মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৪৩

 প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

 তৃতীয় ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ "

পঞ্চম ধারাবাহিকের শুরু - " স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "; "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "




[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

আগের পর্ব  - "বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৪২"


৪৮

 

পরদিন সকালে ছেলেদের ঘুম ভাঙল একটু দেরিতে। দীর্ঘদিন কঠোর পরিশ্রমের পর সুন্দর সফল একটা অভিযান। এবং দীর্ঘ ব্যস্ততার পর এমন নিটোল আত্মবিশ্বাসী অবসরের স্বাদ তারা জীবনে কোনদিনই অনুভব করেনি। সকলেই কিছুক্ষণ আলস্যে কাল কাটিয়ে লক্ষ্য করল ভল্লাদাদা আর রামালি নেই। আশ্চর্য হল সকলেই, দুজনে কোথায় গেল এত সকালে?

কমলিমা কুয়োর জলে স্নান সেরে ভেজা কাপড়ে ঘরে ঢুকে জিজ্ঞাসা করলেন, “কী রে ঘুম ভাঙলো?”

আহোক জিজ্ঞাসা করল, “ভল্লাদাদা আর রামালি কোথায়, জেঠিমা?”

কমলিমা বললেন, “ভোর বেলায় মারুলা এসেছিল, ভল্লা আর রামালির সঙ্গে কিসব গুজগুজ ফুসফুস করল, তারপরেই ওরা বেরিয়ে গেল। বেরিয়ে যাওয়ার সময় ভল্লা বলতে বলল, ঘুম থেকে উঠে, ছেলেরা সবাই যেন ভল্লার বাসায় চলে যায়। মইলি, দীপান আর বিশুনকেও খাটুলা করে নিয়ে যেতে বলেছে”।

ছেলেরা আলস্য ভেঙে সবাই উঠে পড়ল। তাদের মনে এখন আশ্চর্য পরিবর্তন। একটু আগেই মনে হচ্ছিল আজকের দিনটাও নিশ্চিন্ত অবসর – কিন্তু এখন মনে হচ্ছে – সারাদিন শুয়ে বসে খেয়ে গল্প করে ঘুমিয়ে সময় কাটবে কী করে? দ্রুত নিত্যকর্ম সেরে  ভল্লার নির্দেশ মতো ছেলেরা বেরিয়ে পড়ল, তিন আহত বন্ধুকে কাঁধে তুলে নিয়ে।

 

ছেলেরা ভল্লার বাসায় পৌঁছে দেখল ভল্লাদাদা আর রামালি ছাড়াও আরও চারজন মুখচেনা কিন্তু অপরিচিত ছেলে বসে বসে কথা বলছে। ওদের দেখেই ভল্লা বলল, “বাঃ তোরা এসে গেছিস? এক কাজ কর, আহোক সুরুল, কিশনা আর বিনেশ থেকে যা। বাকিরা গ্রামে ফিরে যা। মইলি, দীপান আর বিশুনকে ওদের বাড়ি পৌঁছে দিবি আর বড়্‌বলাকে খবর দিবি। বলবি তোরা আপাততঃ কিছুদিন গ্রামেই থাকবি, কেমন? আজকের দিনটা পরিবারের সঙ্গে কাটা – কাল থেকে আবার নতুন কাজে লাগতে হবে”।

ছেলেরা চলে যেতে ভল্লা সুরুলদের ডেকে বলল, “আয় তোরাও বসে পড় জায়গা করে। এদের সঙ্গে পরিচয় করে নে – চারজনেই এসেছে বটতলি থেকে – ওরাও আমাদের মতোই লড়তে চায়। এখন সকলেই প্রস্তুত হচ্ছে। এদের মহড়ার মাঠ – এখান থেকে উত্তরে, ক্রোশ দেড়েক মতো দূর হবে, তাই না রে মিলা? একটু পরেই আমরা সবাই ওদিকে যাবো। হ্যাঁ, যে কথা তখন বলতে বলতে তুই থেমে গেলি জনা...”?

জনা সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “হ্যাঁ তোমাদের পরশুদিনের আক্রমণের বার্তা চারদিকে ছড়িয়ে পড়তেই – নানারকম প্রতিক্রিয়া শুনছি ভল্লাদাদা। গ্রামের দীন-দরিদ্র মানুষগুলোর বেশির ভাগ তোমাদের দুহাত তুলে আশীর্বাদ করছে, গো। বলছে আমাদের দিকেও অমন একটা ভল্লা যদি থাকত তাহলে রাজার কুকুরগুলোর থোঁতা মুখগুলো জন্মের মতো ভোঁতা করে দিত”।

“আমার নাম সবাই জানল কী করে? তোরাই বলেছিস নিশ্চয়ই। কী বিপদ হল বল তো, আহোক? এ কথা তো রাজধানীর লোকদের কানেও উঠবে – তখন তারা আমাকে আর বেঁচে থাকতে দেবে?”

জনা হাসল, বলল, “তোমার এখানে প্রথম আসার আগে তোমার নাম এবং তোমার কাজের কথা, আমরা কোথায় শুনেছিলাম জানো?”

“কোথায়”?

“আমাদের গ্রাম থেকে দেড় ক্রোশ দূরের হাটে - কয়েকজন বণিকের কাছে...। তারপরেই আমরা চারজন তোমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলাম”।

“হুঁ তার মানে, আমি এতদিন বিখ্যাত ছিলাম – এখন আমার সেনাদলও বিখ্যাত হয়ে গেল। সেনাদল বলাটা আমার একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেল ঠিকই – তবে আস্থানের রক্ষীদের তুলনায় আমার ছেলেরা অনেক বেশি দক্ষ – এ বিষয়ে আমার কোন সন্দেহ নেই। তবে...”,  আহোকদের মুখের দিকে তাকিয়ে ভল্লা বলল, “সেনা হয়ে উঠতে – আরও কিছু মহড়া শিখতে হবে। আরও কিছু অভিযানের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে হবে। যাগ্‌গে সে কথা, সাধারণ মানুষ ছাড়া আর কাদের কী রকম প্রতিক্রিয়া?”

জনা একটু চিন্তা করতে করতে বলল, “এতদিন আমাদের যারা সন্দেহের চোখে দেখত, ভল্লাদাদা। তাদের চোখে গতকাল থেকে কেমন যেন একটা ভয়-ভয় ভাব লক্ষ্য করছি”।

মিলা বলল, “হ্যাঁ ভল্লাদাদা, আমাদের শুনিয়ে শুনিয়ে অনেকেই ঠাট্টা-বিদ্রূপ করত – বলত রাজধানী থেকে তাড়িয়ে দেওয়া এক অপরাধীর সঙ্গে ওঠাবসা করে – এই ছোঁড়াগুলোও কালে একএক জন বীর হয়ে উঠবে রে...। হাসত খ্যাঁক খ্যাঁক করে। আমরা তাদের কাউকেই কোনদিন কিছু বলিনি – কিন্তু গতকাল সেই লোকগুলিই আমাদের দেখে আড়ালে সরে পড়ছে। একজন তো গায়ে পড়ে কথা বলল, তোমাদের মহড়া-টহড়া শুনতে পাই ভালই চলছে?”

জনা বলল, “বলিস কী? কে বল তো?”

মিলা বলল, “আরে ওই মগনা ব্যাটা। গ্রামিকের আমড়াগাছি করে হতভাগা দুটো টাকা-কড়ি বাগিয়ে সাপের পাঁচপা দেখছে...”।

জনা বলল, “দাঁড়া না একবার গ্রামিকের ষষ্ঠী পুজো হয়ে গেলেই – সব ঠাণ্ডা হয়ে যাবে – যত্তো উচ্চিংড়ের বাচ্চা”।

ভল্লা বলল, “চল আমরা মহড়া মাঠে যাই – ওখানে বসেই তোদের ওই গ্রাম প্রধানকে জব্দ করার পরিকল্পনাটা করে ফেলি। তোদের যে বলেছিলাম ওর বাড়ির ভেতরের খুঁটিনাটি তথ্য যোগাড় করতে...”।

“করছে ভল্লাদাদা। বেশ কিছু তথ্য এসে গেছে – বাকি তুমি যেমন যেমন বলবে সব যোগাড় করে ফেলব”।

ওরা দশজনই রণপায় চড়ে দৌড়ে চলল বটতলির মহড়া মাঠের দিকে। মহড়া মাঠে পৌঁছে ভল্লা একধারে বসে অন্য ছেলেদের মহড়া দেখতে দেখতে বলল, “আরে রামালি, নতুন রণপাগুলোতে লোহার খুড়ো আর বল্লমের ফলা লাগানো নেই তো! এঃ হে ওরা নোনাপুরে ফিরল, ওদের বালিয়াকে পাঠিয়ে দেওয়ার জন্যে, বললে হতো ...”।

রামালি বলল, “তার দরকার কি? আহোকরা তো ফিরবে, ওরা নতুন রণপা চড়ে চলে যাবে, বালিয়ার ভাটিতে দিয়ে দেবে – এখন তো গ্রামের লোকেরা সব কিছুই জেনে গেছে...”

আহোক বলল, “যাবার সময় আমরা তিন চারগাছি হাতে করেও নিয়ে যেতে পারি, কী আছে? জনাভাই তোমাদের বাড়তি রণপা কতগুলো আছে?”

মিলা বলল, “দশ জোড়া বেশি আছে”।

“ঠিক আছে যাবার সময় আমরা তিনজন মিলে ছ জোড়া নিয়ে যাবো”।

ভল্লা এই ব্যবস্থায় খুশিই হল, বলল, “বেশ এদিকটা মিটল – তোদের ঘর কতদূর জনা”?

জনা বলল, “ভিত পর্যন্ত গাঁথা হয়ে গেছে – এবার দেওয়াল তুলবে। যাবে? চলো না দেখে আসবে - ”।

 

ঘর-টর দেখে এসে ভল্লারা আবার ফিরে এসে বসল মহড়ার মাঠে, বলল, “এবার বল তোদের প্রধানের বাড়িটা কেমন?”

জনা বলল, “পূর্ব, দক্ষিণ আর পশ্চিমমুখো - তিনদিকে ঘর। দুই-চার-দুই মোট আটখানা! তার সামনে বড়ো উঠোন। ঘরগুলো পাশাপাশি লাগোয়া। তবে রান্নাঘর আর ভাঁড়ার ঘর আলাদা। বাড়ির পিছনদিকে বেশ কিছু ফলের গাছ, অনেকটা জমিতে আনাজও হয়। রান্নাঘরের পাশ দিয়ে সরু গলিটা ওই আনাজের জমির ভেতর দিয়ে পাছ দুয়োর পর্যন্ত গিয়েছে। পাছ দুয়োর খুললেই কিছুটা খালি জমি – তারপরেই ঘাট – খিড়কি পুকুর”।

ভল্লা বলল, “রামালি না আহোক কে আঁকবি - ওই বাড়ির চিত্রটা?”

আহোক বলল, “আমি আঁকছি ভল্লাদাদা, দেখে নাও ঠিক বুঝলাম কিনা”, কাঠি নিয়ে মাটিতে আঁকতে শুরু করল। মিলা আর জনা অবাক হয়ে দেখতে লাগল – চোখের সামনে ফুটে উঠতে লাগল প্রধানের বাড়ির পুরো চিত্রটা। আঁকা হয়ে যেতে ভল্লা বলল, “জনা, বাড়ির সামনের রাস্তাটা কি গলি? গলি হলে সেটা গ্রামের প্রধান রাস্তা থেকে কতদূরে?”

“গলি নয় ভল্লাদাদা – গ্রামের প্রধান রাস্তা”।

“উল্টোদিকে কে বা কারা থাকে? পিছনে পুকুর – বাড়ির বাঁদিকে ডানদিকেই বা কাদের বাড়ি? তাদের সঙ্গে ওই গ্রামপ্রধানের সম্পর্ক কেমন?”

“বুঝেছি – আমরা আক্রমণ করেছি বুঝতে পারলে – ওরা বাধা দিতে আসবে কিনা, তাই তো? না ভল্লাদাদা আশেপাশে যারা আছে তারা সকলেই হত দরিদ্র সাধারণ মানুষ। লোকটা কয়েক বছর আগেও ওদের মতোই ছিল – কিন্তু গ্রামিক হওয়ার পরেই আঙুল ফুলে কলাগাছ। প্রতিবেশীদের অনেককেই বোকা বানিয়ে, ভয় দেখিয়ে, তাদের বাস্তুজমি হাতিয়ে – ওই অতবড় জমি-বাড়ি-পুকুর করেছে। এভাবে চললে, আরও কয়েক বছর পরে ওই পাড়াটাই ওর হাতের মুঠোয় চলে যাবে...”।

“বেশ, যত সাধারণই হোক তাদের সবাইকে হাতে রাখার চেষ্টা কর – যাতে ওরা টের পেলেও তোদের কাজে কোনভাবেই যেন নাক না গলায়...। এবার বল – কোন ঘরে কে থাকে – মানে প্রধান আর প্রধানের বউয়ের ঘর – প্রধানের কটি ছেলে – তাদের সকলের বিয়ে হয়ে গেছে কিনা - তাদের ঘর কোনগুলো? প্রধানের বুড়ো বাপ-মা আছে? তাদের ঘর কোনটা? আমার ধারণা – প্রধানের ঘরেই যাবতীয় টাকাকড়ি সোনাদানা পেয়ে যাবি। একটা বা দুটো সিন্দুকের মধ্যে। বাড়ির ভেতরের খবর বের করতে কাকে লাগিয়েছিস”?

“ওদের রান্না করে যে পাচক তার সহকারি...”।

“সে তো সর্বদাই রান্নাঘরে থাকবে – ওকে বল প্রধানের বউ - গিন্নিমাকে বলে ভৃত্যের কাজ নিক – বলবে রান্নার কাজ ভালো লাগছে না। যে করে হোক প্রধানের ঘরে ঢুকতে হবে। সিন্দুক কোথায় আছে কেমন সিন্দুক – লোহার না কাঠের – জানতে হবে। আর যদি সিন্দুকের কুঞ্চিকার সন্ধানও পেয়ে যাস তাহলে তো হয়েই গেল”।

জনা একটু ইতস্ততঃ করে বলল, “তুমি কী ওদের কারও মৃত্যু চাইছ না?”

ভল্লা বলল, “তোরা কি ওদের নির্বংশ করার পরিকল্পনা করছিস নাকি?”

জনা বলল, “অতটা না হলেও কিছুটা”।

ভল্লা মাথা নাড়তে নাড়তে গম্ভীর গলায় বলল, “দ্যাখ ও বাড়ির বাচ্চা-কাচ্চা, মেয়ে-বউ, বুড়োবুড়িদের মেরে কেন হাত নোংরা করবি? মনে রাখিস সাধারণ মানুষ অকারণ নৃশংসতা ভালভাবে নেয় না। প্রধানকে শেষ কর – ওর ছেলেদের সবাই কি প্রধানের মতোই শঠ ও তঞ্চক?”

মিলা বলল, “না তা নয়। মেজ আর সেজ ছেলে বাপের মতো। বড় ছেলের মাথার ব্যামো – হাবা। বাকি তিন ছেলে নিরীহ ভিতু...। বাপ চোখ বুজলেই  - মেজ ভাই ওদের সবাইকেই ঘাড় ধাক্কা দেবে”।

“তাহলে? সবাইকে মারবি কেন? ওই তিন বাপ-ব্যাটাকে মার। তাছাড়া গণ্ডগোলের সময় আরও দু একজন হয়তো মারা পড়বেই – তা যাক – কিন্তু নাঃ নির্বিচারে শিশু, নারী বৃদ্ধ সকলকে হত্যায় আমার মত নেই...”।

জনা বলল, “ভল্লাদাদা, কথায় আছে শত্রুর শেষ রাখতে নেই – কে বলতে পারে ওই বংশের কেউ ভবিষ্যতে হয়তো আমাদের মহাশত্রু হয়ে উঠল?”

“হোক না। ভবিষ্যতে আমরা কি চোখ বন্ধ করে বসে থাকব? নাকি অশক্ত দুর্বল হয়ে পড়ব? ওরকম এক দুজন উঠতি শত্রু ভবিষ্যতে যেমন জন্মাবে – তেমন আমাদের হাতেই তারা মরবে। কিন্তু সেই আতঙ্কে আমরা এখনই শিশু ও নারীদের সর্বত্র হত্যা করে বেড়াবো? এ আমি মোটেই মেনে নিতে পারব না, জনা।”

ভল্লা থামতে কেউ কিছু বলল না। মাথা নীচু করে জনা ও মিলা গভীর চিন্তায় ডুবে রইল। ওদের চিন্তান্বিত দেখে ভল্লা আবার বলল, “তোরা জনসাধারণের জন্যে লড়াই করছিস – মনে রাখবি তারা তোদের থেকে ন্যায় বিচার প্রত্যাশা করে। অন্যায়কারীকে হত্যা করা একরকমের বিচার,  রাজাও করেন। কিন্তু তাকে সবংশে নির্মূল করাটা কখনোই ন্যায় বিচার হতে পারে না। রাজাও কখনও তা করেন না। জনগণের মনে বিতৃষ্ণা জাগিয়ে জনগণের সঙ্গে বেশি দিন চলা যায় না। তোরা ডাকাত নয়, রাজা হয়ে ওঠ, জনা।”

ভল্লা চুপ করে যেতে, মিলারাও কোন কথা বলল না। সকলেই অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল। বটতলির ছেলেদের মহড়া কিছুক্ষণ দেখে ভল্লা বলল, “এখন আমরা উঠি রে, জনা – কাল সকালে আবার আসবো…”।

জনা ও মিলা মুখ তুলে তাকাল ভল্লার দিকে। মিলা বলল, “তোমার উপদেশ আমরা মেনে নিচ্ছি ভল্লাদাদা। তুই কী বলিস জনা? অপরাধীকে শাস্তি দিতে আমরা শক্ত হাতেই শক্তি ব্যবহার করব। কিন্তু নিরপরাধ নিরীহ মানুষের জন্যে নয়”।

ভল্লা কিছু বলল না, হাসল।

মিলা ভল্লার দুই হাত নিজের মুঠোয় ধরে বলল, “মিলা ঠিকই বলেছে ভল্লাদাদা। গ্রামিকের মতো মানুষগুলোর দুর্নীতি দেখতে দেখতে ক্রোধে আমরা অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম – তুমি শেখালে ক্রোধ ভাল – কিন্তু অন্ধ ক্রোধ আমাদের সর্বনাশের দিকে টেনে নিয়ে যাবে। তোমার কথাই অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলবো, ভল্লাদাদা”।

ভল্লা হাত বাড়িয়ে জনা আর মিলার কাঁধে হাত রেখে, হেসে বলল, “শুধু আমি নই – আমরা সবাই তোদের সঙ্গে আছি”।

 

বটতলির মহড়ামাঠ থেকে বেরিয়ে ভল্লার সঙ্গে রামালিরা গেল তাদের মহড়া মাঠে। রণপা থেকে নেমে ভল্লা বলল, “এই সেই মাঠ – তোদের কত বকেছি, ধমকেছি – মনে পড়ছে? তোরাও প্রত্যেকে এর মাটিতে ঘাম ঝরিয়েছিস কত…!”

সুরুল বলল, “সত্যি ভল্লাদাদা, প্রতিজ্ঞা করেছিলাম লড়তে শিখব – আজ মনে হচ্ছে কিছুটা শিখেছি”।     

আহোক বলল, “সে কথা বলতে?”

ভল্লা মাটিতে বসে বলল, “আয় বোস। আজ কিছু কথা বলার আছে”। সকলে ভল্লার সামনে মাটিতে বসে ভল্লার মুখের দিকে তাকাল।

“আস্থানের আক্রমণ হয়ে গেছে – উপানু মরেছে। মরেছে চোদ্দজন প্রধান রক্ষী। চারদিকে বার্তা রটে গেছে – প্রয়োজনে গ্রামের সাধারণ ছেলেরাও অস্ত্র ধরতে এবং তার ব্যবহার করতে জানে। কিন্তু এরপর - আমরা কী করবো?”

রামালি বলল, “রাজধানী থেকে আরও বড়ো রক্ষীদল এনে ওরা আমাদের শেষ করতে চাইবে নিশ্চয়ই। তার জন্যে আমাদের আরও প্রস্তুত হতে হবে”।

ভল্লা সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “না। আমার তা মনে হয় না। রক্ষীরা আমাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছিল – আমরা তার প্রতিশোধ নিয়েছি। কিন্তু রাজধানীর চোখে আমরা মোটেই শত্রু হয়ে উঠিনি। আমরা খুব ক্ষুদ্র হলেও আমরা এই রাজ্যেরই অধিবাসী। রাজধানী আমাদের শেষ করলে – সমগ্র রাজ্যবাসী সেটাকে মোটেই ভালো চোখে দেখবে না। অতএব আমার মনে হয় না, রাজধানী সে পথে হাঁটবে। বরং এতদিন এই অঞ্চলের অভাব-অভিযোগের কথা তারা সব জেনে-বুঝেও – চোখ বন্ধ করে যে ঘুমোচ্ছিল, এই ঘটনা তাদের সেই ঘুম ভাঙাবে। তারা টের পেয়ে গেছে – অভাবী প্রজাদের মনে জ্বলতে থাকা ধিকিধিকি ক্ষোভের আগুন – সামান্য স্ফুলিঙ্গর ছোঁয়া পেলে, এই ভাবেই আবার ঝলসে উঠতে পারে। এখানে হয়েছে, এরপর অন্য কোথাও – হয়তো চারদিকেই”।

একটু বিরতি দিয়ে ভল্লা বলল, “আমার ধারণা – রাজধানী নতুন রক্ষীদল তো পাঠাবেই – সে শুধুমাত্র আস্থানের সুরক্ষার জন্য। তার পাশাপাশি পাঠাবে – একজন জনাধিকারিককেও। সে এসে গ্রামের মানুষের সঙ্গে কথাবার্তা বলবে। তাদের অভাব-অভিযোগ শুনবে। এবং এই অঞ্চলের উন্নতির জন্যে কিছু কাজ-কর্ম করবে”।

একটু থেমে ভল্লা আবার বলল, “একটা কথা মনে রাখিস – হয়তো সেটা তোদের সকলের দুর্ভাগ্য বলেই মানতে হবে – এই অঞ্চলের মাটি উর্বর নয়, এখানে পর্যাপ্ত বৃষ্টি হয় না। একথাও নিশ্চয়ই মানবি - কারোর পক্ষেই আচমকা এই মাটিকে উর্বর করে তোলা কিংবা প্রচুর বৃষ্টি এনে ফেলা সম্ভব নয়। সে দেবরাজ ইন্দ্র এলেও হবার নয়। তাহলে উন্নতিটা আসবে কোথা থেকে?”

ভল্লা সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ, তারপর বলল, “তোদের মধ্যে কেউ কেউ অথবা অনেকে - যদি গ্রাম ছেড়ে বাইরে গিয়ে কিছু কাজ করিস। উপার্জন করে বাড়িতে কিছু অর্থ পাঠাস – তাহলে অতি সহজেই গ্রামের উন্নতি হতে পারবে। তোদের বাবা-মা-ভাই-বোনেরা অনেকটাই ভালো থাকতে পারবে। তোদের ঘরদোরের শ্রী ফিরবে”।

আহোক বলল, “কিন্তু আমরা কী কাজ জানি? আমাদের কাজ দেবে কে?”

“আগে তেমন কিছু জানতিস না, কিন্তু এখন তো ভালই শিখেছিস”। ভল্লা হেসে বলল।

“লড়াই করতে?” সুরুল উত্তেজিত হয়ে বলল, “কিন্তু আমরা তো রক্ষীদের হত্যা করে রাজধানীর চোখে অপরাধী। আমাদের কাজ দেবে – না শূলে চড়াবে!”

“হতভাগা, রাজধানী কি জানে তুই কটা রক্ষীকে মেরেছিস? আর একজন দক্ষ রক্ষী বানিয়ে তুলতে রাজধানীর কী বিপুল ব্যয় হয় তোদের ধারণা আছে? তাও তো সব ওই উপানুর মতোই মাথামোটা, একলষেঁড়ে। সেখানে বিনা পরিশ্রমে,  বিনা ব্যয়ে তোদের মতো দক্ষ রক্ষী পেলে রাজধানী ধেই ধেই করে নৃত্য করবে রে। তোদের নাম তো কেউ জানে না – তোরা তো সেসময় সবাই ছিলি জুজাক। যাগ্‌গে সেটা কথা নয় – তোরা পাঁচজন ছাড়া কারা কারা রক্ষীর কাজ করতে চায় জেনে নে। আমি এবং মারুলা তাদের কাজের ব্যবস্থা করে দেব। তবে হ্যাঁ – বাইরে যেতেই হবে”।

“বা রে, আর আমাদের কী হবে?” কিশনা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, “তুমি যা বললে আমাদের তো এখানে কোন কাজই নেই”!

ভল্লা হেসে ফেলে বলল, “তোদের দিয়ে সারাদিন আমার গা টেপাবো, পা টেপাবো রে, হতভাগা’। তারপর কিশনার কাঁধে হাত রেখে ভল্লা বলল, “তোদের কাজের কথা কাল বলবো। এখন বাড়ি যা। ছেলেদের সঙ্গে কথা বল। কাল সকালে তোরা চারজন এখানেই আসবি। কথা হবে। রামালি চল রে, বেলা হয়ে গেল কত… কমলিমায়ের গালাগাল না শুনলে তোর দেখি খাবার হজম হয় না…”।  


চলবে...


সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৫/২০

   ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "

ধর্মাধর্ম শেষ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৫/১ "

 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  

[এর আগের পর্বাংশ - "ধর্মাধর্ম - ৫/১৯"]


৫.৬.২ শক্তি, শাক্ত ও তন্ত্রধর্ম

৫.৬.২.১ শক্তির দেবী

শৈব ধর্মের আরেকটি জনপ্রিয় ও শক্তিশালী শাখা হল শাক্ত। শাক্ত ধর্মের মূলকথা শক্তি – যে আদ্যাশক্তির কথা শৈবধর্মে বলা হয়েছে, সেই শক্তিই এখানে প্রধানা দেবী এবং তাঁর ভক্তরা শক্তির উপাসক। শাক্তদের উপাস্য দেবী প্রধানতঃ দশজন, তাঁদের একত্রে দশমহাবিদ্যা বলা হয়ে থাকে। এই দশমহাবিদ্যা হলেন, কালী, তারা, ষোড়শী, ভুবনেশ্বরী, ভৈরবী, ছিন্নমস্তা, ধূমাবতী, বগলা, মাতঙ্গী ও কমলা। এই দেবীরা সকলেই শিবজায়া সতী ও পার্বতীর বিভিন্ন রূপ। প্রসঙ্গতঃ পৌরাণিক মতে সতী ও পার্বতীও একই দেবী, দক্ষের যজ্ঞে দেহত্যাগ করার পর সতীদেবীই পরজন্মে পার্বতী হয়েছিলেন, সেকথা আগেই বলেছি। এই দশমহাবিদ্যার উৎপত্তি নিয়ে বহু পুরাণে বহু কাহিনীর অবতারণা করা হয়েছে, তার মধ্যে যে কাহিনী সব থেকে প্রচলিত, সেটি এরকম,-

নিমন্ত্রণ ছাড়াই সতীদেবী পিতা দক্ষের যজ্ঞে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করায়, মহাদেব তাঁকে যখন বারবার নিষেধ করেছিলেন, তখন ভীষণ রেগে গিয়ে সতীদেবী স্বামীকে তাঁর এই দশরূপ দেখিয়েছিলেন।

কালী - এলোকেশী, ঘন মেঘের মতো কালো গায়ের রং, ত্রিনয়না, বড়বড় দাঁত ও লোলজিহ্বা। গলায় মুণ্ডমালা, তার থেকে রক্ত ঝরছে, তিনি দাঁড়িয়ে আছেন শবের বুকে। তিনি চতুর্ভুজা, তাঁর বাঁহাতের একটিতে তীক্ষ্ণ খড়গ, অন্যটিতে কাটা মুণ্ড। দুই ডানহাতে বরাভয় মুদ্রা। ইনি কৈবল্যদায়িনী– সংসারে পুনর্জন্ম থেকে মুক্তি দেন।

তারা - তাঁর গায়ের রং নীল, লোলজিহ্বা, ত্রিনয়না, করালবদনা, মাথার জটাতে খেলে বেড়াচ্ছে সাপ। কপালে পাঁচটি অর্ধচন্দ্রের ভূষণ, পরনে বাঘছাল। তিনি শিবের বুকের ওপর দাঁড়িয়ে আছেন, তাঁর চারহাতে নীলপদ্ম, খড়গ, কাতি[1] ও নরখুলি। ইনি বিপদ-আপদ, ভূত-প্রেত থেকে সকলকে ত্রাণ বা তারণ করেন, তাই তারা।

ষোড়শী (রাজরাজেশ্বরী) - তাঁর গায়ের রং লাল, ত্রিনয়না, কপালে চন্দ্রভূষণ, তাঁর চার হাতে পাশ, অঙ্কুশ, তীর ও ধনুক, তিনি বসে আছেন যে মঞ্চে সেই মঞ্চ ধারণ করে আছেন, পাঁচ দেবতা - ব্রহ্মা, বিষ্ণু, ঈশ্বর, মহেশ ও রুদ্র। ইনি ত্রিগুণাতীতা–অর্থাৎ সত্ত্ব, রজঃ ও তমোগুণের ঊর্ধে অবস্থিতা।

ভুবনেশ্বরী - এই রূপে তিনি পদ্মাসনা, রক্তবর্ণা, সালংকারা, কপালে চন্দ্রভূষণ, চার হাতে পাশ, অঙ্কুশ ও বরাভয় মুদ্রা। ইনি এই বিশ্ব ভুবনকে পালন করেন।

ভৈরবী - ইনিও পদ্মাসনা, রক্তবর্ণা, ত্রিনয়না, সালংকারা, কপালে চন্দ্রভূষণ, গলায় মুণ্ডমালা, চার হাতে অক্ষমালা[2], পুঁথি ও বরাভয় মুদ্রা। ইনি ভৈরবের ভার্যা - সকল দুঃখ নাশ করেন।

ছিন্নমস্তা - প্রস্ফুটিত পদ্মের উপর বিপরীত রতিক্রিয়ায় মগ্ন মিথুনের উপর তিনি দণ্ডায়মানা, তিনি দ্বিভুজা, দিগম্বরী, উপবীতের মতো তাঁর কাঁধে মুণ্ডমালা এবং সাপ। একহাতের খড়্গ দিয়ে তিনি নিজের মুণ্ড কেটে ফেললেন, অন্য হাতে ধরলেন, নিজেরই কাটা মুণ্ড। কণ্ঠ থেকে উৎসারিত হল তিনটি রক্তধারা। দুই পাশের রক্তধারা পান করতে লাগল তাঁর দুপাশে দাঁড়িয়ে থাকা দুই ডাকিনী সহচরী এবং মধ্যের রক্তধারাটি পান করলেন হাতে ধরে থাকা নিজের কাটা মুণ্ডটির মুখ দিয়ে। ইনি ত্রিশক্তিরূপিণী, মোহনাশিনী ও মোক্ষদায়িনী।

ধূমাবতী - ধূমাবতী অতি বৃদ্ধা বিধবা, তাঁর গায়ের রং ধূসর ধোঁয়ার মতো, তাঁর দুই স্তন বাতাসে দুলছে, তিনি শীর্ণা, ক্ষুধায় আকুল, তাঁর একহাতে একটি কুলা, অন্য হাত কাঁপছে থরথর করে। ইনি ধূম্রাসুরকে বধ করেছিলেন। ইনি চতুর্বর্গ – ধর্ম, অর্থ, কাম, মোক্ষ দান করেন।

বগলা – রত্নময় গৃহে, রত্নময় সিংহাসনে তিনি বসে আছেন, তিনি পীতবর্ণা, পীতবসনা, সালংকারা, তাঁর ত্রিনয়নে চন্দ্র, সূর্য এবং অগ্নি, কপালে চন্দ্রকলা, একহাতে তিনি এক অসুরের জিভ টেনে ধরে আছেন, অন্য হাতে মুগুর। ইনি স্বয়ং চৈতন্যরূপিণী

মাতঙ্গী – রক্তপদ্মাসনা, শ্যামবর্ণা, রক্তবসনা, চতুর্ভুজা – খড়্গ, চর্ম, পাশ, অঙ্কুশধারী, ত্রিনয়না, কপালে অর্ধচন্দ্র। ইনি মতঙ্গ অসুরকে বধ করেছিলেন, সকল বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করেন।

কমলা (মহালক্ষ্মী)– সুবর্ণ বর্ণা, কমলাসনা, চার হাতের দুই হাতে পদ্ম, দুই হাতে বরাভয় মুদ্রা, দুই পাশে দুই-দুই হাতি তাদের চারটি করে দাঁত। দুই হাতি সোনার ঘট থেকে রত্ন এবং অন্য দুই হাতি সোনার কলস থেকে অমৃত ঢেলে দেবীকে অভিষিক্তা করছে।

দেবাদিদেব মহাদেব মনে করলেন, এঁরা কেউই তাঁর নরম-সরম পত্নী সতীদেবী নয়, অন্য কেউ। তিনি আতঙ্ক ও ভয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনারা কে? আমার সতী কোথায় গেল?” উত্তরে কালীরূপী সতীদেবী বললেন, “তুমি তো সবই জান, এখন কেন ভুলে গেলে? চিন্তা করে দেখ আমিই পরমা প্রকৃতি। সৃষ্টির আদিতে তুমি, বিষ্ণু এবং ব্রহ্মা যখন কারণ জলে ছিলে, আমিই তোমাদের তিনজনকে প্রসব করেছিলাম। তোমরা তিনজনেই তখন সৃষ্টির জন্যে তপস্যা করছিলে, এমন সময় আমি শব হয়ে জলে ভেসে সেখানে উপস্থিত হলাম। শবের পূতি গন্ধে বিষ্ণু উঠে গেলেন, ব্রহ্মা মুখ ফিরিয়ে চতুর্মুখ হলেন। একমাত্র তুমিই ঘৃণা না করে, আমাকে আসন করলে এবং আমি প্রকৃতি রূপে তোমার পুরুষ রূপের ভজনা করলাম। সেই তুমি, সেই আমি – এবার মনে পড়েছে?” এই কথা শুনে মহাদেবের সব মনে পড়ে গেল, সেই শবসাধনা, সেই তন্ত্রমন্ত্র। সতীদেবীই যে সেই মহামায়া সে কথা মনে করে, তিনি সতীদেবীকে দক্ষের যজ্ঞে যাওয়ার অনুমতি দিতে বাধ্য হলেন।

 

প্রসঙ্গতঃ এখানে সৃষ্টি তত্ত্বের শাক্তমতের কাহিনীটিও জানা গেল।

 

৫.৬.২.২ মহাভারতে শক্তিপূজা

মহাভারতে শক্তি দেবীদের পূজার বহু উল্লেখ আছে। সবগুলির আলোচনায় না গিয়ে, খুব তাৎপর্যপূর্ণ একটিমাত্র ঘটনার উল্লেখ এখানে করতে চাই। পঞ্চপাণ্ডব ও দ্রৌপদী বারো বছর বনবাসের পর, এক বছর অজ্ঞাতবাসের জন্যে বিরাটরাজ্যে আত্মগোপনে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কিন্তু মানসিক উদ্বেগের শেষ নেই, অজ্ঞাতবাসের সময় দুর্যোধনাদি কৌরবপক্ষ যদি তাঁদের অবস্থান জেনে ফেলে, তাহলে আবার তের বছরের জন্যে দুর্ভোগ চলবে।

উদ্বিগ্ন রাজা যুধিষ্ঠির ভগবতী দুর্গার কৃপা প্রার্থনার জন্যে, তাঁর স্তব শুরু করলেন, “হে যশোদাকন্যা, নারায়ণপ্রিয়া, কংসের ধ্বংসকারিণি, অসুরবিনাশিনি, ভগবতি, বরদায়িণি, আপনাকে নমস্কার।  আপনি ব্রহ্মচর্য্যস্বরূপা, বাসুদেবের ভগিনী। দুর্ধর্ষ কংস আপনাকে মায়ের কোল থেকে ছিনিয়ে নিয়ে, শিলাতলে আছাড় মারতে গেলে, আপনি তার হাত থেকে অনায়াসে নিজেকে মুক্ত ক’রে, আকাশে অদৃশ্য হয়েছিলেন। হে ভুবনেশ্বরি, আপনি দিব্য বস্ত্র ও মালায় সুসজ্জিতা। আপনার হাতে তীক্ষ্ণ খড়্গ ও ঢাল শোভা পাচ্ছে। হে ত্রৈলোক্যতারিণি, যাঁরা পাপের ভার ক্ষালনের জন্যে আপনাকে একান্ত ভাবে স্মরণ করেন, আপনি তাঁদের দুস্তর পাপের পঙ্ক থেকে উদ্ধার করে থাকেন”।

তারপর রাজা যুধিষ্ঠির, সকল ভাই ও স্ত্রী দ্রৌপদী মিলে দেবীকে দর্শনের ইচ্ছায় আরো অনেকরকম স্তব করতে লাগলেন, “হে নবোদিত সূর্যের মতো স্নিগ্ধ উজ্জ্বল দেবি, আপনার চার হাত, চার মুখ, আপনি ময়ুরপুচ্ছ বলয়ধারিণী, পীনস্তনী, গুরুনিতম্বিনী, কেয়ুরধারিণী দেবী। আপনি লক্ষ্মীর মতো শোভা লাভ করে থাকেন। আপনার মুখমণ্ডলের আভায় চাঁদের জ্যোৎস্নাও লজ্জিত হয়। আপনার দুই কান, সোনার কুণ্ডলে অলংকৃত। বিচিত্র আপনার মাথার মুকুট এবং অত্যন্ত রমণীয় আপনার কেশবন্ধন। হে বিবিধ অস্ত্রধারিণি, আপনার বিপুল বাহুসমূহ শক্রধ্বজার মতো। আপনার কটিতটে  ভুজঙ্গের অলঙ্কারে, আপনি মহানাগ বেষ্টিত মন্দর গিরির মতো রূপ ধারণ করেছেন। ময়ুরের পাখায় সাজানো আপনার ধ্বজদণ্ডের কী অপূর্ব শোভা হয়েছে। হে  ত্রিদশেশ্বরি, আপনি কৌমার ব্রতে সুরলোক পবিত্র করেছিলেন, সেই কারণে ত্রিদশগণ সর্বদা আপনার স্তব ও পূজা করেন। আপনি ত্রিলোককে রক্ষা করার জন্য মহাসুর মহিষাসুরকেও সংহার  করেছিলেন। আপনি জয়া, বিজয়া, বরদা এবং আপনি সংগ্রামে বিজয় দান করেন, অতএব আমাদের প্রতি এখন প্রসন্ন হোন, কৃপা করে আমাদের বিজয় দান করুন। হে মদ্য ও পশুমাংসপ্রিয়ে[3], কামচারিণি, নগেন্দ্র বিন্ধ্যাচল আপনার শাশ্বত বাসস্থান, প্রলয়কালে নিখিল জীব ও জড় আপনাতেই লীন হয়। হে কালি, হে মহাকালি, যাঁরা প্রভাতে আপনাকে স্মরণ ও প্রণাম করেন, তাঁদের সকল দুঃখের ভারমুক্তি ঘটে এবং প্রভূত ধন-পুত্র লাভ সুলভ হয়। হে দুর্গে, আপনি বিপদের দুর্গ থেকে লোককে উদ্ধার করেন বলেই আপনার নাম দুর্গা। গহন অরণ্যে অবসন্ন, সাগরজলে নিমগ্ন ও দস্যু কবলে আক্রান্ত জনের আপনিই একমাত্র গতি। হে দেবি, জলপোতে, নির্জন প্রান্তরে কিংবা গভীর অরণ্যে বিপন্ন হয়ে, আপনাকে ভক্তিভরে স্মরণ করলেই, আর বিপদের ভয় থাকে না, বিপদ থেকে তৎক্ষণাৎ উদ্ধার পাওয়া যায়। হে সুরেশ্বরি, আপনি কীর্তি, লক্ষ্মী, ধৃতি, সিদ্ধি, লজ্জা, বিদ্যা, সন্ততি, বুদ্ধি, সন্ধ্যা, রাত্রি, প্রভা, নিদ্রা, জ্যোৎস্না, কান্তি, ক্ষমা ও দয়া। আপনার পূজা করলে মানুষের বন্ধন, মোহ, পুত্রনাশ, ধনক্ষয়, ব্যাধি, মৃত্যুভয় কিছুই থাকে না। হে ভক্তবৎসলে, শরণাগতপালিকে, দুর্গে, আমি রাজ্যভ্রষ্ট হয়েছি। এখন আপনার শরণাপন্ন হয়েছি, আপনাকে প্রণাম করি, আপনি আমাদের সকলকে রক্ষা করুন”

রাজা যুধিষ্ঠিরের এই স্তবে দেবী প্রসন্না হলেন, তাঁদের সামনে আবির্ভূতা হয়ে বললেন, “হে রাজা, আমার প্রসাদে তোমাদের অচিরকালের মধ্যেই বিজয় লাভ হবে। তুমি ও তোমার ভ্রাতৃগণ নিখিল কৌরবদের পরাজিত করে, নিষ্কণ্টকে রাজ্য ভোগ করবে, সুখে এবং শান্তিতে জীবন অতিবাহিত করবে। হে ধর্মরাজ, যে সকল নিষ্পাপ লোকেরা আমার নামসঙ্কীর্তন করে, আমি তাদের প্রতি প্রসন্ন হই এবং আমি তাদের রাজ্য, আয়ু, সম্পদ, সুন্দর স্বাস্থ্য ও সন্তান প্রদান করি। প্রবাসে, নগরে, যুদ্ধে, সংগ্রামে, অরণ্যে, দুর্গম পাহাড়ে ও সাগরের যে কোন দুর্গম স্থানে বিপন্ন হলেই, যারা আমাকে স্মরণ করে, তাদের আর কিছুই দুর্লভ থাকে না।  তোমার এই স্তব ও স্তোত্র শুনলে অথবা পাঠ করলে তাদের সমস্ত কাজ সুসম্পন্ন হয়, সকল উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়। হে পাণ্ডবগণ, আমি প্রসন্ন হয়েই বলছি, তোমরা এই বিরাটনগরে বাস করলে, এখানকার লোকেরা এবং কৌরবরাও, কেউ তোমাদের সঠিক পরিচয় জানতে পারবে না”। (বিরাট/ ৬)। যুধিষ্ঠিরকে এই কথা বলে, দেবী পাণ্ডবদের আশীর্বাদ করলেন এবং সেখানেই অদৃশ্য হয়ে গেলেন।

রাজা যুধিষ্ঠিরের এই দুর্গা স্তবের কাহিনী, মহাভারতে যুক্ত হয়েছে হয়তো খ্রিস্টিয় তৃতীয় চতুর্থ শতাব্দীতে। মোটামুটি ৯০০ বি.সি.ই-র কাছাকাছি সময় মহর্ষি ব্যাসদেব রচিত মূল মহাভারতে এই কাহিনী নিশ্চয়ই ছিল না। কারণ আগেই বলেছি মহাভারতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্ম থেকে কংস বধ (অর্থাৎ বৃন্দাবন থেকে মথুরা) কাহিনীর কোন উল্লেখ আমরা পাই না। তাহলে রাজা যুধিষ্ঠির কী করে জানলেন, তিনি যশোদা কন্যা, এবং কংস তাঁকে পাথরে আছাড় মারতে গিয়েছিলেন? উপরন্তু আমরা আগেই দেখেছি, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের বা মহাভারত রচনার কাল থেকে প্রায় পনেরশ (!) বছর বাদে দেবর্ষি নারদের বকাবকিতে, মহর্ষি ব্যাসদেব ভাগবত ও অন্যান্য বহু পুরাণ রচনায় প্রবৃত্ত হয়েছিলেন (অধ্যায় ৫.৩.৩)। অতএব মহাভারতে ভগবতী দুর্গা যখন রাজা যুধিষ্ঠিরের স্তবে আবির্ভূতা হয়েছেন, ততদিনে ভারতবর্ষে হিন্দু ধর্ম প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। অতএব এই কাহিনীটি প্রক্ষিপ্ত, কাক-ভক্ষ্য মহাভারতকে হংস-বিহারী মহাভারতে রূপান্তরিত করার বহু প্রয়াসের মধ্যে এটি একটি।   



[1] কাতি – শাঁখ কাটার দুমুখো করাত, এখানে নিশ্চয়ই দুমুখী ধারাল কোন অস্ত্র।

[2] অক্ষমালা –জপমালা, জপসংখ্যা গোনার জন্যে সাধারণতঃ রুদ্রাক্ষ, কমলাক্ষ ফল অথবা তুলসীকাঠ থেকে বানানো হত। কাচ, স্ফটিক বা সোনার গুটিকা বা পুঁতি দিয়েও জপমালা বানানোর প্রচলন আছে।

[3] কী কাণ্ড, মহাভারত বলছে মদ্য ও পশুমাংস দেবী দুর্গার প্রিয় খাদ্য – কিন্তু আধুনিক ভারত তা মানবে কেন?  


চলবে...    


নতুন পোস্টগুলি

স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ৯

 প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "  দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা...