প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "
দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "
তৃতীয় ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "
চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ "
পঞ্চম ধারাবাহিকের শুরু - " স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "
অন্যান্য সম্পূর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "; "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "
আগের পর্ব - "বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৪২"
৪৮
পরদিন সকালে ছেলেদের ঘুম ভাঙল একটু
দেরিতে। দীর্ঘদিন কঠোর পরিশ্রমের পর সুন্দর সফল একটা অভিযান। এবং দীর্ঘ ব্যস্ততার
পর এমন নিটোল আত্মবিশ্বাসী অবসরের স্বাদ তারা জীবনে কোনদিনই অনুভব করেনি। সকলেই কিছুক্ষণ
আলস্যে কাল কাটিয়ে লক্ষ্য করল ভল্লাদাদা আর রামালি নেই। আশ্চর্য হল সকলেই, দুজনে কোথায়
গেল এত সকালে?
কমলিমা কুয়োর জলে স্নান সেরে ভেজা
কাপড়ে ঘরে ঢুকে জিজ্ঞাসা করলেন, “কী রে ঘুম ভাঙলো?”
আহোক জিজ্ঞাসা করল, “ভল্লাদাদা আর
রামালি কোথায়, জেঠিমা?”
কমলিমা বললেন, “ভোর বেলায় মারুলা
এসেছিল, ভল্লা আর রামালির সঙ্গে কিসব গুজগুজ ফুসফুস করল, তারপরেই ওরা বেরিয়ে গেল। বেরিয়ে
যাওয়ার সময় ভল্লা বলতে বলল, ঘুম থেকে উঠে, ছেলেরা সবাই যেন ভল্লার
বাসায় চলে যায়। মইলি, দীপান আর বিশুনকেও খাটুলা করে নিয়ে
যেতে বলেছে”।
ছেলেরা আলস্য ভেঙে সবাই উঠে পড়ল। তাদের
মনে এখন আশ্চর্য পরিবর্তন। একটু আগেই মনে হচ্ছিল আজকের দিনটাও নিশ্চিন্ত অবসর –
কিন্তু এখন মনে হচ্ছে – সারাদিন শুয়ে বসে খেয়ে গল্প করে ঘুমিয়ে সময় কাটবে কী করে? দ্রুত নিত্যকর্ম সেরে ভল্লার নির্দেশ মতো ছেলেরা বেরিয়ে পড়ল, তিন আহত
বন্ধুকে কাঁধে তুলে নিয়ে।
ছেলেরা ভল্লার বাসায় পৌঁছে দেখল
ভল্লাদাদা আর রামালি ছাড়াও আরও চারজন মুখচেনা কিন্তু অপরিচিত ছেলে বসে বসে কথা
বলছে। ওদের দেখেই ভল্লা বলল, “বাঃ তোরা এসে গেছিস? এক কাজ কর, আহোক সুরুল, কিশনা আর
বিনেশ থেকে যা। বাকিরা গ্রামে ফিরে যা। মইলি, দীপান আর বিশুনকে ওদের বাড়ি পৌঁছে
দিবি আর বড়্বলাকে খবর দিবি। বলবি তোরা আপাততঃ কিছুদিন গ্রামেই থাকবি, কেমন? আজকের
দিনটা পরিবারের সঙ্গে কাটা – কাল থেকে আবার নতুন কাজে লাগতে হবে”।
ছেলেরা চলে যেতে ভল্লা সুরুলদের ডেকে
বলল, “আয় তোরাও বসে পড় জায়গা করে। এদের সঙ্গে পরিচয় করে নে – চারজনেই এসেছে বটতলি
থেকে – ওরাও আমাদের মতোই লড়তে চায়। এখন সকলেই প্রস্তুত হচ্ছে। এদের মহড়ার মাঠ –
এখান থেকে উত্তরে, ক্রোশ দেড়েক মতো দূর হবে, তাই না রে মিলা?
একটু পরেই আমরা সবাই ওদিকে যাবো। হ্যাঁ, যে কথা তখন বলতে বলতে তুই থেমে গেলি জনা...”?
জনা সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “হ্যাঁ
তোমাদের পরশুদিনের আক্রমণের বার্তা চারদিকে ছড়িয়ে পড়তেই – নানারকম প্রতিক্রিয়া
শুনছি ভল্লাদাদা। গ্রামের দীন-দরিদ্র মানুষগুলোর বেশির ভাগ তোমাদের দুহাত তুলে আশীর্বাদ
করছে, গো। বলছে আমাদের দিকেও অমন একটা ভল্লা যদি থাকত তাহলে রাজার কুকুরগুলোর
থোঁতা মুখগুলো জন্মের মতো ভোঁতা করে দিত”।
“আমার নাম সবাই জানল কী করে? তোরাই
বলেছিস নিশ্চয়ই। কী বিপদ হল বল তো, আহোক? এ কথা তো রাজধানীর লোকদের কানেও উঠবে –
তখন তারা আমাকে আর বেঁচে থাকতে দেবে?”
জনা হাসল, বলল, “তোমার এখানে প্রথম
আসার আগে তোমার নাম এবং তোমার কাজের কথা, আমরা কোথায় শুনেছিলাম জানো?”
“কোথায়”?
“আমাদের গ্রাম থেকে দেড় ক্রোশ দূরের
হাটে - কয়েকজন বণিকের কাছে...। তারপরেই আমরা চারজন তোমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলাম”।
“হুঁ তার মানে, আমি এতদিন বিখ্যাত
ছিলাম – এখন আমার সেনাদলও বিখ্যাত হয়ে গেল। সেনাদল বলাটা আমার একটু বাড়াবাড়ি হয়ে
গেল ঠিকই – তবে আস্থানের রক্ষীদের তুলনায় আমার ছেলেরা অনেক বেশি দক্ষ – এ বিষয়ে
আমার কোন সন্দেহ নেই। তবে...”, আহোকদের
মুখের দিকে তাকিয়ে ভল্লা বলল, “সেনা হয়ে উঠতে – আরও কিছু মহড়া শিখতে হবে। আরও কিছু
অভিযানের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে হবে। যাগ্গে সে কথা,
সাধারণ মানুষ ছাড়া আর কাদের কী রকম প্রতিক্রিয়া?”
জনা একটু চিন্তা করতে করতে বলল,
“এতদিন আমাদের যারা সন্দেহের চোখে দেখত, ভল্লাদাদা। তাদের চোখে গতকাল থেকে কেমন
যেন একটা ভয়-ভয় ভাব লক্ষ্য করছি”।
মিলা বলল, “হ্যাঁ ভল্লাদাদা, আমাদের
শুনিয়ে শুনিয়ে অনেকেই ঠাট্টা-বিদ্রূপ করত – বলত রাজধানী থেকে তাড়িয়ে দেওয়া এক
অপরাধীর সঙ্গে ওঠাবসা করে – এই ছোঁড়াগুলোও কালে একএক জন বীর হয়ে উঠবে রে...। হাসত খ্যাঁক
খ্যাঁক করে। আমরা তাদের কাউকেই কোনদিন কিছু
বলিনি – কিন্তু গতকাল সেই লোকগুলিই আমাদের দেখে আড়ালে সরে পড়ছে। একজন তো গায়ে পড়ে
কথা বলল, তোমাদের মহড়া-টহড়া শুনতে পাই ভালই চলছে?”
জনা বলল, “বলিস কী? কে বল তো?”
মিলা বলল, “আরে ওই মগনা ব্যাটা।
গ্রামিকের আমড়াগাছি করে হতভাগা দুটো টাকা-কড়ি বাগিয়ে সাপের পাঁচপা দেখছে...”।
জনা বলল, “দাঁড়া না একবার গ্রামিকের
ষষ্ঠী পুজো হয়ে গেলেই – সব ঠাণ্ডা হয়ে যাবে – যত্তো উচ্চিংড়ের বাচ্চা”।
ভল্লা বলল, “চল আমরা মহড়া মাঠে যাই –
ওখানে বসেই তোদের ওই গ্রাম প্রধানকে জব্দ করার পরিকল্পনাটা করে ফেলি। তোদের যে
বলেছিলাম ওর বাড়ির ভেতরের খুঁটিনাটি তথ্য যোগাড় করতে...”।
“করছে ভল্লাদাদা। বেশ কিছু তথ্য এসে
গেছে – বাকি তুমি যেমন যেমন বলবে সব যোগাড় করে ফেলব”।
ওরা দশজনই রণপায় চড়ে দৌড়ে চলল বটতলির
মহড়া মাঠের দিকে। মহড়া মাঠে পৌঁছে ভল্লা একধারে বসে অন্য ছেলেদের মহড়া দেখতে দেখতে
বলল, “আরে রামালি, নতুন রণপাগুলোতে লোহার খুড়ো আর বল্লমের ফলা লাগানো নেই তো! এঃ
হে ওরা নোনাপুরে ফিরল, ওদের বালিয়াকে পাঠিয়ে দেওয়ার জন্যে, বললে হতো ...”।
রামালি বলল, “তার দরকার কি? আহোকরা
তো ফিরবে, ওরা নতুন রণপা চড়ে চলে যাবে, বালিয়ার ভাটিতে দিয়ে দেবে – এখন তো গ্রামের
লোকেরা সব কিছুই জেনে গেছে...”
আহোক বলল, “যাবার সময় আমরা তিন
চারগাছি হাতে করেও নিয়ে যেতে পারি, কী আছে? জনাভাই তোমাদের বাড়তি রণপা কতগুলো
আছে?”
মিলা বলল, “দশ জোড়া বেশি আছে”।
“ঠিক আছে যাবার সময় আমরা তিনজন মিলে ছ
জোড়া নিয়ে যাবো”।
ভল্লা এই ব্যবস্থায় খুশিই হল, বলল,
“বেশ এদিকটা মিটল – তোদের ঘর কতদূর জনা”?
জনা বলল, “ভিত পর্যন্ত গাঁথা হয়ে
গেছে – এবার দেওয়াল তুলবে। যাবে? চলো না দেখে আসবে - ”।
ঘর-টর দেখে এসে ভল্লারা আবার ফিরে এসে
বসল মহড়ার মাঠে, বলল, “এবার বল তোদের প্রধানের বাড়িটা কেমন?”
জনা বলল, “পূর্ব, দক্ষিণ আর
পশ্চিমমুখো - তিনদিকে ঘর। দুই-চার-দুই মোট আটখানা! তার সামনে বড়ো উঠোন। ঘরগুলো
পাশাপাশি লাগোয়া। তবে রান্নাঘর আর ভাঁড়ার ঘর আলাদা। বাড়ির পিছনদিকে বেশ কিছু ফলের গাছ,
অনেকটা জমিতে আনাজও হয়। রান্নাঘরের পাশ দিয়ে সরু গলিটা ওই আনাজের জমির ভেতর দিয়ে পাছ
দুয়োর পর্যন্ত গিয়েছে। পাছ দুয়োর খুললেই কিছুটা খালি জমি – তারপরেই ঘাট – খিড়কি
পুকুর”।
ভল্লা বলল, “রামালি না আহোক কে আঁকবি - ওই বাড়ির চিত্রটা?”
আহোক বলল, “আমি আঁকছি ভল্লাদাদা, দেখে
নাও ঠিক বুঝলাম কিনা”, কাঠি নিয়ে মাটিতে আঁকতে শুরু করল। মিলা আর জনা অবাক হয়ে
দেখতে লাগল – চোখের সামনে ফুটে উঠতে লাগল প্রধানের বাড়ির পুরো চিত্রটা। আঁকা হয়ে
যেতে ভল্লা বলল, “জনা, বাড়ির সামনের রাস্তাটা কি গলি? গলি হলে সেটা গ্রামের প্রধান
রাস্তা থেকে কতদূরে?”
“গলি নয় ভল্লাদাদা – গ্রামের প্রধান
রাস্তা”।
“উল্টোদিকে কে বা কারা থাকে? পিছনে
পুকুর – বাড়ির বাঁদিকে ডানদিকেই বা কাদের বাড়ি? তাদের সঙ্গে ওই গ্রামপ্রধানের
সম্পর্ক কেমন?”
“বুঝেছি – আমরা আক্রমণ করেছি বুঝতে
পারলে – ওরা বাধা দিতে আসবে কিনা, তাই তো? না ভল্লাদাদা আশেপাশে যারা আছে তারা সকলেই হত দরিদ্র সাধারণ মানুষ। লোকটা কয়েক বছর আগেও ওদের মতোই ছিল – কিন্তু গ্রামিক
হওয়ার পরেই আঙুল ফুলে কলাগাছ। প্রতিবেশীদের অনেককেই বোকা বানিয়ে, ভয় দেখিয়ে, তাদের বাস্তুজমি হাতিয়ে – ওই অতবড় জমি-বাড়ি-পুকুর করেছে। এভাবে চললে, আরও কয়েক বছর পরে ওই পাড়াটাই ওর
হাতের মুঠোয় চলে যাবে...”।
“বেশ, যত সাধারণই হোক তাদের সবাইকে
হাতে রাখার চেষ্টা কর – যাতে ওরা টের পেলেও তোদের কাজে কোনভাবেই যেন নাক না
গলায়...। এবার বল – কোন ঘরে কে থাকে – মানে প্রধান আর প্রধানের বউয়ের ঘর –
প্রধানের কটি ছেলে – তাদের সকলের বিয়ে হয়ে গেছে কিনা - তাদের ঘর কোনগুলো? প্রধানের
বুড়ো বাপ-মা আছে? তাদের ঘর কোনটা? আমার ধারণা – প্রধানের ঘরেই
যাবতীয় টাকাকড়ি সোনাদানা পেয়ে যাবি। একটা বা দুটো সিন্দুকের মধ্যে। বাড়ির ভেতরের
খবর বের করতে কাকে লাগিয়েছিস”?
“ওদের রান্না করে যে পাচক তার সহকারি...”।
“সে তো সর্বদাই রান্নাঘরে থাকবে –
ওকে বল প্রধানের বউ - গিন্নিমাকে বলে ভৃত্যের কাজ নিক – বলবে রান্নার কাজ ভালো
লাগছে না। যে করে হোক প্রধানের ঘরে ঢুকতে হবে। সিন্দুক কোথায় আছে কেমন সিন্দুক –
লোহার না কাঠের – জানতে হবে। আর যদি সিন্দুকের কুঞ্চিকার সন্ধানও পেয়ে যাস তাহলে
তো হয়েই গেল”।
জনা একটু ইতস্ততঃ করে বলল, “তুমি কী ওদের
কারও মৃত্যু চাইছ না?”
ভল্লা বলল, “তোরা কি ওদের নির্বংশ করার
পরিকল্পনা করছিস নাকি?”
জনা বলল, “অতটা না হলেও কিছুটা”।
ভল্লা মাথা নাড়তে নাড়তে গম্ভীর গলায় বলল,
“দ্যাখ ও বাড়ির বাচ্চা-কাচ্চা, মেয়ে-বউ, বুড়োবুড়িদের মেরে কেন হাত নোংরা করবি? মনে
রাখিস সাধারণ মানুষ অকারণ নৃশংসতা ভালভাবে নেয় না। প্রধানকে শেষ কর – ওর ছেলেদের
সবাই কি প্রধানের মতোই শঠ ও তঞ্চক?”
মিলা বলল, “না তা নয়। মেজ আর সেজ
ছেলে বাপের মতো। বড় ছেলের মাথার ব্যামো – হাবা। বাকি তিন ছেলে নিরীহ ভিতু...। বাপ চোখ
বুজলেই - মেজ ভাই ওদের সবাইকেই ঘাড় ধাক্কা
দেবে”।
“তাহলে? সবাইকে মারবি কেন? ওই তিন বাপ-ব্যাটাকে
মার। তাছাড়া গণ্ডগোলের সময় আরও দু একজন হয়তো মারা
পড়বেই – তা যাক – কিন্তু নাঃ নির্বিচারে শিশু, নারী বৃদ্ধ
সকলকে হত্যায় আমার মত নেই...”।
জনা বলল, “ভল্লাদাদা, কথায় আছে শত্রুর শেষ রাখতে নেই – কে বলতে পারে ওই
বংশের কেউ ভবিষ্যতে হয়তো আমাদের মহাশত্রু হয়ে উঠল?”
“হোক না।
ভবিষ্যতে আমরা কি চোখ বন্ধ করে বসে থাকব? নাকি অশক্ত দুর্বল হয়ে পড়ব? ওরকম এক দুজন
উঠতি শত্রু ভবিষ্যতে যেমন জন্মাবে – তেমন আমাদের হাতেই তারা মরবে। কিন্তু সেই আতঙ্কে আমরা এখনই শিশু
ও নারীদের সর্বত্র হত্যা করে বেড়াবো? এ আমি মোটেই মেনে নিতে পারব না, জনা।”
ভল্লা থামতে
কেউ কিছু বলল না। মাথা নীচু করে জনা ও মিলা গভীর চিন্তায় ডুবে রইল। ওদের
চিন্তান্বিত দেখে ভল্লা আবার বলল, “তোরা জনসাধারণের জন্যে লড়াই করছিস – মনে রাখবি
তারা তোদের থেকে ন্যায় বিচার প্রত্যাশা করে। অন্যায়কারীকে হত্যা করা একরকমের বিচার, রাজাও করেন। কিন্তু তাকে সবংশে নির্মূল করাটা কখনোই ন্যায়
বিচার হতে পারে না। রাজাও কখনও তা করেন না। জনগণের মনে বিতৃষ্ণা জাগিয়ে জনগণের
সঙ্গে বেশি দিন চলা যায় না। তোরা ডাকাত নয়, রাজা হয়ে ওঠ, জনা।”
ভল্লা চুপ করে
যেতে, মিলারাও কোন কথা বলল না। সকলেই অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল। বটতলির ছেলেদের মহড়া
কিছুক্ষণ দেখে ভল্লা বলল, “এখন আমরা উঠি রে, জনা – কাল সকালে আবার আসবো…”।
জনা ও মিলা মুখ
তুলে তাকাল ভল্লার দিকে। মিলা বলল, “তোমার উপদেশ আমরা মেনে নিচ্ছি ভল্লাদাদা। তুই কী
বলিস জনা? অপরাধীকে শাস্তি দিতে আমরা শক্ত হাতেই শক্তি ব্যবহার করব। কিন্তু নিরপরাধ
নিরীহ মানুষের জন্যে নয়”।
ভল্লা কিছু বলল
না, হাসল।
মিলা ভল্লার
দুই হাত নিজের মুঠোয় ধরে বলল, “মিলা ঠিকই বলেছে ভল্লাদাদা। গ্রামিকের মতো মানুষগুলোর
দুর্নীতি দেখতে দেখতে ক্রোধে আমরা অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম – তুমি শেখালে ক্রোধ ভাল – কিন্তু
অন্ধ ক্রোধ আমাদের সর্বনাশের দিকে টেনে নিয়ে যাবে। তোমার কথাই অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলবো, ভল্লাদাদা”।
ভল্লা হাত বাড়িয়ে
জনা আর মিলার কাঁধে হাত রেখে, হেসে বলল, “শুধু আমি নই – আমরা সবাই তোদের সঙ্গে আছি”।
বটতলির মহড়ামাঠ
থেকে বেরিয়ে ভল্লার সঙ্গে রামালিরা গেল তাদের মহড়া মাঠে। রণপা থেকে নেমে ভল্লা বলল,
“এই সেই মাঠ – তোদের কত বকেছি, ধমকেছি – মনে পড়ছে? তোরাও প্রত্যেকে এর মাটিতে ঘাম ঝরিয়েছিস
কত…!”
সুরুল বলল,
“সত্যি ভল্লাদাদা, প্রতিজ্ঞা করেছিলাম লড়তে শিখব – আজ মনে হচ্ছে কিছুটা শিখেছি”।
আহোক বলল, “সে
কথা বলতে?”
ভল্লা মাটিতে
বসে বলল, “আয় বোস। আজ কিছু কথা বলার আছে”। সকলে ভল্লার সামনে মাটিতে বসে ভল্লার মুখের
দিকে তাকাল।
“আস্থানের আক্রমণ
হয়ে গেছে – উপানু মরেছে। মরেছে চোদ্দজন প্রধান রক্ষী। চারদিকে বার্তা রটে গেছে – প্রয়োজনে গ্রামের সাধারণ ছেলেরাও
অস্ত্র ধরতে এবং তার ব্যবহার করতে জানে। কিন্তু এরপর - আমরা কী করবো?”
রামালি বলল,
“রাজধানী থেকে আরও বড়ো রক্ষীদল এনে ওরা আমাদের শেষ করতে চাইবে নিশ্চয়ই। তার জন্যে আমাদের
আরও প্রস্তুত হতে হবে”।
ভল্লা সকলের
মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “না। আমার তা মনে হয় না। রক্ষীরা আমাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার
করেছিল – আমরা তার প্রতিশোধ নিয়েছি। কিন্তু রাজধানীর চোখে আমরা মোটেই শত্রু হয়ে উঠিনি। আমরা খুব ক্ষুদ্র
হলেও আমরা এই রাজ্যেরই অধিবাসী। রাজধানী আমাদের শেষ করলে – সমগ্র রাজ্যবাসী সেটাকে
মোটেই ভালো চোখে দেখবে না। অতএব আমার মনে হয় না, রাজধানী সে পথে হাঁটবে। বরং এতদিন
এই অঞ্চলের অভাব-অভিযোগের কথা তারা সব জেনে-বুঝেও – চোখ বন্ধ করে যে ঘুমোচ্ছিল, এই
ঘটনা তাদের সেই ঘুম ভাঙাবে। তারা টের পেয়ে গেছে
– অভাবী প্রজাদের মনে জ্বলতে থাকা ধিকিধিকি ক্ষোভের আগুন – সামান্য
স্ফুলিঙ্গর ছোঁয়া পেলে, এই ভাবেই আবার ঝলসে উঠতে পারে। এখানে হয়েছে, এরপর অন্য
কোথাও – হয়তো চারদিকেই”।
একটু বিরতি দিয়ে
ভল্লা বলল, “আমার ধারণা – রাজধানী নতুন রক্ষীদল তো পাঠাবেই – সে শুধুমাত্র আস্থানের
সুরক্ষার জন্য। তার পাশাপাশি পাঠাবে – একজন জনাধিকারিককেও। সে এসে গ্রামের মানুষের
সঙ্গে কথাবার্তা বলবে। তাদের অভাব-অভিযোগ শুনবে। এবং এই অঞ্চলের উন্নতির জন্যে কিছু
কাজ-কর্ম করবে”।
একটু থেমে ভল্লা
আবার বলল, “একটা কথা মনে রাখিস – হয়তো সেটা তোদের সকলের দুর্ভাগ্য বলেই মানতে হবে –
এই অঞ্চলের মাটি উর্বর নয়, এখানে পর্যাপ্ত বৃষ্টি হয় না। একথাও নিশ্চয়ই মানবি - কারোর
পক্ষেই আচমকা এই মাটিকে উর্বর করে তোলা কিংবা প্রচুর বৃষ্টি এনে ফেলা সম্ভব নয়। সে
দেবরাজ ইন্দ্র এলেও হবার নয়। তাহলে উন্নতিটা আসবে কোথা থেকে?”
ভল্লা সকলের
মুখের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ, তারপর বলল, “তোদের মধ্যে কেউ কেউ অথবা অনেকে - যদি
গ্রাম ছেড়ে বাইরে গিয়ে কিছু কাজ করিস। উপার্জন করে বাড়িতে কিছু অর্থ পাঠাস – তাহলে
অতি সহজেই গ্রামের উন্নতি হতে পারবে। তোদের বাবা-মা-ভাই-বোনেরা অনেকটাই ভালো থাকতে
পারবে। তোদের ঘরদোরের শ্রী ফিরবে”।
আহোক বলল, “কিন্তু
আমরা কী কাজ জানি? আমাদের কাজ দেবে কে?”
“আগে তেমন কিছু
জানতিস না, কিন্তু এখন তো ভালই শিখেছিস”। ভল্লা হেসে বলল।
“লড়াই করতে?”
সুরুল উত্তেজিত হয়ে বলল, “কিন্তু আমরা তো রক্ষীদের হত্যা করে রাজধানীর চোখে অপরাধী।
আমাদের কাজ দেবে – না শূলে চড়াবে!”
“হতভাগা, রাজধানী
কি জানে তুই কটা রক্ষীকে মেরেছিস? আর একজন দক্ষ রক্ষী বানিয়ে তুলতে রাজধানীর কী বিপুল
ব্যয় হয় তোদের ধারণা আছে? তাও তো সব ওই উপানুর মতোই মাথামোটা, একলষেঁড়ে। সেখানে বিনা
পরিশ্রমে, বিনা ব্যয়ে তোদের মতো দক্ষ রক্ষী
পেলে রাজধানী ধেই ধেই করে নৃত্য করবে রে। তোদের নাম তো কেউ জানে না – তোরা তো সেসময়
সবাই ছিলি জুজাক। যাগ্গে সেটা কথা নয় – তোরা পাঁচজন ছাড়া কারা কারা রক্ষীর কাজ করতে
চায় জেনে নে। আমি এবং মারুলা তাদের কাজের ব্যবস্থা করে দেব। তবে হ্যাঁ – বাইরে যেতেই
হবে”।
“বা রে, আর আমাদের
কী হবে?” কিশনা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, “তুমি যা বললে আমাদের তো এখানে কোন কাজই নেই”!
ভল্লা হেসে ফেলে বলল, “তোদের দিয়ে সারাদিন
আমার গা টেপাবো, পা টেপাবো রে, হতভাগা’। তারপর কিশনার কাঁধে হাত রেখে ভল্লা বলল, “তোদের
কাজের কথা কাল বলবো। এখন বাড়ি যা। ছেলেদের সঙ্গে কথা বল। কাল সকালে তোরা চারজন এখানেই
আসবি। কথা হবে। রামালি চল রে, বেলা হয়ে গেল কত… কমলিমায়ের গালাগাল না শুনলে তোর দেখি
খাবার হজম হয় না…”।
চলবে...