এই সূত্রে - " ঈশোপনিষদ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "
এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১ "
সতীর দেহত্যাগ
শ্রীমৈত্রেয় বললেন, “এই ঘটনার পর
শ্বশুর দক্ষ ও জামাতা শিবের মধ্যে দীর্ঘকাল বিদ্বেষভাব চলতেই লাগল। ব্রহ্মা যখন
দক্ষকে প্রজাপতিগণের অধিপতি পদে অভিষিক্ত করেছিলেন, সেই সময় থেকে দক্ষের মনে
অত্যন্ত অহংকার ও গর্বের সঞ্চার হয়েছিল। আরেকবার তিনি শিব ও ব্রহ্মিষ্ঠ ঋষিদের
উপেক্ষা করে বাজপেয় যজ্ঞ ও তার পরে সর্বশ্রেষ্ঠ বৃহষ্পতিসব যজ্ঞ অনুষ্ঠানের আয়োজন
করলেন। এই যজ্ঞে তিনি সকল ব্রহ্মর্ষি, দেবর্ষি, পিতৃ ও দেবতাদের সস্ত্রীক আমন্ত্রণ
করলেন, কিন্তু শিব ও তাঁর কন্যাকে নিমন্ত্রণ করলেন না।
এদিকে দক্ষকন্যা সতী, আকাশচারী
গন্ধর্বদের থেকে পিতার যজ্ঞ মহোৎসবের কথা শুনলেন। তিনি দেখলেন, তাঁর বাড়ির সামনে
দিয়ে সুন্দরী গন্ধর্ব স্ত্রীরা সুন্দর সাজে সেজে তাঁর পিতার যজ্ঞস্থলে যাচ্ছে।
তাদের পরনে সুন্দর সাজসজ্জা, অঙ্গে দামী দামী অলংকার। এইসব দেখে, তিনি স্বামী
শিবের কাছে গিয়ে বললেন, “হে স্বামী, আমার পিতা সম্প্রতি মহোৎসবের আয়োজন করেছেন, ওই
দেখুন দেবতারা সকলে সেই অনুষ্ঠানে যাচ্ছেন। আপনার অনুমতি পেলে আমিও সেখানে যেতে
পারি। সেই অনুষ্ঠানে আমার অন্যান্য
বোনেরাও তাদের স্বামীদের নিয়ে আসবে, আমার মায়ের সঙ্গেও দেখা হবে। কতদিন মায়ের
সঙ্গে এবং আমার প্রিয় বোনেদের সঙ্গে আমার দেখা হয় না বলে, আমার মন অত্যন্ত
ব্যাকুল, আপনি দয়া করে আমাকে সেখানে যাবার অনুমতি দিন। পিতৃগৃহে কোন অনুষ্ঠানের কথা
শুনলে, কোন কন্যা স্থির থাকতে পারে, হে নাথ? তাছাড়া পিতৃগৃহে এবং শ্বশুরগৃহে যাবার
জন্যে কখনো নিমন্ত্রণের প্রয়োজন হয় না। হে প্রভু, আপনি পরম করুণাময়, আমার অভিলাষ
পূর্ণ করে, আমাকে যাবার অনুমতি দিন”।
গিরীশ প্রিয়তমা পত্নীর ব্যাকুলতা দেখে সহাস্যে বললেন, “প্রিয়ে, তুমি যে বললে নিমন্ত্রিত না হয়েও লোকে বন্ধু বান্ধবের বাড়ি যায়, সে কথা ঠিক। কিন্তু সেই বন্ধু যদি দেহের অহংকারে অন্ধ হয়ে গর্ব ও ক্রোধের বশীভূত হয়, সে বাড়িতে না যাওয়াই ভালো। বিদ্যা, তপস্যা, চিত্ত, দেহ, যৌবন ও কুল, এই ছয়টি সাধুগণের গুণ। আবার এই ছয়টি গুণ অহংকারী লোকের অধিগত হলে, এই গুণগুলিই দোষে পরিণত হয়। আমি জানি, তুমি পিতার কাছে অন্য কন্যাদের তুলনায় অত্যন্ত স্নেহভাজন, কিন্তু আমার সঙ্গে তোমার সম্পর্কের কারণে তোমার পিতা তোমাকে সমাদর করবেন না। লোকে বলে, শত্রুর তিরে শরীরে যে ক্ষত হয়, তার বেদনার থেকেও বুদ্ধিভ্রংশ বান্ধবের কটু বাক্য অনেক বেশি যন্ত্রণাদায়ক। প্রিয়ে, জ্ঞানীব্যক্তিরা সর্বদাই পরষ্পরকে যে অভিবাদন করেন, সে অভিবাদন অন্তর্যামী পরমপুরুষের জন্য, অহংকারীর দেহাভিমানের জন্যে নয়। যে বাসুদেব শব্দে বিশুদ্ধ সত্ত্বগুণ বোঝায়, ইন্দ্রিয়ের অগোচর সেই বাসুদেবকে আমি নিত্য অর্চনা করি। এই রকম আধারে মায়ার আবরণ মুক্ত পরমেশ্বরের অনুভব আসে, আমি এই শুদ্ধসত্ত্বে অধোক্ষজ। অতএব, প্রজাপতিগণের যজ্ঞসভায়, আমি নিরিপরাধ হওয়া সত্ত্বেও যিনি আমাকে কুবাক্য বলেছেন, তিনি আমার শত্রু। হে প্রিয়ে, তিনি তোমার পিতা হলেও তোমার সেখানে যাওয়া উচিৎ নয়। আমার কথা না শুনে, পিতার ভবনে গেলে, তোমার মঙ্গল হবে না। কারণ, যে স্বজনের কাছে এখন তোমার প্রতিষ্ঠা আছে, সেই স্বজনের অপমান তোমার সহ্য হবে না, তোমার কাছে মরণের তুল্য হবে”।
শ্রীমৈত্রেয় বললেন, “ভগবান
শংকরের অনুমতি না পেয়ে দেবী সতী ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। একদিকে মা ও বোনদের সঙ্গে মিলনের
ইচ্ছা, অন্যদিকে ভগবান ভবের নিষেধ, তিনি চরম দ্বিধায় ঘর বার করতে লাগলেন। তারপর
একসময়, রাগে অভিমানে অস্থির হয়ে, তিনি পিতৃগৃহে যাবার জন্যে, একলাই পথে বেরিয়ে
পড়লেন, । দেবী সতীকে একলা যেতে দেখে
মহাদেব রুদ্রের হাজার অনুচর তাঁকে অনুসরণ করে চলল। তাঁকে বৃষেন্দ্রর উপর আরোহণ
করিয়ে, তাঁর হাতে তুলে দিল গোলক, আয়না, লীলাকমল ও অনেক পুতুল। অনুচরেরা তাঁর মাথায়
ধরল শ্বেত ছত্র, তাঁকে ব্যজন করতে লাগল, তাঁর যাত্রা পথে বাজাতে লাগল দুন্দুভি,
শঙ্খ আর বাঁশি।
[পতির উপর রাগ করে বালিকা সতী বাপের বাড়ি চললেন... কিন্তু কেন বালিকা বললাম, কারণ তাঁর অনুচরেরা তাঁর হাতে তুলে দিলে গোলক ( অর্থাৎ খেলার বল), অনেক পুতুল, আয়না আর লীলাকমল... আমার ছোটবেলায় দিদিমার মুখে শুনেছি তিনিও নাকি এমনই নানান উপকরণ নিয়ে যাওয়া আসা করতেন। বালিকা বধূর পতিগৃহে যাত্রার সময় নানান খেলনা-পুতুল সামগ্রী বহন করা, এমনকি বিবাহের তত্ত্বেও শ্বশুরবাড়ি থেকে বালিকার আনন্দের জন্যে নানান পুতুল দেওয়ার প্রচলন ছিল। অর্থাৎ পুরাণে উল্লিখিত প্রায় ১৪০০ বছরের ট্র্যাডিশন আজ থেকে একশ/দেড়শ বছর আগে পর্যন্ত প্রবহমান ছিল।]
পিতা দক্ষের যজ্ঞস্থলে তিনি
পৌঁছে দেখলেন, বেদমন্ত্রের উচ্চারণে যজ্ঞভূমি মুখর। সেখানে উপস্থিত রয়েছেন অনেক
বিখ্যাত মুনি, ঋষি ও ব্রাহ্মণেরা। চারিদিকে শোভা পাচ্ছে মাটি, কাঠ, সোনা, রূপো এবং
চামড়ার তৈরি নানান যজ্ঞপাত্র। দেবীসতীকে দেখে পিতা দক্ষ কোন রকম সমাদর দেখালেন না।
এমন কি দক্ষের ভয়ে যজ্ঞস্থলে উপস্থিত অন্য কেউই তাঁকে সম্ভাষণও করল না। তাঁকে বুকে
জড়িয়ে ধরলেন, তাঁর মা ও অন্য বোনেরা। কিন্তু
পিতা দক্ষের অনাদরে অভিমানিনী দেবীসতী ক্রুদ্ধ হলেন, তিনি লক্ষ্য করলেন, তাঁর পতি
রুদ্রের জন্য কোন যজ্ঞভাগ সংকল্প করা হয় নি। পিতা দক্ষ তাঁদের নিমন্ত্রণ করেন নি,
এখন বিনা নিমন্ত্রণে তিনি এসেছেন কিন্তু তাও তাঁকে অবহেলা করলেন। প্রচণ্ড অপমানে
তিনি সক্রোধে বললেন,
“এই লোকে যাঁর থেকে মহান আর কেউ
হতে পারেন না। যাঁর কাছে এই জগতের কেউই প্রিয় কিংবা অপ্রিয় নয়। দেহীদের কাছে যিনি
আত্মাস্বরূপ। যিনি এই সমস্ত জগতের কারণস্বরূপ, যিনি কোন জীবের প্রতি শত্রুভাব পোষণ
করেন না। এমন মহেশ্বরের সঙ্গে আপনি বিরুদ্ধ আচরণ করছেন? এই জগতে কেউ কেউ আছেন,
যাঁরা অপরের দোষগুণ যথাযথ বিচার করেন, তাঁদের মধ্যস্থ বলা হয়। কেউ কেউ আছেন যাঁরা
অপরের শুধু গুণ বিচার করেন, দোষ দেখেন না, তাঁরা মহত্তর সাধু। আবার কেউ কেউ আছেন
যাঁরা অপরের দোষ অগ্রাহ্য করে, তার সামান্য গুণকে মহৎগুণ হিসেবে বিচার করেন, তাঁরা
মহত্তম সাধু। আর সম্পূর্ণ দোষহীন মহেশ্বর, জগতের অতুলনীয় গুণবান হওয়া সত্ত্বেও,
আপনি তাঁর দোষ কল্পনা করে নিন্দা করছেন! আপনার মন অসূয়াযুক্ত, আপনার মন বিদ্বেষে
পূর্ণ। আপনি এই জড়দেহকেই আত্মা বিবেচনা করে মোহে অন্ধ হয়ে রয়েছেন। যে “শিব” নামের
উচ্চারণে সঙ্গে সঙ্গে মানুষ সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত হয়ে যায়, আপনি সেই শিবের
বিরুদ্ধে প্রচার করছেন! আপনি যাঁকে নামে শিব, বস্তুতঃ অশিব বলেছেন। যিনি জটাধারী, যিনি শ্মশানে ভস্ম,
নরকপালের ভূষণে সজ্জা করেন, যিনি প্রেত ও পিশাচদের সঙ্গে বাস করেন, তাঁকে আপনি
ছাড়া সকলে, এমনকি ব্রহ্মাও অশিব মনে করেন না। মহেশ্বরের চরণের নির্মাল্য সকলেই
মাথায় করে রাখেন।
আপনি শিবনিন্দুক এবং আমি আপনার
সন্তান, এই চিন্তায় আমার ঘৃণা উৎপন্ন হচ্ছে। ভুল করে অপবিত্র অন্নভোজনের পর বমন
করাই দেহশুদ্ধির সবথেকে ভাল উপায় বলে মনে করা হয়। হে পিতা, শিব ব্রহ্মস্বরূপ, অতএব
তিনি কোন কর্মে আবদ্ধ না থাকলেও কোন দোষ হয় না এবং কোন কর্মফলই তাঁকে স্পর্শ করতে
পারে না। আপনার ঐশ্বর্য যজ্ঞশালাতেই আবদ্ধ, যজ্ঞের অন্নেই আপনার উদর পোষণ। আপনি
কর্মকাণ্ডে আসক্ত, তাই আপনি এই ঐশ্বর্যের মধ্যে আবদ্ধ। আমাদের ঐশ্বর্য যজ্ঞের ফলের
প্রত্যাশা করে না, আমাদের ইচ্ছা অনুসারে পরমব্রহ্মস্বরূপ আনন্দ আমরা অনুভব করতে
পারি। অতএব আপনি সমৃদ্ধ এবং আমি ও আমার পতি রুদ্র দরিদ্র, এমন চিন্তাই আপনাকে
অহংকারি করে তুলেছে। আপনি হরের নিন্দা করে চরম অপরাধ করেছেন, আর আপনার দেহ থেকেই
আমার জন্ম। আপনার মতো দুর্জনের সঙ্গে আমার সম্পর্ক আছে, এই চিন্তাতেই আমি অত্যন্ত
লজ্জিত এবং ধিক আমার এই জন্মকে। মহেশ্বর আমাকে ঠাট্টার ছলেও “দাক্ষায়ণী” নামে
ডাকলে, আমার অন্তর দুঃখে ভরে ওঠে। অতএব আপনার দেহ থেকে সৃষ্টি হওয়া আমার এই দেহ
আমি এই যজ্ঞস্থলেই ত্যাগ করব”।
হে বিদুর, দেবীসতী পিতা দক্ষকে
এইভাবে তিরস্কারের পর উত্তরদিকে মুখ করে মাটিতে বসলেন। তারপর আচমন করে পীতবস্ত্রে
নিজের দেহকে আবৃত করে, আচমন করলেন এবং চোখ বন্ধ করে যোগসাধনায় নিরত হলেন। তিনি
নাভিচক্রে ঊর্ধগামী প্রাণবায়ু আর অধোগামী অপানবায়ুর সমতা বিধান করে, উদানবায়ুকে
হৃদয়ের মধ্যে স্থাপনা করলেন। তারপর কণ্ঠপথ পার করে নিজের ভ্রুযুগলের মধ্যে সেই উদানবায়ুকে
সঞ্চারিত করলেন। সর্বজনের পূজ্য মহাদেব যে দেহকে সমাদর করে নিজের কোলে স্থাপন
করতেন, সেই দেহের প্রত্যেক অঙ্গে তিনি অগ্নির সঞ্চার চিন্তা করতে লাগলেন। তারপর
তিনি নিজের স্বামী জগৎগুরু মহেশ্বরের চরণপদ্মের চিন্তায় অন্য সমস্ত চিন্তা ত্যাগ
করলেন। তখন তিনি যে দক্ষকন্যা, তাঁর এই অভিমান দূর হয়ে গেল, তিনি বিশুদ্ধ হয়ে
উঠলেন। তারপর সমাধিযোগে তাঁর দেহে হঠাৎ আগুন জ্বলে উঠল।
এই অদ্ভূত ঘটনা দেখে জগতের ও
আকাশের সকলে হাহাকার করে উঠলেন, তীব্র ধিক্কারের সকলে বলে উঠলেন, “দক্ষের উপর
ক্রুদ্ধ হয়ে দেবাদিদেব শংকরের পত্নী সতীদেবী দেহত্যাগ করলেন। আর এই দক্ষকে দেখ,
যিনি প্রজাপতি এবং সর্ব চরাচর যাঁর প্রজা, যাঁর নিজের কন্যা মনস্বিনী সতীদেবী
সর্বদা সমাদরের যোগ্য, সেই অভিমানিনী কন্যা নিজের পিতার কাছেই অপমানিতা হয়ে
দেহত্যাগ করলেন। এই দক্ষ দাম্ভিক ও অহংকারী, এই দক্ষের অন্তরে মহাদেবের শ্রেষ্ঠত্ব
সহ্য হয়নি, এই দক্ষ ব্রহ্মদ্রোহী শিববিদ্বেষী। নিজের কন্যার দেহত্যাগের সংকল্প
চাক্ষুষ করলেন, কিন্তু একবারের জন্যেও নিবারণের চেষ্টা করলেন না। এই দক্ষের গতি
একমাত্র নরক এবং এই জগতে তাঁর অখ্যাতির কোন সীমা থাকবে না”।
দেবীসতীর সঙ্গে রুদ্রের যে সকল অনুচর এসেছিল, তারা দক্ষকে বধ করার জন্যে অস্ত্র ধারণ করল। মহামুনি ভৃগু দক্ষের এই যজ্ঞের হোমকর্তা ছিলেন, তাঁর আহুতিতে চন্দ্রলোক থেকে উপস্থিত হল ঋভু নামক শতশত দেবগণ। এই ঋভুগণ প্রচণ্ড বেগে রুদ্রের অনুচরদের প্রতিহত করলেন, তাঁদের হাতে পরাস্ত হয়ে রুদ্রের অনুচরেরা পালিয়ে যেতে বাধ্য হল।।
চলবে...