ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "
ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১ "
ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "
ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "
ধর্মাধর্ম শেষ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৫/১ "
"ধর্মাধর্ম" গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -
গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২
(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)
অথবা
+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।
[এর আগের পর্বাংশ - "ধর্মাধর্ম - ৫/২০"]
৫.৬.৩ তন্ত্র ধর্মের উৎপত্তি
শিব এবং শক্তির পূজা ভারতের প্রাচীনতম পূজা পদ্ধতি, ঠিক কবে থেকে শুরু হয়েছিল, নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব
নয়। তবে এঁনাদের সকলেই অনার্যদের মাতৃকা দেবী এবং বেশ কিছু অনার্য গোষ্ঠীর মধ্যে
এঁদের পূজার যে বহুল প্রচলন ছিল, তার প্রত্ননিদর্শণ পাওয়া গেছে সিন্ধু সভ্যতার অবশেষ থেকে।
অনুমান করা যায় এই দেবীদের সকলেই নারী যোদ্ধা, হয়তো মাতৃতান্ত্রিক সমাজের
প্রধানা ছিলেন। অথবা বিরুদ্ধ গোষ্ঠীর সঙ্গে লড়াইতে কোন গোষ্ঠীর অধিকাংশ পুরুষের
মৃত্যু হওয়াতে,
সেই গোষ্ঠীর
নারীরাই ভয়ংকর যোদ্ধা হয়ে উঠতে বাধ্য হয়েছিলেন। যার ফলে তাঁরা একটু বেশি মাত্রায়
নৃশংস হয়ে,
নরমুণ্ডমালিনী
এবং হাতে রক্ত-ঝরা কাটা মুণ্ড ধারণ করেছিলেন।
ভারতের অনার্য মানুষের মধ্যে কিছু কিছু মাতৃতান্ত্রিক বা মাতৃকুলীয়
সমাজের অস্তিত্ব যে ছিল, সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। আজও মেঘালয়ের খাসি, জয়ন্তিয়া ও গারো
জনগোষ্ঠীর মানুষদের সমাজ মাতৃতান্ত্রিক। শোনা যায়, কেরালার নায়ার গোষ্ঠীর মানুষদের
সমাজও মাতৃতান্ত্রিক ছিল। এই সমাজের মানুষদের, টিপু সুলতানের এতই উদ্ভট লেগেছিল, তিনি উঠে পড়ে লেগেছিলেন, এই গোষ্ঠীর মানুষদের
নিকেশ করার জন্যে। এই নায়ার গোষ্ঠীর পুরুষরা কিন্তু যোদ্ধা হিসেবে দক্ষিণ ভারতের
ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ জনজাতি। এঁদের উপাস্য দেবতা ছিলেন নাগ বা সর্প। যে
সাপ মহাদেব এবং দেবী তারার অঙ্গভূষণ। পৌরাণিক মতে, দেবী সতীর শবদেহের টুকরো থেকে যে
একান্নটি শক্তিপীঠের সৃষ্টি হয়েছিল, সেগুলি ভারতের একান্নটি অনার্য অঞ্চলের মাতৃকাদেবী, এ কথা নিঃসন্দেহে বলা
চলে। তাঁরা সকলেই দেবী সতীর বিভিন্ন রূপ হয়ে হিন্দুধর্মে অন্তর্ভুক্তা হয়েছেন।
তন্ত্রপুজোর প্রচলন অতি প্রাচীন। আগেই বলেছি, প্রাথমিক ভাবে তাঁদের পুজোর উপচার
এবং পদ্ধতি খুবই সরল ছিল। উপচারের মধ্যে ছিল ফুল-পাতা। নৈবেদ্যর মধ্যে ছিল, মানুষের যা যা খাদ্য তার
সবকিছুই। ফলমূল,
মিষ্টান্ন, ভাত-ডাল-সব্জি-মাছ-মাংস, সাধারণ মানুষের যা যা
প্রিয় খাদ্য,
সবই দেবতার
নৈবেদ্য। আর মন্ত্র ছিল দেবতার কাছে মনের যাবতীয় ইচ্ছে বা স্বপ্ন নিবেদন। এই পূজায়
তাঁরা কিছু প্রতীকও ব্যবহার করতেন, ত্রিভুজ, চতুর্ভুজ আকার, স্বস্তিক এবং নানান চিত্রলিপি – যা দিয়ে প্রকৃতিকে চিনে
নেওয়া যায়,
যেমন পর্বত, গাছ, গাছের পাতা – অশ্বত্থের
পাতা, নদী, নানান পশু-পাখির আকার, এমনকি মানুষের আকারও। এই
প্রতিটি প্রতীকেরই নিদর্শন পাওয়া গেছে সিন্ধুসভ্যতার প্রত্নাবশেষ থেকে।
অনার্য দেবদেবী এবং তাঁদের পূজাপদ্ধতি হিন্দু ধর্মে অন্তর্ভুক্তির
সময়েই তাত্ত্বিক তন্ত্র শব্দের উৎপত্তি হল। সংস্কৃত এই শব্দটির উৎপত্তি, পণ্ডিতেরা বলেন, যে শব্দ থেকে তন্তু এবং
তাঁত শব্দের উৎপত্তি, সেই
শব্দ থেকে। অর্থাৎ এই অর্থ ধরলে, বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর জীবনে ওতপ্রোত জড়িত বিভিন্ন পূজাপদ্ধতির
তত্ত্ব নিয়ে বুনে তোলা একটি তত্ত্বই তন্ত্র। আবার অনেকে বলেন, তত্ত্ব আর মন্ত্র নিয়ে
তন্ত্র। অর্থাৎ অনার্যদের সাধারণ যে মনোবাসনার মন্ত্র ছিল তার সঙ্গে ব্রাহ্মণ্য
তত্ত্ব জুড়ে তন্ত্র শাস্ত্র গড়ে উঠেছিল।
আগেই বলেছি, ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রাথমিক স্তরে, জীবনের তিনটি বর্গ বা লক্ষ্য ছিল, ধর্ম, অর্থ ও কাম। অর্থাৎ ধর্ম
পথে থেকে সুস্থ জীবিকা উপার্জন করা আর সংসার জীবনের সুখ, স্বাচ্ছন্দ্য কামনা, বাসনা উপভোগ করা।
ব্রহ্মলাভ,
ব্রহ্মজ্ঞ
হওয়া বা মোক্ষলাভ বিষয়টা সাধারণের জন্যে নয়, সেটা ছিল তপস্বী বা সাধকদের জন্যে, যাঁরা জন সমাজের বাইরে -
অরণ্যে তপস্যা বা সাধনা করে থাকেন। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বৌদ্ধ এবং জৈনধর্ম এই
মোক্ষলাভ বা মুক্তি বিষয়টাকে ভীষণ জনপ্রিয় করে তুললেন। সেই অনুসরণে ব্রাহ্মণ্য
পণ্ডিতরাও মুক্তি বিষয়টিকে জীবনের লক্ষ্যে স্থির করে দিলেন, চতুর্বর্গ – ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ। বেদ ও
উপনিষদে এই মোক্ষলাভের কথা সবিস্তারে বর্ণনা করাই ছিল। পরবর্তী কালের হিন্দু
পুরাণকাররা ব্রাহ্মণ্য ধর্মের চতুর্বর্গ এবং উপনিষদের মোক্ষলাভের সাধনার পথই
অনুসরণ করলেন,
একটু
অন্যভাবে। ভাগবত ধর্মে বিষ্ণু এবং শৈবধর্মে শিব হলেন পরমপুরুষ বা ব্রহ্ম।
ব্রহ্মত্ব-লাভের মতো বিষ্ণুত্ব-লাভের জন্যে ভক্তি সাধনার কথা আগেই বলেছি, এবার তন্ত্রমতে
শিবত্বলাভের সাধনার কথা বলব।
প্রশ্ন উঠতে পারে, তন্ত্র বা শক্তি সাধনায় তো দেবীদের প্রাধান্য, সেখানে দেবীত্ব লাভ না
হয়ে শিবত্ব লাভ হবে কেন? এর উত্তর, এই সাধনায় দুটোই হবে। কারণ দেবীরা হলেন আদ্যাশক্তি প্রকৃতি
- মহামায়া,
আর শিব হলেন
পরমপুরুষ বা ব্রহ্ম। সাধনার উচ্চতম স্তরে অনুভব করা যাবে শিব ও শক্তি –অর্থাৎ
পরমপুরুষ ও পরমাপ্রকৃতি একাকার হয়ে আছেন।
তন্ত্রশাস্ত্রের বহু গ্রন্থের কথাই শোনা যায়, তার মধ্যে অধিকাংশই অবলুপ্ত হয়ে
গেছে, আমাদের কাল পর্যন্ত এসে
পৌঁছেছে সবথেকে নির্ভরযোগ্য যে গ্রন্থটি তার নাম “মহানির্বাণ তন্ত্র”। এই গ্রন্থের
লেখকের নাম পাওয়া যায় না, তবে এই গ্রন্থের সৃষ্টি কর্তা স্বয়ং শিব ও পার্বতী। তাঁদের
ধর্মতত্ত্বের আলোচনা থেকেই তন্ত্রধর্ম সম্বন্ধে বিশদে জানা যায়।
৫.৬.৪ তন্ত্র সাধনতত্ত্ব
তন্ত্রের শাস্ত্রগ্রন্থ নিয়ে আলোচনার আগে, তন্ত্র সাধনতত্ত্ব বিষয়ে একটু
বিশদে আলোচনা করা যাক, নচেৎ
আধুনিক হিন্দুধর্মের ভিত যে তন্ত্রধর্ম সেটার উপলব্ধি অধরা থেকে যাবে।
আগেই বলেছি নানান তত্ত্ব ও মন্ত্র নিয়ে তন্ত্রের সৃষ্টি। তন্ত্র
তত্ত্বের মূল সাংখ্য দর্শন, যার কথা আগেই বলেছি। পঁচিশটি তত্ত্ব নিয়ে যে সাংখ্য তত্ত্ব, সেখানে আমরা দেখেছি তার
চব্বিশটি তত্ত্বের জ্ঞান সম্যক আয়ত্ত্ব করতে পারলে, পঁচিশতম তত্ত্বটি আপনিই উপলব্ধি
করা যায়,
সেই জ্ঞানই
ব্রহ্মজ্ঞান,
পরমজ্ঞান।
তন্ত্র মতে এই চব্বিশটি তত্ত্বের জ্ঞান অর্জনের জন্যে নিবিড় আধ্যাত্মিক
সাধনার প্রয়োজন,
আর সেই
সাধনার অন্যতম সহায় হল আধ্যাত্মিক কিছু শব্দের বারবার ব্যবহার – এই শব্দগুলিকেই
বীজমন্ত্র বলে,
যেমন, ওঁ, হ্রীং, ক্লীং, বষট্ ইত্যাদি। অতএব
মন্ত্র দিয়ে যে তত্ত্বজ্ঞানের সাধনা, তাকেই তন্ত্র বলে। তন্ত্রদর্শন ছাড়া অন্য দর্শনে মন্ত্রের
ব্যবহার নেই বললেই চলে, কিন্তু এই মন্ত্র ছাড়া তন্ত্র অচল।
তন্ত্র-তত্ত্বের মূল কিন্তু বেদ, উপনিষদ এবং সাংখ্য ও বেদান্ত
দর্শন। বেদের কর্মকাণ্ডে যত যাগ-যজ্ঞের বিধিনিয়ম আছে, তন্ত্র-তাত্ত্বিকেরা নিজেদের মত
করে সে সবই আত্মসাৎ করেছিলেন। উপনিষদের মূল বক্তব্য হল ত্যাগ এবং বিবেক বিচারে
“নেতি” “নেতি[1]” করতে করতে পরমার্থ লাভ। অর্থাৎ পার্থিব সব
বিষয়কে ত্যাগ করতে করতে পরমার্থ সাধনায় প্রবৃত্ত হওয়া। তন্ত্র এই বিষয়টিকেও তাঁদের
তত্ত্বে যুক্ত করে নেওয়ায়, বৈরাগ্যও তন্ত্রের একটি তত্ত্ব হয়ে গেল। রাজযোগের যে দর্শন
শরীর ও মনকে পবিত্র করা, তন্ত্র সেটাও গ্রহণ করেছে। পুরাণের প্রধান দুটি বৈশিষ্ট্য
হল বৈধী ভক্তি এবং পরাভক্তি। বৈধী ভক্তি আনুষ্ঠানিক, যেমন গঙ্গা স্নান, তুলসী পাতা খাওয়া, চন্দনের তিলক আঁকা, ষোড়শোপচারে পূজা করা, ইত্যাদি। আর পরাভক্তি হল, ঈশ্বরে পরম আস্থা, অহৈতুকী নিঃশর্ত ভক্তি।
তন্ত্র এই দুই ভক্তির মধ্যে পরাভক্তিকে গ্রহণ করেছে, তন্ত্রের ভক্তি ঈশ্বরকে নিবিড়
ভালোবাসা। খুব সংক্ষেপে বললে, তন্ত্রতত্ত্ব অনুযায়ী, তন্ত্রসাধককে পার্থিব বিষয়সমূহ
ত্যাগ করে সাধনা করতে হবে, ঈশ্বরের কাছে নিজেকে সমর্পণ করতে হবে এবং আকুল ভক্তিতে
ঈশ্বরের কৃপা প্রার্থনা করতে হবে।
তন্ত্রমতে জীবনের উদ্দেশ্য ভোগ আর অপবর্গ। ভোগ মানে এই জগতের ভোগ আর
অপবর্গ মানে মুক্তি বা মোক্ষ। এই ব্যাপারেও তন্ত্রের সঙ্গে বেদ বা মহাভারতের কোন
পার্থক্য নেই। বেদ বা মহাভারত বলেছেন, জীবনের উদ্দেশ্য চারটে– ধর্ম, অর্থ, কাম আর মোক্ষ। তন্ত্র বলছে, মোক্ষ ছাড়া সবকিছুই ভোগ।
তন্ত্রমতে যাঁরা সাধনা করেন, একই সাধনায় তাঁরা ভোগ এবং অপবর্গ দুটোই পেতে পারেন, শুধু সংকল্প স্থির করতে
হবে। একটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা বুঝতে সুবিধে হবে। শ্রীশ্রী চণ্ডীতে আমরা দেখি
রাজা সুরথ এবং বৈশ্য সমাধি একই দৈবীসূক্তম্ মন্ত্র জপ করতে লাগলেন। দীর্ঘ সাধনার
পর দেবী শ্রীচণ্ডী দুজনকেই বর দিতে আবির্ভূতা হলেন। রাজা সুরথ বললেন, আমি সমগ্র ভূমণ্ডলের রাজা
হতে চাই,
দেবীর বরে
তিনি তাই হলেন,
অর্থাৎ রাজা
সুরথের ভোগ লাভ হল। অন্যদিকে বৈশ্য সমাধি বললেন, আমি অন্য কিছু চাই না, শুধু মুক্তি চাই, দেবী তাঁকে মুক্তিই দিলেন, অর্থাৎ তাঁর অপবর্গ লাভ
হল। অতএব তন্ত্রমতে মন্ত্র এবং সাধনা একই থাকবে, শুধু সংকল্প স্থির করতে হবে।
পুরাণের থেকে তন্ত্রের আরেকটি পার্থক্য হল, পুরাণে অনেক ক্ষেত্রেই বলা আছে, ঈশ্বরের অহেতুক করুণা বা
কৃপা হলেও মুক্তি হয়ে যায়। যেমন অজামিলের কাহিনী আছে, অজামিল জীবনে কোনদিনই
সাধনা-টাধনার ধার ঘেঁষেননি, তিনি শুধু নিজের পুত্রের নাম রেখেছিলেন “হরি”। মৃত্যুকালে
তিনি ব্যাকুল কণ্ঠে পুত্র হরিকে ডেকেছিলেন, “হরি, ও হরি, আমার পাশটিতে একবার আয়” - তাতেই
অজামিলের মুক্তি হয়ে বৈকুণ্ঠলোক লাভ হয়েছিল, কারণ তিনি মৃত্যুকালে “হরি” নাম
করেছিলেন! তন্ত্র এই ফাঁকি স্বীকার করে না।
তন্ত্র সাধন তত্ত্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল প্রাণবায়ু বা প্রাণ এবং
নাড়ী। উপনিষদ বলছে, প্রাণ পাঁচটি – অপান, প্রাণ, সমান, ব্যান, উদান। পায়ু ও উপস্থে যে
প্রাণবায়ু অবস্থান করে, তার নাম অপান। চোখ, কান, নাক ও মুখে প্রাণ অবস্থান করে এবং
দুইয়ের মাঝখানে অর্থাৎ নাভি মণ্ডলে অবস্থান করে সমান। আমরা যে খাদ্য গ্রহণ করি, তাকে পরিপাক করে, শরীরে শক্তি ও পুষ্টি
বিধান করে সমান বায়ু। আমাদের আত্মা
অবস্থান করেন আমাদের হৃদয়ে। সেই হৃদয়ে একশ একটি নাড়ী আছে, সেই নাড়ীর প্রত্যেকটিতে আবার
একশটি করে শাখা নাড়ী আছে। প্রত্যেক শাখা নাড়ীতে আছে বাহাত্তর হাজার করে প্রতিশাখা
নাড়ী। তার মানে আমাদের সারা শরীরে মূল নাড়ী ১০১টি; শাখা নাড়ী = ১০১ x ১০০ = ১০,১০০; প্রতিশাখা নাড়ী = ১০,১০০ x ৭২০০০ = ৭২,৭২,০০,০০০। অতএব মোট নাড়ী
সংখ্যা = ৭২,৭২,১০,২০১![2] এই সমস্ত নাড়ীর মধ্যে অবস্থান
করে ব্যানবায়ু অর্থাৎ আমাদের সারা শরীরেই ব্যানবায়ু ব্যাপ্ত রয়েছে। এর মধ্যে
মূলনাড়ীর ঊর্ধমুখী একটি নাড়ীতে উদান বায়ু অবস্থান করে, এই উদানবায়ুই আমাদের পুণ্যকর্ম
থেকে পুণ্যলোক,
পাপকর্ম
থেকে পাপলোক এবং উভয়কর্ম থেকে মনুষ্যলোক প্রাপ্ত করায়। ঊর্ধমুখী ওই নাড়ীকেই
তন্ত্রে সুষুম্না বলে।
তন্ত্র সাধন পদ্ধতিতে প্রাণায়াম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শরীরের ভিতরে
প্রাণবায়ু গ্রহণ অর্থাৎ পুরক, শরীরে তাকে রুদ্ধ করা অর্থাৎ কুম্ভক এবং শরীর থেকে সেই
বায়ু ত্যাগ করা অর্থাৎ রেচকের পদ্ধতিকেই প্রাণায়াম বলে। তন্ত্রে তিনটি নাড়ীও খুব
গুরুত্বপূর্ণ – ইড়া, পিঙ্গলা, সুষুম্না। মেরুদণ্ডের
কেন্দ্রে যে সূক্ষ্মনাড়ী তার নাম সুষুম্না, তার বাঁয়ে থাকে ইড়া আর ডানদিকে
পিঙ্গলা। সুষুম্নার শুরু মূলাধার থেকে – মেরুদণ্ডের শেষ প্রান্তে গুহ্যের কাছাকাছি
জায়গায়। আবার এই মূলাধারেই থাকে কুণ্ডলিনীশক্তি। তন্ত্র মতে আমাদের সাধারণ অবস্থায়
এই কুণ্ডলিনীশক্তি সাপের মতো কুণ্ডলি পাকিয়ে ঘুমিয়ে থাকে, সেই সময় মানুষের মন
সুখ-দুঃখ-শোক-আনন্দ-কামনা-বাসনায় জর্জরিত থাকে। সাধনা শুরুর সঙ্গে এই কুণ্ডলিনী
জেগে ওঠে এবং সুষুম্না পথে ওপরের দিকে যাত্রা শুরু করে।
চলবে...
[1] সন্ধি
বিচ্ছেদে নেতি শব্দ হয় ন + ইতি। অর্থাৎ সাধক নিজের চারপাশে এবং তাঁর অন্তরেও
ব্রহ্মের স্বরূপ সন্ধান করতে একেকটি বিষয় চিন্তন করবেন, আর একসময় উপলব্ধি করবেন, না এটি নয় – ন ইতি।
এইভাবেই ধীরে ধীরে তিনি পৌঁছে যাবেন তাঁর লক্ষ্যে এবং যখন উপলব্ধি করবেন, “এই আত্মাই ব্রহ্ম” অথবা “আমিই ব্রহ্ম” তখনই তাঁর মোক্ষ ঘটে
যাবে।
[2] প্রশ্নোপনিষদ
– তৃতীয় প্রশ্নের ৫ থেকে ৭ সংখ্যক শ্লোক – অনুবাদঃ লেখক।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন