রবিবার, ২৫ অক্টোবর, ২০২৬

স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১০

 প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

তৃতীয় ধারাবাহিক উপন্যসের প্রথম পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ " 

    পঞ্চম ধারাবাহিক উপন্যাস প্রথম পর্ব - "স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "

সম্পুর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "; "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "





মুখবন্ধঃ 
[১৯৪৭ সালের ১৫ই আগষ্ট মধ্যরাত্রে বৃটিশ অপশাসন থেকে আমরা মুক্ত হয়েছি। আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। সেই মাহেন্দ্রক্ষণটিকে স্বাগত জানাতে গিয়ে নেহরুজির বক্তব্যের প্রথম বাক্যটি ছিল, “Long years ago we made a tryst with destiny, and now the time comes when we shall redeem our pledge, not wholly or in full measure, but very substantially”.। আজ স্বাধীনতার আশিতম বছরে পা রেখে, সত্যিই কি আমরা পেরেছি এবং পারছি আমাদের যাবতীয় pledge redeem করতে? এক কল্পিত স্বাধীনতা সংগ্রামীর সঙ্গে আজকের জেন-জি তরুণের কথোপকথনে এই উপন্যাস তুলে ধরবে আমাদের যাবতীয় পাওয়া-না পাওয়ার কাহিনী।]

৩০শে জুলাই, ২০২৬, রবিবার সকাল, নটা পনের

 প্রবীণবাবু আর নবীনবাবু ছাড়া, জলখাবারে সবার পাতেই লুচি পড়ল। প্রবীণবাবুদের ডাক্তারের নিষেধ আছে, ওঁনারা রুটি খান।  

অবিনবাবু লুচি ছিঁড়তে ছিঁড়তে বললেন, “কতদিন পরে গরম গরম লুচি খাচ্ছি। তা তোরা লুচি খাস না কেন?”

প্রবীণবাবু বললেন, “এই বয়েসে ভাজাভুজি খেতে সব ডাক্তারই মানা করেন...”।

প্রবীণবাবুর কথা শেষ হবার আগেই অবিনবাবু প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন, “এ আবার কী? এ লুচি ঘিয়ে ভাজা নয়? কিসে ভাজা হয়েছে, ছ্যা, ছ্যা, কি বিটকেল গন্ধ...”। তিনি আলুচচ্চড়ি দিয়ে সবে লুচির প্রথম টুকরোটা মুখে তুলেছিলেন।

তিৎলি পাশেই দাঁড়িয়ে পরিবেশন করছিল, অবাক হয়ে বলল, “কেন সাদা তেল দিয়ে ভাজা হয়েছে। আপনি খান না”?

অবিনবাবু বেশ বিরক্ত হয়ে বললেন, “তেল দিয়ে লুচি ভাজা হয়? কি তেল নারকেল না সরষের তেল? সাদা তেলটা কী বস্তু?”

নবীনবাবু বললেন, “সাদা তেল মানে সূর্যমুখী তেল, সান ফ্লাওয়ার অয়েল। এখন এটাই তো চলে...”।

অবিনবাবু দুহাতে ঠেলে প্লেট সরিয়ে দিলেন, বললেন, “আমাকে বরং ওই রুটিই দাও দুখানা... এ লুচি নিয়ে যাও মা। আমাদের বাগানে প্রচুর সূর্যমুখী ফুল হত। সেই ফুল দিয়ে যে তেল হয়, আর সেই তেলে যে লুচি ভাজা হবে – একথা কোনদিন স্বপ্নেও ভাবিনি। তোরা ঘি খাস না কেন?”

নবীনবাবু বললেন, “একে তো ঘিয়ের আকাশ ছোঁয়া দাম। তার ওপর ডাক্তারদের কড়া বিধান ঘি খেলে কোলেস্টোরল বাড়ে! হার্টের অসুখ করে।”

তিৎলি নতুন প্লেটে দুটো রুটি আর আলু চচ্চড়ি দিতে অবিনবাবু খেতে শুরু করলেন, তারপর বেশ বিদ্রূপের সুরে বললেন, “বাচ্চা ছেলেমেয়েরা বাপ-মায়ের কোলে ওঠে, ঘি খেলে তোদের কোলে কী ওঠে বললি?”

নবীনবাবু সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর ভাবে বললেন, “কোলেস্টোরল, মেডিক্যাল টার্ম”।

অবিনবাবু বললেন, “জানি না, বাপু – তোদের এ কোল কোন কোল। তবে ছোটবেলায় মা ঠাকুমাদের মুখে শুনেছি – মাংসে মাংস বৃদ্ধি ঘৃতে বৃদ্ধি বল আর দুধে লাবণ্য বৃদ্ধি, শাকে বৃদ্ধি মল। বেশ বুঝতে পারছি তোরা আমাদের সময়ের থেকে অনেক এগিয়ে গিয়েছিস। অনেক উন্নতি করেছিস। কিন্তু কিছু কিছু ব্যাপারে...বেশ...”। কথা শেষ না করে অবিনবাবু সবার মুখের দিকে তাকিয়ে একটু ব্যাঁকা হাসি হাসলেন, তারপর বললেন, “ছোট ছোট বাড়ি, ছোট ছোট গাড়ি...খাওয়াদাওয়াও তথৈবচ...” তারপর অহীন আর সর্বজিতের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ওই অখাদ্য লুচি তোরা তো বেশ তরিবত করে খাচ্ছিস দেখছি!”

সর্বজিৎ বোন তিৎলিকে বলল, “তিৎলি, আরও দুটো লুচি দে তো। বিনুদা, মা ঠাকুমাদের কাছে আরেকটি কথা শোননি? শরীরের নাম মহাশয়, যা সওয়াবে তাই সয়”?

অবিনবাবু অবাক হয়ে বললেন, “বলিস কি? এসব কথা তোরাও জানিস?”

সর্বজিৎ বলল, “জানি বৈকি, এই তিৎলির মা – আমার মাসিমা, এইসব প্রবচনের আকর বিশেষ। তোমার ওই মাংস, ঘি, নিয়ে প্রবচনের মধ্যে, খাদ্য হিসেবে মাংসটা আমরা এখন বাড়াবাড়ি রকমের বাড়িয়ে ফেলেছি। অন্যদিকে মুগ বা অড়হর ডালে, কিংবা পুজোর ভোগের খিচুড়িতে - একটু-আধটু ঘিয়ের ছিটে দিয়েই আমাদের কাজ মিটে যায়। ঘিয়ের বদলে এসেছে এই সাদা তেল। তোমার অভ্যেস নেই, তাই একটু আজব গন্ধ লাগছে। আমাদের কিন্তু ভালই লাগে”। তার পর মুচকি হেসে বলল, “শরীরে যা সওয়াবে, তাই সইবে গো, বিনুদা”।          

 এর পর আর কোন কথা বলল না কেউ। মাথা নীচু করে সবাই খেতে লাগল। অবিনবাবু সামান্য শ্লাঘা অনুভব করছিলেন। ভারত স্বাধীন হয়েছে। অনেক যন্ত্রপাতি হয়েছে। ঘরে ঘরে আলো এসেছে, পাখা আছে। দোতলার কলঘরেও জল পাওয়া যাচ্ছে। রাস্তাঘাট ভাল হয়েছে। এক কথায় প্রচুর উন্নতি হয়েছে। কিন্তু অনেক ব্যাপারেই এরা বেশ পিছিয়েও গেছে। মাথা নীচু করে সকলের খাওয়া দেখতে দেখতে তাঁর চোখ পড়ল, দেওয়ালে ঝোলানো কালো রঙের একটা বেশ বড়ো চৌকো চ্যাপটা বাক্সের দিকে। সেটার দিকে তাকিয়ে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, “দেয়ালে ওই বস্তুটা কী, তিৎলি মা? কালো কুচকুচ করছে যখন ছবি বা ফটোর ফ্রেম তো নয় …”।

লুচি নিয়ে অবিনবাবুর কথায় তিৎলি বেশ ক্ষুণ্ণ হয়েছিল, উত্তর দিল, “ওটা টিভি”।

“সেটা কী বস্তু?”

তিৎলি একটু ইতস্ততঃ করে বলল, “ওটাতে নাচ, গান, সিনেমা, খেলা, খবর, নানারকমের অনুষ্ঠান দেখা যায়”।

“দেখা যায়? বটে?” অবিনবাবু আবারও অবাক হলেন, তারপর কিছু একটা ভেবে বললেন “অ বুঝেছি, আমাদের কালে বায়োস্কোপ ছিল, সে এখন ঘরের মধ্যেই ঢুকে পড়েছে? তা কটা থেকে খোলে? কলকাতার হলগুলোতে শুনেছি তিনটে করে শো হত - তিনটে, ছটা, নটা – সেরকম?”

“নাঃ চব্বিশ ঘন্টাই চলে” তিৎলি বলল, “এখন সবাই কাজে ব্যস্ত বলে চালানো হয়নি”।

“এখন চলবে? কই চালাও দেখি”।

তিৎলি টিভির পাশের সুইচটা অন করে এসে, খাবার টেবিলের মাঝখানে রাখা রিমোটটা নিয়ে টিভি চালু করল। “কী দেখবেন বলুন?”

খাওয়া বন্ধ করে অবিনবাবু টিভির দিকে তাকিয়ে রইলেন, বললেন, “আমি তো জানিনা, তুমিই একটা কিছু চালাও না। খবর আছে বলছিলে না? এখন শোনা যাবে – ইয়ে মানে দেখা যাবে?”।

“হুঁ। দেখা যাবে”। তিৎলি একটি বাংলা নিউজ চ্যানেল চালু করল। পর্দায় একটি মেয়ে তারস্বরে চেঁচিয়ে চলেছে, “পথ দুর্ঘটনায় বালকের ভয়ংকর মৃত্যু। আজ সকাল সাড়ে সাতটা নাগাদ পোড়াবটতলার কাছে মায়ের হাত ধরে রাস্তা পার হতে গিয়ে, বাসের চাকার তলায় পিষে গিয়েছে একটি আট বছরের বালক...গুরুতর আহত হলেও অল্পের জন্যে বেঁচে গেছেন বালকের মা...এলাকার মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন, তাঁরা রাস্তা অবরোধ করেছেন, জ্বালিয়ে দিয়েছেন দুটি বাস... পরস্থিতি অগ্নিগর্ভ... আমাদের প্রতিনিধি সজল হাজরার সঙ্গে যোগাযোগ করে সরাসরি চলে যাব ঘটনাস্থলে”... মেয়েটির ছবি একপাশে সরে গেল, আরেক পাশে ভেসে এল ঘটনাস্থলের ছবি... মেয়েটি বলল, “সজল, ওখানকার কি পরিস্থিতি আমাদের জানাও...”।

অবিনবাবু বললেন, “সকাল সকাল খুবই দুঃখের খবর সন্দেহ নেই...কিন্তু মেয়েটি অমন চেঁচাচ্ছে কেন? মনে হচ্ছে যেন কারো সঙ্গে ঝগড়া করছে...”

অহীন বলল, “ওটাই এখন খবর বলার ধরন, বিনুদা...ঘটনার অভিঘাতে মেয়েটি উত্তেজিত...”।

অবিনবাবু বললেন, “তাই বুঝি?”                              

 টিভিতে সজলের কণ্ঠ শোনা গেল, “একেবারেই মিতালি, এখানকার পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ। আহত মহিলাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও, নিহত ছেলেটির মৃতদেহ পুলিশের হাতে তুলে দিতে নারাজ স্থানীয় জনতা...তাদের দাবি অবিলম্বে প্রশাসনের উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের আসতে হবে...এবং তাঁকে প্রতিশ্রুতি দিতে হবে এই ঘটনার প্রকৃত তদন্ত হবে...এবং অপরাধীদের উপযুক্ত শাস্তি হবে...” মিতালি নামের মেয়েটির ছবি এখন পর্দা জুড়ে, একই রকম উত্তেজিত স্বরে বলল, “এখন নিচ্ছি একটা ছোট্ট বিরতি, সঙ্গে থাকুন...”। শুরু হল বিজ্ঞাপনমালা – এবারের মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রথম হওয়া ছেলেটি কোন নোটবুক মুখস্থ করেছে...কোন স্টিলবার ব্যবহার না করলে ভূমিকম্পে ধ্বসে পড়বে আপনার প্রিয় বাড়িটি, সকালে চায়ের সঙ্গে কোন বিস্কুট না খেলে দিনটাই মাটি...

অবিনদাদু অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকেই খাওয়া শেষ করলেন, বললেন, “তিৎলি মা, এই তোমাদের খবর?”

তিৎলি অবিনদাদুর প্লেটে দুটো সন্দেশ দিতে দিতে বলল, “এই জন্যেই খবরের চ্যানেল আমরা তেমন দেখি না, অকারণ চেঁচামেচি আর অজস্র বিজ্ঞাপন”।

“তাহলে কী দেখ?”

“আমরা তো সিরিয়াল দেখি – সিরিয়ালে এক-একটা ল-অ—ম্বা গল্প একটু একটু করে রোজ দেখায় আর সরুদা অহীনদের পছন্দ খেলা – ক্রিকেট, ফুটবল, টেনিস...”।

“অ, তাহলে দেশ-বিদেশের খবরাখবর?”

তিৎলি নাক কুঁচকে হাসল, বলল, “তেমন দেখা হয় না”।

“খ্যাঁদা, নবু তোরা কী দেখিস?”      

নবীনবাবু খুব সতর্ক হয়ে বললেন, “বাবা আর আমি সময় পাই কোথায়? তাছাড়া বসে বসে টিভি দেখার ধৈর্যও থাকে না। ওরা যখন দেখে, আমরা ওই দু পাঁচমিনিট বসলাম – ওই আর কি?”

“তিৎলি মা, এখনও পর্যন্ত তোমাদের এই একটা জিনিষই বড়ো ভালো লাগল, সন্দেশ – আমাদের কালে এমন সুন্দর - মুখে দিলেই মিলিয়ে যাওয়া সন্দেশ খাইনি...”।

তিৎলি উৎসাহে জিজ্ঞাসা করল, তাহলে আরও দুটো দিই?”

অবিনবাবু হাসলেন, “পাগল হয়েছ মা? এখন আর না। নবু, আমাদের খবরের কাগজ-টাগজ নেওয়া হয় না?  নাকি সেসব উঠে গেছে আজকাল”।

নবীনবাবু আগের মতোই সতর্ক হয়ে বললেন, “না উঠে যায়নি, আছে দু চারখানা – সে একেবারে অখাদ্য – আমরা রাখি না”।

“তার মানে দেশের খবর – বিদেশে কোথায় কী হচ্ছে, সে ব্যাপারে তোদের কোন কৌতূহলই নেই? আজব ব্যাপার তো! আমাদের সময় সকালের খবরের কাগজে চোখ না বোলালে সারা দিনটাই কেমন পানসে মনে হত”।

অহীনের খাওয়া হয়ে গিয়েছিল, হঠাৎ চেয়ার থেকে উঠে গেল। তারপর বাবার ঘর থেকে সেদিনের খবরের কাগজটা এনে অবিনবাবুর সামনে রেখে বলল, “বিনুদা, এই যে আজকের কাগজ। আজ রবিবার তো...শুধু খবর নয় – অনেক গল্প-প্রবন্ধও আছে”। তারপর বাবাকে বলল, “বিনুদার থেকে আর কত আড়াল করবে, বাবা? আস্তে আস্তে সবকিছুই উনি বুঝতে পারবেন, জানতেও পারবেন...”।

অহীনের অকস্মাৎ এই আচরণে টেবিলে বসা সকলেই স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। এমনকি অবিনবাবু নিজেও। বিজ্ঞাপনের শেষে টিভিতে মিতালি নামের মেয়েটি তারস্বরে বলে যেতে লাগল একই সংবাদ, সজলের সেই একই বক্তব্য...নীরব ঘরের মধ্যে ছড়াতে লাগল আশ্চর্য শব্দ দূষণ।

অবিনবাবু গম্ভীর মুখে অহীনের আনা কাগজটা বাঁহাতে টেনে নিলেন, কাগজের প্রথম পৃষ্ঠা জুড়ে রঙিন বিজ্ঞাপন – কোন এক সয়া তেলের। এই তেলে হার্টের অসুখ সেরে যায়, অনেক ধরনের ভিটামিন জুড়ে স্বাস্থ্য সচেতন এই তেল ছাড়া মানুষের কাছে আজ আর কোন বিকল্প নেই...। তিৎলি বিনুদার পাশেই দাঁড়িয়েছিল।

 তিৎলি মমতামাখা শান্ত কণ্ঠে বলল, “অহীনের কথায় কিছু মনে করবেন না, বিনুদা”।

অবিনবাবু চোখ তুলে তাকালেন তিৎলির মুখের দিকে, খুব সুন্দরী না হলেও সরল কিন্তু বুদ্ধিমতী তিৎলির চোখদুটি। অবিনবাবু ম্লান হাসলেন, বললেন, “তোমরা আজকাল দেওরকে নাম ধরেই ডাক বুঝি?”

তিৎলি খুব সপ্রতিভ উত্তর দিল, “হ্যাঁ। আজকাল সবাই তো তাই বলে। তাছাড়া প্রপিতামহ-শ্বশুরমশাইকেই যদি “বিনুদা” ডাকতে পারি – তাহলে ভাইয়ের বয়সী দেওরকে নাম ধরে ডাকতে…  ”।

তিৎলির কথা শেষ না হতেই সকলেই হা হা করে হেসে উঠলেন। এমনকি অবিনবাবুও! যাঁকে এতক্ষণ সকলেই ব্যাঁকা বা মুচকি হাসি হাসতে দেখেছেন সকলে।

সবার হাসি থামলে অবিনবাবু হাসি মুখেই বললেন, “বেশ বলেছিস, মা। বৌদিমণি – মানে খ্যাঁদার মাও আমাকে নাম ধরে ডাকতেন... বিনু। তবে অহীনের কথায় আমি কিছু মনে করিনি, মা। বরং বলব সবার মধ্যে, ওই দুই ছোকরাই – অহীন আর সর্বজিৎ - আমার সঙ্গে বেশ স্পষ্ট দ্বিধাহীন ব্যবহার করছে। খ্যাঁদা আর নবুতো আমার সঙ্গে এমন আচরণ করছে – আমি যেন এই সংসারে অনাহুত”।

প্রবীণবাবু বলে উঠলেন, “কী বলছো ছোটকা? আমরা তোমাকে…”

প্রবীণবাবুকে কথা শেষ করতে না দিয়ে অবিনবাবু বললেন, “ধীরে ধীরে আমিও বুঝছি - তিরাশি বছর সময়টা বড্ডো বেশিই। আমার দেখা জগৎ থেকে হঠাৎ তোদের জগতে এসে পড়ে, আমারই নিজেকে অনাহুত মনে হচ্ছে। অচেনা অজানা আগন্তুক। এই দেখ না, এই খবরের কাগজটা। আমাদের সময়ে কাগজের প্রথম পাতায় সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ খবরগুলিই ছাপা হত। আর প্রথমপাতার হেডলাইন মানে – সেটাই হত দিনের প্রধানতম খবর। আজও মনে পড়ে ১৯৩০ সালে – সঠিক তারিখটা মনে নেই - চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুঠ করার খবর সেকালের সব কটি কাগজের প্রথম পৃষ্ঠায় বেরিয়েছিল। আমার বয়েস তখন বছর সাতেক – আমার তখনও বোঝার বয়েস হয়নি। কিন্তু বাবা, বড়দা, মেজদা, সেজদা,  পাড়া- প্রতিবেশীর বয়স্ক মানুষদের দেখেছিলাম ভীষণ উত্তেজিত হয়ে উঠতে। অনেকের কাছেই মাস্টারদা হয়ে উঠেছিলেন পূজনীয় নেতা, আবার বেশির ভাগ লোকই বলেছিল “আহম্মক, বোকা – এভাবে লড়ে বৃটিশরাজকে তাড়ানো যাবে?”

অবিনবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “আর আজ দেখছি, কাগজের প্রথম পৃষ্ঠাজুড়ে তেলের বিজ্ঞাপন – এই তেল দিয়েই তোমরা লুচি ভেজেছিলে না?”

তিৎলি বলল, “ওই তেলে নয় – ওটা সয়া তেল, আমরা খাই সানফ্লাওয়ার মানে সূর্যমুখীর তেল”।

অবিনবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, “সয়া ব্যাপারটা কি?”

তিৎলি বলল, “সয়া একধরনের বড়ো বড়ো দানা – ইংরিজিতে সয়া বিন্‌স্‌ বলে, কিছুটা বরবটির দানার সঙ্গে মিল আছে। তার সঙ্গে খুব সম্ভবতঃ পাম তেলও মেশানো হয়”।

অবিনবাবু হাসতে হাসতে বললেন, “যেন খুব কিছু বুঝে ফেললাম। না, মা, সময় লাগবে… সব কিছু বুঝতে অনেকটাই সময় লাগবে। তোমরা সবাই কাজের মানুষ – আমার মতো নিষ্কর্মা লোকের সঙ্গে তোমরা কতক্ষণ থাকবে? যাও, তোমরা নিজের নিজের কাজ করগে’। আমি বরং কাগজটা পড়ি – বুঝতে চেষ্টা করি আজকের সময়টাকে…”।

খাবার ঘর থেকে সকলে বেরিয়ে যাওয়ার পর, অবিনবাবু পায়ের চটি খুলে চেয়ারেই আসন পিঁড়ি হয়ে বসলেন। তারপর আরাম করে খবরের কাগজের প্রথম দুটি বিজ্ঞাপনের পাতা খুঁটিয়ে পড়লেন। প্রথমটি ছিল স্বাস্থ্যকর সয়া তেলের – যা নিয়ে তাঁর সঙ্গে তিৎলির আগেই কথা হয়েছে। দ্বিতীয় পাতায় বিশাল আবাসন প্রকল্পের বিজ্ঞাপন। চব্বিশতলা বাড়িগুলির প্রত্যেকটি ঘরের জানালা খুললেই হুড়মুড় করে প্রকৃতি ঢুকে পড়ে। সবুজ অরণ্য, আকাশ, আলো, পাখি, বসন্তের হাওয়া...। আজ সকালেই নার্সিং হোম না প্রাইভেট হসপিটাল থেকে ফেরার পথে, বড় রাস্তার দুপাশে বেশ কয়েকটি উঁচু বাড়ি দেখেছেন। তখন তিনি খেয়াল করেননি ওগুলো কত তলা। এখন চব্বিশ তলা আন্দাজ করার সময় তিনি সেগুলির সঙ্গে তুলনা করছিলেন। এই বাড়িটি দোতলা, তাঁদের পৈতৃক বাড়িটাও দোতলা ছিল। কিন্তু সে বাড়ির ঘরের হাইটগুলো ছিল এই বাড়ির থেকে অনেক উঁচু, দুগুণ তো বটেই – তার বেশি হলেও আশ্চর্য হবেন না। তার তুলনায় চব্বিশ তলা বাড়ি কতটা উঁচু? বুঝতে হবে।

অবিনবাবু তিৎলিকে ডাকলেন, “তিৎলি মা, খুব ব্যস্ত নাকি?”

তিৎলি রান্নাঘরে শাশুড়ির সঙ্গে কাজ করছিল, দৌড়ে এল, বলল, “কী বলছ, বিনুদা?”

“একটা কাগজ আর পেন দিতে পারো, মা? কিছু কিছু জিনিষ লিখে রাখব”।

তিৎলি দৌড়ে দোতলায় গেল। একটা কাগজ আর পেন এনে রাখল অবিনবাবুর সামনে।

চলবে...       

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নতুন পোস্টগুলি

শুধু _তুই .কম - পর্ব ২৯

 প্রথম   ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "  দ্বিতীয়  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন র...