মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৪১

  প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

 তৃতীয় ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ "

পঞ্চম ধারাবাহিকের শুরু - " স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "; "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "




[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - "বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৪০"


৪৬

 

সকলেই বাইরে এল। ভোরের আলো ফুটছে – পাখিদের ডাকে টের পাওয়া যাচ্ছে সকালের আগমনী।  কমলিমা দাওয়ায় বসলেন। তাঁর কোলের কাছে বসল ভুটিক আর পাশে বসল, সুরমা আর পালি। ছেলেদের সঙ্গেই বসল কবিরাজ বড়্‌বলা। কমলিমা বললেন, “সবাই মিলে চেঁচামেচি না করে একজন কেউ বল, কী রাজ্য জয় তোরা করে এলি”।

“শুরুটা তাহলে আমিই করি”, আহোক বলল, “দক্ষিণ-পূর্ব কোনের স্তম্ভে আমি ছিলাম – অতএব শুরুটা আমি সবটাই দেখেছি”। ছেলেরা কেউ কিছু বলল না, তাকিয়ে রইল আহোকের মুখের দিকে।

“ভল্লাদাদার পরিকল্পনা মতো, ওরা চারজন – ভল্লাদাদা, সুরুল, মইলি আর রামালি – পূবদিকের দরজার উল্টোদিকে ঝোপের ভেতর ঘাপটি দিয়ে বসল। ওদের সঙ্গে আমি ছিলাম, কিশনা ছিল আর গোলোকদাদা ছিল…”

“গোলোকদাদাটি আবার কে? কোথা থেকে জুটল”? কমলিমা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন।

“তা তো জানিনা জেঠিমা। ভল্লাদাদার বন্ধু এইটুকুই জানি”।

“ঠিক আছে বল”।

“কথা ছিল, গোলোকদাদা স্তম্ভের ওপরে থাকা প্রহরীদের মারলেই, আমি আর কিশনা চটপট সেই স্তম্ভে উঠে চারদিকের পরিস্থিতি দেখে সংকেত দেব। তারপর ভল্লাদারা ভেতরে ঢুকবে। আমি উঠে গেলাম দক্ষিণপূর্ব স্তম্ভে, কিশনাও নির্বিঘ্নে উত্তর-পূর্ব স্তম্ভে চড়ে পড়ল। আমি উঠে দেখলাম, ওখানে মাত্র চারজন প্রহরী রয়েছে – অথচ আমাদের কাছে নিশ্চিত সংবাদ ছিল, ওই দরজার কাছে ছজন থাকে। একটু  সন্দেহ হলেও আমি সংকেত দিলাম – এবং ওপর থেকে ভল্লা ছুঁড়ে এক জনকে, শেষ করলাম। ভল্লাদাদারা শেষ করল দরজার সামনের দুজনকে। বাকি একজন বিপদ বুঝে রক্ষীদের ঘরের দেওয়ালের দিকে সরে গিয়েছিল, তাকে মারল কিশনা। এরপর ভল্লাদাদারা দরজা ডিঙিয়ে ভেতরে ঢুকতে গিয়ে দেখল, দরজায় তালা নেই – আলগা ভেজানো। ওরা ভেতরে ঢুকে অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে বসে রইল। আমাদের সন্দেহ হল – রক্ষীদের দুজন হয়তো বাইরে গিয়েছে…এখনই ফিরে আসবে। হলও তাই – একটু পরেই দেখলাম একজন রক্ষী দরজা খুলে ভেতরে ঢুকছে। ভল্লাদাদাদের হাতেই তার মরণ হল। প্রায় একই সময়ে অন্য আরেকজন বেরিয়ে এল রক্ষীদের ঘরের প্রথম দরজাটা দিয়ে এবং সে ব্যাটাও মারা পড়ল সঙ্গে সঙ্গে”।

এরপরের ঘটনাগুলো আমি দেখতে পাইনি, দেখেছে কিশনা। ও ভাল বলতে পারবে”।

 

এবার সকলে কিশনার মুখের দিকে উদ্গ্রীব হয়ে তাকাল। কিশনা বলল, “আমাদের প্রথম লক্ষ্যটা নির্বিঘ্নেই শেষ হল, এবং আমরা ওপর থেকে দেখলাম ভল্লাদাদারা নিঃশব্দে – কী বলব – একদম বেড়ালের মতো দ্রুত গতিতে পূব আর উত্তরের গলির মধ্যে দৌড়ে সবকটা ঘরের শেকল তুলে দিল। তারপরের লক্ষ্য উপানুর ঘর। মইলি উপানুর অভিসার ঘরের দরজায় টোকা দিল দুবার”।

“অভিসার ঘর মানে?” কমলিমা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “আস্থানে অভিসারের ব্যবস্থাও আছে নাকি”!

কথাটা বলে ফেলে কিশনা একটু অস্বস্তিতে পড়ল। সকলের সামনে জ্যেঠিমাকে কী করে সে বলবে উপানুর জঘন্য কীর্তির কথা। তাই বলা যায় নাকি?

কিশনা বলল, “সে বড়ো নোংরা কথা। আমি তোমায় বলতে পারব না, জেঠিমা। ভল্লাদাদার থেকে জেনে নিও। এখন যা হয়েছে সে কথা বলি শোনো - ভেতর থেকে উপানুর সাড়া পেতেই – মইলি পিছিয়ে এল – রামালি আর সুরুল অস্ত্র হাতে দাঁড়াল দরজার দুপাশে আর ভল্লাদা রইল – উল্টোদিকের বাগানের ঝোপের আড়ালে।

দরজা খুলে ব্যাটা বেরোল, ওর কথা কানে এল, “কী হয়েছে - এত রা…” কথা শেষ করতে পারল না, সুরুল বল্লমের ফলাটা সজোরে বিঁধিয়ে দিল হতভাগার মুখের ভেতর – তারপর সুরুল বল্লমটা টেনে নিতে উপানুর মুখ ছেৎরে গেল। পরিকল্পনার সময় ভল্লাদাদা বলেছিল, উপানু অভিজ্ঞ রক্ষী আর ব্যাটার শক্তিও ভয়ংকর। বললে বিশ্বাস করবে না জেঠিমা…ওই অবস্থাতেও উপানু ঘর থেকে ছিটকে বেরিয়ে এল – আহত পশুর মতো চিৎকার করে দৌড়ে চলল দক্ষিণ দিকে। তার চিৎকার শুনে পশ্চিমের দরজার দুই রক্ষী ধেয়ে এল – তাদের একজন ভল্লাদাদার ভল্লর আঘাতে ছিটকে পড়ল – আর অন্যজনকে ভল্ল ছুঁড়ে শেষ করল সুরুল। কিন্তু তার আগেই দ্বিতীয় রক্ষীটা হাতের ভল্ল ছুঁড়ে মেরেছিল মইলির দিকে। সেই দেখে রামালি একধাক্কায় সরিয়ে দিল মইলিকে আর লাফিয়ে উঠে ওর বল্লমের ফলায় গেঁথে নিল উপানুর মাথা – উপানু মরল। কিন্তু দ্বিতীয় রক্ষীর ছোঁড়া ভল্লটা মইলির দাবনার একটা পাশ ছিঁড়ে দিয়ে বেরিয়ে গেল। রামালি যদি ওই মোক্ষম সময়ে মইলিকে ধাক্কাটা না দিত – হয়তো মইলির বুকেই বিঁধত ভল্লটা। খুব জোর বেঁচে গেছে মইলি”।

সকলেই রুদ্ধশ্বাসে কিশনার কথা শুনছিল, কমলিমা জিজ্ঞাসা করলেন, “তারপর?”

লোহার দরজা ঠেলে এই সময়েই ভেতরে এল দুজন। সম্পৎ আর দেবান। সম্পৎ আর দেবানের কাঁধে খাটুলা। দুজনেই অবসন্ন, ক্লান্ত এবং ক্লিষ্ট।

কমলিমা উঠে দাঁড়ালেন উদ্বেগে, বললেন, “আমাদের কেউ কি মারা গেছে, সম্পৎ? কে… কে মারা গেল?”

সম্পৎ আর দেবান উত্তর দিল না, সাবধানে খাটুলা নামাল বাঁধানো দাওয়ায়। মৃতদেহ দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেল সবাই। আহোক আর কিশনার বর্ণনায় শ্রোতারা যে আনন্দ ও উত্তেজনায় এতক্ষণ মগ্ন ছিল – তারাও এখন ম্লানমুখে দাঁড়িয়ে রইল শবদেহ ঘিরে।  

 

 

একটু পরে শবদেহ ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেদের ভিড়ের মধ্যে পথ কেটে ভেতরে এল ভল্লা, সুরুল আর রামালি। ভল্লা কাছে এসে কবিরাজমশাইয়ের দেহটার পাশে বসে কান্নায় ভেঙে পড়ল, বলল, “পারলাম না, রে মা। কবিরাজমশাইকে গ্রামে ফিরিয়ে আনার জন্যেই আমাদের এত দিনের আয়োজন, সে সব বৃথা হয়ে গেল”।

কমলিমায়ের দু চোখেও এখন অশ্রুর প্লাবন, বললেন, “কী করে এমন হল? ওদের রক্ষীরাই কি…”।

সুরুল বলল, “ভল্লাদাদার পরিকল্পনা মতো, আস্থানের দক্ষিণ-পশ্চিম স্তম্ভের রক্ষীকে গোলোকদাদা ভল্লা ছুঁড়ে মারল – অন্য স্তম্ভের রক্ষীরা কেউ পড়েনি – কিন্তু ওই ব্যাটা ওপর থেকে ছিটকে গিয়ে পড়ল বন্দীশালার চালে। বিকট শব্দে টালি ভেঙে নীচেয় পড়ল রক্ষীর হুমদো দেহটা। তখন কি আর জানতাম – ওই ঘরেই বন্দী আছেন কবিরাজমশাই? বাইরের অন্য রক্ষীদের শেষ করে, আমরা বন্দীশালায় ঢুকলাম। খুঁজতে খুঁজতে ওঁনাকে পেলাম ভাঙাচোরা টালি আর ওই রক্ষীর মৃতদেহের নীচে। সে সব সরিয়ে ওঁনাকে যখন বের করলাম…উনি আর নেই…”।

কমলিমা আঁচলে চোখ মুছে বললেন, “ভল্লা কাঁদিস না। ওঠ - ওঁনার সৎকারের ব্যবস্থা তোকেই করতে হবে তো”।

কান্নাভাঙা হতাশ চোখে ভল্লা তাকাল কমলিমায়ের দিকে, বলল, “তা তো করতেই হবে। ওঁনাকে প্রথমে ওঁর বাড়িতে নিয়ে যাই, মা। তারপর গ্রামের লোকেরাই ওঁর উচিৎ মতো সৎকারের ব্যবস্থা করবেন”।

সুরুল বলল, “আমিও তোমার সঙ্গে যাবো ভল্লাদাদা। যাবার সময় আমাদের গ্রাম হয়ে যাবো – আমাদের সকলের কাছেও উনি ছিলেন অত্যন্ত আপনজন”।

ভল্লা বলল, “চল, কিন্তু সবার যাওয়ার দরকার নেই – আমরা পাঁচ-ছজন গেলেই হবে। তার আগে সবাই কালো ধুতি ছেড়ে নিজেদের ধুতি পরে নে। মুখের কালিঝুলি ধুয়ে নে। সকাল হয়ে গেছে, এই চেহারা নিয়ে বাইরে বেরোন যাবে না। যারা যারা যাবি – চটপট প্রস্তুত হয়ে নে। ওরা কেমন আছে মা, মইলি, দীপান, বিশুন”।

বড়্‌বলা বলল, “চিন্তা করার কিছু নেই, ভল্লাদাদা, ওরা ভালোই আছে – ঘুমের ওষুধ দিয়েছি – ঘুমোচ্ছে।   তোমাদের সঙ্গে আমিও এখন চলে যাই ভল্লাদাদা। আজকে আমার আর কোন কাজ নেই, কাল একটু বেলা করে আসব। ক্ষত পরিষ্কার করে, নতুন প্রলেপ লাগিয়ে দিয়ে যাবো”।

ভল্লা বলল, “ঠিক আছে চলো। আমিও ততক্ষণ কালিঝুলি ধুয়ে ধড়া-চূড়ো বদলে নিই”।


চলবে...



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নতুন পোস্টগুলি

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৪১

   প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "  দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব...