মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৪২

 প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

 তৃতীয় ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ "

পঞ্চম ধারাবাহিকের শুরু - " স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "; "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "




[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - "বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৪১"


৪৭

 

বাইরে সন্ধে নামছে। বিশাল ঘরের ভেতরটা অন্ধকার। একটি মাত্র দীপের আলোয় – ঘর আলোকিত হয়নি, অন্ধকার ফিকে হয়েছে মাত্র। ছেলেদের অধিকাংশই তখনও ঘরের একদিকে মেঝেয় শুয়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। মহিলারা – কমলিমা, পালি, সুরমি – বসে আছেন মইলি, বিশুন আর দীপানের খাটুলির পাশে। কুসি আর ভুটিক বসে আছে কমলিমায়ের পাশে।  

কবিরাজমশাইয়ের সৎকার সেরে ভল্লারা ফিরল। বাইরের কুয়োতলায় হাতপা ধুয়ে সকলেই কমলিমায়ের পাশে বসল। কমলিমা একটু কড়া সুরে বললেন, “তোরা কাপড়চোপড় কেচে স্নান করে এসেছিস তো – তা নাহলে আমাদের কাউকে ছুঁবি না”।

ভল্লা ম্লান হেসে বলল, “ও নিয়মটা আমাদের দিকেও মানতে হয়, মা। এতটুকু নড়চড় হওয়ার উপায় নেই। শ্মশানের কাজ সেরে দীঘির জলে স্নান সেরেই আমরা এসেছি”।

“মানলেই ভালো। বাড়ির বাইরে গেলেই ছেলেরা দেখি উড়নচণ্ডে হয়ে যায় – বস, আমি তোদের খাবার বেড়ে আনি”।

ভল্লা বলল, “আমি এখন আর খাব না, মা। ভাল্লাগছে না। একবারে রাত্তিরেই খাবো। ওদের দে”।

খাওয়ার তেমন ইচ্ছে কারও ছিল না। ভল্লার সঙ্গে গিয়েছিল, সুরুল, আহোক, রামালি, শুকু, অমরা, কিশনা। তারা সকলেই লোভীর মতো ঘুমন্ত সঙ্গীদের দিকে দেখছিল। কতক্ষণে চোখ বন্ধ করে ওদের মতো শরীরটা এলিয়ে দেওয়া যায়।

কুসি বলে উঠল, “বাঃ রে, জেঠিমা তোমাদের জন্যে না খেয়ে বসে আছেন – এখন তোমরা না খেলে কী করে হবে?”

ভল্লা মুহূর্তের মধ্যে সুর বদলে বলল, “আর কখন খাবার দিবি মা? খিদেয় পেট যে জ্বলে যাচ্ছে...কুসি জেঠিমার সঙ্গে যা তো, বোন – হাতে হাতে ধরে আনবি”। মহিলারা সকলেই উঠে গেলেন কমলিমায়ের সঙ্গে। আহোক ফিসফিস করে বলল, “সত্যিই এখন খেতে একটুও ইচ্ছে হচ্ছে না। ভাবছি কতক্ষণে ঘুমোব”।

ভল্লা বলল, “এখন ঘুমোলে চলবে? কমলিমা বসে আছেন, আমাদের কথা শোনার জন্যে – কাল রাত্রে কী হল, আজ সকালে কবিরাজমশাইয়ের সৎকার কেমন হল...”।

আহোক বলল, “কালকে রাতের ঘটনা - আমি আর কিশনা ভোরেই জেঠিমাকে অনেকটা বলেছি – তারপর তো আমরা বেরিয়ে গেলাম। বাকিটা নিশ্চয়ই কেউ বলেছে...”।

ভল্লা বলল, “মনে হয় না – প্রধানমশাইয়ের মৃত্যুটা সবে সামলে উঠছিলেন, তারপরেই এসে পড়ল  কবিরাজমশাইয়ের মৃত্যু – কমলিমায়ের কাছে এ ধাক্কাটাও বড়ো সহজ নয়। তার ওপর এতগুলো ছেলের জন্যে রান্না করেছেন, খাইয়েছেন, মইলিদের দেখাশোনা করেছেন... সময় পেয়েছেন বলে মনে হয় না”।

মহিলারা সবাই মিলে খাবারের থাল এনে একে একে সবার সামনে রাখলেন। কমলিমা এসে বসলেন, ভল্লাদের সামনে। ভল্লা বলল, “তোর খাবার কই, মা? আমাদের সঙ্গে না খেলে – আমরাও খাব না।”

কুসি দৌড়ে গিয়ে কমলিমায়ের থাল এনে দিতে, কমলিমা বললেন, “এবার খুশি? গ্রামের লোকেরা কী বলল রে, কবিরাজমশাইয়ের মৃতদেহ দেখে?”

ভল্লা বলল, “কী বলবে বল দেখি মা? পর পর দু -দুটো ইন্দ্রপতন। দু-দুটো মহীরূহ – যার ছায়ায় গ্রামের মানুষ শান্তিতে বাস করত – ভরসা করত – সে দুটোই পর পর ভেঙে পড়ল ঝড়ে…। তারপর ধর মা, হানো গেল সাপের দংশনে। শল্কুটা কোথায় যে নিরুদ্দেশ হয়ে গেল – আজ পর্যন্ত তার কোন সন্ধান পাওয়া গেল না। মানুষ কত শোক আর করবে বল তো, মা?”

সুরুল বলল, “এখন আর কেউ শোক করে না, জেঠিমা – সকলের চোখেমুখেই এখন আগুন। পারলে লাঠিপেটা করে আস্থানের রক্ষীদের মারবে…কুকুরের মতো”।

আহোক বলল, “আমাদের গ্রামের লোকরা বোধহয় গ্রামের নামই পালটে দেবে, জেঠিমা। ভাবনা চিন্তা করছে। নাম রাখবে জুজাকপুর কিংবা জুজাকগাঁ। আমাদের দীঘির ঘাটে যে বড় অশ্বত্থগাছটা আছে – তার নাম দেবে কবিরাজতলা”।

রামালি বলল, “শুনলাম, সামনের বছর থেকে, গ্রামের কেউ একটা কানা-কড়িও কর দেবে না রাজাকে। বরং সেই করের টাকা জমিয়ে নিজেরাই গ্রামের নানান কাজ করাবে…”।

কমলিমা অবাক হয়ে বললেন, “বলিস কী? গ্রামের লোক পাগল হয়ে গেছে নাকি? রাজা এসব চুপচাপ মেনে নেবে?”

আহোক বলল, “তা জানি না, জেঠিমা – কিন্তু গ্রামের লোক সে কথাই বলছে। তারা আরো কী ঠিক করেছে জানো? তুমি হবে আমাদের গ্রামপ্রধান”।

“আমি?” কমলিমা খাওয়া ভুলে তাকিয়ে রইলেন আহোকের মুখের দিকে, “রক্ষে কর বাবা। প্রধানকে দেখেছি তো, দুশ্চিন্তায় কত রাত ঘুমোতে পারত না…। কেন গ্রামে আর কেউ ব্যাটাছেলে নেই? আমাকে নিয়ে পড়ল কেন, সবাই?

ভল্লা বলল, “তুই কেন নয় বল দেখি মা? গ্রামের ছেলে-মেয়ে, বুড়ো-বুড়ি সবাই তোকে মানে, ভালোবাসে – ভরসা করে – তুই হবি না কেন, মা”?

ঘুম ভেঙে গেলেও একটু ঘোর-ঘোর অবস্থায় ছিল মইলি, কমলিমার প্রধান হওয়ার কথা কানে যেতেই – সে উঠে বসার চেষ্টা করতে লাগল। কমলিমা দেখতে পেয়েই বললেন, “কুসি, একটা বল্লম নিয়ে আয় তো মা – মইলির কোমরটা ভাঙি – বলা পঞ্চাশ বার করে বলে গেছে – এখন অন্ততঃ তিনদিন তোর উঠে বসা চলবে না…লড়াই করে দাবনা ফালা করে এসে, পাকামি করছিস মুখপোড়া”?

মইলি চুপ করে শুয়ে পড়ল আবার, একটু হেসে বলল, “তুমি যদি প্রধান হও, তোমাকে আমি মা ডাকব – তোমার কথার অবাধ্যও হবো না। না হলে…”। মইলি কথা শেষ করল না, কমলিমায়ের মুখের দিকে তাকাল।

 

নিঃশব্দে ঘরে ঢুকল মারুলা। ভল্লার পাশে বসে বলল, “বাঃ আমাকে বাদ দিয়েই তোরা খেতে বসে গেছিস? কমলিমা, আমার কপালে দুখানা রুটি জুটবে না?” কমলিমা কিছু বললেন না, কুসিকে ইশারা করতেই মারুলার খাবার চলে এল। মারুলা খাওয়া শুরু করে বলল, “যা খিদে পেয়েছিল না… কাল দুপুরের পর থেকে পেটে কিছু পড়েনি। চরকির মতো ঘুরে চলেছি – দিন ভর…”।

কমলিমা চমকে উঠে বললেন, “সে কি বাবা? আজ সারা দিনেও খাওয়া হয়নি?”

মারুলা বলল, “না মা। আস্থানের যা অবস্থা – আমাদের জন্যে রান্না করবে কে? আর দুটো রুটি আর ডাল…হবে মা?” কুসি আবার দৌড়ল।

ভল্লা অবাক হয়ে বলল, “আস্থানের কারো খাওয়া হয়নি?”

“তা হবে না কেন? শষ্পক আর আধিকারিকদের পাকশালায় রান্না হয়েছে। কিন্তু রক্ষীদের দল তো সব পগার পার – তাদের রাঁধুনি সহ। কেউ নেই আস্থানে। শষ্পকের বিশেষ রক্ষীরাই এখন আস্থানের রক্ষী হয়ে গেছে”।

“শষ্পক তোকে বলল না, ওদের পাকশালায় খেয়ে নিতে?”

“বলেছিল – অনেকবার বলেছিল – আমিই যাইনি। শষ্পক বললেও – সবাই তো আর সমান নয় – কে কী বলে বসবে। তার ওপর শষ্পক আমাকে পাঠালো বীজপুর – রাজধানীর চিঠি দিয়ে…সেখান থেকেই সোজা এখানে এলাম। বহুদিন পর ঘোড়ায় চড়লাম, বুঝেছিস ভল্লা – কী সুখ রে ভাই – ঝড়ের বেগে গেলাম – ঝড়ের বেগে ফিরলাম। রাত্রে আবার আস্থানে ফিরে শষ্পককে সব সংবাদ জানাতে হবে”।

খাওয়া শেষ করে মারুলা মুখ তুলে বলল, “কেমন আছিস রে, জুজাক? আর সেই দুই জুজাক? তোদের কারো নাম জানি না রে”।

মইলি হেসে বলল, “ভালই আছি, গোলোকদাদা। আমার নাম মইলি। ওরা এখনও ঘুমোচ্ছে – দীপান আর বিশুন। কবিরাজ ঘুমের বটিকা দিয়েছিল – তারই রেশ…”।

একটু পরে ভল্লা বলল, “তিনটে স্তম্ভের প্রহরীকে তো বেশ নিঃশব্দেই শেষ করলি, মারুলা, কিন্তু শেষ স্তম্ভের রক্ষীটা অমন করে নীচেয় টপকে গেল কী করে বল তো?”

মারুলা বলল, “কে জানে? ব্যাটা বোধহয় একদম ধারে দাঁড়িয়ে ঝিমোচ্ছিল, অথবা নেশা-টেশা করেছিল। আরে, ও পড়ে যেতে যা ভয়ংকর শব্দ হল, আমি তো চমকে উঠেছিলাম – এবার কী হবে? আমি তো তখনও জানি না, উপানু হতভাগাটা মরেছে কিনা, কিংবা তোরা সবার ঘরে শেকল তুলে দিতে পেরেছিস কিনা। শব্দটা হতেই আমার মনে হল, সব রক্ষীরা যদি একসঙ্গে বেরিয়ে আসে – তাহলে কী হবে?”

একটু থেমে মারুলা আবার বলল, “আমি কয়েক মুহূর্ত একটু থমকে গিয়েছিলাম। কিন্তু ভেতর থেকে কোন সাড়া-শব্দ না পাওয়াতে অনেকটা ধাতস্থ হলাম। তারপরই দেখলাম দুজন রক্ষী প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে বন্দীশালার দিকে এগোচ্ছে। ওরাও শব্দটা পেয়ে কীসের শব্দ দেখতে যাচ্ছিল মনে হয়। আমাদের দিক থেকে দুই জুজাক একসঙ্গে ভল্ল ছুঁড়ে দুটোকেই এক এক ঘায়ে শেষ করল। যাই বলিস আর তাই বলিস, তোর শিষ্যরা ভালই শিখেছে, ভল্লা...। মাত্র মাস দেড়-দুয়েকের মহড়ায় এমন লক্ষ্যভেদ...।  

কিন্তু একটু গণ্ডগোল হয়ে গেল, পশ্চিমের দরজা দিয়ে ঢুকেই বাঁদিকে যারা ঘাপটি মেরে বসেছিল, শুরুতে তারা আমাদের লক্ষ্যই করেনি,  কিন্তু আমাদের দিক থেকে ভল্লা ছোঁড়াতে ওরা আমাদের অবস্থানটা টের পেয়ে গিয়েছিল। অতএব ওরাও আচমকা দুখানা ভল্ল ছুঁড়ল আমাদের দিকে। আমাদের দুই জুজাক আহত হয়ে গেল”।

আহোক বলল, “হ্যাঁ, দীপান আর বিশুন”।

মারুলা বলল, “আচ্ছা। ওদিকে দক্ষিণ-পশ্চিম স্তম্ভে উঠে যাওয়া আমাদের জুজাক...”।

রামালি বলল, “বাপালি”।

মারুলা বলল, “আচ্ছা। ওই বাপালি ওখান থেকে ভল্ল ছুঁড়ে অন্ততঃ একটাকে শেষ করল বুঝতে পারলাম। কিন্তু বুদ্ধি করে, ভল্লা ছুঁড়েই বাপালি মেঝেয় শুয়ে পড়েছিল। লুকিয়ে থাকা লোকগুলোকে বেশ কিছু তির ওর দিকে ছুঁড়তে দেখলাম, কিন্তু বাপালির কোন ক্ষতি করতে পারল না। আমি বুঝতে পারলাম, লুকিয়ে থাকা রক্ষীগুলো ফাঁদে পড়েছে – ওরা ওখান থেকে সংকেত দিতে শুরু করল...”।

এবার ভল্লা বলল, “উপানু আর দুই রক্ষীকে মেরে, আমি আর রামালি এগিয়ে গিয়েছিলাম পশ্চিমের দরজার দিকে। মইলির ক্ষত বেঁধে সুরুলকে বললাম, তুই মইলির সঙ্গে থাক। সহাধিকারিকের ঘরের কোনায় ঘাপটি মেরে দাঁড়িয়ে আমরা দেখলাম, ওরা তিনজন লুকিয়ে আছে। মনে মনে হিসেব করে দেখলাম, আমরা দুটো রক্ষী মেরেছি, বাপালি মেরেছে একটা, আর বাইরে থেকে ছোঁড়া ভল্লে মরেছে দুই – অতএব পশ্চিমের রক্ষীদের হিসেব মিলে গেল। আমি সংকেত দিতেই বাপালি আরেকটাকে মারল ভল্লা ছুঁড়ে, প্রায় একই সঙ্গে রামালি মারল আর একটাকে। রইল বাকি এক। আমাদের সবার কাছেই ভল্লা ছিল দুটো করে, বুঝতে পারলাম বাপালির কাছে আর ভল্লা নেই। অর্থাৎ যা করার আমাদেরই করতে হবে।

ও বাবা, তারপরেই কোনা থেকে উঁকি মেরে  দেখি, বেড়ার বাইরে থেকে একটা মুণ্ডু উঁকি মারছে – রামালি ফিসফিস করে বলল, অমরা...তার একটু পরেই অমরার ভল্ল গিঁথে গেল রক্ষীটার মাথায়। বাপালি আর অমরা একইসঙ্গে সংকেত দিল সব রক্ষী শেষ। অমরা তুই অত উঁচু বেড়ার ওপরে নিঃশব্দে উঠলি কী করে?” 

অমরা ডাল চাঁটতে চাঁটতে বলল, “গোলোকদাদা বুদ্ধিটা দিল  - আমাকে কাঁধে চাপিয়ে তুলে ধরেছিল বিঠল। এতটুকু নড়াচড়া করেনি – গায়ে খুব জোর আছে বিঠলের”। 

ভল্লা বলল, “ব্যস্‌, তারপর মারুলা দরজা ডিঙিয়ে ভেতরে ঢুকল। চাবি বের করে খুলে দিল দরজা। আমাদের সবাই ভেতরে ঢুকতে, প্রথমেই মইলি, দীপান আর বিশুনকে এখানে পাঠিয়ে দিলাম। তারপর আমরা ছজন ছাড়া বাকিদেরও পাঠিয়ে দিলাম। আমরা রইলাম কবিরাজমশাইকে মুক্ত করার জন্যে...কিন্তু সে আর হল না”।

অনেকক্ষণ কেউ কোন কথা বলল না, চুপ করে বসে রইল। একসময় দীর্ঘশ্বাস ফেলে কমলিমা বললেন, “যা উঠে হাত মুখ ধুয়ে শুয়ে পড়। জীবনের সব সাধ কী আর পূর্ণ হয়? হয় না। ওদের কোমর তো কাল তোরা ভেঙে দিয়ে এলি – ওরা কি চুপ করে বসে থাকবে? ওরা পালটা আঘাত হানবে না? আজ নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে নে। ওদের সেই আঘাত কী করে সামলাবি - কাল থেকে সে চিন্তা শুরু করিস”।

মারুলা বলল, “না কমলিমা, অত দুশ্চিন্তা করো না। আপাততঃ আস্থানের যা পরিস্থিতি ছেলেরা কম করে দিন পনের নিশ্চিন্তে থাকতে পারে। আমার মনে হয় সকলেই নিজের নিজের বাড়ি ফিরে যাক কাল সকালেই। যে তিনজনের আঘাত লেগেছে – তারাও ফিরে যেতে পারে যে যার ঘরে। তাতে কবিরাজ বড়্‌বলাকে প্রতিদিন এতদূর আসতে হবে না। এর মধ্যে রাজধানী থেকে কী সংবাদ আসে দেখা যাক। তারপর পরিস্থিতি বুঝে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে”।

সকলেরই খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। মারুলা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “আমি এখন বেরোব কমলিমা, আস্থানে ফিরতে হবে। আর কমলিমা, যতদিন না আস্থানে আমার দুমুঠো খাওয়ার কোন ব্যবস্থা হচ্ছে, আমার জন্যে দুবেলাই কটা রুটি বেশি বানিও”।

কমলিমা বললেন, “সে কথা বলতে হবে না, বাছা... আমি থাকতে তোর খাওয়ার অভাব কোনদিন হবে না”।

“ভল্লা চললাম রে। মা কি তোর একলার রে শালা, আমারও মা...”, হাসতে হাসতে বলে,  মারুলা বেরিয়ে গেল।

চলবে...

 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নতুন পোস্টগুলি

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৪২

  প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "  দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব ...