শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬

স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ২

  প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

তৃতীয় ধারাবাহিক উপন্যসের প্রথম পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ " 

    পঞ্চম ধারাবাহিক উপন্যাস প্রথম পর্ব - "স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "

সম্পুর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "; "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "





মুখবন্ধঃ 
[১৯৪৭ সালের ১৫ই আগষ্ট মধ্যরাত্রে বৃটিশ অপশাসন থেকে আমরা মুক্ত হয়েছি। আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। সেই মাহেন্দ্রক্ষণটিকে স্বাগত জানাতে গিয়ে নেহরুজির বক্তব্যের প্রথম বাক্যটি ছিল, “Long years ago we made a tryst with destiny, and now the time comes when we shall redeem our pledge, not wholly or in full measure, but very substantially”.। আজ স্বাধীনতার আশিতম বছরে পা রেখে, সত্যিই কি আমরা পেরেছি এবং পারছি আমাদের যাবতীয় pledge redeem করতে? এক কল্পিত স্বাধীনতা সংগ্রামীর সঙ্গে আজকের জেন-জি তরুণের কথোপকথনে এই উপন্যাস তুলে ধরবে আমাদের যাবতীয় পাওয়া-না পাওয়ার কাহিনী।]


২ 

প্রবীণবাবু অনেকক্ষণ একটানা কথা বলে থামলেন। ঘরের সকলেই তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে সেই দিনগুলির কথা কল্পনা করছিলেন। ব্রিটিশদের হিংস্র থাবা থেকে ভারতবর্ষকে বাঁচাতে কত মানুষকেই যে সে সময় প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে কত যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছিল, সে কথা ভাবতে গেলেই মন ভার হয়ে যায়। সেই সব মানুষদের লড়াই আর সহ্যশক্তির ফসল আজকের স্বাধীনতা। অহীন ভাবল, স্বাধীনতা অর্জন করে বৃটিশের হিংস্রতা থেকে আমরা মুক্তি পেয়েছি ঠিকই, কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে আমাদের দেশের শাসকরা যেভাবে সাধারণ মানুষকে যন্ত্রণা আর দুর্ভোগের আবর্তে ঠেলে দিচ্ছে – সেটা কি ওই স্বদেশপ্রেমী মানুষরা কোনদিন কল্পনা করতে পেরেছিলেন?

প্রবীণবাবু অহীনের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “অহীনবাবু, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস তো তোমরা পড়েছ?”

অহীন বলল, “পড়েছি – আমাদের স্কুলের সিলেবাসে ছিল”।

প্রবীণবাবু বললেন, “সে পড়ে কিস্‌সু বোঝা যাবে না। খুব সংক্ষেপে তোমাকে বলছি শোন। বলা হয় ১৯৩৯ সালের পয়লা সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরু। ওই দিন জার্মানি পোল্যাণ্ড দখল করার জন্যে যুদ্ধ শুরু করল, আর তার দুদিন পরে জার্মানিকে শায়েস্তা করতে ব্রিটিশ আর ফরাসী বাহিনী যুদ্ধ করতে মাঠে নামল। অবিশ্যি তার বেশ কয়েক বছর আগে থেকেই ইওরোপের নানান দেশে, এমনকি এশিয়াতেও জাপান আর চিনের মধ্যে লাগাতার যুদ্ধ চলছিল।

ব্রিটিশদের তখন খুব দেমাক – তারা ধরাকে সরা জ্ঞান করত। তাদের সাম্রাজ্যে কোনদিন সূর্য অস্ত যায় না। আর তাদের সাম্রাজ্যের সব থেকে দামি রাজ্যটি হল আমাদের এই ভারতবর্ষ। ভারতের মাঠে মাঠে অজস্র শস্য, মাটির তলায় অঢেল খনিজ সম্পদ। তার ওপর সোনা, রূপো, মণি রত্নের অফুরন্ত ভাণ্ডার। প্রচুর লুঠ করা গেছে – কিন্তু তাতেও আশ মেটেনি – তাদের লোভ আরও আরও অনেক কিছু লুঠ করার – যতদিন ইচ্ছা।

সে সময় গুটিকতক সর্বভারতীয় নেতা চাইছিলেন ব্রিটিশ রাজত্বই থাক। তাঁরা ব্রিটিশদের থেকে কিছু কিছু সুযোগ সুবিধে পেলেই খুশি। তাদের নিয়ে ব্রিটিশদের খুব মজা। ধরা যাক ওই নেতারা খেতে চাইলেন রসগোল্লা। অনেক হম্বিতম্বি, টালবাহানা করে ব্রিটিশরা তাঁদের দিল একটা নকুলদানা। সেই নকুলদানা নিয়েই ওই নেতারা খুশি। তাঁরা ভাবলেন আজ পেয়েছি নকুলদানা, এরপর কোনদিন পাব বাতাসা। এভাবেই একদিন ঠিক রসগোল্লা পেয়ে যাবো। আমার মনে হয় ব্রিটিশরা ওই নেতাদের কীর্তির কথা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করত আর আমাদের আহাম্মকিতে হেসে কুটিপাটি হত।    

কিন্তু অন্যদিকে বেশ কিছু নেতা চাইছিলেন ভারতবর্ষ থেকে ব্রিটিশদের তাড়াতে। ব্রিটিশদের কাছে এই নেতারা খুবই বিপজ্জনক – এরা দিন কে দিন দলে ভারি হচ্ছিল। শুধু রাজধানী কিংবা বড়ো শহরে নয় – জেলায় জেলায়, গ্রামে গ্রামে এই নেতাদের অনুগামীরা বিপ্লবের দীক্ষা নিয়ে, ব্রিটিশদের জ্বালিয়ে মারছিল। এই রেল লাইন উপড়ে ফেলছে। এই টেলিগ্রাফের তার, টেলিফোনের তার ছিঁড়ে, যোগাযোগ ব্যবস্থা তছনছ করে দিচ্ছে বারবার। পোস্ট অফিস, ট্রেজারি থেকে টাকা লুঠ করছে। বাঘা বাঘা ব্রিটিশ অফিসারদের তারা গুলি করে মারছে, কিংবা মারার চেষ্টা করছে বারবার।

কথায় আছে বাঁশের থেকে কঞ্চি দড়। ব্রিটিশ সরকারের অধীনে চাকরি করা দেশীয় অফিসাররা ব্রিটিশদের থেকেও স্বদেশী-বিপ্লবীদের ওপর অত্যাচারে ছিল অনেক কাঠি ওপরে। তাদেরকেও ছেড়ে কথা বলছে না স্বদেশী বিপ্লবীরা।  টিপে টিপে মারছিল ছারপোকার মতো।

এক কথায় ভারতবর্ষ নামক সোনার ডিম পাড়া হাঁসটিকে সামলাতে সে সময় ব্রিটিশরা তাদের সর্বশক্তি নিয়েও হাঁসফাঁস করছিল। তাদের অহরহ ব্যতিব্যস্ত করে রাখছিল, স্বদেশী করা এই সংগ্রামী মানুষগুলো। ওদিকে ইওরোপে নিজের প্রতিবেশী জার্মানিদের খোঁচা দিয়ে – বেশ প্যাঁচে পড়ে গেল ব্রিটিশরা। তারা ভেবেছিল খুব সহজেই জার্মানিদের ঢিট করে যুদ্ধ করার শখ মিটিয়ে দেবে। সে তো হলই না – বরং যুদ্ধের তেজ বেড়ে উঠল এবং বিয়াল্লিশ সাল নাগাদ গোটা ইওরোপ জুড়েই যুদ্ধের আগুন জ্বলে উঠল। চরমে উঠল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।

ভারতের নরমপন্থী নেতাদেরও এবার চোখ খুলল, এই সুযোগটা ছাড়লেন না, তাঁরা ওই বিয়াল্লিশেই ভারত ছাড়ো আন্দোলনের ডাক দিলেন। আর নেতাজী সুভাষ বিদেশে গিয়ে ব্রিটিশদের শত্রুদের সঙ্গে হাত মেলালেন এবং জাপানের সাহায্যে ব্রিটিশ ভারতকে আক্রমণ করার জন্যে বিয়াল্লিশ সালেই গড়ে তুললেন আজাদ হিন্দ ফৌজ। এই সবের মধ্যে ব্রিটিশরা যে চরম বজ্জাতিটা করল, সেটা হল বাংলার মুখের গ্রাস কেড়ে নিল। ইওরোপের নানান যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেদের সৈন্যদের রসদ যোগাতে তারা বাংলা থেকে শয়ে শয়ে জাহাজ ভরে পাচার করতে লাগল খাদ্য শস্য, মানে চাল-ডাল-গম এইসব। বিয়াল্লিশ থেকে তেতাল্লিশ সাল পর্যন্ত গোটা অভিন্ন বাংলা এবং পূর্ব ভারত জুড়ে চলল ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। লক্ষ লক্ষ – কেউ বলে শুধু বাংলাতেই আট লাখ, আর গোটা ভারতে প্রায় তিরিশ লাখ - মানুষ মারা গেল অনাহারে। বাংলার ইতিহাসে যাকে ১৩৫০ বা পঞ্চাশের মন্বন্তর বলে।

পঁয়তাল্লিশ সালের সেপ্টেম্বরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হল, জাপান ও জার্মানির চূড়ান্ত হার হল ঠিকই, কিন্তু ব্রিটিশদেরও কোমর ভেঙে গিয়েছিল। এর দুবছরের মধ্যেই সাতচল্লিশের আগষ্টে ব্রিটিশদের ভারত থেকে পাততাড়ি গোটাতে হল। পলাশীর যুদ্ধ জয় থেকে যদি ব্রিটিশদের রাজত্বকাল ধরা হয় তাহলে একশ নব্বই বছরের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেয়ে ভারত স্বস্তি পেল। কিন্তু আমাদের দুশ্চিন্তার যন্ত্রণা বেড়ে গেল। দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পেল না আমার ছোটকা!”

অহীন অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, “কেন?”

মেঝের দিকে তাকিয়ে প্রবীণবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন, তারপর বললেন, “মা, ঠাকুমার মুখে শুনেছি ঠাকুর সিদ্ধানন্দ নাকি ত্রিকালদর্শী। ত্রিকালদর্শী মানে জানো তো? অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যৎ যিনি দেখতে পান। তা সে ত্রিকাল তো অনেক দূরের কথা, বছর চারেকের মধ্যেই যে আমরা স্বাধীন হতে চলেছি সেটা তিনি দেখতেই পেলেন না! বাবা ও মায়ের কাছে শুনেছি, তেতাল্লিশ সালে বসে ঠাকুর সিদ্ধানন্দ ভেবেছিলেন, পঞ্চাশ-ষাট বছরের আগে ব্রিটিশদের এদেশ থেকে বিদেয় করা যাবে না। কাজেই অতি সাবধানী হয়ে, তিনি অনেক ভেবেচিন্তে ছোটকাকে প্রায় আশি বছরের জন্যে সমাধির ব্যবস্থা করেছিলেন। অর্থাৎ ছোটকার বয়েস একশ বছর পূর্ণ হলে, তবেই তার সমাধি ভাঙবে। এদিকে ভারত তো স্বাধীন হয়ে গেল চার বছরের মধ্যে! বেচারা ছোটকাকে অকারণে এতগুলো বছর ওই পাতালঘরে বন্দী থাকতে হবে? কোন মানে হয়?

আমার ঠাকুমা, বাবা-মা সকলেই পাগলের মতো ঠাকুর সিদ্ধানন্দের খোঁজ শুরু করলেন। তাঁকে খবর দেওয়ার নানান ব্যবস্থা করলেন। কিন্তু প্রায় বছর চারেক তাঁর কোন সন্ধানই পাওয়া গেল না। তারপর একদিন বাবার নামে একটা চিঠি এল। সেই ভদ্রলোকও ঠাকুর সিদ্ধানন্দের কাছে দীক্ষা নেওয়া শিষ্য, অর্থাৎ আমার বাবা-মায়ের গুরুভাই”।

উদ্বিগ্ন অহীন জিজ্ঞাসা করল, “তিনি কী লিখেছিলেন, দাদু”?

প্রবীণবাবু সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালেন। দেওয়াল আলমারির সামনে গিয়ে, তার পাল্লা খুলে একটা বহু পুরোন ফাইল বের করলেন। সেটা হাতে নিয়ে সোফায় এসে বসলেন। ফাইলের ফিঁতে খুলে, অনেক কাগজ পত্রের মধ্যে থেকে একটা চিঠি বের করলেন। সেটা হাতে নিয়ে বললেন, “এই সেই চিঠি। পড়ছি, মন দিয়ে শোন”। 

“।। ওঁ শ্রী শ্রী গুরবে নমঃ।। ওঁ শ্রী শ্রী গুরু কৃপাহি কেবলম্‌।। 

ভবদীয় সুধীনবাবু মহাশয়,

পত্রারম্ভে আপনার ও আপনার পরিবারের সকলের সর্ব্বাঙ্গীন কুশল কামনা করি।

শ্রীশ্রী গুরুদেবকে আপনি যে তিনখানি পত্র প্রেরণ করিয়াছিলেন, সেগুলি একত্রে গতকল্য আমার হস্তগত হইয়াছে। লিফাফার উপর আপনার লিখিত ঠিকানার বারংবার পরিশোধন দেখিয়া, বুঝিতে অসুবিধা হয় নাই যে, পত্রগুলি বহুজনের হস্ত মারফৎ redirect হইয়া অবশেষে আমার নিকট আসিয়া পঁহুছিয়াছে।

শ্রীশ্রী গুরুদেব আমাদিগের ন্যায় অভাগা শিষ্যদের বিবিধ দুর্ভোগ ও দুর্দশা হইতে উদ্ধার করিতেন। সে সব গোপন দুর্ভাগ্যের কাহিনী তৃতীয় কোন ব্যক্তির অবজ্ঞাত হওয়া সমীচিন নহে বিবেচনা করিয়া, আমি আপনার কোন পত্রই পাঠ করি নাই, এ বিষয়ে আপনি নিশ্চিন্ত থাকিতে পারেন। এই পত্রের সঙ্গে আপনার অন্য তিনখানি লিফাফাও আমি প্রেরণ করিলাম। কারণ এই পত্রাদি কোন দুর্জনের হস্তগত হইলে কী বিপদ ঘটিতে পারে, সে কথা কে বলিতে পারে?      

এই ঝঞ্ঝাসংকুল ভব-সাগরে নিশ্চিন্ত তরণী হইয়া যিনি আমাদের বারংবার উদ্ধার করিয়াছিলেন। বিশাল বটবৃক্ষের ন্যায় যিনি আমাদের শরণস্বরূপ সদা বিরাজ করিতেন। একমাত্র তিনিই সকল বিপদে আপনার সহায় হইতে পারিতেন।  কিন্তু হৃদয়বিদারী দুঃখের কথা আর কী বলিব - আজ দ্বিবৎসর হয়, তিনি আমাদিগের ন্যায় অভাগাজনকে ত্যাগ করিয়া পরমলোকে পরমপদ লাভ করিয়াছেন।

ইহজগতে কেহই অমর নহে, সে কথার উল্লেখ বাহুল্যমাত্র। কালের অনুশাসনে তাঁহার দেহাবসানের শোক অচিরেই হয়তো অপনোদন হইত। কিন্তু যাবজ্জীবিত রহিব, একথা কখনও বিস্মৃত হইব না যে, তাঁহার মৃত্যু স্বাভাবিক নহে, সে মৃত্যু বড়ই মর্মন্তুদ। আপনি অবগত আছেন, দেশবিভাগের ডামাডোলে, হিন্দু-মুসলিম পরষ্পরকে হত্যার যজ্ঞে মাতিয়া উঠিয়াছিল। সেই প্রবল দাঙ্গার পরিস্থিতিতে, ৪৬ সালে আমাদিগের গুরুদেব যশোহর জিলার শিমুলিয়ায় জনৈক শিষ্যভবনে অধিষ্ঠান করিতেছিলেন। সেখানেই বীভৎস এক সাম্প্রদায়িক ঘটনায় আমাদিগের গুরুদেব সহ ওই পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষরা সকলেই নিহত হন। শুনিয়াছি বাড়ির মহিলা ও শিশুরা প্রতিবেশী কোন বাড়িতে আশ্রয় পাইয়াছিলেন এবং এক্ষণে জীবন্মৃতবৎ দুর্দশায় কাল কাটাইতেছেন।

আর লিখিতে পারি না। আমার চক্ষুদ্বয় বাষ্পময় হইয়া উঠিতেছে। ইদৃশ দুঃসংবাদে সপরিবার আপনিও স্তম্ভিত হইবেন জানি। শোকে, আক্ষেপে ব্যাকুল হইবেন। কিন্তু কোন ভাষায় আপনাকে সান্ত্বনা জানাইব, তাহা জানা নাই।

ইতি

শ্রী সজনীকান্ত মল্লিক,

পানিসারা, জিলা যশোহর, পূর্ব পাকিস্তান”।



বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/৮

 এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১ " 


  আগের পর্ব - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/৭ "


  তৃতীয় স্কন্ধ - পর্ব ৮

হিরণ্যাক্ষের জন্ম, বিষ্ণুবৈরীতা ও বিনাশ    

সাধ্বী দিতি একশ বছর গর্ভ ধারণের পর যমজ পুত্রের জন্ম দিলেন। তাদের জন্মক্ষণে সর্ব লোকে ভয়ংকর উপদ্রব শুরু হয়ে গেল। দিতির পুত্র সেই আদি দৈত্য দুই ভাইয়ের নাম হিরণ্যকশিপু ও হিরণ্যাক্ষ। তাদের শরীর পাহাড়ের মতো বিশাল, পাথরের মতো কঠিন ও শক্তিশালী। বাহুবলে তারা অসাধারণ বীর এবং একমাত্র ভগবান বিষ্ণু ছাড়া তাদের মৃত্যুর ভয়ও ছিল না। অতএব হিরণ্যকশিপু খুব অল্প দিনের মধ্যেই লোকপালদের ও সেই সঙ্গে সকল লোকই জয় করে ফেলল। আর তার প্রিয় ভাই হিরণ্যাক্ষ দাদাকে খুশি করার জন্যে গদাহাতে বেরিয়ে পড়ল স্বর্গ জয়ের ইচ্ছায়।

তার পায়ে সোনার নূপুর, গলায় বৈজয়ন্তী মালা আর কাঁধে বিশাল গদা। হিরণ্যাক্ষকে দুর্দান্ত গতিতে স্বর্গের দিকে আসতে দেখেই, দেবতারা স্বর্গ ছেড়ে গা ঢাকা দিল। কারণ দেবরাজ ও অন্যান্য দেবতারা তার শৌর্য, বীর্য, সাহস আর পরাক্রমের কথা সবই জানতেন। কিন্তু দৈত্যরাজ মনে করল, দেবতারা কাপুরুষ এবং তার তেজেই দেবতারা স্বর্গ ত্যাগ করে পালিয়েছে।  স্বর্গে যুদ্ধ  হল না বলে, হিরণ্যাক্ষ খ্যাপা হাতির মতো সমুদ্রের জলে আলোড়ন তুলতে লাগল। জলের দেবতা বরুণের জলচর সৈনিকেরা, সেই ভয়ংকর আলোড়নে ভয়ে ও আতঙ্কে দূরে পালিয়ে গেল। মহাবল হিরণ্যাক্ষ এরপর সমুদ্রের মধ্যে প্রবেশ করল, তার নিঃশ্বাসের ধাক্কায় বিক্ষুব্ধ সমুদ্রের বুকে উত্তাল ঢেউ সৃষ্টি হতে থাকল। হিরণ্যাক্ষ পাতালপতি ও জলচর প্রাণিদের দেবতা বরুণের ভবনে গিয়ে উপস্থিত হল।

[দাদারা দাদাগিরি করতে গিয়ে অন্য পাড়ায় ঢুকে যদি দেখে যে, সে পাড়ায় কেউ নেই - সব্বাই গা ঢাকা দিয়েছে, কেমন লাগবে সেই দাদার? রাগে ফেটে পড়বে না? স্বর্গ জয় করতে গিয়ে হিরণ্যাক্ষর মনেও ঠিক সেই অনুভূতি হয়েছিল।] 

সেখানে হিরণ্যাক্ষ তাঁকে উপহাস করে বলল, “হে মহারাজ, দয়া করে আপনি আমার সঙ্গে যুদ্ধ করবেন কি? শুনেছি আপনি লোকপালের অধিপতি। আপনি অনেক দুর্দান্ত বীরের দর্প চূর্ণ করেছেন। অনেক অসুর ও দানবদের হারিয়ে রাজসূয় যজ্ঞের আয়োজন করেছিলেন। এখন আমাকে হারিয়ে আপনার বীরত্বের সুনাম রক্ষা করুন”।

জলপতি বরুণের মনে ক্রোধ সঞ্চার হলেও, অকারণ যুদ্ধে লোকক্ষয় এড়ানোর জন্যে তিনি সংযত হলেন, বললেন, “হে অসুররাজ,  আজ অনেক কাল আমি এই যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা ছেড়ে দিয়েছি। আর তোমার মতো যুদ্ধনিপুণ মহাবীরের সমান বীর কাউকেই তো দেখছি না। একমাত্র বিষ্ণুই তোমার এই যুদ্ধের শখ মিটিয়ে দিতে পারেন। তুমি তাঁর কাছে যাও, তাঁর সঙ্গে যুদ্ধেই তুমি বীরগতি পাবে। ভগবান বিষ্ণু তোমার মতো বীরের জন্যেই অপেক্ষা করছেন”।

উদ্ধত হিরণ্যাক্ষ বরুণদেবের কথায় উন্মত্তের মতো বিষ্ণুর খোঁজ করতে লাগল এবং মহামুনি নারদের কাছে সংবাদ পেল, শ্রীবিষ্ণু পৃথিবী উদ্ধারের জন্যে এখন রসাতলে রয়েছেন। হিরণ্যাক্ষ সঙ্গে সঙ্গেই রসাতলে প্রবেশ করল, সেখানে গিয়ে সে দেখল বিশাল পাহাড়ের মতো এক প্রাণী, তার দুই দাঁতের উপর পৃথিবীকে তুলছে। সেই প্রাণির অঙ্গ প্রভায় হিরণ্যাক্ষর জ্যোতি ঢাকা পড়ে গেল।

হিরণ্যাক্ষ সামনে প্রতিদ্বন্দ্বীরূপে এক জলচর বরাহকে দেখে হেসে উঠে বলল, “আমি বিষ্ণুর সন্ধানে এখানে এলাম, এসে দেখছি এতো একটা বরাহ। মূর্খ বিষ্ণু, শূকরের বেশ ধরেছ বলে তুমি আমার হাত থেকে পরিত্রাণ পাবে, এমন চিন্তাও করো না। পৃথিবীকে রেখে দাও, প্লাবনে ভেসে আসা পৃথিবী এখন রসাতলেই থাকবে, কারণ এই রসাতল আমারই অধীন। তুমি আমার সঙ্গে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হও। তোমার যুদ্ধজয়ের যত কাহিনী শুনেছি, সে সবে তোমার পৌরুষ নামমাত্র, তোমার যোগমায়াই তোমার আসল শক্তি। মূঢ়, আজ আমি তোমাকে হত্যা করে, আমার নিহত বন্ধুদের মৃত্যুর প্রতিশোধ নেব। আমার ভীষণ গদার আঘাতে তোমার মাথা চূর্ণ করে দিলেই, তোমার ভরসায় থাকা যতো ব্রাহ্মণ, দেবতা, মুনি, ঋষি সকলেই অনাথ অসহায় হয়ে পড়বে”।

বরাহরূপী ভগবান সেই অসুরের কুকথা শুনেও কর্ণপাত করলেন না। তাঁর দুই দাঁতের উপর ধরে রাখা পৃথিবীকে নিয়ে তিনি জলের উপরে উঠে এলেন। জল থেকে বাইরে এসে, তিনি পৃথিবীকে প্রতিষ্ঠা করলেন এবং পৃথিবীর মধ্যে আধারশক্তি সঞ্চার করলেন। সেই ক্ষণ থেকেই পৃথিবী সকল ভূতের বাসযোগ্য হয়ে উঠল। এই আশ্চর্য ঘটনায় মুগ্ধ হয়ে, ব্রহ্মা শ্রীবরাহের স্তব করতে লাগলেন, স্বর্গ থেকে দেবতারা আনন্দে পুষ্পবৃষ্টি করতে লাগলেন।  

ভগবানের পিছনে তাড়া করে আসছিল হিরণ্যাক্ষ, তাঁকে জলের বাইরে চলে আসতে দেখে, সে বলল, “তোমার মতো নির্লজ্জ আর কাপুরুষের নিন্দার ভয় না থাকাই স্বাভাবিক, সেই কারণেই তুমি পালিয়ে আসতে পারলে”।

ভগবান পৃথিবীর প্রতিষ্ঠার জন্যে অনেকক্ষণ ধৈর্য ধরে ছিলেন, এবার তিনিও ক্রোধে গর্জন করে বললেন, “ওরে অভদ্র অসুর, তুই যে আমাকে জলচর বরাহ বললি, সত্যিই আমি তাই, কিন্তু আমি তোর মতো কুকুরেরই সন্ধান করে থাকি। আমি তোর ভয়ে পাতালে বদ্ধ থাকা পৃথিবীকে নিয়ে নির্লজ্জের মতো পালিয়ে এলাম। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি, তোর মতো বীরের থেকে পালিয়ে আমি কোথায় যাবো? আয়, আমাকে হত্যা করে তোর আত্মীয়দের চোখের জল মুছিয়ে দেবার তোর প্রতিজ্ঞা তুই রক্ষা কর, তা নইলে তুই আর কিসের বীর”?

ভগবানের এই বিদ্রূপে হিরণ্যাক্ষ ক্রোধে উন্মাদের মতো ভগবানের বুকে গদার আঘাত করতে গেল, কিন্তু ক্ষিপ্রবেগে সেই আঘাত এড়িয়ে গেলেন ভগবান বিষ্ণু। অসুর হিরণ্যাক্ষ বীর্যে, শক্তিতে ও রণকৌশলে অত্যন্ত দক্ষ হওয়া সত্ত্বেও, ভগবান বিষ্ণু তার আক্রমণ বারবার প্রতিহত করছিলেন, কিন্তু নিজে আঘাত করছিলেন না। চপল বালক খেলার ছলে যেমন ক্রুদ্ধ সাপের লেজ আকর্ষণ করে, তার ছোবলকে ব্যর্থ করে দেয়, তিনিও হিরণ্যাক্ষকে নিয়ে যেন যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায় মত্ত হলেন।

এইভাবে দুপুর পার হয়ে যখন বিকেল হতে চলল, ঋষিদের নিয়ে ব্রহ্মা সেখানে উপস্থিত হলেন, ব্রহ্মা বললেন, “হে অচ্যুত, এই দৈত্য অত্যন্ত দুর্ধর্ষ দুর্বৃত্ত, একে হত্যা না করলে, তোমার আশ্রয়ে থাকা দেবতা, গো, ব্রাহ্মণ ও নিরপরাধ জীব বিপন্ন বোধ করবে। হে দেব, এর সঙ্গে যুদ্ধের খেলায় সময় নষ্ট করো না। দেখ সন্ধ্যা আসতে আর দেরি নেই, আর সন্ধ্যা উপস্থিত হলে, এই অসুরকে আজ হত্যা করা সম্ভব হবে না। হে ভগবান, জয় ও বিজয়ের শাপ মোচনের বিধানে, তুমি স্বয়ং এই অসুরকে বধ করবে, এমনই বিধান দিয়েছিলে। অতএব আর বিলম্ব করো না”।    

 তারপর সেই ভয়ংকর যুদ্ধে হিরণ্যাক্ষের গদা ও ত্রিশূল বিনষ্ট হল।  নিরস্ত্র হিরণ্যাক্ষ বরাহরূপী ভগবানের বক্ষে বজ্রমুষ্টিতে আঘাত করল। সেই আঘাতে পাহাড় কেঁপে ওঠে কিন্তু ভগবান এতটুকুও বিচলিত হলেন না। হিরণ্যাক্ষ এবার ভগবানকে দুই বাহুর আলিঙ্গনে পীড়িত করতে সর্বশক্তি প্রয়োগ করল। কিন্তু কি আশ্চর্য, ভগবান সেই ভীষণ আলিঙ্গনের মধ্যে থেকেও, অসুরের কর্ণমূলে তাঁর চরণের ক্ষুর দিয়ে বজ্রের মতো আঘাত করলেন। সেই আঘাতেই সেই দুর্দান্ত অসুর ছিন্নমূল বিশাল গাছের মতো মাটিতে আছড়ে পড়ল। ধরাশায়ী মহাদৈত্য হিরণ্যাক্ষ বরাহরূপী শ্রীবিষ্ণুর মুখ দর্শন করতে করতেই প্রাণ ত্যাগ করল।

মৈত্রেয় বললেন, “এই ভাবেই আদিবরাহ শ্রীহরি দুর্দান্তবিক্রম হিরণ্যাক্ষকে খেলার ছলে সংহার করেছিলেন এবং তারপর তাঁর আনন্দের নিলয় নিজের বৈকুণ্ঠলোকে ফিরে গিয়েছিলেন”।


মহামুনি কর্দম ও দেবহূতির পরিণয়

বিদুর বললেন, “হে ঋষিবর, সাধুজনেরা স্বায়ম্ভূব মনুর বংশের খুব প্রশংসা করে থাকেন। এই বংশেই স্ত্রী-পুরুষ সংসর্গে প্রজা সৃষ্টি হয়েছিল, অতএব এই বংশের কথা আমাকে বর্ণনা করুন। স্বায়ম্ভূব মনুর দুই পুত্র প্রিয়ব্রত ও উত্তানপাদ এবং এক কন্যা দেবহূতি। এই দেবহূতির পাণিগ্রহণ করেছিলেন, ব্রহ্মার ছায়া থেকে উৎপন্ন প্রজাপতি ঋষি কর্দম। আমাকে সেই বৃত্তান্ত দয়া করে বর্ণনা করুন”।

শ্রী মৈত্রেয় বললেন, “প্রজাপতি কর্দমের জন্মের পর, তাঁকে ব্রহ্মা প্রজা সৃষ্টি করার নির্দেশ দিলেন। সেই নির্দেশ পালনের জন্য মহর্ষি কর্দম সরস্বতীনদীর তীরে দশ হাজার বছর ধরে ভক্তিভরে শ্রীহরির তপস্যা করলেন। এইভাবে তপস্যার পর, সত্যযুগে তাঁর আরাধনায় সন্তুষ্ট হয়ে শ্রীহরি ব্রহ্মময় তনুতে তাঁর সামনে প্রকাশিত হলেন। শ্রীহরির সেই রূপ নির্মল ও সূর্যের মতো উজ্জ্বল। তাঁর কণ্ঠে দিনের প্রকাশরূপ শ্বেতপদ্ম ও রাত্রির প্রকাশরূপ নীল উৎপলের মালা। তাঁর বসন নির্মল; তাঁর মাথায় রত্নখচিত মুকুট, কানে সোনার কুণ্ডল।  তাঁর তিন হাতে তিনি শঙ্খ, চক্র ও গদা ধারণ করে আছেন। চতুর্থ হাতে শ্বেত লীলাপদ্ম। তাঁর গলায় কৌস্তুভমণির মালা, তাঁর বক্ষে লক্ষ্মীদেবীর নিলয়। তাঁর দুই চরণকমল গরুড়ের কাঁধে বিন্যস্ত। তাঁর অধরে মৃদু হাসি এবং দুই নয়নে মনোহর দৃষ্টি। প্রজাপতি কর্দম আকাশবিহারী শ্রীহরির এই রূপ দেখে ধন্য হলেন। 

[আজকাল কৌস্তভ নামটি বাঙালীদের মধ্যে বহুল প্রচলিত, কিন্তু নামটি হওয়া উচিৎ ছিল কৌস্তুভ - স্ত-এর সঙ্গে একটি হ্রস্ব-উ যোগ করলে - স্তু হয় - বিষ্ণুর কণ্ঠে কৌস্তুভমণিরই মালা থাকে - কৌস্তভ মণির নয়।]

পরমানন্দে তিনি শ্রীহরিকে প্রণাম করে, জোড়হাতে নিবেদন করলেন, “হে পূজনীয় দেব, তুমি অখিল সত্ত্বার আধার, আজ তোমাকে দর্শন করে আমার নয়নযুগল সার্থক হল। হে পরমেশ, তুমি প্রজাপতি ব্রহ্মারূপে আমাকে প্রজা সৃষ্টি করার যে নির্দেশ দিয়েছেন, সেই আজ্ঞা পালনের জন্যে আমি তোমার কাছে একজন যোগ্য সহধর্মিণী প্রার্থনা করছি। গৃহাশ্রমে ভার্যার থেকেই ধর্ম, অর্থ ও কাম এই ত্রিবর্গ লাভ করা সম্ভব। ধর্মপত্নী থেকে শুধু যে লোকসৃষ্টি সম্ভব তাই নয়; ঋষি-ঋণ, দেব-ঋণ ও পিতৃ-ঋণ এই তিন রকমের ঋণ থেকেও মুক্তি পাওয়া যায়। হে দেব, তুমি এক হয়েও জগৎ সৃষ্টির জন্যে নিজের মধ্যেই স্থিত যোগমায়ার প্রভাবে এই বিশ্ব সৃষ্টি করেছ, পালন করছ আবার তুমিই এই বিশ্বের বিনাশও করবে। হে ভগবান, তুমিই মুক্তি দান করো, কারণ তোমার পরমজ্ঞানের জন্যে কর্মের ফল তোমাকে স্পর্শ করতে পারে না। আবার তুমি ভোগও দান করে থাকো, কারণ তুমিই তোমার মায়ায় বিশ্বের সকল ভোগের উপকরণ উৎপাদন করে থাকো। তুমি কামনায় আসক্ত ব্যক্তিদের বাসনাও পূর্ণ করে থাকো। এই কারণেই কামনায় আসক্ত অথবা নিরাসক্ত, সকলেই তোমার চরণে আশ্রয় নিয়ে থাকে। আমিও তোমার ঐ চরণ কমলে অসংখ্য প্রণাম করি”।

ঋষিবর কর্দমের এই স্তব শুনে, ভগবান শ্রীহরি বললেন, “হে প্রজাপতি কর্দম, আমার অর্চনা কোনদিন ব্যর্থ হতে পারে না। আমি তোমার এই উদ্দেশ্য আমি জানি, তাই আগে থেকেই তোমার জন্যে আমি সব ঠিক করেই রেখেছি। যিনি সসাগরা এই ধরণী শাসন করছেন, ব্রহ্মার পুত্র সেই রাজর্ষি স্বায়ম্ভূব মনু তাঁর ধর্মপত্নী শতরূপাকে নিয়ে পরশুদিন আসছেন তোমার সঙ্গে দেখা করতে। তাঁর দেবহূতি নামে এক কন্যা আছে। তিনি নবীনা, সুশীলা ও বহুগুণের আধার। রাজর্ষি মনু তোমাকেই সেই কন্যা সম্প্রদান করবেন। হে ব্রহ্মন, তোমার এই ভার্যা তোমার নয়টি কন্যার জননী হবেন এবং এই নয় কন্যার সহিত মরীচি প্রমুখ ঋষিদের বিবাহ হয়ে বহু সন্তান সৃষ্টি হবে। হে মহামুনি, তোমার ভার্যা দেবহূতির গর্ভে স্বয়ং আমি নিজের অংশকলায় জন্ম নেব এবং তত্ত্বসংহিতা রচনা করব”।

[দশ হাজার বছরের তপস্যায় তুষ্ট হয়ে, শ্রীহরি নিজেই ঘটকালি করে, দশহাজার বছরের বুড়ো ঋষি কর্দমের জন্যে যে পাত্রী ঠিক করে দিলেন, তিনি নবীনা, সুশীলা ও বহুগুণের আধার। এর তুলনায় আমাদের কৌলীন্যপ্রথায় আশি বছরের বুড়োর সঙ্গে যে আট বছরের বালিকার বিয়ে হত, সে তো তুচ্ছ।]    

ভগবান শ্রীহরি মহর্ষি কর্দমকে এই উপদেশ দিয়ে সরস্বতীনদীতীরের বিন্দুসর নামের সেই আশ্রম থেকে বিদায় নিলেন ও গরুড়ের পিঠে আরোহণ করলেন। মহর্ষি দেখলেন, শ্রীহরি গরুড়ের পিঠে চড়ে চলেছেন এবং সিদ্ধগণ নিখিল তপোমন্ত্র সাধনায় তাঁর স্তব করছেন। এদিকে গরুড়ের পাখার ধ্বনিতে সামবেদের অভিব্যক্তি ও সামবেদের আধারস্বরূপ ঋকবেদ সমূহ উচ্চারিত হয়ে শোনা যাচ্ছিল। শ্রীহরি দৃষ্টির বাইরে চলে যাবার পর, মহর্ষি কর্দম স্বায়ম্ভূব মনুর আসার অপেক্ষায় বিন্দুসর আশ্রমেই রয়ে গেলেন”। 

শ্রী মৈত্রেয় বললেন, “এদিকে উপযুক্তা কন্যার জন্য পতির সন্ধানে স্বায়ম্ভূব মনু তাঁর সোনার অলংকারে সাজানো রথে বেশ কিছুদিন ধরেই পর্যটন করছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন পত্নী শতরূপা ও সুশীলা কন্যা দেবহূতি। নানান দেশ, নানান রাজ্যে ঘুরতে ঘুরতে তাঁরা এসে পৌঁছলেন, সরস্বতী নদীর তীরে বিন্দুসর আশ্রমে। এই ক্ষেত্রে শরণাপন্ন কর্দমের প্রতি করুণাবশতঃ ভগবানের নয়ন থেকে একবিন্দু আনন্দ অশ্রু পড়েছিল, সেই থেকেই ওই স্থানের নাম বিন্দুসরঃ হয়েছিল। এই আশ্রম সরস্বতীর পুণ্যজলে সিক্ত এবং মহর্ষিগণের অবস্থানে পবিত্র।

রাজর্ষি মনু তাঁর অনুচরদের সঙ্গে আশ্রমে প্রবেশ করলেন। সেই সময় মুনিবর কর্দম সবেমাত্র হোম সমাধা করে বিশ্রাম করছেন। সদ্য হোম সমাপনের জন্যে তাঁর শরীর উজ্জ্বল তেজময় ছিল। রাজর্ষি তাঁর কাছে গিয়ে দেখলেন, মহর্ষির শরীর ঋজু, তাঁর দুই চোখ পদ্মের পাপড়ির মতো, তাঁর মাথায় জটা এবং অঙ্গে বল্কল বসন। অসংস্কৃত মহামণিকে যেমন কিছুটা মলিন দেখায়, তাঁকে দেখে রাজর্ষির সেরকমই মনে হল। রাজর্ষি তাঁর পায়ের কাছে প্রণত হলে, মহামুনি কর্দম তাঁকে আশীর্বাদ করলেন ও অভিনন্দন করে হাত পা ধোবার জল ও বসার জন্য দিলেন কুশাসন। 

হাত পা ধুয়ে রাজর্ষি আসনে বসার পর, মহর্ষি কর্দম বললেন, “আপনি সাধু ব্যক্তির রক্ষা ও অসাধু ব্যক্তিদের শাস্তি বিধানের জন্য সর্বদাই ব্যস্ত থাকেন। কারণ আপনিই ভগবান শ্রীহরির পালনী শক্তি। আপনি প্রতাপে সূর্য, যশে চন্দ্র, পরাক্রমে অগ্নি, ঐশ্বর্যে ইন্দ্র এবং দুষ্ট নিগ্রহে যম। আমার মনে হচ্ছে, আমার ইষ্টদেব শ্রীবিষ্ণুই যেন আপনার রূপ ধরে আর একবার আমার সামনে উপস্থিত হয়েছেন, আপনি আমার নমস্কার গ্রহণ করুন। রাজ্য শাসনের স্বাভাবিক নিয়মেই আপনি ঘুরতে ঘুরতে হয়তো আমাদের আশ্রমে এসেছেন, কিন্তু আপনার এই আশ্রমে আসার যদি বিশেষ কোন কারণ থেকেও থাকে, অনুগ্রহ করে ব্যক্ত করুন, হে মহারাজ। আমরা খুব আনন্দের সঙ্গে আপনার উদ্দেশ্যসাধনের প্রয়াস করবো”। 

পরের পর্ব - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/৯ "

মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩৬

   প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

 তৃতীয় ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ "

পঞ্চম ধারাবাহিকের শুরু - " স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "; "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "




[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩৫ "


৪১ 

কমলিমায়ের উঠোনে নিঃশব্দে গিয়ে দাঁড়াল ভল্লা আর রামালি। ঘরের দরজাটা বন্ধ নয়, ভেজানো। দরজার ফাঁক দিয়ে দীপের ম্লান আলোর আভাস আসছে। ভল্লা দাওয়ায় উঠল – হাল্কা চাপ দিতে খুলে গেল দরজাটা। কমলিমা মেঝেয় বসে আছেন, খাটিয়ার ওপর দুহাতের মধ্যে মাথা রেখে। খাটিয়ায় পরিষ্কার বিছানা টানটান করে পাতা, যেন কেউ এখনই আসবে – এসে শোবে। আর তার অপেক্ষাতেই বসে থেকে থেকে কমলিমা ঘুমিয়ে পড়েছেন। ভল্লার বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠল। কী অসহায় শূণ্যতা নিয়েই না এখন বেঁচে রয়েছেন কমলিমা। ভল্লা নিঃশব্দে কমলিমায়ের পাশে গিয়ে বসল। তার পিছনে সামান্য দূরে বসল রামালি।

ভল্লা অতি সন্তর্পণে কমলিমায়ের কাঁধে হাত রেখে চাপা স্বরে বলল, “এমন করে বসে আছিস, কেন রে মা?”

কমলিমা মাথা তুলে তাকালেন, ভল্লাকে দেখে বললেন, “ভল্লা? কতক্ষণ এসেছিস, তুই? জানতেই পারিনি”। কমলিমা হাসলেন – সে হাসির মধ্যে এতটুকু আনন্দ প্রকাশ পেল না, বরং ফুটে উঠল বিষণ্ণ নির্লিপ্তি। কমলিমা আবার বললেন, “এতদিনে তোর সময় হল? ওই দিন আমার কাছে একটি বারের জন্যেও আসতে পারলি না? কিন্তু শুনলাম তুই শ্মশানে গিয়েছিলি?”

“হুঁ। গিয়েছিলাম। তোর কাছে আসতে সেদিন ভয় পেয়েছিলাম মা। সেদিন গ্রামের মেয়ে-পুরুষ অনেকেই তোর কাছে ছিল...তারা কে কী বলবে...সেই ভয়...”।

“হ্যাঁ এসেছিল, গ্রামের সবাই। কবিরাজদাদা আর তুই - ছাড়া। সেদিন গ্রামের সবাই বলছিল আমাকে মুখে আগুন দিতে হবে। আমাকে শ্মশানে যেতে হবে। পাগল নাকি? তাই কখনও হয়, বল? মেয়েরা শ্মশানে যায়? আর আমি কেন মুখে আগুন দিতে যাব? আমি কী আঁটকুড়ি নাকি? গাঁয়ের লোক কী যে বলে না...”। ভল্লা কোন কথা বলল না, তাকিয়ে রইল কমলিমায়ের শীর্ণ অবসন্ন মুখের দিকে।

“তুই এলে, তোকেই বলতাম। যা ছেলের কাজটা করে আয়। এলি না। হ্যারে মুখে আগুন না দিলে আত্মার সদ্গতি হয় না, না? তাহলে কী হবে? এখন মনে হচ্ছে ভুলই করেছি...লোকের কথা শুনে...শ্মশানে গেলেই হত...হ্যারে আমার কী পাপ হল?” গলার কাছে রুদ্ধ হয়ে থাকা কষ্টটাকে ভল্লা এতক্ষণ সামলে নেওয়ার চেষ্টা করছিল। মুখ তুলে কমলিমায়ের শিরা-বিকীর্ণ কঙ্কালসার হাতটা দুহাতে ধরে বলল, “পাপ কেন হতে যাবে রে, মা? আর প্রধানমশাইয়ের আত্মার সদ্গতিই বা হবে না কেন? এইসব কথা চিন্তা করে তুই বসে বসে রাত জাগছিস, মা? গ্রামের মেয়েদের কেউ রাত্রে তোর কাছে থাকে না”?

“ধুর। সন্ধে হলেই আমি তাদের তাড়িয়ে দিই। খুব ভয় করে জানিস? কচি কচি মেয়েগুলো সারারাত  আমার সঙ্গে থাকবে – যদি কিছু হয়ে যায়? খুব ভয় করে। বলি পালা আমার সামনে থেকে”।

“কিসের ভয় মা?”

“নিজের পেটের দু-দুটো ছেলেকে খেয়েছি। স্বামীকে খেয়েছি। আমার বিয়ে হয়েছিল আট বছর বয়সে, এ বাড়িতে এসেছি আমার তের বছর বয়সে। শ্বশুর-শ্বাশুড়ি বলতেন আমি নাকি খুব লক্ষ্মীমন্ত। কবিরাজদাদা বলত তুই খুব ডাকাবুকো ছেলে – ভয়ডর কম। আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বল তো – ভয় করছে না? আমার চোখে অকল্যাণের ছায়া দেখতে পাচ্ছিস না? পুকুরে চান করতে গিয়ে জলে ছায়া পড়ে – স্পষ্ট দেখতে পাই একজোড়া ডাইনীর চোখ”।

চণ্ড রাগে ভল্লা বলে উঠল, “কী আজেবাজে বকছিস, মা? মা কোনদিন ডাইনী হয়? তুই আমার সঙ্গে চল, মা। এই ঘরে একা একা সারাদিন এইসব চিন্তা করে তুই নিজেকে শেষ করে দিবি নাকি? কোন কথা নয় - এখনই ওঠ। সারাদিন তোর কাজ নেই কম্মো নেই, নাওয়া নেই খাওয়া নেই, ঘুম নেই...। আর তাকিয়ে দ্যাখ, রামালি আর আমি সারাদিন-রাত খেটে মরছি। তারপরেও ঘরে ফিরে রামালি দু বেলা হাত পুড়িয়ে রান্না করে – নিজে খায়, আমাকে খাওয়ায়...। আজ তুই চ আমাদের সঙ্গে – এ ঘরে তোকে আমি রাখব না। কত বড়ো ডাইনী তুই হয়েছিস, আমাদের দেখা তো, মা? তোর চোখের বিষে আমাদের কেমন শুকিয়ে মারতে পারিস – চল আমাদের সঙ্গে – দেখি। ওঠ। না উঠলে, তোর ঘাড় ধরে তুলে নিয়ে যাবো, এই বলে রাখলাম, মা। এই গোঁয়ার-গোবিন্দ ছেলেকে তুই ভালই চিনিস। এখনই ওঠ...”।

“পাগল হয়েছিস, ভল্লা? এ আমার স্বামীর ভিটে – এ আমার শ্বশুরের ভিটে...এ সব ছেড়ে...। তাছাড়া তোরা সব উড়নচণ্ডে ছেলে...দল বেঁধেছিস লড়াই করবি বলে...”।

ভল্লা উঠে দাঁড়াল, বলল, “হ্যাঁ, তাই...কিন্তু উড়নচণ্ডেদেরও মা থাকে, ভাইবোন থাকে...রামালি ওঠ। এই বিছানা, আর কমলিমায়ের শাড়ি-টাড়ি গামছা-টামছা – হাতের সামনে যা পাচ্ছিস নিয়ে একটা পুঁটলি বানা...চল। আর এক মুহূর্তও এখানে নয়...”। রামালি উঠে পড়ল - দ্রুত হাতে গুছিয়ে তুলতে লাগল কমলিমায়ের কাপড়-চোপড়।

কমলিমা চেঁচিয়ে উঠলেন, “অ্যাই, রামালি – যেমন ছিল সব রেখে দে - কিচ্ছুতে হাত দিবি না – মেরে ঠ্যাং ভেঙে দেব...”।

ভল্লা হা হা করে হেসে উঠল, পাঁজাকোলা করে দুহাতে তুলে নিল কমলিমাকে, বলল, “তুই যদি রামালির ঠ্যাং ভাঙতে পারিস, তাহলে আমরাও তোর ঘাড় ভাঙতে পারি, মা। কী শরীর, রে তোর? আমাদের ওদিকের পায়রাগুলোও তোর থেকে ভারি হয় ...হা হা...”।

কমলিমা কঠোর চোখে ভল্লার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমায় নামিয়ে দে ভল্লা। সেবা-যত্ন করে তোকে সুস্থ করে তুলেছিলাম, আমার সঙ্গে এই ব্যবহার করবি বলে?”

ভল্লা হাসতে হাসতে বলল, “তোর ওই ডাইনী চোখের ভিরকুটিতে আমি ডরাবার পাত্র নই... আর আমি যে ডাকাত - সে কথা কবিরাজদাদা তোকে বলেনি? সারা জীবনে অনেক ডাকাতি করেছি - অস্ত্র-শস্ত্র, টাকাকড়ি...কিন্তু মা ডাকাতি কোনদিন করিনি...”।

ভল্লা দাওয়া পেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠোনে নামল, রামালি প্রদীপ নিভিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে দরজার শেকল তুলে দিল। তার কাঁধে বেশ বড়ো একটা পুঁটলি। দুজনে অন্ধকারের মধ্যে কমলিমায়ের বাড়ির বেড়া টপকে এগিয়ে চলল জঙ্গলের দিকে। ভল্লার বুকের মধ্যে শীর্ণ পাখির মতোই আবদ্ধ কমলিমা অনর্গল বকাবকি করতে লাগলেন ভল্লাকে...হতভাগা ছেলে, গাঁয়ের লোক কি বলবে? আমার সন্তান গেছে – আমার স্বামীও গেল – এ গ্রামে বাকি ছিল একটু মান-সম্মান – সেটাও গেল তোর জন্যে – কাল সকালে গাঁয়েগাঁয়ে ঢিঢি পড়ে যাবে প্রধানের বউ – ভল্লার সঙ্গে পালিয়েছে – এখনও বলছি আমায় নামিয়ে দে ভল্লা – মুখপোড়া বাঁদর – তোর জ্বালায় আমাকে শেষ অব্দি গলায় দড়ি দিতে হবে…”!

উপানুদের মারে মারাত্মক আহত হয়ে গ্রামপ্রধান জুজাক যেদিন থেকে নিশ্চেতন অবস্থায় শয্যাশায়ী হলেন – সেই দিন থেকেই কমলিমায়ের অনিয়ম শুরু হয়েছিল। তাঁর জীবন থেকে মুছে গিয়েছিল নিয়মিত নাওয়া-খাওয়া, ঘুম-বিশ্রাম, হাসি-আনন্দ, এমনকি প্রতিবেশী মহিলাদের সঙ্গে স্বাভাবিক বাক্যালাপও। আজ ভল্লার সঙ্গে দীর্ঘ বাক-যুদ্ধের উত্তেজনা এবং ভল্লার উদ্ভট এই আচরণের অসহায় প্রতিবাদ করতে করতে তিনি একসময় ভেঙে পড়লেন। তিনি যেন ভল্লার বুকেই নিজেকে সমর্পণ করে ফেললেন। জুজাকের মৃত্যুতেও যিনি এতটুকু অশ্রুপাত করেননি, আজ ভল্লার ওপর রাগে, অভিমানে তাঁর দুচোখে নেমে এল রুদ্ধ অশ্রুস্রোত।

ভল্লা অন্ধকারেও টের পেল, কমলিমায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল, “কেঁদে নে মা, কেঁদে নে…বুকের মধ্যে অনড় পাথরের মতো জমে ওঠা যত অপমান, দুঃখ-শোক বেরিয়ে আসুক চোখের জল হয়ে। একদিন সকলকেই মরতে হবে। কিন্তু এভাবে তুই নিজেকে শেষ করতে পারিস না, মা – আমাদের জন্যেই তোকে বাঁচতে হবে। বাঁচতে হবে রামালির জন্যে – এই গ্রামের জন্যে”।        

জঙ্গলে ঢুকে ভল্লা কমলিমাকে সাবধানে ঘাসে বসাল, তারপর রামালিকে বলল, “তোর পুঁটলি থেকে একটা শাড়ি বের কর তো, রামালি। তারপর ঝোলা বানিয়ে আমার পিঠে শক্ত করে বেঁধে দে বুড়িটাকে। দেখিস একটুও যেন নড়তে না পারে”।

কান্না রুদ্ধ গলায় কমলিমা বলে উঠলেন, “কেন? আমি তো পাখির মতো হাল্কা, আমাকে নিয়ে এটুকু আসতেই তোর হাঁফ ধরে গেল?”

ভল্লা কমলিমায়ের পায়ের ওপর হাত রেখে বলল, “আমরা এখন রণপা চড়ে যাবো, তোকে দুহাতে ধরতে পারবো না, সেই জন্যেই রামালিকে বলছি আমার পিঠে তোকে ঝুলিয়ে দিতে। রাগ করিস নে মা। একজন মা স্বেচ্ছায় তিলতিল করে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলেছে, সে কথা বুঝেও কোন ছেলের পক্ষে ঠাণ্ডা থাকা সম্ভব? আচ্ছা বেশ, আমি তো তোর ছেলে নই – তাহলে তুই কেন নাওয়া-খাওয়া ভুলে আমার সেবা করে সুস্থ করেছিলি? আমি তোর ছেলে নই, তাই কোন অধিকারে আমি তোর ওপর এমন জোর খাটাচ্ছি, এখন তোর তাই মনে হচ্ছে, না রে মা…?”

কমলিমা হঠাৎই ফুঁসে উঠলেন, দুহাতে ভল্লার চুলের মুঠি ধরে বললেন, “আমি তোকে তাই বললাম বুঝি?” তারপর দুহাতে ভল্লার মাথাটা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে আবার কান্নায় ভেঙে পড়লেন। ভল্লা ভীষণ নরম গলায় বলল, “কাঁদ মা, কাঁদ – কেঁদে হাল্কা হ। কিন্তু এত উত্তেজিত হস না, তোর দুর্বল শরীর…”। রামালি স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছিল কমলিমাকে, এরকমই কী হয় মায়েরা? ধীরে ধীরে সেও ওদের কাছে এসে বসল। ভল্লা রামালিকে দেখিয়ে বলল, “দ্যাখ মা, রামালির মুখটা দ্যাখ। হতভাগা বাচ্চাবেলায় মাকে হারিয়েছে – বড়ো হয়েছে কাকির গালমন্দ খেতে খেতে – কেমন অবাক হয়ে তোকে দেখছে দ্যাখ…”। রামালিকেও কাছে টেনে তার মাথায় হাত রেখে কমলিমা কান্নাভেজা গলায় বললেন, “কোন চুলোয় নিয়ে যাবি চল, রাত শেষ হতে চলল – ছেলেরা বলে তুই আর রামালি নাকি খুব খাটিস সারাদিন… ঘুমোবি কখন?”

পরের পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩৭ " 

সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৫/১৩

 ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "

ধর্মাধর্ম শেষ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৫/১ "

 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  


[এর আগের পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৫/১২ "]

৫.৪.১.২ কৃষ্ণের ইন্দ্র বিরোধ

একবার রাম-কৃষ্ণ গোকুলে যাওয়ার পথে দেখলেন, গোপেরা ইন্দ্রযজ্ঞ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তিনি পিতাকে এই যজ্ঞের কথা জিজ্ঞাসা করায় গোপরাজ নন্দ বললেন, “বৎস, ভগবান ইন্দ্র মেঘের দেবতা। বর্ষায় মেঘ থেকে তিনি বৃষ্টি দেন বলেই আমাদের ক্ষেত্র, নদী, সরোবর সরস হয়, আমাদের সমৃদ্ধি আসে। এই কারণেই আমরা দেবরাজ ইন্দ্রের প্রীতির জন্যে এই যজ্ঞের অনুষ্ঠান করি”। এর উত্তরে কৃষ্ণ যে কথাগুলি বললেন, সেগুলিকে বৈপ্লবিক বললেও কম বলা হয়। তিনি বললেন, “পিতা, নিজের কর্মবশেই জীব সুখ, দুঃখ, ভয় বা মঙ্গল ভোগ করে। যদি কর্মফল দাতা কোন ঈশ্বর থেকে থাকেন, তিনি কর্মকর্তাকেই সমর্থন করবেন। কারণ যে কোন কর্মই করে না, তাঁকে তিনি ফল দেবেন কী করে? চতুর্বণ অনুযায়ী কর্ম নির্দিষ্ট করা আছে। ব্রাহ্মণরা বেদপাঠ ইত্যাদি, ক্ষত্রিয়রা পৃথিবীর রক্ষণাবেক্ষণ, বৈশ্যরা বার্তা অর্থাৎ কৃষি-বাণিজ্য এবং শূদ্ররা তিনবর্ণের সেবা করে জীবিকা নির্বাহ করবে। বৈশ্যবৃত্তি চার ধরণের কৃষি, বাণিজ্য, গোরক্ষা ও কুসীদ[1]। এর মধ্যে আমরা গোপালন করে থাকি।

তাছাড়া সৃষ্টি, স্থিতি ও ধ্বংসের কারণ যথাক্রমে সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ গুণ। মেঘরাজি রজোগুণে পরিচালিত হয়ে, বর্ষা ঘটায়, তার থেকে শস্যাদি উৎপন্ন হয় এবং মানুষ শস্য দিয়ে জীবনধারণ করে। এখানে ইন্দ্রের ভূমিকা কোথায়? আমরা বনবাসী, আমাদের নগর ও জনপদ কিছুই নেই। অতএব আমাদের কর্তব্য গো, ব্রাহ্মণ ও পর্বতের উদ্দেশে যজ্ঞ করা। পিতা, এই আমার অভিমত। আপনি যদি ভালো মনে করেন, তাহলে ইন্দ্রযজ্ঞ ছেড়ে এই যজ্ঞের অনুষ্ঠান করুন। এই যজ্ঞ ব্রাহ্মণদের এবং আমারও অভিপ্রেত”। গোপরাজ নন্দ খুশি মনেই গো, ব্রাহ্মণ ও পর্বত যজ্ঞের অনুষ্ঠান সম্পন্ন করলেন।

ওদিকে স্বর্গে বসে ইন্দ্র শুনলেন, ব্রজে তাঁর যজ্ঞ স্থগিত হয়ে গেছে। তিনি কৃষ্ণ ও গোপরাজ নন্দের উপর ক্রুদ্ধ হয়ে সংবর্তক নামের ভয়ংকর মেঘকে পাঠালেন, প্রবল বর্ষণ ও বজ্রপাতে ব্রজের গোষ্ঠকে প্লাবিত করার জন্যে। তিনি বললেন, “কৃষ্ণ কে? একজন সাধারণ মানব। সে অবিনীত, অজ্ঞ, বাচাল, বালকমাত্র। ঐশ্বর্যের অহংকারে গোপেরা উদ্ধত হয়ে, আমার অপ্রিয় আচরণ করল? সংবর্তক, যাও, তুমি গোপদের ঐশ্বর্য এবং তাদের পশু সম্পদ ধ্বংস করে এসো”।

সংবর্তকের প্রভাবে গোকুলে প্রবল ঝড়, ঝঞ্ঝা ও শিলাবৃষ্টি শুরু হল। প্রবল বর্ষণে নদীতে বন্যা দেখা দিল। কৃষ্ণ বুঝতে পারলেন, ইন্দ্রের যজ্ঞ না করাতে, ইন্দ্র ক্রুদ্ধ হয়েছেন। তিনি নিজের হাতে গোবর্ধন পর্বত তুলে নিলেন এবং ব্রজবাসী সবাইকে বললেন, সমস্ত পশুদের নিয়ে, সেই পর্বতের গুহায় আশ্রয় নিতে। ব্রজবাসীরা তাই করলেন এবং সাতদিন প্রবল বর্ষণের মধ্যে তাঁরা সকলেই নিরাপদে সেই পর্বতের অন্দরে বাস করলেন। সাতদিন ধরে গোবর্ধন পর্বতকে হাতে ধারণ করে থাকা শ্রীকৃষ্ণের অদ্ভূত বিক্রমে ইন্দ্র হার মানলেন, তিনি বর্ষণে ক্ষান্ত হলেন। মেঘ সরে গিয়ে উজ্জ্বল সূর্যের উদয় হল। ব্রজবাসীরা গিরি কন্দর ছেড়ে বের হয়ে এলেন, শ্রীকৃষ্ণও গোবর্ধন পর্বতকে আবার যথাস্থানে স্থাপনা করলেন।

ইন্দ্র পূজা ছেড়ে, গো-ব্রাহ্মণের পূজা করার মধ্যে, ব্রাহ্মণ্যধর্মকে অবহেলা করে হিন্দুধর্মের প্রতিষ্ঠা বলেই আমি মনে করি। হিন্দু ধর্মে ভগবান কৃষ্ণ-গোবিন্দের স্তবের মন্ত্রই হল “ওঁ ব্রহ্মণ্যদেবায়, গো-ব্রাহ্মণ হিতায় চ, জগদ্ধিতায় শ্রীকৃষ্ণায়, গোবিন্দায় নমোনমঃ”। আরও একটা বিষয়ে খটকা লাগে, দেবরাজ ইন্দ্র যখন শুনলেন, ব্রজবাসীরা তাঁর পূজা বন্ধ করেছেন এবং এর পিছনে আছেন কৃষ্ণ, তখন তিনি কৃষ্ণকে “অবিনীত, অজ্ঞ, বাচাল, বালক” বললেন কেন? দেবরাজ হয়েও তিনি কী জানতেন না, কৃষ্ণরূপে ভগবান বিষ্ণুই মর্তে আবির্ভূত হয়েছিলেন? পৃথিবীতে ধর্ম সংস্থাপনের জন্যে কৃষ্ণ হয়ে ভগবান বিষ্ণুর আবির্ভাবের অনেক আগে থেকেই স্বর্গের দেবমহলে এর প্রস্তুতি হয়েছিল, শ্রীরামচন্দ্রের আবির্ভাবের পূর্বপ্রস্তুতির মতো। যেমন, ব্রজরাজ নন্দ, তাঁর দুই রাণি – রোহিণী ও যশোদা, বলরাম (যিনি বিষ্ণুর অংশ-অবতার) এবং ব্রজের সকল গোপ ও গোপীগণ স্বর্গ থেকে আবির্ভূত, তাঁরা কৃষ্ণের আগে জন্ম নিয়েছিলেন, শিশু ও বালক কৃষ্ণকে লালন-পালনের জন্য। রাজা কংসের চোখে ধুলো দিতে, কৃষ্ণের সঙ্গে একই সময়ে আবির্ভূতা হয়েছিলেন, দেবী যোগমায়া। দেবরাজ ইন্দ্র স্বর্গের এই সব সংবাদ কিছুই জানতেন না?  কেমন দেবরাজ তিনি? নাকি পুরাণকারেরা কাহিনী কল্পনার সময়, এই দিকটি খেয়াল রাখেননি? নাকি অনার্য বা হিন্দু দেবতার কাছে বৈদিক দেবরাজের লাঞ্ছনার ঘটনাটি ইচ্ছাকৃত ভাবেই উপস্থাপিত করেছেন? 

 ৫.৪.১.৩ রাস উৎসব

মহিলা মহলে কৃষ্ণের আধিপত্য ছিল প্রবল। ব্রজের বয়স্থা মহিলাদের আদর্শ ছিলেন মা যশোদা, তাঁদের সকলেই দুরন্ত শিশু ও বাল-কৃষ্ণের দৌরাত্ম্য অনুভবের স্বপ্ন দেখতেন। বালক-কৃষ্ণের মুখ দর্শনেই তাঁদের কুচযুগ পয়স্বিনী হয়ে উঠত। আবার ব্রজের কিশোরী থেকে যুবতীরাও তাঁর দর্শন এবং স্পর্শ লাভের জন্যে ব্যাকুল। এমন কি বিবাহিতা রমণীরাও কৃষ্ণ প্রেমে উন্মাদিনী। তাঁদের এই গণ উন্মাদনার কারণ কৃষ্ণের রূপ, তাঁর অপ্রচলিত বেশভূষা, তাঁর অলৌকিক কীর্তির প্রবাদ এবং তাঁর মোহন-বাঁশির সুরের জাদু। সবার উপরে রয়েছে তাঁর কোমলে-কঠোর মেশা অসাধারণ ব্যক্তিত্ব।

মহিলা মহলে কৃষ্ণের এই গণ সম্মোহনকে ভাগবত শাস্ত্রে রাস-উৎসব, রাস-যাত্রা বা রাস-ক্রীড়া বলা হয়েছে। রাস শব্দের উৎপত্তি রস থেকে, আবার রাস শব্দের অর্থ শব্দ, ধ্বনি বা কোলাহল। অর্থাৎ রাস-উৎসব রসময় কোলাহল। 

সেদিন কার্তিকমাসের পূর্ণিমা তিথি। পূর্ণ চন্দ্র উদিত হয়েছে পূর্ব আকাশে। সামান্য হিমের পরশ লাগা স্নিগ্ধ বাতাস বহমান। যমুনার তীরে একাকী ভ্রমণ করতে করতে, কৃষ্ণ তাঁর বাঁশিতে তুললেন অদ্ভূত মোহন সুর। গোপপল্লীগুলিতে সেই মোহিনী সুরের মন-কাড়া জাদু বয়ে নিয়ে গেল হেমন্তের মনোরম বাতাস। নির্মেঘ  আকাশ প্লাবিত নির্মল জ্যোৎস্নায়। বাতাসে ভেসে আসা সূরমূর্ছনা, আকাশের মোহিনী আলোক গোপনারীদের ঘর ছাড়তে বাধ্য করল। কেউ রান্না করছিলেন, কেউ শিশুকে স্তন্যপান করাচ্ছিলেন, কেউ স্বামীসেবা করছিলেন। যাঁর যা কিছু হাতের কাজ ফেলে, তাঁরা দৌড়ে চললেন যমুনার তীরে। তাঁদের পিতা, মাতা, স্বামী, পুত্র, ভ্রাতারা নিষেধ করলেন বারবার, কিন্তু ওই আহ্বানে সাড়া না দিয়ে তাঁদের যে অন্য কোন উপায় নেই! তাঁরা সমবেত হলেন যমুনা পুলিনে।

বাঁকুড়া - বিষ্ণুপুরের শ্যামরাই মন্দিরের দেওয়ালে "রাসযাত্রা"-র টেরাকোটা মোটিফ। চিত্র - লেখক।  

সমবেত ব্রজবালাদের দেখে লীলাপুরুষ বললেন, “এত রাত্রে তোমরা এখানে কেন? তোমরা কী জানো না, নির্জন এই যমুনাতটে এখন নিশাচর পশুরা ঘুরে বেড়ায়? তোমরা এখনই ব্রজপল্লীতে ফিরে যাও, সেখানে তোমাদের মাতা-পিতা-পতি-ভ্রাতারা তোমাদের দেখতে না পেয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছেন। তোমাদের আচরণে বন্ধু ও আত্মীয়দের মনে সন্দেহের সৃষ্টি করো না”। গোপললনারা কৃষ্ণের কথায় হতাশ হলেন, তাঁরা প্রণয়-অভিমানে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠলেন। কৃষ্ণ স্মিতমুখে আবার বললেন, “তোমরা কি, যমুনার তীরে পূর্ণ-জ্যোৎস্নার শোভা দেখতে এসেছ? তাহলে বলি, দেখা তো হয়েছে, এবার গৃহে ফিরে যাও। হে কল্যাণি, তোমরাই গৃহের ঐশ্বর্য, তোমরা ঘরে ফিরে পতি, পিতা-মাতা-সন্তান-শিশুদের সেবায় মনোনিবেশ করো। হে কুলকামিনীগণ, আমার ধ্যান, চিন্তা বা আমার কথাতে যেমন প্রীতিবন্ধন হয়, আমার স্পর্শে তেমন হয় না। অতএব তোমরা এখনই ঘরে ফিরে যাও”।

গোপললনারা ক্ষুব্ধ স্বরে বললেন, “হে প্রভো, এমন কঠিন কথা তোমার বলা উচিৎ হচ্ছে না। স্বামী-পুত্র-সংসার সব ছেড়েই আমরা তোমার কাছে এসেছি। তোমার সেবা করলেও স্বামী-পুত্রেরই সেবা হবে। আমাদের যে মন ও হাত এতদিন সংসারের কাজে সতত লিপ্ত ছিল, সেই মন ও হাত তুমি কেড়ে নিয়েছ। আমরা জেনেছি, তুমিই সেই আদি পুরুষ, যিনি দেবতাদের রক্ষা করেন, এখন এসেছ আমাদের ব্রজভূমির দুঃখনাশ করতে। আমরা তোমার কিংকরী, তোমার করকমল আমাদের তপ্ত স্তনে এবং মাথায় অর্পণ করো, আমাদের তৃপ্ত করো”। এর পর কৃষ্ণ মনোরম যমুনা পুলিনে গোপললনাদের আলিঙ্গন করলেন, তাঁদের হাতে, চুলে, উরুতে, কোমরে, স্তনে হাত রাখলেন। শতাধিক গোপরমণী তাঁর স্পর্শে মানিনী হয়ে উঠলেন। তাঁরা সকলেই নিজেকে জগতের শ্রেষ্ঠ নারী বলে মনে করলেন। গোপীদের এই গর্ব, অভিমান ও তূরীয় অবস্থা দেখে কৃষ্ণ সেখান থেকে অদৃশ্য হয়ে গেলেন।

কৃষ্ণ অদৃশ্য হয়ে যেতে গোপ কামিনীরা তাঁর বিরহে অস্থির হয়ে উঠলেন। তাঁরা বনের তৃণ, গাছপালা, নদীর জল, বালুতট সকলের কাছে উন্মাদিনীর মতো, জিজ্ঞাসা করতে লাগলেন, তারা কৃষ্ণকে দেখেছে কিনা? তাঁদের মধ্যে কেউ নিজেই কৃষ্ণ হলেন, কেউ হলেন বৎসাসুর, কেউ হলেন পূতনা। তাঁরা নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলায় মত্তা হলেন। কেউ হামাগুড়ি দিয়ে বালকৃষ্ণের মতো আচরণ করতে লাগলেন। এক কথায় তাঁরা কৃষ্ণময় হয়ে নিজেদের মধ্যেই মত্ত হয়ে উঠলেন। এক সময়ে তাঁরা কৃষ্ণ বিরহে ব্যাকুল হয়ে কাঁদতে কাঁদতে গান ধরলেন।

এই সময়েই হঠাৎ উপস্থিত হলেন কৃষ্ণ। তাঁর অকস্মাৎ আবির্ভাবে গোপললনাদের মধ্যে আনন্দের স্রোত বয়ে গেল, গোপরমণীদের অবসন্ন শরীরে যেন প্রাণ ফিরে এল। তাঁরা সকলে কৃষ্ণকে আলিঙ্গন করে, মাঝখানে বসিয়ে, চারদিকে ঘিরে রাখলেন। একজন গোপকামিনী কৃষ্ণের প্রতি কটাক্ষ করে জিজ্ঞাসা করলেন, “হে কৃষ্ণ, কেউ ভজনা করলে, তাঁকেও অন্য কেউ ভজনা করেন। আবার তাঁকে কেউই ভজনা করেন না। অথবা কেউই কাউকে ভজনা করেন না। হে সখে, এই ব্যাপারটা কেমন, আমাকে বুঝিয়ে দাও তো!”

কৃষ্ণ বললেন, “সখীরা, যাঁরা পরষ্পরের ভজনা করেন, তাঁরা স্বার্থের জন্যেই ভজনা করেন, সেখানে ধর্ম বা বন্ধুত্বের কোন উদ্দেশ্য থাকে না। যাঁরা ভজনা করেন না, অথচ তাঁদের যাঁরা ভজনা করেন, তাঁরা পিতামাতার মতো দয়ালু ও স্নেহ অনুসারে দুই প্রকারের ভজনা করেন। দয়ালু ভজনায় নিষ্কৃতি লাভ হয় এবং যাঁরা স্নেহময় হয়ে ভজনা করেন, তাঁরা বন্ধুত্ব লাভ করেন। দরিদ্র ব্যক্তি হঠাৎ ধন লাভ করে, সে ধন যদি হারিয়ে ফেলে, তাহলে সে যেমন সর্বদা এই নিয়েই চিন্তায় মগ্ন থাকে, তেমনি তোমরাও সব ভুলে এতক্ষণ আমার চিন্তাতেই মগ্ন ছিলে। তোমরা গৃহের কঠিন শৃঙ্খল ছিন্ন করে আমার কাছে এসেছ, এই মিলন অনিন্দনীয়। আমি তোমাদের এই উপকারের কোন প্রতিদান দিতে পারবো না। সুতরাং প্রত্যুপকার করে আমি অ-ঋণীও হতে পারলাম না, আমার ঋণ মোচনের একমাত্র সহায় তোমাদের এই প্রেমবন্ধন”।

গোপীরা ভগবান কৃষ্ণের এই সান্ত্বনা বাক্যে, বিরহের কথা ভুলে উৎফুল্ল হয়ে উঠলেন এবং তাঁরা পরমানন্দে নিজেদের হাতে হাত রেখে কৃষ্ণকে ঘিরে নৃত্য ও গীত শুরু করলেন। কৃষ্ণ-গোবিন্দ রমণীবেষ্টনে আবদ্ধ হয়ে রাসলীলা করতে লাগলেন। রাস-উৎসব শুরু হল। কৃষ্ণ প্রতি দুই জন গোপীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে দুই হাত দুই গোপীর কাঁধে রাখলেন। প্রত্যেক গোপ রমণীরই মনে হল, কৃষ্ণ তাঁর পাশেই আছেন, তাঁর কণ্ঠে হাত রেখে তাঁর মুখের দিকেই তাকিয়ে রয়েছেন। এই রাস উৎসবে বিভোর হয়ে রইলেন গোপরমণীরা, তাঁদের সকলের অঙ্গেই কৃষ্ণের মোহন স্পর্শের অনুভব। রাত্রি শেষ প্রহরে কৃষ্ণের আদেশে তাঁরা যখন অনিচ্ছায় নিজ নিজ ঘরে ফিরলেন, কৃষ্ণ মায়ায় মোহিত ব্রজবাসীরা মনে করলেন, তাঁদের পত্নী, মা, ভগিনী ও কন্যারা সারারাত তাঁদের পাশেই ছিলেন।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, রাজস্থান, গুজরাট, মধ্যভারত এবং মথুরার মতো বেশ কিছু অঞ্চলের পশুপালক অনার্য গোষ্ঠীদের মধ্যে কৃষ্ণ নামে এক বংশীধারী রাখাল বালক ভীষণ জনপ্রিয় ছিলেন এবং বালদেবতা হিসেবে পূজিত হতেন। মহিলা মহলে তাঁর প্রভাব ছিল ঈর্ষণীয়। সেই অনার্য কৃষ্ণের নানান প্রবাদ কাহিনীকে আরও রমণীয় এবং কামোদ্দীপক (erotic) করে তুলেছিলেন পুরাণকারেরা। হয়তো তাঁরা মনে করেছিলেন, ধর্মরসের মধ্যে কিছুটা দৈবী আদিরস সঞ্চার করলে, সাধারণ জনসমাজ কৃষ্ণ সম্পর্কে আরও কৌতূহলী হয়ে উঠবে, বাড়বে ভাগবত ধর্মের প্রভাব। আজকাল শেভিং ক্রিম অথবা পুরুষের বেনিয়ানের বিজ্ঞাপনে পুরুষের পাশে যেমন লাস্যময়ী তরুণী থাকেন, তেমনই এই দৃষ্টি-আকর্ষণী বিজ্ঞাপনটিও রচনা করেছিল পুরাণকার। সেকালে বিজ্ঞাপন-শিল্পে আমরা যে মোটেই পিছিয়ে ছিলাম না, এটি তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।      

পরের পর্ব - " ধর্মাধর্ম - ৫/১৪ "



[1] কুসীদ মানে সুদ, কুসীদজীবী মানে যাঁরা সুদের বিনিময়ে ঋণ দেন, এখানে শ্রেষ্ঠী অর্থাৎ Banker।  


নতুন পোস্টগুলি

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৪/২

 এই সূত্রে - "    ঈশোপনিষদ "  এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ " এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও...