রবিবার, ১ নভেম্বর, ২০২৬

স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১১

 প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

তৃতীয় ধারাবাহিক উপন্যসের প্রথম পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ " 

    পঞ্চম ধারাবাহিক উপন্যাস প্রথম পর্ব - "স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "

সম্পুর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "; "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "





মুখবন্ধঃ 

[১৯৪৭ সালের ১৫ই আগষ্ট মধ্যরাত্রে বৃটিশ অপশাসন থেকে আমরা মুক্ত হয়েছি। আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। সেই মাহেন্দ্রক্ষণটিকে স্বাগত জানাতে গিয়ে নেহরুজির বক্তব্যের প্রথম বাক্যটি ছিল, “Long years ago we made a tryst with destiny, and now the time comes when we shall redeem our pledge, not wholly or in full measure, but very substantially”.। আজ স্বাধীনতার আশিতম বছরে পা রেখে, সত্যিই কি আমরা পেরেছি এবং পারছি আমাদের যাবতীয় pledge redeem করতে? এক কল্পিত স্বাধীনতা সংগ্রামীর সঙ্গে আজকের জেন-জি তরুণের কথোপকথনে এই উপন্যাস তুলে ধরবে আমাদের যাবতীয় পাওয়া-না পাওয়ার কাহিনী।] 

 

৩০শে জুলাই, ২০২৬ রবিবার, সকাল সাড়ে এগারোটা

ওপরে অহীনের ঘরে সর্বজিৎ আর অহীন আড্ডা দিচ্ছিল। অবশ্য সে আড্ডার অধিকাংশ আলোচনাই চলছিল অবিনবাবুকে নিয়ে। আধুনিক পরিস্থিতির সঙ্গে পরিচিত হতে হতে অবিনবাবুর প্রতিক্রিয়া শেষ অব্দি কোথায় পৌঁছবে, সেটাই এখন এ বাড়ির সকলের মাথাব্যথা। সেই গম্ভীর ও গভীর আলোচনার মাঝখানে তিৎলি যখন দুজনের জন্যে দুটো অমলেট আর দুকাপ কফি নিয়ে ওদের ঘরে গেল, দুজনেই আনন্দে চেঁচিয়ে উঠল, বলল, “ওঃ এর থেকে ভাল আর কী হতে পারে?”

সর্বজিৎ চামচ দিয়ে গরম অমলেটের টুকরো মুখে পুরে বলল, “বিনুদা নীচেয় কী করছে, রে তিৎলি?”

তিৎলি টুলের ওপর বসে বলল, “এমন মনোযোগী পাঠক আমি আগে কোনদিন দেখিনি, সরুদা। তাও আবার খবরের কাগজ। শুধু খবর নয়, প্রত্যেক বিজ্ঞাপনের শর্তাবলী প্রযোজ্য পর্যন্ত সবই পড়ছেন। তার ওপর একটা কাগজে কী সব লিখে চলেছেন”।  

অহীন বলল, “কাগজ-পেন কোথায় পেলেন?”

তিৎলি বলল, “আমার কাছে চাইলেন তো, আমিই দিলাম। পেনটা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখে বললেন, এ তো ফাউন্টেন পেন নয় বৌমা! এই পেনেই এখন তোমরা লেখ বুঝি? এ পেনের নাম কি? আমি বললাম, আমরা বলপেন বলি, অনেকে ডটপেনও বলে। তারপর কাগজে দু একটা দাগ টেনে, নিজের নাম লিখলেন। বললেন, বাঃ বেশ পেন তো! কালি ভরে কোনদিক দিয়ে? আমি বললাম, ওর মধ্যে কালি ভরা যায় না। আমি পেনের মুণ্ডুটা খুলে পেনের রিফিলটা দেখালাম। বললাম, এই রিফিলটা শেষ হয়ে গেলে, নতুন কিনতে পাওয়া যায়, সেটা  ঢুকিয়ে নিলেই আবার লেখা চালু হয়ে যাবে”।   

সর্বজিৎ বলল, “দাম-টাম জিজ্ঞাসা করেননি?”

“করেননি আবার? বললাম পাঁচটাকা, আর রিফিলের দাম দুটাকা। আমাদের স্টুডেন্ট লাইফে যখন প্রচুর লিখতে হত – তখন একটা রিফিলে দিন পনের-কুড়ি আরামসে হয়ে যেত। উনি অবাক হয়ে তাকিয়ে শুনছিলেন আমার কথা। বললেন, পাঁআচ টাআকাআ? তিরিশটাকা মাইনেতে একটা সংসারের সারা মাস চলে যায়, বৌমা। দু-তিনটে ছেলেমেয়ে লেখাপড়া করলে, তাদের রিফিল কিনতেই তো মাসে দশ-বারোটাকা বেরিয়ে যাবে! কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে বললেন, যত দেখছি, ততই তো চমকে যাচ্ছি, বৌমা”। আরও কিছুক্ষণ হালছাড়া অবস্থায় বসে থেকে বললেন, ঠিক আছে বৌমা, তুমি যাও”। তিৎলি হাসল বলল, “আমি তো হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম, বাবা”।

অহীন জিজ্ঞাসা করল, “কী লিখছেন কিছু দেখেছ?”

“হুঁ। এই তো কফি দিতে গিয়ে দেখে এলাম, এ-ফোর পাতার এক পৃষ্ঠা শেষ করে, পরের পাতায় লিখে চলেছেন। তবে হ্যাঁ, হাতের লেখাটি কিন্তু মুক্তোর মতো…”।

অহীন জিজ্ঞাসা করল, “উনি এত কী লিখছেন, বলো তো, সরুদা তোমার কী মনে হয়?”

সর্বজিৎ অমলেট শেষ করে, কফির কাপে চুমুক দিয়ে গম্ভীর হয়ে বলল, “আমাদের জন্যে প্রশ্নবাণ তৈরি হচ্ছে, অহীন। ভীষ্মের শরশয্যার কথা শুনেছ? প্রস্তুত হও, আমাদের সকলেরই সেই অবস্থা হবে”।

অহীন জিজ্ঞাসা করল, “তুমি বলছ, খবরের কাগজ পড়ে ওঁর যা কিছু মাথার ওপর দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে, সে সব উনি প্রশ্ন করার জন্যে প্রস্তুত হচ্ছেন?”

“ঠিক তাই। তার মধ্যে ইতিহাস থাকবে, ভূগোল থাকবে, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, বেশ কিছুটা বিজ্ঞানও থাকবে… এ আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি”।

অহীন আর তিৎলি হেসে উঠল হো হো করে। সর্বজিৎও হাসল, বলল, “হাসছ অহীন? এ পরীক্ষা ইউপিএসসি ধরনের – যে কোন বিষয় থেকে যে কোন প্রশ্ন আসতে পারে… রেডি হও…”।

সর্বজিতের কথা শেষ হল না, অবিনবাবু স্মিতমুখে দরজায় এসে দাঁড়ালেন। বললেন, “কি, এত হাসাহাসি কিসের?”

অহীনরা সকলেই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল, অহীন বলল, “আরেব্বাস, বিনুদা তুমি একেবারে ওপরে চলে এলে? এস এস আরাম করে বিছানায় বস। জমিয়ে আড্ডা দেওয়া যাক”।

অবিনবাবু অহীনের বিছানাতেই বসলেন। আরাম করেই বসলেন। তারপর তাঁর হাতের কাগজটা দুহাতে মেলে ধরে বললেন, “বুড়োদুটোর ওপর আমার তেমন ভরসা নেই, তাই তোদের কাছেই এলাম। আমার অনেক প্রশ্ন আছে”।

অহীন বলল, “ঠিক এই কথা নিয়েই আমরা হাসাহাসি করছিলাম, বিনুদা। বৌদি এসে খবর দিল, তুমি খবরের কাগজ পড়ছ আর কাগজে কি সব যেন লিখছ। সেই শুনে সরুদা বলল, তুমি কঠিন কঠিন প্রশ্নমালা সাজাচ্ছ… এবং সেগুলোর উত্তর আমাদেরকেই দিতে হবে”।

অবিনবাবু খুশি হয়ে সর্বজিতের দিকে তাকালেন, বললেন, “এই জন্যেই তো তোদের কাছে এলাম। সত্যিই অনেক কিছু বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে…”।

সর্বজিৎ বলল, “তোমার প্রশ্ন শোনার আগে, আমি একটা লেকচার দিয়ে দিই, বিনুদা। তাতে হয়তো তোমার অনেক প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবে। এবং অনেক ব্যাপার-স্যাপার তোমার বুঝতেও সুবিধে হবে”।

অবিনবাবু হাসলেন, হাতের কাগজটা ভাঁজ করে পাশের টেবিলে রেখে বললেন, “সেই ভালো, শুরু করো তোমার বক্তৃতা”।

তিৎলি বলল, “আমি তাহলে নীচেয় যাই…অনেক কাজ আছে”।

অবিনবাবু বললেন, “না, মা তুমিও থাকবে। তুমি নীচেয় গিয়ে তোমার শাশুড়িমাকে বলে এস, আমি ডেকেছি…”। তিৎলি অহীন আর সর্বজিতের প্লেট আর কফির খালি প্লেট নিয়ে নীচেয় যেতে যেতে বলল, “আচ্ছা”।

অবিনবাবু স্মিতমুখে বললেন, “শুরু করো, সর্বজিৎ”।

সর্বজিৎ একটু সময় নিয়ে মনে মনে কথাগুলো গুছিয়ে নিল, তারপর বলল, “তুমি যখন সমাধিতে গেলে, দাদুর মুখে শুনেছি সালটা ছিল ঊণিশশ তেতাল্লিশ? তাই তো?”

“হুঁ”।

“গোটা ইওরোপ তখন যুদ্ধে জ্বলছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। প্রথম দিকে হিটলারের জার্মানি খুব বাজিমাত করলেও, মিত্রশক্তি অর্থাৎ আমেরিকা এবং ইটালি ছাড়া, ইওরোপের দেশগুলো পরের দিকে ভালোই পালটা মার শুরু করল। অবশ্য হিটলার তাতেও দমবার পাত্র নয়, আক্রমণ করে বসল রাশিয়াকে। রাশিয়ার স্টালিনকে আরেকজন হিটলারও বলা যায়। তফাৎ শুধু গোঁফে – একজনের টুথব্রাশ আরেকজনের মুশটাশ। স্টালিনের লাল ফৌজ হিটলারের নাজি বাহিনীকে নাকানি-চোবানি খাইয়ে ছাড়ল। শেষমেষ মিত্রশক্তি আর রাশিয়ার যৌথ চাপে হিটলার বিধ্বস্ত হল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হল ১৯৪৫ সালে। তবে এই যুদ্ধে সবথেকে বেশি মূল্য চোকাতে হয়েছিল জাপানকে। জাপান ছিল অক্ষ শক্তিতে, অর্থাৎ জার্মানি ও ইটালির সমর্থক। আমেরিকা জাপানে দুটি অ্যাটম বম্ব ফেলে ধ্বংস করে দিল জাপানের দুটি শহর। হিরোসিমা আর নাগাসাকি। আমেরিকার রসিক ও সভ্য বিজ্ঞানীরা ওই দুটি বম্বের নাম দিয়েছিল, লিট্‌ল্‌ বয় আর ফ্যাট ম্যান। পুঁচকে ছেলে, আর ভুঁড়ো মানুষ। দুই বোমায় নিহত হল প্রায় লাখ তিনেক নিরীহ মানুষ এবং আণবিক তেজস্ক্রিয়ায় কত মানুষ যে অসুস্থ আর পঙ্গু হল তার সম্পূর্ণ হিসেব পাওয়া যায় না।

অবিনবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, “এই অ্যাটম বম্ব বস্তুটা কি?”

সর্বজিৎ বলল, “তোমরা নানান কেমিক্যাল দিয়ে যে হাতবোমা বানিয়ে সায়েবদের মারতে, সে বোমার ক্ষমতাকে যদি পিঁপড়ে বলি, তাহলে তার তুলনায় অ্যাটম বম্ব হল লাখখানেক বা তারও বেশি হাতির ক্ষমতা। ওই ব্যাপারটা এখন ভুলে যাও, বিনুদা। ভীষণ জটিল বিজ্ঞান – আমার যা বিদ্যে-বুদ্ধি তাতে তোমাকে কিছুটা আভাস হয়তো দিতে পারব। এখন বরং আমাদের আগের কথায় ফিরে আসি।       

এই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্র এবং অক্ষ শক্তির সভ্য, উচ্চশিক্ষিত এবং সংস্কৃতিবান রাষ্ট্রনেতাদের হাতে মারা পড়ল প্রায় সাত-সাড়ে সাত কোটি মানুষ। তাদের অধিকাংশই নিরীহ নাগরিক।  

ওই হিসেবের বাইরে, এই যুদ্ধের সঙ্গে আমাদের সরাসরি কোন যোগ না থাকলেও, আমাদের এই বাংলার প্রায় তিরিশ লক্ষ লোক মারা গিয়েছিলেন স্রেফ অনাহারে”।

“সে কি? কেন?”

“বিনুদা, আমরা তখনও পরাধীন। সিন্ধবাদের ঘাড়ে চেপে থাকা সেই বুড়োর মতো বৃটিশরা তখন আমাদের ঘাড়ে বসে গোগ্রাসে গিলছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তাদের সৈন্যদলের খাদ্যের সংস্থান ঠিকঠাক রাখতে বাংলা থেকে জাহাজ ভরে তারা নিয়ে গিয়েছিল আমাদের মুখের গ্রাস – চাল, গম, ডাল…। মাথার ঘাম পায়ে ঝরিয়ে গ্রামে গ্রামে যাঁরা ফসল ফলান, তাঁদের না খাইয়ে মেরে ফেলল বৃটিশ সরকার – তাদের সৈন্যদের পেট ভরাতে”।

অবিনবাবু বিস্ফারিত চোখে সর্বজিতের কথা শুনছিলেন, অস্ফুট স্বরে বললেন, “কী বলছ, সর্বজিৎ!”

“সত্যি ঘৃণায় রক্ত গরম হয়ে ওঠে। সে সময় এই সব নানান কারণে আমাদের দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম যখন চরমে উঠল। তখন ইওরোপের পরিস্থিতিও দ্রুত বদলে যাচ্ছিল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানরা হেরে সম্পূর্ণ পর্যুদস্ত হলেও, বিজয়ী দেশগুলির মধ্যে বৃটিশদেরও বেজায় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। তার ওপর তারা ভয়ও পেল ভীষণ। এদেশ থেকে তারা বহু ভারতীয়কে নিয়ে গিয়ে, আধুনিক যুদ্ধবিদ্যা শিখিয়ে পাঠিয়েছিল জার্মানির সীমান্তে। সেসময় একে তো গোটা দেশবাসী তখন উত্তাল “ভারত ছাড়ো” আন্দোলন নিয়ে, তার ওপর ওইসব সুশিক্ষিত ভারতীয় সৈন্যরা দেশে ফিরে এসে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সঙ্গে যদি যোগ দেয়?

ঘটেও ছিল তাই – ১৯৪৬-এর নৌবিদ্রোহ। ব্রিটিশ ভারতে এই বিদ্রোহ বিখ্যাত “রয়্যাল ঈন্ডিয়ান নেভি মিউটিনি” নামে। ১৮-ই ফেব্রুয়ারি ১৯৪৬ সালে এই বিদ্রোহ শুরু হয় মুম্বাই বন্দরে, দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সারা ভারতের মুখ্য বন্দরগুলিতে – যেমন করাচি, কলকাতা, মাদ্রাজ, বিশাখাপত্তনম। তাদের অনেকগুলি দাবির মধ্যে ছিল – বর্ণ বৈষম্য, জাতি বিদ্বেষ – অর্থাৎ ভারতীয় নৌসেনারা যতই দক্ষ এবং সাহসী হোক না কেন, ব্রিটিশ অফিসাররা তাদের প্রতিপদে চরম অপমান এবং দুর্ব্যবহার করত। বৃটিশ সেনাদের তুলনায় ভারতীয় সেনাদের বেতন এবং অন্যান্য সুযোগসুবিধা সবকিছুই ছিল অত্যন্ত কম। আরও দেখা যেত বিপজ্জনক ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে সর্বদাই ভারতীয় সেনাদের সামনে এগিয়ে দেওয়া হত – আর ব্রিটিশ সেনারা থাকত পিছনে নিরাপদে।

এই বিদ্রোহকে সমর্থন করেছিল জাতীয় কংগ্রেস, ভারতের কম্যুনিস্ট পার্টি, মুসলিম লিগের মতো প্রধান রাজনৈতিক দলগুলি। এবং এই বিদ্রোহে সরাসরি সামিল হয়েছিল, বায়ু সেনা এবং কিছু কিছু অঞ্চলের স্থলবাহিনীর সেনারাও। কিছু কিছু শহরের পুলিশ বাহিনীও এই বিদ্রোহে প্রত্যক্ষভাবে যোগ দিয়েছিল।  যাইহোক সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেলের মধ্যস্থতায় এই বিদ্রোহের সমাপ্তি ঘটে ২৫শে ফেব্রুয়ারি ১৯৪৬।

মাত্র এই সাতদিনের বিদ্রোহই লণ্ডনে বসে থাকা ব্রিটিশ প্রধানদের হাড়ে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছিল। তারা বুঝেছিল প্রশিক্ষিত ভারতীয় সেনা এবং সাধারণ পুলিশও যদি এভাবে বিদ্রোহ করে, তাহলে ভারত ছাড়ো আন্দোলনে মেতে ওঠা বিপ্লবীদের সামলাবে কে? ইওরোপের নানান দেশ থেকে সদ্য ফিরে আসা রাণির ভক্ত বৃটিশ সৈন্যরা ওই সময় কেউ এদেশে আসতে চাইবে না। অতএব চালিয়াৎ বৃটিশরা হঠাৎই উদার হয়ে গেল, ঘোষণা করল যে, তারা ধীরে ধীরে ভারতীয়দের হাতে পূর্ণ শাসন ক্ষমতা ছেড়ে যাবে। যেটা বলল না, সেটা হল, মানে মানে কেটে পড়তে পারলে বাঁচি”।

অহীন বলল, “ইতিহাসে এসব ঘটনার কথা সবই পড়েছি, মুখস্থ করেছি। পরীক্ষা দিয়ে পাশও করেছি। কিন্তু তোমার মতো ঘটনাগুলোর এমন গুরুত্ব কেউ শেখায়নি, সরুদা। ঘটনাগুলো আজ নতুন চোখে দেখছি”।

তিৎলি হেসে বলল, “কার দাদা দেখতে হবে না?”

সর্বজিৎ লাজুক হেসে বলল, “তাই তো! যাগ্‌গে, আবার আগের কথায় ফিরি। সুসভ্য বৃটিশরা অনেক আগে থেকেই আমাদের দেশে হিন্দু-মুসলিম বিভেদটাকে উস্কে তুলছিল, সে কথা তোমরাও নিশ্চয় জানো, বিনুদা”।

অবিনবাবু বললেন, “সে আর জানব না? বজ্জাত বৃটিশদের ওটাই তো ছিল ধূর্তামি”।

সর্বজিৎ বলল, “একদম। এইবার ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় তারা বিভেদটাকে একদম সামনে তুলে আনল। মুসলিমদের সামনে কংগ্রেসকে হিন্দুদল আর হিন্দুদের সামনে মুসলিম লিগকে মুসলমানদের দল হিসেবে প্রচার করে দিল। তারপর দুপক্ষের নেতাদের সঙ্গে আলাদা আলাদা বৈঠক করে দুপক্ষকেই উস্কে দিতে থাকল। ফল যা হবার তাই হল, মুসলিমরা চাইল – ধর্মের ভিত্তিতে দেশ ভাগ করতে হবে। অর্থাৎ যে যে অঞ্চলে মুসলিম অধিবাসীদের সংখ্যাধিক্য – সেই অঞ্চলগুলি নিয়ে দুটো আলাদা দেশ হোক। অনেক বৈঠক, আলোচনা, দেশ জুড়ে বিতর্কের ঝড় – কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না। বৃটিশরা মুচকি হেসে বলল, সে বেশ হবে। তোমরা ঠিক করে ফেল, কীভাবে দেশটাকে ভাগ করা যায়”।

“দেশ ভাগ?” অবিনবাবু অবাক হয়ে বললেন।

“হ্যাঁ বিনুদা। দেশ ভাগ। বৃটিশ সরকার র‍্যাডক্লিফ নামের এক ব্যারিস্টারকে দেশভাগ কমিটির চেয়ারম্যান বানিয়ে, ভারতকে ভেঙে তিন টুকরো করার দায়িত্ব দেওয়া হল। মধ্যিখানে ভারত আর দুই পাশে দুই দেশ - পশ্চিম আর পূর্ব পাকিস্তান। পশ্চিমের পাঞ্জাব প্রদেশ আর আমাদের বাংলা দুটুকরো হল, বাকি দেশ একই রইল”।

“সে সময় গান্ধিজি, সুভাষ বসু, নেহরু কী করছিলেন?”

“১৯৪৫ সালের আঠারই আগষ্ট, নেতাজিকে শেষ দেখা গিয়েছিল, তাইওয়ানের তাইপেই শহরে। কেউ বলে বিমান দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। কেউ বলে ষড়যন্ত্র করে তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল। কেউ বলে তিনি সব ছেড়েছুড়ে সন্ন্যাস নিয়েছিলেন। তাঁর ঠিক কী হয়েছিল, সে কথা হয়তো কিছু লোক জানে বা জানত, কিন্তু সাধারণ মানুষ আজ পর্যন্ত জানতে পারেনি”।

“বার্লিনে হিটলারের সঙ্গে সাক্ষাতের পর ১৯৪৩ সালে সুভাষ বসু জাপান গিয়েছিলেন এই পর্যন্ত জানতাম। কিন্তু শেষ অব্দি তাঁর মতো নেতার এই পরিণতি হয়েছিল?”

“হ্যাঁ বিনুদা। আমাদের নেহরু আর মুসলিম লিগের জিন্না সায়েব দেশভাগকে সমর্থন করেছিলেন। গান্ধিজি দেশভাগ সমর্থন না করলেও – এই ব্যাপারে তাঁর আর কোন নিয়ন্ত্রণ ছিল না। এই পর্যায়ে অবিভক্ত বাংলার অজস্র জায়গায় হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে বীভৎস দাঙ্গা শুরু হয়েছিল। শুরু হয়েছিল গণহত্যা – দুপক্ষেরই বহুলোক মারা গিয়েছিল। পরিস্থিতি এমনই দাঁড়িয়েছিল – দেশ ভাগ ছাড়া, আর অন্য উপায় রইল না। বৃটিশরা যা চেয়েছিল, তাই ঘটল। এবং ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট পাকিস্তান আর ১৫ই আগস্ট ভারত স্বাধীন হল। সেই স্বাধীনতার উল্লাসে ফিকে হয়ে গেল লক্ষ লক্ষ নিরীহ মানুষের রক্তপাতের লজ্জা এবং বাধ্য হয়ে নিজের দেশ, গ্রাম, শহর ছেড়ে আসা লক্ষ লক্ষ উদ্বাস্তু মানুষের দুঃসহ অসহায়তার গুরুত্ব”।

সর্বজিৎ মাথা নীচু করে চুপ করে রইল অনেকক্ষণ। তারপর বলল, “তোমরা যে আদর্শে, যে স্বাধীনতার স্বপ্নে সংগ্রাম করেছিলে, বিনুদা। তার সমাপ্তি হল, স্বাধীনতা এল। কিন্তু মুষ্টিমেয় কিছু নেতা ক্ষমতার লোভে তাদের পছন্দ মতো ভারতটাকে ছিঁড়ে ফেলল। তাতে কত লোকের প্রাণ গেল, কতলোক উদ্বাস্তু হল তাতে ওই নেতাদের কী আসে যায়? যদিও ভারতের রাজনীতিতে গান্ধিজি তখন প্রায় অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছিলেন, তবুও নিজের মতো করে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে আবার যাতে শান্তি ও সদ্ভাব ফিরে আসে সেই চেষ্টা করছিলেন। অনেকেরই সেটা সহ্য হল না – স্বাধীনতার ছমাসের মধ্যেই ১৯৪৮ সালের জানুয়ারিতে তাঁকে হত্যা করা হল”।

“গান্ধিজিকে হত্যা? কী বলছ সর্বজিৎ। এও সম্ভব? মানছি, গান্ধিজির পথ ও মতামত সে সময়েও আমাদের  বহুবার, বহুক্ষেত্রে মনোমত হয়নি। কিন্তু তাই বলে খুন? কারা করেছিল? কেন করেছিল?”

সর্বজিৎ গম্ভীরভাবেই বলল, “এখন এই অব্দিই থাক, বিনুদা। তোমার সমাধিতে যাওয়া আর গান্ধিজিকে হত্যার মধ্যে মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধান। সেই পাঁচবছরের যে অতি সংক্ষিপ্ত বিবরণ তোমাকে বললাম, তাতেই তোমার শিউরে ওঠার মতো অনেক উপকরণ আমি দিয়ে ফেলেছি। এই যে প্রবীণদাদু – তোমার খ্যাঁদা - যাঁর জন্ম  ১৯৩৪ সালে। ভারত স্বাধীন হওয়ার সময় তাঁর বয়েস ছিল তের। একটি বালকের জ্ঞান হওয়ার বয়স যদি পাঁচ কিংবা ছয় ধরি – সেই বয়স থেকেই এই ধরনের প্রত্যেকটি মর্মান্তিক ঘটনা তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন। প্রতিটি ঘটনার অভিঘাতে, দেশের প্রতি তাঁর আবেগ যেমন জর্জরিত হয়েছে, তেমনই তাঁর মন থেকে বদলে যেতে থেকেছে সনাতন মূল্যবোধের ধারণা। তিনি দেখেছেন, সদ্য স্বাধীন দেশের মানুষ এই ঘটনাগুলির বিরুদ্ধে দায়সারা কয়েকদিনের প্রতিবাদ এবং ধিক্কার জানিয়ে – নির্লিপ্ত দক্ষতায় নিজ নিজ স্বার্থে, নিজ নিজ কাজে নিযুক্ত থেকেছে।

অনেক বেলা হল, স্নান করতে যাও, বিনুদা। আমরাও যাবো। আমাদের জন্যে বাড়ির সবাই অপেক্ষা করছেন”।

চলবে... 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নতুন পোস্টগুলি

স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১১

 প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "  দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা...