ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "
ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১ "
ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "
ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "
ধর্মাধর্ম শেষ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৫/১ "
"ধর্মাধর্ম" গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -
গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২
(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)
অথবা
+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।
[এর আগের পর্বাংশ - "ধর্মাধর্ম - ৫/১৮"]
৫.৫.১ অন্যান্য হিন্দু দেবতা
হিন্দুদের ত্রিদেব - অর্থাৎ ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর ছাড়াও জনপ্রিয়
আরও বেশ কিছু দেবতা রয়েছেন, যেমন কার্তিকেয়, গণেশ বা গণপতি। যদিও ষড়ানন কার্তিকেয় বা কার্তিকের জন্ম
নিয়ে বিভিন্ন ধরনের পৌরাণিক কাহিনী প্রচলিত আছে, তবু কার্তিক ও গণেশ, দুজনেই ভগবান শিব ও দেবী
পার্বতীর পুত্র হিসেবেই সমধিক পরিচিত। ভগবান গণেশের প্রধান দুটি রূপের মধ্যে
প্রথমটি হল তিনি সিদ্ধেশ্বর বা সিদ্ধিদাতা এবং দ্বিতীয়টি হল বিঘ্নেশ বা বিঘ্ন
নাশকারী। ভগবান গণেশ ভারতীয় হিন্দু বণিকমহলের একমাত্র দেবতা, তিনিই বাণিজ্যে সিদ্ধি
এবং ঋদ্ধি দান করেন। দেবতা হনুমান, তিনি প্রধানতঃ সংকট-মোচন এবং বিঘ্ন-নাশকারী ভারতের সর্বত্র
পূজিত এবং অত্যন্ত জনপ্রিয়। দেবতা বিশ্বকর্মা শিল্পী, কলাকুশলী ও দক্ষ কারিগর মহলে
অত্যন্ত জনপ্রিয়।
৫.৫.২ দেবীরূপা নদী
নদীসমূহতে দেবীত্ব আরোপ করার প্রাচীন প্রচলন যে অনার্য ভারতীয়দের মধ্যে
ছিল, সেকথা আমরা আগেই আলোচনা
করেছি। ব্রাহ্মণ্যধর্ম সেই নদীগুলিকেও নানান পৌরাণিক কাহিনীতে সাক্ষাৎ দেবীরূপে
বরণ করে,
হিন্দু
ধর্মের অন্তর্ভুক্ত করে নিল। হিন্দু ধর্মের যে কোন দেব বা দেবী পূজায় জলশুদ্ধি
একটি আবশ্যিক প্রকরণ এবং তার মন্ত্রটি হল, “গঙ্গে চ যমুনে চৈব গোদাবরি
সরস্বতি। নর্মদে সিন্ধু কাবেরি জলেস্মিন সন্নিধিং কুরু”।।
মন্ত্রোক্ত সাতটি নদীকে ভারতবর্ষের পবিত্রতম নদী হিসেবে মান্য করা হয়, যদিচ এগুলির মধ্যে
সরস্বতী নদী খ্রিস্টিয় চতুর্থ বা পঞ্চম শতাব্দীর মধ্যেই অবলুপ্ত হয়েছিল এবং সিন্ধু
নদী ১৯৪৭-এ দেশভাগের পর ভারতবর্ষের বাইরে রয়ে গেছে। কিন্তু তাও পূজার সময়
কোশা-কুশি বা তাম্র কুণ্ডের জল স্পর্শ করে, আজও আমরা এই মন্ত্রই উচ্চারণ করি, এবং বিশ্বাস করি ওই জলে
সাতটি নদীর পবিত্র জল যেন সংস্থিত হল। এই মন্ত্রটির আপডেটেড ভার্সান, “গঙ্গে চ যমুনে চৈব
গোদাবরি মহানদী। নর্মদে কৃষ্ণা কাবেরি জলেস্মিন সন্নিধিং কুরু” হওয়া যুক্তিযুক্ত
হলেও, আমরা সেই ১৩০০ সি.ই.-র
আগের মন্ত্রই সংস্কারবশতঃ ব্যবহার করে চলেছি ও চলব।
যাই হোক, এই সাতটি পবিত্র নদীর মধ্যে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ নদী গঙ্গা ও নর্মদা। গঙ্গা এবং নর্মদা সাক্ষাৎ দেবী মূর্তিতে পূজিতা হয়ে থাকেন।
৫.৫.২.১ গঙ্গা
গঙ্গা মকরবাহনা দেবী। একদিকে গঙ্গা ও তাঁর অজস্র শাখানদী ও উপনদীর
পবিত্র জলধারায় উত্তর ভারতের বিস্তীর্ণ জনজীবন একান্তভাবেই নির্ভরশীল। অন্যদিকে
তিনিই পাপীজনের সকল পাপ ও কলুষহারিণী। গঙ্গার ভৌগোলিক উৎস যেখানেই হোক, পৌরাণিক মতে গঙ্গার
উৎপত্তি ভগবান বিষ্ণুর চরণ থেকে। ভগীরথের তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে তিনি স্বর্গ থেকে
মর্ত্যে এসেছিলেন। কিন্তু তাঁর সেই প্রবল জলধারার প্রপাত ধারণ করার সাধ্য পৃথিবীর
ছিল না, অতএব ভগীরথের তপস্যায়
সন্তুষ্ট মহাদেব তাঁর জটায় গঙ্গার সেই প্রপাত ধারণ করলেন। তারপর ভগীরথের প্রদর্শিত
পথে গঙ্গা হিমালয় থেকে নেমে এলেন এবং দীর্ঘ পথ পরিক্রমা শেষ করলেন বঙ্গোপসাগরের
সঙ্গমে।
এ গেল পূতসলিলা গঙ্গা নদীর পৌরাণিক কাহিনী। এ ছাড়াও আছে দেবীরূপা
গঙ্গার কাহিনী। তাঁর অপরূপ সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে কুরুরাজ শান্তনু, গঙ্গাদেবীকে বিবাহের
প্রস্তাব দেন। দেবী গঙ্গা প্রথমে নারাজ হলেও, শর্ত সাপেক্ষে শান্তনু-জায়া হতে
সম্মতা হলেন। শর্ত ছিল, তাঁর গর্ভজাত পুত্রদের তিনি জন্ম মূহুর্তেই গঙ্গাজলে
বিসর্জন দেবেন,
এবং তাঁর এই
আচরণ বিনা প্রতিবাদে মেনে নিতে হবে রাজা শান্তনুকে। নচেৎ তিনি তৎক্ষণাৎ ত্যাগ
করবেন স্বামী ও সদ্যজাত পুত্রকে। রাজা শান্তনু নির্দ্বিধায় এই শর্ত মেনে নিলেন।
তারপর “ত্রিপথগামিনী গঙ্গা রমণীয় কলেবরধারণপূর্বক পরম ভাগ্যবান শান্তনু রাজার
মহিষী হইয়া মনোহর হাব-ভাব বিলাস ও সম্ভোগাদি দ্বারা নরেন্দ্রের মন মোহিত করিলেন”।
কয়েক বছরের মধ্যে দেবী গঙ্গা দেবতুল্য সাতটি পুত্র সন্তান প্রসব
করেছিলেন এবং পুত্ররা ভূমিষ্ঠ হওয়া মাত্র তাদের সকলকেই গঙ্গার ধারাস্রোতে বিসর্জন
দিচ্ছিলেন। রাজা শান্তনু প্রতিবারই দেবী গঙ্গার এই আচরণে ক্ষুব্ধ হলেও প্রিয়তমা
জায়ার বিরহের কথা মনে করে নির্বিকার রইলেন। এরপর অষ্টম পুত্র ভূমিষ্ঠ হতেই রাজা
শান্তনু আর থাকতে পারলেন না, পুত্রশোকে কাতর হয়ে বললেন, “এই পুত্রকে বিনষ্ট করিও না; তুমি কে? কী নিমিত্ত আত্মজদিগের
প্রাণবধ করিতেছ?
তুমি এই
গর্হিত নিষ্ঠুরাচরণে ক্ষান্ত হও”।
তখন দেবী গঙ্গা বললেন, “আমি এখন থেকেই তোমার সহবাস ত্যাগ করলাম। আমি মহর্ষি জহ্নুর
কন্যা, আমি গঙ্গা বা জাহ্নবী।
আমি যে সাতটি পুত্রকে গঙ্গা স্রোতে বিসর্জন করেছি, তাঁরা কেউই সাধারণ মানুষ নন, তাঁরা অষ্ট বসুর সাতজন।
মহর্ষি বশিষ্ঠের অভিশাপে তাঁরা মনুষ্য জন্ম নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। তুমি তাদের পিতা
এবং আমি তাদের মাতা হয়ে তাদের গর্ভে ধারণ করেছিলাম, এবং জন্ম মূহুর্তেই তাদের
গঙ্গাস্রোতে বিসর্জন দিয়ে তাদের শাপমুক্তি ঘটিয়েছি। তাঁদের যে প্রতিশ্রুতি আমি
দিয়েছিলাম,
আজ আমি তার
থেকে মুক্ত হলাম। অতএব আপনার সঙ্গে আমার পূর্ব শর্ত অনুযায়ী আমি ফিরে চললাম আমার
নিজস্থানে। আপনি আমার এই পুত্রকে গ্রহণ করুন, সে গঙ্গাপুত্র দেবব্রত নামেই
আপনার কাছে বড়ো হয়ে উঠুক”। এই শিশুই বড়ো হয়ে মহাবীর ও মহাজ্ঞানী হয়ে উঠেছিলেন, এবং পিতাকে সন্তুষ্ট করতে
কঠোর প্রতিজ্ঞা করে “ভীষ্ম” নাম অর্জন করেছিলেন। তাঁর হাত ধরেই এক সময় কৌরব বংশ
যেমন আর্যাবর্তের শ্রেষ্ঠ গোষ্ঠী হয়ে উঠেছিল, তেমনি তাঁর উদাসীনতায় তার ভয়ংকর
পতনও হয়েছিল। তাঁর পরোক্ষ সহযোগিতায় কুরু গোষ্ঠীর জ্ঞাতিশাখা পাণ্ডবরা উঠেছিলেন
উন্নতির শিখরে এবং ঘটনাচক্রে তৃতীয়-পাণ্ডব বীর অর্জুনই হয়েছিলেন তাঁর মৃত্যুর
কারণ। [মহা/আদি/৯৮]
৫.৫.২.২ নর্মদা
নর্মদা গঙ্গার মতো বিষ্ণুপদী নন। তিনি রুদ্রের কন্যা - ভগবান মহাদেবের
তেজ থেকে তাঁর জন্ম। গঙ্গার অপরিসীম মহিমার কথা মনে রেখেও মহর্ষি ভৃগু, কর্দম, কপিল, দুর্বাসা, অণীমান্ডব্য প্রমুখ
বলেছেন নর্মদা ভারতবর্ষের সমস্ত নদীকুলের মধ্যে শ্রেষ্ঠা; রুদ্রের তেজ থেকে তিনি সমুৎপন্না; স্থাবর জঙ্গম সমস্ত
কিছুকেই তিনি ত্রাণ করেন। শুদ্ধচিত্তে তাঁর তট পরিক্রমা করলে সর্বসিদ্ধি উপলব্ধি
করা যায়।
মহাভারতের বনপর্বে ঋষি পুলস্ত্য যুধিষ্ঠিরের তীর্থ ভ্রমণের সঙ্কল্পের
কথা শুনে তিনি উপদেশ দিয়েছিলেন, “দেখ যুধিষ্ঠির তুমি অন্যান্য তীর্থে তো যাবেই, কিন্তু বিশেষ করে
ত্রিলোক-প্রসিদ্ধা নর্মদা দর্শনে অবশ্যই যেও। নর্মদায় পিতৃপুরুষ এবং দেবতাদের
তর্পণ করলে,
অগ্নিষ্টোম
যজ্ঞের তুল্য ফললাভ হয়”।
নর্মদার উৎস মধ্যপ্রদেশের অনুপপুর জেলার মহাতীর্থ অমরকণ্টকে, যার অপর নাম মেকলে বা
ঋষ্য – বিন্ধ্য পর্বতের একটি শৃঙ্গ। এই নদী মধ্যপ্রদেশ ও গুজরাটের মধ্যে দিয়ে
পশ্চিমদিকে প্রবহমানা, এবং
এই দুই রাজ্যের জলসম্পদের প্রধানতম উৎস। এই নদীর দৈর্ঘ প্রায় ১,৩১২ কি.মি. এবং গুজরাটের
খাম্বাৎ খাঁড়ির কাছে আরব সাগরে মিলিত হয়েছে। এই মোহানা থেকে ৩০ কি.মি. দূরের ভারোচ
শহর, যার প্রাচীন নাম ছিল
ভৃগুকচ্ছ,
প্রাচীন
সমুদ্র বন্দর ও হিন্দুদের প্রাচীন তীর্থক্ষেত্র।
নর্মদার উত্তর তট বরাবর দাঁড়িয়ে আছে বিন্ধ্য পর্বতশ্রেণী আর দক্ষিণতটে
সাতপুরা পর্বতমালা। আজ থেকে একশ বছর আগেও নর্মদার উভয় তীরে ছিল শ্বাপদসংকুল
দুর্ভেদ্য অরণ্য রাজি। এই নিবিড় অরণ্য, দুই পর্বতশ্রেণী এবং তার মাঝখানে প্রবহমানা স্রোতস্বিনী
নর্মদার জন্যেই উত্তরভারত থেকে দক্ষিণভারতের যাওয়ার স্থলপথ বহুদিন দুরধিগম্য ছিল।
নর্মদা উপত্যকার প্রাচীনতা নিয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই, কারণ ধারণা করা হয় এটি পৃথিবীর প্রাচীনতম ভূভাগ গণ্ডোয়ানাভূমির
একটি অংশ। এই অঞ্চলের পলির নানান স্তরে বেশ কিছু ডাইনোসোরসের জীবাশ্মও উদ্ধার করা
গেছে।
এই নদীর উভয়তটেই অনার্য মানুষের সম্পন্ন জনপদ ও গ্রামের প্রাগৈতিহাসিক
কালের প্রত্ননিদর্শন পাওয়া গেছে বিস্তর। ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক কালে আমরা যে সব
সম্পন্ন নগর ও জনপদের সন্ধান পাই সেগুলি হল, মাহিষ্মতী, উজ্জয়িনী, বিদিশা, চেদি ইত্যাদি।
নর্মদা - এই ত্র্যক্ষর শব্দটি শৈবদের কাছে “গায়ত্রী”-র সমতুল্য একটি
বীজমন্ত্র। নৃ ধাতু থেকে নর্ম বা নর্মন
শব্দটি নিষ্পন্ন করা যায় – নর্ম কথার অর্থ ক্রিয়া, খেলা বা লীলা, আরও সঠিক বললে, আনন্দ-লীলা। অতএব নর্মদা কথার অর্থ যিনি আনন্দ-বিলাস দান
করেন। এই আনন্দের সংজ্ঞা মিলবে তৈত্তিরীয় উপনিষদের তৃতীয় ভৃগুবল্ল্যধ্যায়ের ষষ্ঠ
অনুবাকে –
“আনন্দই
যে ব্রহ্ম একথা জেনে রাখুন। কারণ আনন্দ থেকেই এই জীব ও জড় জগতের সৃষ্টি হয়, আনন্দের আবহেই তারা
প্রতিপালিত হয় এবং অন্তিমে এই আনন্দেই তারা ফিরে আসে ও আনন্দেই বিলীন হয়” [বাংলায়
সরল অনুবাদ – লেখক]। অতএব নর্মদা শুধু স্থূল ও সাধারণ জলধারা নয়, চিন্ময়ী রূপে তিনি
ব্রহ্মস্বরূপা আনন্দময়ীও। নর্মদার অন্য নাম রেবা, এই নামও বীজমন্ত্রের মতো জপ করলে, শোনা যায়, সর্বসিদ্ধি লাভ সম্ভব।
নর্মদার পবিত্রতা সম্পর্কে আরও জনশ্রুতি হল, সারাদিন স্নানরত পাপী ও তাপীদের
পাপ ও কল্মষ ধুতে ধুতে পতিতপাবনী গঙ্গা নিজেই যখন মলিন হয়ে ওঠেন, দিনান্তে তিনি নর্মদা
তটের কহ্লোড়ি ঘাটে আসেন কৃষ্ণা গাভীর বেশে। এবং নর্মদার পূত সলিলে অবগাহন করে
নির্মল শুভ্র গাভীরূপে ফিরে যান স্বস্থানে। শিব ভক্তগণ আরও বিশ্বাস করেন, নর্মদাতটের প্রতিটি কংকর
– অর্থাৎ প্রতিটি নুড়ি এবং কাঁকরই শিবময় শংকর। অতএব উওরভারতে কাশি যেমন একটি
শিবক্ষেত্র,
নর্মদা তট
তার থেকেও বরেণ্য শিবক্ষেত্র।
৫.৬.১ হিন্দু দেবী
বৈদিক দেবীদের তুলনায় হিন্দু দেবীর সংখ্যা এবং তাঁদের গুরুত্ব অপরিসীম।
বৈদিক বা ব্রাহ্মণ্য দর্শনের প্রকৃতি, যাঁর সংযোগে পুরুষোত্তম ব্রহ্ম এই জগতের সৃষ্টি, স্থিতি ও লয় করে থাকেন, হিন্দু ধর্মে সেই প্রকৃতি
হয়ে উঠলেন দেবী - তিনিই আদ্যাশক্তি, মহামায়া। ভগবান বিষ্ণু বা বলা ভাল তাঁর প্রধান অবতার
শ্রীকৃষ্ণের মহিলা-মোহিনী মহিমা থাকা সত্ত্বেও, ভাগবত মতে দেবীদের প্রাধান্য নেই
বললেই চলে। বিষ্ণুপ্রিয়া লক্ষ্মীদেবী বিষ্ণুর, সীতাদেবী শ্রীরামচন্দ্রের এবং
শ্রীকৃষ্ণপ্রিয়া শ্রীরাধিকা শ্রীকৃষ্ণের পাশে পূজিতা হয়ে থাকেন। যদিও এই তিনদেবীর
মধ্যে লক্ষ্মীদেবীর জনপ্রিয়তা সর্বজনীন, সম্পদের দেবী হিসেবে প্রত্যেক হিন্দুর ঘরেই তিনি
স্বাধীনভাবে পূজিতা হয়ে থাকেন। তবে সেই লক্ষ্মীদেবী, যত না সমুদ্রমন্থনে উত্থিতা
বিষ্ণুর পত্নী হিসেবে পূজিতা হন, তার থেকে অনেক বেশি পূজিতা হন, মহাদেব ও পার্বতীর কন্যা হিসেবে।
ভাগবত মতে মাতৃকাদের যে নাম পাওয়া যায়, সেগুলি হল, পৌর্ণমাসী, পদ্মা, অন্তরঙ্গিকা, গঙ্গা, কলিন্দতনয়া, গোপী, বৃন্দাবতী, গায়ত্রী, তুলসী, পৃথিবী, গো, বৈষ্ণবী, শ্রীযশোদা, দেবহূতী, রোহিণী, শ্রীসতী, দ্রৌপদী, কুন্তী এবং শ্রীকৃষ্ণের দশ পত্নীগণ, যাঁদের নাম আগেই বলেছি।
এঁদের মধ্যে গঙ্গা, গায়ত্রী, তুলসী, পৃথিবী ও গো মাতৃকার পূজা
ভারতের সর্বত্রই প্রচলিত, অন্যান্য মাতৃকারা অঞ্চলভেদে পূজিতা হয়ে থাকেন।
অন্যদিকে ভগবান মহেশ্বরের পত্নীদের সকলেই মহামায়া আদ্যাশক্তির বিভিন্ন
রূপ। কখনো তিনি সতী, কখনো
গিরিকন্যা উমা বা পার্বতী বা গৌরী। ভক্ত হিন্দুদের মনে এই দৈব দম্পতি হর-গৌরী, দাম্পত্যের আদর্শ ও
প্রতীক। পার্বতী বা গৌরী একদিকে পতিনিষ্ঠ পত্নী - প্রেমে, অভিমানে, অনুরাগে, অনুযোগে মাধুর্যের শেষকথা। আবার
অন্যদিকে তিনিই মাতৃস্বরূপা– তিনি শুধুমাত্র লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ জননীই নন, তিনি ভক্তজনেরও মাতা, তিনি তাদের দুর্গতিনাশিনী, পাপহারিণী, ভবতারিণী। বিভিন্ন যুগে
বিভিন্ন সময়ে তিনি ভক্তজন এমন কি দেবতাদের পরিত্রাণের জন্যেও শান্ত-পূত-পবিত্র
পার্বতী রূপ ছেড়ে যোদ্ধারূপও ধারণ করেছেন বার বার। কখনো তিনি দেবী দুর্গা -
মহিষাসুরমর্দিনী, কখনো
দেবী চণ্ডী – চণ্ডমুণ্ড ও রক্তবীজ অসুরনাশিণী আবার কখনো তিনিই ব্যাঘ্রবাহিনী
অম্বা। এই দেবীদের সকলেই ভারতের প্রায় সর্বত্র পূজিতা হয়ে এসেছেন এবং আজও পূজিতা
হয়ে থাকেন। তাঁর আরেকটি রূপ অন্নপূর্ণা – এই রূপেই তিনি ভক্ত প্রজাদের সমৃদ্ধি, শস্য এবং সম্পদ দান করেন।
দেবী লক্ষ্মী ধনের দেবী, সে কথা আগেই বলেছি। দেবী সরস্বতী বৈদিক কালে বাক্-দেবী বা
ভাষার দেবী ছিলেন, এখন
তিনি সর্ববিদ্যার দেবী। শৈব মতে ষোড়শ মাতৃকার নাম পাওয়া যায়, গৌরী, পদ্মা, শচী, মেধা, সাবিত্রী, বিজয়া, জয়া, দেবসেনা, স্বধা, স্বাহা, শান্তি, পুষ্টি, ধৃতি, তুষ্টি, আত্মদেবতা ও কুলদেবতা।
চলবে...
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন