প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "
দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "
তৃতীয় ধারাবাহিক উপন্যসের প্রথম পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "
চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ "
পঞ্চম ধারাবাহিক উপন্যাস প্রথম পর্ব - "স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "
সম্পুর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "; "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "
৩০শে জুলাই, ২০২৬ রবিবার – সকাল সাতটা
ডাক্তার সরকারের পরামর্শ
অনুযায়ী অহীনরা নার্সিং হোম থেকে বিনুদাকে বাড়ি আনতে গেল রবিবার সকাল সাতটা নাগাদ।
সব ফর্মালিটি সম্পূর্ণ করে ডিসচার্জ করাতে আধঘন্টা মতো সময় লাগল। নার্সিং হোম থেকে
বিনুদাকে নিয়ে তারা রওনা হল সাড়ে সাতটা নাগাদ। গণেশদা, গাড়ির ড্রাইভার, ছাড়াও ওরা
চারজন। সর্বজিৎ সামনের সিটে, পিছনে দুপাশে অহীন আর নবীনবাবুকে নিয়ে মাঝখানে বিনুদা।
এই বসার ব্যবস্থাও ডাক্তার সরকারেরই পরামর্শে। তিনি বলেছিলেন তিরাশি বছর আগে এই শহরের
যে পরিবেশ ছিল, আজকের সঙ্গে তার আকাশপাতাল তফাৎ। আমাদের চোখে সেটা বিসদৃশ না হলেও,
বিনুদা অর্থাৎ অবিনদাদুর পক্ষে সেটা মোটেই সুপাচ্য হবে না।
ডাক্তার সরকার বলেছিলেন, “আমি
আজন্ম পঞ্চান্ন বছর এই শহরেই রয়েছি। এই শহরের নানান উন্নতি দেখেছি, দেখেছি নানান
সামাজিক অবনতিও। কিন্তু আমি এ সব পরিবর্তন ঘটতে দেখেছি ধীরে ধীরে। সেই পরিবর্তনে
কখনো আনন্দ পেয়েছি – কখনো বিরক্ত হয়েছি। কিন্তু সেই সব ঘটনা কোনদিনই আমার মনে
বড়োসড়ো কোন ধাক্কা দিয়ে যায়নি। কিন্তু তিরাশি বছর বাদে ঘুম থেকে জেগে অবিনদাদু অকস্মাৎ
প্রত্যক্ষ করবেন এই সব পরিবর্তনের নমুনা। এই ধাক্কাটা ওঁর কাছে কতটা বড় হয়ে উঠতে
পারে, সে সম্পর্কে আমাদের কোন ধারণাই নেই। অতএব, যতটা সম্ভব ধীরে সুস্থে রয়ে সয়ে –
আমাদের বর্তমান রূপটা প্রকাশ্যে আনাই ভাল”।
নার্সিংহোমটা মাঝারি একটা গলির
মধ্যে। স্টার্ট দিয়ে গাড়ির চলা শুরু হতেই, শুরু হল বিনুদার প্রশ্নমালা।
“আচ্ছা, আমি এই হাসপাতালটায়
যে এতদিন রইলাম, কেমন খরচ হল?”
নবীনবাবু বললেন, “তা খরচ একটু
বেশিই। এটার মালিক আমাদের প্রতিবেশী ও বন্ধু, ডাক্তার সরকার। সেই খাতিরে তিনি আমাদের
জন্যে অনেকটাই কমে করে দিয়েছেন”।
বিনুদা বললেন, “অ, তার মানে
এটা সরকারি হাসপাতাল নয়? ব্যক্তিগত হাসপাতাল?”
নবীনবাবু বললেন, “হ্যাঁ, আমরা
বলি প্রাইভেট নার্সিং হোম বা হসপিট্যাল”।
বিনুদা বললেন, “তা সরকারি
হাসপাতালগুলো কী দোষ করল? আমাকে সেখানে রাখলি না কেন?”
নবীনবাবু বললেন, “সরকারি
হাসপাতালের অবস্থা তেমন সুবিধের নয় গো। প্রচণ্ড ভিড়, বেড খালি পাওয়া যায় না। অনেক
রোগীকে মেঝেতেই শুইয়ে চিকিৎসা করতে হয়। আরও নানান অব্যবস্থা...”।
যে কথাটা নবীনবাবু বলতে
পারলেন না, সেটা হল - অবিনদাদু তিরাশি বছর ধরে সমাধিতে ছিলেন। সমাধি শেষে তিনি সবে
বাস্তব জগতে ফিরে এসেছেন। তাঁর মতো আশ্চর্য পেশেন্টকে সরকারি হাসপাতাল অ্যাডমিট
করবে কিনা, সেটাই তো তাঁরা নিশ্চিত ছিলেন না। ডাক্তার সরকার পইপই করে সকলকে বলে
দিয়েছেন, এ কথাটা তাঁর মুখের সামনে যত কম উচ্চারণ করা যায় ততই মঙ্গল। তাঁর মতে,
অবিনদাদু নিজে নিজেই বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে যদি ধীরে ধীরে মানিয়ে নিতে পারেন,
সেটাই হবে আমাদের সত্যিকারের সাফল্য।
অবিনদাদু বিরক্ত মুখে বললেন, “কী যে বলছিস, কিছুই
বুঝলাম না। সরকারি ব্যবস্থার থেকে ব্যক্তিগত ব্যবস্থা ভাল? আচ্ছা, আমরা কি, আমাদের
সেই কৃষ্ণপুর শহরেই রয়েছি, নাকি কলকাতায় এসেছি?”
গাড়িটা নার্সিং হোমের গলি
থেকে বেরিয়ে বড়ো রাস্তায় পড়তেই বিনুদার প্রশ্নের ধরন বদলে গেল।
অহীন বলল, “না গো, এটা কলকাতা
হবে কেন, কৃষ্ণপুরই”।
“বাবা, এত চওড়া রাস্তা?
দুপাশে এত দোকান? আর ওই ওইগুলো কি? সাইকেলের মতো দুটো চাকা – কিন্তু সাইকেল তো নয়?
লোকগুলো প্যাডেল চালাচ্ছে না তো!”
অহীন বলল, “না সাইকেল নয়।
ছোটগুলোকে স্কুটার, আর বড়োগুলোকে বলে মটর সাইকেল। ইঞ্জিন বসানো আছে, পেট্রলে চলে”।
“বটে? আমার বাবার একটা গাড়ি
ছিল। সে গাড়িটার কী হল? এটা তো নতুন গাড়ি বুঝতে পারছি”।
নবীনবাবু বললেন, “সে গাড়ি আমি
দেখিনি, তবে বাবার মুখে শুনেছি সেটা বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল”।
“সে গাড়ি বেচে দিয়ে এই ফঙ্গবেনে
গাড়ি কেনা হল? ছ্যাঃ। তবে রাস্তাতেও যত গাড়ি দেখছি, সেগুলো কোনটাই তো আমাদের সেই
গাড়ির মতো নয়”। অবিনদাদু একটু হাসলেন, বললেন, “সে সব বনেদি গাড়ি কেনার মতো লোকই
মনে হয় কমে গেছে, তাই না? আরে, ওটা আবার কি?”
“কোনটা?”
“আরে ওই যে রাস্তার ওধারে
দাঁড়িয়ে আছে। জানালায় লোকজনের মুখ দেখা যাচ্ছে। ওটা কি?”
সর্বজিৎ বলল, “ওটা মোটর বাস।
ওতে চড়ে অনেক লোক এক জায়গা থেকে নানান জায়গায় যেতে পারে”।
“ওটার চেহারা তো গোদা একটা
ঘরের মত - ওটাও চলে? বলিস কি?”
“চলে বৈকি। প্রচুর বাস চলে।
এক শহর থেকে অন্য শহরে। কম খরচে যাওয়া-আসার জন্যে বাসের কোন জুড়ি নেই”।
“কম খরচে মানে?”
“কম খরচ মানে বাসের ভাড়া। ধর
তুমি এখান থেকে তারকেশ্বর যাবে – তার ভাড়া পনেরটাকা”।
“প-নে-র টাকা? সেটা কম খরচ
হল? দশ-পনেরটাকা বেতনে ছোট সংসারের মাস চলে যায়!”
সর্বজিৎ মৃদু হাসল, বলল,
“বিনুদা তোমাদের সময় চালের দাম কত ছিল, মনে আছে?”
অবিনবাবু বললেন, “একটু ভাল
চাল হলে দু টাকা মণ, আর সাধারণ চালের মণ, খুব বেশি হলে একটাকা বা পাঁচসিকেই ধর”।
নবীনবাবু বললেন, “এক মণ মানে
প্রায় সাঁইত্রিশ কেজি। আমি বাড়িতে যে চালটা কিনি, তার দাম ষাট টাকা কেজি। তাহলে এক
মণের কতদাম হবে সর্বজিৎ?”
সর্বজিৎ বলল, “ষাট টাকা দরে, এক
মণের দাম হবে বাইশ শ’ কুড়ি টাকা”।
অবিনবাবু উত্তেজিত হয়ে বললেন,
“তোরা মাইনে পাস কত? তোদের সংসার চলে কী করে?”
নবীনবাবু মুখটা ব্যাজার করে বললেন,
“ওই আর কি - চলে যায় একরকম করে”।
এর মধ্যেই অহীনের পকেটে ফোনটা বেজে উঠল। অহীন ফোন বের করে দেখল, বৌদি ফোন করেছে। কানেক্ট করে বলল, “হ্যাঁ বৌদি, নার্সিং হোম থেকে আমরা বেরিয়ে পড়েছি, মিনিট পনের হল। আর মিনিট পাঁচ-দশের মধ্যেই পৌঁছে যাবো...আচ্ছা”।
অবিনদাদু অহীনকে লক্ষ্য
করছিলেন অবাক চোখে। অহীন ফোনটা অফ করে কান থেকে নামাতেই জিজ্ঞাসা করলেন, “ওটা আবার
কী বস্তু?”
অহীন হাতের তালুতে ফোনটা মেলে
ধরে বলল, “ফোন। মোবাইল ফোন”।
“ফোন? আমাকে বোকা বানাচ্ছিস? ওই
পাৎলা বাক্সটা ফোন? আমি ফোন দেখিনি? বড়দার আপিসে ফোন ছিল। ফোন হলে তো তার লাগবে,
তার কই? তারপরে শোনার জন্যে আর কথা বলার জন্যে, অনেকটা ডাম্বেলের মত দেখতে, যে
যন্ত্রটা - সেটা কই? নম্বর ডায়াল করে অপারেটরকে যে নাম্বার চাইবি, সে যন্ত্রটাই বা
কোথায়?”
অহীন হেসে ফেলে বলল, “তোমাকে
বোকা বানাবো কেন, বিনুদা? এটা সেই ফোন নয় ঠিকই, তবে ফোন – মোবাইল ফোন। আজকাল প্রায়
সবার কাছেই থাকে। দেখবে? আমি দাদু মানে তোমার খ্যাঁদাকে ফোন করবো?” অহীন ফোন আনলক
করে, দাদুর নাম্বার বের করে ডায়াল করে, স্পিকার মোড অন করল। দাদুর ফোনে রিং হচ্ছে,
গান বাজছে, “হরি দিন তো গেল, সন্ধ্যা হল পার করো আমারে, আমি দীন ভিখারি নাই কো
কড়ি, দেখ ঝুলি ঝেড়ে...হ্যালো”। দাদু কথা বলল।
অহীন বলল, “দাদু, বিনুদা
তোমার সঙ্গে কথা বলবেন। কথা বলো, বিনুদা...”
অবিনবাবু হকচকিয়ে রয়েছেন,
বললেন, “ইয়ে, মানে...খ্যাঁদা বলছিস?”
“হ্যাঁ কাকা, খ্যাঁদা বলছি। বৌমা
বুকুনকে একটু আগেই ফোন করেছিল, বলল, তোমরা নাকি প্রায় এসে পড়েছো? এস আমরা সবাই
তোমার অপেক্ষাতেই বসে আছি। তুমি এলে একসঙ্গে জলখাবার খাবো”।
অহীন বলল, “কিছু বলো,
বিনুদা”। অবিনবাবু মাছি তাড়ানোর মতো হাত নেড়ে তাকিয়ে রইলেন ফোনটার দিকে, কিছু
বললেন না। অহীন ফোনে উত্তর দিল, “দাদু আমরা চলে এসেছি। আর দু মিনিট। রাখছি এখন”।
“আচ্ছা। আয়”।
অহীন ফোনটা অফ করে দেওয়ার পর,
অবিনবাবু বললেন, “দেখি তোর যন্তরটা”। হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলেন কিছুক্ষণ, গম্ভীর
মুখে বললেন, “বুজরুকি করার আর জায়গা পাসনি, হতভাগা? তুই বললেই আমি বিশ্বাস করে
নেব?”
ওরা বাড়ির সামনে চলে এসেছিল। লোহার
গেটের সামনে গাড়ি থামতে, সর্বজিৎ নেমে গেটটা খুলে দিল। গণেশদা গাড়ি ঘুরিয়ে ব্যাক গিয়ারে
ঢুকিয়ে দিল ভেতরে।
অহীন গাড়ির দরজা খুলে নেমে, নীচু
হয়ে বিনুদাকে ডাকল, “নেমে এস, বিনুদা”।
অবিনবাবু ধীরে ধীরে গাড়ি থেকে
নেমে মাটিতে পা দিয়ে, বাড়িটার দিকে তাকালেন, বললেন, “এ কোথায় নিয়ে এলি আমায়? এই
আমাদের বাড়ি?”
গেট খোলা আর গাড়ির আওয়াজে
সকলেই বাড়ির বাইরে এসে পড়েছিলেন। প্রবীণবাবু এগিয়ে এসে কাকার হাত ধরে বললেন, “এস,
কাকা। এ বাড়ি আমাদের কে বলল? এ বাড়ি তোমার। এস ভেতরে এস”। প্রবীণবাবু কাকার হাত
ধরে বাড়ির ভিতরে নিয়ে গেলেন। ডাইনিং টেবিলের সামনে একটা চেয়ারে বসিয়ে বললেন, “একটু
বস। তারপর তোমার ঘরে নিয়ে যাব। হাসপাতালের জামা কাপড় বদলে হাতমুখ ধুয়ে নেবে চলো,
তারপর আমরা একসঙ্গে জলখাবার খাবো”।
অবিনবাবু প্রবীণবাবুর মুখের
দিকে তাকিয়ে উত্তেজিত হয়ে বলে উঠলেন, “তোরা সবাই আমাকে বোকা বানাচ্ছিস কেন বল তো?
এ বাড়ি তো আমাদের নয়, এ বাড়ি কাদের বাড়ি? তুই সত্যিই খ্যাঁদা তো? আমার কিন্তু এখন
সন্দেহ হচ্ছে। তুই যদি সত্যিই খ্যাঁদা হস, তুই তো জানিস এ বাড়ি আমাদের নয়। সেখানে
না গিয়ে, আমাকে এ কাদের বাড়িতে তুই নিয়ে এলি?”
প্রবীণবাবু একটু রেগেই গেলেন,
বললেন, “আমি যদি খ্যাঁদা না হই, তিরাশি বছর পরে তোমার সমাধি ভাঙবে, এ কথা জানলাম
কী করে? তিরাশি বছর সময়টা বড়ো কম নয়, ছোটকা। তুমি আমাকে শেষ
দেখেছিলে আমার যখন সাত-আট বছর বয়েস। তুমি সেই বয়সেই আটকে রয়েছ, তাই বলে আমিও কী সেই
বালক বয়সেই আটকে রয়েছি? আমার বয়েস এখন প্রায় নব্বই হতে চলল। কেন বুঝছো না, এই তিরাশি
বছরে সব কিছুই বদলে গেছে। প্রত্যেকদিন বদলে চলেছে এই পৃথিবী, মানুষজন, গ্রাম,
শহর...সব”।
অবিনবাবু কিছু বললেন না,
তাকিয়ে রইলেন প্রবীণবাবুর মুখের দিকে। প্রবীণবাবু একটু শান্ত হয়ে বললেন, “মনটাকে
শক্ত করো, ধৈর্য ধরো। এই বাড়ি আমিই বানিয়েছিলাম, আজ থেকে প্রায় ষাট বছর আগে। এই
জমি আমাদের সেই পৈতৃক জমির সীমানার বাইরে কিন্তু একদমই লাগোয়া। বিকেলে অহীন তোমাকে
আমাদের পুরোন বাড়ি দেখাতে নিয়ে যাবে। দেখে এস। বুঝতে পারবে সব। এখন চলো, নিজের ঘরে
গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নাও। শুরু হোক তোমার নতুন জীবন, নতুন অভিজ্ঞতা”।
প্রবীণবাবু উঠে দাঁড়িয়ে হাত
বাড়ালেন। অবিনবাবু কোন কথা না বলে, ভাইপোর হাত ধরলেন। দুজনে এগিয়ে গেলেন দোতলার
সিঁড়ির দিকে।
ওঁরা দুজন ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে নবীনবাবু একটু তিক্ত স্বরে বললেন, “যত বয়েস হচ্ছে, বাবা ততই খেঁকটে হয়ে যাচ্ছে। ছোড়দাদুকে ওভাবে কথাগুলো বলাটা কি উচিৎ হল?”
সর্বজিৎ বলল, “না, মেসোমশাই, আমার মনে হয় দাদু যা করেছেন, একদম ঠিক করেছেন। ডাক্তার সরকার
ঠিকই বলেছেন, বিগত আট দশকে আমাদের জীবনে এত পরিবর্তন এসেছে, বিনুদার পক্ষে একদিনে সে
সব বুঝে ওঠা অসম্ভব। গাড়িতে আসতে আসতে, গাড়ি নিয়ে, অহীনের ফোন নিয়ে ওঁনার মন্তব্যগুলো
শুনলেন না? যে সময় ওঁনাকে সমাধিস্থ করা হয়েছিল, সেই সময়কার আভিজাত্যের ধারণাতেই
তিনি আটকে রয়েছেন। বড়ো বড়ো থামওয়ালা প্রাসাদোপম বাড়ি। সেই সময়কার গাড়ি। সেই
সময়কার ভারি ভারি জগদ্দল ফোন। কিন্তু স্বাধীন ভারতে আমরা এখন যে আর অভিজাত নই, সেটাই
উনি বুঝতে পারছেন না। আমরা মধ্যবিত্ত হয়ে গেছি। সেই মাপে এখন আমাদের সবকিছুই অনেক ছোট,
ওঁনার ভাষায় “ফঙ্গবেনে” করে ফেলতে হয়েছে। এই বাড়ি, ওই গাড়ি…সব। এই ব্যাপারটা ওঁনাকে
বুঝতে হবে, আমাদের বোঝাতে হবে। তার জন্যে…”। সর্বজিৎ একটু থামল।
নবীনবাবু সর্বজিতের কথা মন দিয়ে শুনছিলেন,
বললেন, “ঠিকই বলছ, থামলে কেন, বলো?”
সর্বজিৎ একটু ইতস্ততঃ করে বলল, “তার জন্যে
মাঝে-সাঝে একটু জোর করতে হবে, ধমক-ধামকও দিতে হবে। তবে হ্যাঁ, সেটা দাদুর পক্ষেই করা
সম্ভব। কারণ দাদুর সঙ্গে বিনুদার বয়সের তফাৎ খুব বেশি নয়। বিনুদার পরিচিত পরিজনের মধ্যে
একমাত্র দাদুই জীবিত। আমাদের মধ্যে একমাত্র দাদুর সঙ্গেই বিনুদার প্রত্যক্ষ স্নেহের
সম্পর্ক। দাদুই হলেন বিনুদার শ্রদ্ধেয় বড়দা ও বড়বৌদির প্রত্যক্ষ
স্মৃতি। সেই অধিকারে তিনি ছোটকাকে খুচরো ধমক দিতেই পারেন। তাতে আমার মনে হয় ভালই হবে”।
ঘরে উপস্থিত সকলেই সর্বজিতের কথা মন দিয়ে শুনছিল। নবীনবাবু উঠে দাঁড়িয়ে সর্বজিতের কাঁধে হাত রেখে বললেন, “ঠিক কথা সর্বজিৎ। কিন্তু আস্তে আস্তে তিনি যখন সবই জানতে পারবেন, তখন কী যে হবে, ভাবতেই…”। নবীনবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেলে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “যাগ্গে যা হবার হবে, এখন চলো আমরাও একটু ফ্রেশ হয়ে আসি, যতই হোক আমরাও তো নার্সিং হোমের ভেতরে গিয়েছিলাম…”।
চলবে...
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন