো বিবাদ ও সংঘর্ষের
ঘটনা লেগেই থাকত। যে বিভেদ ও দ্বন্দ্বের অবসান করেছিলেন যুগপুরুষ শঙ্করাচার্য।
মূলতঃ তাঁর প্রচেষ্টাতেই হরি ও হর প্রায় অভিন্ন দেবতা হরি-হর আত্মারূপে হিন্দু
ভক্তদের মনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। তিনিই হিন্দুধর্মের গঠন সম্পূর্ণ এবং সম্পন্ন
করলেন, যার মূল তত্ত্ব আজও
হিন্দু সমাজে একইভাবে প্রবহমান। সেকথা সংক্ষেপে আসবে একটু পরেই।
[1] একার্ণব–এক+অর্ণব
- গোটা পৃথিবী একটিমাত্র সমুদ্রের জলে ডুবে ছিল।
[2] নারায়ণ
– নার মানে জল,
আর অয়ণ মানে
আশ্রয় – একার্ণব জলের মধ্যে তিনিই একমাত্র আশ্রয় বলে, তাঁর নাম নারায়ণ।
[3] অন্তকৃৎ
- অন্তকারক,
নাশক ।
“অনাদি অন্তকৃৎ” - যাঁর শুরু নেই অথচ যিনি প্রলয়কারী বিনাশক – অর্থাৎ ভগবান
মহাদেব।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন