শনিবার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

ধর্মাধর্ম - ১/৫

 ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "





[এর আগের পর্ব পড়তে  হলে এই সুত্রে প্রবেশ করুন - ধর্মাধর্ম - ১/৪]

 

প্রথম পর্ব (৭০,০০০ বিসিই থেকে ১২,০০০ বিসিই) 

৫ম পর্বাংশ


১.৪.২ বিশ্বাসে মিলায় শান্তি  

এই মানুষগুলির জীবন পুরোপুরি নির্ভর করত প্রকৃতির ওপর – তার উদ্ভিদ, গাছপালা তাদের বুনো ফল, শিকড়, কন্দ, ছত্রাক ও বুনো শস্য সংগ্রহ এবং মাছ অথবা ছোট-খাটো বন্য পশুর শিকার। বিপদও ছিল বিস্তর – হিংস্র প্রাণীদের আক্রমণ, যেমন বাঘ, সিংহ; ভূমিকম্প, বজ্রগর্ভা ঝড়বৃষ্টি এবং দাবানল। এমনকি আপাত নিরীহ তৃণভোজী পশুরাও কখনো কখনো ক্ষেপে উঠত, দুরমুশ করে দিত তাদের নিদ্রাজড়িত রাত্রির বসতিগুলি। যেমনটি ঘটেছিল মিত্তিকার পরিবারে। অতএব প্রত্যেকটি দিন এবং দিনের পর দিন তাদের জীবন ও জীবনযাত্রায় ছিল নানান অনিশ্চয়তা, কাল কী ঘটতে পারে, তার ধারণাও করা যেত না।

প্রকৃতির ওপর এই নির্ভরতা শুধু হোমো স্যাপিয়েন্সদের নয়, অন্য সকল প্রজাতির প্রাণীদেরও স্বাভাবিক প্রবণতা। জঙ্গলের সমস্ত জীব এবং গাছপালাও প্রকৃতির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করত[1]। তবে তাদের জীবন এবং জীবনধারণের চিন্তা একমুখী, সেখানে আছে শুধুই বর্তমান। ভবিষ্যতের কথা - কাল বা পরশু কী ঘটতে পারে, সে চিন্তা করার সামর্থ্য তাদের থাকে না। অতএব কোন সম্ভাব্য বিপদের আশঙ্কা বা দুশ্চিন্তা করার বিলাসিতাও তাদের থাকে না।

সে ভাবনা এল মানুষের মনে – অর্থাৎ তার মস্তিষ্কে। অবসর সময়ে তারা অতীতের অভিজ্ঞতার কথা চিন্তা করে, ভবিষ্যতের দুর্ভাবনায় মানুষ শঙ্কিত হয়। সেই সেবারের মতো যদি এখনই একটা ভূমিকম্প ঘটে যায়। অথবা একদল সিংহের কবলে যদি পড়তে হয়। অথবা কোন প্রতিবেশী মানবদল বা মানুষের দলের সঙ্গে যদি লড়াই বেধে যায়। একবার ভাবতে শুরু করলে এমন “যদি”-র কোন শেষ থাকে না। এমনই অজস্র সম্ভাব্য কাল্পনিক ঘটনা, যার নিয়ন্ত্রণ তাদের ক্ষমতার বাইরে, সেগুলি নিয়েই তাদের দুশ্চিন্তা এবং আশঙ্কা। কাল্পনিক এই দুশ্চিন্তা আর আশঙ্কার যে মানসিক চাপ, তার থেকে মুক্তির জন্যে তারা আরও একটি নতুন কল্পনার আশ্রয় নিল, তার নাম বিশ্বাস। এই দুশ্চিন্তাগুলিকে পুরোটাই কাল্পনিক বলাটা আমার হয়তো একটু বাড়াবাড়ি হল, কিন্তু এগুলো নিয়ে মাথা খারাপ করে আরেকটা কল্পনাকে আঁকড়ে ধরার যুক্তিটাকে আমার তার থেকেও বাড়াবাড়ি বলে মনে হয়। কেন? বলছি। 

আমরা যদি সেই সময়কার মোট জনসংখ্যার তুলনায়, বাঘের কবলে বা সাপের কামড়ে মৃত মানুষের সংখ্যার তুলনা করি, দেখা যাবে সংখ্যাটা নগণ্য। আধুনিক জীবনেও প্রতিদিন যত মানুষ নানান যানবাহনে চাপেন, তার তুলনায় যত মানুষ যানবাহনের দুর্ঘটনায় মারা পড়েন, সেই সংখ্যাটা অত্যন্ত নগণ্য নয় কি? তা নাহলে, আমি আজ এই বই কী করে লিখছি এবং আপনারাই বা ধৈর্য নিয়ে এই বই কী করে পড়ছেন? এবং সত্যি কথা বলতে আমরা সকলেই জানি, বাঘ এবং সিংহের মতো হিংস্র শিকারী পশুরা আজ অবলুপ্তির কাছাকাছি এসে পৌঁছেছে, আর বিপরীত দিকে, বিশ্বজুড়ে আজ মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির হার আমাদের বিশেষ উদ্বেগের কারণ এবং সে বিষয়ে আমরা অত্যন্ত আশঙ্কা এবং দুশ্চিন্তায় রয়েছি! পৃথিবীতে “মানুষ”-এর সংখ্যা “যদি” এভাবেই বাড়তে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতের “মানুষ”-এর কী হবে?

অতএব, দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হওয়াটা আমাদের অনন্য বৈশিষ্ট্য, যা অন্য সমস্ত জীবজগতের থেকে আমাদের সম্পূর্ণ আলাদা করে তুলেছে। আর আমাদের এই অনন্য আচরণ প্রকৃতি-মায়ের পরেও অন্য আরেকটি বিশেষ বিষয়ে আমাদের নির্ভর করতে শিখিয়েছে। প্রকৃতি-মা মাঝেমধ্যে আমাদের ঝড়-ঝঞ্ঝার শাস্তি দিলেও, আমাদের খাদ্য-সংস্থান করেন, আমাদের লালন-পালন করেন। আমাদের প্রজননেও সাহায্য করেন, যাতে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের মানুষেরা তাঁকে পুরোপুরি আয়ত্ত্বে আনতে পারে! কিন্তু প্রকৃতি ছাড়া অন্য যে বিষয়ে আমরা নির্ভর করি, সেটা সঠিক কী? এক কথায় সেটা বলা খুব মুশকিল, কারণ একে স্পর্শ করা যায় না, গন্ধে টের পাওয়া যায় না, চোখে দেখতে পাই না, কিন্তু যদি (এখানে আবার একটা “যদি” এসে পড়ল!) আমরা বিশ্বাস করি, তাহলে আমরা তাকে অনুভব করতে পারি।

পিতা পশুপতির দলটিকে কিছু রীতি বা প্রথা পালন করতে লক্ষ্য করেছিলাম, যেমন বয়স্ক মহিলা এবং পুরুষরা শিকারে বেরোন লোকদের ঘিরে একটা গণ্ডী রচনা করেছিলেন। অস্ফুট কিছু কথা বলতে বলতে, সকলেই জোড় হাতে গভীর মনোযোগে ও শ্রদ্ধায় শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। শুধু ওই বাচ্চা ছেলেমেয়েগুলি ছাড়া, যারা তখনো বিশ্বাস করতে শেখেনি। বড়োরা কৃতজ্ঞ মুখ তুলে তাকিয়ে ছিলেন ওই বড়ো পাথরটার দিকে। সেই সময় দলের সকলের মন এই আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন ছিল, দলের সকলেই মারাত্মক কোন আঘাত ছাড়া, নিরাপদে ফিরতে পারবে তো? তারা দলের সকলের জন্যে যথেষ্ট খাদ্যের যোগাড় করতে পারবে তো? যদি না হয়, তাহলে কী হবে? উপরন্তু, সফল শিকার এবং খাদ্য-সংগ্রহ নিয়ে ফেরার পরেও, বয়স্কা মহিলা ও পুরুষেদের সঙ্গে তারাও আকুল শ্রদ্ধা এবং ব্যাকুল কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিল, বড়ো ওই পাথরটির প্রতি। ওই পাথরের কী এমন বিশেষত্ব ছিল?

ওই পাথরটা ছিল একটি আত্মা। আপনি এখন বিশ্বাস করবেন না। কিন্তু এই অধ্যায়ের শেষ অব্দি পড়ে, আপনিও মেনে নেবেন যে, হ্যাঁ, ওই পাথরের মধ্যে একটি আত্মা ছিল। এবং পাথর ছাড়াও অনেক কিছুতেই আত্মা থাকতে পারে।

পাথর হল একটি নিষ্প্রাণ জড় বস্তু, যার সঙ্গে কারও কোন সংযোগ তৈরি হতে পারে না। কোন জীবের সঙ্গে নয়, অথবা মানুষের সঙ্গেও নয়। কিন্তু পাথরকে স্পর্শ করা যায়, চোখে দেখা যায়, কখনো কখনো গন্ধও পাওয়া যায়। আকাশের নিচে খোলা প্রান্তরে পড়ে থাকা, প্রচণ্ড দাবদাহে তপ্ত একটি পাথরের ওপর যখন শীতল বৃষ্টিবিন্দু এসে পড়ে, তখন পাথরের গন্ধ পাওয়া যায়। অন্যদিকে আত্মা হল সম্পূর্ণ বিপরীত একটি সত্ত্বা, যদি আপনি বিশ্বাস করেন, তার সঙ্গে নিয়মিত সংযোগ করা যায়। তার সঙ্গে নানান অনুভূতি ভাগ করা যায়, যেমন, সুখ, আশীর্বাদ, কৃতজ্ঞতা, বিরক্তি, এমনকি ভয়ংকর ক্রোধও। কিন্তু তাকে ছোঁয়া যায় না, দেখা যায় না, তার গন্ধ পাওয়া যায় না। অতএব, এখানে ওই পাথরটির সঙ্গে আত্মার একটা অঙ্গাঙ্গী এবং পরিপূরক ভূমিকা তৈরি করা গেল।

তাই বলে এমন সিদ্ধান্ত নেবেন না যে, এই গ্রহের সব পাথরের মধ্যেই এমন বিশেষ ক্ষমতা রয়েছে, ব্যাপারটা অতটা সহজ এবং সরল নয়। পাথরের আকার এবং আয়তনে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য থাকতেই হবে, যার জন্যে বিশ্বাসীরা ভাবতে বাধ্য হবে যে, ওই পাথরটিতেই তাদের আত্মা-অভিভাবক প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। একটু দূর থেকে দেখা, গায়ে কিছু চিড়, ফাটল, কিছু উঁচুনীচু, কিছু ছোপ-ছাপ, দাগ-টাগ নিয়ে একটা পাথর, আপনার উর্বর মস্তিষ্কের প্রশ্রয়ে আপনার কোন প্রিয় অভিভাবকের মুখের আদলে ধরা দিতেই পারে। সেই অভিভাবক যিনি বেশ কিছুদিন আগেই মারা গেছেন। কিন্তু তাও তিনি ভালোবাসতে পারেন, আশীর্বাদ করতে পারেন, প্রশ্রয় দিতে পারেন এবং দোষ, অথবা বলা ভাল, পাপ করলে, শাস্তিও দিতে পারেন। যেভাবে মিত্তিকার দলের কিছু মানুষের করা পাপকর্মের শাস্তি দিতে, তিনি রাতের অন্ধকারে পাগলা দাঁতাল হাতিকে পাঠিয়েছিলেন! হয়তো তিনি আপনার ঠাকুরদাদা, অথবা দিদিমা, কিংবা আপনার অত্যন্ত ভালোবাসার গুরুজন। যাঁর থেকে আপনি অনেক কিছু শিখেছেন, জেনেছেন। যিনি জীবিত অবস্থায় আপনাকে নিয়ত উপদেশ দিয়েছেন। মৃত্যুর পরেও যাঁকে আপনি অহরহ স্মরণ করেন এবং যখনই আপনি বিপদে অসহায় বোধ করেন, অন্ততঃ মনে মনে তাঁর সাহায্যের আশা করেন[2]।

সকল বড়ো পাথরেই যেমন আত্মার অধিষ্ঠান হয় না, তেমনি সকল আত্মাই শুধুমাত্র পাথরেই স্থিতু হবেন, এমনও নয়। আরও অনেক বস্তু আছে, যেখানে আত্মা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। যেমন কোন গাছ, কিছু কিছু পাহাড়, পর্বত, নদী। এমনকি কিছু বিশেষ প্রাণীও, যেমন সাপ, হনুমান, শূকর, ষাঁড়, পাখি, মাছ। এমনকি গৃহপোষ্য নিরীহ বেড়ালও! আধুনিক হাইওয়েতে, দ্রুত দৌড়ে চলা অত্যাধুনিক গাড়ির সামনে “রাস্তা কেটে” দিয়ে গৃহস্থ বিড়াল যখন দৌড়ে পার হয়ে যায়, তখন সেই বিড়ালের মধ্যে মন্দ-আত্মা আজও ভর করে! এই বঙ্গে, সকালে ঘুম থেকে উঠে এক শালিক দেখতে পেলে, সেই শালিকে মন্দ-আত্মা ভর করে। কিন্তু সেই শালিকই যখন যুগলে দেখা দেয়, তখন তারাই হয়ে ওঠে শুভ-আত্মা! ভারতবর্ষ এবং বিশ্বের বহুদেশে আজও বিশ্বাস করা হয়, দাঁড়কাক অশুভ-আত্মা বহন করতে পারে। যে বাড়িতে পরিবারের কেউ গুরুতর অসুস্থ রয়েছেন, সেই বাড়ির চালে বসে দাঁড়কাকের কর্কশ ডাক যেন মৃত্যুকেই আহ্বান করে। এই কারণে আমাদের ঠাকুমা-দিদিমারা দাঁড়কাককে “যমকাক”ও বলতেন। এই ধরনের আত্মা (পরবর্তী কালে দেবত্ব) আরোপিত পাথর, পশু, পাখি, সরীসৃপ, মাছ এমনকি পশু-মানবের সঙ্গেও আমাদের সম্যক পরিচয় হবে, বহু বছর বাদে। সে কথা আসবে এই গ্রন্থের চতুর্থ এবং পঞ্চম পর্বে।

বিশেষ কিছু মানুষ, পুরুষ ও মহিলার মধ্যেও আত্মা ভর করে। সর্বদা না হলেও, মাঝেমাঝে - যখনই কোন বিশ্বাসীর তার থেকে কোন মানসিক আস্থা অথবা কোন পরামর্শের দরকার হয়। এই ধরনের লোকেদের সাধারণতঃ ওঝা বা গুণিন কিংবা ভর-মাতা বলা হয়। আত্মার ভর হওয়া এই পুরুষ বা মহিলারা সাধারণ পুরুষ বা মহিলাদের মতোই সন্তানাদি নিয়ে সংসারী জীবন যাপন করেন। কিন্তু যখনই তাঁদের দেহে আত্মার ভর হয়, তাঁদের আচরণ বদলে যায়। অদ্ভূত এবং উদ্ভট কিছু অঙ্গভঙ্গী করে তাঁরা বিশ্বাসীদের মনে এমনই এক অলৌকিক বাতাবরণ তৈরি করেন, যে বিশ্বাসীরা আগের থেকে আরও বেশি বিশ্বাসী হয়ে ওঠেন এবং এটাই হল ওঝা, গুণিন ও  ভর-মাতাদের একমাত্র USP।

বিশ্বাসের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকে প্রধানতঃ চার শ্রেণীতে বিভক্ত করা যায়। মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ যাঁরা আত্মাকে সৃষ্টি করতে এবং তাকে ইচ্ছেমতো নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, যেমন ওঝা আর গুণিন। দ্বিতীয়, দলের অধিকাংশ সাধারণ বিশ্বাসী মানুষরা। তৃতীয় শ্রেণী হলেন তাঁরা - যাঁরা দোনামনা গোত্রের - যাঁরা ঠিক করে উঠতে পারেন না, বিশ্বাস করবেন কী করবেন না। যখন খুব সম্পন্ন অবস্থায় থাকেন তাঁরা আত্মায় বিশ্বাস করেন না। কিন্তু যখনই কোন বিপদে পড়েন, তখন ঝটপট সমাধানের চেষ্টায় বিশ্বাস করতে শুরু করেন। চতুর্থ এক শ্রেণীও থাকতে পারেন, তাঁরা অবিশ্বাসী - যাঁরা কোনভাবেই আত্মায় বিশ্বাস করেন না। তাঁদের পরবর্তী কালে নাস্তিকও বলা হয়েছে। তাঁদের সংখ্যা প্রায় বিরল, দলে তাঁদের গুরুত্বও নগণ্য। কোন দলে যদি কোন অবিশ্বাসী কিছুটা প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হতে থাকেন, ওঝা ও গুণিনদের প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ প্রভাবে তাঁরা দলের মধ্যে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন এবং এমনকি তাঁদের প্রাণহানির আশঙ্কাও তৈরি হতে পারে।

অতএব, আশঙ্কা আর দুশ্চিন্তা থেকে কিছুটা পরিত্রাণ পেতে, প্রকৃতির ওপর পূর্ণ নির্ভরতার পরেও, মানুষ আত্মা নামক এক অলীক বিষয়ে বিশ্বাস করতে শুরু করল।

১.৪.৩ হেডে জয় তোমার, টেলে আমার হার

এখন কৌতূহলের বিষয় হল, আত্মার ভূমিকাটা কী? এমন প্রশ্নের এক কথায় উত্তর হল, তাদের ভূমিকা অজস্র। যত ধরনের ভূমিকা আমরা চিন্তা করতে পারি – এর কোন সীমা নেই। কিছু ভূমিকার উদাহরণে বলা যায়, আপনাকে একটা ফলন্ত গাছের সন্ধান দেওয়া। বাঁদররা খবর পাওয়ার অনেক আগেই আপনি যাতে ফল সহজেই সব আহরণ করতে পারবেন। বেশ কিছু দুর্বল ছাগল সহ বুনো ছাগলের একটা দলের সন্ধান দেওয়া, বাঘের দল সন্ধান পাওয়ার আগেই যাদের সহজে শিকার করা যায়। একটা প্রবল ঝড়ের তাণ্ডবকে বনের দূরতম প্রান্তে ঠেলে দেওয়া। এভাবেই মানুষের প্রতিটা সাফল্যে এবং বিপদ এড়িয়ে যাওয়ার আকস্মিক ঘটনায় আত্মার ভূমিকা বাড়তেই থাকবে। আপনি কৃতজ্ঞ হতে থাকবেন। শুধু আপনার বিশ্বাসের ভিতটা শক্তপোক্ত হলেই হল।

আত্মারা কী সর্বদাই আমাদের সাহায্য করে থাকে? না কখনোই না, আত্মা যদি ক্রুদ্ধ হয়, বুনো ছাগলদের দলে রামছাগলটাও খেপে উঠে তার শিং দিয়ে, দলের কয়েকজনকে ফেঁড়ে দিতে পারে। গাছের ফল পাড়তে গিয়ে, গাছের ডাল ভেঙে মাটিতে পড়ে, আপনার হাত-পা ভাঙতে পারে। ঝঞ্ঝার আঘাতে শেকড় ওপড়ান বড়ো বড়ো গাছ কিছু লোককে পিষে ফেলতে পারে। গভীর ঘুমের রাত্রে, হাতির দল এসে তছনছ করে দিতে পারে মানুষের দুর্বল কুঁড়েঘরগুলি, থেঁৎলে দিতে পারে বেশ কিছু মানুষকে। এমন অনেক অঘটনই ঘটতে পারে! এগুলি সবই আত্মার অসন্তুষ্টির কারণ। তার জন্যে, আপনি ব্যাকুল হয়ে ক্ষমা ভিক্ষা করবেন। তবে এক্ষেত্রেও, আরেকবার বলি, আপনার বিশ্বাসের ভিতটা শক্তপোক্ত হলেই হল।

তাহলে কিছু কিছু উপকারের জন্যে কেনই বা আমরা আত্মায় ভরসা রাখব? এ রকম প্রশ্নের শেকড়, মন থেকে উপড়ে ফেলুন অঙ্কুরেই। কারণ আপনাকে বিশ্বাস - বিনা প্রশ্নেই - করতে হবে। সফল একটা শিকার-সংগ্রহের পর, অল্পস্বল্প ঝড়ঝাপটার রাত সামলে পরেরদিনের রোদ ঝলমলে সকালে, বড়ো একটা সিংহের দলের থেকে কোনভাবে পরিত্রাণ পেয়ে, আপনাকে আত্মার সামনে বিনীত শ্রদ্ধায় কৃতজ্ঞতা জানিয়ে সন্তুষ্ট করতে হবে। কারণ এসবই ঘটেছে শুধুমাত্র আত্মার বদান্যতায়। আত্মার তৃপ্তির জন্যে আপনাকে উৎসর্গ করতে হবে, বাছাই করা বেশ কিছু ফল এবং বড়ো একখণ্ড মাংস। যদিচ সেই ফল এবং মাংস নিবেদনের পুরোটাই, প্রসাদ হয়ে আপনার কাছেই ফিরে আসবে। কারণ আত্মার অস্তিত্ব আপনার কল্পনায়, কল্পনার দাঁত দিয়ে আর যাই হোক ফল বা মাংসের টুকরো কাটা যায় না!   

কিন্তু আপনার দলের কোন সদস্যের দুর্ভাগ্যজনক কিছু ঘটলেও আপনি আত্মাকে দোষারোপ করতে পারবেন না। কারণ আপনি অবশ্যই জানবেন, আত্মা ক্রুদ্ধ হলে এমন ঘটতেই পারে। কিন্তু আত্মা এত অসন্তুষ্টই বা হয় কেন? তার কারণগুলো খুঁজে বের করতে হবে আপনাকেই। আপনাকেই সাজিয়ে তুলতে হবে তার অসন্তোষের কারণগুলি। কারণগুলি কী হতে পারে?

কারণেরও কোন অন্ত নেই। যেমন, কিছুদিন আগেই, যুবক-যুবতীদের যে দলটা বড়োসড়ো শিকার ধরে আর বড়ো বড় কন্দ সংগ্রহ করে নিয়ে এসেছিল, তাদের মধ্যে দু-তিনজন ছিল উদ্ধত। তারা ওই প্রস্তর-আত্মার সামনে মাথা নত করেনি, নিজেদের দক্ষতার অহংকারে। কিন্তু যেদিন কোন একটা অঘটন ঘটবে, বয়স্ক মানুষ গম্ভীর হতাশার সুরে বলবেন, “আমি জানতাম এমনটা ঘটবে। ছেলেদের উদ্ধত ওই আচরণে আত্মা ক্রুদ্ধ হয়েছেন, আমরা অভিশপ্ত হয়েছি। আমরা এখনও যদি আমাদের আচরণ সংযত না করি, এমন ঘটনা ঘটতেই থাকবে এবং আমরা ধ্বংসের পথে এগিয়ে যাবো। অতএব এই হল অপরাধ স্বীকার করে, অনুতপ্ত হওয়ার সময়। আমরা সকলে একসঙ্গে একমনে করজোড়ে তাঁর কাছে ভিক্ষা করি, আমাদের ক্ষমা করো, পিতা, আমাদের ওপর ক্রুদ্ধ হয়ো না। আমরা যদি কোন ভুল করেই থাকি, আমাদের শাস্তি দাও, আমাদের শিক্ষা দাও। হে পিতা, আমাদের কৃপা কর। আমাদের প্রচুর খাদ্য দাও, সকল বিপর্যয় থেকে আমাদের রক্ষা কর...”।

এভাবেই মানুষের নিজেরই করা কোন না কোন ত্রুটি দিয়ে আড়াল করা যায় আত্মার যে কোন ব্যর্থতাকে। সে ত্রুটি উপরে বলা ঘটনার মতো গুরুতর নাও হতে পারে, হতে পারে খুবই তুচ্ছ কিছু। যেমন, বনে ঢোকার পথে ডানদিকে হঠাৎ শেয়াল দেখে ফেলা (মহিলাদের ক্ষেত্রে বাঁদিকে)। আত্মাকে কিছু উৎসর্গ না করেই সমস্ত খাদ্য নিঃশেষ করে ফেলা। কিংবা যে পাহাড়ের চূড়ায় প্রস্তর-আত্মার অধিষ্ঠান, আনমনে তার তলায় কারও থুথু ফেলা, প্রকৃতির ছোট ডাকে সাড়া দেওয়া, ইত্যাদি অনেক কিছুই হতে পারে।

তাহলে আত্মার ওপর কেন এত বিশ্বাস করত মানুষ? উত্তরঃ বিপদের সম্ভাবনার দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি পেতে।

একটু হিসেব কষা যাক। এক বছরে, আপনি কতদিন প্রবল বজ্র-ঝঞ্ঝার আশা করেন – সম্ভবতঃ পাঁচ থেকে সাত দিন[3]? বছরে আপনি কতদিন বিপর্যয় ঘটানো ভূমিকম্পের আশা করেন – সম্ভবতঃ প্রতি পাঁচ থেকে দশ বছরে একবার? মানুষ সিংহ কিংবা বাঘের স্বাভাবিক শিকার নয়, তাও বছরে কতদিন আপনি আশা করেন, বাঘ বা সিংহ আপনাকে আক্রমণ করবে – খুব বেশি হলে পাঁচ কিংবা ছদিন?[4] হতে পারে এগুলো সবই অনুমান, এর পিছনে কোন সংখ্যাগত তথ্য পাওয়া যাবে না, কিন্তু তবুও বছরের তিনশ পঁয়ষট্টি দিনের তুলনায়, সমস্ত দুর্ঘটনার দিন যোগ করলে কুড়ি-পঁচিশ দিনের বেশি হতে পারে না। আর এই হিসেবেই লুকিয়ে আছে আত্মার বিশ্বাসযোগ্যতা। আপনি যদি বিশ্বাস করেন যে আত্মার অনুগ্রহে, বছরের তিনশ চল্লিশটি (বছরের প্রায় ৯৩% দিন) শুভদিন আপনি উপভোগ করেছেন, সেক্ষেত্রে আপনার আত্মার ওপর বিশ্বাস করা ছাড়া অন্য কোন পথ অবশিষ্ট থাকল কি? অন্যদিকে, আপনি যদি বছরে পঁচিশটি (বছরের মাত্র ৭% দিন) অশুভ দিনের দুর্ভোগে কষ্ট পেয়ে থাকেন, এবং যদি বিশ্বাস করেন, তার কারণ হল আপনার বা আপনার দলের কোন মানুষের ভুল বা অপরাধ, সেক্ষেত্রেও আত্মার ওপর আপনার বিশ্বাস এতটুকুও কমবে না। বরং বহুগুণ বেড়ে উঠবে। অতএব সাধারণ মানুষের সঙ্গে আত্মার (পরবর্তী কালে, দেবতাদের ) সম্পর্কটা নির্বিঘ্নে হয়ে উঠছিল – Head you win, tail I loose – অর্থাৎ “হে আত্মা, হেডে জয় তোমার, টেলে আমার হার”।

এইভাবেই বয়স্ক সেই মানুষটি, যাঁর নাম পশুপতি। যিনি আত্মার সঙ্গে সংযোগ রাখেন, তিনি দলের অন্য সবার তুলনায় অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবেন। তাঁর কর্তৃত্বে প্রশ্ন তোলার কারও সাহস হবে না, দলের মধ্যে তিনিই হয়ে উঠবেন আত্মার সঙ্গে নিবিড় সংযুক্ত অনন্য এক পুরুষ।

পিতা পশুপতি কিন্তু কোন দুর্বুদ্ধি বা নিজের স্বার্থ সিদ্ধির জন্যে এমন একটা “বিশ্বাস”-এ ভরসা করেছিলেন, একথাও ঠিক নয়। তিনি নিজেই অদ্ভূত এই কল্পনায় বাঁধা পড়ে মানসিক স্বস্তি ও শান্তি পেয়েছিলেন। সেই উপলব্ধিই তিনি সঞ্চারিত করতে পেরেছিলেন নিজের দলের সকলের মনে। এমনকি কন্যাসমা মিত্তিকা নামের অন্য দলনেত্রীর মনেও! এই বিশ্বাসের বীজ ভবিষ্যতে আমাদের কোন মহীরূহের নিচে দাঁড় করিয়েছে, সে আলোচনা আসবে পরবর্তী পর্বে। 

এবং আরও পরবর্তী পর্যায়ে আমরা দেখবো, এই “বিশ্বাস” কিভাবে বিপণন যোগ্য পণ্য হয়ে ওঠে।  কিভাবেই বা এই “বিশ্বাস” হয়ে উঠবে রাষ্ট্র ও সমাজপতিদের ক্ষমতার শীর্ষ জয়ের অন্যতম হাতিয়ার।

 সে সব আলোচনা যথা সময়ে আসবে এখন আমরা ফিরে যাই পিতা পশুপতির পরিবারের কাছে। 

 

১.৪.৪ বৃহত্তর পরিবারের সূচনা

দুপুরের আহার সেরে, কিছুক্ষণ আগেই ওরা চলে গেল, গিরিজ আর মিত্তিকা। ওদের এগিয়ে দেওয়ার জন্যে পিতা পশুপতি তাঁর দলের তিন সশস্ত্র যুবককে পাঠালেন। সূর্যাস্তের এখনও দেরি আছে, কিন্তু ওদের বসতি পর্যন্ত যেতে সন্ধ্যে হয়ে যাবে এবং সেক্ষেত্রে ওই তিন যুবকের আজ আর ফেরা হবে না। ওখান থেকে আগামীকাল ভোরে রওনা হতে হবে।

এই প্রথম তাঁর দলের তিনজন সাহসী যুবক দলের বাইরে রাত্রিযাপন করবে, অজানা এক দলের সঙ্গে। কাজটা কি তিনি ভাল করলেন? ওদের যদি কোন অসৎ উদ্দেশ্য থেকে থাকে? যদি ওরা ওই তিনজনকে রাত্রে ঘুমন্ত অবস্থায় হত্যা করে? তাঁর দলকে দুর্বল করে তোলার এ কোন ষড়যন্ত্র নয় তো? তাঁর মনে ভিড় করে এল, উদ্বেগ আর আশঙ্কা। তিনি অস্তগামী সূর্যের দিকে তাকিয়ে স্থির হয়ে বসে গভীর চিন্তায় ডুব দিলেন।

সকালে ওরা আসার পর থেকে, গিরিজ এবং মিত্তিকার সঙ্গে যা যা কথা হয়েছে সে সব পর্যালোচনা করতে লাগলেন। না, ওদের কথায় কিংবা আচরণে কোন মন্দ উদ্দেশ্যের ইঙ্গিত তিনি খুঁজে পেলেন না। এখানে এসে মিত্তিকা ও গিরিজ, তাঁর দলের অন্য সকলের সঙ্গেও যে ভাবে কথা বললেন। বাচ্চাদের সঙ্গে, মেয়ে এবং পুরুষদের সঙ্গে যে আচরণ করলেন। সে কথা মনে করেও, তাঁর দলের প্রতি ওঁদের দুজনের কোন ঈর্ষা বা বিদ্বেষের কোন লক্ষণ দেখতে পেলেন না। তবু তাঁর মনে এখন আশঙ্কা ও দুশ্চিন্তা। আগামীকাল সকালে ওরা তিনজন সুস্থ না ফেরা পর্যন্ত, তাঁর এই উদ্বেগ কাটবে না।

যাবার কিছু আগে গিরিজের সামনেই মিত্তিকা তাঁকে একটি প্রস্তাব দিলেন। সে প্রস্তাব যেমন অভিনব, তেমনই অসম্ভব। মিত্তিকার অনুরোধ, তিনি যেন তাঁর দলের দুই কন্যাকে দান করেন। সেই দুই কন্যা, মিত্তিকার দুই তরুণ পুত্রের জীবনসঙ্গিনী হবে। ওই দুই কন্যাকে তিনি, তাঁর পুত্রেরা এবং তাঁদের দল সারাজীবন বহন করবেন, পালন করবেন। এই অদ্ভূত প্রস্তাবের কারণ বোঝাতে মিত্তিকা আরও বললেন, তাঁদের পরিবারে এখন ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের সংখ্যা কম, যার ফলে বংশরক্ষা এবং প্রজননে, তিনি পশ্বাচার পরিস্থিতির আশঙ্কা করছেন। পশ্বাচারে পরিবারের বাঁধনে ভাঙন ধরে। তাই পিতা পশুপতির কাছে তাঁর বিনীত অনুরোধ, “আপনাদের দুটি কন্যা আমাকে দান করুন”।

পিতা পশুপতি তখনই গভীর আপত্তিতে বলেছেন, এ অসম্ভব। এমন অদ্ভূত প্রস্তাবে সাড়া দেওয়ার কোন প্রশ্নই নেই। তবুও মিত্তিকা তাঁকে কর জোড়ে বার বার অনুরোধ করেছেন, “আপনি এভাবে অসম্মত হবেন না, বাবা, আপনাকে যতটুকু চিনেছি, তাতে বুঝেছি আপনি ভবিষ্যতদ্রষ্টা। জীবনকে আপনি অন্তর দিয়ে বিচার করেন। আমার এই প্রস্তাব অভিনব কিন্তু অসম্ভব নয়। আমাদের দুই দলের এই সম্পর্ক হয়তো ভবিষ্যতের পথ দেখাবে। আপনি সময় নিন, চিন্তা করুন। আজ চাঁদের দশমদিন, আমরা দুজনে আবার আসব পূর্ণচন্দ্রের দিন। আপনার সম্মতির আশায়, এ কটা দিন, আমি প্রতীক্ষায় থাকব”।

কিছুক্ষণ হল সূর্য অস্ত গেছে, মেয়েরা মশাল জ্বালিয়েছে দুটো, চর্বির পোড়া গন্ধ নাকে আসছে। দলের সকলে নিজেদের মধ্যে গল্প করছে। পিতা পশুপতির কানে আসছে, গিরিজ আর মিত্তিকাই আজ তাদের গল্পের বিষয়। দলের ছেলে-মেয়েরা সকলেই খুশি, গিরিজ আর মিত্তিকার ব্যবহারে। কারও মনে কোন বিদ্বেষ নেই। পিতা পশুপতি একটু নিশ্চিন্ত হলেন। তবুও আগামীকাল সকালে ওই তিনজনের না ফেরা পর্যন্ত তাঁর মনের কাঁটাটি রয়েই যাবে।

মিত্তিকার কন্যাদানের প্রস্তাবটাও পিতা পশুপতি স্বস্তি দিচ্ছে না। কোন পরিবারভিত্তিক দলের সদস্য সংখ্যা অত্যধিক বেড়ে গেলে, সে দলকে তিনি বহুবার ভেঙে যেতে দেখেছেন। তাঁর নিজের দলেও এমন ঘটনা ঘটেছে বেশ কয়েকবার। কারণ বিশেষজ্ঞরা বলেন, সদস্য সংখ্যার সঙ্গে পারিবারিক বন্ধন প্রত্যক্ষভাবে নির্ভর করে। সেই ম্যাজিক সংখ্যাটি হল পঞ্চাশ থেকে ষাট। সদস্য সংখ্যা তার থেকে যত বেশি হতে থাকে, পারিবারিক বন্ধন ততই আলগা হতে থাকে। এর কারণ কোন সাধারণ মানুষই পঞ্চাশ বা ষাট জনের বেশি সংখ্যক ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তিগত অন্তরঙ্গ সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে না। অসাধারণ মানুষ, যাঁরা সফল নেতৃত্ব দেওয়ার অধিকারী, তাঁরা অবশ্যই ব্যতিক্রম। অতএব পরিবারের সদস্য সংখ্যা আশি-নব্বই হলেই, অবধারিতভাবে দলটি দুই ভাগে ভেঙে যেত। নতুন দলটি নতুন অঞ্চলে বসতির সন্ধান দেখত। 

দল ভেঙে নতুন দল গড়ার ব্যাপারটা পিতা পশুপতির কাছে নতুন না হলেও, পরিবারের দু একজন সদস্য – সে ছেলে হোক বা মেয়ে - অন্য দলে চলে যাবে, এমন উদাহরণ তিনি কোনদিন দেখেননি বা শোনেননি। এক পরিবারে আজন্ম লালিত-পালিত কোন ছেলে বা মেয়ের পক্ষে অন্য দল, অন্য পরিবারে মানিয়ে নেওয়া সম্ভব? আর কেনই বা যাবে? আমাদের এই দল কী আমাদের কোন মেয়ে বা ছেলেকে অযত্নে, অনাদরে রেখেছে? কত দুঃখ, সুখ, আনন্দ, বেদনার স্মৃতি বুকে নিয়ে তারা বড়ো হচ্ছে এই পরিবারে। আরো বড়ো হবে, পরিণত হবে, চিরপরিচিত এই দলের হাল ধরবে হয়তো কোনদিন। এসব ছেড়ে কেন যাবে তারা, অপরিচিত, অজানা-অচেনা মানুষের পরিবারে? সেখানে কেমন হবে তাদের ব্যবহার? দূর থেকে বেড়াতে আসা বৃদ্ধ গিরিজ এবং সঙ্গী-পুত্রহারা মিত্তিকার ব্যবহার বা তাঁদের আচরণ দেখে গোটা একটা দলের প্রত্যেক মানুষকে বোঝা যায় নাকি?

তবে মিত্তিকা একটা কথা বলেছেন, চিন্তা করার মতো। একটি দলের, একই পরিবারের মধ্যে মানুষের প্রজন্মের পর প্রজন্ম বেড়ে ওঠা খুব ভাল কথা নয়। যদিও এমনই চলে আসছে হাজার হাজার বছর ধরে। এই প্রথাটাকে একটা কোথাও থামানো দরকার। এক পরিবারের রক্তে অন্য পরিবারের মিশ্রণ দরকার, তাতে নতুন প্রজন্ম ভিন্নতর হয়ে উঠতে পারবে। একটি পরিবারভিত্তিক দলে, জন্ম থেকেই একটি ছেলে বা মেয়ের, কে তার প্রজনন সঙ্গী হবে, সেটি নির্দিষ্ট হয়ে যায়। এই নিয়মের ব্যতিক্রম হয় তখনই, যখন কোন অঘটনে দলের অনেক ছেলে বা মেয়ের মৃত্যু হয়। যেমনটা হয়েছে ওই দলের ক্ষেত্রে। সঙ্গিনীর অভাবে ছেলেরা কী তবে বীভৎস কোন সম্পর্কের দিকে এগোবে? সেই কুৎসিত প্রজন্ম...না, পিতা পশুপতি জেনেশুনে এমন হতে দিতে পারেন না।    

মিত্তিকার প্রস্তাবিত দুই দলের এই সম্পর্কে আরেকটা খুব বড়ো মঙ্গলজনক দিক আছে। তিনি যদি তাঁর পরিবারের দুই কন্যাকে ওঁদের পরিবারে দান করেন, দুই দলের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বাড়বে। যোগাযোগ বাড়বে, সহযোগিতা বাড়বে, বিপদে-আপদে একে অপরের পাশে থাকতে পারবে। এখন যে কোন দলের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলেই সর্বদা যে বিদ্বেষের মনোভাব থাকে, এই এলাকায় অন্ততঃ একটি দলের সঙ্গে সেই মনোভাব দূর হয়ে সখ্যতা আসবে। পিতা পশুপতি আশা করেন, কয়েক বছরের মধ্যে ওই দল তার হারানো শক্তি ফিরে পাবে। দুই দলের মিলিত শক্তি দিয়ে তখন অনেক বাধা সহজেই দূর করা যাবে।

পিতা পশুপতি মনস্থির করতে পারছেন না। এই চিন্তা ছাড়াও, তিনি আরও ভাবছেন, কোন দুটি কন্যাকে তিনি দান করতে পারেন? যারা এই দলের যোগ্য প্রতিনিধি হয়ে ওই দলে যাবে? তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠছে অতি প্রিয় চার-পাঁচটি মুখ। তাদের কাছে এই প্রস্তাব রাখলে তারা সম্মত হবে তো? সম্মত না হওয়ারই সম্ভাবনা, সেক্ষেত্রে তিনি কী করবেন? জোর করবেন? আজন্ম যাদের তিনি পরম স্নেহে লালন-পালন করেছেন, তাদের মতের বিরুদ্ধে গিয়ে তিনি নিজের মত জোর করে চাপিয়ে দেবেন? তাতে দলের অন্য মেয়ে-পুরুষের মনে ক্ষোভ তৈরি হবে না? নিজের দলের মধ্যেই তিনি সৃষ্টি করবেন অবিশ্বাসের বাতাবরণ?

পিতা পশুপতি ন্যায়-অন্যায়, উচিৎ-অনুচিত, শুভ-অশুভ নানান চিন্তায় কিছুতেই ঘুমোতে পারলেন না। রাত পার হয়ে গেল কখন, ভোরের স্নিগ্ধ বাতাস গায়ে লাগতে, তিনি বেরিয়ে এলেন অঙ্গনে। মুখ তুলে তাকালেন পাথর-আত্মার দিকে। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন অনেকক্ষণ, তারপর নরম সূর্যের প্রথম আলো এসে যখন পড়ল পাথর-আত্মার মুখে, তিনি জোড় হাতে অস্ফুটস্বরে বললেন, “পিতা, অনেকগুলি পথের মধ্যে সঠিক পথ কোনটি আমি বুঝতে পারছি না। আপনি আমাকে সঠিক পথের দিক্‌নির্দেশ দিন। যে পথে আমাদের সকলের মঙ্গল, যে পথে অন্য দলেরও মঙ্গল, আমাকে সেই পথ দেখান। আমার মন থেকে সমস্ত দ্বিধার অন্ধকার দূর করে, আমাকে ভবিষ্যতের আলো দেখান”। চোখ বন্ধ করে একাগ্র মনে তিনি স্থির দাঁড়িয়ে রইলেন।

“বড়োবাবা, তুমি কী সারারাত ঘুমোওনি? সেই কোন ভোর থেকে উঠে তুমি এমন দাঁড়িয়ে রয়েছ?” কতক্ষণ পরে, নাতনি ঊষির ডাকে পিতা পশুপতি সচেতন হলেন। চোখ মেলে সকালের আলোয় ঊষির পবিত্র মুখখানি দেখে বড়ো আনন্দ পেলেন। মুখে স্নিগ্ধ হাসি নিয়ে বললেন, “বড়ো চিন্তায় ছিলাম রে, মা। তবে এখন চিন্তা দূর হয়েছে। পিতা আমাকে সঠিক পথের সন্ধান দিয়েছেন। তার ওপর সকালের আলোয় তোর ওই নির্মল মুখ – আমার মনের সমস্ত দ্বিধা দূর করে দিয়েছে। আমি এখন নিশ্চিন্ত”।

...চলবে...

পরের পর্ব এই সূত্রে -  ধর্মাধর্ম - ১/৬



[1] প্রাণীজগৎ প্রকৃতির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করত বলেছি। তার মানে এখন কী আর করে না? না করে না। তারা এখন মানুষের নির্দিষ্ট করে দেওয়া অভয়ারণ্যে প্রতিপালিত হয়, পরোক্ষে মানুষই তাদের দেখভাল করে। আমরা টিকিট কেটে অভয়ারণ্যের গাড়িতে চেপে, জঙ্গলের প্রাণীদের দেখতে যাই, মজা নিই, ফটো তুলি। যে কোন অভয়ারণ্য কি আসলে মানুষের বানানো বৃহত্তর চিড়িয়াখানা নয়? এমনকি বনে কোন গাছ কতগুলো আছে, তার নথি বানিয়ে, তার মধ্যে কত গাছ কেটে কত আয় হবে, তাও আমরাই হিসেব করি। জঙ্গল জঙ্গলের মতো থাকতে পারে কই? আমাদের বটানিস্ট বিজ্ঞানীরা বলে দেন, কোন গাছের নতুন চারা বসাতে হবে, যাতে জঙ্গল নয়, বাড়বে কাঠের উৎপাদন!     

[2] ব্যাপারটা খুব আজগুবি মনে হচ্ছে কি? চিন্তা করে দেখুন তো, আমরা কাজে বেরোনোর সময়, কোন না কোন দেব বা দেবীর মূর্তি বা ফটো, কিংবা আমাদের পরলোকগত বাবা-মায়ের বাঁধানো ফোটোর দিকে একবারও কি তাকাই না? প্রতিটি রাজনৈতিক দপ্তরে, নিজস্ব দলের পরলোকগত নেতা-নেত্রীর বড়ো বড়ো ছবি বা ফোটো, সে মহাত্মা গান্ধী, ইন্দিরা গান্ধী, নেতাজী সুভাষ, বাবা আম্বেদকর, কার্ল মার্ক্স প্রমুখ – যিনিই হোন, থাকে না? পিতা পশুপতির থেকে ভাবনা চিন্তায় আমরা সত্যিই কি অনেকখানি এগোতে পেরেছি? আধুনিক বিজ্ঞানের প্রাচুর্যের মধ্যেও!   

[3] এই হিসাব আমি বিগত বছর দশেকের আঞ্চলিক ভয়ানক সাইক্লোন, টাইফুন বা টর্নেডো ধরে বলছি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাপক হারে পরিবেশ দূষণের জন্যে এ ধরনের ঝড়-ঝঞ্ঝার সংখ্যা ক্রমশঃ বাড়ছে এবং ভবিষ্যতে আরও বাড়বে। এর অর্থ মানুষ যখন প্রকৃতির গায়ে আঁচড়টুকুও কাটতে পারেনি, আজ থেকে চল্লিশ হাজার বছর আগে, বছরে এমন তাণ্ডব ঝড়ের সংখ্যা নিশ্চয়ই আরও কম ছিল!

[4] ১৫.০৫.১৯২৬ সালের The Pioneer পত্রিকায় একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল, সেটি এরকমঃ- “The man-eating leopard, which has lately been widely known as the Rudraprayag pest, and has, during the past seven years, killed one hundred and twentyfive human beings in the western part of the Garhwal district, has at last been shot, having fallen to the rifle of Captain J. Corbett, of Gurney House, Nainital”. এই চিতাটির পায়ে শজারুর কাঁটা ফুটে যাওয়ায় এবং অদক্ষ শিকারির হাতে আহত হওয়ায় মানুষখেকো হয়ে উঠেছিল এবং সাত বছরে বিশাল গাড়োয়াল জেলার পশ্চিমাংশে ১২৫ জন (সংখ্যাটি কিছু বেশিও হতেই পারে, কারণ সব মৃত্যুই হয়তো নথিভুক্ত করা যায়নি), অর্থাৎ বছরে গড়ে সতের জন মানুষকে হত্যা করেছিল। কিন্তু আমি যে সময়ের কথা বলছি, তখনকার জনসংখ্যা ১৯২৬ সালের জনসংখ্যার সঙ্গে কোনভাবেই তুলনীয় নয়। তাছাড়া মানুষ কোনদিনই চিতা, বাঘ বা সিংহের স্বাভাবিক শিকার ছিল না। অতএব, বাঘ বা সিংহের হাতে নিহত বা আহত হওয়ার ঘটনা সে সব দিনে আরও বিরল ছিল।


শুক্রবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২

 

এই সূত্র পড়া যাবে - " ঈশোপনিষদ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১ "



এই উপনিষদের প্রথম শব্দ ‘কেন’, এই কারণে এই উপনিষদের নাম কেনোপনিষদ। এই “কেন” শব্দের অর্থ – কেন বা why নয়। কেন এই সংস্কৃত শব্দের অর্থ কাহার দ্বারা – অর্থাৎ জগতের সমস্ত ঘটনা কে ঘটাচ্ছেন?  এ উপনিষদটি চার খণ্ডে বিভক্ত। প্রথম দু খণ্ড পদ্যে এবং শেষ দুই খণ্ড গদ্যে লিখিত। অনেক পণ্ডিতের মতে, এই উপনিষদের গদ্যাংশ, পদ্যাংশের অনেক আগেই রচিত হয়েছিল। এই প্রসঙ্গে আরও মনে রাখতে হবে – ঋগ্বেদ থেকে শুরু করে ভারতবর্ষের অধিকাংশ শাস্ত্রীয় রচনা ছন্দবদ্ধ পদ্যাকারে রচিত – গদ্য রচনা যথেষ্ট বিরল। অতএব, এই উপনিষদের গদ্যাংশ ভারতের প্রাচীনতম গদ্যরচনার অন্যতম নিদর্শন।    

ঈশোপনিষদের মতো কেনোপনিষদেরও উদ্দেশ্য অমৃতত্ব লাভ এবং ব্রহ্মের সঙ্গে জগৎ ও জীবের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা। তবে ঈশোপনিষদের মতো এই উপনিষদের বিষয় এত ব্যাপক নয়। এর বিষয় জীব-আত্মার সঙ্গে ব্রহ্ম-আত্মার সম্বন্ধ স্থাপন। প্রথমে শিষ্য-গুরু প্রশ্ন ও উত্তরের মাধ্যমে, তারপর একটি রূপক কাহিনীর সাহায্যে ব্রহ্মতত্ত্বের আলোচনা করা হয়েছে। 

শান্তিপাঠ

 

ওঁ সহ নাববতু, সহ নৌ ভুনক্তু, সহ বীর্যং করবাবহৈ তেজস্বি নাবধীতমস্তু,

মা বিদ্বিষাবহৈ।।

ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ।

ওঁ সহ নৌ অবতু, সহ নৌ ভুনক্তু, সহ বীর্যং করবাবহৈ তেজস্বি নৌ অধীতম্‌ অস্তু,

মা বিদ্বিষাবহৈ।।

ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ।

 

আমাদের দুজনকে তিনি সমভাবে রক্ষা করুন, দুজনকেই সমভাবে (জ্ঞান) লাভ করান, আমাদের উভয়কেই (জ্ঞানলাভের) উপযুক্ত করে তুলুন। আমাদের উভয়ের কাছেই লব্ধজ্ঞান যেন তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। (আমরা যেন পরষ্পরের প্রতি) বিদ্বেষ না করি।  ওঁ শান্তি, সকল বিঘ্নের শান্তি হোক।

 

ওঁ আপ্যায়ন্তু মমাঙ্গানি বাক্‌ প্রাণশ্চক্ষুঃ শ্রোত্রমথো বলমিন্দ্রিয়াণি চ সর্বাণি। সর্বং ব্রহ্মৌপনিষদম্‌। মাঽহং ব্রহ্ম নিরাকুর্যাং, মা মা ব্রহ্মা নিরাকরোৎ অনিরাকরণমস্তু।

অনিরাকরণং মেঽস্তু। তদাত্মনি নিরতে য উপনিষৎসু ধর্মাস্তে ময়ি সন্তু, তে ময়ি সন্তু। ওঁ শান্তিঃ  ওঁ শান্তিঃ  ওঁ শান্তিঃ ।।

 

ওঁ আপ্যায়ন্তু মম অঙ্গানি বাক্‌ প্রাণঃ চক্ষুঃ শ্রোত্রম্‌ অথ বলম্‌ ইন্দ্রিয়াণি চ সর্বাণি। সর্বং ব্রহ্ম ঔপনিষদম্‌। মা অহং ব্রহ্ম নিরাকুর্যাং, মা মা ব্রহ্মা নিরাকরোৎ অনিরাকরণম্‌ অস্তু।

অনিরাকরণং মে অস্তু। তৎ-আত্মনি নিরতে য উপনিষৎসু ধর্মাঃ তে ময়ি সন্তু, তে ময়ি সন্তু। ওঁ শান্তিঃ  ওঁ শান্তিঃ  ওঁ শান্তিঃ ।।

 

আমার সমস্ত অঙ্গ – বাক, প্রাণ, চোখ, কান, বল ও সকল ইন্দ্রিয় পুষ্টিলাভ করুক। এই সমস্তই যে ব্রহ্মের স্বরূপ, সেই তত্ত্বই এই উপনিষদ।  আমি যেন ব্রহ্মকে অস্বীকার না করি, ব্রহ্ম যেন আমাকে প্রত্যাখ্যান না করেন, কখনোই প্রত্যাখ্যান না করেন।

তাঁর সঙ্গে আমার নিত্যসম্বন্ধ থাকুক। উপনিষৎ সমূহে যে ধর্ম তত্ত্ব আছে, তারা আমার আত্মায় নিযুক্ত হোক, সেই আত্মায় আমি নিরত হই। ওঁ শান্তি, সকল বিঘ্নের শান্তি হোক।

 

প্রথম খণ্ড

 

কেনেষিতং পততি প্রেষিতং মনঃ

কেন প্রাণঃ প্রথমঃ প্রৈতি যুক্তঃ।

কেনেষিতাং বাচমিমাং বদন্তি

চক্ষুঃ শ্রোত্রং ক উ দেবো যুনক্তি।। ১/১

 

কেন ইষিতং পততি প্রেষিতং মনঃ

কেন প্রাণঃ প্রথমঃ প্রৈতি যুক্তঃ।

কেন ইষিতাং বাচম্‌ ইমাং বদন্তি

চক্ষুঃ শ্রোত্রং ক উ দেবঃ যুনক্তি।। ১/১

 

কার ইচ্ছায় এবং নির্দেশে আমাদের মন চালিত হয়? কার আদেশে প্রধান প্রাণ নিজ কাজে নিযুক্ত হয়? কার ইচ্ছায় মানুষ এত কথা বলে, কোন জ্যোতির্ময় পুরুষই বা চোখ, কানকে নিয়ন্ত্রণ করেন? [এই প্রশ্নগুলির উত্তর জানতে কোন শিষ্য যেন তাঁর গুরুকে জিজ্ঞাসা করছেন।]

এখানে “প্রাণঃ প্রথমঃ” – অর্থাৎ প্রাণই প্রধান – প্রাণ ছাড়া কোন ইন্দ্রিয়ই কার্যক্ষম হয় না।  

 

শ্রোত্রস্য শ্রোত্রং মনসো মনো যদ্‌

বাচো হ বাচং স উ প্রাণস্য প্রাণঃ।

চক্ষুষশ্চক্ষুরতিমুচ্য ধীরাঃ

প্রেত্যাস্মাল্লোকাদমৃতা ভবন্তি।। ১/২

শ্রোত্রস্য শ্রোত্রং মনসঃ মনঃ যদ্‌

বাচঃ হ বাচং স উ প্রাণস্য প্রাণঃ।

চক্ষুষঃ চক্ষুঃ অতিমুচ্য ধীরাঃ

প্রেত্য অস্মাৎ লোকাৎ অমৃতা ভবন্তি।। ১/২

   [শিষ্যের প্রশ্নের উত্তরে গুরু বলছেন] যাঁর শক্তিতে কান শুনতে পায়, মন চিন্তা করে, বাগেন্দ্রিয় কথা বলে, তাঁর শক্তিতেই প্রাণ উজ্জীবিত হয়, চোখ দেখতে পায়। তিনিই সমস্ত ইন্দ্রিয়ের চালক, পণ্ডিতেরা এই তত্ত্ব জেনে আত্মবুদ্ধি ত্যাগ করে, সংসারের ঊর্ধ্বে অমৃতলোক অনুভব করেন।   

 

ন তত্র চক্ষুর্গচ্ছতি ন বাগ্‌গচ্ছতি নো মনঃ।

ন বিদ্মো ন বিজানীমো যথৈতদনুশিষ্যাৎ।। ১/৩

ন তত্র চক্ষুঃ গচ্ছতি ন বাক্‌ গচ্ছতি ন মনঃ।

ন বিদ্মঃ ন বিজানীমঃ যথা এতৎ অনুশিষ্যাৎ।। ১/৩

চোখ তাঁকে দেখতে পায় না, বাক্যে তাঁকে বর্ণনা করা যায় না, মনেও তাঁর কল্পনা করা যায় না। আমরা তাঁর স্বরূপ জানি না, অতএব কী ভাবে তাঁর কথা তোমাকে বলবো, তাও জানি না।


অন্যদেব তদ্বিদিতাদথো অবিদিতাদধি।

ইতি শুশ্রুম পূর্বেষাং যে নস্তদ্‌ব্যাচচক্ষিরে।। ১/৪


অন্যৎ এব তৎ বিদিতাৎ অথ অবিদিতাৎ অধি।

ইতি শুশ্রুম পূর্বেষাং যে নঃ তৎ ব্যাচচক্ষিরে।। ১/৪

আমাদের জানা, এমনকি অজানা সকল বিষয় থেকেই তিনি ভিন্ন, আমাদের পূর্ববর্তী গুরুদের কাছে এমন ব্যাখ্যাই আমরা শুনেছি।


যদ্বাচাঽনুভ্যুদিতং যেন বাগভ্যুদ্যতে।

তদেব ব্রহ্ম ত্বং বিদ্ধি নেদং যদিদমুপাসতে॥ ১/৫


যৎ বাচা অনুভ্যুদিতং যেন বাক্‌ অভ্যুদ্যতে।

তৎ এব ব্রহ্ম ত্বং বিদ্ধি ন ইদম্‌ যৎ ইদম্‌ উপাসতে॥ ১/৫

যাঁকে কথায় প্রকাশ করা যায় না, কিন্তু আমাদের বাক্য যিনি প্রকাশিত করেন, তাঁকেই তুমি ব্রহ্ম বলে জানবে – কিন্তু যাঁকে আমরা উপাসনা করি, তিনি নন।

“ন ইদম্‌ যৎ ইদম্‌ উপাসতে” – অর্থাৎ যাঁকে আমরা উপাসনা করি, তিনি নন” - এই কথাটি পরবর্তী শ্লোকগুলিতে বারবার বলা হয়েছে কারণ এই বক্তব্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর আগের উপনিষদগুলি থেকে আমার জেনেছি – এক এবং অদ্বিতীয় ব্রহ্ম প্রকৃতপক্ষে সর্বব্যাপী এক চেতন-পুরুষ বা আত্মা, তিনিই আমাদের সকল জ্ঞানের প্রকাশক। এই ব্রহ্মই আমাদের একমাত্র উপাস্য। কিন্তু আমরা যে সকল অনাত্ম জড়পদার্থে – অর্থাৎ দেবদেবীর মূর্তিতে - ব্রহ্মত্ব আরোপ করে, সেই দেবদেবীর উপাসনা করি – তাঁরা কেউই স্বরূপতঃ ব্রহ্ম নন। তাঁদের উপাসনা কখনোই ব্রহ্মোপাসনা হতে পারে না। এমনকি আমাদের সনাতন ধর্মে যে ত্রিমূর্তি বা ত্রিদেবের – ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বরের উপাসনা করা হয়, সেই ত্রিদেবের ব্রহ্মাও ব্রহ্ম নন। ব্রহ্মা সাকার কিন্তু ব্রহ্ম নিরাকার। ব্রহ্ম সর্বব্যাপী এবং সচ্চিদানন্দস্বরূপ, অব্যক্ত, অনির্বচ্চনীয় জগতাত্মা।     

 

যন্মনসা ন মনুতে যেনাহুর্মনো মতম্।

তদেব ব্রহ্ম ত্বং বিদ্ধি নেদং যদিদমুপাসতে॥ ১/৬

যৎ মনসা ন মনুতে যেন আহুঃ মনঃ মতম্।

তৎ এব ব্রহ্ম ত্বং বিদ্ধি ন ইদং যৎ ইদম্‌ উপাসতে॥ ১/৬

মন যাঁকে চিন্তা করতে পারে না, অথচ যিনি মনে চেতনার প্রকাশ ঘটান, তাঁকেই তুমি ব্রহ্ম বলে জানবে – কিন্তু যাঁকে আমরা উপাসনা করি, তিনি নন।


যচ্চক্ষুষা ন পশ্যতি যেন চক্ষূংষি পশ্যতি।

তদেব ব্রহ্ম ত্বং বিদ্ধি নেদং যদিদমুপাসতে॥ ১/৭


যৎ চক্ষুষা ন পশ্যতি যেন চক্ষূংষি পশ্যতি।

তৎ এব ব্রহ্ম ত্বং বিদ্ধি ন ইদং যৎ ইদম্‌ উপাসতে॥ ১/৭

চোখ যাঁকে দেখতে পায় না, অথচ যিনি আমাদের দৃষ্টিতে আলো দিয়েছেন, তাঁকেই তুমি ব্রহ্ম বলে জানবে – কিন্তু যাঁকে আমরা উপাসনা করি, তিনি নন।


যচ্ছ্রোত্রেণ ন শৃণোতি যেন শ্রোত্রমিদং শ্রুতম্।

তদেব ব্রহ্ম ত্বং বিদ্ধি নেদং যদিদমুপাসতে॥ ১/৮


যৎ শ্রোত্রেণ ন শৃণোতি যেন শ্রোত্রম্‌ ইদং শ্রুতম্।

তৎ এব ব্রহ্ম ত্বং বিদ্ধি ন ইদং যৎ ইদম্‌ উপাসতে॥ ১/৮

কান যাঁকে শুনতে পায় না, অথচ যিনি আমাদের শ্রবণে শব্দের বোধ সঞ্চার করেন, তাঁকেই তুমি ব্রহ্ম বলে জানবে – কিন্তু যাঁকে আমরা উপাসনা করি, তিনি নন।


যৎ প্রাণেন ন প্রাণিতি যেন প্রাণঃ প্রণীয়তে।

তদেব ব্রহ্ম ত্বং বিদ্ধি নেদং যদিদমুপাসতে॥ ১/৯


যৎ প্রাণেন ন প্রাণিতি যেন প্রাণঃ প্রণীয়তে।

তৎ এব ব্রহ্ম ত্বং বিদ্ধি ন ইদং যৎ ইদম্‌ উপাসতে॥ ১/৯

এই প্রাণ যে প্রাণকে উপলব্ধি করতে পারে না, অথচ যিনি আমাদের প্রাণে জীবনীশক্তি সঞ্চার করেন, তুমি তাঁকেই ব্রহ্ম বলে জানবে – কিন্তু এই যাঁকে আমরা উপাসনা করি, তিনি নন।

 

কেনোপনিষদ প্রথম খণ্ড সমাপ্ত

 

  

দ্বিতীয় খণ্ড

 

যদি মন্যসে সুবেদেতি দভ্রমেবাপি

নূনং ত্বং বেত্থ ব্রহ্মণো রূপম্।

যদস্য ত্বং যদস্য দেবেষ্বথ নু

মীমাংস্যমেব তে; মন্যে বিদিতম॥ ২/১

যদি মন্যসে সুবেদ ইতি দভ্রম্‌ এব অপি

নূনং ত্বং বেত্থ ব্রহ্মণো রূপম্।

যদস্য ত্বং যদস্য দেবেষু অথ নু

মীমাংস্যম্‌ এব তে; মন্যে বিদিতম॥ ২/১

যদি তুমি মনে কর “আমি ব্রহ্মকে ভালোভাবেই জেনেছি”, তবে এই ব্রহ্মের দেবত্ব স্বরূপ সামান্য রূপই জেনেছ। সুতরাং ব্রহ্ম আজও তোমার বিচার্য বিষয়। [শিষ্য বললেন] “আমার মনে হয় আমি ব্রহ্মকে জেনেছি”।

 

নাহং মন্যে সুবেদেতি নো ন বেদেতি বেদ চ।

যো নস্তদ্বেদ তদ্বেদ নো ন বেদেতি বেদ চ॥ ২/২

না অহং মন্যে সুবেদ ইতি নো ন বেদ ইতি বেদ চ।

যো নঃ তৎ বেদ তৎ বেদ নো ন বেদ ইতি বেদ চ॥ ২/২

আমি মনে করি না আমি ব্রহ্মকে ভালোভাবে জেনেছি। আমি তাঁকে জানি না তা নয়, আবার জানি যে তাও নয়। আমাদের [শিষ্যদের] মধ্যে যিনি এই তত্ত্ব বুঝতে পেরেছেন, তিনিই ব্রহ্মকে বুঝতে পেরেছেন।

 

যস্যামতং তস্য মতং মতং যস্য ন বেদ সঃ।

অবিজ্ঞাতং বিজানতাং বিজ্ঞাতমবিজানতাম্॥ ২/৩

যস্য অমতং তস্য মতং মতং যস্য ন বেদ সঃ।

অবিজ্ঞাতং বিজানতাং বিজ্ঞাতম্‌ অবিজানতাম্॥ ২/৩

যিনি মনে করেন তিনি ব্রহ্মকে জানেন না, প্রকৃতপক্ষে তিনিই ব্রহ্মকে জানেন। যিনি মনে করেন তিনি ব্রহ্মকে জেনেছেন, তিনি তাঁকে জানেননি। প্রকৃত জ্ঞানী ব্রহ্মকে জানেন এমন মনে করেন না, কিন্তু অজ্ঞ জনেরা মনে করে।

 

প্রতিবোধবিদিতং মতমমৃতত্বং হি বিন্দতে।

আত্মনা বিন্দতে বীর্যং বিদ্যয়া বিন্দতেঽমৃতম॥ ২/৪

প্রতিবোধবিদিতং মতম্‌ অমৃতত্বং হি বিন্দতে।

আত্মনা বিন্দতে বীর্যং বিদ্যয়া বিন্দতে অমৃতম্‌॥ ২/৪

যিনি প্রতিটি আত্মবোধে ব্রহ্মকে উপলব্ধি করেন, তিনিই অমৃতরূপ মোক্ষ লাভ করেন। শুধুমাত্র আত্মজ্ঞানের মাধ্যমে যে সামর্থ্য লাভ করা যায়, সেই বিদ্যাতেই অমৃতত্ব লাভ সম্ভব।  

 

ইহ চেদবেদীদথ সত্যমস্তি

ন চেদিহাবেদীন্মহতী বিনষ্টিঃ।

ভূতেষু ভূতেষু বিচিত্য ধীরাঃ

প্রেত্যাস্মাল্লোকাদমৃতা ভবন্তি॥ ২/৫

ইহ চেৎ অবেদীৎ অথ সত্যম্‌ অস্তি

ন চেৎ ইহ অবেদীৎ মহতী বিনষ্টিঃ।

ভূতেষু ভূতেষু বিচিত্য ধীরাঃ

প্রেত্য অস্মাৎ লোকাৎ অমৃতা ভবন্তি॥ ২/৫

এই জীবনেই যদি কেউ ব্রহ্মকে জানতে পারে, তার সত্য লাভ হয়, কিন্তু তা যদি না হয় তার মহতী বিনাশ উপস্থিত হয় (অর্থাৎ সে এই সংসারের জরা-মৃত্যু, সুখ-দুঃখের অধীন হয়)। অতএব জ্ঞানীব্যক্তিরা সর্বভূতে পরম ব্রহ্মকে উপলব্ধি করে, এই জাগতিক লোকের ঊর্ধে অমৃতস্বরূপ হয়ে থাকেন।

 

কেনোপনিষদ দ্বিতীয় খণ্ড সমাপ্ত


...চলবে...

বুধবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

চুরি বিদ্যে মহাবিদ্যে...

 



এর আগের পর্ব - সনাতনীর সন্ধানে   ]


আমাদের কলকাতার ছোট্ট বাসা বাড়ির ততোধিক ছোট পরিসরে মায়ের ভান্ডার থেকে হরলিক্স, মাখন এবং বিস্কুট চুরি করে ধরা না পড়াটাই আশ্চর্য ছিল। প্রায় প্রত্যেকবারই ধরা পড়তাম। প্রচুর বকাবকি এবং পিঠের ওপর মায়ের চড়টা চাপড়টা বরাদ্দ থাকত। চড়চাপড় খেয়ে মুখ গোমড়া করে ওঘরে চলে যেতাম আর দেয়ালের দিকে মুখ করে শুয়ে থাকতাম বিছানায়। এর মানে আমি খুব রেগে গেছি মায়ের ওপর। একটু পরেই মা আসতেন পাশের ঘরে। বিছানার একপাশে বসতেন, পিঠে হাত রাখতেন। আমার রাগ আরো বেড়ে যেত, মায়ের হাত সরিয়ে দিতাম ঝটকা দিয়ে – মা মুখ টিপে হাসতেন, বলতেন –

-‘ইস, ফর্সা পিঠে কেমন লাল লাল দাগ হয়ে গেছে। খুব লেগেছে না? ছি ছি, এমন ঘুনুসোনাকে কেউ এভাবে মারে’? আমার কণ্ঠ তখন আবেগে রুদ্ধ, ভীষণ মমতায় মা আমার পিঠে হাত বোলাতেন। রুদ্ধ আবেগ কান্না হয়ে উঠে আসত, আমি ফুঁপিয়ে উঠতাম, পিঠ ফুলে ফুলে উঠত। মা আবার বলতেন-

–‘কে মেরেছে, বাবা, তোমাকে? কে এত কষ্ট দিল আমার ঘুনুসোনাকে?’ পিঠ ফিরিয়ে থেকেই শেষ অভিমানটুকু উজাড় করে দিয়ে কান্নাভাঙা গলায় আমি চেঁচিয়ে উঠতাম –

-‘কে আবার, মা - আমার মা, তুমিই তো মারলে আমাকে...’। ভারি গলায় মা বললেন-

-‘উঁহু, তাহলে ও তোমার মা নয়, ও রাক্কুসী। মা এমন মারতেই পারে না ঘুনুসোনাকে...’। নিমেষের মধ্যে সমস্ত রাগ অভিমান ভুলে যেতাম, আমি লাফিয়ে উঠে বসতাম মায়ের সামনাসামনি, বলতাম-

-‘মোটেও রাক্কুসি নয় - মা। আমার মা...’। কান্না ভেজা চোখে তাকিয়ে দেখি মায়ের চোখেও জল। বুকের কাছে টেনে নিয়ে মা বলতেন-

-‘কেন চুরি করিস বলতো? সব তো তোদেরই জন্যে। আমারও এমন রাগ হয়ে যায়...’।

কলকাতায় মায়ের ছোট্ট ভান্ডার পার হয়ে গিয়ে মামাবাড়িতে দিদিমার বৃহত্তর ভান্ডারের সন্ধান দিয়েছিল বন্নিদিদি। সেখানেও বন্নিদিদির পূর্ণসহযোগিতায় চৌর্যবৃত্তির হাতযশ বেড়ে উঠেছিল সন্দেহ নেই। কিন্তু এসবই ছিল নিজস্বাপহারণ - নিজের জিনিষই চুরি করা। কারণ এসব খাদ্যদ্রব্য মা কিংবা দিদিমা আমাদের মনোরঞ্জনের জন্যেই সংগ্রহে রাখতেন। দিদিমার ভান্ডারেও আমাদের চৌর্যবৃত্তি ধরা পড়ে দিদিমার থাবড়ি খেয়েছি অনেক, আর খেদোক্তি শুনেছি বিস্তর – ‘পোড়ারমুখো (আমাকে আর বন্নিদিদির ক্ষেত্রে পোড়ারমুখি), এসব তো তোদের জন্যেই বানানো। তা সে আকাচা কাপড়ে ছোঁয়াছুঁয়ি না করলে চলছিল না’? আচারের বয়াম আকাচা কাপড়ে ছুঁলে, আচার নাকি বিগড়ে যায়। 

সে যাই হোক, এইবার ডাক এল পরস্বাপহরণের।

তখনকার দিনে সম্বৎসরে একবারই ধান হতো। ধান কাটার পর শীতকালে বেবাক নেড়া পড়ে থাকত ধূসর মাঠ কে মাঠ। কেউ কেউ টুকটাক চাষবাস করতেন সর্ষে, আলু, আখ, মুসুরডাল...। খাপছাড়া সবুজের দেখা মিলত এখানে সেখানে। দেখবার মতো ছিল – সর্ষের ক্ষেতগুলি - সবুজ পশমিনার ওপর উজ্জ্বল হলুদের অনবদ্য বুটির কাজ। হিমেল উত্তুরে হাওয়া এসে যখন দোলা দিয়ে যেত সর্ষে ফুলের বৃন্তে - মুগ্ধ হয়ে দেখা ছাড়া অন্য কোন বর্ণনা আসত না মনে। বড়ো হয়ে সেই বর্ণনা শুনেছি কণিকা বন্দোপাধ্যায়ের মন্মোহিনী কণ্ঠে – ‘...আকাশের লাগে ধাঁধা, রোদের আলো ওই যে বাঁধা। বুঝি ধরার কাছে আপনাকে সে মাগলো – সর্ষে ক্ষেতের ফুল হয়ে তাই জাগলো, নীলদিগন্তে...’। এমন নিখুঁত রূপকল্প রচনা রবি ঠাকুরের পক্ষেই সম্ভব। যতবার গানটি কানে আসে চোখের ওপর দুলতে থাকে উজ্জ্বল হলুদের সেই শামিয়ানা...।

আখের ক্ষেত ছিল মাঠে বেশ কয়েকটি। সবচেয়ে নিরাপদ, লোকালয় থেকে নির্জন দূরত্বে একটি আখের ক্ষেত নির্বাচন করে আমরা পাঁচজন রওনা হলাম এক মধ্যদ্বিপ্রহরে। আমরা দুইভাই, মামাতো দুইভাই, আর মামাতো বড়ো দাদার পাড়ার এক বন্ধু। আমাদের মধ্যে মামাতো বড়ো দাদা আর তার বন্ধু সবার বড়ো, আর আমি সবচেয়ে ছোট। আমি আর পিঠোপিঠি মামাতো দাদা হাফপ্যান্ট পড়া আর বাকিরা ডোরাকাটা পায়জামা। জানিনা কেন, এই পায়জামাগুলোকেই গ্রামে সবাই ফুলপ্যান্ট বলত, আর ফুলপ্যান্টকে বলত সুট। দাদারা ছোট ভাঁজ করা ছুরি নিয়েছিল, আমরা হাফপ্যান্টের বাচ্চা বলে আমাদের ছুরি মেলে নি।

 আমরা যখন আখের সুউচ্চ বহির্বেষ্টনী সাবধানে এড়িয়ে ক্ষেতের অন্দরে ঢুকলাম, দেখলাম সে ক্ষেতের আখ খেতে এমন কিছু আর বাকি নেই। মাঝখানটা বেশ ফাঁকা, আখের চিবোনো ছিবড়ে আর আখের খোসা স্তূপাকারে ছড়ানো যত্র তত্র। অর্থাৎ আমরা এ কাজেও পথিকৃৎ হতে পারলাম না, আমাদের আগেও অনেকেই এই ক্ষেতের রসাস্বাদন করে গেছে। অনুশোচনার অবকাশ ছিল না, তাই ঝপাঝপ গোটা দশেক আখ ছুরির আঘাতে ধরাশায়ী হল এবং টুকরো হয়ে চলে এল সাফসুফ হয়ে। আমরা নিজের নিজের হাত ও দাঁতের সহযোগিতায় নেমে পড়লাম ইক্ষুর রসগ্রহণে। ঘন্টাখানেকের মধ্যেই আমাদের যা ছিবড়ে জমা হয়ে উঠল তাতে আমরা সকলেই আড়ালে বসে লুকোতে পারতাম অনায়াসে। পেটের মধ্যে আখের রস টলমল করছে, আখের খোসা ছাড়াতে গাল ও ঠোঁটের ভেতর আর মাড়ি ছিঁড়ে জ্বালা করছিল, রসে চ্যাটচ্যাট করছিল কনুই অব্দি হাত আর মুখের চারপাশ। শুনেছি আখের রস নাকি জন্ডিসের অব্যর্থ পথ্য, কিন্তু সেদিন ধরা পড়লে আমাদের কেস যে জন্ডিস হতো - সেটাও ব্যর্থ হতো না নিশ্চিৎ।    

ক্ষেত মালিকের নিশ্চয়ই ইচ্ছে ছিল বাড়িতেই আখের গুড় বানিয়ে নেওয়ার। যে গুড়ের থেকে আমাদের এই বঙ্গভূমির একাংশের প্রাচীন যুগেই নাম হয়েছিল গৌড় এবং গৌড়িয় মাধ্বীর সুখ্যাতি পৌঁছেছিল মহাভারতের সুরারসিকদের কাছেও। কিন্তু যেদিন তাঁর অন্তঃসারহীন আখের খেতের সম্যক হদিশ তিনি পেয়েছিলেন, তাঁর অন্তঃকরণে কি অনুভূতি হয়েছিল এবং আমাদের কি পরিমাণ শাপশাপান্ত করেছিলেন - সে চিন্তা করলে আজও মনের ভিতর অস্বস্তি হয় ভীষণ।

সে দিন রাতে ভাত খাবার সময় কোন তরকারিই মুখে রোচে নি - এমন ঝাল। আসলে ঝাল-টাল কিচ্ছু না আমার মুখের ভিতরে যা অবস্থা তাতে সামান্য নুনের স্পর্শেও জ্বলে উঠছিল। কেন এবং কি করে হল - মা ও মাসীমাদের জেরার চোটে আমার জেরবার হাল, অবশেষে বড়মামীমার হস্তক্ষেপে মীমাংসা হল দুধ ভাতের প্রেসক্রিপ্সনে। বন্নিদিদি কিন্তু ছাড়েনি - আমার পেট থেকে কথা বের করে নিয়েছিল সেই রাত্রেই এবং ‘বেশ হয়েছে, খুব ভালো হয়েছে, আর যাবি আমাকে না বলে?’ বলেও, আমাকে অনেকখানি মধু এনে দিয়েছিল লুকিয়ে – আঙুলে করে লাগিয়ে দিয়েছিল গালে আর ঠোঁটের ভিতরে।

এই ঘটনার পরে আমার মতো বাচ্চারা ব্রাত্য হয়ে গেলাম দাদাদের দল থেকে। বাস্তবিক আমার জন্যে প্রায় ধরা পড়ার উপক্রম হচ্ছিল সক্কলের। কিন্তু আমরাও হার মানলাম না। আমাদের আলাদা একটা দল তৈরি হয়ে গেল গোপনে এবং আমাদের প্রথম অ্যাকশন প্ল্যান হল আলুপোড়া খাওয়া। কচুপোড়া ব্যাপারটা তাও শুনেছিলাম – উত্তর কলকাতায় ‘কচু পোড়া খেলে যা’ লব্জটা তখন প্রায়ই শোনা যেত – কিন্তু আলুপোড়া কোনদিন শুনিনি। শোনা তো সামান্য কথা, একেবারে চেখে দেখার সুযোগ আসছে জেনে রীতিমত উত্তেজিত হয়ে উঠলাম।

 আলুপোড়া অভিযানের দিন সকালে – সাজসাজ রব পড়ে গেল আমাদের মধ্যে - কিন্তু অত্যন্ত গোপনে। আলু পোড়াবার জন্যে ঘুঁটে, কেরোসিন তেল, দেশলাই। টেস্টের জন্যে নুন, লংকা ও গোলমরিচের গুঁড়ো, শিশিতে সামান্য সর্ষের তেল, যদি আলু কাটাকুটি করতে লাগে বলে দুটো ছুরি। এরইমধ্যে আমি বারবার জিগ্যেস করছিলাম – ‘কিরে আসল জিনিষ, আলু নিবি না’? – ‘ধূর, ওতো মাঠে...’। ওদের কথাবার্তার কোন হদিশ পাই না, এসে থেকে তো মাস খানেক হতে চলল মাঠে মাঠে ঘুরে বেড়াচ্ছি বিস্তর, মাঠে আবার আলু কোথায়? পাছে আমাকে সবাই বোকা ভাবে, এই চিন্তা করে চেপে গেলাম, মনে মনে নিশ্চিত ছিলাম, এ মিশন ব্যর্থ হবে এবং সময়ে আমার দূরদর্শীতায় সকলে মুগ্ধ হতে বাধ্য।

নির্দিষ্ট সময়ে আলাদা আলাদা ভাবে যার যার দায়িত্ব অনুযায়ী জিনিষপত্র নিয়ে আমরা রওনা হলাম। গ্রামের বাইরে একটা জায়গায় আমরা জড়ো হয়ে রওনা হলাম মাঠের দিকে। আমি এতক্ষণ লক্ষ্য করছিলাম কেউ আলু নেয় নি। আসার পথে এত দোকান গেল, সব দোকানেই আলু পাওয়া যায়, সে সব ছেড়ে এই মাঠে আলু নিয়ে কে বসে আছে কে জানে – টেরটি পাবে বাছাধনেরা।  

চুপচাপ হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা গিয়ে একটা মাঠে সবাই গিয়ে থেমে গেলাম। সে মাঠে আলুর কোন চিহ্ন নেই। গোটা মাঠে আধা সবজে আধা হলদে হয়ে যাওয়া চারাগাছে ভর্তি, আমার হাঁটুর হাইট হবে বড়ো জোর। একটাই বিশেষত্ব নজরে এল - এর মাটিটা। দুপাশে সামান্য নালি কেটে গাছের গোড়াগুলো উঁচু করে ঝুরো ঝুরো মাটিতে ঢাকা। 

আমাদের দলের একজন একটা গাছ কে নিষ্ঠুর ভাবে টেনে তুলতেই শেকড়ের সঙ্গে বেরিয়ে এল বেশ একমুঠো আলু – ছোট বড় মাঝারি সাইজের। অবাক কান্ড – তার আগে শিব্রাম চকরবরতির লেখায় পড়েছিলাম, আলু হয় বড় বড় গাছে ...টুসকি দিয়ে খুব সাবধানে আলু পাড়তে হয়...আর এইখানে মাটির ভিতরে সেই আলু? 

এহেন অবাক কান্ডে আমি যারপরনাই অভিভূত হলাম এবং আমাদের বাচ্চা দলের সাফল্য সম্পর্কে আমার আর সন্দেহের অবকাশ রইল না। সেই বিকেলে ঘুঁটে ও মাঠের শুকনো আগাছার কাঠকুটো জোগাড় করে আলু পোড়া বানানো হল। আধপোড়া, ঝামাপোড়া, আধকাঁচা, দরকচা আলুই ক্যাঁচক্যাঁচ করে খেয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে আমরা যখন ফেরার পথ ধরলাম, সূর্য তখন পাটে বসার আগে একটু থমকে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন - এই ছোঁড়াগুলো ফাঁকা মাঠে করছেটা কি? 

আমাদের নিরাপদ ও সাকসেসফুল মেডেন মিশন আমাদের সাহস ও আত্মবিশ্বাস অনেক বাড়িয়ে দিল। 

আমরা যখন বাড়ি পৌঁছলাম, বন্নিদিদি সদর দরজায় সন্ধ্যার প্রদীপ দেখাচ্ছিল। চালধোয়ার ধুচুনির মধ্যে প্রদীপ, তার অসংখ্য ছিদ্র দিয়ে প্রদীপের বহুধা আলো ঠিকরে পড়ছে চারদিকে। কি একটা মন্ত্র পড়ছিল বিড়বিড় করে, মুখে কথা না বলে ভুরু তুলে জিজ্ঞেস করল ‘কোন চুলোয় যাওয়া হয়েছিল শুনি’? আমি বললাম ‘এই তো বেড়াতে’। বন্নিদিদি তুলসীতলায় প্রদীপটা নামিয়ে মাথা নীচু করে নমস্কার করল তিনবার। আমি প্যান্টের পকেট থেকে দুটো আলুপোড়া বন্নিদিদির দিকে বাড়িয়ে দিতে, বন্নিদিদি বলল, ‘দাঁড়া, দাঁড়া, তোর আকাচা কাপড়, ছুঁয়ে দিস না। আলুপোড়া কোথায় পেলি? মাঠে আলু চুরি করতে গিয়েছিলি? সেদিন আখ চুরি, আজ আলু - কি শুরু করেছিস? তুই এই গ্রামের ছেলে নোস - কলকাতায় থাকিস। ভালো স্কুলে পড়িস। নপিসিমা-পিসেমশাই তোকে এইসব করার জন্যে এখানে নিয়ে এসেছে? তোর এই কাজের জন্যে তোর বাবা-মাকে কেউ যদি পাঁচকথা শোনায় - তোর ভাল লাগবে তো’? 

সেই সন্ধ্যায় তুলসীমঞ্চের সামনে, মুখের ওপর খেলা করা প্রদীপের স্নিগ্ধ আলোয় - বন্নিদিদির কথাগুলো আমাকে এমন এক সত্যের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল যার ফল হয়েছিল সুদূরপ্রসারী। আজ পর্যন্ত জীবনের প্রত্যেকটি বেপথু মুহূর্তে, দীপের সীমিত আলোয় বন্নিদিদির দীপ্ত মুখের সেই কথাগুলি সঠিক পথের দিশারী হয়ে আমার কাছে ফিরে এসেছে বারবার।  

[পরের পর্ব " লোকশিল্পীর বিলুপ্তি "]  

সনাতনীর সন্ধানে

 



[এর আগের পর্ব - রতনে রতন চেনে।]


এমন নয় যে মামার বাড়ি বা গ্রাম বাংলা আমার কাছে নতুন জায়গা। এর আগেও গেছি। কিন্তু এইবারটা একটু অন্যরকম। অন্যান্য বার আমাদের থাকার সময় হত সীমিত, সাতদিন বড়জোর দশদিন। কলকাতার আবদ্ধ জীবনের থেকে মুক্তির রসাস্বাদন শুরু হবার আগেই যেন ফেরার আয়োজন চালু হয়ে যেত। এবারে থাকাটা একদম আলাদা – সরকারি নির্দেশ অনুযায়ী অনির্দিষ্টকালের জন্য।

পৌঁছোনোর পরদিন সকাল সকাল ঘুম থেকে টেনে তুলে দিল ছোটমাসিমা - হাতে ধরিয়ে দিল একটা কাঁসার গেলাস – ধরে দেখলাম সেটা কনকনে ঠান্ডা। এমনিতেই কলকাতার চেয়ে অনেক বেশী ঠান্ডা এখানে। গেলাসটা হাতে ধরতে আমার হাড়গোড় পর্যন্ত কেঁপে উঠল ঠান্ডায়। ফিকে বাদামি রঙের, সরস্বতীপুজোর পায়েসের গন্ধ মাখা পানীয় – সঠিক বললে - সার্ভড অ্যাজ চিল্ড। হাল্কা চুমুক দিতেই দাঁতের গোড়া ঝাঁকিয়ে উঠল ঝনঝন করে, কিন্তু রসনার স্বাদকোরকগুলি রীতিমত নড়েচড়ে বসল এমন একটি অনাস্বাদিত রসের অভূতপূর্ব আস্বাদ পেয়ে। পানীয়টি খেজুর গাছের রস – আর এ জিনিষ যে আমাদের কলকাতায় মিলবে না সেটা গর্বের সঙ্গে ঘোষণা করতেও ছাড়ল না ছোটমাসিমা। বাবা আমার পাশেই বসেছিলেন, তিনিও মাসিমার কথায় কোন প্রতিবাদ করলেন না। অথচ ওই বয়সেই অনেক বয়স্ক লোকের মুখেই শুনেছিলাম – ‘কি পাওয়া যায় না, হে - পয়হা ফেললে বাঘের দুদও মেলে কলকেতায়’!

সেদিন সকালেই বাবা নিমের ডাল দিয়ে দাঁতন করলেন। বিষাক্ত কেমিক্যালযুক্ত পেস্ট আর প্লাস্টিকের বুরুশের থেকে অন্ততঃ একদিন প্রাকৃতিক মুক্তি পাবার জন্যে। বাবার দেখাদেখি বায়না ধরলাম আমিও। ভাবলাম না জানি এও কোন অজানা জগৎ খুলে দেবে আমার সামনে। খেজুররসে সদ্যতৃপ্ত রসনা সেদিন চমকে উঠেছিল আমার এ হেন অবিমৃষ্যকারিতায়, আর আমার অন্তরাত্মার হাতে পায়ে ধরে বারবার বলেছিল ‘ছেড়ে দে মা, কেঁদে বাঁচি’। বারবার মানা করা সত্ত্বেও শুনিনি বলে, ছোটমাসিমা আমার কি অবস্থা দাঁড়ায় দেখতে সামনেই দাঁড়িয়েছিল। মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত তিক্ত হয়ে উঠেছিলাম, কিন্তু বাবার মতো গম্ভীরভাবে পায়চারি করতে করতে নিমের ডালেই দাঁত মেজেছিলাম সেদিন এবং সেই বয়সেই বুঝে গিয়েছিলাম - ইগো বড় বালাই।

সেদিন বিকেলেই বাবা ফিরে গেলেন কলকাতায়। ছোটমামা বাবাকে এগিয়ে দিতে গেল। আমরা সদর দরজায় দাঁড়িয়ে রইলাম যতক্ষণ বাবাকে দেখা যায়। দিদিমা, দুই মাসিমা, মামাতো দিদি এবং সবার পিছনে বড়োমামা - সকলেই ছিলেন আমাদের সঙ্গে। বাবা যখন রাস্তার মোড়ে আড়ালে চলে গেলেন, দিদিমা হাত জোড় করে নমস্কার করে বললেন ‘সব ভালো রেখো, মা বিপত্তারিণী’, ঘোমটা দেওয়া মায়ের গম্ভীর মুখ আর চোখে জল টলটল করছিল। ভীষণ মন খারাপ করতে লাগল বাবার জন্যে।

আমি অচিরেই আমার মামাতো দিদির একান্ত ভক্ত হয়ে উঠলাম। বহ্নি আমার উচ্চারণে হয়ে গেল বন্নিদিদি। কাজে অকাজে বন্নিদিদির সঙ্গী হবার জন্যে আমি উদ্গ্রীব থাকতাম, আর বন্নিদিদিও আমার মতো একটি অনুরক্ত ভাই পেয়ে যারপরনাই হ্লাদিতা হয়েছিল সন্দেহ নেই।

দুপুরে দিদিমা, মা-মাসিমার দিবানিদ্রার অবসরে আমি বন্নিদিদির একান্ত সঙ্গী হিসেবে দিদিমার কড়ির বয়ামে সুরক্ষিত কুলের আচার, আমের মিষ্টি ও টক আচার, আমচূর ইত্যাদির নিয়মিত অংশীদার হতে পেরেছিলাম। মাঝে মাঝে কোথা থেকে কে জানে বন্নিদিদি কৎবেল জোগাড় করে আনত। সকালে সর্ষের তেল, বিট নুন, গুড় দিয়ে মেখে রেখে দিত রোদ্দুরে - কিন্তু সকলের চোখের আড়ালে। দুপুরে সেই জারিয়ে ওঠা কৎবেলের গন্ধেই মুখের ভিতরটা রসস্থ হয়ে উঠত। তর্জনীর ডগায় অল্প একটু মাখা নিয়ে বন্নিদিদি টেষ্ট করত, তার চোখ ছোট্ট হয়ে যেত কুঁচকে, আর জিভে টক করে আওয়াজ তুলে বলত –‘দারুউউণ’। তারপর আমার জিভেও একটু লাগিয়ে দিয়ে মুখের দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করত - কেমন? অদ্ভূত স্বাদে আমার মোহিত রসনা তখন জবাবরহিত, তাই ঘাড় নাড়িয়ে বন্নিদিদির রসবোধকে পূর্ণ সমর্থন করে বন্নিদিদির বাটির দিকে তাকাতে, বন্নিদিদি আদ্দেকের বেশ কিছুটা কম আমার হাতে তুলে দিয়ে বলত-

– ‘বেশী খাসনি, বদহজম হবে। আর তোর পেট খারাপ হলে মা আমার পিঠ ফাটাবে...’।  বন্নিদিদির মা মানে আমার মামিমা।

একদিন সকালবেলা নটা সাড়ে নটা নাগাদ ছোট্ট একটি বালতি হাতে বন্নিদিদি আমাকে বলল ‘আমার সঙ্গে যাবি তো চ, গোয়ালে যাব গাই দুইতে’। আমার বিশ্বাসই হয়নি। বন্নিদিদি কতো বড়ো আমার চেয়ে – মেরেকেটে বছর তিন কি চারেকের হবে। সে ওই বড়ো বড়ো শিংওলা গরুগুলোকে সামলাতে পারবে? এই বুঝি পেটে শিং দিয়ে গুঁতিয়ে দিল - এই ভয়েই তো আমি সারা!

বাড়ি থেকে মিনিট পাঁচেক দূরেই মামাদের খামার বাড়ি, তার একধারে টালির চাল দেওয়া টানালম্বা গোয়াল ঘর। বুকসমান উঁচু মাটির চাতালে ছটা পোড়ামাটির লাল রংয়ের ডাবা বসানো। মেঝেয় ছটা খোঁটা পোঁতা আছে, গরু মোষ বাঁধার জন্যে। চারিদিক গোময় এবং গোমূত্রলিপ্ত অর্থাৎ হিন্দুশাস্ত্র মতে পবিত্র। দুধসাদা বাছুরটা গোয়ালের বাইরে বাধাঁ ছিল, বড়ো বড়ো কালো চোখ মেলে দেখছিল তার মাকে আর ছটফট করছিল মায়ের কাছে যাবার জন্যে। গোয়ালে খোঁটায় বাঁধা মা গাইটি - যার দিদিমা নাম রেখেছিলেন গৌরী - বারবার ডেকে উঠছিল হাম মা...।

ভুবনমামা - মামাবাড়ির রাখাল - লম্বা পাতবঁটিতে ঘস ঘস করে গরুমোষের খাবার ‘ছানি’ কুচোচ্ছিল খড়ের আঁটি কেটে কেটে। সে মুখ তুলে তাকাল, বলল - ‘এতক্কনে এলে বন্নিদিদি, সেই থিকে তোমার গউরি ডেকে ডেকে সারা -’। মামাবাড়ির বাসন মাজা, ঘর নিকোনো, ঘুঁটে দেওয়ার কাজ করে বিধবা ভামিমাসী - সত্যভামা – আমাদের দেখে হাসল। তার দুহাতে গোবর লেগে, একটা ঝুড়িতে গোবর তুলে রাখছে সে, দুপুরে ঘুঁটে দেবে বলে।

বন্নিদিদি খোঁটা থেকে বাছুরটাকে খুলে দিতেই বাছুরটা ছুট্টে চলে গেল তার মায়ের কাছে। মাথার ঢুঁ দিয়ে দিয়ে মায়ের পালান চুষতে শুরু করল আর গৌরী ঘাড় ঘুরিয়ে ধূসর রঙের লম্বা জিভ দিয়ে চাঁটতে লাগল তার সন্তানের গা, পিঠ আর সদা চঞ্চল লেজটি। সেইসময় বা তার কিছুদিন পরে কংগ্রেসের ভোটের সিম্বল ছিল ‘গাইবাছুর’ – অবিকল যেন এই গৌরী আর তার বাছুরের ছবি। সেই সিম্বলকে প্রত্যক্ষ জেনেছিলাম বন্নিদিদির সঙ্গে মামাবাড়ির গোয়ালে। 

মিনিট চারপাঁচেক পরেই বন্নিদিদি বাছুরটাকে টেনে সরিয়ে আনল, আমাকে দড়িটা ধরিয়ে দিয়ে বলল –‘শক্ত করে ধরে রাখ, কাছে আসতে দিস না’। বলেই উবু হয়ে বসে গেল গৌরীর নীচে বালতিটা রেখে। দুটি বাঁট দুহাতের বুড়ো আঙুল আর তর্জনী দিয়ে চেপে চেপে দুধ দুইতে শুরু করল। ফিনকি দিয়ে ঝরে পড়া সফেন দুধে খালি বালতি আস্তে আস্তে ভরে উঠতে লাগল – এই দুধ আমাদের পুষ্টি দেবে, দেবে লাবণ্য ও শক্তি। কারণ দিদিমার মুখে শুনেছি “দুধে লাবণ্য বৃদ্ধি, ঘৃতে বৃদ্ধি বল। মাংসে মাংস বৃদ্ধি, শাকে বৃদ্ধি মল”। সমস্ত দুধ নিংড়ে নিয়ে প্রায় পৌনে-বালতি ভরা দুধ নিয়ে বন্নিদিদি উঠে এল, আমাকে বলল বাছুরটাকে ছেড়ে দিতে - ছেড়ে দিলাম। অবুঝ ক্ষুধার্ত বাছুরটা আবারও ছুটে গেল তার মায়ের কাছে। গৌরী তখন নিঃস্ব – তার রিক্ত পালানে নিজের সন্তানের স্পর্শও তখন বিরক্তিকর।

এর আগে গরুর রচনা পড়েছি। সে অনুযায়ী গুনে গুনে বুঝে নিয়েছি তার শিং, পা, ক্ষুর লেজের চুলচেরা হিসেব। আমাদের পুষ্টিবিধানের জন্যে তার নিরলস দুগ্ধ সরবরাহের উপকারী প্রয়াসের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতার প্রকাশ ছিল সেই সব রচনায়। বাড়িতে দেখেছি যে কোন যজ্ঞ অনুষ্ঠানে, পঞ্চগব্য আবশ্যিক উপচার এবং শুনেছি বহুল প্রচলিত মন্ত্রে গোমাতার স্তব ও স্তুতি। সেদিন বুঝেছিলাম চরম এক বঞ্চনাকে কি সুচারুভাবেই না ঢেকে রাখা হয়েছে মানবসভ্যতার উন্মেষ থেকে!

এই শোষণ, দোহন ও বঞ্চনার ইতিহাস ততটাই প্রাচীন, যতটা প্রাচীন মানুষের সামাজিক ইতিহাস। সবল শোষণ করে অবলকে, সক্ষম দোহন করে অক্ষমকে এবং একে আড়াল করার জন্যে আবহমানকাল ধরে চলে আসছে পাপ-পুণ্য, পূর্বজন্মের সুকৃতি-দুষ্কৃতির খতিয়ান। নির্বলের হতাশা এবং সবলের সম্ভাব্য বিবেক দংশন যদি কোনভাবেই ঢাকা না দেওয়া যায়, তাহলেও হাতে তো থাকছেই - কপালের লিখন – ‘নেকন, নেকন, বুয়েচ হে, সবই কপালের নেকন’!

এতটা স্পষ্ট উপলব্ধি সেদিনই আমার ঘটে গিয়েছিল মোটেই তা নয়, কিন্তু চেতনায় এই রূপটা যে একটা অস্পষ্ট আকার নিচ্ছিল এটা সত্যি। কলকাতার বাসায় আমাদের ছোট্ট সীমিত সংসারে, উত্তর কলকাতার মধ্যবিত্ত পাড়ায় এবং স্কুলের ছকবাঁধা নিত্যনৈমিত্তিক জীবনে এই চেতনার আভাস আসাও – অন্ততঃ সেই বয়সে – একপ্রকার অসম্ভবই ছিল আমার মনে হয়।

সে যাই হোক, বাড়ি এসে মাকে বন্নিদিদি আর আমার কৃতিত্বের কথা সবিস্তারে জানাতে, মা বলল প্রাচীনকালে মেয়েরাই নাকি গাই দুইত মানে দোহন করত আর সংস্কৃতের দোহন শব্দ থেকেই নাকি দুহিতা শব্দ এসেছে – যার মানে কন্যা বা মেয়ে। তার মানে বন্নিদিদি ভারতবর্ষের এক কন্যার সনাতন প্রতিরূপ এবং প্রতিভূ! আশ্চর্য!

 

এমন ভাবেই প্রত্যেকটি দিন - নিত্যনতুন এবং অভিনব স্বাদ রূপ রস নিয়ে ধরা দিতে লাগল আমার কাছে। চিনে নিতে লাগলাম আমার জীবনের ভিত্তি আর সম্পর্কের সব শিকড়গুলি। গোগ্রাসে আত্মসাৎ করছিলাম এর সবকিছু। গড়ে উঠতে লাগল এক ভিন্ন মাত্রার জীবনবোধ। যে বোধ আমার চেনাশোনা শহরের জীবনযাপন পদ্ধতির থেকে অনেকটাই আলাদা।

 

-০০-

[এর পরের পর্ব  "চুরি বিদ্যে মহাবিদ্যে"]  

নতুন পোস্টগুলি

স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ৮

   প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "  দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রা...