ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "
ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১ "
ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "
ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "
ধর্মাধর্ম শেষ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৫/১ "
"ধর্মাধর্ম" গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -
গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২
(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)
অথবা
+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।
[এর আগের পর্বাংশ - "ধর্মাধর্ম - ৫/২১"]
৫.৬.৪ তন্ত্র সাধনতত্ত্ব (আগের পর্বের পরে)
সুষুম্না নাড়ীতে ছটি পদ্ম আছে, একদম নিচে মূলাধার, তারপর ক্রমান্বয়ে উপরের
দিকে স্বাধিষ্ঠান, মণিপুর, অনাহত, বিশুদ্ধ ও আজ্ঞা।
তন্ত্রমতে এই ছটি পদ্মকে বলে চক্র – ষট্চক্র ভেদই তন্ত্র সাধনার মূল উদ্দেশ্য, বেদে এই ছটি পদ্মকে বলা
হয় ভূমি। মূলাধারের অবস্থানের কথা আগেই বলেছি, স্বাধিষ্ঠান চক্রের অবস্থান
উপস্থের,
মণিপুর
নাভিমণ্ডলের,
অনাহত
হৃদয়ের, বিশুদ্ধ কণ্ঠের এবং আজ্ঞা
চক্র ভ্রূর সমান্তরালে অবস্থান করে। সাধনার বিভিন্ন পর্যায়ে সুষুম্নানাড়ী পথে
কুণ্ডলিনী শক্তি এক একটি চক্র ভেদ করে উপরের দিকে উঠতে থাকে। কুণ্ডলিনী যখন হৃদয়ের
অনাহত চক্র স্পর্শ করে তখন সাধকের মন থেকে সমস্ত কামনা বাসনার অবসান হয়, সাধক অদ্ভূত এক জ্যোতি
দেখতে পান। এরপর কুণ্ডলিনী বিশুদ্ধ চক্র স্পর্শ করলে সাধকের মন ঈশ্বর চিন্তায়
ব্যাকুল হয়,
তখন ঈশ্বরের
বিষয় ছাড়া অন্য কথা বলতে পারেন না, অন্য কথা শুনলেও অসহ্য বোধ হয়। এরপর কুণ্ডলিনী ষষ্ঠ চক্র
আজ্ঞাভূমি স্পর্শ করলে, সাধক ঈশ্বরকে দেখতে পান, কিন্তু একটু আড়াল থাকে – যেমন
লণ্ঠনের আলো,
দেখা যায়, কিন্তু কাচের জন্যে
স্পর্শ করা যায় না। ষষ্ঠ চক্র অতিক্রম করে কুণ্ডলিনীশক্তি যদি সপ্তমভূমিতে সহস্রার
অর্থাৎ সহস্রদল পদ্মে মিলিত হয়, তখন সাধকের সমাধি হয়। সমাধিস্থ হলে সাধকের বাহ্যজ্ঞান লোপ
পায়, সাধক দেহ রক্ষা করতে
পারেন না,
একুশ দিনের
মধ্যে তাঁর দেহের অবসান হয়। সপ্তমভূমির এই সহস্রদল পদ্মের অবস্থান, মাথার ব্রহ্মতালুতে। এই
সহস্রার পদ্মেই সচ্চিদানন্দ শিব অবস্থান করেন, সাধকের শক্তি শিবের সঙ্গে মিলিত
হন। শিব-শক্তির এই মিলনই তন্ত্রের পরমার্থ লাভ, উপনিষদের ব্রহ্ম লাভ।
যাঁরা ঈশ্বরকোটি সাধক অর্থাৎ অবতার, তাঁরা লোকশিক্ষার জন্যে সমাধি
অবস্থা থেকেও আবার নেমে আসতে পারেন। তাঁদের অবস্থান থাকে ষষ্ঠ ও সপ্তমভূমির
মাঝখানে। তাঁদের মধ্যে ভক্তভাবের অথবা দাসভাবের সামান্য অহংটুকু – ভক্ত আমি, দাস আমি - থাকে। যেমন
হনুমান ছিলেন,
দাসভাবে; নারদ, সনক, সনন্দ, সনাতন, সনৎকুমার প্রমুখ ছিলেন
ভক্তভাবে,
যেমন
শ্রীশ্রীচৈতন্য ছিলেন প্রেমভাবে এবং শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ছিলেন সন্তানভাবে।
তন্ত্র সাধনার নিম্ন স্তরে - মূলাধার থেকে অনাহত চক্র স্পর্শ করার আগেই
সাধকের আটটি দৈব ক্ষমতার সিদ্ধি ঘটতে থাকে। এই সিদ্ধিকে বিভূতিও বলে - আটটি সিদ্ধি
এরকম – অণিমা (সূক্ষ্ম হয়ে ওঠা), লঘিমা (পালকের মতো হাল্কা হওয়া), গরিমা (অস্বাভাবিক ভারি হয়ে ওঠা), মহিমা (বিশাল চেহারা), প্রাপ্তি (ইচ্ছেমতো যে
কোন বস্তু হাতে আনা), প্রাকাম্য
(ইচ্ছেমতো যে কোন বিষয় অর্জন করা), বশিত্ব (যে কোন মানুষ বা জীবকে বশ করা), ঈশিত্ব (সৃষ্টি বিষয়ে নাক
গলাতে পারা!)।
সেকাল থেকে আজ পর্যন্ত, তীর্থে-তীর্থে এবং কলকাতা বা যে কোন বড়ো শহরের
রত্নব্যবসায়ীদের চেম্বারে প্রায়ই স্বঘোষিত সিদ্ধ সাধকদের দেখা যায়। তাঁদের অনেকে
আবার স্বর্ণপদক প্রাপ্ত – এই পদক কোন প্রতিষ্ঠান দিয়ে থাকে জানা যায় না। তবে এঁরা
বশীকরণ করতে পারেন, আপনাকে
যে কোন কাজে সার্থক করে তুলতে পারেন। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার হল বৈদেশিক আক্রমণের
সময় এঁদের কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না, তখন অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে যোদ্ধাদেরই সীমান্তে লড়তে হয়ে।
তাঁরা বশিত্ব দিয়ে বিপক্ষ সৈন্য বা সেনাপতিদের বশ করে যুদ্ধ বন্ধ করতে পারতেন, কিন্তু কোনদিন করেননি।
অথবা সাধারণ আকৃতির সাধক মহিমা সিদ্ধি দিয়ে হঠাৎ বিশাল শরীর বানিয়ে, গরিমা সিদ্ধিতে তাঁদের
পায়ের তলায় পিষে একজন শত্রুকেও বিনাশ করতে পেরেছেন - এমন শোনা যায় না।
তন্ত্রসাধনায় এই আটটি সিদ্ধিলাভকে খুবই তুচ্ছ এবং অবহেলার চোখে দেখা
হয়েছে। এই বিভূতি দিয়ে সাধারণ মানুষকে অবাক করে, যাঁরা অর্থ, যশ বা প্রতিপত্তি উপার্জন
করেন, তন্ত্রশাস্ত্র তাঁদের
খুবই নীচু স্তরের সাধক বলেছেন।
৫.৬.৫ তন্ত্রশাস্ত্র
তন্ত্রে বেদ - বেদান্ত সর্বশাস্ত্রকে একত্রে বলা হয় নিগম এবং
তন্ত্র-শাস্ত্রকে বলা হয় আগম। উভয়ের সম্পর্ক পিতা-পুত্রের মতো। পুত্র পিতাকে
অত্যন্ত শ্রদ্ধা করে, কিন্তু
যুগোপযোগী হতে গিয়ে তার মতের সঙ্গে পিতার মতের অমিল হয়। আবার পিতা অর্থাৎ বৈদিক
মতের সনাতন পণ্ডিতেরা, তন্ত্রকে
তাচ্ছিল্য করেন,
বলেন, হতভাগা এত লেখাপড়া শিখেও
উচ্ছন্নে গেল?
মহানির্বাণ তন্ত্র চোদ্দটি পর্বে বিভক্ত, এই পর্বগুলিকে “উল্লাস” বলা
হয়েছে। প্রথম উল্লাসে জগজ্জননী পার্বতী সাধারণ মানুষের জন্যে উদ্বিগ্ন হয়ে পতিদেব
শিবকে বলছেন,
“হে
সর্বভূতেশ,
তুমি সকলের
অন্তর্যামী,
চারবেদ
তোমার দ্বারাই প্রকাশিত হয়েছিল। সেই বেদ থেকেই বর্ণাশ্রমাদি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সত্যযুগে মানুষ সত্যবাদী, ধার্মিক ছিল, তারা অতিলোভী বা কামুক
ছিল না, সকলেই সর্বদা আনন্দে
থাকত। সত্যযুগের পরে, মানুষ
বেদ অনুসরণ করে,
সব কর্ম
করতে পারত না,
বৈদিক কর্ম
তাদের কাছে কষ্টকর হয়ে উঠেছিল। কিন্তু তবুও তারা বেদ ত্যাগ করেনি। তখন তুমি
পৃথিবীতে বেদার্থযুক্ত স্মৃতিশাস্ত্র প্রকাশ করেছিলে, সেই শাস্ত্র অনুসরণ করে, মানুষ দুঃখ-শোক-রোগ-তাপ
থেকে উদ্ধার পেয়েছিল। তারপর দ্বাপরে মানুষ স্মৃতির সুকর্মও ত্যাগ করে, মনোকষ্ট এবং ব্যাধিতে
আকুল হয়ে উঠেছিল। তখন তুমি ব্যাসাদি ঋষি হয়ে সংহিতাশাস্ত্র (পুরাণাদি) উপদেশ দিয়ে
মানুষকে উদ্ধার করেছ।
[লক্ষ্য করার বিষয়, এখানে দেবী পার্বতী বললেন, মহেশ্বর শিবই চারবেদের প্রকাশক, তিনিই মনু হয়ে
স্মৃতিশাস্ত্র রচনা করেছেন, আবার তিনিই বেদব্যাসের মতো ঋষি হয়ে পুরাণাদি রচনা করেছেন!
শ্রীশ্রী গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বিভূতি যোগের মহিমাকেই তিনি যেন খণ্ডন
করলেন!]
তারপর পাপরূপী, সর্বধর্ম-বিলোপকারী কলিযুগ এসে গেল। এখন দেবতারা শক্তিহীন, স্মৃতি এখন স্মৃতিহীন, নানা পথ প্রদর্শনকারী
পুরাণাদির বিনাশ হতে চলেছে। মানুষ মন্দমতি, শঠ, নীচ, পরের সম্পদ চুরি করে। ব্রাহ্মণেরা
সন্ধ্যা-বন্দনাদি ছেড়ে শূদ্রের মত আচরণ করে। মানুষের মনে কখনো সৎচিন্তা, সৎকথা শোনা যাবে না। এই
নরাধমদের উদ্ধারের জন্যেই তুমি সকল তন্ত্র রচনা করেছ এবং ভোগ ও মুক্তিপ্রদ
আগমশাস্ত্র সৃষ্টি করেছ। কিন্তু এখনকার লোক কলির পাপযুক্ত, সর্বদাই অস্থিরমতি, নিদ্রা ও আলস্যে আসক্ত, এদের ভাবশুদ্ধি কী ভাবে
হতে পারে?
দেবী পার্বতীর মানবের প্রতি এই মাতৃসুলভ ব্যাকুলতার উত্তরে সদাশিব
দ্বিতীয় উল্লাসে বলেছেন, “হে মহাভাগে, তুমিই জগতের কল্যাণকারিণী, তুমি খুবই ভাল প্রশ্ন করেছ, এমন প্রশ্ন আগে কেউ
করেনি। হে প্রিয়ে, তুমি
সর্বজ্ঞা,
অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ
বিষয়ে তুমি যা যা বললে, সবই যথার্থ। হে প্রিয়ে, আমি সত্য সত্য পুনঃ সত্য বলছি, কলিকালে আগমোক্ত পথ ছাড়া
অন্য পথ নেই। কলিকালে বেদের মন্ত্রসকল
বিষহীন সাপের মতো নির্বীর্য হয়ে পড়েছে, যে মন্ত্র সত্যাদি যুগে ফলদায়ী ছিল, কলিতে তারা সকলেই মৃতের
মত নিষ্ফলা হয়ে গেছে। হে দেবেশি, বেদ, আগম, বিশেষতঃ বহু তন্ত্রের সার
আমি তোমাকে সংক্ষেপে বলছি। যেমন, মানুষের মধ্যে তত্ত্বজ্ঞানী শ্রেষ্ঠ, নদীর মধ্যে গঙ্গা শ্রেষ্ঠ, দেবতাদের মধ্যে আমি
শ্রেষ্ঠ,
তেমনি সমস্ত
আগম শাস্ত্রের মধ্যে এই মহানির্বাণ তন্ত্রই শ্রেষ্ঠ। এই মহাতন্ত্র বিশেষ ভাবে
জানলে, জীব সর্বসিদ্ধি লাভ করে।
হে পরমেশ্বরি, বিশ্বের হিত করলে বিশ্বের ঈশ্বর প্রীত হন, কারণ তিনিই বিশ্বের আত্মা, বিশ্ব তাঁকেই আশ্রয় করে
রয়েছে। তিনি এক,
অদ্বিতীয়, সত্য, পরাৎপর, স্বপ্রকাশ, সচ্চিদানন্দস্বরূপ। তিনি
নির্বিকার,
নির্বিশেষ, গুণাতীত, সর্বাত্মা, সর্বব্যাপী, সর্বদর্শী, বিভু ও সনাতন। হে
মহেশ্বরি,
সেই
পরমেশ্বরই সর্বপ্রাণীর একমাত্র কারণ; তাঁর নিযুক্তিতেই ব্রহ্মা জীব সৃষ্টি করে স্রষ্টা পদবী
পেয়েছেন। তাঁর ইচ্ছাতেই বিষ্ণু এই জগৎকে পালন করে, পালয়িতা হয়েছেন। তাঁর ইচ্ছাতেই
সংহারকারী হয়ে,
আমি জগতে
সংহর্তা আখ্যা পেয়েছি। তুমিই তাঁর পরমা প্রকৃতি, সেহেতু তুমি ত্রিভুবনে পূজ্যা”।
চতুর্থ উল্লাসে ভগবান সদাশিব বলেছেন, “হে মহাভাগে, হে দেবি, তোমার থেকেই এই নিখিল জগৎ
উৎপন্ন হয়েছে। হে শিবে, তুমিই এই নিখিল জগতের জননী। তুমি সকলের আদ্যা অর্থাৎ
আদিভূতা। সকল বিদ্যা এবং আমরা সকলেও তোমার থেকেই উৎপন্ন হয়েছি। তুমি জগতের সকল
বিষয় জান,
কিন্তু
তোমাকে কেউ জানতে পারে না। তুমি কালী, তুমি তারিণী, তুমি দুর্গা, তুমিই ষোড়শী, ভুবনেশ্বরী, ধূমাবতী, তুমিই বগলা, ভৈরবী, ছিন্নমস্তা, তুমিই অন্নপূর্ণা, বাগ্দেবী, তুমিই কমলালয়া লক্ষ্মী, তুমি সর্বশক্তিস্বরূপা
এবং তুমিই সর্বদেবময়ী। তুমি সাকারা হয়েও নিরাকারা। তুমি মায়া দিয়ে বহুরূপ ধারণ কর, তুমিই সকলের আদি, অনাদি, কর্ত্রী, হর্ত্রী (হননকারিণী) এবং
পালিকা। হে দেবি, এই
কারণেই তোমাকে বলছি, ব্রহ্মমন্ত্রে
দীক্ষিত সাধক যে ফল লাভ করে, তোমার সাধনা করেও সে একই ফল লাভ করতে পারে”।
তৃতীয় উল্লাসে দেবীর প্রশ্নের উত্তরে মহাদেব শঙ্কর বলেছেন, “হে দেবি, কুলাচার বিনা শক্তিমন্ত্র
সিদ্ধিপ্রদ হয় না, অতএব
কুলাচারে নিরত হয়েই শক্তিসাধন করতে হবে। হে আদ্যে, শক্তিপূজা বিধানে মদ্য, মাংস, মৎস্য, মুদ্রা, মৈথুন এই পঞ্চতত্ত্বের
কথা বলা হয়েছে। পঞ্চতত্ত্ব ছাড়া সাধকের ইষ্টসিদ্ধি হয় না, পদে পদে বিঘ্ন ঘটে”।
আবার ষষ্ঠ উল্লাসে, মহাদেব শঙ্কর পঞ্চতত্ত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত বলেছেন,
মদ্য - “উত্তম মদ্য বা সুরা তিনপ্রকার– গৌড়ী, পৈষ্টী এবং মাধ্বী, এই সুরা তাল, খেজুর, মধু থেকে সঞ্জাত। এই সুরা
যেভাবেই তৈরি হোক এবং যেই নিয়ে আসুক, এ বিষয়ে কোন জাতিভেদ নেই, শোধন করলে সর্বসিদ্ধি দান করে।
শুদ্ধি বিনা মদ্যপান, বিষপানের
তুল্য – সাধক চিররুগ্ন এবং স্বল্পায়ু হয়।
মাংস – তিন প্রকারের – জলচর, ভূচর, খেচর। এই মাংস যেখান থেকেই আনা হোক বা যে ব্যক্তিই সে
প্রাণীর ঘাতক হোক, শোধনের
পর কিছু আসে যায় না। বলিতে পুরুষ-পশু
বিহিত, স্ত্রী-পশু হত্যা
নিষিদ্ধ।
মৎস্য– শাল, বোয়াল, রুই মাছ – এই তিন মাছ উত্তম। অন্যান্য কাঁটাহীন মাছ মধ্যম, বেশি কাঁটাযুক্ত মাছ অধম।
মুদ্রা –চাঁদের মতো শুভ্র, যব অথবা গম থেকে তৈরি এবং ঘিয়ে ভাজা, মনোহর মুদ্রা (লুচি বা
পুরি) উত্তম। ধান থেকে তৈরি মুদ্রা মধ্যম। অন্য শস্য (ছোলা, মটর) ভেজে তৈরি মুদ্রা
অধম।
মৈথুন – নিজের দীক্ষিতা পত্নী অথবা শক্তিরূপা দীক্ষিতা পরকীয়া নারী
সঙ্গম”।
সাধারণ জন এই পঞ্চতত্ত্বকেই “পঞ্চ-ম” বলে জানেন এবং বিশেষতঃ এই পঞ্চ-ময়ের কারণেই তাঁদের মনে তন্ত্র-সাধনা সম্পর্কে একটা বিভীষিকা কাজ করে, তাঁদের মনে হয়, তন্ত্রসাধনা মানেই যেন এই “পঞ্চ-ম”-এর অনাচার ও ব্যাভিচার। সাধারণের মন থেকে এই আতঙ্ক ও বিরূপভাব দূর করার জন্যে পরবর্তী অনেক তন্ত্রতত্ত্বে এই পঞ্চতত্ত্বের যে ব্যাখা করা হয়েছে, তার কথাও এখানে বলে রাখি। প্রসঙ্গতঃ বলি, ওপরের পঞ্চ-ম-এর তত্ত্ব বিবৃত করেছেন, স্বয়ং ভগবান মহাদেব, অন্ততঃ মহানির্বাণতন্ত্রে তাই দাবি করা হয়েছে। কিন্তু নিচের এই আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা করেছেন পরবর্তী পণ্ডিতগণ -
ইড়া ও পিঙ্গলার শ্বাসবায়ুকে একত্র করে, ধীরে ধীরে বায়ু গ্রহণ করতে হয়, তারপর মূলাধার সংকুচিত করে, “হংসঃ”[1]-মন্ত্র উচ্চারণ করতে করতে কুম্ভক করলে, মৎস্য সাধনা হয়। মৎস্য এখানে ইড়া ও পিঙ্গলা নাড়ীর মধ্যে ঊর্ধমুখী কুল-কুণ্ডলিনী শক্তি।
এরপর কুণ্ডলিনী শক্তিকে হৃদয়ের অনাহত-পদ্মে এনে পূজা, জপ ও হোম কার্য করতে হবে, তারপর সহস্রার মহাপদ্মের
ভেতর পারদের মতো উজ্জ্বল বিন্দুরূপ শিবস্থানের কল্পনা করতে হয়, এরই নাম মুদ্রা সাধনা।
এর পর সাধক কল্পনায় হৃদয়পদ্ম থেকে ষোড়শী, স্থির যৌবনা, পীন পয়োধরা, সর্বালঙ্কারভূষিতা, রক্তবর্ণা, সুন্দরদর্শনা, মৃদুহাস্যবদনা ইষ্ট
দেবীকে সহস্রারপদ্মে ভগবান শিবের কাছে উপস্থিত করবেন। সাধক মৌনী হয়ে আরও চিন্তা
করবেন, ওই দেবী ভগবতী ভগবান
শিবের কাছে বসে,
তাঁর
মুখপদ্ম চুম্বন করছেন। এই চিন্তনই মাংস সাধনা।
এরপর সাধক চিন্তা করবেন, দেবী ভগবতী ভগবান শিবকে আলিঙ্গন করে সঙ্গমে নিরত রয়েছেন, এই সময় সাধক নিজেকে
শক্তির সঙ্গে অভিন্ন চিন্তা করে নিজেকে পরমসুখী ও আনন্দময় জ্ঞান করবেন, এই সাধনার নাম মৈথুন।
এরপর সাধক তাঁর জিহ্বাগ্র দিয়ে তালু কুহর রোধ করে ধ্যান করবেন যে, শিব ও শক্তির মিলন ও বিহারে সুধাক্ষরণ হচ্ছে, সে সুধার স্বাদ তিনি জিহ্বাগ্রে যেন অনুভব করছেন। এই সাধনাই মদ্য সাধনা। এই সময় সাধকের নেশাগ্রস্তের অবস্থা হয়, এই অবস্থাকেই সমাধি বলে। সমাধি অবস্থার যে আনন্দ – সে আনন্দ শরীর ও মনের অব্যক্ত – ভাষায় তার বর্ণনা করা যায় না ।
চলবে...
[1] “হংসঃ”
- শাক্ত ও শৈব তত্ত্বে একে অজপা মন্ত্র বলে – অর্থাৎ জীবকে এই মন্ত্র জপ করতে হয়
না, তার শ্বাস – প্রশ্বাসের
সঙ্গে স্বতঃই অহোরহ এই মন্ত্র জপিত হয়। নিশ্বাসের সময় “হং” শব্দে বায়ু শরীর থেকে
বের হয়ে আসে,
এবং “সঃ”
শব্দে বায়ু শরীরে প্রবেশ করে। প্রতি মিনিটে ১৫ বার শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়া হয় ধরে
নিলে সারাদিনের ২৪ ঘণ্টায় আমরা নাকি ২৪ x ৬০ x ১৫ = ২১,৬০০ হংসঃ মন্ত্র জপ করে থাকি।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন