বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৪৪

 প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

 তৃতীয় ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ "

পঞ্চম ধারাবাহিকের শুরু - " স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "; "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "




[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?] 


 


৪৯

 

রাত্রে খাওয়া-দাওয়া করে মারুলা গতকাল আস্থানে ফিরে যায়নি, ভল্লাদের সঙ্গেই ছিল। আজ খুব ভোরে দুজনে রণপা চড়ে বেরিয়ে গেল। কোথায় যাচ্ছে বলল না, যাবার সময় রামালিকে বলল, কালকের কথা মতো নোনাপুরের মাঠে চলে যাবি – ওখানেই আমরা চলে আসব ঠিক সময় মতো”।

অস্ত্র ভাণ্ডার থেকে বেরিয়ে, ভল্লা আর মারুলা গেল আস্থানে। আস্থানের দরজায় এখন পাহারা দেয় শষ্পকের ব্যক্তিগত রক্ষীরা। তারা ভল্লাকে না চিনলেও, মারুলাকে চেনে। শিবিরের ভেতরে ঢুকে মারুলা গলা তুলে বলল, “মান্যবর আপনি ডেকেছিলেন, আমরা এসেছি”।

শষ্পক তাঁর কক্ষ থেকে বেরিয়ে এসে ভল্লাকে দেখে হাসলেন, “তোমরা আস্থানের বাইরে থাকো – আমি আসছি – এখানে সব আলোচনা করা যাবে না”।

ভল্লা আর মারুলা আস্থানের বাইরে গিয়ে রাজপথের ধারে দাঁড়াল। একটু অপেক্ষার পরেই শষ্পক আস্থান থেকে বেরিয়ে ওদের কাছে এগিয়ে এলেন। মারুলা এবং ভল্লা দুজনেই অভিবাদন করল, উত্তরে শষ্পক ভল্লার হাত ধরে বললেন, “তুমি খেলা একটা করে দেখালে বটে, ভল্লা – গোটা রাজ্যবাসী চমকে গেছে…চলো হাঁটতে হাঁটতে কথা বলি”।

ভল্লা বলল, “কিন্তু মান্যবর, রক্ষীদের কাউকে নিলেন না, আপনার নিরাপত্তা?”

শষ্পক হাসলেন, বললেন, “তোমাদের মতো দুজন বন্ধু থাকলে নিরাপত্তার চিন্তা কি?”  কিছুটা এগিয়ে শষ্পক দাঁড়ালেন, বললেন, “এ জায়গাটা বেশ নির্জন – কথাবার্তাগুলো এখানেই সেরে নেওয়া যাক”। ভল্লা আর মারুলা চুপ করে তাকিয়ে রইল শষ্পকের দিকে।

শষ্পক ভল্লাকে বললেন, “মারুলা নিশ্চয়ই তোমাকে বলেছে, তোমার ছেলেদের নিয়ে এরপর কী করবে ভল্লা?”

ভল্লা বলল, “মারুলার কাছে আপনার প্রস্তাব শোনার পরেই, আমি ছেলেদের বলেছি – আজ সকালে ওরা জানাবে। আপত্তি হওয়ার কোন কারণ তো নেই, মান্যবর – তবে ওরা একটু ভয় পাচ্ছে…”।

“যে আস্থানের রক্ষীদের ওরা মারল – সেই আস্থানেই ওদের রক্ষী হয়ে নিয়োগ – অবিশ্বাস এবং ভয় করার কথাই তো। বুঝিয়ে বল…দেখ কী হয় – অন্ততঃ জনা দশেক ছেলে আমার এখনই চাই – আগামী কাল থেকে হলেও আপত্তি নেই…”

“কিন্তু মান্যবর, রাজধানীর মতামত নিয়েছেন? রাজ্য সুরক্ষা মন্ত্রক এই বার্তা পেলে উন্মাদ হয়ে যাবে যে!”

“যাক না। আমি কী করবো? এই আস্থানের কোষাগারে এখন কত টাকা আছে – সঠিক না জানলেও অনুমান করতে পার তো? আমার ওই কটা দেহরক্ষীদের পক্ষে তার সুরক্ষা করা সম্ভব? তোমার বটতলি গ্রামের চেলারা অস্ত্র কেনার অর্থ যোগাড় করছে – ওদিকের ধনীদের বাড়ি ডাকাতি করে। তাদের পক্ষে এই আস্থান তো এখন ফাঁকা মাঠ। আমার তো রাত্রের ঘুম চলে গেছে ভল্লা”। একটু বিরতি দিয়ে আবার বললেন, “উপানুর দলকে যমের দুয়ারে পাঠিয়ে তুমি আমাকে যেমন নিশ্চিন্ত করেছ – কিন্তু অন্য দিকে দুশ্চিন্তা বাড়িয়েও দিয়েছ বহুগুণ। রাজধানীতে দিনে দুবার পত্র লিখে পাঠাচ্ছি – তাতে আমার সমস্যা তো মিটছে না। আমার ধারণা ওখান থেকে নতুন রক্ষীদল এখানে আসতে মাসখানেক লাগবেই”।

মারুলা বলল, “মাস খানেক? না না মান্যবর, সাত-দশদিনের মধ্যে ঠিক এসে যাবে…”।

ভল্লা বলল, “নারে মান্যবর সঠিক বলেছেন। রক্ষীসর্দার সহ এতগুলো রক্ষী মারা গেল – সে নিয়ে মন্ত্রকগুলির মধ্যে – কার দোষ - কার দায় – সেই নিয়েই রীতিমতো চাপান-উতোর চলবে কিছুদিন… তারপর মহামন্ত্রীর হস্তক্ষেপে সুরক্ষা মন্ত্রক নড়াচড়া শুরু করবে। তারপর মন্ত্রক ঠিক করবে - কোন সর্দারকে কোথা থেকে তুলে এখানে পাঠাবে। সে সর্দার খবর পেয়েই এখানে লাফিয়ে চলে আসবে তেমনও নয়। উপানুদের মৃত্যুর কথা শুনলে হয়তো আসতেই চাইবে না। আসতে চাইলেও – তারা বলবে – এতদূরে যাবো…কবে আবার ফেরা হবে কে জনে - কিছুদিন বাড়ি থেকে ঘুরে আসি…এসব তো তুই জানিস, মারুলা? মান্যবর মাসখানেক বললেন, তার বেশি লাগলেও আমি আশ্চর্য হবো না”।

শষ্পক বললেন, “একদম বাস্তব চিত্র ভল্লা – এমনটাই ঘটবে”।

ভল্লা একটু চিন্তা করে বলল, “আপনার পরিস্থিতি বুঝতে পারছি, মান্যবর। আমি দেখছি – আগামীকাল সকালে পনের জন ছেলেকে যদি পাঠাতে পারি – তাদের সাতজন থাক দিনে আর রাত্রে থাক আটজন – আর মারুলা, আপাততঃ তুইই কদিনের জন্যে ওদের সর্দার হয়ে যা – নতুন ছেলে – কাজের ধরনটা ওদের বুঝিয়ে দিতে হবে তো”।

“বাঃ, এতো খুব ভালো ব্যবস্থা, আমি অনেকটাই নিশ্চিন্ত হতে পারব। আর আস্থান থেকেই আমি ওদের নিয়মিত মাসোহারার ব্যবস্থা করে দেব – মাসে চার তাম্র-মুদ্রা – রাজধানীর রক্ষীদেরও তাই দেওয়া হয়”।

“সে ঠিক আছে, কিন্তু দুটো সমস্যা আছে, মান্যবর,” ভল্লা বলল।

শষ্পক উদ্বিগ্ন স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন, “কী সমস্যা, ভল্লা?”

“প্রথম, রাজধানী থেকে রক্ষীদল এলে ওরা কী করবে?”

“সে ব্যবস্থা আমার ওপর ছেড়ে দাও। রাজধানীতে আমি বলে দেব – রক্ষীদল না পাঠাতে। ছেলেরা আমার সঙ্গেই থাকবে – এখান থেকে অন্য আস্থানে। কিন্তু তোমার ছেলেরা যদি কদিন পরে আচমকা পালিয়ে যায় – তাহলে কিন্তু আমার দুকূলই যাবে”।

“তার দায়িত্ব আমার, মান্যবর, ও নিয়ে ভাববেন না। তবে আমার দ্বিতীয় সমস্যা, দিনে-রাতে, ছেলেরা এখানে খাবে কোথায়?” ভল্লা বলল।

শষ্পক বললেন, “এ উপায় তো আমার হাতেও নেই। গ্রামে কোন লোকজন নেই – অন্ততঃ দুজন – যারা পনের-কুড়িজনকে রোজ রেঁধে খাওয়াতে পারবে?”

ভল্লা হেসে ফেলল, বলল, “গ্রামে মেয়েরাই রান্নার কাজ করে, পুরুষরা খায়। শহরের কিছু পুরুষ চটিতে বা পান্থশালায় রান্নার কাজ করে। বীজপুরের জনাইকে একবার বলে দেখা যায়, মান্যবর – ও কোন ব্যবস্থা করতে পারে কিনা। আপনি চিন্তা করবেন না, মান্যবর, কিছু একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে”।

শষ্পক হেসে বললেন, “সে আমি জানি – আপনি একবার দায়িত্ব নিলেই ব্যস্‌ - নিশ্চিন্ত। কিন্তু আমার আরও একটি সমস্যা আছে – ঘোড়াগুলোর কী হবে? আটটি ঘোড়া। আমার একটি -  তাকে নিয়ে আমি রোজই দুবেলা এদিক সেদিক একটু ঘুরে আসি – কিন্তু বাকি সাতটা? হাঁটা-চলা না করলে ওদের তো বাত ধরে যাবে। মারুলাকে মাঝে দুদিন বীজপুরে পাঠিয়েছিলাম ঘোড়া দিয়ে…”।

ভল্লা মারুলার দিকে তাকাল, মুচকি হেসে বলল, “আমরা যদি সাতটা ঘোড়া থেকে - ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দুটো – তিনটে রোজ নিয়ে যাই, মান্যবর – ছেলেদের ঘোড়ায় চড়াটাও শিখিয়ে ফেলতাম”।

শষ্পকও হাসল, “আমার আপত্তি নেই। এখনই নিয়ে যাও। চলো, অনেকক্ষণ হল, এবার ফেরা যাক, নাহলে রক্ষীরা আমাকে খুঁজতে এখানে চলে আসবে…”।

“হ্যাঁ চলুন। আগামী কাল সকালে ছেলেরা আসবে – আপনার রক্ষীদের বলে রাখবেন, মান্যবর – তা নাহলে ভয়ংকর ভুল বোঝাবুঝি হয়ে উঠতে পারে – আর মারুলা তুই দরজার বাইরে অবশ্যই অপেক্ষায় থাকবি…”

“ভাল কথা মনে করিয়েছ, ভল্লা। রক্ষীরা এমনিতেই বেশ আতঙ্কে আছে – সকাল সকাল হঠাৎ জনা পনের ছেলেকে দরজার সামনে দেখলে, কেলেঙ্কারি কাণ্ড হয়ে উঠতে পারত”।    

 

তিনটে ঘোড়া নিয়ে নোনাপুর মহড়া-মাঠে পৌঁছে ভল্লা আর মারুলা দেখল – ছেলেরা বসে আছে তাদের অপেক্ষায়। রামালি, সুরুলরাই শুধু নয় – তাদের দলের প্রায় সবাই।

সুরুল উঠে দাঁড়িয়ে উত্তেজিত স্বরে বলল, “ভল্লাদাদা এটা তো উপানুর ঘোড়া – তুমি পেলে কোথায়?”

ভল্লা নিজের ঘোড়াটার দিকে আরেকবার তাকিয়ে বলল, “তাই নাকি? তা তো জানতাম না। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঝিমোচ্ছিল সবকটা…নিয়ে এলাম। ঘোড়ায় চড়া শিখবি?”

একথায় সকলেই লাফিয়ে উঠল – ঘোড়ায় চড়া শিখবো!

ভল্লা হাসতে হাসতে হাত তুলে বলল, “আরেঃ – আজই সবাই শিখে ফেলবি নাকি – তিনটে তো মোটে ঘোড়া – হবে পালা করে হবে”। ভল্লা আর মারুলা ঘোড়া তিনটেকে গাছের গুঁড়ির সঙ্গে বেঁধে রেখে মাঠের ধারে বসল। ঘোড়া তিনটে ঘাড় নামিয়ে ঘাসের ডগা ছিঁড়ে ছিঁড়ে যখন খেতে লাগল – সেই দৃশ্যও ছেলের দল মোহিত হয়ে দেখতে লাগল। তাদের স্বপ্ন এভাবে মাটিতে নেমে আসতে পারে? বিশ্বাসই হয় না।

ভল্লা ছেলেদের মুখের দিকে তাকিয়ে, বেশ মজা পেল, বলল, “তোরা এলি কেন? তোরা কী জানতিস – আমরা আজ ঘোড়া নিয়ে আসব?”

বিনেশ হাসতে হাসতে বলল, “তা নয় ভল্লাদাদা, ওরা সবাই রক্ষীর কাজ করতে উৎসাহী। কিন্তু ওদের বাড়ির লোক কেউ বিশ্বাসই করছে না – বলছে, আস্থানের রক্ষীদের তোরা মারলি – আর সেখানেই তোদের কাজে নেবে? এ কখনও হতে পারে? ওদের বক্তব্য তুমি নিজে গিয়ে বললে, বাড়ির লোক মনে হয় মেনে নেবে”।      

  ভল্লা হাসল, বলল, “সে না হয় যাবো, বিকেলের দিকে। কিন্তু তার আগে কয়েকটা কথা স্পষ্ট করে বলে নিই। তোদের মাসোহারা হবে চার তাম্র মুদ্রা”।

ছেলেদের মধ্যে অনেকেই আশ্চর্য হয়ে বলল, “প্রতিমাসে – চার তাম্র মুদ্রা?”

ভল্লা মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বলল, “হ্যাঁ। কিন্তু তার কয়েকটা নিয়ম আছে – সেগুলো না মানলে কিন্তু কাজ তো যাবেই – কিছু কিছু ক্ষেত্রে শাস্তিও হতে পারে”। এর পর ভল্লা শষ্পকের বলা কাজের নিয়মগুলো বুঝিয়ে দিল ছেলেদের।  

 ছেলেরা আশ্চর্য স্বপ্নে তখন বিভোর, সবাই ঘাড় নাড়ল সম্মতিতে।

ভল্লা বলল, “তোদের দলের সর্দার কে হবে? তোরাই ঠিক করে নে। তার কথা কিন্তু তোদের সকলকে মানতে হবে”।

ছেলেরা নিজেদের মধ্যে কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে বলল, “দেবান”।

দেবান উত্তেজিত হয়ে বলল, “আরেঃ আমি সর্দারির কী জানি? পাগল হয়েছিস নাকি তোরা?”

মারুলা বলল, “ভয় পাস না। সর্দারি করার কাজটা আমি তোকে বুঝিয়ে দেব, দেবান, চিন্তা করিস না”।

ভল্লা বলল, “সবাই রাজি?”

“রাজি”।

“তাহলে কাল সকালেই দেবানের সঙ্গে তোরা চোদ্দজন রণপা চড়ে আস্থানে চলে যাবি। দরজার বাইরে থাকবে মারুলাদাদা। ও তোদের ভেতরে নিয়ে গিয়ে – থাকার জায়গা এবং কাজের কথা সব বুঝিয়ে দেবে। ঠিক আছে?”

“ঠিক আছে”।

“বেশ এখন তোরা বাড়ি যা। বাড়ি গিয়ে বড়োদের সঙ্গে কথা বল। আমি বিকেলে যাবো – নোনাপুরে এবং সুকরাতেও…”।     

         

ছেলের দল চলে যেতে আহোকরা অধীর আগ্রহে ভল্লার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তাদের দলের অনেকেরই তো বেশ একটা গতি হয়ে গেল, কিন্তু তাদের কী হবে?

তাদের মনের কথাটা রামালিই শুরু করল, “আমাদের দলে মোট বত্রিশজন রয়েছি ভল্লাদাদা। তার মধ্যে ওরা পনের জন – আর আমরা পাঁচজন। তাছাড়াও থাকছে – আরো বারো জন। আমাদের আর ওই বারো জনের কী হবে”?

“বারো জন নয় বাকি রইল নজন আর তোরা আটজন। মইলি, দীপান আর বিশুনের কথা ভুলে গেলি নাকি? ওরা সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতেই হবে। ওই ন’জনও দু-পাঁচদিনের মধ্যে রক্ষী হিসেবে কাজ করবে। অবশ্য সেটা অনেকটাই নির্ভর করবে, এই পনেরজনের ওপর। ওরা যদি কোন গণ্ডগোল না পাকায় কিংবা পালিয়ে না আসে – তাহলে বাকি নজনও ওদের সঙ্গে যোগ দেবে”।

সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে ভল্লা হাসল, বলল, “তোদের আটজনের কী হবে? খুব চিন্তায় রয়েছিস না? তোদের আটজনের মধ্যে সর্দার হবে রামালি – এটা আমিই ঠিক করে দিলাম। তোদের কিছু বলার আছে? মনে কোন সন্দেহ হচ্ছে? থাকলে এখনই বলে ফেল”।

আহোক বলল, “না ভল্লাদাদা, আমাদের মধ্যে রামালিই যে সবার থেকে ভালো যোদ্ধা – সে কথা আমাদের দলের সবাই মানি”।

“বাঃ এই বিশ্বাস আর ভরসা যেন সর্বদা থাকে। আমিও মানি রামালি সবার থেকে ভালো, কিন্তু তোরা বাকি সাতজন – বিশেষ করে আহোক, সুরুল, বিনেশ আর কিশনা – তোরাও যথেষ্ট দক্ষ এবং বুদ্ধিমান, ঠাণ্ডা মাথার কাজের ছেলে। তোরা আটজন এই অঞ্চলের পুরো কাজটা দেখবি। কী কাজ? এক এক করে বলি,

নতুন নতুন ছেলেদের নিয়ে ভালো রক্ষী হওয়ার মতো দল তৈরি করতে হবে।

এর সঙ্গে বটতলির এখনকার ছেলেদের এবং আরও নতুন ছেলেদেরও তৈরি করতে হবে।

বটতলির ছেলেরা ওদের রাজ্যে ওদের মতো কাজ করবে – তার মধ্যে নাক গলাবি না – তবে প্রয়োজন হলে ওদের কাজের পরিকল্পনা বানাতে আমরা পরামর্শ দেব। যেমন গতকাল বলছিলাম।

বটতলির ছেলেরা আমাদের যেমন যেমন টাকা-পয়সা দেবে, আমরা সেই অনুযায়ী ওদের অস্ত্র-শস্ত্র দেব।

তবে এই রাজ্যে বটতলির ছেলেরা যেন কোন গণ্ডগোল পাকাতে না আসে - সেদিকেও তীক্ষ্ণ লক্ষ্য রাখবি।

 

এবার খুব মন দিয়ে শোন, কয়েকটা বিষয় কখনও করবি না। তোরা যতটা শিখেছিস – সবটা বটতলির ছেলেদের কিংবা নতুন রক্ষী ছেলেদের শেখাবি না। কিছুটা কম শেখাবি।

বিশ্বাস করে – আমাদের ভেতরের কোন কথাই কাউকে বলবি না – সে বটতলির ছেলেরা হোক, রক্ষী ছেলেরা হোক কিংবা তোদের বাড়ির লোকই হোক।

আর আশা করব – নিজেদের মধ্যে কোন রকম বিশ্বাসঘাতকতা করবি না। কারও মনে কোন সন্দেহ হলে বা বুঝতে না পারলে – সবাই মিলে বসে ভুল বোঝাবুঝি মিটিয়ে নিবি। তা নাহলে দল ভেঙে যাবে – শেষ হয়ে যাবি। আবার সেই অসহায় সাধারণ মানুষ হয়ে যাবি। 

আর সবার ওপরে মাথায় রাখবি নিজ নিজ গ্রামের – নোনাপুর, সুকরার - মানুষরা যাতে ভালো থাকে – ধীরে ধীরে গ্রামের যেন উন্নতি হয়।

আপাতত যেটুকু মাথায় এলো বললাম। তোরা নিজেরাও কথাগুলো চিন্তা কর। আমরা সর্বদাই একসাথে থাকবো – আরো অনেক কথাই হয়তো হবে”।  


চলবে...




কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নতুন পোস্টগুলি

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৪/৫

 এই সূত্রে - "    ঈশোপনিষদ "  এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ " এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও...