বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৪/৪

 এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১ " 



 চতুর্থ  স্কন্ধ - পর্ব ৪

দক্ষের আরেকবার যজ্ঞ অনুষ্ঠান

শ্রী মৈত্রেয় বললেন, “এইভাবে প্রজাপতি দক্ষ মহাদেবকে প্রসন্ন করার পর, ব্রহ্মার অনুমতি নিয়ে উপাধ্যায় ও ঋত্বিকদের সঙ্গে নিয়ে আবার যজ্ঞ শুরু করলেন। ব্রাহ্মণেরা যজ্ঞের সূচনা করলেন এবং যজ্ঞের বিঘ্নদোষ দূর করার জন্যে বিষ্ণুর উদ্দেশে যজ্ঞের আগুনে ঘি প্রয়োগ করলেন। যজমান দক্ষ তাঁদের সঙ্গে শুদ্ধচিত্তে এমন গভীর ধ্যান করলেন যে, কিছুক্ষণের মধ্যে সেই যজ্ঞস্থলে শ্রীহরির আবির্ভাব হল। যাঁর পক্ষপুটে বেদের দুটি শাখা বর্তমান, সেই পক্ষীরাজ গরুড়, তাঁকে বহন করে নিয়ে এলেন। শ্রীহরির প্রভায় দশদিক উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। তাঁর কোমরে সোনার চন্দ্রহার, তাঁর শ্যামকান্তি বর অঙ্গে পীতাম্বর। তাঁর মাথায় সূর্যের মতো উজ্জ্বল মুকুট, তাঁর কমলের মতো সুকুমার মুখের চারপাশে ভ্রমরের দলের মতো কেশরাশি শোভা পাচ্ছিল। সোনার অলংকার শোভিত তাঁর আট হাতে শঙ্খ, চক্র, গদা, পদ্ম, তির,ধনুক, অসি আর চর্মের ঢাল। তাঁর বুকে লক্ষ্মীদেবী, গলায় বনমালা, দুপাশে রাজহাঁসের মতো শুভ্র ব্যজন ও চামর; মাথার উপর চাঁদের মতো সুশোভন শ্বেত ছত্র। তাঁর মুখের হাসিতে ও দু চোখের দৃষ্টিতে মুগ্ধ বিশ্ব।

শ্রীভগবানকে সামনে দেখে ব্রহ্মা, রুদ্র, ইন্দ্র এবং উপস্থিত দেবতা, ঋষি, মুনি ও ব্রাহ্মণেরা সকলে উঠে দাঁড়ালেন ও তাঁকে প্রণাম করলেন। তাঁরা সকলে সসম্মানে, জোড়হাতে শ্রীহরির স্তব ও বন্দনা শুরু করলেন।

প্রজাপতি দক্ষ বললেন, “ভগবান, আপনি সমস্ত জীবের চৈতন্যস্বরূপে অবস্থান করেন। আপনি শুদ্ধ এবং এক অর্থাৎ অদ্বিতীয়, সুতরাং আপনি অভয়স্বরূপ। আপনি কখনও মায়ায় অভিভূত হন না, অথচ জগতের লোকশিক্ষার জন্যে, মায়ার প্রভাবে আপনি বারবার মানুষরূপে অবতীর্ণ হন”।

রুদ্র বললেন, “হে বরদ, আপনার চরণপদ্মে অখিলার্থ লাভ করা যায়। আপনার শ্রীচরণে আমার চিত্ত নিবেশিত আছে, অজ্ঞ ব্যক্তি আমাকে আচারভ্রষ্ট বলে নিন্দা করলেও, আপনার প্রসাদে আমি বিচ্যুত হই না”।

ভৃগু বললেন, “যাঁর গভীর মায়ায় আত্মতত্ত্ব আবৃত হয়ে যায়, মোহনিদ্রায় আচ্ছন্ন দেহিরা তাঁদের আত্মায় বিরাজিত আপনার তত্ত্ব কোনদিনই বুঝতে পারেন না, আপনার একান্ত ভক্ত ও বন্ধুদের আত্মাস্বরূপ আপনি আমার প্রতি প্রসন্ন হোন”।

ব্রহ্মা বললেন, “আমাদের ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে সকল পদার্থের পার্থক্যজ্ঞান উপলব্ধি সম্ভব। পুরুষ এই ভাবে যে যে বস্তুর রূপ অনুভব করে, তার মধ্যে কোনটাই আপনার স্বরূপ নয়, অর্থাৎ আপনি সকল ইন্দ্রিয়ের অগোচর। আপনি এই বিশ্বের সকল চরাচরের আশ্রয় হয়েও, নিখিল মায়াময় বস্তু থেকে ভিন্ন”।

ইন্দ্র বললেন, “হে অচ্যুত, অসুর বিনাশী অস্ত্রে শোভিত আপনার এই অষ্টভুজ মূর্তি, আমাদের মন ও নয়নের পক্ষে আনন্দকর, বিশ্বের উৎপত্তি স্বরূপ আপনার এই যে শ্রীবিগ্রহ, এই মূর্তি মায়ার মতো মিথ্যা নয়, বরং সনাতন সত্য”।

দক্ষপত্নী প্রসূতি বললেন, “হে ঈশ, আপনার শুভাগমন হোক, আপনি প্রসন্ন হোন, আপনাকে প্রণাম করি। মাথাহীন দেহ যেমন সুন্দর হাত, পা ও অন্যান্য অবয়ব সংযোজনাতেও অর্থহীন হয়, তেমনি আপনার অধিষ্ঠান রহিত যজ্ঞানুষ্ঠানও শোভা পায় না। হে শ্রীনিবাস, আপনি আমাদের রক্ষা করুন”।

অগ্নি বললেন, “যাঁর তেজে আমি প্রদীপ্ত হয়ে, ঘৃতের সঙ্গে হবিঃ দেবতাদের উদ্দেশে বহন করি, যিনি অগ্নিহোত্র, দর্শ, পৌর্ণমাস, চাতুর্মাস্য ও পশুসোম এই পাঁচ  যজ্ঞস্বরূপ এবং পাঁচ যজুঃ মন্ত্রে যিনি পূজিত হয়ে থাকেন, সেই যজ্ঞপালক যজ্ঞমূর্তির বন্দনা করি”।

শ্রীভগবান বললেন, “আমিই জগতের পরম কারণ। আমিই আত্মা, ঈশ্বর ও সাক্ষী। আমি স্বপ্রকাশ ও আমার কোন উপাধি নেই। আমাকেই ব্রহ্মা ও শিব বলে জানবে। হে দ্বিজ, আমি আমার গুণময়ী মায়ায় সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয়ের অনুষ্ঠান করি এবং সেই কর্ম অনুযায়ী নাম ধারণ করে থাকি। আমিই পরম আত্মা ও অভিন্ন অদ্বিতীয় ব্রহ্ম। যারা অজ্ঞ, তারাই ব্রহ্মা, রুদ্র ও অন্যান্য ভূতকে আমার থেকে পৃথক মনে করে। প্রাণিগণ যেমন নিজদের মাথা, হাত, পা ইত্যাদি অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে নিজের থেকে আলাদা মনে করে না, তেমনি আমার ভক্তরা ভূতসকলকে আমার থেকে ভিন্ন মনে করেন না। ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও রুদ্র সর্বভূতের আত্মা, এই তিনের স্বরূপ এক, যিনি এই তিনের মধ্যে ভেদ দর্শন করেন না, তিনিই শান্তি লাভ করেন””।

শ্রীমৈত্রেয় বললেন, “প্রজাপতিশ্রেষ্ঠ দক্ষ ভগবানের এই আদেশ লাভ করে, ত্রিকপাল যজ্ঞে তাঁর অর্চনা করলেন, তারপর প্রধান ও অপ্রধান যজ্ঞ করে দেবতাদের অর্চনা করলেন। পরে সমাহিত চিত্তে বিশিষ্ট যজ্ঞভাগে রুদ্রের ভজনা করে যজ্ঞ সমাপ্ত করলেন এবং অন্যান্য সোমপায়ী দেবতাদেরও অর্চনা করলেন। যজ্ঞ শেষ করে ঋত্বিকদের সঙ্গে অবভৃথস্নান অর্থাৎ যজ্ঞ শেষের অবগাহন স্নান করলেন। এইভাবে ভগবানের কৃপায় দক্ষ, যজ্ঞে সিদ্ধিলাভ করায়, দেবতারাও তাঁকে “ধর্মে মতি হোক” এই আশীর্বাদ করে স্বর্গে ফিরে গেলেন।

অন্যদিকে দক্ষকন্যা সতী, নিজের কলেবর ত্যাগ করার পর, হিমালয় ও মেনকার কন্যা রূপে জন্ম নিলেন। প্রলয়ের সময় সুপ্তা শক্তি যেমন আবার ঈশ্বরকেই আশ্রয় করেন, তেমনই অম্বিকা একনিষ্ঠ ভক্তগণের একান্ত গতি মহাদেবকে পতি রূপে ভজনা করেছিলেন।

হে বিদুর, মহেশ্বরের এই পবিত্র চরিত্রের কথা শুনলে যশ হয়, আয়ুবৃদ্ধি ঘটে এবং পাপ নাশ হয়। যে ব্যক্তি মহেশ্বরের এই কীর্তি পরমভক্তিভরে নিত্য শ্রবণ করে ও কীর্তন করে, সে নিজেকে ও অপরকে সংসারের সকল বিপদ থেকে রক্ষা করতে সমর্থ হয়”। 

অধর্মের বংশকথা 

মহর্ষি মৈত্রেয় বললেন, “ব্রহ্মার পুত্রদের মধ্যে সনক প্রমুখ চার কুমার, নারদ, ঋভু, হংস, অরুণি ও মতি জন্মসিদ্ধ ছিলেন, তাঁরা কেউই দার পরিগ্রহণ করেননি। অধর্মও ব্রহ্মার পুত্র, তাঁর ভার্যা মৃষা, তাঁদের পুত্রের নাম দম্ভ এবং কন্যার নাম মায়া। অপুত্রক নিঋতি এই উভয় সন্তানকেই গ্রহণ করেছিলেন। দম্ভ ও মায়া সহোদর যমজ হলেও, তারা অধর্মের অংশ বলে, পতিপত্নী ভাবে লিপ্ত হয়। তাদের লোভ ও নিকৃতি অর্থাৎ শঠতার জন্ম হল। লোভ ও নিকৃতির সংযোগে ক্রোধ ও হিংসার জন্ম হল। ক্রোধ ও হিংসার থেকে কলি অর্থাৎ কলহ ও তার বোন দুরুক্তির জন্ম হল। কলি ও দুরুক্তির সন্তান মৃত্যু ও ভীর জন্ম হল এবং মৃত্যু ও ভীর থেকে নিরয় ও যাতনার উৎপত্তি হল। হে বিদুর, আমি অধর্মের বংশের কথা তোমাকে সংক্ষেপে বর্ণনা করলাম। এই কথা তিনবার শুনলে মানুষের মলিনতা দূর হয়, কারণ অধর্মের বংশকে পরিত্যাগ করলে, অশেষ পুণ্য অর্জন হয়ে থাকে।   

হে বিদুর, ব্রহ্মার পুত্র স্বায়ম্ভূব মনু ও তাঁর স্ত্রী শতরূপার এক কন্যা দেবহূতি ও অন্য কন্যা প্রসূতির আখ্যান, তোমাকে বর্ণনা করলাম। এবার তাঁর দুই পুত্র প্রিয়ব্রত ও উত্তানপাদের কথা বলি শোনো।

 ধ্রুবর উপাখ্যান

সুনীতি ও সুরুচি ছিলেন রাজা উত্তানপাদের দুই পত্নী, দুজনের মধ্যে সুরুচিই ছিলেন রাজা উত্তানপাদের প্রিয়তমা। একদিন রাজা উত্তানপাদ সুরুচির পুত্র উত্তমকে কোলে নিয়ে আদর করছিলেন, তাই দেখে সুনীতির পুত্র বালক ধ্রুবও পিতার কোলে চড়ার জন্যে বায়না করতে লাগল। কিন্তু রাজা ধ্রুবকে প্রশ্রয় দিলেন না। সুরুচি রাজার এই ব্যবহারে অত্যন্ত গর্বভরে সতীনপুত্র ধ্রুবকে বললেন, “বৎস, তুমি রাজপুত্র হলেও আমার সন্তান নও বলেই, রাজার আসনে বসবার তুমি যোগ্য নও। তোমার যদি রাজার আসনে বসার একান্তই ইচ্ছে হয়, ঈশ্বরের তপস্যা করে, তাঁর অনুগ্রহে আমার সন্তান হয়ে জন্ম লাভ করো। নতুবা এই দুর্লভ বাসনা ছেড়ে দাও”।

সাপ যেমন ক্রোধে হিস হিস শব্দে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে থাকে, বিমাতার কথায় অসহায় ধ্রুবও দীর্ঘশ্বাস ফেলতে লাগলেন। তিনি দেখলেন, বিমাতার দুর্বাক্য শুনেও পিতা কোন মন্তব্য করলেন না, তখন তিনি কাঁদতে কাঁদতে চলে গেলেন, তাঁর মা সুনীতির কাছে। সুনীতি তাঁর ছেলেকে কোলে তুলে নিলেন। তারপর তিনি অন্তঃপুরনারীদের থেকে জানতে পারলেন তাঁর সতীন সুরুচির কুবাক্যেই তাঁর পুত্র কাঁদছে। পুত্রের শোকে তিনিও ব্যথিত হলেন, জলভরা চোখে তিনি বললেন, “বৎস, তুমি আমার গর্ভে জন্মেছ, আমার স্তন্যেই তুমি বড়ো হয়েছ, কিন্তু আমার এমনই দুর্ভাগ্য, রাজা আমাকে পত্নীর মর্যাদাটুকুও দেন না। তবে বৎস একটা কথা মনে রেখো, যে ব্যক্তি তোমাকে দুঃখ দেয়, সে সেই দুঃখই নিজের জীবনেই ভোগ করে থাকে। এবং বিমাতা হলেও সুরুচি তোমাকে সুপরামর্শই দিয়েছেন, তুমি শ্রীহরির পাদপদ্ম বন্দনা করো। অন্য সকল বস্তুর থেকে আসক্তি ত্যাগ করে, স্বাভাবিক ভক্তি ও পবিত্র চিত্তে নিজেকে তাঁর চরণে সমর্পণ করে দাও, তাঁর ভজনা করো। পদ্মপলাশলোচন শ্রীহরিই তোমার সকল দুঃখ হরণ করতে পারেন, এই বিষয়ে আমি নিশ্চিত”।

ধ্রুব মায়ের বিলাপ এবং মায়ের এই উপদেশ শুনে পিতার গৃহ তৎক্ষণাৎ ত্যাগ করলেন। অন্তর্যামী নারদ সমস্ত কথা শুনে এবং ধ্রুবের প্রতিজ্ঞার কথা জেনে সেই স্থানে উপস্থিত হলেন। তিনি বালক ধ্রুবের মাথায় আশীর্বাদের হাত রেখে চিন্তা করলেন, ক্ষত্রিয়দের কি আশ্চর্য প্রভাব! ধ্রুব বালক মাত্র, কিন্তু বিমাতার কুবাক্য এবং পিতার অবহেলার অপমান তার সহ্য হল না। তারপর বললেন, “বৎস তোমার এখন খেলার বয়েস, এই বয়সে মান-অপমানের কোন কারণ আমি দেখতে পাচ্ছি না। মান ও অপমানের পার্থক্য আছে ঠিকই, কিন্তু তোমার এই অসন্তোষ মোহ ছাড়া আর কিছুই নয়। মায়ের উপদেশে যোগ সাধনা করে তুমি যে ঈশ্বরের কৃপালাভ করার চেষ্টা করতে যাচ্ছো, বাস্তবে তাঁর কৃপালাভ করা দুঃসাধ্য। নিঃসঙ্গ মুনিরা যোগ ও সাধনায় বহুজন্ম চেষ্টা করেও ঈশ্বরকে জানতে পারেন না। অতএব তুমি এখন এই নিষ্ফল চেষ্টা ত্যাগ করো, বরং বৃদ্ধবয়সে এই সাধনার চেষ্টা করো। ঈশ্বর যার জন্যে যেমন সুখ কিংবা দুঃখ নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন, তার সেই অবস্থাতেই সন্তুষ্ট থাকা কর্তব্য। মনে রেখো, সুখের সময় উপস্থিত হলে পুণ্য ক্ষয় হয়, আর দুঃখের দিনে পাপ-ক্ষয় হয়। এইভাবেই দেহধারী মানুষ সংসার পার হয়ে মোক্ষ লাভ করতে পারে। নিজের থেকে বেশি গুণবান ব্যক্তির দর্শনে প্রীতি, গুণে নিকৃষ্ট ব্যক্তিকে দয়া, আর সমগুণের ব্যক্তির সঙ্গে বন্ধুত্ব করলে, অপমান সহ্য করতে হয় না”।

ধ্রুব বললেন, “আপনি দয়া করে, আমাদের মতো ব্যক্তি যা লাভ করতে অক্ষম এবং সুখদুঃখে অভিভূত ব্যক্তিদের সন্তোষলাভের জন্যে শমগুণের উপদেশ করলেন। কিন্তু ক্ষত্রিয় স্বভাবের জন্যে আমি অধৈর্য ও অবিনীত হওয়ায়, আমার বিমাতা সুরুচির কুবাক্যের জ্বালা আপনার ঐ উপদেশে প্রশমিত হচ্ছে না। আমার পিতৃপুরুষেরা যা কোনদিন লাভ করতে পারেন নি, এই ত্রিভুবনে যা শ্রেষ্ঠ পদ, আমি সেই পদ জয় করার ইচ্ছে রাখি। হে ব্রহ্মণ, পরমেশ্বরের অঙ্গ থেকে আপনার জন্ম,  জগতের মঙ্গলের জন্যে আপনি বীণা বাজিয়ে সূর্যের মতো জগতকে প্রদক্ষিণ করেন, অতএব, আপনিই আমাকে সাধু পথ নির্দেশ করুন”।

ধ্রুবর কথায় দেবর্ষি নারদ সন্তুষ্ট হয়ে বললেন, “বৎস, তোমার মা তোমাকে সঠিক উপদেশ দিয়েছেন। ভগবান বাসুদেবই তোমার মনের ইচ্ছা পূরণের একমাত্র পথ, তুমি একাগ্রচিত্তে তাঁর ভজনা করো। তোমার মঙ্গল হোক, আমি এই আশীর্বাদ করি। তুমি পবিত্র যমুনার তীরে যাও, শ্রীহরি সর্বদা সেখানেই বিরাজ করেন। ঐ স্থানের নাম, মধুবন। মধুবনে তোমার আসন প্রতিষ্ঠা করো,  পবিত্র কালিন্দীর জলে তিনসন্ধ্যা স্নান করে, দেবতাদের প্রণাম করবে। তারপর রেচক, পূরক ও কুম্ভক এই তিন রকমের প্রাণায়াম করে মনের চাঞ্চল্য দূর করে, শান্ত চিত্তে শ্রীহরির ধ্যান করো।

হে বৎস্য, মনে রেখ, ভক্তকে কৃপা করার জন্যে শ্রীহরি সব সময়েই উদ্গ্রীব থাকেন। তাঁর মুখভাব ও দৃষ্টি সদাপ্রসন্ন। তাঁর নাক, ভ্রূ ও কপোল সুকুমার। সকল দেবতাদের মধ্যে তিনি পরমসুন্দর ও সদাতরুণ। তাঁর অঙ্গ শ্যামবর্ণ, তাঁর বুকে শ্রীবৎসচিহ্ন, তাঁর গলায় বনমালা ও কৌস্তুভ মণি। তাঁর চারহাতে শঙ্খ, চক্র, গদা, পদ্ম, সোনার কেয়ুর ও বলয়, কানে সোনার কুন্ডল। তাঁর পরনে পীত পট্ট বস্ত্র। শ্রীভগবানের এই পরম মঙ্গলরূপ ধ্যান করতে করতে মন যখন পরম আনন্দে ডুবে যায়, তারপর মন তাঁর চরণেই লিপ্ত হয়ে থাকে।  হে রাজপুত্র ধ্রুব, এখন আমি তোমাকে মহামন্ত্র বলব, মন দিয়ে শোনো, “সৃষ্টিস্থিতিপ্রলয়কারী ভগবান বাসুদেবকে নমস্কার”। পবিত্র জল, ফুলের মালা, ফলমূল, দুর্বা ও তুলসী পাতা দিয়ে ভগবানের অর্চনা করবে। এইভাবে সমস্ত মনপ্রাণ সমর্পণ করে অখণ্ডভক্তি দিয়ে শ্রীহরির ধ্যান ও পরিচর্যা করলে, তিনি মানুষের পক্ষে যা শ্রেষ্ঠ তাই প্রদান করে থাকেন”। দেবর্ষির উপদেশ শুনে রাজপুত্র ধ্রুব আনন্দ চিত্তে তাঁকে প্রদক্ষিণ করলেন ও প্রণাম করলেন। তারপর দেবর্ষির অনুমতি নিয়ে শ্রীহরির পদরেণু সমৃদ্ধ মধুবনের উদ্দেশে যাত্রা করলেন।

ধ্রুব রওনা হওয়ার পর, দেবর্ষি নারদ গেলেন মহারাজ উত্তানপাদের অন্তঃপুরে। রাজার দেওয়া পাদ্য অর্ঘ্য স্বীকার করে দেবর্ষি নারদ মহারাজ উত্তানপাদকে বললেন, “মহারাজ, আপনার মুখ দেখছি, চিন্তায় মলিন! কোন বিঘ্ন ঘটেনি তো?” মহারাজ বললেন, “হে ব্রহ্মণ, আমি স্ত্রৈণ এবং চূড়ান্ত নিষ্ঠুর। আমার পাঁচবছরের বালক পুত্র আমার কোলে চড়তে চেয়েছিল, আমি তাকে প্রত্যাখ্যান করেছি। আমি আমার এই পুত্রকে এবং তার মাকে নির্বাসিত করেছি। আমার শিশুপুত্র এখন ম্লান মুখে, ক্লান্ত পায়ে, ক্ষুধায় কাতর হয়ে, একা একা জঙ্গলে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর আমি বাস করছি এই রাজপ্রাসাদে। আমি মূর্খ এবং আমি পত্নীর সম্পূর্ণ বশীভূত। আমার নিষ্ঠুর এই ব্যবহার আপনি লক্ষ্য করুন, দেব”।

দেবর্ষি নারদ মহারাজের এই কথায় বললেন, “হে মহারাজ, আপনার পুত্রকে আপনি বুঝতে পারেননি, তাকে দেবতারা রক্ষা করবেন। আপনার পুত্র অসাধারণ, অতএব আপনি পুত্রের জন্যে শোক করবেন না। একদিন এই ত্রিভুবন ঐ শিশুর বশীভূত হবে। লোকপালেরাও যে দুঃসাধ্য কর্ম করতে পারে না, আপনার পুত্র সেই কর্ম সুসম্পন্ন করবে। তারপর জগতে আপনার যশ বিস্তার করে, আপনার পুত্র খুব তাড়াতাড়িই ফিরে আসবে, আপনি চিন্তা করবেন না”।

চলবে...


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নতুন পোস্টগুলি

স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ৯

 প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "  দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা...